রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০

আহসান হাবিব।। পারক গল্পপত্র



কেথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের প্রতিটি থানায় তার ছবি পাঠিয়ে বলা হয়েছে কড়া নজর রাখতে। শুধু থানায় নয়, দেশের এমন কোন সীমান্ত ফাঁড়ি নেই যেখানে তার ছবি সহ ডিটেইলস পাঠিয়ে বলা হয়নি যেন এই ব্যক্তি কোনমতেই বর্ডার পার হতে না পারে। র‍্যাব তার বাহিনী নিয়ে ভীষণ তৎপর, যে কোন মূল্যে তাকে জীবিত পাকড়াও করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা ঘন ঘন মিটিং এ বসছে, ছক কষছে, সমস্ত দেশে ছকের জাল বিস্তার করা হয়েছে। বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিক ছবি দিয়ে বলা হয়েছে কোনমতেই যেন এই লোক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে। সাদা পোষাকের গোয়েন্দা দল নেমে পড়েছে। রেলস্টেশন, বাস স্টেশন, নদীর প্রতিটি ঘাট এবং ফুটপাতের দিকে নজর রাখছে। দেশের প্রতিটি ভিক্ষুকের প্রতি এমনভাবে নজর রাখা হচ্ছে কাউকে সন্দেহ হলেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।  যেন কোন উপায়েই চোখকে ফাঁকি দিয়ে বিশেষ করে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে। কেননা, ভারত আমাদের এমন প্রতিবেশী দেশ যেখানে একজন ছিঁচকে চোর কিংবা কালোবাজারিকে খুব সহজেই গুলি করে হত্যা করে ফেলে কিন্তু একজন দেশোদ্রোহী ঠিকই বর্ডার পার হয়ে যায় এবং বহাল তবিয়তে বসবাস করতে থাকে। সম্প্রতি শেখ মুজিবের খুনী ক্যাপ্টেন মাজেদ তার উজ্জ্বল প্রমাণ! কি করে এই লোক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বহাল তবিয়তে বছরের পর বছর একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে যেতে পারলো! 


এই প্রসংগেই 'রাষ্ট্রকে বোঝা বড় দায় হে' কথাটা বলে মেশের কাকা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন, ঠোঁটে তার সেই হাসি যা ঝুলে থাকে বিদ্রুপের ভংগী হয়ে। এখন শুধু বিদ্রুপ নয়, একটা অবজ্ঞা এবং সবজান্তা ভাব নিয়ে ফুটে উঠেছে। অবশ্য ভাদু কাকা এই ভাবকে কেয়ার করেন না, তিনি মেশের কাকার মুখের উপর বলে ফেলেন-

'রাষ্ট্রকে বোঝা সবচেয়ে সহজ, দেখতে হবে কারা ক্ষমতায় আছে, তাদের মতলব বুঝতে পারলেই রাষ্ট্র বোঝা হয়ে যায়'

মেশের কাকা ভাদু কাকার এই কথায় নড়েচড়ে বসেন, যদিও তিনি জানেন ভাদু কাকু এমন কথা বলতে অভ্যস্ত।

'ধর, এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, শেখ হাসিনা প্রধান মন্ত্রী, তুই রাষ্ট্রকে বুঝে ফেলেিসছ'?

'তার আগে তুই তাহলে বল রাষ্ট্র বোঝা বলতে তুই কি বুঝাতে চাইছিস'?

'ধর এই যে একটা লোক ভারতে পালিয়ে গেলো, সেখানে সে কি করে এতো বছর থাকতে পারলো? কংগ্রেস ছিল, এখন বিজেপি, সব আমলেই তো সে বহাল তবিয়তে ছিল, রাষ্ট্র তাহলে কি? এই ব্যক্তির দ্বারা সব রাজনৈতিক দল কিভাবে সুবিধা পায়'?

'এটা বুঝলি না! এটা হচ্ছে কুটনৈতিক খেলা, পররাষ্ট্রনীতি, এর মধ্য দিয়ে পাশের রাষ্ট্রকে চাপে রাখা'

'তা তুই ঠিকই বলেছিস, এখন বল তো এই যে তাজুল নামের লোকটা সাত সাতটা লোককে খুন করে ফেললো, ব্যাংকের সব টাকা লুট করে নিয়ে চলে গেল, রাষ্ট্র তাকে ধরতে পারছে না কেন'?

'কে বলেছে তোকে রাষ্ট্র ধরতে পারছে না, বল ধরছে না'

এবার মেশের কাকা চুপ করে যান, চায়ের কাপে চুমুক দেন, হাসিটা একটু ম্লান হয়ে আসে, অবজ্ঞার ভাবটা কমে আসে।



দেশের পুরো মিডিয়া ভেংঙে পড়েছে তাজুলের উপর। ক্রাইম রিপোর্টাররা আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে, যদিও এদের প্রধান কাজ তাজুলকে বের করা নয়, তাজুলের ব্যক্তিগত সব কাহিনী রসিয়ে রসিয়ে বলা। এই রসিয়ে বলা গল্পগুলো আম জনতা খায় এবং এসবে মজে থেকে আসল গল্প ভুলে যায়। কয়েকদিন আগে করোনা কেলেঙ্কারিতে ধৃত ডাঃ সাব্রিনার কথা এখন প্রায় সবাই ভুলে গেছে, ভুলে গেছে পাপিয়ার কথা, শামিমের কথা কিংবা সম্রাটের কথা। এখন মাতামাতি চলছে মেজর সিনহাকে নিয়ে। যদিও সিনহা ছাপিয়ে এখন সবার মুখে মুখে উঠে এসেছে শিপ্রা দেবযানীর কথা। এখন হত্যার নায়ক ওসি প্রদীপের কথা ভুলে যাচ্ছে, এখন মুখে মুখে ঘুরছে শিপ্রার কথা। কেন? কারণ শিপ্রা একজন নারী, তার যা কিছু ব্যক্তিগত, সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তার যৌনতার বিষয়গুলি! যেমন কয়েকদিন আগে ডা: সাব্রিনার বেলায় ঘটেছিল। তার পোষাক, তার স্বামীর সংখ্যা, প্রেমিকের সংখ্যা, সেক্স ভিডিও ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়েছিল। পুরুষ ক্রিমিনালের বেলায় এরা খুঁজে বেড়ায় নারী আর নারী ক্রিমিনালের বেলায় খুঁজে পুরুষ! এইসবের ফাঁকে রাষ্ট্র বগল বাজায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হালকা হয়ে পড়ে! রাষ্ট্র তখন তার ক্ষমতাকে সংহত করার সুযোগ পায় এবং লাগাতার এই খেলা চলতে থাকে।


এই মুহূর্তে দেশের সব মিডিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে ছুটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব ব্যস্ত পুলিশ বিজিবি র‍্যাব বাহিনীর প্রধানদের সংগে আলোচনায়। গোয়েন্দা সংস্থার লোকও যোগ দিয়েছে আলোচনায়- একটাই লক্ষ্য যে কোন মুল্যে তাজুলকে গ্রেফতার। 


সভার কাজ শেষ হয়ে বিবিধ বাহিনীর প্রধানরা বেরিয়ে গেলেন, তারা সকলেই চৌকষ, কোন সাংবাদিক তাদের কোন প্রশ্ন করার সাহস দেখাল না। তারা চলে যেতেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো মন্ত্রীর কামরায়। মন্ত্রী সম্ভবত এটাই চাইছিলেন, যদিও তার চোখে মুখে একটা ব্যস্ততার ছাপ তিনি এঁকে রেখেছেন। একটা ফোন এসেছে, মন্ত্রী ফোন ধরলেন..'জ্বী ম্যডাম, জ্বী ম্যাডাম' বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। উপস্থিত সব সাংবাদিক বুঝে ফেললো এটা নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রীর ফোন। সারাকক্ষে একটা নজিরবিহীন পিনপতন নীরবতা, কেননা সাংবাদিকরা যখন কারো সাক্ষাৎকার বিশেষত মন্ত্রি বা কোন সেলিব্রিটির নিতে যায়, একটা ছোট খাটো হাট বানিয়ে ফেলে, শত শত মাইক্রোফোন মুখের সামনে কিলবিল করতে থাকে আর প্রশ্নের বাণ ছুটতে থাকে আর যারা ফটো সাংবাদিক, তাদের অবিরাম ক্লিক চলতে থাকে। একটা বাজার মনে হয়, সাংবাদিকরা খদ্দের আর মন্ত্রী মহাশয় মাছ বিক্রেতা! 

'তাজুলের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি'?

মন্ত্রী কিছু বলার আগেই অজস্র প্রশ্ন আসতে থাকে, মনে হয় উত্তর নয়, প্রশ্নই আসল, মন্ত্রী শুধু প্রশ্ন শুনে যান এবং মুখমণ্ডলে এমন একটি ভাব বজায় রাখেন, যেন তিনি এদের নিয়ে খেলছেন!

'তাজুলের অবস্থান সম্পর্কে কতটুকু জানতে পেরেছেন, মাননীয় মন্ত্রী'?

'তাজুল একজন খুনী, এর আগেও সে খুন করেছে, তার নামে মামলা আছে, সে কি করে ছাড়া পায়'?

মন্ত্রী কোন উত্তর দেন না, প্রশ্ন শুনে চলেন, একদা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান,

'আমি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবো, কিছু সময় অপেক্ষা করুন, বিকেলেই বিশেষ সংসদ অধিবেশন বসছে, আমি সেখানেই সব জানিয়ে একটা বিবৃতি দেবো' বলেই তিনি তার কক্ষ থেকে খুব দ্রুত বেরিয়ে পড়েন, পেছনে সাংবাদিকদের দংগল তার পেছন পেছন ছুটতে থাকে, সংগে নানা ধরণের উত্তরবিহীন প্রশ্ন। 


সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে একটি বিবৃতি দিলেন- 'যে কোন মূল্যে খুনী তাজুলকে গ্রেফতার করা হবে। খুনী যেই হোক, ক্ষমা নেই। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভীষণ তৎপর রয়েছে, গ্রেফতার সময়ের ব্যাপার মাত্র'।



অথচ সাতদিন পেরিয়ে গেলো তাজুলের টিকিটিরও সন্ধান পায়নি কোন বাহিনী। এর মধ্যে তাজুলের বাসা থেকে তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ সহ অন্যান্য বহু ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি জব্দ করেছে। তিন বাহিনীর লোকেরা অবাক হয়ে যায় যখন তারা তাজুলের বাসায় একটা জল্লাদখানার সন্ধান পায়। শুধু তাই নয়, এক বিশাল মারণাস্ত্রের সংগ্রহ যখন তাদের চোখে পড়ে, তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তারা অচিরেই বুঝে ফেলে তাজুল কোন যা তা খুনী নয়, নিশ্চয় তার আন্তর্জাতিক কানেকশন আছে, হতে পারে সে বিশাল মাফিয়া চক্রের হোতা। তাকে পাকড়াও করা যে সহজ হবে না, তারা বুঝে ফেলে। ইতোমধ্যেই তাজুলের মোবাইল থেকে তার সব যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই খতিয়ে দেখতে গিয়ে তারা আরো অবাক হয়ে পড়ে যখন দেখে দেশের তাবৎ বড় বড় রাজনীতিবিদদের সংগে তার কথাবার্তার তালিকা। এই সাতদিন সে কারো সংগে কথা বলেছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, কারণ তার নিজের আইডি থেকে কোন ফোন সে করেনি। সব শেষ ফোনটি সে যাকে করেছে, ইতোমধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাকে জেরা করে কিছুই পায়নি বলে সংবাদপত্র গুলো খবর ছাপছে। এরই মধ্যে ফেনি শহরে ঘটে যায় এক লোমহর্ষক ঘটনা, প্রকাশ্য দিবালোকে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে ফেনি ডিগ্রী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাগরকে। ঘটনার বিবরণে জানা যাচ্ছে জয়নব নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতো একসংগে দুজন- সাগর এবং সৈকত। মেয়েটিকও নাকি দুজনকেই ভালোবাসতো কিংবা ভালোবাসার অভিনয় করতো। এটা জানাজানি হয়ে গেলে প্রেমিক সৈকত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং কলেজ গেটে সাগর জয়নবকে একসংগে দেখতে পেলে দলবল নিয়ে সাগরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাগরের সংগে তখন জয়নব একই রিকশা থেকে নামছিল । জয়নবের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটলে সে নির্বাক হয়ে পড়ে, সে সৈকতকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি, ফলে জনমনে এই হত্যাকাণ্ড ব্যপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।


'আপনি কি মনে করেন না দেশে আইন শৃঙ্খলা ভেংঙে পড়েছে'?

'একদম না, স্বাধীনতার পর এখন আইন শৃঙ্খলা সবচেয়ে উন্নত এবং স্বাভাবিক আছে'

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর তাৎক্ষণিক জবাব,

সাংবাদিকদের মধ্যে মৃদু হাসির রেখা উঠতে না উঠতেই বাতাসে মিলিয়ে যায়,

'তাজুলকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি কেন'?

'সব প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে, ধরা তাকে পড়তেই হবে'

'পেপার পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাজুল আপনাদের দলের লোক, সব নেতা নেত্রীদের সংগে তার ছবি আছে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সংগেও তার ছবি আছে, এটাকে কি বলবেন'?

'দল থেকে তাকে ইতোমধ্যেই বহিষ্কার করা হয়েছে'

আবার একটা মৃদু হাসি অনতিবিলম্বে বাতাসে মিলিয়ে যায়! তারা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে, কোন প্রশ্ন করার কথা তারা ভুলে যায়।



'কি বুঝলি ভাদু? রাষ্ট্রকে বুঝতে পারছিস'?

'খুব পারছি'

'তাজুল কিন্তু ধরা পড়েনি'

'এটাই তো রাষ্ট্র! রাষ্ট্র কাকে ধরবে কাকে ধরবে না, এটাই তুই এখনো বুঝে উঠতে পারলি না রে মেশের, আবার তুই রাষ্ট্র বুঝতে চাস'! কথাটা শোনার পর কেন জানি মেশের কাকার সেই বিখ্যাত হাসিটা আরো বিস্তৃত হয়! 

'তাজুল কি দেশে আছে বলে মনে করেন মেশের কাকা'

আমি প্রশ্নটা করে ফেলি,

'আছে কিংবা নাই, যদি দেশে থাকে, ভাল আছে, নিরাপদে আছে, যদি বিদেশ চলে গিয়ে থাকে, তাও রাষ্ট্র সেটা জানে'

'কাকা, আপনার কি মনে আছে ২১ শে অগাস্ট বোমা হামলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি বলেছিলেন'?

'খুব মনে আছে, উই আর লুকিং ফর শত্রুজ'

ভাদু কাকা, মেশের কাকা এবং আমি এক সংগে হেসে উঠলাম! 

'এরই মধ্যে কিন্তু ফেনিতে আবার প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক ছাত্রকে, কাকা জানেন'?

'নিশ্চয় জানি এবং এও জানি তোদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছে স্বাধীনতার পর নাকি দেশে এতো ভাল আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর কখনো এমন উন্নত ছিল না, ভাদু কি বলবি, এটাকে'?

ভাদু কাকা সেলাই মেশিনে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছিলেন কিন্তু কান এদিকে খাড়া, কাজ বন্ধ না করেই বললেন-

'স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কি এমন ভুল বলেছে শুনি? এমন একটা রেজিম দেখাতে পারবি যখন মন্ত্রীরা আইন শৃংখলা নিয়ে এমন কথা বলেনি'?

মেশের কাকা এবং আমি ভাদু কাকার কথা শুনে চুপ, সত্যিই তো সব সরকারের একই রা।

'শোন' ভাদু কাকা যোগ করেন 'যেখানে মানুষ সেখানেই অপরাধ। উন্নত দেশগুলো কি এর বাইরে? না, তবে তাদের ওখানে বিচার ব্যবস্থা উন্নত, আমাদের এখানে সরকার বিচার ব্যবস্থার উপর আধিপত্য খাটায়, এই যা'! 



সাগর এবং জয়নবের সেক্স ভিডিও এখন সবার মোবাইলে মোবাইলে ঘুরছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন বুঁদ হয়ে এই সেক্স ভিডিও দেখছে। খুনের মোটিফ বদলে গেলো যখন জয়নবের সেক্স ভিডিও সৈকতের সংগেও বেরিয়ে পড়লো। সারাদেশ এখন এই সেক্স ভিডিও দেখতে মেতে উঠেছে, সাত হত্যার খুনী তাজুল এখন মানুষের স্মৃতি থেকে প্রায় উধাও হতে বসেছে। সব ধরণের মেডিয়া এখন সাগর সৈকত জয়নবের যৌনতা নিয়ে নানা গালগল্পে মেতে উঠেছে। সৈকত এখনো পলাতক, তাজুলের মত তাকেও ধরা সম্ভব হয়নি, তবে এটা ঠিক সৈকত ধরা পড়বে। কারণ সৈকতের ছবি এখনো কোন রাজনৈতিক নেতার সংগে দেখা যায়নি।


সারাদেশ তাজুলকে গ্রেফতারের দাবীতে ফুঁসে উঠেছিল, সাগর হত্যার কাহিনী যেন সবাইকে নির্বাক করে দিয়েছে। তারা প্রতিবাদ করতেও যেন ভুলে গেছে। 'অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর' অবস্থা দাঁড়িয়েছে এমন। কিন্তু তাদের জন্য আরো অবাক হওয়া বাকি ছিল। যখন তারা শুনলো কক্সবাজারের পুলিশ একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে গুলি করে হত্যা করেছে। সারাদেশ কেঁপে উঠলো এই ঘটনায় এবং আশ্চর্য এই ঘটনায় কেউ প্রতিবাদ জানলো না


'আচ্ছা বলতো ভাদু, মেজর সিনহা হত্যায় কেন মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামলো না'?

ভাদু কাকা এই প্রশ্ন শুনে মুচকি মুচকি হাসছেন, আমি সেই হাসিতে দেখতে পাচ্ছি এক শ্লেষ যা অচিরেই বেরিয়ে আসবে তার সেই পরিচিত শীতল উচ্চারণের মধ্য দিয়ে,

'এই তুই রাষ্ট্রকে চিনলি মেশের, জনগণকে চিনলি না! আরে জনগণকে না চিনলে তুই রাষ্ট্রকে চিনবি কি করে?'

মেশের কাকার মুখটা সামান্য চুপসে যায়, হাসিটা অবজ্ঞা থেকে অন্য এক ফর্মে রূপ নেয়, সেটা দমে যাওয়া কিংবা আরো শ্লেষাত্মক হয়ে ওঠা বোঝা যায় না,

'তুই বল না শুনি:

'তোর মনে আছে এর আগে তনু হত্যার ঘটনা, ঘটনাটা ঘটেছিল ক্যান্টনমেন্ট চৌহদ্দির ভেতরে, জনগণ এই ঘটনায় ফুঁসে উঠেছিল, কিন্তু সরকার তেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি, আজো নেয়নি, কেন নেয়নি? কারণ সরকার আর্মিকে নাড়তে চায়নি, সেটা জনগণের মগজে সেট হয়ে আছে একটা হিংসার রূপ নিয়ে। আজ যখন মেজর সিনহা, হোক অবসরপ্রাপ্ত, তবু যেহেতু আর্মি ট্যাগ লাগানো, তাই জনগণ পথে নামেনি'

'কিন্তু সরকার তো এই ব্যাপারে খুব তৎপর'

'স্বাভাবিক, এখানে সরকার বাধ্য হয়েছে, চাপটা যে আর্মি থেকে আসছে'

'তাহলে তুই কি বলতে চাস দেশ বাহিনীর হাতে পুতুল'?

'এটাই বুঝতে পারিস না, আবার রাষ্ট্র বুঝতে চাস'!

মেশের কাকা এবার একদম চুপ হয়ে যান, আমি এই ফাঁকে রাষ্ট্র বিষয়ক এক অসাধারণ জ্ঞান লাভ করতে থাকি, আমার ভেতরেও অসীম শূন্যতা নেমে আসে।

মেশের কাকা একটা সিগারেট ধরান, এক কাপ চায়ের অর্ডার করেন,

'আমাকে ছাড়াই চা খাবি, মেশের'? বলে ভাদু কাকা জোরে জোরে হেসে ওঠেন, মেশের কাকাও হাসতে থাকেন, দুকাপ নয়, এবার তিনকাপ চায়ের অর্ডার হয়, আমার জন্যও বরাদ্দ হয়।

'তাহলে ভাদু তুই আমাকে বল এই যে মেজর সিনহা  হত্যায় পুলিশকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটার কি ব্যাখ্যা '?

'সহজ' বলে ভাদু কাকা চলে আসা চায়ের কাপে চুমুক দেন, 'পুলিশ অধিকতর সফট ফোর্স, জনগণকে বাগে রাখতে এই গ্রেফতার দরকার ছিল। তুই দেখ ইয়াসমিন হত্যায় কিন্তু পুলিশের ফাঁসি হয়েছিল। তুই দেখাতে পারবি তথাকথিত কোন গণতান্ত্রিক সরকার কোন আর্মিকে জেলে পুরেছে'?

মেশের কাকা ইতিহাস হাতড়াতে থাকেন, মনে হয় খুঁজে পান না, কথাও ফোটে না, নীরব থাকেন। 

'আচ্ছা তুই বলতো তাজুল কি ধরা পড়বে'?

'পড়বে, যখন জন অসন্তোষ থিতিয়ে আসবে, আরো বড় বড় ঘটনায় মানুষ মেতে থাকবে, তখন তাজুল পুলিশ বা র‍্যাবের জালে আটকা পড়বে' বলে ভাদু কাকা তার ঠোঁটে একটা অন্যরকম হাসি ঝুলিয়ে দেন।

'এমন কেন করবে'?

'করবে, কারণ তখন তাজুলকে হ্যান্ডেল করা সহজ হবে আর নতুন নতুন ইস্যুগুলি তাজুলে কিছুটা হাল্কা হয়ে উঠবে। জনগণ ভাববে- না, আমাদের সরকার তৎপর আছে'

মেশের কাকা আর কোন কথা বলার জো পান না, চুপ করে থাকেন। 

আমার ভেতরে অনেক ক্ষণ থেকে একটা উঁকি মারছিল, বলেই ফেললাম-

'আচ্ছা কাকা, এই যে ত্বকী হত্যা হলো, এখন পর্যন্ত কাউকে ধরা হল না কেন, কিংবা সাগর-রুনী হত্যা মামলার কাজ থেমে আছে কেন'?

'এগুলো দলীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিষয়, এখানে ক্ষমতা প্রধান নিয়ামক। এগুলি রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকার চেয়ে দল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্নটা বেশি জড়িত। দলকে দেখতে হয় এসব'

'তাতে তো জনগণের কাছে ভুল বার্তা যায়'

'যায়, কিন্তু দল তাতে কম ক্ষতির মুখে পড়ে। মনে রাখিস দল ঠিক না থাকলে কোন কিছু মোকাবেলা করা সম্ভব নয়'

আমি ভাদু কাকার দিকে অবাক চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকি, মেশের কাকার মুখ থেকে, ঠোঁট থেকে অবজ্ঞা মিশ্রিত হাসিটা তখন উধাও হয়ে সেখানে ঝুলে পড়েছে শ্রাবণের মেঘ! 



আজ সমস্ত মিডিয়ার একটাই হেডলাইন- 'গতকাল গভীর রাতে সাত খুনের আসামি তাজুল ইসলামকে গ্রেফতারের সময় দুপক্ষের গুলি বিনিময় কালে তাজুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারা পড়ে। একজন পুলিশও গুলিবিদ্ধ হয় এবং আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা আশংকাজনক'।