বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সরোজ দরবার।। পারক গল্পপত্র



প্রেমিকার হাতে আলতো একটা চিমটি কাটা থেকে দাঙ্গা বেধে যাতে পারে! ভাবতে পারেনি মহীউদ্দিন। 

শোভনাও কি ভেবেছিল! 

ওরা তখন খুনুসুটি করছিল। যে-কোনো প্রেমের গল্পে যেমনটা হয়। শোভনা মহীউদ্দিনের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে কিছু বলছিল। শোভনার ঈষৎ তপ্ত নিঃশ্বাস মহীর শরীরে শিরশিরানি ধরাচ্ছে তখন। তার কান দুটি ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে। মহীও একটু পিছনের দিকে হাত বাড়িয়ে শোভনাকে আরও খানিক কাছে টেনে নিয়েছে; শোভনার ফরসা লম্বা গলার কাছে তার মুখটা এনে গোপনে কিছু বলতে থাকে। মহীর অল্প-ভেজা ঠোঁটের আভাস পায় শোভনা। তার শরীর গোপনে গোপনে শক্ত হয়ে ওঠে। যে-কোনো প্রেমের গল্পে, প্রেমাস্পদের প্রথমবার একান্তে মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে যে সমস্ত অনির্বচনীয় ঘটতে থাকে, এক্ষেত্রেও তা-ই তা-ই হচ্ছিল। ওরা একে অন্যের ভিতর হারিয়ে যাচ্ছিল। আর ঠিক সেই সময়ই কী-এক কথায়-কথায়, মহী শোভনার হাতে চিমটি কাটে। বোধহয় একটু জোরে। শোভনার যতটা লেগেছিল, তার থেকে একটু জোরেই, কপট রাগত স্বরে সে বলে বসেছিল, উহ! কী ডাকাত! লুট করতে এসেছ সব, অ্যাঁ! 

এ-কথা ঠিক যে, মহী ও শোভনার প্রেম-বিয়েতে কারও মত ছিল না। মহী, শোভনাকে নিয়েই পালিয়েছিল। শোভনা রাজিও ছিল।

কিন্তু এই সাধারণ গল্পে অসামান্য ভূমিকা নিল শোভনার বলা ‘লুট’ কথাটা।

দিকে দিকে রটে গেল, মহী আসলে শোভনাকে লুট করে নিয়ে গেছে। তা, প্রেমিক পুরুষ তো তার নারীটিকে নিজের কাছে চাইবেই। দুজনে তারা কাছাকাছি আসতে চাইবে, এই তো প্রেমের ধর্ম।

কিন্তু এই গল্প যে এত সরল সমীকরণে চলবে না, তা স্পষ্ট। কারণ, তাহলে ওই ‘লুট’ শব্দটি এত গুরুত্ব পেত না। 

অতএব, দুটো দল খাড়া হয়ে গেল। একদল জোর গলায় বলল, মহীউদ্দিনের তো রক্তেই আছে লুটতরাজ। 

ওদিকে তখন শোভনার মুখে লুটের কথা শুনে মহীও গম্ভীর। তার চঞ্চল হাতের সমস্ত খেলা স্তব্ধ হল। তার নিঃশ্বাস ধীর হয়ে এল। সে করুণ চোখে শোভনার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমাকে লুটেরা বললে?

শোভনা তখনও জানে না, এতে দোষের সে কী এমন করেছে! নিজের পুরুষ, যার কাছে সে নিজেকে অপ্রকাশ্য রাখবে না, স্বেচ্ছায় যার হাত ধরে ঘর ছেড়েছে, তার সঙ্গে একটু কৌতুকও করবে না! আরও জোর দিয়ে সে তাই বলে, লুটেরাই তো। লুটেরা লুটেরা লুটেরা...

সত্যি?

নয়তো কী! একেবারে মামুদ সুলতান।

শোভনার এটুকু প্রেমোক্তি না-বোঝার মতো মূর্খ মহী ছিল না কোনোদিনই। কিন্তু তার ভয়টা ছিল এখানেই। এর আগেও দুষ্টুমি করে শোভনা তাকে মাহমুদ বলেছে, বলেছে সব লুট করে নেওয়ার কথা। মজা করেই বলেছে। আর যতবার তা শুনেছে, ততবার শরীর ক্রমশ কাঠ হয়ে গিয়েছে মহীর। একটা আস্ত পোড়া কাঠ। কিছুতেই আর সে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। যতবার শোভনার মুখে এ-কথা শোনে, ততবার তার শরীরের একটা করে অংশ পোড়া কাঠ হয়ে যায়। সে-কথা সে শোভনাকে বলতে পারেনি কোনোদিন। 

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধে না-হলে প্রবাদজন্ম মিথ্যে হত। ফলে, যা ভয় পাচ্ছিল মহী, শোভনা ঘুণাক্ষরেও যা টের পায়নি, বাস্তবিকই তা-ই তাই-ই হতে থাকল।

জোর-গলার-দল, আরও জোর গলায় বলল, কী, রক্তে যে লুট আছে, ভুল বলেছিলাম নাকি? হল তো এবার! এবার, প্রেমিকা তো নিজের মুখেই বলছে মাহমুদ। আমরা তো কোন ছাড়।

দ্বিতীয় দল, যেন তেমন আত্মবিশ্বাসী নয়, তবু নড়বড়ে যুক্তি সাজিয়েই কিঞ্চিৎ উচ্চস্বরে বলল, কিন্তু সে তো কথার-কথা। ওসব সত্যি ধরে নাকি কেউ? আর কোন যুগের সঙ্গে কোন কথাকে মেলাচ্ছ তোমরা?

কেন? মেলানোর কী আছে! সুলতান মাহমুদ কি হানা দেয়নি? সোমনাথ মন্দির লুট করেনি?

করেছে।

তাহলে, অস্বীকার করছ কেন?

অস্বীকার করছি কোথায়? কিন্তু সেই সঙ্গে পাঞ্জাবের শাহী রাজা জয়পালের আক্রমণের কথা বলবে না? সুলতান সুবক্‌তিগীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তো তিনিই আগে ঘোষণা করেছিলেন। 

তো?

তারপর ঘুজকের কাছে যেই বেকায়দায় পড়লেন, সন্ধি করলেন। কিন্তু, ক-দিন যেতে-না-যেতেই নিজের সন্ধি নিজেই ভেঙে ফের ঘজনী আক্রমণ করলেন। সেই শঠতার কথা বলবে না, তুমি?

একে শঠতা বলবে?

শঠতা নয়! রাজায়-রাজায় যুদ্ধ, তা নয় মানা গেল! কিন্তু সন্ধি ভাঙলেন কেন? সুবক্‌তিগীন তো জয়পালের শঠতারই জবাব দিতে চেয়েছিলেন। নিজে পারেননি। ছেলে মাহমুদকে সে-দায়িত্ব নিয়েছিল। মাহমুদ তো এই অস্মিতা ভাঙতেই এতবার করে...

একে শঠতা নয়, দেশপ্রেম বলে, মূর্খ কোথাকার। তোমার দেশ, অন্য কেউ দখল করতে পারে, এরকম সম্ভবনা থাকলে তুমি কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে?

তা কে বলেছে?

জয়পালকে কাঠগড়ায় যখন তুলছ, তখন এটা মাথায় থাকে না! আসলে এইসব হাবিজাবি বলে, সোমনাথ ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। এসব কারসাজি আর চলবে না, কেমন!আমাদের মন্দির লুটে নিয়ে গেলে, আমরা কেউ বসে থাকব না। সেদিনও থাকিনি। আজও নয়।

মন্দির লুট তার আগেও হয়েছে, ভাই। ইসলাম যখন আসেনি, তার আগেও মন্দিরগুলোর সম্পদ লুট করে নিয়ে গিয়েছে বিজয়ীরা। কী করে অস্বীকার করবে যে, তখনকার অর্থনীতির একটা বিরাট কেন্দ্র ছিল মন্দিরগুলো। সেই কারণেই লুটপাট চলত।

আমরা তো তাই-ই বলছি। 

মন্দিরগুলো ঘেরা থাকত প্রাচীরে। যাতে আক্রমণ ঠেকানো যায়। তার মানে, এও তো ঠিক যে, মন্দির আক্রমণ তার আগেও বহুবার হয়েছে। কারণ, মন্দিরে প্রচুর ধন-সম্পত্তি থাকত।

আহ! তোমরা তো আমাদের লাইনেই কথা বলছ হে! আমরা একদম এই কথাটাই বলছি। বলছি যে, আমাদের সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে মাহমুদ। হাজারে হাজারে আমাদের ভাইবোন সেদিন বাধা দিয়েছে, আর প্রাণ হারিয়েছে। আমরা সে-সব ভুলে যাব?

ভুলতে তো বলিনি।

বলছ তো তাই।

বলছি, পুরোটা মনে রাখতে। জয়পালের কথাও যেন মনে রাখা হয়। ওটা না-থাকলে, মামুদের আক্রমণ হয় না।

আবার বলছি, বারবার বলছি, জয়পাল বিধর্মীদের হাত থেকে নিজের দেশ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

মামুদও তো বাবার সঙ্গে হওয়া প্রতারণার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন।

প্রতিশোধের কথাটা তাহলে স্বীকার করলে তো। তাহলে মানলে তো যে, বিধর্মী মাহমুদ প্রতিশোধের বশে সোমনাথকে ছারখার করেছিল। লুট করেছিল। সোনা-দানা নিয়ে চলে গিয়েছিল ঘজনীতে।

আমরা তো একবারও বলিনি যে, মামুদ লুট করেনি।

আমরাও এতক্ষণ ধরে সেই একটা কথাই এতবার করে বলছি। লুট করেছিল, এবং, এখনও করছে।

অর্থাৎ, মোটে একখানা শব্দে এসে দুই দলই থামল। ‘লুট’। মাহমুদ লুট করেছিল; মহীও লুট করছে। সেদিন সোমনাথ মন্দির। এখন শোভনাকে। 

২)

একটা বানিয়ে তোলা গল্প। মহী ও শোভনার। কারণ, এই নামে কাউকে আমরা চিনি না। তাঁদের প্রেমের মুহূর্তে উঁকি দেওয়ার মতো কু-কর্ম আমরা করিনি। অতএব? গল্পটা আগাগোড়া বানানোই ছিল। কিন্তু, মুশকিল হল অন্যত্র। গল্পটা আমরা যেখানে ছেড়ে এলাম, সেখানে শেষ হল না।

দুই দল থেমে গিয়েছিল। আমরা স্পষ্টই বুঝেছিলাম, এরকম বিচারে, এমনধারা বাদানুবাদে কোনও সমাধান নেই। এত বছরের ইতিহাসকে আজ এক প্রেমাষ্পদের গল্পে টেনে আনতে গেলে সেই ভেড়া-নেকড়ের গল্প বানাতে হয়। তুই জল নোংরা করিসনি তো, তোর বাবা করেছে গোছের মীমাংসায় পৌঁছতে হয়। কিন্তু শিশুপাঠ্য সে-গল্প নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার আর-কোনও মানে হয় না।

এই বিবেচনাতেই গল্পটিকে ছেড়ে রেখে আসা হয়েছিল। কিন্তু পরিত্যক্ত সন্তান যেমন কপালজোরে কাউকে-না-কাউকে পেয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে, এ-গল্পেরও তা-ই হল। গল্প এবার নিজে নিজেই বেড়ে উঠতে থাকল; গল্প সূচনাকারীর তার উপর আর-কোনও নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হল না।

৩)

তাহলে মহী কে?

সে-এক দুর্ধর্ষ নারী হরণকারী।

ধর্ষক কি?

হতেও পারে? অন্তত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নোয়াখালিতে দেখনি? 

মহী কোথায় থাকে?

কেউ জানে না। তার লোকেরা তাকে আড়াল করে রাখে। তবে তার চর-অনুচররা সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। আর, শোভনার মতো লক্ষ্মী-প্রতিমা মেয়ে দেখলেই তাদের ধর্মনাশ করে। প্রেম তাদের প্রেম নয়; একরকমের হাতিয়ার।

এদের হাত থেকে ঘরের মা-বোনেদের রক্ষা নেই তবে?

রক্ষা করতে হবে।

এদের মধ্যে কেউ কি ভালো নেই? সকলেই এমন?

ভালোর কথা ভাবতে পারি না, যখন খারাপটা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে।

কী দেখা যাচ্ছে? এই যে বললে, মহীকে কেউ চোখে দেখেনি।

আমি দেখিনি। অন্য কেউ দেখেছে।

সে তো মিথ্যেও বলতে পারে।

সে মিথ্যে বলবে কেন?

 এই বিন্দুতে এসে কথোপকথন থামে। এবং সিদ্ধান্ত টানা হয়ে যায়। 

সিদ্ধান্ত ১ - মহী এক নারী লুন্ঠনকারী, ধর্ষক।

এবার, দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের দিকে এগোতে আমাদের আর-একটা কথোপকথনে কান দিতে হবে। 

সত্যি কি মহী নারী হরণকারী?

নাও হতে পারে।

আর, ধর্ষক?

তাও নাই-ই হতে পারে।

তাহলে, এত রাগ কেন?

আসলে, হয়তো ওরা ভালোবেসেই বিয়ে করেছে।  

তবে! আপত্তি কোথায়!

না, আপত্তি নেই। তবে সত্যি বলতে কি, মহী তো একাধিক বিয়ে করতে পারে। তাতে শোভনার কপাল পুড়বে।

হুম, সে-সম্ভবানা আছে।

তা ছাড়া, আর একটা ব্যাপারও আছে।

সেটা কী?

এত সন্তান হয় ওদের। গোটা দেশটা তো ওদের সন্ততিতেই ভরে যাবে। বাকি কারও আর থাকার জায়গা হবে না।

বলছ!

শুধু আমি কেন? সকলেই বলছে। 

কিন্তু তাহলে এতদিনে তো হয়েই যেত। মহীরা তো সন্তানের জন্ম দিয়েই দেশ দখল করে ফেলতে পারত। কই হয়নি তো!

এখনও হয়নি। তবে হওয়ার সম্ভাবনা তো বাতিল করা যায় না।

সে তো এমনি অনেকেরই কাচ্চা-বাচ্চার সংখ্যা বেশি।

দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে। তা ছাড়া, জন্মনিয়ন্ত্রণ কি মহীরা মানবে? না, মানানো যাবে?

মানালেই হয়।

মানবে না।

তুমি কী করে জানলে? 

এই তো যুগ যুগ দেখে আসছি। কত দেশে অনেকগুলো করে বিয়ে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে, এখানে হয়েছে! এখানে কি মহীরা সকলের জন্য এক আইন মানবে?


অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত - ২ এসে নিজে নিজেই দাঁড়িয়ে গেল। মহী একটি গোপন উদ্দেশ্য সাধন করে চলেছে। জনসংখ্যায় দেশ দখল।

এহেন দুটি সিদ্ধান্ত যখন পাশাপাশি এসে দাঁড়াল, তখন আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত এ-দিক ও-দিক থেকে সাহস করে সামনে চলে এল। যথা, বড় বড় লোকেরা মহীকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। সবকিছুতে ছাড় দেয়। সাত খুন মাফ করে দেয়। এসব কেন হবে? সব সিদ্ধান্ত একজোট হলে, একটাই আওয়াজ ওঠে- প্রতিকার চাই। সবার আগে চাই মহীকে। 

৪)

সিদ্ধান্তরা যখন মহীকে খুঁজতে বেরোল, তখনও সে বিরস মুখে শোভনার পাশটিতে। শোভনা তার কানে আলতো কামড় দিয়ে বলছে, আমি তো মজা করছিলাম। তুমি এত রেগে গেলে কেন?

মহী উত্তর দেয় না। সে আলগোছে শোভনার এলোচুল স্পর্শ করে। 

তারপর ক্ষীণ স্বরে বলে, লা-ইলাহ ইল্লালাহ। তুমি এর মানে জানো শোভনা?

শোভনা দুদিকে মাথা নাড়ে; জানে না। 

মহী বলে, এর মানে, ঈশ্বর ছাড়া আর-কোনও ঈশ্বর নেই।

তারপর সে একটু হাসে। বলে, জানো কতজনে চায়, ঈশ্বরের অনুগ্রহ পেতে। স্বর্গবাসের সুখ পেতে। কিন্তু আসল কথাটি কী জানো, যে ঈশ্বরকে চায়, সে ঈশ্বরকেই ভালোবাসে, কেবল ঈশ্বরকেই চায়।

শোভনা, এবার একটু থমকে বলে, আজ, তুমি এসব বলছ কেন? আমি কি তোমায় খুব দুঃখ দিয়ে ফেললাম!

একটু আদর করে শোভনাকে কাছে টেনে মহী বলে, লুটের কথা বলছিলে না, শোভনা? তোমাকে আমি লুট করব কী করে? তোমায় আর আমায় কোনও ফারাকই যে নেই।

শোভনার কাছে এই মহী অচেনা। যে-মহী তাকে প্রেমের চিঠি লিখত, যে-মহী তাকে নিয়ে পালিয়েছে, এ যেন সে নয়। সে মহীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক। 

মহী বলে, তোমায়-আমায় তফাৎ নেই। তওহীদ। একাত্মতা। আমরা সবাই এক। এই তো সকল ধর্ম বলে, শোভনা। ‘আমি’র মরণ হলে তবেই তো ‘ফনা’। তখন ঈশ্বর হয়ে বেঁচে ওঠা। ‘ফনা’ হলে তবেই তো ‘বকা’। ভালোবাসা স্বয়ং ঈশ্বর।

ভালোবাসার কাছেই মানুষ এক হয়ে বেঁচে ওঠে। কেউ আলাদা থাকে না। 

একটুক্ষণ থেমে সে বলে, একজনের গল্প শুনবে, শোভনা?

গল্পের গন্ধ পেয়ে নড়েচড়ে বসে শোভনা। বলে, বলো।

মহী বলে, সে-মানুষটাও একজন আজব লোক। বলে বেড়াতেন, আমি যাকে ভালোবাসি, আর সে যাকে ভালোবাসে, দুজনে একই। আমাকে দেখলেই তাকে দেখো। তাঁর কথা অনেকের কানেই নতুন ঠেকে। অদ্বৈতভাবের পথিক তো, একদিন বলেই বসলেন, আমিই সত্য, ‘অনায়ল হক’। সেদিন আগুন জ্বলল অনেকের মগজে। এতবড় স্পর্ধা লোকটার! একে বরদাস্ত করা হবে না। ঠিক করা হল, ক্রুশে বিঁধে ফ্যালা হবে তাঁকে। একজন শিষ্য প্রশ্ন করল, তুমিই যদি সে হবে, তবে তোমার এই দশা কেন? তিনি হাসিমুখে বললেন, এই তো তার প্রেমের রীতি। যার মিলন সে চায়, তাকে এভাবেই তো কাছে টেনে নেয়। ক্রুশে চড়ানোর আগে শুরু হল বেত্রাঘাত। একের পর এক বেত পড়ছে শরীরে, আর তিনি বলে বলে উঠছেন, ‘অঃহদ্‌’। এক। সব একই।

একামেবাদ্বিতীয়াম। সোহং।

শোভনা স্তম্ভিত হয়ে বলে, এমন মানুষকে মেরে ফেলল? কে ইনি? তুমি কি এঁকে চেনো?

মহী একটু হেসে বলল, তাঁকে কে না চেনে! নিজের ভিতরেই তাঁকে দেখতে পাবে।

শোভনা বোঝে না। তার সেই বেবাক অবাক-বনে-যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয় মহীর। বলে, সেই মানুষটি হলেন মনসুর-অল-হল্লাজ। জানো শোভনা, মৃত্যুর আগে হল্লাজ বলে গিয়েছিলেন, ওগো ঈশ্বর, আমার কাছে যা প্রকাশ করেছ, তা এদের কাছেও করলে, এরা এই কাজ করত না। আর, যা এদের কাছে গোপন করেছ, তা আমার কাছেও করলে, আমাকে এভাবে কষ্ট পেতে হত না। আমি তাঁর কথা খুব শুনতে পাই শোভনা। কে যেন, আমাকে সারাক্ষণ বলেন, এক এক, সব এক। এক বই দুই নেই। তাহলে কীসের ফারাক... লা-ইলাহ ইল্লালাহ। ঈশ্বর ছাড়া আর কোনও ঈশ্বর...

তার কথা শেষ না-হতে-হতেই সিদ্ধান্তরা ঘিরে ফ্যালে মহী-শোভনাকে। ওরা সভয়ে প্রশ্ন করে, তোমরা কারা?

সিদ্ধান্তরা উত্তর দেয় না। শোভনার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি ঠিকই চিনেছ বোন। এ লুটেরারই জাত। 

শোভনা এবার বুঝতে পারে, কোথায় কতবড় ভুল হয়ে গিয়েছে। কেন যে মহী লুটের কথা শুনে এত চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল তখন, তা যেন টের পায় সে। কিন্তু ততক্ষণে বড়ো দেরি হয়ে গেছে। শোভনা জানে না, আর-কিছু করা যাবে কি-না। সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে মহীকে।

সিদ্ধান্তরা এবার আসরে নামে। বলপ্রয়োগ করে। প্রবল আকর্ষণে শোভনাকে তারা প্রথমে বিচ্ছিন্ন করে মহীর থেকে। সহজে হয় না সে কাজ। বেশ জোর খাটাতে হয়। বেশ। অবশেষে কাটা গাছের ডালের মতো মহীর থেকে আলাদা হয়ে যায় শোভনা। সিদ্ধান্তদের সমবেত উল্লাসে শোনা যায় না, শোভনা সে-সময় বুক-ফাটা আর্তনাদ করছিল কি-না।

ইতিমধ্যে সিদ্ধান্তদের অনেকগুলি মশাল ঘিরে ফ্যালে মহীকে। 

মহীর চারিদিকে এখন আগুন। তারা লাফাচ্ছে। নাচছে। আস্ফালন করছে। সে-আগুন কতদিনের কে জানে! সে আগুন কবে নিববে তাও জানে না সে। 

উল্লাসধ্বনি এখন দ্বিগুণ। কিছুই প্রায় শোনা যায় না। শুধু শোভনা এই এতকিছুর ভিতর শুনতে পাচ্ছিল, সেই আগুনবৃত্তে বসে মহী একমনে তখনও বলে চলেছে, অঃহদ্‌। একামেবাদ্বিতীয়াম। সোহং। সব একই। এক বই দুই নেই।

~~


( শোভনা ও মহীউদ্দিনের গল্প এককালে খুব প্রচলিত ছিল। ‘মহী বা শোভনার প্রেমপত্র’ নামে একটি পাতলা বই খুব বিক্রি হয়। সংখ্যাগুরুর মনে সংখ্যালঘুর ধারণা তৈরিতে এই গল্পের বেশ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। তথ্য বলতে এটুকুই। বাকিটা গল্পের ধর্মে গল্পই।)