মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অসিত কর্মকার।। পারক গল্পপত্র



ভোর থেকে সানাই বাজছে।বিসমিল্লাহ খান ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে শুভবিবাহের সুবাস। গাছগাছালিতে ওড়াউড়ি করা প্রজাপতিগুলো খানিক বেশি উতলা, চঞ্চল এখন। কলোনির মানুষগুলো সবাই নিমন্ত্রণ পাক না পাক, ওই সুরের জাদুতে নিবিষ্ট মন সময় গড়াতে আরও ফুরফুরে, তাতে প্রজাপতিদের গোপন খেলা। 

আজ মিতুলের বিয়ে।রতনদের বাড়ির সামনের গলির ওপারে মিতুলদের টালির দোচালা বাড়ি।প্লাস্টার খসা ঘরের দেয়ালে টুনিলাইটের সারি ঝুলছে।সামনের এক চিলতে উঠোন জুড়ে প্যান্ডেল।ভাঙ্গা পাঁচিল ঘেরা বাড়ির সামনে প্লাস্টিক ফুলে সাজানো গেট।তাতে থার্মোকল কেটে লেখা ‘স্বাগতম’, তার নীচে ‘শুভবিবাহ’,তারও নীচে ‘মিতুল ওয়েডস সাগর’।

মিতুলের গায়ে হলুদউৎসব চলছে।হলুদ শুভ, তাতে শুদ্ধ হচ্ছে মিতুলের তনু। কিন্তু মন! সানাইয়ের সঙ্গে মিলেমিশে শঙ্খধ্বনি,উলুরব,আনন্দের চিৎকার-চেঁচামিচি।হাসি-মস্করা,হুল্লোড়,হলুদ মাখামাখি। গলিতে বাচ্চাদের হুটোপুটি।সিগারেটে সুখটানসহ বড়দের গার্জিয়ানগিরি, ব্যস্তসমস্ত কয়েকজনের  হাঁকাহাঁকি।ডেকরেটরসের আরও নানা জিনিসপত্র ভ্যানরিক্সা থেকে গলিতে নামছে।তাতেও নানারকম শব্দের উৎসব। আশপাশের বাড়ি থেকে কৌতূহলী  উঁকি। ফাঁকফোকর থেকে চোখ সরে না আর। 

মন্দাশীতের মিহিকুয়াশার পরতে পরতে জড়িয়ে একটা জিজ্ঞাসা কলোনিময় ঘুরপাক খাচ্ছে,মিতুলের সঙ্গে রতনের বিয়েটা হল না কেন! ওদের বিয়ে হবে,এ তো ধরাধার্য্য কথা।শুধু দু’পা হেঁটে মিতুল এঁদো গলিটার ওপার থেকে এপারে চলে আসবে।পাড়ার মেয়ে পাড়ার বউ হয়ে থেকে যাবে বাকি জীবন।এর নানা উত্তরও হাওয়ায় ভাসছে।তবে একজনেরটা আরেকজন বেমালুম কাটছে।এই কাটাকুটি খেলায় বুঁদ সারা কলোনি।তারপরও সবকিছু মিলিয়ে একটা উৎসবের আমেজ।ফাল্গুনের মনকাড়া প্রকৃতি তার সঙ্গী।

পাত্রের নাম সাগর।ত্রিবেনীতে নিজস্ব বাড়ি।পারিবারক চালু মুদিদোকান।ছেলে ভাল।খেয়ে-পরে ভালই থাকবে মিতুল।মিতুলের মা বন্দনা জনে জনে বলেছে সে কথা।তাতে করে মিতুল সুখে থাকবে কিন্তু রতনের কী হবে?

ছেলে হিসেবে রতনও তো তুখোড়।কলোনির সেরা।আয়-রোজগার সেরকম একটা না করলেও মিতব্যয়ী এবং গুছোনো ছেলে রতন, সংসার ঠিক চালিয়ে নিত।অনেক বছরের সম্পর্ক দুজনের।তাহলে কী এমন ঘটনা ঘটল হঠাৎ!বন্দনা বিলক্ষণ জানত,এ প্রশ্ন কলোনিতে উঠবেই।মিতুলকে একদিন খুব করে চেপে ধরতে সে শুধু বলে,’তোমাদের আমাকে পার করা দিয়ে কথা,তা দিলেই তো হল!’

 এই সহজ সমাধানের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি বন্দনা।রতনকে বলেছিল,’মেয়ে আমার কেন এমন বেঁকে বসল রতন?ভুল বোঝাবুঝি করে এতদিনের সম্পর্কটা ভেঙ্গে দিও না। এ বিয়েটা না হলে লজ্জায় যে মুখ দেখাতে পারব না।‘বন্দনার আরও অনেক বোঝানোতেও রতন চুপ।আনত মাথা।পাথরের মতো দাঁড়িয়ে।বন্দনা রতনের হাত দুটো ধরতে রতন অস্ফুটে শুধু বলে,’আমার সঙ্গে বিয়ে হলে মিতুল কিছুতেই সুখি হবে না।আমি জানি।‘

-‘কেন রতন?’বন্দনার সকাতর জিজ্ঞাসা।

রতন আবার পাথর।

ছেলের কেন এই মতিভ্রম তা রতনের মা পারুলও বহু চেষ্টা করে বার করতে পারেনি।অবশেষে বন্দনার কাছে তার দুঃখপ্রকাশ,’ছেলের আমার মুখে রা-টুকু নেই দিদি।আপসোস হয়,মিতুলকে ঘরের বউ করে আনার সখ আমার মাটি হল।‘

অগত্যা মিতুলের জন্য অন্য ছেলে খোঁজা শুরু।ঘটকও লাগানো হল।

রতন তখন একরকম বেকারই। বাঁধাধরা কোনও কাজ নেই। যখন যা পায় তাই করে। সেইসঙ্গে কটা ট্যুইশানি। একদিন মিতুল বলেছিল,’এভাবে আর কতদিন।তুমি বাঁধাধরা একটা কিছু কর।খেয়ে-পরে কোনওরকম থাকতে পারলেই হল।‘

চেষ্টার কসুর ছিল না রতনের।দু’একটা হতে হতেও হয়নি।শেষ পর্যন্ত অবশ্য একটা জুটল।মহামায়া বস্ত্রালয়ে সেলিং-কাউন্টার সামলানোর কাজ।একদিন পাশের পাড়ার বিপিন কুন্ডুর সঙ্গে রাস্তায় রতনের দেখা।চাকরির চেষ্টা করছে শুনে বিপিন কুন্ডু এই কাজের প্রস্তাবটা রতনকে দেয়।লেখাপড়া জানা এমনই একটি বিশ্বাসী ভালোছেলে খুঁজছিল সে।মায়না ছয় হাজার টাকা।সেইসঙ্গে রাতে দোকানে ঘুমোলে এক হাজার টাকা এক্সট্রা।তার মানে, সঙ্গে রাতপাহারার কাজটাও জুটে গেল রতনের। 

কাজে খুব নিষ্ঠা রতনের।খুব খুশি বিপিন কুন্ডু।তার হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফসল এই মহামায়া বস্ত্রালয়।এলাকার সেরা।দোকান খোলা-বন্ধের কাজ রতন করে।মিতুলকে সেভাবে সময় দিতে পারে না।তাতে মিতুলের ক্ষোভ-অভিমান তেমন নেই।রতন বাঁধা চাকরি পাওয়াতেই সে খুশি।আর দিন গোনে, কবে বউ হয়ে সামনের গলির এপার থেকে ওপারে ঠাঁই নেবে। 

রাতের খাবারটা পেটে পড়তে শরীর ছেড়ে আসে রতনের।দোকানের গদিতে লম্বা ঘুম লাগায়।ভোর ভোর উঠে ম্যানিকুইনগুলোকে নতুন পোশাকে সাজায়।শাড়ি,চুড়িদার,সালোয়ার-কামিজ ইত্যাদি পোশাকে ওগুলো অপরূপা হয়ে ওঠে।দেখে পথচলতি মানুষ থমকে দাঁড়ায়।বিপিন কুন্ডু বলে ,’রতনের চয়েসের তুলনা নেই।‘দোকানের সেল বাড়ছে দিন দিন।জনান্তিকে বলে,’রতন আমার দোকানের আরেক লক্ষ্মী।‘প্রথম লক্ষ্মীটি অবশ্যই তার স্ত্রী মহামায়া স্বয়ং।রতন খুশি।খুশি মিতুলও।

সেদিন ওদের দুজনের সামনে লেকের জলে আলো-আঁধারির খেলা।গাছেদের ছায়ার নাচানাচি।পাখির কিচিরমিচিরে মিষ্টি চারিদিক।ওপারে রেল-স্টেশান।সবেমাত্র একটা ট্রেন ডাউনের পথে ঢকাস-ঢক, ঢকাস-ঢক শব্দ করে মিলিয়ে গেল।ঠাট্টার ছলে মিতুল জিজ্ঞেস করে,’আমাদের বিয়ের পরেও কি তুমি ওই রাতপাহারার কাজটা চালিয়ে যাবে?’

রতন চুপ।হঠাৎই পেয়ে বসা এক উদাসপানা ভাব।

বিস্মিত মিতুল রতনের বুকে মাথা গুঁজে দেয়।আদুরে গলা,’কী হল,বললে না যে!’

-‘আজকাল আমার যে কী হয়েছে,শুধু মনে হয় আমি তোমার কাছ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছি ।তোমাকে আর সেভাবে ভালবাসতে পারছি না।কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা নয় মিতুল!’আপসোস ঝরা কন্ঠস্বর রতনের।

-‘এ তোমার ভুল ধারণা।কাজপাগল হয়েছ বলে ওরকম মনে হচ্ছে।‘

-‘তোমাকে আমি ঠিক বোঝতে পারছি না মিতুল।‘

-‘তাহলে কি বিপিন কুন্ডুর ওই মহাময়া বস্ত্রালয় আমার সতীন হল!’মিতুল কপট অভিমান করে বলে, দোকানটাকে যা ঝকঝকে তকতকে করে রাখ! আর ওই ম্যানিকুইনগুলোকে যা সুন্দর করে সাজাও তুমি!না শিখে কী করে পার বল তো?’

হেসে ওঠে রতন,’আমি আসলে তখন মনে মনে তোমাকেই সাজাই বলে হয়ত অত ভাল পারি।‘

-‘তবে যে বললে ,তুমি আর আমাকে ভালবাসতে পারছ না?’

হেঁয়ালি হেসে প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতে চায় রতন।তার মনের এই বৈকল্যের  কী  যে কারণ বুঝে উঠতে পারে না রতন। মিতুল মনে করে, এটা সাময়িক ব্যাপার। মানুষটার কেজো মনের গভীরে প্রেম ভালবাসা অন্তঃসলিলা হয়ে আছে, একদিন ফের আবার ঢেউ হয়ে ভেসে উঠবে। 

কিন্তু কোথায় কী। সেদিন সন্ধ্যায় খুব কেঁদেছিল মিতুল। সন্দেহ করেছিল, রতনের জীবনে অন্য কেউ এসেছে বুঝি। 

এখন একটাই আশঙ্কা সবার মনে, সম্পর্ক ভাঙ্গার কারণ যদি মিতুল হয় আর সেই আঘাতে রতন যদি কিছু একটা করে বসে! যদিও রতনকে একদমই স্বাভাবিক লাগছে। দিব্যি আছে। সবার মতে, ভয় তো ওখানেই! 

সানাইয়ের মিলনাত্মক সুরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে ঘরে ঢুকল রতন। সঙ্গে বিয়ের গিফ্ট। লাল বেনারসী। কুন্ডুমশাইকে বলে রেখেছিল রতন। দামটা মাসে মাসে শোধ করে দেবে। শাড়ি দেখে বাড়ির সবাই মুগ্ধ। স্নানটেনান করে রুটিতরকারি খেয়ে ফের দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে যাচ্ছে রতন, পারুল বলল, দুপুরেও ওদের বাড়ি আমাদের সবার নিমন্ত্রণ। 

রতন বলল, আমি কোনও বেলায়ই যাব না। গিয়ে কেন ওদের বিড়ম্বনায় ফেলব। 

দোকানে যাচ্ছে রতন। আশপাশের বাড়ি থেকে অনেক কৌতূহলী চোখ। কারণ পাড়ার বাতাসে একথাও ওড়াউড়ি করছে যে, দোষ যদি রতনের হয়, তাতে করে মিতুল যদি কিছু একটা করে বসে! যদিও এই আশঙ্কা অনেকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছে। বলছে, সাগরও ভাল ছেলে, রতনদের থেকে অনেক বেশি স্বচ্ছল পরিবার। মিতুল কী আর সাধে রাজি হয়েছে! 

রাতে বাড়িতে খেতে এল না রতন। হোটেলে খেয়ে এসে দোকানের গদিতে শুয়ে পড়ল। রাত গড়ায়, সানাইয়ের সুরটা এখন একাকীত্বের যন্ত্রণা হয়ে রতনের বুকে বিঁধছে। সারাদিনের কাজের ব্যস্ততায় তা ভুলে ছিল। মনের আকাশে এখন কত স্মৃতি দল বেঁধে ভিড় করছে। হতাশা গ্রাস করছে রতনকে। সে কি মিতুলকে ফিরিয়ে দিয়ে ভুল করল। সাগর নামে কে একজন কোত্থেকে এসে কত সহজেই মিতুলকে জীবনসঙ্গী করে নিল। এ কি শুধু তার সংসার প্রতিপালন করতে না পারার অক্ষমতা নাকি কাপুরুষতা? এখন যেন নিজেকে ব্যর্থই মনে করে রতন। 

আর ঘুম আসছে না রতনের। মৃদু আলোয় রতন দেখে, গদির পাশ দিয়ে সারি দিয়ে রাখা ম্যানিকুইনগুলো যেন তাকে বিদ্রুপের হাসিতে বিদ্ধ করছে। একটু একটু করে ওরা রতনের দিকে এগিয়ে আসছে, এক্ষুনি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিশোধ নিতে চাইছে! ওদের একটিকে, যে সবার আগে, মনে মনে তাকে রতন মিতুল মানে। ঠিক মিতুলের মতো দেখতে। স্নিগ্ধ শান্ত, মোহিনী আবেদনময়ী। অদ্ভুত সুন্দর  এক  ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো। ওকে নানারকম পোশাকে সাজিয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় রতন। যা পরায় তাতেই দারুণ দেখতে লাগে। খরিদ্দাররা হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। পরানো পোশাকটাই কেনার জন্য জোরাজুরি করে। সেই মিতুলের চোখমুখ কী কঠিন এখন। ভঙ্গিমায় আক্রমণাত্মক! এক অদ্ভুত ভয় রতনের মনে। ওরা দলবদ্ধ, রতন একা। তার শরীরজুড়ে ঘামের রেণু। গা থেকে কম্বলটা সরিয়ে উঠে বসে রতন। হাত বাড়িয়ে ঝটপট বড় লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয়। মিতুলের দিকে অপরাধীর দৃষ্টিতে তাকায়, অস্ফুটে আওড়ায়, তুমি আমাকে ক্ষমা কর মিতুল!

তারপরই রতন যেন প্রায়শ্চিত্ত করতেই মিতুলকে দুহাত বাড়িয়ে কাছে টানে। অতি যত্ন সহকারে মিতুলের শরীর থেকে  একটি একটি করে পোশাক খুলতে থাকে। 

রতনের সামনে নিরাবরণ মিতুল যেন লজ্জা সরমে মরে যেতে থাকে। কপট রাগে রতনকে বিদ্ধ করে। ভাল লাগে রতনের। মিতুলকে এমন করে কোনওদিন পায়নি রতন, মিতুলের গালে, ঠোঁটে, শরীরের নানা বাঁকে চুমু খেতে থাকে। আরক্তিম হয়ে উঠতে থাকে মিতুল। 

রতন মিতুলের গালে গাল লাগিয়ে ফিসফিস করে বলল, আজ আমাদের বিয়ে মিতুল। দেখই না, কী সুন্দর করে সাজাই তোমাকে। 

একটা লাল বেনারসি মিতুলকে পরিপাটি করে পরায়। ঘোমটা মাথায় কী চমৎকারই না মিতুলকে দেখছে রতন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে। আপসোসও হয় একটু। যদি এক চিলতে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারত! আরও কতই না অপরূপ লাগত মিতুলকে! 

মিতুলের সঙ্গিনীদের চোখেমুখেও খুশির ঝিলিক দেখে এখন রতন। 

রাত অনেক হল। সানাইয়ের সুর আর ভেসে আসছে না। বাকি পৃথিবীও ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে। সব আলো নিভিয়ে দেয় রতন। 

এসো মিতুল, রতন মিতুলের হাত ধরে কাছে টানে, বিছানায় গ্রহণ করে সুদৃঢ় আলিঙ্গনে বুকে জড়ায়। গভীর প্রণয়ের উষ্ণতায় মিতুলের  মধ্যে প্রাণ সঞ্চারে মেতে ওঠে রতন! 

রাত গড়ায়। বাইরে প্রকৃতির নানা লীলাখেলা সানাইয়ের সুর হয়ে বাজে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন