বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দীপালোক ভট্টাচার্য।। পারক গল্পপত্র


                     


।।এক।।

সেই একই চশমাওয়ালা গান্ধীজী। মাঝে বড় বড় করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া লেখা। মাঝ বরাবর ওপর থেকে নিচে চলে যাওয়া চকমকে রাঙতাটাই যা গোলমেলে। তা এতসব কারিকুরি কি দ্রুপদের পক্ষে বোঝা সম্ভব? সেই বেচারা কোত্থেকে এই পাঁচশো টাকার নোটখানা পেয়েছে সেটাই মনে করতে পারছে না।  এটিএম এর পেট থেকে বেরোনো দু হাজার টাকার নোট খুচরো করতে গিয়ে পাওয়া একখানা  পাঁচশো? নাকি টিউশন বাড়িতে দেওয়া নিরীহ খামের মাঝে লুকিয়ে থাকা কড়কড়ে দুটো পাঁচশোর একখানা? কপালে চিন্তার ভাঁজ ধ্রুপদের। 

ঘড়ির কাঁটা রাত বারো ছুঁতে মিনিট খানেক বাকি। একটু পরেই একখানা মিসড কল আসবে, যার অর্থ হলো মোবাইল ইন্টারনেট চালু কর।  তার কয়েক সেকেন্ড পর টুং করে একখানা শব্দ হবে, তারপর ক্রমাগত সেই শব্দকে নিঃশব্দ কম্পনে রূপান্তরিত করতে মোবাইলের সাইলেন্ট মোডে একটা আলতো স্পর্শ।  তারপর পর্দার ঔজ্জল্য যতটা সম্ভব কমিয়ে বুড়ো আঙ্গুলের আলতো ছোঁয়ায় মৌলির সাথে কিছু শব্দ বিনিময়।  প্রতিটা দিনকে আগের দিনের ফটোকপি মনে হতে হতেও হয়না এই স্বল্প সময়টুকুর জন্য।  এই সময়টুকুর প্রতীক্ষায় প্রবল বিরক্তি নিয়েও মুখস্থ করা যায় সংবিধানের কততম সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রামসভা গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিংবা মগধের রাজধানী কোথায় ছিল বা ২০০৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে কে পেয়েছিলেন এসব নানান হাবিজাবি সাধারণ জ্ঞান। এসব জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে এই বাজারে একখানা সাধারণ চাকরি জোটানো, যাকে ধ্রুপদের ভাষায় পেছন হলুদ।


অন্যদিন এই সময়ে অনেককিছু মুখস্ত করে ফেলে ধ্রুপদ। বারোটার মিসড কলটাকে টার্গেট ধরে ফটাফট মুখস্ত করে ফেলে কোচিং সেন্টার থেকে দেওয়া সাধারণ জ্ঞানের তথ্যসমন্বিত কাগজের পাতাগুলি।  একটা চাকরি পেতেই হবে ধ্রুপদকে। যে করেই হোক। আজ ঘুরে ফিরে পাঁচশো টাকাটার কথাই মনে হচ্ছে। বিকেলে কোচিং সেন্টারে পড়া শেষে প্রতি মাসের কোর্স ফি-র কিস্তি জমা দিতে গিয়ে কাউন্টারের মেয়েটি জানায়, কিছু মনে করবে না, এই পাঁচশো টাকার নোটটা একটু চেঞ্জ করে দাও। না ছেড়া নয়। তাহলে? মেয়েটি ইনিয়ে-বিনিয়ে জানায় টাকাটা জাল। ফি-র টাকাটা দিতে পারেনি আজ। পার্স হাতড়ে বুঝল সাড়ে তিনশো মত আছে। লজ্জার মাথা খেয়ে জাল নোটটা নিয়ে বেরিয়ে আসে কোচিং সেন্টার থেকে।  কোর্স ফি-র টাকা প্রায় পুরোটাই দেয় বাবা। দুদিন আগে দেড় হাজার দিয়েছে। তার ওপর বাড়ির কাজে হাত দিয়েছে। নভেম্বরে দাদার বিয়ে। ঘর দরকার। তাছাড়া রান্নাঘর, বসার ঘরের দেওয়ালে নোনা ধরে যাচ্ছেতাই অবস্থা। প্রতিদিন মিস্ত্রী লেবারের হাজিরা, ইট- সিমেন্টের বিশাল খরচা সামলে সরকারি চাকরি থেকে সদ্য অবসর নিউ বাবা আর কত টানবে? ইংরেজি অ্যাপ্রোপ্রিয়েট প্রিপোজিশন মুখস্ত করতে গিয়ে এসব এলোমেলো ভাবনা আক্রান্ত করল মনসংযোগ।


বারোটা বাজতে দুই। এই এল বলে মিসড কল। হঠাৎ মনে হল ভ্যালিডিটি আজই শেষ। তাহলে? পাপলুকে বললে কেমন হয়? ও বলছিল, ও নাকি বাড়িতে বসেই মোবাইলে রিচার্জ করে। করবে নাকি ফোন?


।।দুই।।

 - তোমার বাবা রায় বানান কি লিখে গো? আর এ না আর ও?

 -শুনতে পারছি না, জোরে বলো। 

 -বললাম, তোমার বাপ কি লেখে আর এ না আর ও?

 -কী লেখে মানে?

 -বলছি যে.... হ্যালো, হ্যালো....

 লাইনটা কেটে গেল। ধ্রুপদ এসেছে পাড়ার সাইবার ক্যাফেতে। রেলের স্টেশন মাস্টার পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি বেড়িয়েছে। সেটার অনলাইন ফর্ম ফিল আপের জন্য। প্রতিবার যেমন হয়, মৌলি বলে, তুমি যখন করছই আমার ফর্মটাও ফিল আপ করে দাও। অনলাইনের অত ঝামেলা আমার পোষাবে না। মাস কয়েক আগে কোন একটা চাকরির পরীক্ষায় মৌলির বাবার নামটা ভুল এন্ট্রি করেছিল ধ্রুপদ।  না,  ঠিক ভুল নয়। মৌলি নিজে রায় বানান আর ও ওয়াই লেখে। এদিকে ওর মাধ্যমিকের অ্যাডমিটে ওর বাবার পদবী ভুলবশত আর এ ওয়াই ছাপানো ছিল।  তারপর থেকে এটাই চলছে। মৌলি আর ও, আর ওর বাবা আর এ।  সেই চাকরির পরীক্ষার এডমিট আসার পর মৌলির টেনশন দেখে মনে হয়েছিল, বাবার পদবীটার ছোট্ট গোলমালের জন্য ওর হওয়া চাকরি আর হলো না। এবার আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি ধ্রুপদ। ক্যাফেতে বসেই ফোন করেছে মৌলিকে। কিন্তু ফোনটা কেটে গেল হঠাৎ করবে করবে করেও করল না ধ্রুপদ। করলেও পাবে কিনা কে জানে।  ট্রেনে আছে এখন। আছে বলতে একটু আগেই উঠেছে ওর মায়ের সাথে মামাবাড়ি যাচ্ছে বহরমপুর। মামাতো দিদির ছেলের মুখেভাত। আসতে আসতে আরও তিনদিনের ধাক্কা।

- প্রিন্ট দিয়ে দেবো? ক্যাফের ছেলেটা বলল।

-দাঁড়াও, আরেকবার দেখে নি। কম্পিউটারের পর্দায় অন্বেষী চোখ ধ্রুপদের।

প্রিন্টারের ক্যাঁচকোঁচ শব্দটা বেশ ভালো লাগে ধ্রুপদের।  পর্দায় দেখা দ্বিমাত্রিক হরফ, ছবি সব কেমন ছাপা হয়ে বেরিয়ে আসে আঙুলের ইশারায়।

প্রিন্ট আউটটা হাতে নিয়ে এক ঝলক তাকালো ও। ব্যাংকে জমা দিতে হবে দু'জনেরটা। কালকেই লাস্ট ডেট। মৌলির আসতে আসতে আরো দু'দিন। আর ও থাকলেও কি বলা যেত, তোমারটা তুমি দাও, আমারটা আমি? টাকার অংকটার দিকে চোখ গেল ধ্রুপদের। ওরটা সাড়ে তিনশো। আর মৌলির দুশো কুড়ি। মোট পাঁচশো সত্তর। ওরা এস সি, তাই কম। এটা একটা সুবিধে। না হলে সাড়ে তিনশ করে দু'জনেরটা মিলিয়ে সাতশো টাকা দিতে হতো। মৌলির কাছ থেকে তো নেওয়া যায়না এসব। যায়?


 একটু যদি পড়তো মৌলিটা। ধ্রুপদ ভাবে। ব্যাংক ক্লারিক্যাল এ ওদের কোটায় প্রচুর সিট ছিল। আসলে অংকটায় কাঁচা। কোচিং সেন্টারের মক টেস্টেও মৌলি অংকে মার খায়। জি কে, জি আই, ইংরেজি এসবে ভালোই করে। শুধু অংকটা। নিজের বদলে মৌলির চাকরির কথা কি বেশি ভাবছে আজকাল ধ্রুপদ? ও কি অনেকের মত ভেবে নিয়েছে, পদবীতে চ্যাটার্জি আছে বলে সেই প্রথাগত ভাবনা- জেনারেল কাস্ট? যাস্ট হবে না। কিন্তু একটা দুর্ভাবনাও আছে। মৌলির চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বুমেরাং হয়ে ঘুরে আসবে নাতো বাড়িতে? বাবা-মা এখনো সেভাবে কিছু জানেনা। দাদা কিছুটা জানে। কিন্তু দাদাটাই তো মায়ের পছন্দ করা বামুন ঘরের মেয়ে বিয়ে করে চাপে ফেলে দিল। পরে যদি একটা তুলনামূলক আলোচনা ওঠে? অবশ্য এক্ষেত্রে 'যদি'টাকে ডিলিট করে ফেলাই যায়, তাই না?

ধুর! কি সব আবোল তাবোল ভাবছে ধ্রুপদ? এখন সেভাবে কিছুই হলো না, এখনি এসব ভাবনা। দাদার পাকা কথা হয়ে গেল দিন কয়েক আগে। সেটার আফটারশক হতে পারে।

 হঠাৎ সেই পাঁচশো টাকাটার কথা মনে পড়ল ধ্রুপদের। এই মুহূর্তে ব্যাংকে পাঁচশো কুড়ি টাকা লাগত। পাঁচশো টাকাটা থাকলে....


।।তিন।।

দুপুরে খাওয়ার পর বারান্দায় বসে মোবাইল খুটখুট করছে ধ্রুপদ। নিজের ঘর থেকে প্রায় বিতাড়িত হয়েছে দিন কয়েকের জন্য। ওর ঘরের দেওয়াল জুড়ে নোনা ধরেছে বেশ কয়েক বছর হল। সেই কোন যুগে বানানোর পর আর মেরামত হয়নি। তার ওপর বৃষ্টিবহুল তড়াইয়ের একতলা টিনের বাড়ি। আর ধ্রুপদের ঘরটা তো রোদের জন্য হাহাকার করে থাকে। শেষ বিকেলে এক ফালি রোদ রাঙিয়ে দেয় পুব দিকের দেয়ালটাকে। কিন্তু সে রোদে উষ্ণতা থাকেনা। অবশ্য বিকেলবেলা ঘরে বসে নিস্তেল রোদ্দুর দেখার মতো বিলাসিতা করার সময় কোথায় ধ্রুপদের? হয় ছাত্র পড়াতে ছুটতে হয়, নয়তো চাকরির পরীক্ষার কোচিং সেন্টার।

ওর ঘরের জিনিসপত্র চৌকির ওপর ঢিপ করে রাখা হয়েছে। চৌকিটা ঘরের মাঝখানে। চারিদিকের দেওয়ালে পুরোনো প্লাস্টার চটিয়ে মশলার নতুন প্রলেপ।  মেঝেটাও সম্ভবত চটিয়ে টাইলস বসানো হবে। তবে সেটা হবে কিনা তা নির্ভর করছে বাবার ব্যাংক একাউন্টে কত আছে সেটার ওপর। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর যেমনটা হয় আর কি। ঘরটা একটু সারানো দরকার। তার ওপর বড় ছেলের বিয়ে। নতুন একটা ঘর দরকার। ছোট ছেলের ঘরটাও একটু হাত দিতে হবে। বারবার তো হয়না এসব কাজ। মার একটা বড়সড় রান্নাঘরের শখ।  বাথরুমটাও পুরনো আমলের। মায়ের আর্থারাইটি... বসতে কষ্ট। একটা কমোড হলে মন্দ হয় না। এসব করতে গিয়ে সাত লাখের বাজেট গিয়ে কখন দশ লাখে দাঁড়িয়েছে বাবার নজর এড়িয়ে।


 বারান্দার সামনের ফাঁকা যায়গাটায় ইট বিছিয়ে বালি সিমেন্ট মাখা হচ্ছে। একজন সামনে ঢিপি করে রাখা বালির স্তুপ থেকে টিনে করে বালি আনছে। আরেকজন নির্দিষ্ট অনুপাতে সিমেন্ট আর জল মিশিয়ে কোদাল দিয়ে সুনিপুণভাবে মাখছে যেটাকে ওরা মশলা বলে ডাকে। সেই মশলা আরেক জন শ্রমিক কড়াইয়ে করে নিয়ে যাচ্ছে ধ্রুপদের ঘরে। সেখানে মিস্ত্রি কাজ করছে। রান্না ঘরের পাশ দিয়ে শুরু প্যাসেজটা দিয়ে ওরা যাতায়াত করায় গোটা বাড়ি আর বাড়ি নেই। বালি, জল- কাদা, সিমেন্টে মেঝে মাখামাখি। ধ্রুপদের মায়ের কপাল আজকাল প্রবল বিরক্তিতে সবসময় কোঁচকানো থাকে। কাজ হয়ে যাবার পর প্রতিদিন বালতি- ঝাঁটা নিয়ে আসরে নেমে পড়ে ওর মা। বারন করলেও  শোনে না।

মোবাইল থেকে চোখ তুলে শ্রমিকদের কাজ দেখছে ধ্রুপদ। বাবা পেনশনার্স সমিতির মিটিংয়ে গেছে। ধ্রুপদ কে বলে গেছে একটু নজর রাখতে। আসলে সারা জীবনের সঞ্চয় ভেঙে প্রতিদিন অনেক টাকা চলে যাচ্ছে মিস্ত্রি, শ্রমিকদের মাইনে দিতে। মিস্ত্রি সাড়ে চারশো টাকা আর শ্রমিকদের সাড়ে তিনশো । তিনজন শ্রমিক আর একজন মিস্ত্রি প্রতিদিন কাজ করছে। প্রতিদিন বলাটা ভুল। আজ এটা কাল ওটা বলে কামাই তো আছেই।

 ধ্রুপদ মনে মনে হিসেব করে। শ্রমিকদের হাজিরা ধরলেও প্রতিদিন সাড়ে তিনশো মানে মাসে তিরিশ দিনে সাড়ে দশ হাজার। এদিকে ওর সাতাশ বছর বয়সে বাড়ি বাড়ি ছাত্র পড়িয়ে মাসে মেরেকেটে হাজার চারেক। অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এলো ধ্রুপদের কলজে থেকে।

 -দাদা জলের বোতলটা খানেক দেন তো। জিয়ারুল নামের ছেলেটা ধ্রুপদ কে বলল। পুরনো কোল্ড্রিংসের বোতলে জল রাখা আছে ওদের জন্য। পৌরসভার টাইম কল থেকে মা ভরে রাখে। কুদ্দুস মিস্ত্রিও হাজির জল ব্রেক নিতে। দু লিটারের বোতল নিমেষে খালি।

 - তোমার বাবা আসবে নাকি আমরা চলি যাওয়ার আগে? কুদ্দুস জিজ্ঞাসা করে।

 - কেন বাবা না বলে গেছে তোমাদেরকে দু'দিন পরে দেবে হাজিরা। ধ্রুপদ উত্তর দেয...

 - আরে হাজিরার কথা বলতেছি না দাদা। ওইটা নিয়া কথা হইচে।  কথা হইলো, কাইল তো আমার দুইজন লেবার আসবেনা। যদি পাই বদলি হিসাবে দুইজনকে, তাইলে কাল আসবো নইলে কিন্তু কাল আসতেছি না।

 - বাবা থাকতে বললে না কেন? আমি জানিনা। এমনি কিন্তু তোমরা অনেক দেরি করে ফেলেছ। ধ্রুপদের কন্ঠে ঝাঁঝ। কেন, আসবে না কেন? দু'দিন পর থেকে আসুক তাহলে।

 - আরে ওদেরকে পাইতেছেন কোথায় আপনি? কুদ্দুস বোঝানোর চেষ্টা করে ধ্রুপদকে। ওরা সাউথে যাইতেছ... এইখানে আর কাজ করবে না। আমরাও কোনদিন পালন দিব। কি কস জিয়া?

 -ঠিকে কইচেন দাদা। জিয়ারুল ওর গুটকা শোভিত দাঁত বের করে হাসতে হাসতে জবাব দেয়। পাইসাটাই হইল আসল, তাই না? এইটে হামরা কত করি পাই? সাড়ে তিনশো। তাওতো হেডমিস্ত্রি কুড়ি টাকা কাটি নিবে। আর ওইটে ফালাট-ফালাইওভারের কাজোত মাস মাইনা দিয়া কন্ট্রাকটেরর ঘর লেবার রাখিবে। মাসোত  পঁচিশ হাজার। থাকাটাও ফিরি। পাঁচ হাজার খাইলেও মাসোত ফ্যালে চ্যারে বিশ হাজার জমাও। এক বছর কামাই করিলে দুই লাখ চল্লিশ। ক্যানে যাইম না কন তো এইবার?

ধ্রুপদ উত্তরে কি বলবে ভেবে পেল না। সত্যিই তো। দৈনিক সাড়ে তিনশো  টাকার দিনমজুরিকে লাথি মেরে পঁচিশ হাজারি চাকরির জন্য দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট কাটার মধ্যে একটা গতিময়তা আছে। উদ্দীপনায় ঝলসে ওঠা জিয়ারুলের চোখজোড়া কি ব্যঙ্গ করছে আলমারিতে ল্যামিনেশন করে রাখা ধ্রুপদের মার্কশীট সার্টিফিকেটগুলো কে?

ঘরে চলে আসে ধ্রুপদ। ঘড়িতে চারটে। সাড়ে চারটের সময় নতুন টিউশন বাড়িতে যাবার কথা। কিন্তু ইচ্ছে করছে না।


।।চার।।

 একশো টাকার নোটটা বের করতে গিয়েও করলনা ধ্রুপদ। মনে পড়ল, পার্সে ওই পাঁচশো টাকাটা ছাড়া খুব একটা বেশি নেই। বাবার কাইনেটিক হোন্ডাটা নিয়ে বেরোনোর সময়ই বাবা বলছিলো, মনে হয় তেল খুব একটা বেশি নেই। পারলে একটু ভোরে নিস তো। কাল আবার ব্যাংকে যেতে হবে। এই অবস্থায় দাওতো একশোটা টাকা বলাটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। বিশেষত ধ্রুপদের মত ছেলের পক্ষে।

আজ অনেকদিন পর ঠেকে যাচ্ছে।  রোববার বিকেল টা ফাঁকাই রেখেছে ও। পড়ানো নেই। কোচিং সেন্টারও বন্ধ। মাঝেমধ্যে মৌলির সঙ্গে একটু এদিক ওদিক যে হয় না রোববারের বিকেলে, তা নয়। মৌলি কাল রওনা দেবে বহরমপুর থেকে। আগে থেকেই ভাবা ছিল ছোট পুলের ঠেকটায় অনেকদিন যাওয়া হয়না। পুরোনো বন্ধুরা সবাই যে যার মতো ব্যস্ত নিজের কাজ নিয়ে। রোববার টা পাওয়া যায় সবাইকে এই সময়।

- কি ব্যাপার গুরু, দেখাই নাই আজকাল। কই থাকিস? রঞ্জন যাকে বন্ধুরা আদর করে ফুটো বলে ডাকে। ধ্রুপদ গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করার সাথে সাথে বলে উঠলো ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে।

 ধ্রুপদ কোন উত্তর দেয় না। অর্থপূর্ণ ভঙ্গিতে হাসে। সে হাসির অনেক রকম মনে হতে পারে। চোখ বুলিয়ে দেখল আসর জমজমাট। রনি, পতু, গামছা, সবাই আছে। পোতু নতুন বাইক কিনেছে। ওয়ান এইট্টি পালসার।  সেটাকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে।

- ব্রেকিং নিউজ এইমাত্র খবর পাওয়া গেল পতু তার নতুন বাইক কেনা উপলক্ষে ছোট পুলের ঠেকের সদস্যবৃন্দকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে পকেটে  কড়কড়ে নোট নিয়ে এসেছে। রাজ রেস্টুরেন্টের দিকে এক্ষুনি তার কনভয় রওনা দেবে। আসুন একঝলক শুনে নেই পতুর প্রতিক্রিয়া। রনি ওর হাতের কাল্পনিক মাইকটা পতুর দিকে এগিয়ে দেয়।

 - বিরোধীদের এই অপপ্রচারে কান দেবেন না বন্ধুগণ। আপনারা হয়তো জানেন না, ব্যাংক থেকে বছরে সাড়ে নয় পার্সেন্ট ইন্টারেস্টে এই বাইক কেনা। ডাউনপেমেন্টের খরচ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার, মানে আমার বাপ। আপনাদের অবগতির জন্য জানাই, খুব শিগগির দিদি জামাইবাবুর চাপে জামাইবাবুর ওষুধের কোম্পানিতে এম.আর হিসাবে জয়েন করতে চলেছি। তাই কেন্দ্রীয় অনুদানে এই বাহন ক্রয়। আপনারাই বলুন, এই আর্থিক সংকটের মধ্যে বন্ধুদের নিয়ে মোচ্ছব করাটা কি উচিত? আমি জনগণের দরবারে প্রশ্ন রাখছি।

 - মাইর খাবি শালা। চাকরি পাইছিস, এতক্ষণ বলিস নাই? তুতানের গলায় উষ্ণতা। চাকরির খাওয়া প্লাস বাইকের খাওয়া। আমরা কিন্তু চিকেন কাটলেটে ভুলতেছি না। বন্ধুগণ, আমি প্রস্তাব রাখছি যে পতু আমাদেরকে ক্যান্ড ভাল্লুক সহযোগে চিকেন ললিপপ খাওয়াবে।

- আমি এই প্রস্তাব সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি। ধ্রুপদ বলল। প্রবল করতালির মধ্য দিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হল সভায়।  পতু কে পেছনে বসিয়ে গামছা পতুর নতুন বাইক স্টার্ট দিল।

 -অই  দাঁড়া, রঞ্জন চিৎকার করে বলল, যে প্রস্তাব সমর্থন করলো, সেই তো শালা নিরামিষ। মালটার জন্য কোলড্রিংস আনিস।

 - না না, লাগবেনা আমার জন্য কোলড্রিংস। ওইটাই খাব। ধ্রুপদের গলা কে ছাপিয়ে গেল একশো আশি সিসি’র সিসির ইঞ্জিন। পতুরা কি শুনতে পেল ওর কথা?

- কিরে, তোর না গন্ধ শুকলেই বমি আসে? আজ কী হইল? তুতান জিজ্ঞেস করল।

-ভাবছি একটা চাকরিতে জয়েন করবো। করবি নাকি? অবশ্য দূরে।

 - কোথায়? কত দিবে রে? কোয়ালিফিকেশন কি? দ্রুপদের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন সটান লুফে নিল তুতান।

- আরে, সবুর। ধ্রুপদের চোখে দুষ্টুমি। কনস্ট্রাকশন কম্পানি। মাসে পঁচিশ হাজার ইনক্লুডিং লজিং। খাবারটা মেস করে।

- স্টার্টিং হিসাবে মন্দ না, তাই না? তুতান ধ্রুপদের বাবার কাইনেটিক হোন্ডাটার ওপর এসে বসল। আরে  সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোই মাসে আঠারো-বিশ দিতেছে ট্রেনিং পিরিওডে।  জব ডেস্ক্রিপশন কী রে?

 -একদম চাপের না। আট ঘন্টার ডিউটি। তোকে জাস্ট অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি করতে হবে। ধ্রুপদ একটু একটু করে সুতো ছাড়ছে।

 - মানে? তুতানের মুখ হাঁ। বাকিরাও তাকিয়ে আছে ধ্রুপদের দিকে।


- মানে আর কিছুই নয়। ইট, বালি, সিমেন্ট, পাথর এসব মাখা। রাজমিস্ত্রির কাছে কড়াইয়ে করে নিয়ে আসা। মাথায় করে ইট বওয়া। এইত্তো। ব্যাস।  সিমল্পি লেবারি করা যাকে বলে। করবি নাকি বল।  ধ্রুপদের ঠোঁটের কোনে হাসি। সে হাসিতে বিষাদের মিশেল।

 সবাই বিহ্বল হয়ে গেল মুহূর্ত কয়েকের জন্য।  হঠাৎ পিং পিং। ধ্রুপদের মোবাইলে মেসেজ অ্যালার্ট। মনে হয় মৌলি। পকেটে হাত দিতে গিয়েও দিল না ধ্রুপদ।



।।পাঁচ।।

 -দাদা, ও দাদা।

 হেডমিস্ত্রির গলা। ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি টোয়েন্টি দেখছে ধ্রুপদ। বাবা-মা গেছে শিলিগুড়ি।  ছোটমেসো হঠাৎ করে বাথরুমে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। এখানকার নার্সিংহোম থেকে শিলিগুড়ি রেফার করেছে। বাবা-মা ওই অ্যাম্বুলেন্সেই চলে গেছে মাসিদের সাথে। আজ মিস্ত্রির- লেবারদের মাইনে দেওয়ার কথা। তাড়াহুড়োর চোটে বাবা ভুলে গেছিল তখন। একটু আগে ফোন করে বলল, আলমারির লকারে টাকা আছে। সাড়ে চার হাজার টাকা কুদ্দুসকে দিয়ে দিস। ধ্রুপদ বারান্দায় এসে দেখে সবাই কাজ গুটিয়ে বাড়ি যাবার জন্য তৈরি।


 - কাকু দিয়া গেছে না টাকা?  কুদ্দুস মিস্ত্রি জিজ্ঞাসা করল।

 - হ্যাঁ। দাঁড়াও এক মিনিট। ধ্রুপদ ঘরে আসে টাকা নেওয়ার জন্য। আলমারির লকার খুলে দেখে ওপরেই একটা খাম রাখা। ওপরে লেখা লেবার পেমেন্ট। গুনে গুনে ন’খানা পাঁচশো টাকার নোট বের করল খাম থেকে। বারান্দায় এসে আবার টাকাটা গুনল ধ্রুপদ।


 - বাবা সাড়ে চার হাজারের কথা বলে গেছে। কুদ্দুস মিস্ত্রির দিকে তাকিয়ে বলল ধ্রুপদ।

 - আরেকটু বেশি হইলে ভালো হইতো। ঠিক আছে। থাউক গিয়া। কাকুর সাথে কথা বইলে নিব এখন পরে। কুদ্দুস এগিয়ে আসে।

 - এক মিনিট দাঁড়াও। ধ্রুপদের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক ছুটে ঘরে এসে ওর মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার নোট টা বের করে খাম থেকে বের করা নোটগুলোর একটা নিজের মানিব্যাগে ঢোকায় কাঁপা কাঁপা হাতে। আবার গোনে।  সেই পাঁচশো টাকার নোটটা মাঝে দিয়ে দেয়। গোনার সময় ভাল করে খেয়াল করে কিছু বোঝা যাচ্ছে কি না। না। ধ্রুপদের হাত কোন ফারাক খুঁজে পায় না আসল নকলের।


 - এই নাও। 

নোটগুলো হাতবদল হয়ে চলে আসে কুদ্দুস মিস্ত্রীর কাছে। সে লেবারদের হাতে টাকা দেয়। বাকীটা পকেটে ঢোকায়।

 - কী হল গুনে দেখলে না? ভেতর ভেতর অস্থির লাগছে ধ্রুপদের।

- তোমরা ল্যাখাপড়া জানা মানুষ, কুদ্দুস ওর থলে ব্যাগে সরঞ্জাম ভরতে ভরতে বলে, আর আমরা অনেক মানুষ চড়াইচি তো। মানুষ চিনি। কে কেমন। চুকলিবাজি সবাই করতে পারে না।

 কুদ্দুস সাইকেলের প্যাডেলে পা দেয়। পাশের বাড়ি থেকে শাঁখ বেজে ওঠে।  ধ্রুপদ ঘরে আসে। টিভিতে বিরাট কোহলি রান আউট হল। আর বোধহয় পারবে না ভারত। এক ওভার চার বলে উনচল্লিশ রান লাগে জিততে। হঠাৎ বিছানার তোষক তুলে টিভির আলোতেই দেখে ব্যাংকের চালানটা ঠিকমতো রাখা আছে কিনা। কালই ব্যাংকে যেতে হবে। কালকেই লাস্ট ডেট।

 মশা পনপন করছে। কিন্তু আলো জ্বালতে ইচ্ছে করছে না। কুদ্দুস মিস্ত্রি নাই চিনুক, নিজেকে নিজের কাছে খুব অচেনা মনে হল ধ্রুপদের।


৩টি মন্তব্য: