শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চমক মজুমদার।। পারক গল্পপত্র



লোক গুলো মাথা উঁচু করে দুঃশাসানের  দিকে তাকিয়ে থাকে। অবাক চোখে চেটে খায় সিরাজুলের মাথা থেকে পা পর্যন্ত। আর সিরাজুল হাতের চোঙাটা  মুখের কাছে এনে চেঁচাতে থাকে- “এক নিমেষে ব্যাথা উধাও। একটা ফাইল খেলেই গাঁটের ব্যাথা,বাতের ব্যাথা,মচকে যাওয়া ব্যাথা,পড়ে গিয়ে ব্যাথা হাপিস।বাজার ভর্তি লোকের মধ্যে দিয়ে লম্বা রণপা বাড়িয়ে এগিয়ে যায় কোমর থেকে মাটি পর্যন্ত প্রায় ফুট সাতেক লম্বা চোঙা প্যান্টটা লতপত করে। রঙচঙে জামা আর মাথায় শঙ্কু আকৃতির টুপি পড়ে সিরাজুল ব্যাথার ওষুধ বেচে যায়।

অবশ্য সারা বছর যে ও এমন করে ওষুধ বিক্রি করে তা নয়, আসলে দুঃশাসান যা কাজ পাই তাই করে।অবশ্য না করে উপাই নেই। বারিতে স্ত্রী আর বাচ্চার পেট চালানোর জন্য কিছু একটা করতে হবে। দুঃশাসান  অন্যের  জমিতে ধাঙর খাটে। আর বাকি সময় ওকে বাঁচায় ওদের পাশের পাড়ার রাকিব মণ্ডল। রাকিব কি করে তা দুঃশাসান জানে না। ওর জানার দরকার ও নেই। ছোট বেলায় ওর বাপ দুঃশাসান কে সিখিয়েছিল এই রণপা হাঁটা। ওর বাপ ও রণপা তে চড়ে যেন উড়ে বেরাত। শিখে যাওয়ার পর বাপে ছেলেতে  মিলে হত প্রতিযোগিতা । ওদের পাডার পাশে যে মাঠটা ছিল- তাতে লম্বা লম্বা বাঁশের ঠ্যাঙে চেপে দৌড়ে যেত দুই পুরুষ। দুঃশাসানের বাপ ও নাকি এই রণপা চড়া শিখেছিল তার বাপের কাছ থেকে। পাড়ায় এখনো সময়ে সময়ে ফিসফাস চলে দুঃশাসানরা  নাকি ডাকাত দের বংশধর। আতিতের ডাকাতরা নাকি ডাকাতি করে বাঁশের ল্পম্বা ল্পম্বা রণপা চড়ে পালাত দ্রুত। রাকিব অবশ্য দুঃশাসানের আয়ের পথ খুঁজে দেয় অন্যভাবে। এই যে আজকে ওর পিঠে আর চোঙা প্যান্টে কোম্পানির নাম সেঁটে ও ব্যাথার মলম বিক্রি করে, তা জোগাড় করে দিয়েছে রাকিবই। রাকিব সময় মতো জোগাড় করে দেয় সার্কাসে জোকারের কাজ। পুজোর শোভাযাত্রায় হাঁটা বা জন্মদিনে বাচ্চাদের মনোরঞ্জন করার জন্য রণপার কাজ। একবার তো পূজোর শেলে কাপড়ের দোকানের প্রচার, আর একবার ভোটের মিছিলে হেটেছে দুঃশাসান ।

পুরো বাজার টা ঘুরে পেয়ারা ওয়ালাটার শামণে দাঁড়ালো দুঃশাসান। ছেলেটার জন্য দুটো পেয়ারা নেওয়া যেতে পারে। দুঃশাসানের পাঁচ বছরের ছেলেটা বড়  রুগ্ণ। জন্মের পর থেকেই প্রায় বিছানাতেই শুয়ে শুয়েই কেমন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। বড্ড বায়না ওর। শুধু রণপাতে চড়ে দুঃশাসানের হাঁটতে দেখলেই ও চুপ। চোখের সামনে বাবাকে কেমন বড় হয়ে যেতে দেখে  আবাক চোখে। দুঃশাসান রোজ চেষ্টা করে ছেলের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যায়।

পেয়ারা কত করে গো? বাঁশের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেও। 

 দাম শুনে কয়েক মুহূর্ত হিসাব করে নেয়। পকেটে যা পয়সা আছে তাতে সবকিছু সামাল দিয়ে কিনতে পারবে কিনা। বাজারে আসা লোকজন ঘিরে ধরে ওকে। দ্রুত কাঁধের ঝুলিতে দুটো কমলা কিনে ভরে নেয় সিরাজুল, চোঙা মুখে চ্যাঁচ্যাঁতে থাকে- গাঁটের ব্যাথা,বাতের ব্যাথা,মচকে যাওয়া ব্যাথা,মচকে যাওয়া ব্যাথা...

ঝটপট বিক্রি করতে থাকে ব্যাথার ওষুধের ফাইল। বাজারে ঘুরঘুর করতে থাকা কয়েকটা অর্ধ উলঙ্গ বাচ্চা তাদের নোংরা হাত পা নিয়ে আবাক চোখে তাকিয়ে থাকে উপরের দিকে- একটা ঢ্যাঙা লোক কেমন অবলীলাক্রমে আকাশের কাছা কাছি পৌঁছে যায়।

দুঃশাসানের বাড়িটা শহরের একেবারে প্রান্তে। আসলে ওদের বাড়ীর এলাকাটা গ্রামই ছিল। পাশেড় শহরটা বাড়তে বাড়তে ওদের পাড়াটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাড়া বলাটা অনেকাংশে ভুল। এখন এখানে বাস করে কয়েকটা ঘর। বাকিরা একটু স্বচ্ছল হতেই সরে গিয়েছে শহরের পেটের ভিতরে। কেই বা আর প্রান্তিক  হয়ে থেকে যেতে চায়। এখন এখানে যারা থাকে তারা সবাই দুঃশাসানের সমগোত্রীয়।– আর্থ সংস্থানের দিক ঠেকে।বাড়ী গুলো একটু ছাড়া ছাড়া। একদিকে শহরের সমস্ত আবর্জনা ফেলাড় জায়গা। কটু দুর্গন্ধে ছেয়ে থাকে পুরো এলাকাটা। ক্ষুধার্থ শহর আর কেণো এইদিকে আগ্রসর হয়নি বুঝতে কষ্ট হয় না।দুঃশাসানের বাড়ি শহরের সিমারেখায়। বাড়িটার পর থেকে বিস্তীর্ণ পতিত জমি।জমি পার করে উঁচু বাঁধের উপর রেল লাইন।খাতায় কলমে শহরে থাকার সুবাদে বারী গুলোয় ইলেকট্রিক লাইন এসেছে বটে। তবে কারেন্ট কখন থাকে কখন থাকে না তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। সে নিয়ে ে চত্বরের বাসিন্দাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। সম্ভবত কম বিদ্যুৎ খরচ হলে কম পয়সা লাগবে এই চিন্তা থেকেই। টি ভি গ্যাসের মতো নাগরিক উপকরনও জমা হয়েছে এই  বাড়ি গুলোয়।

বাড়িটা বড্ড প্রিয় দুঃশাসানের। প্রতিদিন কাজের শেষে শান্তির ঘুমটা বাড়ি এসে না দিলে বুকের ভিতরটা ওর কেমন যেন উথাল পাথাল করে। সার্কাসে কাজ করার সময় টানা অনেক দিন বাড়ির বাইরে ছিলও। নিজেকে তখন কেমন অস্থির অস্থির লাগত। ও বেশ বুজতে পারে বাড়ির থেকে ও বেশি টানে বাড়ির মানুষ গুল।বউ ছেলের সাহ চা ওর সারাদিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।আজকাল ছেলের বায়নাটা একটু বেশি বেড়ে গেছে, এই সারাদিনের কাজের শেষে এই অবাস্তব বায়নাক্কা সামাল দিতে দিতে দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়ে দুঃশাসান। রাগ হয় খুব। তাবু রাগ কমলে ছেলের প্রতি স্নেহটাই উপচে ওঠে। সেদিন তিভি দেখতে দেখতে ছেলে বায়না ধরল- আমায় একটা গাড়ি চাই।

-ঠিক আছে সোনা, বাবা এবার মেলায় কাজ করতে তোমার জন্য একটা খেলনা গাড়ি এনে দেবে। দুঃশাসনের বউ বায়না সামাল দিতে চেষ্টা করে।

- খেলনা নয়, আমার আসল চাই।

- আসল কি করে কিনব সোনা। আমরা তো গরীব। ওসব বড় লোকেরা কিনতে পারে।

-কেন? বাবাও তো বরলক! বাঁশের পা’টা লাগিয়ে কত বড় হয়ে যায়।

ব্যাথার ওষুধ বিক্রি করতে করতে ছেলের কথাগুলো মনে পড়ে দুঃশাসনের।

রাতের খাওয়া সারতে না সারতেই বিদ্যুৎ চলে যায় দুঃশাসনের পাড়ায়। আজ বড় ধকল গেছে দুঃশাসনের কাট ফাতা রোদ্দুরে রনপায় হেঁটে হেঁটে ওষুধ বেচা। ও যেন সূর্যের একটু বেশি কাছে চলে  গিয়েছিল । রাকিবের কাছে পয়সা বুঝিয়ে আসার সময় জেনে নিয়েছে আগামি কালের কাজ। একটা জন্ম দিনের পার্টি । তারমানে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা,বসার সুযোগ নেই।রাতে খওয়ার পর শরীর ভেঙে পড়তে আসে। ঘুম জড়িয়ে ধরে। রণপা দুটোর ওপর হাত বোলায় দুঃশাসন। বাঁশ দুটোর নিচে রবারের প্যাড। উপরের দিক্তা,জেতা ওর হাঁটুর কাছা কাছি থাকে, সেখানে টায়ার কেতে লাগানো। বাইরের ঘরে পা দুটোকে শুইয়ে শোওয়ার ঘরে ঢোকে দুঃশাসন।

লোডশেডিং হলেও মাঠের ধারের জানালা দিয়ে বেশ হাওয়া ঢোকে ঘরে। চৌকির উপর ছেলেকে ঘুম পড়াচ্ছে ওর মা। মেঝেতে কম্বল পেটে শুয়ে পড়ে সিরাজুল। বাঁধের উপর থেকে একটা ট্রেন চলে গেল। মাঠ পেরিয়ে তার ঝম ঝম শব্দ ক্ষীণ ভাবে এসে পৌঁছায় দুঃশাসনের ঘরে। ট্রেনের কামরার সাদা ফ্যাট ফ্যাটে আলো  কাঁপতে থাকে পতিত জমির আগাছায়।আজ পূর্ণিমা। চাঁদ দেখা যাচ্ছে রেল লাইনের সামান্য উপরে। কমলা রঙের টকটকে বলের মতো গোল চাঁদ।

-আয় আয় চাঁদ মামা তিপ দিয়ে যা। ছেলের গায়ে আলত চাপড় মারে মা।

-মা আমার চাঁদ চাই।

-মানে? অবাক হয় দুঃশাসনের বউ।

-ওই চাঁদটা আমার চাই।

-আজ বাবা কেমন দুটো পেয়ারা এনেছে সোনা। ছেলের মতি গতি দেখে কেমন ভোলাতে শুরু করে মা।

-না আমার পেয়ারা চাইনা। ওই চাঁদটাই চাই।

বায়না ধরে ছেলে খনখনে কান্নার শব্দ ও শুরু হয়। মা বুঝিয়ে উঠতে পারেনা। বায়না গাড় থেকে গাড় তর হয়।

ধুত্তোর। সারাদিন খাটা খাটনির পর যে একটু ঘুমোব তার জো নেই। রেগে উঠে পড়ে দুঃশাসন। বিরক্তি তার চোখে মুখে।

তুমি আবার উঠলে কেন? আমি ওকে সামলাচ্ছি... তুমি শোও। মোলায়েম করে বোঝাতে চাই দুঃশাসনের বউ।

দুঃশাসান রেগে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ওর স্ত্রী বুঝে উঠতে পারে না তার কি করা উচিত। বরকে বুঝিয়ে ঘরে এনে শোয়াবে নাকি ছেলের বায়না ভোলাবে। শেষে ছেলের পাশে শুয়ে বোঝাতে থাকে। কিন্তু ছেলে চাঁদকে হাতে পাওয়ার বায়না থেকে একচুল ও নড়ে না। মা তাকে ভোলানোর চেষ্টা করতে থাকে। লোভ দেখাতে থাকে। গলা গম্ভীর করে বকা দেয়। ভালবেসে বুকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু ছেলের বায়না থামেনা।সেই খ্যান খ্যান কান্না, সাথে আব্দার।।ক্লান্ত, ব্যর্থ মা ফ্যাল ফ্যাল চোখে পতিত মাঠের দিকে চেয়ে থাকে।কি করবে বুঝে ওঠে না।ভেজা চোখে ছেলে ও তাকায় গোল চাঁদের দিকে – হাতে পাওয়ার আকুতি নিয়ে। দুজনেই দেখে একটা ছায়া মূর্তি মাঠ পেরিয়ে উঠে পড়েছে রেল লাইনের বাঁধের উপর। ছায়াটা অস্বাভাবিক লম্বা। রেল লাইনের উঁচু বাঁধটায় দাঁড়িয়ে সে দুহাতে বলের মতো ধরেছে চাঁদটাকে। চাঁদটা এখন ছায়া মূর্তির দুহাতের মধ্যে। ছেলেটা ওর কাছে আকাশের চাঁদ। যার মিঠে আলোয় ভরে যায় দুঃশাসনের জীবন।


২টি মন্তব্য: