মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অমল কৃষ্ণ রায়।। পারক গল্পপত্র



চলতে চলতে বাইকটা হঠাৎ থেমে গেল। থামার কারণ যে তেলের ঘাটতি নয় সেটা

নিশ্চিত, কারণ গতকালই পাঁচশো টাকার তেল ভরেছিলাম। সন্ধাপেরোনো মিশকালো

অন্ধকারে ধরলা নদীর লম্বা পাকা ব্রীজটাতে আমি একা। নিজেকে সারাদিনের

ক্লান্ত শরীরে বেশ অসহায় মনে হচ্ছে। যদিও এটা আমার চেনা রাস্তা। প্রায়

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পথেই স্কুলে যাতায়াত করছি। তবুও একটু যেন

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। কী করা যেতে পারে ভাবতে লাগলাম। আমার

বাইকের মেকানিজমের জ্ঞান বলতে শুধু প্লাগের ইলেকট্রিক সমস্যা মেটানো।

বড়জোর দহনযন্ত্রটা খুলে একটু ঘষে দিতে পারি। তার বেশি কিছুই জানি না।

অগত্যা সেই চেষ্টাটা করতে অন্ধকারে আন্দাজের উপর ভর করে ডিগ্গি খুলে

হাতড়িয়ে  রেঞ্জপাতি বের করে নিলাম। তা দিয়ে ইগনিশন টেষ্ট করলাম। না,

দিব্যি চোখধাঁধাঁলো একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে এল। তার মানে গাড়ি

ইগনিশন টেস্টে পাশ করে গেছে। এবার অন্যকিছু প্রোবলেম মেটানোতো আমার পক্ষে

সম্ভব নয়। তাহলে এই রাতে নির্জন জায়গাটায় দাঁড়িয়ে কী করতে পারি? ক্রমশ

অন্ধকারের গাঢ়ত্ব বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন নিজের হাতটাই দেখতে পারছি

না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে একটা সুখটান

দিলাম। সিগারেট আমার জীবনে অনেক সমস্যা মিটিয়ে দেয়। এরকম বহু নজির আছে।

পথেঘাটে বিপদে পড়লে তখন মনে হয় সিগারেটই আমার সঙ্গী। বাইকে হেলান দিয়ে

দুই টান দিতেই মনে পড়ে গেল, এই ধরলার পাড়েইতো আমার এক প্রাক্তন ছাত্র

বিজনের বাড়ি। কতদিন ও আমাকে রাস্তায় দেখলে হাত কপালে ঠেকাত। বাড়িতে

যাবার জন্য আবদারও করত। কোনওদিন যাওয়া হয়নি। পুরনো ছাত্রদের মধ্যে এখনও

শিক্ষকের প্রতি যথেষ্ঠ ভক্তিশ্রদ্ধা আছে, যা কালের স্রোতে ক্রমশ বিলিন

হতে চলেছে। ধরলার নদীর ব্রীজ যখন তৈরি হয়, তখন বিজনেরা এখানে একটা

অস্থায়ী ডেরা তৈরি করে ভাততরকারির হোটেল খুলেছিল। বেশ রমরমিয়ে চলত

হোটেলটা। ব্রীজের সব লেবারমিস্ত্রিরা এখানেই খেত। হোটেল চালিয়ে লাভের

টাকায় ঘরটাকে ভাল করে বানিয়েছিল বিজনের বাবা। আমিও দুএকদিন এদের হোটেলে

চাপান খেয়েছি। ব্রীজ উদ্বোধনের পরে সে হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। কারণ শ্রমিক

ছাড়াতো বাইরের কাস্টমার খুব একটা ছিল না। বহুদিন ধরে স্কুলে যাওয়া আসার

পথে সেই নির্জন বাড়িটার দিকে তাকাই। কোনওদিন বিজনকে দেখি না। ঠিক করলাম,

আজ বিজনের বাড়িতে গিয়ে হাজির হব। বাইকটাকে রাস্তার পাশে রেখে রাস্তা

থেকে নীচে নেমে বাড়ির কাছাকাছি এসে হাঁক দিলাম, বিজন বাড়ি আছিস? কোনও

উত্তর কানে এল না। বাড়িটা অন্ধকারে কেমন যেমন পোড়োবাড়ির মতো মনে হল।

এবার মনের ভিতর ভয়টা জাঁকিয়ে বসল। নিজের অতি চেনা নিত্যদিনের রাস্তার

পাশে নীচু জমিতে অন্ধকারে আমি একা। মশার ঝাঁকের আওয়াজ কানে আসছে। দুএকটা

কামড়ও বসাচ্ছে। সভয়ে কাঁপা গলায় আবার ডাকলাম, বিজন আছিস? ভূতের মতো একটা

অবয়ব চোখে পড়ল। ক্রমশ আমার দিকে আসছে। একেবারে কাছে আসাতে বুঝলাম, একজন

মহিলা, মাথায় ঘোমটা কোলে বাচ্চা নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

‘বিজনের ঘর ইটভাটা গেইছে। তা তোমরা কাঁয় বারে?’

‘আমি ওর মাস্টারমশায়।’

বলেই নিরাশ হয়ে রাস্তায় উঠার জন্য পা বাড়ালাম। চোখে পড়ল আরেকজন মধ্য

বয়স্কা মহিলা হাতে একটা ঝুড়িমতো নিয়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। হাতে

একটা কুপি। কুপির ছোট্ট আলোতে মহিলার মুখমণ্ডল স্পষ্ট দেখতে পেলাম।

মহিলার বয়স আমার মতোই, পঞ্চাশের ধারেকাছে হবে হয়তো। মুখের আদলটা সামান্য

কুপির আলোতে চিনে নিতে ভুল হল না। বিস্মিতস্বরে ডাকলাম, তুমি মনীষা না?

আমার খুব কাছে এসে মহিলা থমকে দাঁড়াল। অবাক কণ্ঠে বলল,

‘কে?’

‘আরে আমি দ্বৈপায়ণ। চিনতে পারছ না?’

‘দ্বৈপায়ণ মানে তুমি-তুমি মাস্টার দ্বৈপায়ণদা!’

আমি ইতিবাচক উত্তর দিলাম। মনীষা কয়েকপা এগিয়ে একেবারে আমার খুব কাছাকাছি

এসে দাঁড়াল। এতটা কাছে যে, ওর শ্বাসের শব্দ আমার বুকে আছড়ে পড়ছে। একটা

যেন উষ্ণ অনুভূতিতে আমি শিউরে উঠলাম। প্রায় তিন দশক পরে এক চেনা উষ্ণতা

যেন আমার বুকে আদর করে দিল। দেখলাম, মনীষা এখন আর আগের মতো নেই। মুখমণ্ডল

আর গলার স্বর বাদে সবই পালটে গেছে। অন্ধকারেও মনীষার বার্ধক্য আমার চোখ

এড়াল না। ভারিক্কি চেহারার মনীষার কটা রূপোলি পাকা চুল কপালের উপর

চিকচিক করছে। নদীর পাড়ের সিক্ত মৃদু বাতাসে চুলগুলো মাঝেমাঝে কেঁপেকেঁপে

উঠছে। লাজলজ্জ্বার মাথা খেয়ে দুজনে দুজনের দিকে অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে

রয়েছি।

‘তুমি এখানে এত রাতে কী করে এলে?’

‘আরে আমার গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে। তাই মানে...।’

‘কারও সাহায্য চাইতে এসেছ?’

‘ঠিক তাই।’

‘গাড়িটা নষ্ট হয়ে ভালই হয়েছে। নইলে তো তোমাকে আর দেখতে পেতাম না। দেখেছ,

আমার চল্লিশ পার হওয়া চালশেধরা চোখেও তোমাকে চশমা ছাড়াই চিনে ফেললাম।’

‘আমিও তোমাকে দেখেই চিনে ফেলেছি। তা তুমি এখানে কী কর?’

‘কী আর করব, এখানেই থাকি।’

‘এই জনশূন্য নদীর পাড়ে তোমার বাড়ি!’

‘হ্যাঁ, অবাক হচ্ছো। কিন্তু এটাই সত্যি। তুমি আমাকে বলেছিলে না, মাধ্যমিক

পাশ করতে পারলে আমাকে বিয়ে করবে। আমি পাশ করার জন্য বারবার চেষ্টা করেছি,

পারিনি। তারপর তুমি একদিন এই ধরলার পাড়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা বন্ধ

করে দিলে। বুঝলাম, একজন শিক্ষকের স্ত্রীর যোগ্যতার মাপকাঠির পরীক্ষায় আমি

ডাহা ফেল করেছি। তখন আর কী। যে ধরলার পাড়ে বসে তোমাকে নিয়ে স্বপ্নের জাল

বুনতাম, সেই ধরলার পাড়েই সন্ন্যাস জীবন কাটাতে শুরু করলাম। একটা

রাধাগোবিন্দ মন্দির করেছি। তাতে দুবেলা ভক্তদের ভোগ আসে। তাতেই দিন কেটে

যায়। ঐ দেখো। আমি একা বকবক করে যাচ্ছি। তোমার খবর বল এবার।’

‘আমি মাধবীকে বিয়ে করেছিলাম। তুমি বোধহয় চিনতে ওকে। তোমাদের একক্লাস নিচে

পড়ত। পড়াশনায় খুব ভাল ছিল।’

‘হ্যাঁ, মনে পড়েছে। প্রতিবারই ক্লাসে ফার্ষ্ট সেকেণ্ড হতো। রোগামতো

ছিপছিপে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা।’

‘হ্যাঁ, সেই মাধবী। দুটো সন্তান জন্ম দিয়ে হঠাৎ চলে গেল।’

‘চলে গেল মানে! তোমার স্ত্রী নেই?’

 ‘না।’

 ‘না’ উচ্চারণটা খুবই মৃদুস্বরে বললাম। আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছিল না।

নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। মাধবীর জায়গায় আমি মনীষাকে ভাবতে লাগলাম।

কী এমন ক্ষতি হতো? মাধ্যমিক পাশ না হয় মনীষা নাই করল। মাধবী জীবনে এতগুলো

পাশ করে কী দিতে পেরেছে আমায়? শুধু ডাক্তার, কাড়ি কাড়ি টাকার ওষুধের

উপর নির্ভর করে কটা বছর বেঁচে শেষে তার অশক্ত শরীরটা একদিন নেতিয়ে পড়ল।

আর মনীষা এখনও শরীরের বাঁধনটা দিব্যি ধরে রেখেছে। ওর মনে কষ্ট দিয়ে সরে

গিয়েছিলাম। সে কষ্টটা বিধাতা আমাকে বুমেরাং করে আমার উপর ঢেলে দিল।’ আমি

যখন আপনমনে মনীষা আর মাধবীর মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনায় বুদ রইলাম, তখন

মনীষা আমার চটকা ভাঙল,

‘কী ভাবছ? চল আমার আশ্রমে বসে বিশ্রাম নাও। চাইলে রাতে থাকতেও পারো। কোনও

অসুবিধে নেই। অবশ্য তোমার যদি কোনও আপত্তি না থাকে।’

‘চলো তোমার আশ্রমটা দেখব।’ মনীষার পিছু পিছু হেঁটে চললাম। মনীষা আবার

পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করল,

‘বলতে পারো, মাধ্যমিকের অঙ্কটাই আমাকে এ জীবনে ঠেলে দিল। আমারইবা কী দোষ

বল, আসলে অঙ্কটা যে আমার মাথায় কোনওদিনই ঢুকত না। তুমি আমাকে শর্ত

দিয়েছিলে, কোনওরকমে একটা মাধ্যমিকের পাশ মার্কশীট চাই। আর কিছু না।

বুঝতাম, ঐ পাশ মার্কশীটটা শুধু তোমার স্টেটাস মেইনটেইন করার জন্য দরকার

হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমি সেটা...।’

বলতে বলতে মনীষা থেমে গেল। আমিও চুপচাপ তার সঙ্গে হাঁটছি। একটা

শালকাঁঠালের বনের মাঝের এক মেঠো পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম মনীষার আশ্রমে।

দেখলাম, একটা মন্দির, তার পাশে বেশকিছু থাকার ঘর। মন্দিরে রয়েছে কিছু

ভক্ত। পুরুষ এবং নারী উভয়েই। মনীষা তাদেরকে দেখিয়ে বলল, এরাই আমার বন্ধু।

বলতে পারো আমার মতোই ওরাও কেউ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। অনেকে

অবশ্য তার থেকেও কম পড়াশুনা করেছে। অক্ষর জ্ঞান নেই এ রকমও অনেকে আছে।

বুঝলাম, মনীষা আমাকে এসব বলে মনে জ্বালা মেটাচ্ছে। আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে

ওর কথাগুলো হজম করলাম। কারণ, পঁচিশ বছর আগে আমিই ওর ভিতরে রাবণের চিতার

মতো একটা ক্ষোভ, অভিমানের চিতা জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। আজ ওর বলার মতো

সময়সুযোগ এসেছে। বলে যাক। বলে ও শান্ত হোক। আমি নীরবে সব শুনে যাই।

মনীষা আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ওর ঘরে বসাল। ঘরে শুধু কিছু সাদা গেরুয়া

কাপড় একটা বাঁশের উপরে ঝুলানো রয়েছে। কোথাও আর কোনও রঙ  চোখে পড়ল না।

বিছানার চাদর টানটান করতে করতে মনীষা বলল,

‘এই আমার ঘর। এই কোনওরকমে থাকা আর কী।’ কথাটা বলে মনীষা বাইরে কাকে ডেকে

কী যেন বলে এল। আমার চোখ তখন মনীষার ঘর জরিপ করছে। ছোট্ট ঘরটাতে একটা

প্রশান্তির বাতাবরণ আমাকে স্নিগ্ধ করে তুলল। এতক্ষণ ধরে গাড়ি খারাপ

হওয়াতে আমার উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেল, সবই বেমালুম ভুলে গেলাম।  মনে হল

ঘরটাতে এমন দামি কিছু না থাকলেও জীবনের ন্যূনতম চাহিদায় বেঁচে থাকার জন্য

যা দরকার সবই আছে। বুঝে নিলাম, মনীষা এই ধরলার নির্জন পাড়ে নিজেকে

ভালভাবে থাকার মতো একটা মনোরম পরিবেশ গড়ে তুলেছে।

‘চা খাবেতো?’ নিজের কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে মনীষা কথাটা বলে আমার দিকে

তাকাল। কোনওরকম ভান না করেই বললাম,

 ‘পেলে ভালই হতো। ইনফ্যাক্ট শরীরে অনেকটা ধকল গেছে।’

 ‘করে আনছি। তা চায়ে চিনি খাওতো?’

 ‘না। সুগারটা বর্ডার লাইনে। তাই ডাক্তারের বারণ আছে।’

‘ও, ঠিক আছে। তোমাকে আদা গোলমরিচ দিয়ে করে দিচ্ছি। দুধ চা নাকি লাল চা?’

‘লাল হলেই ভাল হয়। কারণ দুধ চায়ে আমার প্রচণ্ড অ্যাসিড হয়।’ ‘ঠিক আছে করে দিচ্ছি।’

বলেই মনীষা দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। খানিকবাদে একজন যুবক এসে বলল,

আপনার বাইক কি খারাপ হয়েছে?

 ‘হ্যাঁ।’

‘চাবিটা দিন। আমি বাইকটা রাস্তা থেকে নিয়ে এসেছি। মেকানিক এসেছে প্রোবলেমটা দেখতে।’

কৃতজ্ঞচিত্তে আমি পকেট থেকে চাবিটা বের করে যুবকের হাতে দিলাম। এরই মধ্যে

মনীষা চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। আমার হাতে তুলে দিল গরম চায়ের পেয়ালা। তখনই ওর

হাতের আঙ্গুল আমার হাতের সংস্পর্শে এল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আমি যেন

শিহরিত হলাম। সেই শিহরণ। ঠিক পঁচিশ বছর আগে ধরলার পাড়ে দুজনে পাশাপাশি

বসে যখন ওর নরম হাতটা ধরে নিতাম, তখন যেমন একটা শিহরণ হতো। চায়ে চুমুক

দিয়ে ভাবতে লাগলাম, আড়াই দশক পরে এখনও মনীষার হাত কী করে সেই একইরকম

থাকে। তবে কি সাত্ত্বিক আহার, সাত্ত্বিক জীবনযাপন, সাধনমার্গিক মন তার

জীবনীশক্তিকে এতটা অটুট রেখেছে। কালের নিয়মে ভাঙন ধরেনি।

মুখে কিছু বললাম না। চায়ে চুমক দিয়ে মনীষার কথাগুলো গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম।

‘দ্বৈপায়ন, তুমি আমার আশ্রমটা একবার দেখবে না?’ মনীষা আবদারের সুরে বলল।

‘অবশ্যই দেখব। তোমার নিজহাতে পাতা একটা সাধ্বীজীবনের সংসারটা দেখে যাবই।’

‘হ্যাঁ, বলতে পারো তাই। আসলে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে শুনে আমি প্রথমে খুব

মুচড়ে পড়েছিলাম। কী করব ভাবতে পারছিলাম না। তখন মাঝেমধ্যে একাএকা এই

ধরলার পাড়ে এসে বসে থাকতাম। তোমার সান্নিধ্য অনুভব করতাম। মনে হতো, তুমি

পাশে বসে আছো। ঠিক আগের  মতো আমাকে নানারকম স্বপ্ন দেখাচ্ছ। কী করে

সংসারজীবনে আমরা পা দেব। একটা ছোট্ট বাড়ি হবে। একটা বা দুটো সন্তান হবে।

সে ছেলে হোক বা মেয়েই। তার বেশি নয়। তারপর আমরা সন্তানদের ঘিরে চলবে

আমাদের নানা জল্পনাকল্পনা। তাদের ভবিষ্যৎ একটু একটু করে বুনতে থাকব।

তারপর একদিন তাদের হাতে গোটা সংসার ছেড়ে দিয়ে আমরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাব।

তখন শুধু নীরবে তাদের সংসার দেখে যাব। কোথাও নাক গলাতে যাব না। স্বপ্নের

মতো একটা ঘোর আমাকে অনেকক্ষণ ডুবিয়ে রাখত। বিশ্বাস করো। এই সময়টায় আমি

ভুলেই যেতাম, আমি যে একা। সেই তুমি আর আগের মতো কোনওদিন এই ধরলার পাড়ে

ফিরে আসবে না। এরইমধ্যে একদিন বাবা চলে গেল। মা-তো অনেক আগেই গত হয়েছেন।

দাদার বিয়ে হয়েছে। দাদাবউদির সংসারে আমি ক্রমশ একটা বোঝা হতে লাগলাম। তখন

ঠিক করলাম, সাধ্বীজীবন বেছে নেব। এই ধরলার পাড়েই একটা রাধাকৃষ্ণের

মন্দির করব। দাদাকে সেটাই জানালাম, আমাকে বিয়ে দিতে হবে না। তুই শুধু

আমাকে ধরলার পাড়ে ছোট্ট একটা মন্দির করে দে। দাদা তাই করল। একটা মন্দির

বানিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজের সংসারের জঞ্জাল সাফ করল। এখানে

আসার পর আমার মতো সহায়সম্বলহীন কিছু মানুষ এগিয়ে এল। মন্দিরে পুজোর

নৈবিদ্যি আসতে লাগল। বলতে পারো মানুষের ধর্মভীরুতাই হয়ে উঠল আমার বেঁচে

থাকার রসদ। তানাহলে তুমি ভাবো, ভক্তরা নৈবিদ্যি নিয়ে না এলে কী খেতাম?’

‘এভাবে বলছ কেন? তোমার মধ্যে কি ধর্মবিশ্বাস নেই? অবশ্যই আছে। তানাহলে এত

বড় মন্দির করলে কী করে?’

 ‘সত্যি কথা কী, একসময় আমার মধ্যে শুধু তুমিই ছিলে। আর কোনও কিছুর প্রতি

আমার বিশ্বাস বা টান অনুভব করতাম না। তারপর ধীরে ধীরে একটা অদৃশ্য সত্তা

সে জায়গাটা দখল করে নিল। তাই বলতে পারো সেই অর্থে আমার মধ্যে কোনও

ধর্মোন্মাদনা নেই। আমি দেবদেবীসত্তাকে নিজের পরিবারের একজন মনে করি। তাই

এখন আমার মনে হয়, কিছু না থেকেও আমার সবই আছে।’

বাইরে থেকে বাইকের গোঙানি আওয়াজ কানে এল। খুব চেনা আওয়াজ। বুঝলাম। আমার

বাইক ঠিক হয়ে গেছে। মনীষা বলল, তোমার বাহন ঠিক হয়ে গেছে। চিন্তা নেই।

এবার নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারবে। চল তার আগে নদীর পাড়টায় একটু ঘুরে

আসি। বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। মন্দিরচত্বর পেরিয়ে চলে গেলাম ধরলা নদীর

পাড়ে। খুব চেনা জায়গা। দেখলাম, এখনও অনেকটা সেইরকমই আছে। পার্থক্য শুধু

নদীতে আগে একটা লম্বা কাঠের ব্রীজ ছিল। পরবর্তীতে পাকা ব্রীজ হয়েছে।

পাশাপাশি হেঁটে যেতে যেতে মনীষা একটা উঁচু টিলার মতো জায়গা দেখাল। চিনতে

পারছো এই জায়গাটা? মনে পড়ে গেল। এখানেইতো আমি আর মনীষা বসে অনন্ত সময়

কাটাতাম। আজ চায়ের কাপে যে স্পর্শানুভূতি পেলাম, সেটা প্রথম এই টিলায়

বসেই পেয়েছিলাম। তারপর যা হয় আর কী। মাংসের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো তখন

প্রতিটা বিকেল মনীষার কথা খুব মনে পড়ত। এসে পড়তাম দুজনে ঠিক এইখানে।

‘আজ বসবে এখানে?’ জানতে চাইল মনীষা।

কথাটা শুনে আমতাআমতা করলাম, না-না। কে কী ভাববে?

‘আমি কারও ভাবার পরোয়া করি না। তাছাড়া আজ বসলে তো আগের মতো তোমার সঙ্গে

গায়ে গা লাগিয়ে বসতে পারব না।’

‘তাহলেতো বসাই যায়।’

 মনীষা আর আমি উঠে পড়লাম সেই টিলায়। তারপর দুজনে তফাতে বসে পড়লাম।

বসামাত্র যেন স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল। পঁচিশ বছর আগের সেই সময়, বয়স,

উন্মাদনার ছবি ভেসে উঠল আমার চোখে। তখন কত কথা বলত মনীষা—

শোনো দ্বৈপায়ণ, আমি একটা সাফ কথা বলি। আমার দ্বারা জীবনে মাধ্যমিকের

অঙ্কে পাশ করা সম্ভব নয়। তাই তুমি আমাকে এই কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিও না যে,

পাশ করলে তবে বিয়ে করবে। তাতে কী হয় জানো। অঙ্ক করতে গিয়ে তোমার কথা মনে

করে আরও বেশি করে ভুল করি। আর মাস্টারমশায়ের বকা খাই। পরীক্ষার হলেও তাই

হয়। যখন অঙ্ক কিছুতেই মিলতে চায় না, তখন তোমার কথাটা মনে পড়ে যায়। তখন

আরও বেশি করে ঘাবড়ে যাই। মনে হয় যেন তোমাকে বোধহয় কেউ আমার কাছ থেকে

ছিনিয়ে নেবার জন্য পরীক্ষার হলে বসে একের পর এক অঙ্ক মিলিয়ে যাচ্ছে। তাই

বলছি, শর্তটা তুলে নাও। খোলামনে বল, আমি পাশ করি-না করি আমাকে তুমি বিয়ে

করবে।

 মনীষার কথায় আমি তখন কিছুতেই টলতাম না। বলতাম, চেষ্টা করে যাও। ঠিক

পারবে। সবাই পারে, তুমি কেন পারবে না? শুধু তো একটা পাশ। তাতে আমার

বাবামায়ের ইচ্ছেটা পূরণ হবে। আমার কথা শুনে মনীষা ভীষণ রেগে যেত। যাও,

তোমার সঙ্গে আমার আড়ি। তারপর নিমেষে সে রাগ গলে জল হয়ে যেত। আমার হাতটা

নিজেই কাছে টেনে নিত।

আজ খুব ইচ্ছে করছিল আজ আবার মনীষার হাতটা নিজের মধ্যে টেনে নিই। ঠিক আগের

মতোই। মনীষার স্থির দৃষ্টি তখন নদীর দিকে। ওর দিকে তাকাতেই যেন আমার চোখ

শ্রদ্ধায় নত হয়ে এল। তাই হাতটা একটু বাড়িয়েও সরিয়ে নিলাম। সাহস হল না

তাকে ছুঁতে। মনে হল মনীষা এখন সাধারণ মেয়ে নয়। দেখলাম, তার চোখে যেন

দিব্যজ্যোতি রয়েছে। একজন ভোগবিমুখ, ত্যাগশীলা, মহিয়সী নারী আমার পাশে

বসে। স্নিগ্ধ সাদাকাপড় পরিধায়ী মানুষটির সারল্যে ভরা মুখমণ্ডল। পরম

তৃপ্তিতে একাগ্রচিত্তে সে কী যেন প্রত্যক্ষ করছে। একবার বলতে চাইলাম,

মনীষা, তুমি এখনও কত সুন্দর। বলার সাহস হল না। তাই আমি মাথা নীচু করে

চুপচাপ বসে রইলাম। মুখ খুলল মনীষা,

’এখানে এলে তোমার মতো কারও সান্নিধ্য পাই। আজও জানি না, সে কে? হতে পারে

তিনিই ইশ্বর।’

আমি কোনও উত্তর দিলাম না। দুজনের মধ্যে আবার একরাশ নীরবতা নেমে এল।

‘এই বাড়িগুলো দেখছ দ্বৈপায়ণ।’ দূরে ইশারায় দেখাল মনীষা।

‘কোন বাড়ি বলোতো?’

‘আরে ঐ যে রাস্তার ধারে। এখন সবই প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এই ব্রীজটা

যতদিন ধরে তৈরি হয়েছিল, ততদিন তারা এখানে দোকনদারি করত। তারপর তারা ঘর

বানিয়ে বাস করতে শুরু করে দিল। তাদের মাথায় এই বুদ্ধিটা ছিল না যে,

ব্রীজটা একদিন তৈরি হয়ে গেলে এখানে কেউ আর কাজ করতে আসবে না। তাই খাবার

বিক্রি হবার প্রশ্নই উঠে না। তাই আজ এসব বাড়ি সব ভূতুড়ে মনে হয়। কিন্তু

আমাদের এই টিলা কিন্তু আগের মতোই আছে। আমি এখানে একা এসে বসেবসে সময়

কাটাই। বেশ ভাল লাগে। বড় তৃপ্তি পাই। কেন যে ভাল লাগে বুঝতে পারি না।

আমার ভাললাগাটাও এই নদীর ব্রীজ তৈরির মতো অস্থায়ী একটা প্রোজেক্টের মতো

নিঃশেষ হয়ে যেতে পারত। তোমার বিয়ে হবার পরে এই টিলায় বসলে আমার যন্ত্রণায়

কাতর হয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। কষ্ট পেলে অবশ্য আমিও আর

এখানে কোনওদিন আসতাম না। তখন এই টিলারও ভূতুড়ে বাড়িগুলোর মতো দশা হতো।

শ্মশানে যেমন হয়, মানুষ মরলেই জনসমাগম, নইলে কাকপক্ষীও সেদিকে ফিরে তাকায়

না। এই আমার ইশ্বর। এবার বুঝতে পারছ দ্বৈপায়ণ। তিনি আমাকে এই টিলাতে

বসলেও এসে সঙ্গ দেন। তাই আমি রোজ এসে বসি। তাই এতগুলো বছর পরেও তুমি দেখো

জায়গাটা কত সুন্দর।’

আমি উৎকীর্ণ হয়ে মনীষার কথাগুলো শুনছিলাম। মনে হল মনীষা যেন আমাকে পাশে

বসিয়ে জীবনদর্শনের পাঠ দিচ্ছে। আমি তার এক অনুগত ছাত্র। একবার মুখফুটে

বললাম, আমার কলিগরা আমার পুরনো গাড়িটা নিয়ে ঠাট্টা করতো, স্যার সেই

মান্ধাতা আমলের  গাড়িটা আর কত চালাবেন? এবার এটা ছাডুন তো মশায়। এর এখন

মিউজিয়ামে রাখার বয়স হয়েছে। একটা নতুন ফোরস্ট্রোক বাইক কিনে লাইফটা এনজয়

করুন। আমি তখন ওদের ইয়ার্কিচ্ছলে বলতাম, একে ছাড়া যাবে না ভাই। কথায়

বলে— Old is gold. আজ সত্যিই মনে হচ্ছে এই পুরনো গাড়িটাই আমাকে অতীতকে

ফিরে দেখাল।’

‘ঠিকই বলেছ। তা নাহলে এই ধরলার পাড়ে কে আর শখ করে আসে?’

পকেটে ফোনটা বেজে উঠল। দেখলাম, মেয়ে নীরা ফোন করছে।

কানে দিতেই অভিযোগের সুর ভেসে এল, কী ব্যাপার বলোতো? তুমি কোথায়? এখনও

আসছ না কেন? কাজের মাসী এসে বসে রয়েছে, কী রান্না করবে জিজ্ঞেস করছে।

‘আসছি মা। আমার বাইকটা খারাপ হয়ে গেছে।’

‘তোমার মেয়ে বুঝি?’

 ‘হ্যাঁ।’

‘মেয়েদের বাবার প্রতি একটু বেশি টান হয়।’

‘তাছাড়া আর কাকে কাছে পাবে? তিনি তো আমার কাঁধে সব দায়িত্ব শপে দিয়ে

ফুড়ুত করে উড়ে গেলেন।’

‘কার কখন যাবার সময় হবে কে জানে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মনীষা।

‘তা ঠিক। তবুও বড় অসময়ে চলে গেল।’

কোনও কথা বলল না মনীষা। আবার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা কেটে দিয়ে বললাম,

‘আজ যাই। মেয়েটা বারবার ফোন করছে।’

 ‘যাও। সময় পেলে গাড়ি নষ্ট না হলেও আবার একদিন এসো।’

 ‘আচ্ছা, বাইকটা কে যেন সারাই করল। তাকে কত দেব?’

‘দিতে হবে না।’

 ‘কেন?’

‘ও আমাদের আশ্রমেরই ছেলে। একসময় শিলিগুড়িতে বাইকের দোকানে কাজ করত।

তারপর একদিন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে আমাদের মন্দিরে এসে থাকতে শুরু করেছে। ও

টাকা দিয়ে কী করবে? ওর থাকাখাওয়া সবই তো আশ্রমে।’

 দুজনে উঠে হাঁটতে হাঁটতে আশ্রমের দিকে চললাম। যেতে যেতে মনীষাকে বললাম,

আমি তোমার কাছে হেরে গেছি মনীষা। মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতির ঘন্টা বাজছিল।

মনীষা আমার কথাটা শুনতে পেল কিনা বুঝতে পারলাম না।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন