শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কাজল সেন।। পারক গল্পপত্র



বদখ্‌ত এই রাস্তাটা চলে গেছে অনেকদূর। কতদূর? কোথায়? না, এসব কখনই  ভাবেনি দীপ্যমান। ভাবার কথা তার ভাবনাতেই আসেনি। বরং যখনই সে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে, রাস্তা তাকে গ্রহণ করেছে, আপন করে নিয়েছে। আর যখন সে চলা  শুরু করেছে, রাস্তা তাকে নির্বিবাদে সঙ্গদান করেছে। দীপ্যমান হেঁটেছে। তন্ময় হয়ে হেঁটেছে।


আর এইভাবেই একদিন হাঁটতে হাঁটতে দীপ্যমান যখন অনেকটা দূরে বর্ষায় ভরাট  কোনো এক নদীর উন্মুক্ত উত্থিত বুকের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল, তখন সে ছিল সেই নদীর ঢিলেঢালা সেতুর ওপর। দীপ্যমান স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল নদীর উদ্ধত যৌবন। দেখছিল নদীর ফুলে ফেঁপে ওঠা উন্মত্ত রূপ। আর ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল তার মা। দীপ্যমান ভাবতেও পারেনি যে মা ঠিক এখানেই তার জন্য প্রতীক্ষায় থাকবে। বলেছিল, ‘আরে তুমি! কতক্ষণ?’ মা হেসেছিল, ‘দূর পাগলা, কতক্ষণ আবার কী! সন্তান ঘরের বাইরে থাকলে মায়েরা সারাক্ষণই অপেক্ষায় থাকে’। মায়ের হাসি দেখে দীপ্যমানও হেসেছিল, তবে সেটা ক্যাবলার হাসি। পাল্টা কোনো কিছু বলার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। শুধু তার অল্প অল্প মনে পড়ছিল, অনেক বড় বয়স পর্যন্ত সে তার মায়ের স্তনে হামলে পড়ে থাকত। মায়ের আঁটসাঁট শরীরে বিশাল দুই স্তনের সম্ভার, আর তার অন্দরমহলে দুধের পর্যাপ্ত ভাঁড়ার। স্তনে মুখ ডুবিয়ে সে চারপাশের জগতটাকে বেমালুম ভুলে যেত। যেন এমনই এক বর্ষায় মায়ের ভরাট নদীর উন্মুক্ত উত্থিত বুক থেকে উপচে বেরিয়ে আসত অমৃতরসের ধারা। দীপ্যমানের এই ছেলেমানুষী কান্ড দেখে সবাই হাসাহাসি করত। বলত, বয়স অনেক তো হলো, এবার মা’কে রেহাই দে বাবা! কিন্তু মায়ের কোনো বিকার ছিল না। মা শুধু হাসত। দীপ্যমান কান্নাকাটি করলেই তার মুখে গুঁজে দিত স্তনের বোঁটা। 


মা বলল, ‘কী রে, মনে পড়ে তোর, ছেলেবেলায় মাই খাবার কথা? কী যে নেশা  ছিল তোর! উঃ, আমার বুক চুষে চুষে একেবারে ছিবড়ে করে দিতিস! তা হ্যাঁ রে,  এখনও ইচ্ছে করে নাকি তোর?’ দীপ্যমান মায়ের কথায় লজ্জা পেল। বলল, ‘ধ্যাত, কী যে তুমি বল না মা! আমি এখনও বাচ্চা আছি নাকি!’ মা বলল, ‘অনেক বড় হয়ে গেছিস, তাই না রে! কিন্তু জেনে রাখিস, মায়ের কাছে তুই এখনও বাচ্চাই আছিস। বুড়ো হলেও তাইই থাকবি’।  


দীপ্যমান বলতে গেছিল, ‘মা, তোমার বুকের দুধ খাবার বয়স আমি সত্যি সত্যিই অনেকদিন আগেই পেরিয়ে এসেছি। তাই এখন আর তোমার স্তন নয়, বরং তোমার স্তনের স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার মনে। থাকবেও চিরদিন। আসলে কী জানো মা, বড় হয়ে আমার অন্য কোনো নারীর স্তনের খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। যা আমাকে  অকাতরে দান করেছিল আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীনি-বান্ধবী অলক্তিকা। হ্যাঁ মা,  তুমি তো জানো যে, ঠিক তোমারই মতো বিশাল আকারের ছিল অলক্তিকার দুই স্তন। সুঠাম। তরতাজা। তোমার মতোই অলক্তিকাও কখনও আমাকে নিরাশ  করেনি তার স্তনে মুখ রাখতে। কিন্তু জানো তো মা, আমি যখনই অলক্তিকার স্তনের বোঁটায়  মুখ রেখে আকর্ষণ করেছি, একফোঁটাও অমৃতরসের ধারা বেরিয়ে আসেনি তোমার  মতো। আর তখন খুব  অসহায় লাগত নিজেকে। বুকটা টনটন করে উঠত। মনে হতো, দৌড়ে চলে যাই তোমার কাছে। তোমার বুকে মুখ লুকোই সেই ছেলেবেলার মতো। 


কিন্তু এসব কথা কিছুই বলা হলো না, কেননা ঠিক তখনই হাল্কা পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এসে দাঁড়াল অলক্তিকা। দীপ্যমান অবাক। একী কান্ড! অলক্তিকার কথা মনে পড়তেই অলক্তিকা এসে উপস্থিত! ও জানল কী করে যে, দীপ্যমান এখানে দাঁড়িয়ে আছে! অলক্তিকা বলল, ‘কী ব্যাপার, এই মাঝদুপুরে তুই এখানে? কোনো কাজে এসেছিস?’ দীপ্যমান থতমত খেয়ে বলল, ‘না ঠিক তা নয়, আসলে আমি তো কোনো কাজের জন্য কোথাও বের হই না, এমনি এমনিই রাস্তায় হেঁটে বেড়াই। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানিস, আজ হঠাৎ মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমি তো ভাবতেই পারিনি মা আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে! কত দিন পরে যে দেখা হলো মায়ের সঙ্গে! আবার তোর সঙ্গেও এখানেই দেখা হয়ে গেল কেমন! অনেকদিন পর আমাদের দেখা হলো, তাই না রে? মায়ের সঙ্গেও তোর দেখা হয়ে যাবে। দাঁড়া, মা’কে ডাকি!’ 


দীপ্যমান ঘুরে মা’কে ডাকতে গিয়ে দেখল, মা তখন হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে  চলে গেছে। অলক্তিকাও দেখল। হতাশ হলো দীপ্যমান। মা কেন এভাবে চলে গেল? অলক্তিকা ব্যাজার মুখে বলল, ‘তোর মা নিশ্চয়ই আমাকে আসতে দেখে চলে গেল!’ কথাটা ভাল লাগল না দীপ্যমানের। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘না, তা কেন! তোকে দেখে  মা কেন চলে যাবে? তোকে তো আমার মা পছন্দ করত, ভালোবাসত!’ অলক্তিকা মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, খুব জানা আছে আমার! ভালোবাসত! কচু ভালোবাসত! আমাকে একেবারেই পছন্দ করত না তোর মা’। দীপ্যমান অলক্তিকাকে শান্ত করতে বলল, ‘না না, তুই এভাবে বলিস না! তুই তো আমার সত্যি সত্যিই খুব আপনজন। মনের মানুষ। মা তো সেকথা জানত!’ অলক্তিকা আরও ক্ষেপে গেল, ‘তুই না বুঝতে  পারিস, কিন্তু আমি তো বুঝি! আসলে বিয়ে না করে আমাদের একসঙ্গে থাকাটা  তোর মা কখনই পছন্দ করেনি, মেনে নিতে পারেনি, বুঝলি!’ দীপ্যমান এবার শান্ত স্বরে বলল, ‘আজ এসব কথা আবার কেন তুলছিস অলক্তিকা? সেসব তো কবেই চুকেবুকে গেছে!’ দীপ্যমানের কথায় কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকল অলক্তিকা। তার মুখে  যেন আঁধার নেমে এলো। তারপর অতিকষ্টে ফিসফিস করে বলল, ‘বুঝলি দীপ্যমান, সবই কপাল আমার! সাত সাতটা বছর আমরা একই ঘরে একই বিছানায় শুয়েছি। তুই নিজেই বল, তুই কী কম চেষ্টা করেছিলি! তুই তো রীতিমতো পাগলা হয়ে গেছিলি, যেন আমার জরায়ুতে নতুন প্রাণ আসে। আর আমার দুই স্তন টইটম্বুর হয়ে ওঠে দুধে। আমার অবশ্য এ ব্যাপারে একটু আপত্তিই ছিল। এত তাড়াতাড়ি সন্তানের দায়িত্ব আমি নিতে চাইনি। বরং আরও কিছুদিন এভাবেই জীবনটা ভোগ করতে চেয়েছিলাম। আর তুইই বল দীপ্যমান, আমি তো নিজের শরীর মন সব কিছু উজাড়  করে দিয়েছিলাম তোকে! কোনো আড়াল রাখিনি। আমিও খুব নিবিড় ভাবে তোকে  আঁকড়ে ধরেছিলাম। আর তাই বুঝেছিলাম, তুই শুধুমাত্র আমার স্তন ও যোনিতে সন্তুষ্ট হতে পারিসনি, বরং যোনির গভীরে নতুন প্রাণ আর স্তনের অন্তরমহলে দুধের যোগান চেয়েছিলি। কিন্তু আমি তোকে কিছুই দিতে পারিনি। তুই খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলি। মায়ের কথা মনে পড়ত তোর। কিন্তু মায়ের দুধই বা তুই আর পাবি  কোথায়! সব তো কবেই শুকিয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে!’  


দীপ্যমানের মনে হলো, অলক্তিকা ঠিক কথাই বলছে। তাদের লিভ ইন ব্যাপারটায় সত্যিই আপত্তি ছিল মায়ের। তবে মনে দুঃখও ছিল খুব। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মেই মায়ের স্তনে দুধের যোগান বন্ধ হয়ে গেছিল অনেকদিন আগে। অথচ  অলক্তিকা তার স্তনে সংগ্রহ করতে পারেনি একফোঁটাও দুধ। আসলে মৃত্যুর আগে সন্তানের সন্তানকে দেখার বেজায় শখ ছিল মায়ের।   


দীপ্যমান আর কথা বাড়ালো না। কথা বাড়িয়ে কী লাভ! অলক্তিকা বলল, ‘তা অনেকদিন পরে তোর সঙ্গে মায়ের দেখা হলো। খুব ভালো লাগল, তাই না রে? কী বলল মা? নিশ্চয়ই তোকে দুধ খাবার কথাও বলল!’ 

দীপ্যমান বলল, ‘হ্যাঁ, তা বলছিল বই কি! মায়ের মন তো!’ অলক্তিকা বিষণ্ন হলো দীপ্যমানের কথায়। বলল, ‘হ্যাঁ, সে তো ঠিকই। জীবনে মায়ের অনুপস্থিতি খুবই বেদনাদায়ক। মা যা যা দিতে পারে, আর কি কেউ তা দিতে পারে? পারে না। কিন্তু জানিস, আমার কষ্টটা আরও তীব্র, আরও অসহনীয়। এবং সেটা তোর জন্য  দীপ্যমান! তুই নিশ্চয়ই আমার কথা বুঝতে পারছিস। মা’কে তুই আগেই হারিয়েছিস। আমিও আর থাকতে পারলাম না। আমি বেঁচে থাকলে তোকে অন্তত এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হতো না রে!’       

  

৮টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগল,একটা নতুন তুলনাত্মক দৃষ্টি ।

    উত্তরমুছুন
  2. সমাপ্তি টা অসাধারণ! টানটান গল্প ।দারুণ!

    উত্তরমুছুন