শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী।। পারক গল্পপত্র



গঙ্গা এখানে স্রোতস্বিনী। জলের চাপ এতটাই যে পাড়ের শাসানিতে তার মধ্যখান ফুলে-ফুলে উঠেছে। দিগন্ত বিস্তৃত এই নদীকে রোজই দেখে রঞ্জন। আর যেন সে রোজই গঙ্গাকে নতুন করে আবিস্কার করে। ঘাটে নেমে নিচু হয়ে এক আঁচলা জল তুলে মাথায় ছিটিয়ে এক বুক মানসিক তৃপ্তি পায় সে। এরপর ফেরা। পায়ে-পায়ে লাল পাথরের ঘাট মাড়িয়ে উপরে ওঠা। একেবারে উপরের ধাপে উঠে পিছন ফিরে একবার তাকায় রঞ্জন। হ্যাঁ, মেয়েটি জলও ছেড়ে উঠে যাচ্ছে। ঘাটে তার পায়ের ছাপ। নদীকে ছেড়ে যেতে তারও কিছু কষ্ট হচ্ছে বইকি! 

শুধুই কি নদীর অলস প্রবাহ, তার বুকে জেলেদের নৌকার ভেসে যাওয়া বা কখনও স্থির চিত্র দেখে সে?  না। জেলেনৌকা  জাল ফেলে চুপ করে বসে থাকে না। তারা রান্নাখাওয়া করে নৌকার ভেতরেই। তার পর হালকা করে একটা ঘুম দেয় নৌকার দুলুনি আর নদীর ফুরফুরে বাতাসের আরামে। জলের গন্ধ পেতে পেতে সে ঘুমিয়ে পরে আর মাছেরা আটকে যেতে থাকে জালে। 

ঘাটের একদম উপরে দাঁড়িয়ে পিছন ঘুরে সে নদীকে প্রণাম করল। লোকটা আজও আসেনি। মেয়েটি বটগাছের নিচ দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু তার নাম কি, কোথায় থাকে—এসবের কিছুই জানে না সে। সে মনে মনে পছন্দ করে। আর ভাবে, গঙ্গাতীরের এই মেয়েটিকে যদি ঘরণী করতে পারত।

ছয়মাস হয়েছে তার চাকরির। ফেরার পথে গঙ্গার ধারে বসা চাই তার। নিত্য। 

সেই থেকে দেখে আসছে, নদীর ধারে আসতে লোকটার কামাই বা ক্লান্তি নেই একবারও। তেমনি ক্লান্তি নেই গুনগুন সুর করে রামায়ণ পাঠে। লোকটা কী দুম করে মরে গেল নাকি? নাকি অসুস্থ হয়ে পড়ল? 

এই বটের নিচে বসতেই লোকটা পছন্দ করতো বেশি। যদি কোন কারণে এই জায়গাটা ফাঁকা থাকল না, সে চলে যেন ওদিকের শিব মন্দিরের এক কোনায় যেখানে জাম-আম-লিচু গাছ আছে, সেখানে। ওদিকে সাধারণত কেউ বসতে যায় না। যারা বাইরে থেকে গাঁজা খেতে আসে তারা ওই জায়গাটা পছন্দ করে। কেননা সেখানটা রাস্তা থেকে চট করে চোখে পড়ে না। 

আপনমনে পাঠ করে যেত লোকটা। বসার ও ওঠার আগে নদী ও ভূমিকে সে প্রণাম করত। 

তার ঘর চেনে না রঞ্জন। তবে তার পাড়াটা জানে। সেটা একটি বস্তি। সবাই বিহারি বা দেহাতি আর ভোজপুরি মানুষজন। এক সময় এরা এসেছিল চটকলে কাজ করার জন্য। এখন সব চটকল প্রায় বন্ধের মুখে। ওরা সবাই অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। অদূরে একটা সস্তা সিনেমা হল আছে, সেখানে কেবল ভোজপুরি সিনেমা চলে। 

রঞ্জন কোনদিন রামায়ণ পড়েনি। না গদ্যে না পদ্যে। তবে সে রামায়ণ দেখছে সিরিয়াল হিসেবে। কিন্তু এই লোকটা যে রামায়ণ পড়ে তা যেন রঞ্জনের কাছে অজানা। 

রঞ্জন পরে বুঝেছে, রামায়ণের কাহিনি কে না-জানে। সেটা আরও মধুর হয়ে ওঠে লোকটার পড়ার গুনে। যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সব। ওই দূরে  সীতার কুটির। তিনি এই ঘাট বেয়ে উঠে আসছেন। হাঁটু অবদি জলে ভেজা পা। হাতের কনুই অবদি সিক্ত। কপালের উপর আলগোছে যে চুল পড়ে আছে, সেখানে বিন্দুবিন্দু নদীজল।

যেন সেই মেয়েটি উঠে আসছে ঘাট থেকে।

বড় রাস্তায় ওঠার আগে এই গলি রাস্তার মুখে একটা চা দোকান আছে। আসলে সেটা কোন দোকান নয়। একটা সরকারি লম্বা পাচিল, তার দেওয়াল চট ঘিরে অস্থায়ী চা দোকান। কয়লার উনুন। বয়ামে সাজানো বিস্কুট। দোকান বন্ধ হলে বয়াম ব্যাগে ভরে ঘরে নিয়ে চলে যায়। 

দোকানদার উড়িয়া বউ। সে আর তার ছেলে চালায় দোকান। ওরা লোকটাকে চিনতে পারল না। বলল, গঙ্গার ধারে বসে রামায়ণ, গুরুর বচন বা হনুমান চালিশা পড়ে—আলাদা করে চিনিই বা কাকে। দেখলে হয়ত মনে পড়বে।

রঞ্জন বলল, ও থাকে সামনের বস্তিতে। মাঝবয়েসী লোক। লম্বা, রোগা, কালো।  

ওরা মাথা নাড়ল। 

বলল একটা বছর দেশেকের ছেলে। দোকানের সামনে সে দুই একজনের সঙ্গে লাট্টিম খেলছিল। 

বলল, ওই লোকটা,যাদের বাড়ির সামনে পেয়ারাগাছ আছে?

বাড়ি চিনিস?

হ্যাঁ।

খালি গা, হাফ প্যান্ট। ছেলেটা এগোতে লাগল। তার পিছনে রঞ্জন। ঘড়ি দেখল। বেলা তিনটে। আজ শনিবার। তার ছুটি হয়েছে দুটোয়। বাড়ি ফিরতে অসুবিধে হবে না। খুব দেরি হলেও অন্যদিনের মত সাড়ে পাঁচটার তারকেশ্বর লোকাল সে পেয়ে যাবে।              

রাস্তা পেরিয়ে নিচু জায়গা, ঘরের টালির চালে মাথা যাতে না কেটে যায়, নিচু হয়ে সে যেখানে দাঁড়াল, সেখানে পেয়ারাগাছ আর তার সামনেই খাটিয়া পেতে চুপ করে বসে আছে সে। 

ছেলেটা চলে গেল। 

রঞ্জনকে দেখে লোকটা যেমন অবাক হল, রঞ্জনও হল। এইভাবে আচমকা এসে পড়ায়। সে বলল, অনেকদিন রামায়ণ শুনি না আপনার গলায়, তাই দেখতে এলাম। শরীর ঠিক আছে আপনার?ু

বলেই তার খেয়াল হল, হাতে করে কিছু আনা হয়নি। মনে মনে একটু আফশোস করল সে। কিছু ফল আনা উচিত ছিল। যাক, কী আর করা যাবে। পরে একদিন এসে না হয় দেওয়া যাবে।  

লোকটা আবার বলল, বসুনবাবু। এত করে কয়দিন রামজীকে ডেকেছি যে, তিনিই আপনাকে পাঠিয়ে দিলেন। 

বসল রঞ্জন। পেছনে একটা ঘর দেখা যাচ্ছে। আহামরি কিছু নয়। সেই টালির চালের ঘর আর পাঁচ ইঞ্চির দেওয়াল। প্ল্যাসটারহীন দেওয়ালের গায়ে নীল রঙ। তার সামনে বসে একটি দেহাতী বউ হামানদিস্তাতে মশলা কুটছে। সে দু’-একবার তাকাল। 

আপনি ঠিক আছেন?

তা আছি বাবু। আপনি কেমন আছেন?

ভালো। আমি এলাম আপনার রামায়ণ শুনতে। 

লোকটা চুপ করে রইল। 

রঞ্জন বলল, কী হল, শোনাবে না?  

এবার আস্তে আস্তে লোকটা বলল, আমার মন ভালো নেই বাবু।

, ঠিক আছে। আজ আমি আসি। 

বাবু, যাবেন না। 

ততক্ষণে উঠে পড়েছে রঞ্জন। লোকটার গলার স্বরে এমন একটা কাতরতা ছিল, যা তার পা বেঁধে দিল। 

লোকটা বল, আপনি এসেছেন, রামজির কৃপা! বসুন বাবু। 

আজ না হয় থাক। পরে একদিন আসব। তার আগে আপনি ঘাটে আসুন। ওখানে বসেই শুনতে বেশি ভালো লাগে। 

ঘরের ভেতর যাবার ইচ্ছে ছিল না রঞ্জনের। 

কিন্তু লোকটা এমনভাবে বলতে লাগল, হাত জোড় করে; তাতে রঞ্জন যেমন একটু বিস্মিত হল। 

ঘরটার মধ্যে বিশেষত্ব কিছু নেই। সাধারণ ঘর, অন্ধকার। কিন্তু রঞ্জনের সেখানে অবাক হবার ছিল। বিছানার এককোণে পিছন করে বসে ছিল একটি মেয়ে। তার পিঠময় এলোমেলো চুল। সম্ভবত সে কাঁদছে। একটা পারিপারিক বিবাদের ফলে লোকটার মন ভাল নেই কদিন ধরে—তার মধ্যে ঢুকে পড়ে সে কী ঠিক করল?

লোকটা বলল, ওই আমার মেয়ে, জাহ্নবী। দুই মাস হল ষোলোতে পা দিয়েছে। ওকে আপুনি বিয়ে করবেন, বাবু? ?

হতবাক রঞ্জন অবাক হতে ভুলে গেছে। আশ্চর্য কথা বলে তো লোকটা! সে যেন অবাক হতে ভুলে গেছে আর মেয়েটাও আরও ঝুঁকে পড়েছে ভূমির প্রতি। 

লোকটা মেয়েকে ধরে তার দিকে ফেরাতে চাইছে। অনেক জোরাজুড়িতে যখন সে সফল হল, সেই জলেভেজা মুখ দেখে রঞ্জন অবাক। আরে! এই মেয়েটিকে দেখার আশায় সে রোজ ঘাটে বসে থাকত! 

চেনা নেই জানা নেই, এমন এক নারীরত্ন তাকে উপহার দিতে চলেছে লোকটা, রঞ্জন বিস্মিত হল। ভালোও লাগল।  

নদী থেকে উঠে মেয়েটি কিন্তু তার দিকে কখনও দেখে না। নিজের কাজটুকু গুছিয়েই চলে যেত। রঞ্জনের মনে হোত নদীটি যেন এই মেয়েটির জন্যই বয়ে যাচ্ছে। আবার কখনও ভাবত, মেয়েটির ঘরের পাশেই আছে সীতার কুটির। মেয়েটি সীতার জন্য জল নিতে আসে। ফিরে গিয়ে দু’জনে মিলে গল্প করবে আর তুলসীগাছ বসাবে নদীর ধারে ধারে।

এইভাবে রঞ্জন নিজের অজান্তেই মেয়েটির একটার পর একটা ছবি এঁকে যায় রোজ। আশ্চর্য সাদা মেয়েটির হাতদুটি। অসম্ভব সুন্দর ওর দুটি পা। কোমনীয় চুল, জুলপি। 

সে এ-কথা সে অস্বীকার করতে পারে না, নদীর বুকে দ্বীপ জেগে ওঠার মত ওই মেয়টি তার বুকে একখন্ড ভালবাসার দ্বীপের জন্ম দিয়েছে। 

লোকটা বলল, আমরা গরীব। আপনাদের সঙ্গে মেলেও না। তবু আপনি যখন আমার এই মাইয়াকে ভালোবাসেন, যদি ওকে গ্রহণ করেন, আমাদের ভাল লাগবে।

রঞ্জন দমবন্ধ করে অপেক্ষা করছে। 

লোকটা বলল, আমার মেয়ের পেটে জমজ বাচ্চা আছে বাবু। ডাক্তার বলেছে, নষ্ট করে দিতে। দুটি প্রাণ এইভাবে শেষ হয়ে যাবে বাবু? এখন আপনি যদি ওকে বিয়ে করে নেন, ওরা বেঁচে যায়।   

রামায়ণ পাঠে পুণ্যলাভ হয়। প্রতিদিন গঙ্গাস্নান বা গঙ্গাদর্শনও পুণ্য। সব কয়টিই খুব সহজেই হয়ে যাচ্ছিল রঞ্জনের জীবনে। 

যখন সে শুনত সেই সীতার বনবাসের কাহিনি, মনে হত; দীর্ঘ বনবাসের কোনো এক সময় রামসীতা এখানে কুটির বানিয়ে কয়েকটি মাস কাটিয়ে গেছেন। রাম যখন বনে বনে ফল পাড়তে যেতেন, সীতা তখন গঙ্গার পাড়ে নানা গাছপালা লাগাতেন। তাঁকে সেই চারা এনে দিত এই লোকটা আর তার মেয়ে সেইসব চারাগাছে জল দিত। আর তাই নদীর পাড়ে এত গাছ, এত ছায়া, এত মায়া। এখনও সেখানে রামযুগ বয়ে চলে।

এমনই ছিল লোকটির পাঠের মায়াজাল।  

মেয়েটা মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। ওদিকে কাঁদছে লোকটার বউ। সে দেহাতি হিন্দিতে কী সব বলে যাচ্ছে। 

রঞ্জন চুপ করে বসে রইল। একটু-একটু করে সময় পার হয়ে যাচ্ছে। জেলেরা কি জাল গুটানো শুরু করেছে? আজ কতগুলি মাছ পড়ল তাদের জালে? কত ঢেউ জাগল নদীতে? গঙ্গা মাঈয়া কী আজও রামায়ণ শোনার অপেক্ষায় ঘাটের মাথায় উঠে আসবেন?

ঘরের মধ্যে সকলে চুপ। মেয়েটাও সোজা হয়ে বসেছে এবার। তাকাচ্ছে না, , কিন্তু অপেক্ষা করছে।  রঞ্জন বাইরে চলে এল। পিছুপিছু লোকটাও। বাইরে এসে গাছটার নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে। সামনে লোকটা। নদী প্রবাহের শব্দ এখানে আসে না। তবে নদীর পাখিরা ওড়াউড়ি করে। নদীর বাতাস বয়ে যায়। রঞ্জন জানে না, এই গাছে কখনও জটায়ু পাখি এসে বসেছে কিনা। 

এবার লোকটা ধীরে ধীরে বলল,আমি জানি, এগুলি বলা ঠিক হল না। তবু যখন মেয়ে এসে বলল, আপনি ঘাটের ধারে বসে আছেন, তখন মেয়েকে বললাম, তবে ডাকলি না কেন সেই বাঙ্গালিবাবুকে? আসলে আমিও জানি, আপনি ঘাটে আসেন রামায়ণ পাঠ শোনার জন্য। গঙ্গা মাঈয়াকে দেখায় জন্য। যখন রামায়ণ পড়ি, মনে হয় ভগবান শ্রীরাম আমার পাশে বসে সেই পাঠ শুনছেন। 

রঞ্জন চুপ করে রইল।

লোকটা একটু থেমে বলল, আমি জানি বাবু, এ সম্ভব নয়। তবু যা বললাম, রামজির কৃপাসেই বলা। আপনি আমায় মাপ করবেন। আমার অবস্থা তো বুঝতে পারছেন। আপনি আমাকে এমন কিছু বলুন, যাতে আমার মনের এই বেদনা চলে যায়, আমি আবার আগের মত হতে পারি; আপনাকে, গঙ্গা মাঈয়াকে রামায়ণ পাঠ করে শোনাতে পারি।  

রঞ্জন একটু সময় নিল।

তার পর মাটি থেকে একটুকরো ইঁট কুড়িয়ে একটু ভেবে জাহ্নবীর সাদা দেওয়ালে লিখলঃ আমরা যখন আনন্দে থাকি তখন যেন আমাদের কষ্ট হয়, আর যখন কষ্টে থাকি তখন যেন আনন্দ হয়। 

লোকটা লেখাটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এতদিনের অভ্যেসে সে বাংলাটা রপ্ত করেছে কিন্তু পড়তে শেখেনি। বললে,  কী লিখলেন বাবু?

রঞ্জন দু’হাত জোড় করে বললে, ভালো থাকুন।  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন