সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বর্ণালী রায়।। পারক গল্পপত্র



খোলা আকাশের নীচে ভোরের শিশির ভেজা ঘাসের উপর শুয়ে আছি সেই থেকে। দলা পাকানো মেঘেরা নীল আকাশে ভেসে ভেসে যাচ্ছে। ছোটবেলায়  খাতায় আঁকা গোল গোল কুণ্ডলী পাকানো সাদা মেঘ। অনেকটা ড্যান্সিং ফ্রকের মতো। রুমি দিদি গতবছর দুর্গা পুজোয় পরেছিল না। ঠিক সেই সেরকম। আমি বললাম “ওমা কি সুন্দর মেঘের মতো ঢেউ খেলানো জামা তোমার রুমিদিদি’’।

রুমি দিদিই তো বললে, এটাকে ড্যান্সিং ফ্রক বলে রে বুঁচি। 

আমার মা যখন রুমিদিদির বাড়িতে কাজ করতে যায়, আমায় সাথে করে নিয়ে যায়। মা বলে, সমত্ত মেয়ে একা রেখে যাবু নি। সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে আমি মার সাথে রুমি দিদিদের বাড়ি যাই। এখন আমার বয়স তেরো-চোদ্দ হবে। রুমি দিদি খুব ভালো। ও আমাকে ওর সব পুরানো জামা, সাজগোজের জিনিস দেয়, সিনেমা দেখায়। রুমি দিদি খুব ভালো গান গায়, নাচ করে। ও বলে জানিস বুঁচি, আমি না বড়ো হয়ে হিরোইন হব। 

আমি গান গাইতে পারি না। কিন্তু সন্ধে বেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, বাবা মদ খেয়ে মাকে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যায়। আমি তখন রুমি দিদির পুরানো জামা, জুতো পরে, মুক্তোর মালা গলায় বাবার রিক্সার সিটে বসে-দাঁড়িয়ে নেচে গেয়ে উঠি। মনীষা কৈরালাকে আমার দারুন লাগে। 

‘আজ ম্যায় উপর 

আসমা নীচে...’ কি দারুন গান তাই না ? 

রুমি দিদির সাথে সাথে আমিও স্বপ্ন দেখি হিরোইন হবার। 

সেদিন রুমি দিদি জিজ্ঞাসা করেছিল, “আচ্ছা তোর নাম বুঁচি কেন ?” 

আজও আমি ঘাসের বিছানায় শ্রান্ত, শান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছি, সত্যিই তো মা কেন অমন বিচ্ছিরি নাম দিল। সে যাকগে হিরোইন হলে নামটা বদলে দেব। 

কী নাম রাখবি তবে ? 

আমি বললাম কেন মনীষা। রুমি দিদি হা হা করে হেসে উঠল। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। 

একদিন রুমি দিদি একটা সাদা খাম আমার হাতে দিয়ে বলল তিনটে বাড়ি পরে গলির মোড়ে রাজু দাদা দাঁড়িয়ে আছে, ছুট্টে গিয়ে ওর হাতে খামটা দিয়ে আসতে। রাজু দাদা শুনেছি মস্ত গায়ক হয়েছে। টিভিতেও দেখেছি। ঐ যে গো রাতের বেলা হয় না, অনেকে গান গায়। তারপর যারা ভালো তারা থেকে যায়, বাকিরা বাদ পড়ে যায়। সেই সেবার টিভিতে গান গেয়ে,খুব নাম করেছে রাজু দাদা। মস্ত নাম ডাক পাড়ায়। পাড়ার পুজোয় সে কী সুন্দর বাজনা বাজিয়ে নেচে নেচে গান গাইল। আমার তো হেব্বি লেগেছিল। কী সুন্দর দেখতে রাজুদাদাকে। ঠিক যেন রাজপুত্তুর। 

সেই রাজু দাদার হাতে খামটা তুলে দিলুম। হাতের ছোঁয়ায় কেমন যেন ছ্যাঁকা লাগল বুকে। আমার হাত থেকে খামটা নিয়ে রাজু দাদা হেসে বাইক নিয়ে চলে গেল। 

আমি সেদিন সন্ধে বেলা আরো সাজলাম। খুব নাচলাম। 

বাহোকে দরমিয়া 

দো প্যায়ার মিল রহে হ্যায়...’ 

সেদিন থেকে প্রায়ই সাদা খাম, লাল খাম, হলুদ খাম আমি রাজু দাদাকে পৌঁছে দিতে যেতাম। একদিন হঠাৎ হাত থেকে খামটা নিয়ে রাজুদাদা আমার দিকে চেয়ে বলল, ‘তোর নাম কী রে ? 

আমার যেন মনে হল, পৃথিবীর সবটা আমার হাতের মুঠোয়। বুঁচি নামটা মুখি দিয়ে বলতে গিয়েও বললাম মনিষা।

মনিষা ! বাঃ সুন্দর নাম। Good girl। 

সেদিন ছুটে এসে ছাদের কোনায় বসে আছি। নিঃশাস পড়ছে জোড়ে জোড়ে, আর খালি ভাবছি রাজুদার গুড গার্ল। 

কিন্তু মানে কী এটার। 

বুচি বুচি ! কী রে এখানে বসে আছিস, রুমি দিদি উপরে উঠে এসেছে। এখানে বসে আছিস কেন? দিয়েছিস রাজুকে খামটা ? 

হ্যা দিয়েছি গো। 

আচ্ছা আমি নিচে যাচ্ছি। 

তুইও আয়। 

রুমি দিদি ও রুমি দিদি 

কি বল ? 

গুড গার্ল মানে কী গো ?

কেন তোর কী দরকার ? কে বললো তোকে গুড গার্ল?

বল না গো? 

ভালো মেয়ে। 

ও মা তাই, আবার লাল হয়ে উঠলাম লজ্জায় । 

কে বলেছে তোকে গুড গার্ল ? 

আমি তো কিছুতেই বলব না। 

অনেক চাপাচাপিতে বললাম রাজুদাদা। রুমি দিদি কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। 

তারপর অনেক দিন খাম পৌঁছাতে যেতে হয় নি। একদিন সন্ধে বেলা আমি বাবার রিক্সার সিটে রোজগার মতো সেজেগুজে বসে গান গাইছি। নাচছি, দেখি একটা বাইক এসে থামল আমাদের ঝুপড়ির পাশে। 

ও মা রাজু দাদা। আমি তো অবাক। কী করব আর করব না ভাবছি। 

রাজুদাদা ইশারায় আমায় ডাকল। আমার বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল। আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। রাজু দাদা আমার হাতে একটা খাম দিয়ে বলল এটা রুমিকে দিয়ে দিও। 

আমি খাম হাতে ফেরত আসছি। পিছন থেকে রাজু দাদা বলল, এই মনিষা খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায়'। 

আমার যেন পায়ের নীচে মাটি সরে গেল। আমি ছুট্টে ঘরে ঢুকে গেলাম। আজও ভাবছি আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে রূপ, লাবণ্য কেন আমার এত বেশী। হয়তো রুমিদিদির থেকেও বেশি। 

গত সপ্তাহে গল্প করতে করতে রুমি দিদি আমায় বলল হ্যারে রাজুকে তোর কেমন লাগে ? 

আমি বুঝতে না পেরে বললাম হেব্বি লাগে। বিয়ে করলে ওকেই করব। আমাকেও হেব্বি লাইন মারে গো রুমিদিদি। 

আমি খেয়াল করিনি রুমি দিদির চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। আমার গালে সপাটে একটা চকষালো।

মাও খুব বকেছে আমায়। মার এত দিনের কাজটা বোধহয় চলে যাবে। রুমি দিদি যে বড়মাকে বলেছে আমি ওর সাজের জিনিস চুরি করি। কিন্তু তোমরা বিশ্বাস করো আমি কিছু চুরি করি নি। 

দুই সন্ধা মা কেঁদেছে শুধু। গতকাল রাতে আমি বাবার রিক্সায় বসে কাঁদছি। হঠাৎ একটা আলো। গাড়ি এসে থামলো একটা। একি রাজু দাদা এসেছে। আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেছি। গাড়িতে ওঠো মনীষা কথা আছে।

আমি অবাক হয়ে চেয়ে আছি ওর মুখের দিকে। 

হাত ধরে তুলে দিল গাড়িতে। গাড়ি ঘুরিয়ে মেন রোড, তারপর হাই রোড ধরে গাড়ি চলছে। রাতের রাস্তা তবুও ভয় লাগছেনা আমার। আমি তো ভালোবাসি রাজু দাদাকে। রাজু দাদাও বাসে। 

এমা দাদা বলছি কেন ? 

রাজু। হ্যাঁ, রাজু।

নইলে এল কেন আমায় নিতে। রুমি দিদি যা করেছে আমার সাথে, মার সাথে, রাজুরও ভালো লাগে নি নিশ্চই। তাই তো আমায় নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে, আমার সব কথা শুনতে এসেছে। 

গাড়িটা এসে থেমেছে একটা ধান ক্ষেতের পাশে। দরজা খুলে রাজু বেড়িয়ে এল। হ্যাঁচকা টানে আমাকে টেনে বেড় করে ধানক্ষেতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। টান মেরে আমার গায়ের জামা প্যান্ট ছিঁড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একি ! একি করছে তুমি ! আমার মুখটা পিছন থেকে আরো দুজন লোক একটা কাপড় দিয়ে বেঁধে দিল। আমার ভালোবাসাকে দুমড়ে মুষড়ে ফালাফালা করে রাজু ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে। 

এবার ঐ অন্য লোক দুটো। রাত পেরিয়ে প্রায় ভোর।আমার ভালোবাসার পুরষ্কার,আমার স্পর্ধার ইনাম।আমি যে ঝি এর মেয়ে।আমার স্বপ্ন দেখাও মানা।তাই তো বলল রাজু দাদা মদের বোতলের কাঁচ টা পেটে ঢোকানোর সময়। 

আমি চোখ মেলে আছি আকাশের দিকে কত তারা সারা আকাশ জুড়ে। আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। রক্তাভ লাল,কমলা,ধূসর, নীল, লাল, সাদা, পেঁজা পেঁজা মেঘ উড়ছে আকাশে। মনীষা ভেসে বেড়াচ্ছে সেই মেঘের জামা পড়ে। আর বুঁচির নিথর দেহ ধান ক্ষেতে রক্তস্নাত হয়ে পড়ে আছে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন