বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অনুরঞ্জনা ঘোষ নাথ।। পারক গল্পপত্র



"কে? কে ওখানে?"  মাঝরাতে চমকে উঠে বিছানায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে  চিৎকার করে উঠল সুতপা। শুনতে পেল কে যেন বিড়বিড় করে বলছে সেই কথাটা-যা শুনলে এখনো ওর শিরদাঁড়া দিয়ে স্রোত নেমে যায়, অনুশোচনায় দগ্ধ হয় তার হৃদয়, চোখ দিয়ে নেমে আসে নীরব অশ্রু  ধারা...... তার প্রিয় বন্ধু দেবযানীর থেকে শোনা  শেষ কয়েকটি কথা -"আমায় তুই নোটগুলো সময়মতো একটু দিলিনারে ? দিলেতো আমার স্বপ্নটা পূরণ হত বল।  কেন করলি আমার সঙ্গে এমন? আমাকে না তোর প্রিয়বন্ধু বলে দাবি করতি?তাহলে কেন এমনভাবে আমার স্বপ্নটাকে ভেঙে চুরমার করে দিলি? " অস্ফূট শব্দগুলো রাতের অন্ধকারে সুতপার কানে অনুরণিত হতে হতে সুতপা যেন চলে গেল ২৬ বছর আগে...... 

                   সুতপা চ্যাটার্জী আর দেবযানী দাস  ছিল যেন ধনী-দরিদ্র সমাজের ধনী-দরিদ্র এই দুই শ্রেণীর প্রতিভু -ধনের  অসম বন্টন তাদের বন্ধুত্বে চিড় ধরাতে পারেনি, ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই ওরা দারুন বন্ধু। চার্টার্ড একাউন্টেন্ট পিতার একমাত্র কন্যা সুতপা অসম্ভব স্মার্ট ঝলমলে অন্যদিকে সুন্দরবন থেকে পড়তে আসা ক্ষেতমজুর বাবার মেয়ে মৃদুভাষী দেবযানী শান্ত সহজ সরল কিন্তু অসম্ভব মেধাবী। সুতপা যদি সমুদ্রের উচ্ছল ঢেউ হয়তো দেবযানী  শান্ত অতল জলধি। দেবযানী থাকতো কলেজের হোস্টেলে। কিন্তু এহেন  বন্ধুত্বেও চিড় ধরল যখন আজীবন প্রথম হয়ে আসা সুতপা কে হারিয়ে দেবযানী  এম. এ ফার্স্ট ইয়ারে প্রথম হলো।  স্বাভাবিকভাবেই আজন্ম প্রাধান্য পেয়ে আসা সুতপার ভক্তদের ভিড়টা দেবযানী মুখো হতে থাকলো- এতে অবশ্য দেবযানীর খুব একটা হেলদোল ছিল না কারণ ও পড়াশুনা নিয়েই  বেশি ব্যস্ত থাকত। ও জানতো যে ও গরীব ঘরের মেয়ে। ওকে যে করেই হোক নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাই বাহ্য জগতের বন্ধুত্ব,  তাদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, হাসি, ঠাট্টা করে নষ্ট করার মত সময় তার কাছে ছিল না। সুতপার বন্ধুত্বই তার কাছে অমূল্য বলে মনে হতো,  সুতপাকে সে ভালবাসত প্রাণপণ। কিন্তু এই ঘটনাগুলো সুতপার খারাপ লাগতে লাগলো। যদিও সে দেবযানীকে খুবই ভালবাসত তবুও মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা কাঁটা ধীরে ধীরে বিঁধতে লাগছিল। এর ওপর বন্ধু ইন্দ্রনীল যাকে  সুতপা মনে মনে বেশ পছন্দই করে একদিন যখন গল্পের ছলে সুতপাকে বলল " সুতপা, দেখ, দেবযানী এত শান্ত স্বভাবের মেয়ে আর মিশুকে না হলেও ওর মধ্যে কেমন একটা আকর্ষণ আছে তাই না রে? 

যদিও গ্রামের মেয়ে তবু কি যেন আছে যা ভীষণ ভালো লাগে আমার। " 

" ও বাবা তুই যে দেখছি দেবযানীর  প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস রে ইন্দ্র। "- বলে হো হো করে হেসে উঠে সুতপা ইন্দ্রর  পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। ইন্দ্র "এই না,  না কি সব যা তা বলছিস" বলে সেই মুহূর্তে অস্বীকার করলেও ব্যাপারটা সুতপার বুঝতে আর কিছু বাকি ছিল না। যেহেতু দেবযানীকে সুতপা খুব  ভালোবাসতো তাই এই ঘটনাগুলো প্রথমদিকে অল্প অল্প খারাপ লাগলেও পরবর্তীকালে এই খারাপ লাগাটাই ঈর্ষায় পরিণত হতে থাকলো।  কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও দেবযানীকে সে কথা বুঝতে দিল না। তার পরেই ঘটল সেই দুর্ঘটনাটা। এম.এ পার্ট টুর পরীক্ষার আগে যখন দেবযানী যখন বাড়ি যাচ্ছিল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তার সমস্ত বইপত্র, পরীক্ষার নোটস ইত্যাদি নিয়ে তখন তার ব্যাগ কোনভাবে ট্রেন থেকে চুরি হয়ে যায়।  এককথায় বলা যায় দেবযানী একদম পথে বসে যায়। দেবযানী তার প্রিয় বন্ধু সুতপার কাছে হেল্প চায়, দেবযানী ও সুতপা মিলে যে নোটগুলো বানিয়ে ছিল সেগুলোর  কোন কপি সুতপা কোনভাবেই দেবযানীকে  দেয় না বরঞ্চ বলে নাকি হারিয়ে গেছে।  আসলে বলা যায় ঈর্ষান্বিত সুতপা  তাকে সেইভাবে হেল্প করেনা। মুখচোরা দেবযানীর ইউনিভার্সিটিতে এমন গভীর বন্ধুত্ব আর কারো সঙ্গেই ছিল না। তবুও তার কথা শুনে অন্য বন্ধুরা অল্প হেল্প করলেও তার মূল নোটগুলো না থাকায় সে তার কাঙ্ক্ষিত  মার্ক্স তুলতে পারেনি ফলে তার নেট স্লেট  দেওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। 

জীবনের স্বপ্নগুলো এইভাবে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়াতে দেবযানী  এরপর আত্মহত্যা করে আর তার আগেই তার প্রিয় বন্ধু সুতপাকে  কথাগুলো বলে যায় শেষবারের মতো যা ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সুতপার শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত নামায়.....

                           টিনা, সুতপার মেয়ে এবার এম . এ ফাইনাল দেবে।সুতপার মেয়ে হলেও টিনা স্বভাবে শান্ত, মিষ্টি লাজুক  আরেকটু ভীতু প্রকৃতির কিন্তু পড়াশোনায় ভীষণ সিরিয়াস, একেবারে যেন মায়ের উল্টো ধারার- অনেকটা সুতপার এককালের ভীষণ প্রিয় বন্ধু দেবযানীর মত।  কিন্তু মায়ের সাবজেক্টটাই ওর প্রিয়, সেই ফিলোসফিতেই  ও এম.এ করছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে , খুব ব্যাস্ত টিনা। কিন্তু পার্ট টু পরীক্ষার কদিন আগে টিনার বেস্ট ফ্রেন্ড রূপক একিউট জন্ডিসে খুবই অসুস্থ হওয়ায় ওর বাবামা ওকে হোস্টেল থেকে ওদের বাড়ি রায়গঞ্জে নিয়ে চলে যায়, তার ফলে অনেকগুলো ক্লাস সে করতে পারে না।  তাই সে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে টিনার কাছে সাহায্য  চাওয়াতে হেল্পফুল টিনা সব নোটস ও সাজেশনস তাকে দেয়।শুধু তাইনা, নিজের জন্য যে স্পেশাল নোটস সে বানিয়েছিলো তাও রূপককে সে অকপটে দিয়ে দেয়।  রূপক সব জেরক্স করে নিয়ে  টিনাকে ফোন করে জানায়  যে ওর হোস্টেলের একটি বন্ধু দিব্যেন্দুর হাত দিয়ে সিল করা প্যাকেট-এ নোটগুলো টিনাকে ফেরত পাঠিয়ে নিজের বাড়ি রায়গঞ্জে চলে যাচ্ছে সেদিনেরই বিকেলের ট্রেনে।আর নিজের হাতে সময় ছিলনা  বলে বন্ধুর হাত দিয়ে নোটস ফেরত পাঠাচ্ছে বলে ক্ষমা চেয়ে নেয়  টিনার কাছে আর বলে যে, " থ্যাঙ্কস টিনা,  তোর জন্যই আমি পরীক্ষাটা ভালো করে দিতে পারবো,  তোর মত বন্ধু হয় না।"  উত্তরে  সুদর্শন, মিশুকে,  হাসিখুশি রূপককে মনে মনে পাগলের মতো ভালোবাসে চলা অথচ কখনো বলতে না পারা  মিতভাষী টিনা শুধু বলে - " বেশি কথা বললে মার খাবি। তোর না আমি বেস্ট ফ্রেন্ড,  আমি তোর জন্য এটুকুও  করবো না ? তাহলে আমরা বন্ধু কেন? বেস্ট অফ লাক"। " হ্যাঁরে থ্যাংকস। তোকেও 'বেস্ট অফ লাক '। তবে তোকে আর 'বেস্ট অফ লাক' জানাবো কি! তুই তো বরাবরের মতো এবারও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হবি আর আমি হব সেই সেকেন্ড, তাই তোকে আর ওসব জানিয়ে লাভ নেই, বরং তুই আমায় জানা ওতেই কাজ দেবে "- রূপক হাসতে হাসতে বলে ওঠে। 

" বাজে বকিস নাতো। সাবধানে বাড়ি ফিরে যা।" টিনার এই কথার উত্তরে রূপক বলে " ওকে ওকে,  বাট আই মিস ইউ এ লট  মাই লাভলী  ফ্রেন্ড, কতগুলো দিন তোর পিছনে লাগতে পারবোনা আমার দিন কি করে কাটবে বলতো? " টিনা ছদ্ম রাগ দেখায় বলে- "আর বেশি কথা বললে এবার সত্যি গিয়ে তোকে মারবো কিন্তু। "- কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখের কোনটা  চিকচিক করে ওঠে টিনার। 

'দুর্ঘটনা' বা বলা যায় একই ঘটনা পৃথিবীতে বারবার ঘটে শুধু ঘটনার কুশীলব বদলে যায়, এখানেও সেই আগের বারের মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। বাসের থেকে নামার সময় একটা ফোন আসাতে  দিব্যেন্দু এমন অন্যমনস্ক হয়ে যায় যে ভুল করে  নোটস এর প্যাকেটগুলো বাসে ফেলে নেমে চলে আসে এবং নোটগুলো সব হারিয়ে যায়। বাস গুমটিতে গিয়ে খোঁজ করলেও কেউ তার খোঁজ দিতে পারেনা। আর নোটগুলো হারিয়ে দিব্যেন্দু সঙ্গে সঙ্গে টিনাকে ফোন করে সে খবর জানায় না। সে বাস গুমটিতে বারবার খোঁজ করতে থাকে এবং টিনাকে মিথ্যে কথা বলে যে  তার বিশেষ অসুবিধার জন্য সে দুদিন নোটগুলো ফেরত দিতে যেতে পারছে না,  দুদিন বাদে গিয়ে সে সব নোট গুলো ফেরত দিয়ে আসবে। এদিকে  দু-তিনদিন পাগলের মতো বাস গুমটিতে খোঁজ করার পরও  নোটস এর দেখা না মেলায় দিব্যেন্দু হাল ছেড়ে দিয়ে শেষে টিনাকে ফোন করে সব কথা জানায়। 

দিব্যেন্দুর কথায় টিনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এখন কী করবে ও?  কিভাবে পরীক্ষা দেবে?  রাগ ও কান্নায় ভেঙে পরে টিনা।  দিশাহারা লাগে, সে ভাবতে থাকে বাবা-মা যদি জানতে পারে যে তার সব নোটগুলো  এভাবে হারিয়ে গেছে তাহলে তাকে কি বলবে তারা? কিন্তু টিনার আর কিছু করার থাকে না। সে তাড়াতাড়ি রূপক কে ফোন করে এসব কথা জানায়, বলে "রূপক জানিস দিব্যেন্দু আমার নোটগুলো  বাসে ফেলে নেমে গেছে আর সব নোটস  হারিয়ে গেছে। এখন আমি কি করব?"  রূপক টিনার কথা শুনে অবাক হয়ে যায়, বলে -  "নেটওয়ার্কের প্রবলেমের জন্য ভালো করে তোদের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।দিব্যেন্দু তো আমায় ফোন করে এসব কথা কিছুই জানালোনা, উল্টে আমার ফোনই ধরলো না তাই ভাবছিলাম যে কি হলো হঠাৎ? এখন তাহলে তুই কি করবি? কিভাবে পরীক্ষা দিবি? তোর সব নোটগুলো এমনকি স্পেশাল নোটস  ও তুই আমায় দিয়ে এত  উপকার করলি, ইশ আমার হাতে যদি সময় থাকতো আমি তোকে নিজে গিয়ে দিয়ে  আসতামরে । ছি! ছি ! কি বিশাল অন্যায় দিব্যেন্দু করল! কী করবি এবার টিনা?  তুই কি করে পরীক্ষা দিবি? এখনতো আর আমার রায়গঞ্জ থেকে ফেরত যাওয়া সম্ভব নয়রে, আর রায়গঞ্জ তো  কলকাতার কাছে নয় যে তুই টুক করে এসে নোটগুলো সব নিয়ে গিয়ে আবার জেরক্স করে নিবি।" টিনা ফোনে খুব কাঁদতে থাকে, বলে "আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলরে। এখন আমি কি করব?  মা বাবা জানেনা যে তোকে এতসব নোটস আমি দিয়ে দিয়েছিলাম, জানলে কি হবেরে?  নোটস দেওয়াটা বড় কথা নয়, কিন্তু এখন যে আমার কাছে আর কিছুই  রইল না, আমার সর্বনাশ হয়ে গেল রে রূপক। কি করলো এটা দিব্যেন্দু? রূপক তুই যদি নিজে  সব নোটগুলো ফেরত দিয়ে যেতি ভালো হতো রে। তুই নিজে হাতে কেন আমাকে ফেরত দিয়ে গেলি না তাহলে আমার জীবনের এই সর্বনাশ হত না, আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেলরে  রূপক" 

উত্তরে রূপক বলে - "সত্যি রে টিনা, আমি যে অন্য দিন বাড়ি ফেরার টিকিট পেলামনা, পরীক্ষা এসে গেছে তাই আর সময় নষ্ট করতে পারবো না বলেই দুদিনের মধ্যে ফেরত আসার প্ল্যান করে  কলকাতা  গেলাম, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে এইভাবে তোর সর্বনাশ হয়ে যাবে।   তুই কিছু চিন্তা করিস না, আমি তোকে সব নোটস ছবি তুলে মেইল করে পাঠিয়ে দিচ্ছি, আর  হোয়াটসঅ্যাপেও  পাঠিয়ে দিচ্ছি।  তুই পড়ে নে, দেখে নে আর প্রিন্ট আউট বার করে নে, তাহলেই হবে।" "আরে তুই তো পাগলের মতো কথা বলছিস! অত নোটস এর জন্য প্রিন্ট আউট বার করতে  কত খরচা পড়বে বলতো? আর হোয়াটসঅ্যাপে দেখে কি পড়া মুখস্থ করা যায়? এবার আমি কী করব বলতো? বাবা মা জানতে পারলে ভীষণ রাগ করবে? এত প্রিন্ট আউটের খরচাই বা আমাকে কে দেবে  বল?" চিৎকার করে ওঠে  টিনা। প্রচন্ড কাঁদতে থাকে টিনা আর রূপক কে বারবার বলতে থাকে "তোর জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল রে রূপক তোকে উপকার করতে গিয়ে আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল. " অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে যায় রূপক,  কিন্তু সত্যিই ওর পক্ষে কিছু করা সেই মুহূর্তে আর সম্ভব হয়না। বেডরুমের দরজা আটকে যখন এইসব কথা রূপকের সঙ্গে টিনা ফোনে  আলোচনা করছিল আর চিৎকার চেঁচামেচি করছিল সুতপা দরজার সামনে দিয়ে  যেতে যেতে চিৎকার শুনে  চমকে ওঠে এবং ছুটে যায় মেয়ের কাছে। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে, সুতপা কে সব কথা বলে টিনা কাঁদতে কাঁদতে আসন্ন বিপদের অভিঘাতে অজ্ঞান হয়ে যায়। এসকল ঘটনায় সুতপা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়, বাড়িতে ডাক্তার ডেকে টিনাকে সুস্থ করে তোলে. কিন্তু ডাক্তার বলে যান যে টিনার ভীষণ মানসিক আঘাত লেগেছে ওকে যেন  কোন বিষয়ে কোনো চাপ না দেওয়া হয়।

 ওদিকে রূপক মেইল করে সমস্ত নোটস টিনাকে পাঠিয়েও দেয়।টিনার বাবা সব প্রিন্ট আউট নিয়েও আসে টিনার জন্য।  কিন্তু এই সকল নানারকম কাণ্ডকারখানায়  দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন পার হয়ে যায়। ওদিকে পরীক্ষার দিন ক্রমশ এগিয়ে আসতে থাকে। রূপককে মনে মনে  ভালোবাসতো বলেই জীবনের এত বড় ঝুঁকিটা সে নিয়েছিল, চেয়েছিল তার মতো রূপকও  যেন খুব ভালো রেজাল্ট করে। কিন্তু সেই চাওয়া যে তার জীবনকে এইভাবে শেষের দিকে নিয়ে যাবে, তার স্বপ্নগুলোকে ছারখার করে দেবে সে কখনো তা  কল্পনাই  করতে পারেনি। বারবার ক্ষমা চাওয়া সত্ত্বেও রূপককে সে ক্ষমা করতে পারে না। রূপকের প্রতি চরম অভিমান আর অব্যক্ত যন্ত্রণায় তার মনটা দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যেতে থাকে। আর এই সকল ঘটনা টিনার মনে এমন মানসিক চাপ সৃষ্টি করে যে সে আর সেইভাবে মনঃসংযোগ করে আগামী দিনগুলোয়  প্রস্তুত হতে পারে না। অনিচ্ছাকৃত ঘটনা পরম্পরায় জড়িয়ে পড়ে এমনভাবে সে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায় যে সেখান থেকে বাঁক ফিরে আর পর্বতের চূড়ায় ওঠার  স্বপ্নকে সে সফল করতে পারে না, ফলে বরাবর কলেজে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া  টিনার  ইউনিভার্সিটির ফাইনালে  ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় আর তারপর ধীরে ধীরে সুগভীর মানসিক অবসাদে সে ডুবে যেতে থাকে। অসহায় সুতাপারা স্বামীস্ত্রী মিলে মনোচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীর সাহায্যে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় । 

হঠাৎ করে রাতের অন্ধকারে সুতপা আবিষ্কার করে যে কথাগুলো তার বন্ধু  দেবযানী নয়,  পাশে শুয়ে থাকা অসুস্থ মেয়ে টিনাই  বলছে বিড়বিড় করে....


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন