বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অংশু প্রতিম দে।। পারক গল্পপত্র



-“তুই যাবি?” জানতে চাইছে রাজাদা। বাপনের পরেই রাজাদার লাইন। বাপন না গেলে রাজাদা প্যাসেঞ্জার তুলবে।

-“যাবো না কেন?” বাপনের কথাতে ঝাঁজ স্পষ্ট। 

-“তাহলে লোক তোল গাড়ীতে। টেম্পার নেওয়ার কী আছে!” বাপনের একটু খারাপই লাগছিলো। রাজাদাকে এভাবে বলাটা ঠিক হল না। স্ট্যাণ্ডের গুটি কয়েক ভালো মানুষের মধ্যে রাজাদা অন্যতম। 

অফিস টাইমে অটো ভরে উঠতে সময় লাগে না। বাপনের পাশের সীটে একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা বসেছেন। বাপনের বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরোনোর সাথে সাথে মনে পড়ল কয়েক মাস আগের এক সকালের কথা।

-“আরে, কণিষ্ক না!” বাপন অবাক! ডানলপ-নোয়াপাড়া রুটের অটো ড্রাইভার বাপনের যে কণিষ্ক নামটা আছে সেটা ও নিজেও ভুলে গেছিল! অফিস টাইমে প্যাসেঞ্জারের অপেক্ষায় ডানলপ স্ট্যাণ্ডে বসে থাকা বাপনকে চিনতে পেরে ওই নামে ডেকেছিল ঋতিকা। 

ঋতিকা! কলেজের দিনগুলোয় বহুজনের হার্টথ্রব। ঋতিকাকে প্রপোজ করতে গিয়ে অনেকেই মুখ পুড়িয়েছিল। কেউ কেউ ছিল সাইলেন্ট প্রেমিক। যেমন কণিষ্ক ওরফে বাপন। তবে বাপন যে দুবছর কলেজ করেছিল ঋতিকার সাথে কথাবার্তা হত। বাবার হঠাৎ মৃত্যুর জন্য কলেজ মাঝপথেই ছেড়ে দিয়ে বাপন রুজি-রোজগারের ধান্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কঠোর বাস্তবের জমিতে তখন প্রেম হাওয়া।  

এতদিন বাদে এরকম একটা পরিস্থিতিতে ঋতিকা বাপনকে চিনতে পেরেছে শুধু না, ওর সাথে সেই কলেজের বন্ধুর মতই ব্যবহার করছিল। সেদিন অটোয় যেতে যেতে ঋতিকা জানালো প্রতিদিন ও নোয়াপাড়া থেকে নেতাজীভবন যাতায়াত করে। ভবানীপুরে ঋতিকার অফিস কটায় শুরু, ছুটি কটায় সব জেনে গেল বাপন। ভালো লাগছিল বাপনের। সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় নোয়াপাড়ায় নেমে ঋতিকা অটো স্ট্যাণ্ডে দেখল কণিষ্ক অটো নিয়ে অপেক্ষা করছে। ঋতিকা উঠতেই আর কোনো প্যাসেঞ্জার না তুলেই ছেড়ে দিয়েছিল অটো।

সেই থেকে প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে বাপন শুধুমাত্র একজন সওয়ারি নিয়েই এক ট্রিপ মারত। সকালে ঋতিকা স্ট্যাণ্ডে না আসা অব্ধি বাপন লাইন ছেড়ে দিত বাকিদের। বাকি অটোচালকদের কাছে চোখে লাগছিল ব্যাপারটা। এই নিয়ে বাপনের পেছনে লাগতেও ছাড়েনি তারা। তবে বাপনের হাবভাব দেখে ধীরে ধীরে বুঝে গেছিল বাপন সীরিয়াস। কিন্তু সীরিয়াস হয়ে কী হল?

কলেজে চঞ্চলের সাথে স্টেডি অ্যাফেয়ার ছিল ঋতিকার। ওদের থেকে এক ব্যাচ সীনিয়ার। কলেজের টপার আর প্রচণ্ড কেরিয়ারিস্টিক ছেলে চঞ্চল। দেখতেও বেশ হ্যাণ্ডসাম। ঋতিকা আর চঞ্চল যেন রাজযোটক। একেবারে মেইড ফর ইচ আদার! কলেজের সবাই জানতো চঞ্চলের সাথেই বাকি জীবনটা কাটাতে চলেছে ঋতিকা। 

কলেজের পাট চুকিয়ে দেশের বাইরে পড়তে চলে গেল চঞ্চল। এদিকে কণিষ্কও পার্ট ওয়ানের পরে কলেজ ছেড়ে দিয়েছে। কলেজ সংক্রান্ত আর কোনো খবর না পেলেও চঞ্চল ঋতিকার লাভস্টোরির দি-এণ্ড হয়ে যাওয়ার খবরটা কণিষ্ক জেনেছিল। শুনেছিল চঞ্চল বাইরেই সেটল্‌ড হয়ে গেছে।  

ঋতিকার জীবনে একজন অটোচালকের যে কোনো জায়গা থাকতে পারে না সেটা বোঝে বাপন। তাও কেন জানে না অফিসের দিনগুলোয় দুবার ঋতিকার ক্ষণিকের সান্নিধ্য পাওয়াই বাপনের কাছে মোক্ষ হয়ে উঠেছিল। ঋতিকাও যে ওর সঙ্গ উপভোগ করত সেটা বাপন ফীল করত। কয়েকদিন শুধু ওকে নিয়ে বাপনের অটো ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ঋতিকা পেছনের সীটে না বসে বাপনের পাশেই বসত। খুশী হলেও ঋতিকার শরীরের স্পর্শ এড়িয়ে বেশ আড়ষ্ঠ হয়েই অটো চালাতো বাপন। ঋতিকা বেশ মজা পেত। বাপনের দিকে একটু সরেই বসত ইচ্ছে করে। ঋতিকার বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে ক্রমে জড়তা কাটছিল বাপনের। 

এক ট্রিপ প্যাসেঞ্জার নোয়াপাড়ায় নামিয়ে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল বাপন। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে আজ। বাড়ী থেকে চা খেয়ে বেরোনোর সময় ছিল না। টুং-টাং শব্দে বাপন বুঝলো ওর স্মার্ট-ফোনে মেসেজ ঢুকছে একে একে। কলেজের বন্ধুদের একটা গ্রুপ আছে। সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় মেসেজ চালাচালি। বাপনের এসবের বালাই ছিল না কোনোকালেই। পয়সা জমিয়ে শখ করে স্মার্ট-ফোন কিনেছিল একটা। টুকটাক ফটো তোলা, দুর্গাপুজোর ভাসানের ভিডিও করা, ব্যস ওই অব্ধিই দৌড় ছিল! ঋতিকাই ওর ফোনে ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ চালু করে দিয়েছিল। তারপরে ওর নাম্বারটা কলেজের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে ঋতিকাই জুড়ে নিয়েছিল।  

-“অটো চালানোর কাজকে আমি ছোট বলে মনে করি না। তবে গ্রুপে সবার মানসিকতা তো সমান নয়। সবাইকে অত ডিটেলসে বলার দরকার নেই তুই কী করিস। বিজনেস করিস, ব্যস ওইটুকুই বলবি।” ঋতিকা গ্রুপের বাকি বন্ধুদের জানিয়েছিল যে কণিষ্ক ব্যবসা করে। পরে ওকে এভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল। কণিষ্ক মেনে নিয়েছিল ঋতিকার কথা।  

-“ওয় আশিক! কী এত দেখছিস মন দিয়ে, দেখি।” প্যাসেঞ্জারের চাপ কম থাকে দুপুরের দিকে। অটোয় বসে মোবাইল ঘাঁটছিল বাপন। কলেজের গ্রুপে চুপচাপ থাকলেও মেসেজগুলো পড়ে। গ্রুপে হঠাৎ ধূমকেতুর মত আবির্ভাব ঘটেছে চঞ্চলের। দেশে ফিরে এসে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেছে, ঋতিকার সাথেও। গ্রুপে ঋতিকাই চঞ্চলকে অ্যাড করেছে। চঞ্চলের সাথে ঋতিকার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে জোর আলোচনা। চঞ্চল আর ঋতিকার পুরোনো কেমিস্ট্রি ফের সক্রিয় হয়ে উঠলেও কণিষ্কর মন মানতে চায় না! ও শুনেছিল কেরিয়ারের সুবিধার জন্য চঞ্চল এক মার্কিন মহিলাকে বিয়ে করেছিল। বর্তমানে চঞ্চল ডিভোর্সি। ঋতিকাকে পেতে চাইছে আগের মত। কিন্তু কণিষ্ক বুঝতে পারছে না ঋতিকা কি করে চঞ্চলকে মেনে নিচ্ছে!  

-“ওহো, দিলরুবার ছবি দেখছিস।” কথাটা বলে বাপনের হাত থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিল রিচা। ছবিই দেখছিল বাপন। গ্রুপে ছবি দিয়েছে ঋতিকা। চঞ্চলের সাথে কাপ্‌ল ছবি। মাঝেমধ্যেই দিচ্ছে এখন। সেইসব ছবি দেখলে বাপনের বুকের ভেতর থেকে একটা দলা পাকানো কষ্ট ঠেলে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে দিয়ে। 

রিচা কলগার্ল। ডানলপ চত্বর ওর চৌহদ্দি। বরানগর রেল স্টেশনের কাছাকাছি সায়রাবিবির ঠেকে রিচার খুব ডিমাণ্ড। প্রদীপের সাথে বাপন একবার সেখানে গিয়েছিল। অনেক নেশা করে নেশার ঝোঁকেই প্রদীপের সাথ ধরেছিল। প্রদীপ ওইসব জায়গার রেগুলার কাস্টমার। ঝোঁকের মাথায় চলে গেলেও বাপন সারি সারি দাঁড়ানো মেয়েদের সামনে জড়সড় হয়ে বসেছিল আর জুলজুল করে তাকাচ্ছিল সবার দিকে। রিচার শরীরে বাপনের নজর একটু বেশীই ঘুরছিল। বাপন আর চয়েস করবে কি! রিচাই ওকে ডেকে নিয়েছিল নিজের ঘরে সেদিন।  

-“ফোনটা দে,” রিচার ওভাবে ফোন কেড়ে নেওয়া ভালো লাগেনি বাপনের। কড়া ভাষায় আরো কিছু বলতে গিয়েও রিচার মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল বাপন। গম্ভীর মুখে ভুরু কুঁচকে বাপনের মোবাইলের স্ক্রীনে ঋতিকা আর চঞ্চলের ছবিটা দেখছে রিচা।

(২)

-“বাব্বা! এতদিনে ফোন করলি তাহলে,” কণিষ্কর ফোন পেয়ে বাবলি বেশ উচ্ছ্বসিত। কলেজের বন্ধুদের মধ্যে বাবলির পি-আর প্রচণ্ড রকমের ভালো। গ্রুপের সবার সাথেই ফোন আর পার্সোনাল চ্যাটের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখে চলে। সকলের হাঁড়ির খবরও কমবেশী থাকে বাবলির কাছে। ঋতিকার সাথে কণিষ্কর নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সময়েই বন্ধুমহলে চঞ্চলের এইরকম আবির্ভাব কূ ডাকছিল কণিষ্কর মনে। 

কিছুদিন ধরে ঋতিকার দেখাও পাচ্ছে না। ঋতিকা অটো ধরতে আসে না ডানলপের স্ট্যাণ্ডে। কেন আসছে না ফোন করে ঋতিকার কাছে সেটা জানতে চাওয়ার সাহস কণিষ্ক জোটাতে পারেনি। এদিকে মনের অস্থিরতাও কাটছে না। বরানগর স্ট্যাণ্ডের প্রদীপের কাছেই একদিন শুনলো, ঋতিকা একজনের গাড়ীতে করে নাকি অফিসে যাচ্ছে আজকাল। লেকের মুখোমুখি বিল্ডিং কমপ্লেক্সে একজন থাকতে এসেছে কিছুদিন হল। গাড়ীতে করে অফিসে যাওয়ার সময় সেই ভদ্রলোক ঋতিকাকে বরানগর স্টপ থেকে তুলে নেয়। একদিন বাপন বরানগর স্টপ অন্ধি গিয়ে দেখে এসেছে। সন্দেহ তো একটা হচ্ছিলই। সেদিনের পরে সেটা দূর হল। গাড়ীর চালকের আসনে চঞ্চল বসে আছে। চঞ্চলের পাশে বসে ঋতিকাকে চলে যেতে দেখে বাপনের মনে হচ্ছিল ওর ভেতরটা কেউ গুঁড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। প্রদীপদের সাথে ওর দারু খেতে বসা সেইদিনই প্রথম। সেদিনই রিচার ঘরে প্রথমবার ঢুকেছিল বাপন। পরেরদিন বাবলিকে ফোন করেছিল সে। চঞ্চল আর ঋতিকার সম্পর্কের আপডেট জানতে চাইলে অনর্গল বকে গেছিল বাবলি। 

-“আর বলিস না! ঋতির কোনো আক্কেল আছে? ওই ডিভোর্সি চঞ্চল ছাড়া কি ওর গতি নেই? নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য চঞ্চল তো একবার ঋতিকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। ফরেনারের সাথে জমেনি বেশিদিন, ফিরে এসে ঋতিকে ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের দুখ্‌রা শুনিয়েছে! ব্যস ঋতির কাছে সব মাফ।” 

-“ঋতিকা চঞ্চলকে বিয়ে করবে নাকি?” যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল কণিষ্কর গলায়। 

-“জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঋতিকে। অত খুলে আমাকে কিছু বলেনি। তবে ঋতির হাবভাব দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কি কাণ্ড বল দেখি!”

কিছুই না আবার হয়ত অনেক কিছু! বাপন নিজেকেই বুঝতে পারে না। ঋতিকা জীবনে যাই করুক তাতে বাপনের কিছুই বলার থাকতে পারে না। তবু সেদিন বাবলির সাথে কথা বলার পর থেকেই ওর মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। চঞ্চলের সাথে ঋতিকার সম্পর্কটা আবার আগের মত হয়ে যাচ্ছে ভাবলেই খুব কষ্ট হচ্ছে কণিষ্কর। যদিও ঋতিকা তো ওর কোনোদিনই হবে না, তাহলে!

-“আবে, এ ফান্টুস তোর জানেমনের সাথে পোজ দিচ্ছে কেন?” বাপনের মোবাইলের পর্দায় চঞ্চল আর ঋতিকার যুগল ছবিটা দেখে বলে ওঠে রিচা। 

-“হবু বর তো বৌয়ের সাথে পোজ দিয়ে ছবি তুলবেই। এতে আশ্চর্যের কী আছে?” গলা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে কথা বলছে বাপন।

-“কিছুই না। হবু বরটা এক নম্বরের ঢ্যামনা কিনা তাই জানতে চাইছি!”

-“কেন? চঞ্চল কী করেছে?” 

-“বলব। তার আগে বল তুই শুধু আমাকে নিয়ে যাবি এই ট্রিপে!” কথাটা শুনে রিচার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বাপন। ডানলপ চত্বরের রাতের রাণী রিচার চোখে আকূতি। রিচা চাইছে অন্তত একটিবার ঋতিকার মত ওকেও শুধু প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলুক বাপন। একটুখানি তো চাহিদা! বাপন রাজী হয়ে গেল। অটোতে বাপনের পাশে বসে যেতে যেতে রিচা অনেক কথাই বলল। চোয়াল শক্ত করে শুনছিল বাপন। সেইসাথে মনের সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে বাপন কিছু করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হচ্ছিল।


(৩)

দিন কয়েক পরের কথা। সন্ধ্যে ছটা নাগাদ নোয়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের এক্সিট দিয়ে বেরিয়ে ঋতিকা বনহুগলি যাওয়ার অটো ধরল। আজ সকাল থেকে চঞ্চল বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত ছিল বলে ঋতিকা চঞ্চলের সাথে অফিস যায়নি। তবে এখন বাড়ীতে না ফিরে চঞ্চলের ফ্ল্যাটেই যাচ্ছে। ও ঠিক করেছে একসাথে ডিনার করবে। তবে চঞ্চলকে কিছু না জানিয়ে একটা সারপ্রাইজ দিতে চাইছে ঋতিকা। সেইসাথে মনের মধ্যে যে খচখচানি হচ্ছে সেটাও দূর করা যাবে।

ঋতিকাকে নিয়ে অটোটা স্ট্যাণ্ড থেকে বেরিয়ে গেলে অন্য অটোতে বসে থাকা প্রদীপ ফোন করল বাপনকে।

“বেরিয়ে গেছে বুঝলি। দশ মিনিটের মধ্যে স্পটে মানে বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছে যাবে।”

-“ঠিক আছে, আমি স্পটের পাশেই আছি।” বাপন আজ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ওর চিরাচরিত রুট ছেড়ে অন্য রুটের রাস্তায় এসেছে। রাস্তার ধারে ওর অটোকে সাইড করে রেখেছে। আর নিজে লেক ফেসিং যে আবাসনে চঞ্চল ফ্ল্যাট কিনেছে, তার পাশেই একটা ছোট গলির আবছা আঁধারে থেকে লক্ষ্য রাখছে আবাসনের মেইন গেটের দিকে। বোঝা যাচ্ছে কারো জন্য সে অপেক্ষা করছে। চঞ্চলকে সারপ্রাইজ দেওয়ার যে প্ল্যান ঋতিকা করেছিল সেটা এতক্ষণে আরও তিনজন জেনে গেছে। 

কিছুক্ষণ পরেই ঋতিকা বহুতল বিল্ডিং কমপ্লেক্সের মেইন গেটের সামনে অটো থেকে নামবে চঞ্চলের ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য। চঞ্চলের ফ্ল্যাটের বর্তমান পরিস্থিতিটা জানতে হলে আমাদের এক ঘন্টা পিছিয়ে যেতে হবে। ঠিক যখন চঞ্চলের ফ্ল্যাটের বেলটা বেজে উঠেছিল। দরজা খুলে তো চঞ্চল বেশ অবাক। মোহময়ী সাজে দরজার অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে রিচা। মেয়েটার মধ্যে পুরুষদের আকর্ষণ করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। ওর নেশায় একসময় বুঁদ হয়ে ছিল চঞ্চল। প্রায় দিনই চঞ্চল সায়রাবিবির আস্তানায় চলে যেত রিচার টানে। রিচা এই ফ্ল্যাটেও এসেছে। রিচার সাথে ঝামেলাটাও তো হল ফ্ল্যাটেই।

সেদিন রিচার শরীরটা আশ মিটিয়ে খাওয়ার পরে চঞ্চল ওকে প্রস্তাবটা দিয়েছিল। অনেক বেশী টাকা রোজগারের হাতছানি ছিল সেই প্রস্তাবে। কিন্তু রিচা রাজী হয়নি। এদিকে চঞ্চল পার্টির থেকে মোটা অ্যাডভান্স নিয়ে ফেলেছে, ক্রমাগত তাগাদা আসছে। আসলে রিচার সাথে একটা অ্যাটাচ্‌মেন্ট হয়ে গেছিল বলেই চালে ভুল করে ফেলেছিল চঞ্চল। প্রস্তাব না দিয়ে সোজাসুজি পার্টির হাতে তুলে দিলেই হয়ত ল্যাটা চুকে যেত। তবে রিচা লাইনের মেয়ে, বেশ চালাক-চতুরও। ওকে বোকা বানানো সহজ হত না। রিচাকে হ্যাণ্ডওভার করার পরে বয়স্ক লোকটার সাথে কিছু একটা করে বসলে বা পালিয়ে পুলিশের কাছে চলে গেলে চঞ্চল ফেঁসে যেতে পারতো। তাই রিচাকে জানিয়েই করতে চেয়েছিল। পুরো সওদা থেকে ভালোরকম ভাগই দিত রিচাকে। কিন্তু সব শুনে চঞ্চলকে গালি দিয়ে রিচা চলে গেছিল। তবে রিচাকে চঞ্চল বলেছিল মত বদলালে যেন ফিরে আসে।  

-“ভেবে দেখলাম তোর প্ল্যানটা খারাপ না। বুড়োটার খিদে মেটাতে হবে, এই তো! এখানেও করতে হয় সেসব। সাথে একটু যত্নআত্তিও করতে হবে নাহয়। বুড়োর তো ছেলেমেয়ে কেউ কাছে থাকে না বলেছিলি?”

-“হ্যাঁ, সবাই দেশের বাইরে। বুড়োটা তোকে বৌয়ের মতই রাখবে। ভালো খাওয়া-পরা পাবি, মুম্বাইয়ের অন্ধেরির মত পশ এলাকায় থাকবি। আর কি চাই!”

-“তোর দালালির টাকার আধা হিস্যা চাই আমার।”

-“ডান্‌! তাহলে কাল ভোরের ফ্লাইটেই টিকিট বুক করছি।” বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে চঞ্চলের। রিচা ওকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। পার্টির অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব ছিল না ওর পক্ষে। বিকল্প একটা বন্দোবস্ত করার পথে কিছুটা এগোচ্ছিল, কিন্তু সেটাতেও রিস্ক অনেক। অনেক সাবধানে আর ধীরেসুস্থে পা ফেলতে হচ্ছিল চঞ্চলকে। সময় লাগছিল তাতে। এদিকে বৌয়ের মৃত্যুর পরে একাকীত্ব গ্রাস করছিল ওর ক্লায়েন্ট মুম্বাইনিবাসী বয়ষ্ক ভদ্রলোকটিকে। খুবই অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।  

-“রাতটা তাহলে এখানেই থেকে যাই।” শরীরী বিভঙ্গে নেশা ছড়িয়ে রিচা কথাটা ছুঁড়ে দিল চঞ্চলের দিকে। ও জানে চঞ্চল এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতছাড়া করার বান্দাই নয়। 

এরপরে বেডরুমে ঘন্টাখানেক উথালপাথাল সময় কাটতে কাটতেই আবার বেল বাজলো চঞ্চলের ফ্ল্যাটে। ঠিক সেইসময় কণিষ্ক অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে কমপ্লেক্সের মেইন গেটের সামনে অটো নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ও জানে একটু বাদেই হৃদয়ভঙ্গের একরাশ বেদনা নিয়ে ঋতিকা বেরিয়ে আসবে।  

বাবলিকে ঋতিকা ওর ফিলিংস শেয়ার করে শুনে কণিষ্ক বাবলিকে রিকোয়েস্ট করেছিল যাতে ও ঋতিকাকে সাবধান করে চঞ্চলের ব্যাপারে। রিচাকে চঞ্চল কী প্রস্তাব দিয়েছিল সেটা আর কণিষ্কর অজানা নয় তখন। সেইসব কথা ঋতিকে সরাসরি না জানিয়ে বাবলি একটু ঘুরিয়ে বলেছিল। পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ার আগে ঋতি যেন চঞ্চলকে ভালোভাবে যাচাই করে নেয়। এই যে আজ ঋতিকার সারপ্রাইজ ডিনারের প্ল্যান, সেটা বাবলিরই মস্তিষ্কপ্রসূত। শুধু প্ল্যানের কথাটা যে বাবলি কণিষ্ককেও জানিয়েছে, সেটা ঋতি জানবে না কোনোদিনই। বাপনও সেইমত রিচাকে ফিট করল যাতে ঋতিকার সামনে চঞ্চলের কদর্য রূপটা সহজেই প্রকাশ হতে পারে। 

ওই তো ঋতিকা আসছে। পেছন পেছন চঞ্চলও আসছে যদিও। কিন্তু চঞ্চলের কোনো কথাই শুনছে না ঋতিকা। গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। সামনেই একটা অটো দেখে ঋতিকা এগিয়ে আসছে ওর দিকেই। অটোতে স্টার্ট দিল বাপন। 

ঋতিকার জীবনে অটোচালক বাপনের জন্য কোনো জায়গা না থাকলেও ও বন্ধুর মত একটা কাজ করেছে। চঞ্চলের নোংরা অভিসন্ধির আঁচ কোনোদিনই ঋতিকাকে স্পর্শ করবে না।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন