রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অভিজিৎ দাশ।। পারক গল্পপত্র



বাংলাদেশের লালমণিরহাট থানার মধ্যে একটি ছোটো ভূখণ্ড বাঁশপেচি ছিট। বাংলাদেশ দিয়ে ঘেরা একটি ভারতীয় ভূখণ্ড। 

ছোটোবেলায় টুম্পার বাবা দূরে আঙুল উঁচিয়ে বলত “মারে তাকেয়া দ্যাখ্, হুই হামার দ্যাশ। হামার ভারত। হামার ইন্ডিয়া। কিন্তুক, হামার তো ওটে যাবার ঘাটা নাই।” ছোটো টুম্পা তবু বাবার কাছে জানতে চাইত, “হামার দ্যাশত্ হামরা যাবার না পাং ক্যানে বাবা?” বাবা কোন উত্তর দিতে পারেনি। ছোটো এই মেয়েটিকে এই চাষাভূষা মানুষটা বোঝানোর ভাষা পায়নি। একইভাবে তার বাবা ও তাকে বোঝাতে পারেন নি ছিটমহলের মানুষের অসহায়তা। শুধু তার চোখ দুটি জলে ভরে উঠত। চোখের সামনে নিজের দেশকে দূরের দেশ হতে দেখেছেন। অথচ তারা ইন্ডিয়ান। বড়ো হয়ে টুম্পার বাবা যেটুকু বুঝেছেন তাতে কোনো আশার আলো দেখেননি।

টুম্পা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। বাংলাদেশের স্কুলে সে লেখাপড়া করতে থাকে। তাদের বাঁশপেচি ছিটের আরো কয়েকজনও সেখানেই পড়ে। সেখানকার মানুষরা যে একটু বাঁকা চোখে তাদের দিকে তাকান তা তারা বুঝতে পারে। তাই ছিট থেকে সবাই এক সাথে পড়তে যায়, এক সাথে ফেরে। কিন্তু পড়াশুনাও সহজে হয় না। তার বাবার নাম রমাপদ বর্মন। কিন্তু স্কুলের খাতায় বাবার নামের জায়গায় আর একজনের নাম আছে- যাত্রানাথ বর্মন, বাড়ি মৌলবীর হাট জেলা-লালমণির হাট।

তার সব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য সে দৌড়ে যায় যতীন জ্যাটোর কাছে। “জ্যাটো, হামার বাঁশপেচিক ছিট কয় ক্যানে?” যতীন জ্যাটো বাংলাদেশের কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেছেন। ভালো নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও আর লেখাপড়া করতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। আর বেশি পড়ে হবেই বা কি? বাংলাদেশের তো চাকরি জুটবে না।

যতীন জ্যাটো বলেন, “মারে আমাদের এই জায়গাটা তো ইন্ডিয়ার। আর চারিদিকে বাংলাদেশ। তাই ছিট। তোর ছিট কাপড়ের জামায় যেমন ছোপ ছোপ আছে অনেকটা তেমনি এই বাঁশপেচি।” পরে টুম্পা আরো জেনেছে চারপাশে বাংলাদেশ থাকায় নিজের দেশের সাথে যোগাযোগ বন্ধ। বর্ডারে বন্দুক উঁচিয়ে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার বাহিনী। আগে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। তাই পালিয়ে নিজের দেশে যাতায়াত করা যেত। এখন তাও সম্ভব নয়। অন্য দেশে ঘেরা মানুষগুলির কোনো উন্নতি হয় না। সরকারি সুযোগ তারা কোনদিনই পায়নি। বাংলাদেশে নাম ভাড়িয়ে পড়াশুনা করেও কোন লাভ নেই। চাকরি-বাকরি তো কোনো দেশেই জুটবে না। অন্য কাজ নেই । চাষ-বাস করে আর কত এগোয় তাও বাংলাদেশের হাটে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় তারা।

টুম্পা এখন কলেজে বি.এ পড়ে। তপন তার প্রানের বন্ধু। দুবাড়ি পরেই তাদের বাড়ি। তপন দাকে অন্যান্য বখাটে ছেলেদের কাছ থেকে আগলে রাখে। দুজনে একসাথে যাতায়াত করতে করতে নিজেদের অজ্ঞাতে মনের মধ্যে ইচ্ছেকুসুম ফুটে উঠেছে। একদিন না দেখলেই তখন ছুটে আসে টুম্পাদের বাড়ি, “কাকি টুম্পা কোথায়?” কাকি জবাব দেয়, “ঘরত্ আছিলো তো। দ্যাখেক নামিতারঘরের সতে কোটে গেইল?” খুঁজতে থাকে তপন। আবার তপনকে না দেখলে টুম্পা আসে তখন দের বাড়ি, “জ্যাটো তপন কোথায়?” তপনের বাবা হুকা টানতে টানতে বলেন, এলায় তো আছিলো, এদি ওদি উটকা, উটকি দ্যাখেক, পাবু।” টুম্পা ঠিক খুঁজে পায়। আসলে তাদের জন্য প্রকৃতি একটি নিভৃত লতাকুঞ্জ রচনা করে রেখেছে। একজন আর একজনকে খুঁজে না পেলে এই লতাকুঞ্জে প্রতীক্ষা করে।

তাদের বি.এ.দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছে। দুজনেই একসাথে পরীক্ষা দিতে যায়। টুম্পার শেষ পরীক্ষার দিন তপনের পরীক্ষা নেই। দুজনের ঐ একটি বিষয় আলাদা আলাদা। সেদিনও তপন তাকে কলেজে এগিয়ে দিয়ে আসে। আসলে সুন্দরী টুম্পার প্রতি কলেজও বাইরের অনেক যুবকের লোভে চোখ চকচক করে। কথা ছিল ফেরার সময় তপন এসে তাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বন্ধুরা এসে তপনকে জোর করে ফুটবল খেলতে নিয়ে যায়। পরীক্ষা শেষে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে টুম্পা রওনা দেয়। তাদের সাথে ছিটের আর কেউ পড়ে না। কয়েকজন প্রথম বর্ষে পড়ে। তাদের ক্লাস তো এখন বন্ধ। অগত্যা ……. একাইফেরে টুম্পা। আর তার এই একা ফেরা চোখ এড়ায় না তারই এক সহপাঠীর। ছিটমহলে অন্যায় করলে কোনো কেস হবে না। সবাই জেনেও গেছে আর কিছু দিনের মধ্যে সিটের অনেকেই ভারতে চলে যাবে। টুম্পারাও যাবে। এমনিতে বাংলাদেশের মাটিতে ছিটবাসীদের কিছু করার সাহস নেই। তার মধ্যে আবার এসময় সিটের বাকি ও তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করবে না। টুম্পার মত সুন্দরীকে একা পেয়ে এই সহপাঠির নোলা পড়তে লাগলো। এক বছর আগে এক বন্ধু তো ছিটের এক মেয়েকে নিয়ে ফূর্তি করে রাতের অন্ধকারে ছুড়ে ফেলেছিল ছিটে। এনিয়ে কেউ কিছু করতে পারেনি। সে টুম্পার পেছনে চলতে থাকে। টুম্পা গতি বাড়িয়ে দেয়। ছিটের সীমান্তে কয়েকটি পাকুড় গাছের পাশ দিয়ে রাস্তাটি ছিটে ঢুকেছে। সেখানে দিনের বেলায় অন্ধকার অন্ধকার। পথ আটকে দাঁড়ায় সহপাঠী। টুম্পা বলে, “রাস্তা ছাড়্ নবা।” নবা দাঁত বের করে এগিয়ে আসে। টুম্পা “মাগো” বলে চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু তার চিৎকার বেশিদূর এগোয় না।

বাজার করে ঘরে ফিরছিল এনামুল মিঞা। পিছনে আরো কয়েকজন। সূর্য ডোবার আগেই তারা ছিটে ফিরে আসে। হঠাৎ পাকুড় গাছের আড়ালে মেয়েটাকে পড়ে থাকতে দেখে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়। দূর থাকা সবাইকে ডেকে নেয়, “জলদি আইসেন সগায়।” তার ডাক শুনে সবাই ছুটে আসে। ঠিক এরকম সময় তখনও টুম্পা বাড়ি ফেরেনি দেখে সাইকেল নিয়ে ছুটে আসে। পাকুরতলায় অনেককে সাইকেল রেখে দৌড়ে এসে দেখে টুম্পা পড়ে আছে অনড়। তার সালোয়ার কামিজ ছেঁড়াখোঁড়া। রক্তে ভিজে গেছে নিম্নাঙ্গ। তাড়াতাড়ি নিজের জামা খুলে পরম যত্নে ঢেকে দেয় তার টুম্পার দেহ। নাকের কাছে হাত নিয়ে এসে দেখে তার শ্বাস চলছে।

সবাই মিলে ধরাধরি করে তাকে নিয়ে যায়। ছিটে ডাক্তার বলতে তৈমুর চাচা। তিনি কয়েক বছর বাংলাদেশের এক ডাক্তারের কম্পাউন্ডার হিসেবে কাজ করেছেন। কাটা ছেঁড়ার সেলাইও করতে পারেন। তার কাছেই টুম্পাকে নিয়ে যাওয়া হল। টুম্পার বাবা, মাও ছুটে এসেছেন। সারা ছিটমহল যেন আজ তৈমুর চাচার বাড়িতে ভেঙে পড়েছেন।

তৈমুর চাচার দুই ঘন্টা আন্তরিক চেষ্টা ও তপনের সহযোগিতায় জ্ঞান ফিরল টুম্পার। কিন্তু তপনকে দেখে সে বাঁধভাঙ্গা কান্নায় ভেঙে পড়ল। তৈমুর চাচা তাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে দিলেন।

তারপর সুস্থ হয়ে টুম্পা সেই যে বাড়িতে ঢুকেছে আর বাড়ি থেকে বের হয়নি। তপনের কিছু বলার ছিল। কিন্তু কাকু বা কাকীর সামনে তা আর বলা হয়নি। টুম্পাও কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সেদিন থেকে।

আজ তাদের নিজেদের দেশে পা দেওয়ার দিন। চারিদিকে আনন্দ উৎসব-সাজো সাজো রব। অন্যান্যদের সাথে তপন ও টুম্পাদের পরিবারও গাড়িতে উঠেছে। টুম্পা আলাদা একটি সিটে বসে আছে। এত দিনের ভিটে ছেড়ে যেতে হবে বলে সবার চোখে জল। আবার এ জল শুধু দুঃখের নয়-আনন্দেরও। দেশহীনের দেশ পাওয়ার দিন। এদিনটার জন্যই সারাজীবন ধরে অপেক্ষা করেছে। কিন্তু আনন্দ বা দুঃখ কোনোটিই টুম্পাকে ছুঁতে পারেনি।

একে একে গাড়িতে উঠে বসেছেন সবাই। গাড়ির কনভয় চলছে। টুম্পা এখনও একাই বসে আছে। মুখে যেন কালবৈশাখীর মেঘ। জ্যাটোর তো চোখে পড়ে। তিনি তার পাশে গিয়ে বসেন। মাথায় হাত দিয়ে বলেন, মারে বাঁচি থাকা বড় কঠিন মারে। যা হয়্যা গেইচে তার বাদে তো কোনোয় করার নাই। তুই আর হামার তপন দুই়ঝনে অ্যাং করি থাকিলে বাঁচির পাবু না। মুই কং কি তুই মোর তপনক্ রিয়াও কর মা। দুইঝনে ভাল্ থাক। সুখত্ থাক।” জ্যাটোর কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে টুম্পা, জ্যাটো বলেন, “মারে তপনক্ তোর একটি পাঠে দ্যাং। তোরা কয়াবুলি করি নে।” জ্যাটোর কথা টুম্পার মনে সুশিতল মুক্ত বাতাস এনে দেয়। বাইরে তখন মেঘলা গুমোটভাব কেটে গিয়ে সূর্যটা উঁকি দিয়েছে। টুম্পার চোখের জল তখন বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার মতো দুকূলে ঝাপিয়ে পড়ে। আর সেই বন্যায় ভাষার জন্য তখন এসে বসে তার পাশে।

তখন টুম্পার চোখের জল মুছে দেয়। বলে, “আমিই দায়ী রে, আমিই দায়ী। আমি যদি সেদিন বন্ধুদের সাথে খেলতে না যেতাম-টুম্পা তার মুখ চেপে ধরে। তপন তার হাত সরিয়ে চেপে ধরে । বলে, “টুম্পা তোকে ছাড়া যে আমি অচল। নতুন জায়গায় তোকে ছাড়া থাকতে পারব নারে। তুই বাবার কথায় মত দে।” টুম্পা আরো বেশি করে কাঁদতে থাকে। তপন বলে চলে, “সবাই তো দেশ পাবে। কিন্তু আমি? আমার দেশ তো তুই। তাহলে আমি কি দেশ পাব না? কাঁদতে কাঁদতে টুম্পা ক্ষীণস্বরে বলে, “আমার তো সব শেষরে, সব শেষ। আমি কি করে মুখ দেখাবো? তোকে আমি কী দেব? আমি যে গর্ভবতী। তোকে আমি কিভাবে ঠকাব? না, না, তা পারবো না।” তপনের দুচোখও জলে ভরে যায়। তপন বলে, “যে আসছে সে আমার পরিচয়ে মানুষ হবে। তুই অমত করিস না। আমাকে বঞ্চিত করিস না। তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস। এই বিশ্বাসের আর অমর্যাদা হবে না। তুই একটা সুযোগ দে।”

অবশেষে টুম্পার মত পাওয়া যায়। ততক্ষণে গাড়ি ছিটমহল- বাসীদের জন্য তৈরি ক্যাম্পের দোরগোড়ায় এসে পড়েছে। তার নিজেদের দেশে কখন ঢুকে পড়েছে টেরও পায়নি। বর্ডার পেরোতেই বোধহয় জয়ধ্বনি উঠেছিল।

ছোটো ছোটো টিনের একচালা ঘরগুলিতেই এক-কটি পরিবার কোনোক্রমে মাথা গোঁজার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শুভদিন দেখে টুম্পার সাথে তপনের অনাড়ম্বরভাবে বিয়ে হয়ে যায়। মহাকুমাশাসক উৎসাহ নিয়ে সব আয়োজন করে দেন। ক্যাম্পে প্রথম বিয়ের উৎসব বলে কথা।

টুম্পার একটি কন্যা সন্তান জন্মেছে। দুজনে নাম রেখেছে মুক্তি। তপনের সাহচর্যে টুম্পার মধ্যে পরিবর্তন ঘটেছে। এরমধ্যে বিডিও অফিসে সে আরো কয়েকজনের সাথে স্বনির্ভরতার ট্রেনিং নিয়েছে। সে ক্যাম্পের কয়েকজন মেয়ে ও বৌকে নিয়ে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। তারা আধাকুটা, কয়েক রকমের ছাতু, মুড়ি, খই, ডালের বড়ি ইত্যাদি তৈরি করে। ক্যাম্প সংলগ্ন দিনহাটা কৃষি মেলা বাজারে তা বিক্রি করে। সংসার চালাতে লাভের অর্থ কাজে লাগে।

টুম্পারা জানতে পেরেছে ক্যাম্পের যে দুজন মেয়ে দিনহাটা শহরের স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে তাদের যাতায়াতের পথে দুটি ছেলে কয়েকদিন থেকে খুব উত্যক্ত করছে। তারা ওদের ভয় দেখায়, বিয়ের প্রলোভন দেখায়। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ছেলে দুটি মেয়ে পাচার চক্রের সাথে জড়িত। মেয়েদের কোথাও রেহাই নেই। টুম্পা প্রতিজ্ঞা করে সে আর কোনো মেয়েকে অত্যাচারিত হতে দেবে না। তাই মেয়ে দুটির মাধ্যমে ভালোবাসার ফাঁদ পাতে, অবশ্য মেয়েদের পিছনে ক্যাম্পের কারো-না-কারো নজর থাকে।

ফাঁদ অনুযায়ী মহালয়ার ভোর হতে না হতে মেয়ে দুটিকে নিয়ে পালানোর তারা ক্যাম্পের সামনে এসে বাইকের হর্ণ দেয়। মুহূর্তে টুম্পার নারী বাহিনী চারদিক থেকে তাদের ঘিরে ধরে। ছেলে দুটি বাস্কেট থেকে তাদের অস্ত্র বের করারও সময় পায়না। টুম্পার এক প্যাঁচে প্রথম জন পড়তে থাকলে বাহিনীর আর একজন ধরে ফেলে। আসলে এই বাহিনী সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি ক্যারাটে শিখে নিয়েছে। আর একজন পালাতে গিয়ে নারী বাহিনীর হাতে বাধা পড়ে। তাদের পিছনে তখন উঁকি দিচ্ছে খাকি উর্দিবাহিনী। এক নারী পাচার বাহিনীটিকে কিছুতেই পুলিশ-প্রশাসন ধরতে পারেনি। তাই আজ তারাও আনন্দিত। কৃষিমেলা সর্বজনীনের মাইকে তখন বাজছে দেবীর আবাহন ধ্বনি-“শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোর মঞ্জির। ধরনীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা। প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মবতার আগমনবার্তা...........


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন