শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী।। পারক গল্পপত্র



লাট্টু  যখন বাড়ি ফিরে এল, গ্রাম জুড়ে অন্ধকার। ঘরের ভেতর যে টিমটিমে বাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে তার বিস্তার বড় কম। জ্বলজ্বলে আগুন আছে আলো নেই। এই তো সেদিন মেম্বার এসে বলে গেল আর কদিন সবুর কর, ঘরে ঘরে ইলেক্ট্রিক চলে আসবে। ভর্তুকি আছে, টাকাও বেশি লাগবে না। সবুর তো করেই আছে কবে থেকে। সারের দোকানের ম্যানেজার লাট্টু যখন দোকান বন্ধ করে ফেরে খালপারের ওপাশে ঝকঝকে আলো আর এপাশে আসতে আসতে অন্ধকার যেন ব্যঙ্গ হয়ে চেপে ধরে। আজ খালের জলটা বেশ বেড়েছে ।

 ওনেকদিন আগে ওটা আসলে একটা নদী ছিল। কেশাই নদী। ছোট বেলাতেও ভালোই জল দেখেছে ওতে। বর্ষাকালে সুপুরি গাছের ডাল বেঁধে ব্রিজ বানিয়ে পার হতে হত। অন্য সময় বাঁশ বা যা হোক কিছু থাকত। ইদানীং ঢালাই ব্রিজ হয়েছে কিন্তু জল নেই।  ভাদ্র মাসে যদিও বা একটু খানি হাঁটু ভেজা জল হয় , সারা বছর শুকনো মাটি। এখন আর কেউ কেশাই নদী বলে না। খালই বলে। 

বাড়িতে ঢুকে স্নান সেরে এলো লাট্টু । দুইদিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। আজ যদিও বিকেল থেকে  আর হয়নি।  

 ----মা  ছোট্টুর জ্বর কমল! 

গামছা দিয়ে গা মুছতে মুছতে বলল লাট্টু

---- এখন একটু কম মনে হচ্ছে।   

ছোট্টুকে কোলে নিয়ে বসে আছে লাট্টুর মা গীতা । দুদিন ধরে নাতির জ্বর। 

দীপালি বারান্দায়  উনুনে ডাল চড়িয়েছে। এই বর্ষায় ওর খুব কষ্ট হয়। খড়িগুলো স্যাঁতস্যাঁত   করে আগুন জ্বলতে চায় না। খালি ধোঁয়া আর ধোঁয়া। লাট্টু  বারান্দার বসতেই ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল দীপালি --- খালের জল দেখেছ!  নদী হয়ে গেছে একদম।

 ----হ্যাঁ, দেখলাম তো,  কোন দিন এত জল দেখিনি, সেই ছোটতেও না। 

-----তুমি বলছিলে না এটা আগে নদী ছিল আর কি যেন  নাম, গল্পটা  বোলোতো আজ । 

 ঘন কালো মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে গোল পূর্ণিমার চাঁদ। সুন্দর মায়াময় জোছনা দীপালির মুখ জুড়ে। 

 লাট্টু সেই গল্পের কথায় না গিয়ে বলল -- বান আসবে মনে হচ্ছে ।  

-----কেন?  বান আসবে কেন! হয়তো নদীটা আবার আগের মতো ---। 

-----এমন জল আগে কখন দেখিনি, শুনলাম কুচবিহার জলপাইগুড়ি সব জায়গা জলে ঢুবে গেছে। এবার এদিকেও---। 

মেঘ আবার কখন ছেয়ে গেছে। চাঁদ আড়ালে। দীপালির মুখে কালো ছায়া নেমে এলো । খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল,  লাট্টু উঠে পরল। ছোট্টু ঘুম ভেঙে কাঁদছে। মা ওকে চুপ করাচ্ছে। "কাল খাল পারের ওষুধের দোকানটাতে নিয়ে যেতে হবে।" ভাবল লাট্টু।

একটা কোলাহল শোনা যাচ্ছে কিসের!  কান পাতল ও। হ্যাঁ কোলাহলই বটে। ক্রমশ বাড়ছে ওটা। বাইরে বেরিয়ে এলো। আশেপাশের বাড়ি থেকেও বেড়িয়ে এসেছে  প্রানেশ কাকা, রাজেন মিস্ত্রি, হরিদাস। পেছন পেছন মেয়ে বৌ-রা। রাস্তায় ছিপছিপে জলের স্রোত।  সত্যিই বান আসছে আসছে তবে !  ওপারটা নিচু, ওদিকে আগে জল উঠেছে। মানে জল বাড়লে এদিকেও ভেসে যাবে  আর জল নাকি বেড়েই চলেছে। চুর্ণির বাঁধ কি তবে ভেঙে গেল! খালের ওপারের জনরব এপারেও সংক্রামিত হল দ্রুত। সকলে ব্যস্ত হয়ে পরল। ঘরের জিনিস পত্র যা ছিল,  আলমারি, টিনের বাক্স চৌকি সবকিছুর তলে ইট দিয়ে যতটা পারা যায় উঁচু করা হল। রান্নার জিনিস পত্র চৌকির উপর। নতুন বাঁশের বেড়া দিয়েছিল কদিন আগেই লাট্টু। সেটা উপড়ে এনে আরও মজবুত করে দড়ি বেঁধে  টিনের চালায় মই-এর মতো ঠেস দিয়ে রাখল। দরকারে যেন দীপালি এমনকি মা আর ছোট্টুকেও ছাদে তোলা যায়। একটা বড় প্লাস্টিক আছে ওর। সেটাও বের করে রাখল হাতের কাছে , বৃষ্টি বাদলার দিন, ছাদে উঠতে হলে ----। এসব করতে করতে তখন মাঝ রাত্রি। বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার।  ছোট্টুর জ্বর বাড়ছে।  দশ পনেরো মিনিট ঘুমচ্ছে কি ঘুমচ্ছে না, আবার কেঁদে উঠছে। কখনো দীপালি গিয়ে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে তো কখনো গীতা সরষার তেল মালিশ করে দিচ্ছে হাতে পায়ে গলায়। কখনও আবার জলপট্টি --। 

-----কাল বড় ডাক্তার না দেখালেই নয়। নিজের মনে আবার আওরালো লাট্টু।

 ----আচ্ছা  জলের তোড়ে যদি ব্রিজটা ভেঙে যায়!  

বলেই নিজের মুখ চেপে ধরল দীপালি। 

--- এ কি অলুক্ষুনে কথা বলে ফেললাম গো! 

---- কিছুই বলা যায় না, সন্ধ্যাবেলায় যেমন পাগলা দেখে আসলাম খালের জল---- সত্যি যদি বাঁধ ভেঙে যায় তবে ছোট্টুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব কেমন করে! 

দুজনেই একসাথে তাকালো ছোট্টুর দিকে। 

---- ওকে হোমিওপ্যাথি ওষুটা খাইয়েছিলি?  

---- কাল থেকে তো ওটাই খাইয়ে যাচ্ছি। 

------ খাওয়ার জল ভরে রাখিস।  কথা ঘোরাল লাট্টু। 

দীপালি  বাসন মেজে হাত মুছতে মুছতে এসে   বলল, ছট্টু ঘুমিয়েছে । 

---- হ্যাঁ মা-ও ঘুমিয়ে পরেছে । পাশে তুইও ঘুমিয়ে নে একটু। তিনটা সারে তিনটা বাজে। লাট্টু পাখার বাতাস করতে করতে বলল।

------ আর তুমি!  তুমি কোথায় ঘুমবে !  ওই ঘরের  চৌকিতে তো জিনিসপত্র স্তুত ।

 ----আমি চালায় উঠব। বৃষ্টি কমে গেছে। গরমও লাগছে । 

---- না না তারচেয়ে তুমি শোও এখানে আর আমি মাটিতে।

---- যা বলছি শোন না।  খুব গরম লাগছে, এখানে আমার ঘুম হবে না।

          প্রানেশ কাকা বাইরে থেকে ডাক দিয়ে বলল, কিরে লাট্টু জিনিসপত্র গোছানো হল?  লাট্টু দরজার কাছে এগিয়ে বলল এই তো হয়েই গেল প্রায়। আমাদের আর কটা জিনিস!  

---- বাঁধের ব্যাপারে শুনেছিস নাকি কিছু!  

----- কই না তো!  কেন তুমি কিছু শুনেছ?  

----- বিকালে শুনছিলাম কয়েক যায়গায় ফাটল ধরেছে।  কি যে অবস্থা ----।  

---- আমাদের গ্রামে তো টিভি দেখে জানার উপায় নেই। সন্ধ্যা বা বিকাল হলে তো ওই পাড়া থেকে জেনে আসা যায় কিন্তু এতো রাতে---।

----- সেই তো! যা আরাম কর গিয়ে। ঘুম তো আর হবে না, যা হোক একটু শুয়ে নে। কি যে আছে কপালে।  আবার সেই অভিশাপটার কথাও ভাবছি। তোর মা কই রে?  

সমবয়সী, সমমনষ্ক মানুষেরর খোঁজে গীতার নাম করলো পানু কাকা।    

তাড়াতাড়ি লাট্টু বলে উঠল ---ঘুমচ্ছে, ঘুমিয়ে গেছে। যাও তুমিও একটু ঘুমিয়ে নাও। 

প্রানেশ কাকা চলে যেতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লাট্টু। বেশ বুঝতে পারছে গ্রামের বয়স্ক মানুষগুলোর মধ্যে একটা চাপা সংশয় কাজ করছে সমান্তরাল ভাবে। ও আর সেটাকে হাওয়া দিতে চায় না।

       টিনের চালে হাতের উপর মাথা দিয়ে শুলো লাট্টু। ক্লান্ত শরীরে ঘুম নেমে এসেছিল কিন্তু কিছুক্ষন পরই একটা আওয়াজে  ভেঙে গেল। আবার মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। দেখল দীপালি উঠে আসছে ছাদে। বলল, উঠনে তো অনেক জল এসে গেছে। নিচ থেকে ডাকছিলাম---। 

------ কি আর করার আছে! 

 দীপালি বসল পাশে। চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।  

লাট্টু বলল ---কেশাই-এর গল্পটা শুনবি?

---- এখন!  বল।

দীপালি নিরুৎসাহেই বলল কিছুটা। ওর মনে এখন বানের ভয়।

লাট্টু শুরু করল।

----- এই গ্রামে তখন রাজার শাসন। রাজার একটাই মাত্র মেয়ে ছিল,  কেশমালা। 

-----কেশমালা!  এ কেমন নাম!  

হ্যাঁ যেমন তার রূপ তেমন তার চুল। চুল নাকি মাটি ছুঁয়ে থাকত। যাই হোক, তো সেই কন্যা পণ করেছিল, যে গ্রামে নদী কেটে আনবে তার সাথেই বিয়ে করবে সে। রাজবীর নামে ছিল এক সুপুরুষ।  চুর্ণি নদী থেকে খাল কেটে নিয়ে এল এই নদী, ভগীরথ-এর মতো। 

----- সেই থেকেই নাম কেশাই নদী! 

---- তারপর আমাদের গ্রামে আর কোন অভাব থাকলো না। উপচে পরল সোনার ফসল। গোলায় যায়গা হত না।  সুখ সমৃদ্ধি ধরে না যেন। 

----- তারপর!  কি যেন একটা অভিশাপের কথা বলে মা!  

---- অভিশাপ!   তোকে বলেনি গল্পটা! 

----- কই!  জিজ্ঞেস করলেই এড়িয়ে যায়। আজ সকালেও  বলছিল, চুর্নির বাঁধ ভেঙে যদি বান আসে তো গ্রাম মুছে যাবে সেই জলে। অভিশাপ কখনো মিথ্যা হয় না। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কিছুতেই মুখে আনতে পারলো না আর কিছু। আতঙ্কে বার বার শুধু কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করছিল।

 গলায় কথা আঁটকে গেল লাট্টুর। ও আসলে সেই গল্পটা বলতে চায়নি দীপালিকে।  আর এখন তো একেবারেই না। তবু দীপালি নাছোড়।  

সুতরাং বলতেই হলো । 

----সুখ কারো চিরকাল সয় না। ওই সেগুনের জঙ্গল আছে যে, সেখানে গজিয়ে উঠেছিল এক ডাকাতের দল। একদিন ওরা হামলা করল। সবার হাতে বিশাল বিশাল তলোয়ার।   রাজার একটা ছোট্ট বাহিনী ছিল। ওদের অবশ্য সৈন্য না বলে পাহারাদার বললেই মানায় বেশি। তাদের নিয়ে রাজবীর প্রবল পরাক্রমে বাধা দিল ওদের। কিন্তু এত গুলো সসস্ত্র ডাকাতের সাথে বেশিক্ষণ পেরে উঠল না। এদের কাছে অস্ত্র বলতে লাঠি আর দু-চারটা বল্লম। তলোয়ার শুধু রাজবীরের হাতে। সেদিন যদি গ্রামের লোক একসাথে বেরিয়ে আসত তাহলে হয়তো---।  ভীতু লোকগুলো দরজা বন্ধ করে বসে থাকল।  নৃশংস ভাবে রাজবীরকে খুন করল ওরা। কেশমালার উপর অত্যাচার করল নির্বিচারে। রাজা বাধা দিতে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পেয়েছিল। তারপর ওরা চলে গেল একসময় । গ্রামের লোক একে একে বেরিয়ে এল। দেখল কেশমালা দুই হাতে রাজবীরের মৃত শরীর টেনে নিয়ে যাচ্ছে নদীর দিকে।  গ্রামের লোক এগিয়ে গেল কিন্তু কেশমালা হাত তুলে থামিয়ে দিল সবাইকে। কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না ওর।   ধংসের সেই নগ্ন রূপ দেখে কেউ এগনোর সাহসও পাচ্ছিল না। আসলে নিজেদের বিবেক ওদের ওখানেই পুঁতে ফেলল যেন। সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া কেশমালার সেই এলোমেলো রক্তে ভেজা চুল আর রক্তাক্ত স্বামীকে টেনে নিয়ে যাওয়া। পেছনে পেছনে শুধু কোন মতে চলেছিল রাজা। মৃত স্বামীকে  টেনে নিয়ে নদীতে নামল রাজকন্যা। তারপর  গলা জলে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাল। বলল,  ছারখার হয়ে যাবে সব, এই নদীর বিধ্বংসী বানে  নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে  জনপদ।  তারপর তলিয়ে গেল ওরা। হঠাৎ করে যেন প্রাণ ফিরে পেল আতংকিত জনতা,  দৌড়ে গিয়ে আছড়ে পরল রাজার পায়ে। দোহাই রাজা, এই অভিশাপ থেকে আমাদের বাঁচান। বারবার আর্তনাদ করতে থাকল ওরা। রাজা তখন নদীতে হাঁটু সমান জলে দাঁড়িয়ে। ঘোর লাগা চোখে ঘরঘর করে কোনমতে বলল, এই গ্রামে একটা লোকেরও যেদিন সাহস হবে, খালি হাতে গোখরো সাপ এই জলে ডুবিয়ে মারার সেদিন এই পাপ খণ্ডন হবে আর অভিশাপ মুক্ত---।  বলতে বলতে কাটা গাছের মত জলে মুখ থুবড়ে পরে গেল আর সাথে সাথেই স্রোতের টানে ভেসে গিয়েছিল।  কারো সৎকার হল না। কারও আত্মা শান্তি পেলো না। 

----- বিশ্বাস করো এই গল্প !

---- কি জানি! প্রায় আশি নব্বই বছর আগের কথা,  সে আমার মায়েরও শোনা গল্প।  যে ভাবে শুনে এসেছি সেভাবেই বললাম। শুনেছি তারপর অনেক সাধু তান্ত্রিক আসে, পূজা পাঠ হয় আর তারপরই ওই চুর্ণি নদীর বাঁধ। বন্যা তো দূরে থাক চুর্ণি নদীই শুকিয়ে গেল প্রায় তো কেশাই আর বাঁচে কোথা থেকে!   লোকে ভুলেই গেল, এমনকি নামটাও। 

---- শুধু বয়স্করা ছাড়া।

 মনে মনে আশ্বস্ত হল লাট্টু, যাক দীপালি অভিশাপের গল্পে ভয় পায়নি। 

----- আজ পূর্নিমা তাই না!  

ওরা দুজনেই তাকিয়ে থাকে শেষ রাতের ঝকঝকে চাঁদের দিকে। একটু একটু করে কালো মেঘ  আশেপাশে ভীড় জমাচ্ছে । লাট্টু এক হাতে বেড় দিয়ে ধরে দীপালিকে। একটা রাতপাখি উড়ে গেলো। 

ছোট্টু উঠে গেছে, আবার কাঁদছে। ওরা নিচে নেমে এলো। এইটুকু সময়ে এতো জল!  উঠন ছাপিয়ে বারান্দায় উঠে গেছে, ঘরেও ঢুকি ঢুকি করছে। গীতা ছোট্টুকে কোলে জাপটে ধরে নিয়ে বসে আছে। বলল, জ্বর তো আবার বাড়ছে রে ছেলেটার । 

দীপালি  বলল---  চল গো ওকে নিয়ে এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না হলে ব্রীজ ভেঙে গেলে---। 

---- পাগোল হলি নাকি!  ব্রীজ কি এখন আছে!  তাছাড়া ওদিকে আরও জল।  আট কিলোমিটার রাস্তা এই জল ঠেলে, আবার মাঝে নদী।  সেও তো ---। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে যেন দম নিয়ে বলল, ----  মনে হয় চুর্ণির বাঁধ ভেঙে গেছে রে। 

শেষের কথাটা  কেমন কেঁপে কেঁপে বেরিয়ে এলো। বৃদ্ধার মুখ সাদা হয়ে গেছে। দীপালির দিকে তাকিয়ে বলল, সকালেই বলছিলাম না, দেখ কত তাড়াতাড়ি জল বাড়ছে! ঠিকই বলছিস।  নিশ্চয় বাঁধ, বাঁধ ভেঙে গেছে।

ছোট্টুর গায়ে হাত দিয়ে মুখ শুকিয়ে গেল দীপালির । লাট্টুর বুকেও কেমন যেন বাতাস কমে আসছে।  বাইরে ঠিক তক্ষুনি   শুরু হলো তুমুল ঝড় বৃষ্টি। হাওয়ার দাপটে লন্ঠন নিভু নিভু । চরাৎ চরাৎ শব্দে বাজ পড়ছে। যেন এক্ষুনি ওদের বাড়িতেই পড়বে। আকাশে আঁকিবুঁকি ভিষণ বিদ্যুৎ  রেখা। হঠাৎ ওদের কথা থেমে গেল। প্রচন্ড ভয় ওদের কিছুক্ষনের জন্য পাথর বানিয়ে দিলো।     চোখ ঝলসানো  সে আলোয় দেখতে পেল চৌকির এক কোণায় মাথা উঁচু করে বসে আছে একটা গোখরো সাপ। ছড়ান ফনায় স্পষ্ট মূর্তিমান আতঙ্ক। তিনজনেরই শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে হিমেল স্রোত। গীতা হঠাৎ ছট্টুকে নামিয়ে রেখে ঝড়ের গতিতে গিয়ে চেপে ধরল গোখরোর মাথা। পাগলের মতো আওরে চলল, তোকে আমি ডুবিয়ে মারব। বিশাল সাপটাও মুহূর্তে মরিয়া। পেঁচিয়ে ধরেছে গীতাকে। গীতা ডান হাতে চেপে ধরেছে ওটার গলা আর বাঁ হাতে চেপে ধরে লেজের দিকটা।  কিন্তু লেজের দিকে ছাড়িয়ে নেয় সাপ নিজেকে। লাট্টু একটা লাঠি তুলে নেয় কিন্তু কোথায় মারবে কি ভাবে মারবে বুঝতে পারছে না। দীপালি একটা বস্তা এনে বলে এতে ঢুকিয়ে দাও, এতে ঢুকিয়ে দাও। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত মাত্র। গীতা সাপটাকে নিয়ে নেমে পরে উঠনে। বলে একে ডুবিয়ে মারবো। বলেই দৌড়াতে থাকে নদীর দিকে। উঠনে কোমরের নিচে জল হলেও  বাড়ি থেকে বেরতেই জলও বাড়তে থাকে।  জল ঠেলে গীতা ছুটছে পেছনে লাট্টু। পাড়ার লোকেরাও বেরিয়ে এসেছে। গীতা হুমড়ি খেয়ে পরে বুক জলে পৌছে। তবু ছেড়ে দেয়নি গোখরোর মাথা। প্রচণ্ড বৃষ্টি, আকাশে যেন আগুনের খেলা চলছে। এমন আকাশ কেউ কখনও দেখেনি। আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে।  স্পষ্ট হয়ে ওঠে   দুজনের তোলপার দৃশ্য।

 তারপর শান্ত হয়ে যায়। অতিরিক্ত শান্ত। কে কোথায় গেল!  পাড়ার লোকেদের টর্চের আলোয় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বৃষ্টি আরও জোরালো হয়ে উঠছে। জলও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

 এখন    চারিদিকে স্থির জলচিত্র। সবার ঘরের ভেতর প্রায় এক মানুষ জল। ধানের ক্ষেত রাস্তা নদী মাঠ সব জলের তলে। চারিদিকে শুধু জল আর জল।  চালার উপর সারাদিন বসে আছে দীপালী আর লাট্টু ছোট্টুকে কোলে নিয়ে। জ্বর এখন অনেকটা কম তাই ঘুমচ্ছে। ওদের মতো অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে চালায়। কে যেন টিনের চালা ভেঙে পড়ে তলিয়ে গেছে জলে।কথাটা ভেসে আসল কানে কিন্তু ভালো বুঝতে পারল না দীপালি।  অনেকে আবার আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে দূরে কোন উঁচু যায়গায়। ভাগ্যিস আর বৃষ্টি হয়নি আজ। কিন্তু গনগনে রোদ আর জলীয়  বাষ্পের মিলমিশে দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। চালার উপর তোষক পেতে প্লাস্টিক টাঙিয়ে ওরা বসে আছে সারাদিন। জল আর বাড়েনি। বিকেলের দিকে এখন মনে হচ্ছে কমছেই বরং কিছুটা। সারাদিন পেটে কিছু পরল না কারও । কাল রাতের ভয়ঙ্কর ঘটনা বারবার পুনরাবৃত্ত হচ্ছে যেন চোখের সামনে। মাঝে মাঝেই লাট্টু ঢুকরে কেঁদে উঠছে।  কাল ওর কোন হুঁশই ছিলনা বলতে গেলে। পাড়ার লোকরাই ওদের জিনিসপত্র সহ ছাদে তুলে দিয়েছে।  দীপালি বলল

------ আমাকে কিছু খেতেই হবে, ছোট্টুর জন্য। কিন্তু কোথায় খাওয়ার! বোতলের জলও প্রায় শেষ হতে চলল। কিছুক্ষণ চুপকরে থেকে আবার বলল---আচ্ছা মা হঠাৎ কেন যে এমন বোকামোটা করল!  আমার তো মনে হয় না গল্পটা সত্যি। আর যদি সত্যিও হয় তো ওই বৃদ্ধ রাজা মরার সময় ঘোরে কি বলেছে সে বিশ্বাসে এতবছর পর মা---। 

---কে জানে কিন্তু আমার মা তো চলে গেল।  মাকে তো আমি আর পাব না। ঢুকরে উঠল আবার লাট্টু

----- তোর মা বলিদান দিয়েছে রে লাট্টু। ওমন করে কাঁদিস না।

নিজেদের চালার উপর থেকে চিৎকার করে বলল প্রানেশ কাকা।  লাট্টু এবার দাঁতে দাঁত পিষে বলল, যত্তসব গাঁজাখুরি গল্প, তারজন্য মা ---।  

         সুর্য ডুবে যাচ্ছে,  পশ্চিম আকাশ লাল করে আর খিদের আগুন জ্বলে উঠেছে সকলের পেটেই ভীষণ ভাবে। একটা বোতলের তলানি জল বাঁচিয়ে রেখেছে ছোট্টুর জন্য। রাজেন মিস্ত্রি চিৎকার করে বলল, দেখলি তো তোদের সরকার   খোজ নিচ্ছে একবারও। বাঁচলাম না মরলাম এত গুলো মানুষ! আসুক ব্যাটা ওই বজ্জাতগুলো ভোট চাইতে। আর মেম্বারটাকে তো দেখলেই সোজা প্যাঁদব আমি। খিদায় তেষ্টায় মরতে বসেছি আমরা।  

সারারাত কি ভাবে যে কাটল কে জানে। সকালে চোখ বন্ধ করে শুয়েই ছিল। দীপালির পেট মুচ়্ড়ে বমি চলে আসছে বারবার। কিসের একটা আওয়াজে তাকিয়ে দেখল গ্রামের ছেলেরা আসছে নৌকা চালিয়ে  আর ওদের সাথে আরও কিছু অচেনা মানুষ। ওদের সবার মাথায় টুপি আর তাতে লেখা “ সমাজবন্ধু “ ওদের সঙ্গে রান্না করা খিচুড়ি,  দুধ, জল, ওষুধ এমনকি জামাকাপড়ও। আনন্দে চোখে জল চলে এল দীপালির।  মানুষ দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে।   



         **



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন