শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পার্থসারথি রায়।। পারক গল্পপত্র



মরারকুটি নামটি শুনলে কায়ো অটেকোনা সাগাই করির যাবার চায়না। এ্যালাকার মানষিগিলা কয়, "অভাবের ঠ্যালাত এ্যালাকার ম্যালা মান্ষি মরি গেইচে বুলিয়া ওই নামটা নাকি ওইদোন হইচে।" ওই এ্যালাকাত আতু মিয়ার বাড়ি। আতু দিল্লি খাটি বাড়িত পাইসা প্যাটে দিয়া কোনোমতে সংসার চলায়। ছোটো বেটির বিয়ার পরে থাকি আতুর বৌ ছকিনা একলায় বাড়ি-সংসার সামাল দ্যায়। দ্যাশোত করোনা আইচ্চে থাকি আতুও বাড়িতে আচে।


দিনটা আচলো শুকোরবার। ছকিনা দুপরা আইগ্নার আকাত সিদ্দ ভাত চড়ে দিচে। আতু গাও ধুবার জইন্যে কলেরপার যাবার ধইরচে। এইদোন সমায় ছকিনা ফ্যাদ্লা শুরু করে,"মুই কিচুই বুজির নাইকচোং না। মান্ষিটা বাড়িতে খোস্টংমোস্টং করি দিনটা প্যাটের নাইকচে ক্যানে? ছোটো বেটির প্যাটোত আট মাসের ছাওয়া। ওই যৌতুকের এক লাক টাকা দিবার পামোনা কয়া প্যাটাইচি জইন্যে বেটির উপরা অইত্যাচার শুরু হইচে। হয় 

দেওয়ানিরঘরের অটে যায়া এইদোন অন্যাইজ্য যৌতুক চাওয়ার বিচার চাও । নাহয় বাড়ি-ভিটা ব্যাচেয়া ওই পাইসা দ্যাও।" আতু কতাগিলা শুনিয়া কয়, "অরাও। দ্যাকোং কি করা যায়।"


বারের নমাজ পড়িয়া বৈকাল নাগাত আতু উত্তর টারিত বজলুর বাড়ি যায়। বজলু আর আতু ছোট ব্যালা থাকি গালা ধরাধরি করি বড়ো হইচে। দোনোঝনে দিল্লি খাটে। মনের মান্ষিটাক পায়া বজলু দূ:কের কতা কওয়া শুরু করে। বজলু কয়, "ভাই মরার করোনার জইন্যে সরকার হামাক বাড়িত আনিয়া থুইল্। কাম-কাজ কিচুই নাই। খালি এ্যাশোনের চাউল দিয়া কি সংসার চলে? এ্যালাকাত একশো দিনের কাম থাইকলেও দুইটা পাইসার মুক দ্যাকা গেইল হয়। তায়ো নাই।" 


বজলু থাইমলে আতু কয়, 'মুই যে আরো অইগ্দা জ্বালাত পইরচোং। বজলু জাইনবার চায়, কিসের অইগ্দা জ্বালা? তকোন আতু কয়, "তুই ভালে করিয়া জানিস যে ছোট বেটির বিয়াত হামরা ধার-দ্যানা করিয়া সউক কিচু ঝারি-ঝুরিয়া যৌতুকের দাবি পূরন কইরচিনো। নগদে এক লাক টাকা, বেটির হাতে-কানে-গালায় সোনার জিনিস, জামাইর নগুলের সোনার আংটি, ঘরের বিচনা-পাটি ব্যাবাকে দেওয়া হইচলো। দিল্লি খাটিয়া সেই দ্যানার পাইসা এ্যালাও মুই শোদ করির পাং নাই। তাতে উমরা নয়া করিয়া ফির এক লাক টাকার যৌতুক দাবি কইরচে। বেটিটার প্যাটোত আট মাসের ছাওয়া। উয়ার উপরা উমরা সেই অইত্যাচার কইরবার নাইকচে বোলে। এ্যালা মুই কি করোং ? কয়বার মান্ষি যৌতুক দ্যায় ? তুই কতো ভাই।" এইদোন কতা শুনিয়া বজলু আগ হয়া কয়, "হাটেক, থানাত যায়া উমার সগারে নামে কেস করি দেই। ওইল্লা মান্ষিক শাস্তি দিবার নাইগবে।" বজলুক থামেয়া আতু কয়, "দ্যাক, বেটিক বিয়াও দিচি। বেটির ওটে সংসার হউক,  বাপ হিসাবে মুই সেইটা চাং। কাজেই কাইল মুই বেটির বাড়ি যাইম। জামাই, উয়ার বাপ-মাও সগারে হাতে-ঠ্যাং-এ ধরিয়া কইম যে বিষ কিনার মোর হাতোত নাই পাইসা। কাজেই নয়া করিয়া যৌতুকের পাইসা দিবার নাকান কোনো উপায় মোর নাই। মুই চাং, তুইও হাটেক কাইল মোর সতে।" বজলু ওই কতাত আজি হয়।


এদিকোনা সইন্দা হয়া গেইচে। আতু বাড়ি চলি যায়। ছকিনা তকোন আইগনাত বসি আচে। ন্যাম্পোত ক্যারাসিন ত্যাল নাই। ন্যাম্পোর আগুন টিপিসটিপিস করি জইলবার নাইগচে। আতু হাত-ঠ্যাং ধুইয়া বৌয়ের বগলোত বইসে। সতেসতে ছকিনা কয়, "বেটির উপরাত দুইদিন থাকি অইত্যাচার বোলে বেশি হইচে। ট্যাপরার মাও কয়া গেইল।" আতু এইকতা শুনিয়া হাত দুইটা উপরা তুলিয়া নম্বা নিকাশ নিয়া খালি কয়, "হায় আল্লা !" একনাপরে ওমায় বৌয়োক কয়, "কাইল সকালে বজলুক সতে নিয়া ওটেকোনা যাইম। নে এ্যালা ভাত চড়ে দে। প্যাটটাত কিচু না দিলে শরিলটা চলে ক্যাদোন করি ?"


ছকিনা গালোত হাত দিয়া বসি কান্দে। চৌক মুচতে মুচতে কয়, "চাউল নাই। ঘটিত উদিনকার চাইট্টা চাউল ভাজা আচে।" শ্যাষম্যাষ দুইঝনে চাউলভাজা আর পানি খায়া বিচনাত শুতি পড়ে।


প্যাটোত নাই খাবার, মাতাত হইল জ্বালা।  মনোত অশান্তি নিয়া কি আর চৌকোত নিন ধরে? আতু ফজরের নমাজ পইরবার জইন্যে আগোতে মজজিদোত যায়। যায়া দ্যাকে ওই বেটির বাড়ির বগলের একজন মজজিতের বারান্দাত বসি আচে। আতু যাইতে আর ওই মান্ষিটা ফুস ফুস করি  কয়, "ভাইজান, তোর বেটির বাড়িত আইজ আইতোত একটা বড় কিচু ঘটনা ঘইটচে। যদ্দুর যানং তাতে তোর বেটিক উমরা হাসপাতাল নিয়া গেইচে। তুই এলায় হাসপাতালোত চলি যা।" আতু এই কতা শুনিয়া আল্লার নাম নিয়া  হাসপাতাল মুকে অওনা দেয়। 


হাসপাতাল যায়া আতু দ্যাকে কয়টা পুলিশ বসি আচে। এমারজেন্চির আকপাকে বারান্দাত কাপড় দিয়া ঢাকি থোয়া একটা মানুষ দ্যাকা যাবার নাইকচে। আতুর বুকখান ধরপর করি উটে। একপায় দুইপায় আতু আগে যাবার ধরে। পুলিশের একঝন উয়ার নাম, ঠিকানা, ক্যানে ওটে গেইচে এইল্লা জাইনবার চায়। জবাপ দিবার ধরি পুলিশের কতাত আতু বুজবার পায় যে ওই ঢাকি থোয়া একজন আর অন্যো কায়ো নোমায়। ওটা উয়ার বেটি----অক্সি! পুলিশেরটে অনুমতি নিয়া আতু বগলোত যায়া কাপড় খান তুলি দ্যাকে অক্সির মাতা-মুক অক্তে ভিজি গেইচে। আতুর বুজবার বাকি থাকে না যে অক্সিক ওই এক লাখ টাকার জইন্যে ডাঙ্গে মারি ফ্যালা হইচে। আতু বোবার নাকান বেটির অক্তমাকা মুকের ভিতি চায়া থাকে। আতু ধান্দা দ্যাকে। মরা বেটি উয়াক নালিশ দ্যায়, "আব্বা, উমরা মোক ডাঙ্গে মারি ফ্যালাইচে। উল্লা মান্ষি নোমায়, পশু।" আতুর চৌকোত ভাসি উটে অক্সির ছোটো ব্যালার নালিশ দিবার ম্যালা ছবি।


পুলিশ ওটে থাকি আতুক সাড়ে দেয়। ইদিকমইদ্যে সকাল হয়া গেইচে। আতু পাগলার নাকান কপাল চাপড়ায় আর হাউ হাউ করি কান্দিতে কান্দিতে বাড়ি চলি যায়। 


ছকিনা গরুটা বায়রা পোঙ্গালোত বান্দিয়া খোলামবাড়ি ঝাইর দিবার নাইগচে। আতু বাড়ি যাইতে আর সোয়ামির মুক-চৌক দেকিয়া ছকিনার ক্যাদোন নাগে। ছকিনা কিচু পুচ করার আগোতে  আতু ঘটনার কতা খুলি কয়। সতেসতে ছকিনা একবার "অক্সি" কয়া  চিকরিয়া অজ্ঞান হয়া মাটিত পড়ি যায়। আশপড়শি সগায় দৌড়ি আইসে। ঘটনার কতা শুনিয়া সগায় হায় হায় করির ধরে। জলের ছিটা দিয়া ছকিনাক সুস্ত করি তুলবার চ্যাষ্টা করা হয়। হাসপাতাল মুকে দলে দলে সগায় যাওয়া শুরু করে। ওদিকোনা মরা দ্যাহাটা পুলিশ থানা নিয়া গেইচে। বজলুও এই কতা শুনিয়া থানাত পৌচিচে। বজলুক দেইকতে আর উয়ার হাত ধরিয়া আতু কয়,"ভাই, ওটে আইজ আর যাওয়া না খাইবেরে....।" বজলু, পরিবারের অন্য সগার কতা  শুনিয়া আতু থানাত কেস করি দেয়। জামাই, উয়ার বাড়ির সউক মান্ষির নামে খুনের কেস হয়। পুলিশ মরা দ্যাহা পরীক্কা কইরবার জইন্যে জেলা হাসপাতালোত প্যাটে দেয়। আতুরঘর খালি বুকে বাড়ি ফিরি যায়।


বৈকাল নাগাত পুলিশ আতুর বাড়িত মরা দ্যাহার সৎগতি কইরবার জইন্যে খবর প্যাটে দেয়। আতুর আপত্তি না থাকায় মরার গাড়ি উয়ার বাড়ি যায়। এ্যালাকার মান্ষিগিলা আতুর খোলামবাড়িত তকোন জড়ো হইচে। ম্যাতোরে গাড়ি থাকি মরা নামায়। কিন্তুক দুইটা মরা। আতু পুলিশের কাচোত জাইনবার চায় যে দুইটা মরা ক্যানে ? তখন জনৈক পুলিশ কর্মী জানান, "একটি দেহ মায়ের। আর একটি দেহ তার গর্ভের আট মাসের সন্তানের।" এই কতা শুনিয়া আতু, ছকিনার নাকান ওটে থাকা ব্যাবাক মান্ষির মাতাত আকাশ ভাঙ্গি পড়ে। আতুর খোলামবাড়ি এক্কেবারে শ্মশান হয়া যায়। আতু, ছকিনা দুইঝনের কারো চৌকোত পানি নাই।  ছকিনাক বুকোত জড়ে ধরিয়া আতুর মুক থাকি ব্যার হয়, "হায় আল্লা, অক্সি যৌতুকের বলি হইল! তার সতে বলি হইল অক্সির আট মাসের প্যাটের ছাওয়াটাও!"


চৌকের জল আর বুকভত্তি ব্যাদোনা নিয়া খোলামবাড়ির মাতাত মাও-ছাওয়া দোনোঝনোকে কবর দেওয়া হয়। শ্যাষে  ভিতাভিতি হওয়ার সমায় সগার আকপাকে বজলু কয়টা কতা কয়। বজলু কয়, "আইন আইনের ঘাটা দিয়া চইলবে।  আইনের ফাক-ফোকর দিয়া এইদোন জঘইন্য অপরাধিরঘর একদিন ছাড়া পায়া যাইবে। জেল থাকি ব্যারেয়া ভাল্ মান্ষি সাজিয়া ফির একপালা যৌতুক নিয়া বিয়াও হইবে। তারপর  সেই........!" 


বজলুর এই কতার পর অটে জড়ো হওয়া একজন মুরুব্বী কয়,"যৌতুক, বৌয়ের  উপরা যৌতুকের জইন্যে অইত্যাচার এইল্লা বন্দ কইরবার বাদে দ্যাশোত বোলে কতো শক্ত শক্ত আইন হইচে। ত্যাও ক্যানে হামারগিলার ঘরের বেটি, প্যাটের ছাওয়াক দুনিয়া থাকি চলি যাওয়া খায় ?"


 আইজ-কাইলকার সমাজ ম্যালাদুর আগে গেইচে। সেই কতা বজলুও মানে। তারপরেও এইদোন ঘটনা দেকিয়া সমাজের ভিতি বজলুর প্রশ্ন, "এই দো-পায়া যৌতুকনোবি পশুগিলাক সমাজ থাকি কি উচিত শিক্কা দেওয়া যায় না ? আরো কতদিনে হামার সমাজ থাকি এই যৌতুক নেওয়া বন্দ হইবে ? অক্সি আর উয়ার প্যাটের ছাওয়ার নাকান আরো কতোঝনের খুন হওয়া দ্যাহা তামার বাপ-মাক নিজের হাত দিয়া  সৎগতি কইরবার নাইগবে ? কিন্তুক এই সমাজ থাকি প্রশ্নগিলার জবাপ যে কদ্দিনে মিলবে,  সেইটা বজলুর জানার মদ্যে নাই।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন