শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চন্দন চক্রবর্তী।। পারক গল্পপত্র



পেঁয়াজের মস্তগুন হলগে হাসি, বাসি, কাশি মানে যেকোনো মুহুর্তে যেকোনো সময় মেঘের জলের বন্যা বইয়ে দেয়। সেই কারণে কিনা জানিনা আমার গিন্নি সুতপার পেয়াজ বড় প্রিয়। ভালো কথা। তাহলে এই মন্দার বাজারে যেখানে পেঁয়াজের আকাল।


সকালেই বাজারের ব্যাগ হাতে ধরিয়ে ফর্দের ফিরিস্তি দিয়ে বলল, এক কেজি পেঁয়াজ মাস্ট। আর নতুন আলু। এবং তা ফিনফিনে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ঝুলিয়ে আনবে। আর বাকী সব বাজার ব্যাগের মধ্যে। আমি তো হা হয়ে গেলাম।  

মিত্তির, মন্ডল, চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, গিন্নিরা দু'শ গ্রামের বেশি পেঁয়াজ কেনে না। ওদের আমি দেখাতে চাই 'হাম কিসিসে কম নেহি' বলে কিনা মারুতি অলটো গাড়ি নাকি গাড়িই নয়। ঠ্যালা গাড়ির সমান৷ বুঝলাম সুতপার পেঁয়াজ রহস্যের কথা। ভেবেছিলাম সেই বিয়ের পর কথায় কথায় কেঁদে চোখের জল বার করে ফেলতো। এখন চল্লিশ বছর কাটাবার পর আমার চোখের জল বার করে ছাড়ছে। পোষাচ্ছে না তাই পেঁয়াজ এনে নিজের চোখের জল বার করতে চাই। কিন্তু যা বুঝলাম, উনি এখন আমাকে ছেড়ে মণ্ডল, চ্যাটার্জীদের ধরেছেন।


বললাম, হ্যাগো সবই কচি কচি খাও।মানে কচি পাঠা, কচি ঢেঁড়শ এর মতো কচি পেঁয়াজ কলি আনবো। ব্যাস সাদা সাদা ফুলের কুঁড়ি বার করা। ওটা পেঁয়াজের কাজও করবে। 


এবারে প্রায় তেড়ে এলো। চেষ্টায় ছিলাম যতটা বাজেট কমানো যায়। বাজারে আলুর দামও চড়া। নতুন আলুর দেখা বিশেষ নেই। তার দাম আকাশ ছোয়া চল্লিশ টাকা কেজি। পেয়াঁজ তো পেঁয়াজি করে চলেছে একশ ষাট ছাড়িয়েছে।

এবারে একটু নরম গলায় বলল, শোনো সোনা তুমি বরং কম দামি কচি পোনা মাছ ব্যাগের ভেতর রেখে দেবে। কেউ দেখবে না। যে পয়সা বাঁচবে সেই পয়সায় আলু পেঁয়াজে ঢুকিয়ে দেবে।


বিষন্ন মুখে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারে গেলাম। ভাবলাম, ঝকমারি হয়েছে এই খোল্লাই আবাসনে ফ্ল্যাট কিনে। যাইহোক শেষের বুদ্ধিটি মন্দ নয়। মহার্ঘ বস্তু পেঁয়াজ। আলু কিনতে কম দামি মাছে ঝুকে পড়। ব্যালেন্স হয়ে যাবে। ওফ্ কেয়া বুদ্ধি। বুদ্ধি হো তো অ্যায়সা।শালা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর বা অর্থমন্ত্রী হতে পারতো!

  বাজারের সামনে দেখি বিশাল লাইন।বাজারের ব্যাগ নিয়ে এক ভদ্রলোক হনহনিয়ে হাঁটছিলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, 'মশাই ওটা কীসের লাইন'? আজকাল লোকগুলো সব সময় কেন যে হনুমানের মতো মুখ খিঁচিয়ে থাকে কে জানে? দাঁত মুখ খিঁচিয়ে উত্তর দিলেন, 'সরকারী গাড়ি এসেছে কম পয়সায় পেঁয়াজ, আলু দিচ্ছে। দেখতে পাচ্ছেন না? ‘হালকা হাসি বেরিয়ে এলো। সে জন্য এতো বড় লাইন! বাব্বা’?


আপনি কী ভাবলেন, সিনেমার টিকিট নাকি মদের দোকানে যাচ্ছি।

একটা সিগারেট ধরিয়ে দেখলাম, ময়াল সাপের মতো লাইনটা এঁকে বেঁকে বেড়েই চলেছে। হঠাৎ একটু  নস্টালজিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়লাম। মেট্রো সিনেমার বাইরে খাঁচার মধ্যে পঁয়ত্রিশ পয়সার লাইন দিতাম। কিম্বা মোহন বাগান, ইস্ট বেঙ্গল ম্যাচ দেখার জন্য লাইন দিতাম। বেশ ছিল দিনগুলো। শেষ টান মেরে সিগারেট টুকরোটা ফেলে দিলাম। একটা লোকের পায়ের তলায় পড়ে চিপসে গেল। 

আর যাইহোক দামি আবাসনের লোকেরা কেউ পেঁয়াজ কিনতে এই লাইনে দাঁড়াবে না। সব্বারই সম্মান হানির ভয় আছে। সুতরাং এদিকে  কেউ পা  মাড়াবে না।কিন্তু লাইনে দাঁড়াতে গেলে তো অবধারিত অফিসের দেরি। এমনিতেই মাঝের হাট ব্রীজ ভেঙে অফিসযাত্রী দের মাজা ভেঙে দিয়েছে।


ঘড়ি দেখলাম মাত্র সাতটা। দেরি হলেও বড়জোর একঘন্টা। বড় সাহেব লোকটি ভালো কিন্তু তার চামচা মাইতিবাবুর মাতব্বরী চোখটা এড়িয়ে গেলেই হলো। ও ঠিক ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। বল্লেই হবে রাস্তা অবরোধ টোধ হচ্ছিল। আজকাল ‘অবরোধ’ কথাটি সব কিছুই রোধ করে দেয়। যেকোন ব্যাপারে দেরি হলেই চাপিয়ে দাও রাস্তা অবরোধের ঘাড়ে’।


আমার গিন্নির চেহারাটা মোটামুটি মোটা কিন্তু আমি ছিপছিপে ছিপের মতো। রঙটাও ছাই ছাই। সুতরাং দুটি মোটামোটা লোকের মাঝে বডি গলিয়ে দিলেই হবে কেল্লাফতে। কেউ তেমন দেখতে পাবে না।

যাইহোক তক্কে তক্কে ছিলাম। দুজন লম্বা মোটাসোটা লোকের মাঝে সিঁধেল চোরের মতো সেঁধিয়ে গেলাম। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই বুঝে গেলাম যে আমার কোন আশা নেই। যতই পেঁয়াজি করে নিজেকে বাঁচিয়ে লাইনে ঢুকি না কেন আমার খেল খতম।


ব্যাপারটা তাহলে বলেই ফেলি,‘প্রত্যকের হাতে একটি করে কাউন্সিলারের সই এবং স্ট্যাম্প মারা চোতা।ওটি থাকলেই রেশনের দামে পেঁয়াজ আলু বা অন্যান্য সব্জি কম দামে পাবে।


পেছনের মোটা লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদা কাউন্সিলারের চিঠি কেন’? মানে অন্যান্য আইডেন্টিটি কার্ড দেখালে হবে না’? ভদ্রলোক কট কট করে দেখে বললেন, ‘বুঝলেন না আমরা ওনার দলে কতজন লোক আছে তার একটা আন্দাজ পাওয়া বা লোক দ্যাখানো ‘আমরা তোমাদের’। বোঝা গেল’?

লাইন ছাড়তে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা আপনি কাদের’? 

ধুর মশাই! আপনাকে বলতে যাবো কেন’?

পেঁয়াজের পেঁয়াজি কবে যে মিটবে বোঝা যাচ্ছে না। যেখানে কলকাতা বাজারে ৫০/৬০ টি গাড়ি ঢুকত এখন সেখানে দু-চারটে! লোকে মাংসও নাকি হলুদ লঙ্কা দিয়ে খাচ্ছে। আদাও নাকি ‘আদানি’ হয়ে গেছে!


লোকাল পৌরপিতার কাছে যে যাবো তারও উপায় নেই। শালা, নামিদামি আবাসনের রাজনীতির জন্য তাও বন্ধ। আগে তবুও পুজোতে স্থানীয় পৌরপিতা মানুষটিকে সম্মান দিয়ে উদ্বোধনে নিয়ে আসতেন। এখন পরিচালন সমিতিতে মাউড়ারা ঢুকেছেন। তারা এসবে যাবে না। সোজা রাজ্যপালকে দিয়ে উদ্বোধন করিয়েছে শেষবার। বোঝ ঠ্যালা!

আরে শালা সঙ্গে লেজুড়ের মতো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে ডাক তা নয়। তিনি তো খচে বোম। আমাদের আবাসনের নাম শুনলেই তার চিত্তির চটকে যায়।‘যাইহোক, মাঝখান থেকে কিছুটা দেরি হয়ে গেল।


বাঙালিদের সবটাতেই পেঁয়াজি মারা অভ্যেস! দরকারটা কী আলু পেঁয়াজের দোকানে গিয়ে ভিড় করার। সবার গিন্নি কি আমার গিন্নির মতো! যে কটা আলু পেঁয়াজের দোকান আছে সবকটাতেই বেশ ভিড়। সরু হওয়ার একটা সুবিধেও আছে। সহজেই মারাদোনার মতো দু-চারটে ডজ করে সোজা সামনে। সব্বাই নচে, নচেদা, নচেবাবু বলে ডাকাডাকি করছে। তিনি আজ সম্রাটের মতো পেঁয়াজের বস্তার ওপর বসে। যেন এই পেঁয়াজই তাকে সম্রাট বানিয়েছে। দু’টি লোক ওজন করে চলেছে। উনি টাকা গুনে চলেছেন ১৬০ টাকা কেজি!

গদ গদ হেসে বলতে থাকে, আর বলবেন না বাজারে এখন পেঁয়াজ চুরি হচ্ছে। রাতে আবার ভর্ত্তি বস্তা নিয়ে হাওয়া। এখন আমরা বাজার কমিটির সেক্রেটারিকে বলে দুজন স্পেশাল গার্ড বসিয়েছি। বুঝতে পারছেন বাজারের হাল। ‘পেঁয়াজ চুরি’। ব্যাঙ্ক লুট, গয়না চুরি এসব শুনেছি কিন্তু ‘পেঁয়াজ চুরি’ কখনও শুনিনি। এতো ‘বউচুরি’র থেকেও সাংঘাতিক, পেঁয়াজ হচ্ছেগে রান্নার প্রাণভোমরা। খাদ্যরসিক বাঙালিদের রান্নাঘর বড় প্রিয়। সেই জায়গা থেকে প্রাণভোমরা – চুরি।

কে একজন বললেন, হবে নাই বা কেন! মোস্ট প্রেস্টিজিয়াস প্রোডাক্ট বলে কথা’। বৌ-চুরি গেলে বউ পাওয়া যায় কিন্তু পেঁয়াজ কভি নেহি।


‘যা বলেছেন, বাড়িতেও আত্মীয় স্বজন থেকে অনেকে এসে হাজির হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আবদার রাখতে হচ্ছে’। পেঁয়াজ বস্তায় বসা নচেদা উত্তর দিলেন।

‘দাদা আপনার বাড়িটা কোথায় বলুন না’?

‘আপনার ফোন নাম্বারটা বলুন না নচেদা’।

‘না না ওসবও বন্ধ করে দিয়েছি। এখন সব ‘পেঁয়াজওয়ালা’ বলতে শুরু করেছে। গিন্নির সম্মানে লাগে মশাই’।


এক কেজি পেঁয়াজ একশ ষাট টাকায় কিনে বাজার করে বাড়ি ফিরলাম। সুতপা দরজা খুলে বললো, হ্যাঁগো পেঁয়াজ আলু বেশ ইলিশমাছের মতো ঝুলিয়ে এনেছো তো!

‘হুম, এনেছি মণ্ডল গিন্নি আবার জিজ্ঞেসো করলো, ‘দাদা পেঁয়াজ কত করে নিলো’? 

আমি গুল মেরে বলে দিয়েছি স্পেশাল বড় পেঁয়াজ তো একশ আশি করে কিনেছি’!

ভদ্রমহিলা মুখ ভেটকে চলে গেল।

‘কিন্তু কই তোমার হাতে তো নেই’!গিন্নির ভুরুতে চির ধরেছে তখন।

‘পুরো ঢপ মেরে বললাম, হাতেই ছিল। জুতো খোলার সময় ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছি’।

‘আসলে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, অন্যান্য বাজারের মতো ওগুলো ব্যাগেই ঢুকিয়ে রেখেছি’।

বললাম, গরম চা দাও এক কাপ! অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। স্নানে যেতে হবে।


(২)

কিন্তু এতো বড়ো যে কেলেঙ্কারিয়াস ঘটনা ঘটে গেছে বুঝতে পারি নি। সুতপার চিৎকার চব্বকার! এবং যা অনেকদিন দেখিনি তা দেখলাম।


পেঁয়াজ ছাড়া চোখের জল! ভ্যাক করে কেঁদে বলে, ‘তুমি, এভাবে চিট করলে আমার সঙ্গে? পারলে এটা করতে! তারমানে তুমি পেঁয়াজ ঝুলিয়ে আনো নি?

ভ্যাবলাকান্ত হয়ে বললাম, তা আনি নি ঠিক কথা। কিন্তু পেঁয়াজ তো এনেছি। হাতে পেঁয়াজ ঝোলাতে ভুলে গিয়েছিলাম’।

‘কোথায় পেঁয়াজ? ব্যাগে পেঁয়াজ নেই? তুমি আমাকে ঠকালে’?

‘বিশ্বাস করো ঠকাই নি মোন্টাসোনা! গুনে একশ ষাট টাকা দিয়ে এক কেজি কিনে ছিলাম! এখন মনে হচ্ছে মালটা ফেলে এসেছি। আসলে বয়স বাড়ছে ভুলে যাওয়া রোগে ধরেছে।

‘এখন কী হবে’?

‘কী আর করা যাবে? অফিসে গিয়ে হাফ ছুটি নিয়ে পেঁয়াজের সন্ধানে নচের দোকানে যাবো’।

‘তুমি বরং অফিস যাও। আমি বাজারে গিয়ে নচের দোকান খুঁজে নিয়ে পেঁয়াজ নিয়ে চলে আসবো। বেশ, ঝুলিয়ে ইলিশ মাছের মতো’।

‘একদম যাবে না। পেঁয়াজ এখন মহার্ঘ বস্তু। অচেনা মনে হলে একদম দেবে না। মাঝখান থেকে অপমানিত হবে। আমি ঠিক চলে যাবো’।


(৩)

এবারে দেখা যাক সেই পেঁয়াজের হাল কী হলো? কোথায় গেল? এলাকার বাইরেই দাস পাড়ার ছকু ছিঁচকে থাকে। গতকাল সন্ধেতে বেশ একটা বড় মোবাইল ফোন ঝেড়েছে। বিক্রি করে হাজার দুয়েক টাকাও এসেছে। দিন আনে দিন খায় সে। দুই ছেলে, বৌ নিয়ে সংসার। মোটা চালের ভাত আর কলমি শাক ভাজা খেতে খেতে পেট হেজে গেছে। ক’দিন আগে মাছ বাজারে একজনের কেনা ভেটকি মাছ নিয়ে সটকে গিয়েছিল। সেটা বেশ আরাম করে খেয়েছিল। তারপরে আবার ডাল ভাত বা কলমি শাক! নেহাত বউটা তিনবাড়িতে কাজ করে তাই চলে যায়। বৌ বোঝায়। ‘হ্যাঁগো, এসব লাইন ছেড়ে  দাও। ছেলেরা বড় হচ্ছে। সবাই পেছনে বলে ওই দ্যাখ, ছকু ছিঁচকের বৌ! কেমন লাএ বলো’! শোনে না। বলে, বাপ ঠাকুদ্দার জাত ব্যবসা ছাড়বুনি’। তা সেই ছকু ছিঁচকের খুব ইচ্ছে হয়েছে খাসি মাংস খাবে। সঙ্গে সন্ধে বেলায় একটু টান্টু! কিন্তু বাজারে খাসি মাংস, পিঁয়াজের দাম চড়তে চড়তে যে চড়কগাছে উঠে আছে, কে জানতো। ও কলমি শাকের দাম জানে। সেটাও বেড়েছে এক আঁটি দশটাকা! তবুও চলে যায়।


প্রথমত ওর সমস্যা লাইনে সরকারী পেঁয়াজ কেনা অসম্ভব। কারণ আর কিছু না ও কে একজন ছিঁচকে সবাই জানে। কাউন্সিলার বাবু-আবার বেশি করে চেনেন। সব চোর, ছিঁচকেদের উনি বেশিই চেনেন। অতএব কোনও চিঠি পাবার আশা নেই। আইজুলের খাসি মাংসও ছ’শ টাকা কেজি। শেষ খেয়েছিলো চারশ টাকায়। যাইহোক, মন যখন চেয়েছে খেতে হবেই। দু’হাজার টাকা তো কম নয়।

কথায় বলে ঢেঁকি সগগে গেলেও ধান ভাঙে। কথাটা ফলে গেল। সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেল। নচের পেঁয়াজের দোকানে বেশ ভিড়। টঙে বসা নচে খদ্দেরকে দু’হাজার টাকার নোট ভাঙিয়ে ফেরত দিচ্ছিল। ছকু দেখলো একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে পেঁয়াজ, অরক্ষিত। আর যায় কোথায়? শ্যামবাজারের শশীবাবুর মতো প্যাকেটটি নিয়ে সুড়ুত করে সটকে পড়লো। ওফ একটা বিশাল খচ্চা বাজলো’।প্রাণভোমরা পেঁয়াজ এখন ওর মুঠিতে।


যা পেঁয়াজ আছে তা মাংস হয়েও ঘরে থাকবে’।

যদি কেউ দেখে ফেলে বা ধাওয়া করে। আইজুলের দোকানে গিয়ে বলল। আইজুল দা একটা কালো প্লাস্টিকের প্যাকেট দাও না? এই পেঁয়াজটা ঢুকিয়ে রাখবো? ড্যাব ড্যাব চোখ বার করে আইজুল দেখলো মাগি গণ্ডার বাজারে এতোটা পেঁয়াজ! চেহারা দেখলে তো মনে হচ্ছে না । এ লোকটা অতো পেঁয়াজ কিনতে পারে’? শালা, ছিঁচকের মতো দেখতে। চুরির মাল নাকি!

আর বোলু নি। বাবু কিনতে দেইলো। রাস্তায় লোকে লোভ দেচ্ছে তাই কালও প্যাকেটে ঢেকে রাখা ... হ্যা হ্যা’

আইজুল ভাবে, ‘তাই বলো’!

অনেকটা চোরের ওপর বাটপারি হয়ে গেল। টুকটাক বাজার করে মাংস নিয়ে ফিরে গেল। মাংসর দোকানে রেখে আসা পিঁয়াজের প্যাকেটটি ফেলে চলে গেল। আসলে মাংস কেনার আনন্দে বেচারা ভুলেই গেল।তার প্রাণভোমরা মুঠ্যির বাইরে!


এদিকে আইজুলের বাড়িতে মাংস খাওয়া হয় না। পেঁয়াজের অভাবে। আজকাল বিবি যতবার বলে মাংস দাও রাঁধবো। অমনি আইজুল উত্তর দেয়। ‘অতদাম দিয়ে পেঁয়াজ কেনা সম্ভব নয়। ওসব এখন বড়লোকরা খায়! দাম কমলে মাংস হবে। ব্যবসা তো করো না। ব্যাপারটা বোঝানো যাবে না। বিবি মুখ ভ্যাটকায়। ‘বুঝে কাজ নেই’। ছেলেপুলেদের কথা ভেবেই বলি’।


যাইহোক, আইজুল তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে সোজা বাড়ি। পেঁয়াজ, আদা রসুন সঙ্গে খাসির মাংস সব দিয়ে বলল, ‘কষিয়ে রাঁধতও। বহুদিন মাংস খাই নি’।


(৪)

অফিসে ঢুকতে বেশ দেরি হলো। পাশের ডেক্সে মাইতি বাবুর সেই মাতব্বরি চাউনি। ‘বড়বাবু ডেকেছেন আগে যাও’।

মাঝবয়সী ভদ্রলোক মিঃ রনজিৎ রায়। রয় ক্রিয়শনের মালিক। থাকেন সল্টলেকের বাংলো বাড়িতে গম্ভীরসে বললেন, বোসো! বলি এতো দেরি হলো কেন? ভাঙা ব্রীজের দোহাই দিয়ে কতদিন চলবে’?

‘আজ্ঞে, স্যার ব্রীজ নয়। আমতা আমতে করে বলে ফেলল, পেঁয়াজ কান্ডতে জড়িয়ে পড়েছি’।

‘পেঁয়াজ! এতো এখন প্রিসিয়াস প্রোডাক্ট! আমার মিসেস বললো, ‘হাতে এক প্যাকেট পেঁয়াজ কিনে ঢুকলে নাকি সামাজিক সম্মান বেড়ে যায়। সেই পেঁয়াজ’?

সব বিস্তারিত শোনার পর উনি বললেন, ‘তোমাকে একটা শর্তেই ছাড় দিতে পারি’?

‘যে কোনও শর্তে রাজি! নচের দোকানের পেঁয়াজ নিয়ে ঘরে ঢুকতেই হবে। একটু তাড়াতাড়ি ছাড়তে হবে’।

‘কালই আমার জন্যে এক কেজি পেঁয়াজ নিয়ে আসবে। আসলে দামটা বড় কথা নয়। ওই যে বললাম খুব দামি বস্তু! মিসেসের ইচ্ছে মোবাইলে ছবি তুলে পোস্ট করা! বুঝলে কিছু’?

‘অবশ্যই পারবো স্যার ! তাহলে আজ টিফিন টাইমে যাবো স্যার’?

‘ওকে, বেস্ট ওফ লাক’।

আর বেস্ট অফ লাক। হন্তদন্ত হয়ে ঘেমে নেয়ে যখন নচের দোকানে পৌঁছোলাম তখন ভর দুপুর । দোকান ঝাঁপ বন্ধের মুখে। 

‘নচেদা আমার এক কেজি পেঁয়াজের দাম দিয়েছিলাম কিন্তু প্যাকেটটা ফেলে গেছি’!

‘পেঁয়াজ এখানে? চাদ্দিকটা দেখে বলল, কই না তো! আপনি অন্য কোথাও ফেলেছেন’।

প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, বিশ্বাস করুন, ঠিক ওইখানে রেখেছিলাম’।

‘দেখুন আমার মিথ্যে বলে লাভ’? আজকাল পাবলিকও চোর হয়ে গেছে মশাই। দেখুন, সুযোগ বুঝে কেউ নিয়ে চম্পট দিয়েছে। ওই যে বলেছিলাম খুব দামি বস্তু। থমথমে মুখে বললাম, কী আর করবো। আমাকে এক প্যাকেটে আটশ আর আর একটা পাকেটে এক কেজি দিয়ে দিন’।

‘সে কি আটশ কেন’? ওটাও এক কেজি দিই’?

‘উঁহু সকালে এক কেজি ছিলো এখন সেটা দু’শ কমিয়ে দাও। 

পেঁয়াজ ওজন করতে করতে নচে প্রশ্ন করে ‘আচ্ছা দাদা এই বাজারে আপনি আরও এক কেজি পেঁয়াজ কিনছেন? দু’দিন পরে দাম কমে যাবে তখন না হয় কিনতেন! মৃদু হেসে বললাম, ‘তখন কিনে লাভ হবে না। এটা আমার অফিসের মালিকের জন্য….. এক রকমের ‘ঘুষ’ বলতে পারো। দাম তো আর নিতে পারব না।... শোনো একটা চরম সত্য তোমাকে বলে যাই, সব সময় মধ্যবিত্তদেরই পেছন মারা যায়। শাল্লা’! 

দু’প্যাকেট পেঁয়াজ নিয়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেলাম।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন