শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বিপ্লব বিশ্বাস।। পারক গল্পপত্র



কিসসা - ১ :

রসিকলাল কেচ্ছাদার মানুষ। আবার ওজনদারও বটে। শহরের বুকে নাটক, গান, আর্ট ফিলিম এমন কি উত্তরাধুনিক সাহিত্য বিষয়ে এ হেন সমঝদারজন দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। গলিঘুঁজিতে এক দুজন লুকিয়ে থাকলেও তারা রসিকের মতো হাইলাইটেড নয়। লোকাল মিডিয়ার ভেঁপু রসিকের হয়েই বাজে বেশি। আর এই কারণেই টগবগে জাটিঙ্গা পাখির দল রসিকের আগুন - ফাঁদে ধড়াধ্বড় পড়ে ও পুড়ে পোড়খাওয়া হয়। 

রসিকের এখানেই শেষ নয়। সে হোমিয়োপ্যাথও। তবে অ্যামেচার। বায়োকেমিকের মিশেল পছন্দ করে না। আবার কাশি, গলাব্যথা না কমলে যে হেমোডোজের সঙ্গে কুসুমগরম জলে গার্গল করতে বলবে, তাও নয়। ও পুওর মাদার টিংচারিস্ট। এক্কেবারে র। আর এমনই এক র টিন - টিনার কী এক ক্রনিক সারাতে গিয়ে ঘেঁটে ফেলল সব। এক নিবিড়, নিশ্চুপ সাঁঝঘোরে। পরবর্তী ট্রিটমেন্ট করেছিল পাড়ার রোমিয়োরা। তবে টিনার নয়, রসিকের। বড়দেরও সায় ছিল পুরোদস্তুর। রোগ কিন্তু সারেনি। হেঁদুর গোরু খাওয়ার মতো বেড়েই গেছে। অবশ্য ভুলোমনা মানুষের স্বাভাবিক আচরণের কারণে রসিকও মিশে যেতে পেরেছে মূল স্রোতে। অনুত্তম মাস্টার সেই স্রোতেরই সাতপাঁচে না থাকা এক ছাপোষা। সে রসিকের পেশেন্টও বটে। আম - আমাশয়ের। উভয়ের মধ্যে বন্ধুভাবের চলন একান্তগোপন কথাচার অব্দিও। উভয়েই আসে যায়, উভয়ের থানে। এমনই এক ছুটি - সকালে অনুত্তমের ঘরে এসেছে রসিকলাল। বন্ধুপত্নী খুব একটা পছন্দ না করলেও আলগোছে এক ডিশ ফুলকো লুচির সঙ্গে বেগুনভাজা, কালাকাদ মেলে ধরে রসিকের জিভের ডগায়। নিচের ঘরে। দুই বন্ধুতে খেতে খেতে কথা। এ কথা, সে কথার পর বুড়ির আলাপাতার মতো সটান এগোয় অনুত্তম। সদ্যমৃত গাইনি ভ্রমরলাল বিষয়ে : 

ভ্রমর তো চলে গেল, রসিক। 

কোন ভ্রমর?, বেগুনের খোসা ছাড়িয়ে জানতে চায় রসিক। 

কেন? মায়েদের ডাক্তার ভ্রমরলাল ব্রহ্ম? তোমার ক্লাসমেট ছিল না? 

ও, ওই লম্পটটার কথা বলছ? ওকে আর মায়েদের ডাক্তার বোলো না, বলো মাগীদের ডাক্তার। যা সব কীত্তিকলাপ ওর! মায়েদের সঙ্গে! একবার তো এম সি আই ওর লাইসেন্সটাই খিঁচে নেয় আর কি। তারপর কোন এক মন্ত্রীটন্ত্রি ধরে... যত্তোসব। 

মুখময় তেতো ছিটিয়ে একটা গোটা কালাকাদ মুখ - পেটে ঠেসে দেয় রসিক। 

তবে যাই বলো, এই বয়সে দুম করে চলে যাওয়া...। নাম কিন্তু ছিল খুব! 

দাঁতফাঁকে আটকানো লুচি আঙুল চালিয়ে বাইরে এনে খেলতে চায় অনুত্তম। রসিক অভিজ্ঞতার ঝাড় দেয়, ও সব বুঝবে না তুমি। একে তো ইসকিমিক হার্ট। তায় রোজকার টনটনানি। পঞ্চাশ পেরনো হার্ট আর নেবে কত? শয়তানটা গেছে। মায়েরা বাঁচল।... এ কথা বলেই রসিক গলা উঁচিয়ে গেলাস -জল কোঁত কোঁত ঢালতে লাগল। 

অনুত্তম দেখল, জলরাশি যেন স্বরযন্ত্রের হাজারো ফুটো দিয়ে বাইরে ছড়াচ্ছে। তৃষ্ণা মেটাতে পারছে না রসিক- লীলার।       


কিসসা - ২ :

বেন্দা যে রাউতাড়া হাইয়ের ছোটো পিয়োন, এ কথা মানতেই চায় না বিরহী কানাড়া ব্যাঙ্কের কালিধন। তার দাবিতে বেন্দা ওই স্কুলের ছোটো করণিক, থার্ড ক্লার্ক। স্কুলের ড্রাফট করা বা অন্য জমাটমার কাজটাজ করতে গিয়ে তেমন পরিচয়ের বেলুনই ফুলিয়ে আসে বেন্দা। তার ইস্ত্রিপাট জামাপ্যান্ট, চোখে বচ্চনি চশমা, পকেটে উঁকি - মারা মোবাইল ক্লিপ কিংবা মুখনির্গত তিনশো জর্দার খুশবাইতে অবশ্য কেরানির চাইতে অনেকটাই বড় মনে হয় বেন্দাকে। বাড়িতে মধ্যেমাঝে নানা কাজে গেলে হেডস্যার বরদাকান্তকে বউয়ের বাণী শুনতে হয় এমনতরো, হেডমাস্টার তুমি না তোমার বেন্দা তা তো আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। সাতবাসি দাড়িতে আলখাল্লা বইপাগল বরদা মুচকি হেসে বলে, যে সে হলেই হল ; ঠাকুরের আসল নকল এখানে সবই একাকার, বুঝলে? আবার মাসে একবার বেতন - চাহিদার কপি নকলের কাজটি পা দুলিয়ে দুলিয়ে যখন করে বেন্দা, তখন বেশ বোঝা যায়, ওর মধ্যে করণিক - পোকা কিলবিলিয়ে বেড়াচ্ছে। তখন হেডস্যার আর বড় পিয়োনের সামনে সোজাকথার মেজো পিয়োন সত্যচরণ বলে ওঠে, বেন্দা, মাস্টামশাই, এমনটিই বলে বেড়ায় এখানে ওখানে। 

এ সব নিয়ে ফাঁকা সময়ে মস্করা হয়। এই করতে করতে সেদিন এক উড়ো ফোন। বরদাকান্ত তখন এগারোক্লাশে। ফোন ধরে ভোলাবাবু জানতে পারেন, স্কুলের ক্লার্ক বৃন্দাবনবাবুকে চাইছে কেউ। ভোলাবাবুর অসহ্য লাগায় যাচ্ছেতাই বলে ফোন নামিয়ে রাখেন। পরে বেন্দাকে চোটেপাটে নিয়ে মিথ্যে পরিচয়ের হাওয়া নিকেশ করে তবেই দম নেন। অন্যরাও এ সব জেনে যায়। কেউ হাসাহাসি করে, কেউবা ছিছিক্কার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো মন্দিরে একজন কর্মীর এ হেন লাগাতর মিথ্যাচার ঘোরতর অন্যায় বলে নিদান দেন ভোলাবাবু। ছাত্রদের মধ্যেও এর কু - প্রভাব পড়বে বলে চিন্তান্বিত মন্তব্য করেন তিনি। 

এই ভোলাবাবু, বরদাকান্ত আসার আগে মাসআটেকের জন্য টি আই সি হয়েছিলেন, রাউতাড়া হাইয়ের। তখন বাজারের মাছবালা, সবজিবালা, চালবালা সব তাকেই হেডস্যার জানত। মানে, ভোলাবাবু জানাতেন। ' কে আর অত খোঁজ রাখে ' বলে উঁচু মহলেও ঝেড়ে দিতেন এই পরিচয়। বরদা আসার পরেও ভোলাবাবুকেই হেডস্যার বলেছে অনেকে। সব শুনে বিষয় - মজা নষ্ট করতে চায়নি বরদা। আসল চেপে নকলে মজেছে। স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে। 

             আজ ক্লাস থেকে ফিরে ভোলাবাবুর তেজি গলায় যখন সব শুনল বরদাকান্ত তখন বুঝল, তার দীর্ঘদিন ধরে তারিয়ে তারিয়ে ভোগ করা মজাটি আজ উঠে গেল। তবু্ও শেষবারের মতো চেটেপুটে সে ঠাসল ভোলাবাবুকে। বলল,  সূচের ফুটো আপনি ঠিকই ধরেছেন ভোলাবাবু। ওর একটা হলেও আপনার এলেমও কম নয়। আর আপনার নামটাও সার্থক। তাই না? 

এর কোনও জবাব ভোলাবাবু দিতে পারেন না। 


কিসসা - ৩ :

ফিরছি তিনটের লালগোলায়। ইদফেরত ভিড় সামলে অর্ধেক পাছা ছুঁইয়ে যাতায়াতের পথ - ধারে বসতেই নজরে পড়ল, গুড়ের লম্বাটে ঠিলিটা। দড়িতে ঝুলছে। অ্যালার্ম - শেকলের নিচের ব্র‍্যাকেটে। ঠিলি - মালিকের পরিচয়পথে ওঁত পেতে থাকতে থাকতেই হকারপুঙ্গবদের গুঁতোয় জেরবার হচ্ছি। কখনও চা - ছোঁড়ার ছ্যাঁকায় দাপনা ছ্যাঁত তো কখনও মশলামুড়ির বিবিধ কৌটো - নকশায় সেই দাপনাই জরাসন্ধের মতো ভাগ হবার জোগাড়। তাকে টেনে স্বস্থানে আনতেই কানে আসে, কদ্দুর যাবেন? বহরমপুর শুনেই জানতে চান, কোথায়? রাইকানন, শুনেই বলে ওঠেন, মধুবাবুর বাড়ির কাছাকাছি নাকি? এই মধুবাবু মধুরকূল থানার ডাকসাইটে মেজোবাবু। সুনামের চাইতে কুনামই বেশি। অপছন্দের ছোট্ট ' হুঁ ' আলতো ছাড়তেই বুঝে নিলেন ডব্লিউ বি পির উর্দিপরা মাঝারি ভুঁড়িদার বক্তাবাবু। আপনি কোথায়? প্রশ্ন করতেই তিনি ' কাশিমবাজার' বলে যতিহীন চালিয়ে যেতে লাগলেন : আপনাদের মধুবাবু তো মশাই এলেমদার মাল। থানায় থানায় ঘোরে,  বিশাল তেতলা পাথর - বাড়ি তুলেছে। আবার ধুমসো মেয়েটাকেও লাখকয়েক দিয়ে গছিয়েছে তেলগড়ের বসাকবাড়িতে। ছ্যাঃ, ঘেন্না ধরে গেল মশাই পুলিশের চাকরিতে। আর মাসআটেক আছে। গেলে বাঁচি। এখন কোথায় আছেন? বসিরহাট। এবারে ঠিলি - রহস্য মালুম হল। কথা কিন্তু থামে না : জানেন মশাই, ছিলাম কাঁদি। পার্টির দুই বাছাধনকে ৪০২-এর এমন জটপ্যাঁচে ফেলেছি যে জীবনভর জেলের ঘানি টানতে হবে। খুব চুটুকপুটুক হয়েছিল। আবার বলে কিনা, পাঁচ দেব, রফায় আসুন। মাইনে পাই কেটেকুটে তিরিশ। হাবিজাবি ধরে পঁয়ত্রিশ ছাড়িয়ে যায়। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, পুনেতে থাকে। মেয়েকে বি এ করিয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। মেয়ের ঘরের মেয়ের দাদান হয়েছি। দ্যাবাদেবীর আবার কী চাই? আমায় কিনা বলে... বাঞ্চোত, আমি তোর রফায় পেচ্ছাপ করে দিই। সতীপ্রসন্নকে ঘুষ!... বেড়ে নাম বটে। যাহোক, একলপ্তে এতখানি বের করে সতীবাবু বুঝতে পারেন গাড়ি থেমে আছে, রেজিনগর। ক্রসিংজটে আটকে আছে। তা বুঝে আবার শুরু: বুইলেন মশাই, লালগোলার এই এক ঝামেলা। আটকাতে আটকাতে ঠিক নটা করবে। একবার ভাবলাম, বাসে আসি। তা সে পথও তো খানাডোবায় ভরা। তিনগুণ ভাড়ার কথা আমার মুখ ফসকানোর আগেই সতীপ্রসন্ন প্রসন্ন - চিত্তির মুখে টাঙিয়ে বলেন, উর্দিতে আছি তো, এলে বাসবালারা খুব খাতিরযত্ন করে। দারুণ খুশি হয়। 

আমি জানতে চাই, খুশি হয় কেন? 

এতক্ষণের বকবকম দারোগাবাবু এই ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর দিতে মুখ মোচড়ায়। কথা সরে না

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন