রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দেবাশিস দে।। পারক গল্পপত্র



শহরের এই নামজাদা বেসরকারি হসপিটাল থেকে দিনে দুপুরে একজন মানুষ নিখোঁজ ! তাও আবার পেসেন্ট্‌ নয়, দীর্ঘ নয় মাস এই হসপিটালে কাজ করা এক দারোয়ান ! কি করে এটা সম্ভব ? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে পুলিশ মহল সবাই ধন্ধে  পড়ে গেছে। পুলিশের একপ্রস্ত  জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়ে গেছে সবাইকে। কোনও সমাধান সূত্রই পাওয়া যাচ্ছে না। তবে হসপিটালের অপর একটি দারোয়ান আর  হিসাবরক্ষকের  কথায় কিছু অসঙ্গতি আছে বলে পুলিশের ধারনা। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া দারোয়ান রামবিলাশ বিহার নিবাসী।  এর আগে কোন এক ফ্যক্টেরীতে দারোয়ানের চাকরি  করত, সেই কাজ ছেড়ে সল্টলেকের এই হাসপাতালে।


মাঝারি গড়ন, রং কালো, কোঁকড়ানো চুল, ব্যবহার ভালোই। মাঝে মধ্যে হেসে কথা বলতেও দেখা গেছে এই রামবিলাশকে। মাস দুয়েকের ব্যবধানে দেশে যায় দু-তিন দিনের জন্য। রামবিলাশের কথা থেকে সবাই জেনেছে বাড়িতে ওর বৃদ্ধা মা, পাঁচ বছরে বিবাহিত বৌ আর সাড়ে তিন বছরে একটি পুত্র সন্তান আছে। মাঝে মাঝে ওর মোবাইলে দেশের থেকে বৌ এর ফোন আসে – অনেকেরই নজরে পড়েছে তা। রামবিলাশ ছাড়া অপর এক দারোয়ান - বিশ্বজিৎ এর কাছ থেকেই এই রকম  অনেক কথা জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে বিশ্বজিৎ আসল কথাটাই পুলিশের কাছে গোপন করে গেছে। নিখোঁজের একদিন আগে রামবিলাশের সঙ্গে বিশ্বজিৎ এর কি একটা ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া হয়। দুজনেই দুজনকে দেখে নেব বলে শাসিয়েছে। বিশ্বজিৎ এটা নিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে আছে  - রামবিলাশ এমন কিছু করেনিতো - যাতে সে  ফেঁসে যায়। পুলিশকে সে কথা বলতেও ভয় পেয়েছে – যদি সব দোষ ওর নামে চলে আসে – যেটুকু না বললে নয় শুধু সেইটুকুই পুলিশকে জানিয়েছে। হসপিটাল কর্তৃপক্ষ থেকে সবাই যে যতটুকু রামবিলাশকে  দেখেছে সবাই তা পুলিশকে বলেছে। তবে ক্যাশিয়ার তিমিরবরণও একটি কথা সযত্নে গোপন করে গেছে - রামবিলাশ তিমিরবরণের  কাছে হাজার টাকা ধার চেয়েছিল। তিমিরবরণ তা দিতে অস্বীকার করে, মানে ম্যানেজমেন্ট এর দোহাই দিয়ে বলেছিল – এই ক’মাস কাজ করে এখনই তোমায় টাকা ধার দেওয়া যাবে না। ম্যানেজমেন্ট জানতে পারলে খুব রাগারাগি করবে। তখন  রামবিলাশ তিমিরবরণকে অনেক অনুনয় বিনয় করে টাকার জন্য। কিন্তু তিমিরবরণ রাজি হয় না। এতে সামান্য কথা-কাটাকাটি হয়। রামবিলাশের নিরুদ্দেশের পর তিমিরবরণের মনে হয় এই নিরুদ্দেশের পিছনে ওই টাকার কোন সম্পর্ক জড়িত নয়তো, তিমিরবরণ ভাবতে পারে না – সব গুলিয়ে যায় তার।


আজ  সকালে আবার  পুলিশ, সবাই  বেশ ভয়  পেয়ে যায়, হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সাথে  কথা  বলে পুলিশ বিশ্বজিৎ এর কাছে আসে- বলে তুমি সবসময় ওর কাছাকাছি থাকতে –তুমি  মনে করে দেখ – আর  কি কি  হয়েছিল নিরুদ্দেশের দুই তিন দিন আগে থেকে – অনেকে বলছে  তোমার সঙ্গে নাকি কি নিয়ে ঝগড়া  হয়েছিল ওর। সত্যি করে  সব কিছু খুলে  বল – না হলে কিন্তু তোমায় থানায়  যেতে হবে। বিশ্বজিৎ ভয় পেয়ে যায়। বলে বিশ্বাস করুন, আমাদের নিজেদের মধ্যে কোন ঝগড়া  হয়নি – ওরই একটি  বিষয় নিয়ে হয়েছিল কিন্তু আমি জানি না তার সঙ্গে ওর নিরুদ্দেশের কোন সম্পর্ক আছে কিনা –পুলিশ তখন ধমক দিয়ে বলে – সেটা আমরা বুঝব, তুমি  সব কিছু বিস্তারিত  বল। বিশ্বজিৎ তখন ভয়ে ভয়ে এতদিন ধরে চেপে রাখা কথাটা বলেই ফেলে -  রামবিলাশের আত্মীয় স্বজন সবাই বিহারেই থাকে ও বলেছিল, কিন্তু গত দু’ তিন মাস ধরে প্রায় তিন চারদিন রামবিলাশকে কাজের ফাঁকে হসপিটাল  বাউন্ডারির বাইরে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম। সেই নিয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করাতে ও কিছু বলতে চায় না। তখন ওকে বলেছিলাম ম্যানেজারকে  বলে দেব ব্যাপারটা।  ও তাতে খুব রেগে যায় আমার ওপর – বলেছিল – বলে দেখ কি হয়। এই , এছাড়া আর কিছু হয়নি আমার সাথে। পুলিশের  মাথায় হাত পড়ে যায় – এর পিছনে কোন মেয়ে ঘটিত কারণ নেইতো । কিন্তু কি করে সেই মহিলার খোঁজ পাওয়া যায় !!


প্রতিদিনের মত আজও তিনজন সুশ্রী মহিলা হসপিটাল রিসেপসান বসে। দুর থেকে তারা দেখছে বয়স্ক এক মহিলা খুড়িয়ে খুড়িয়ে রিসেপশানে এর দিকে এগিয়ে আসছে সঙ্গে তার  অল্প    বয়েসী আত্মীয় তাকে ধরে ধরে আসছে। সাথে এক বাচ্চাও আছে। রিসেপসানের একজন বলে - দেখবি পড়ে গিয়ে পায়ে লেগেছে সেটা  দেখাতেই আসছে, অন্যজন বলে না’রে  মনে হচ্ছে আর্থ্রাইটিস হয়েছে। আরেকজন বলে আমার মনে হচ্ছে কোমরের কোন অসুবিধা আছে ওই অর্থপেডিকেই পাঠাতে হবে। ইতিমধ্যে ওই তিনজন রিসেপসান পৌঁছে গেছে। অল্প বয়সী যে মহিলা ছিল সে  আধা হিন্দি আধা বাংলায় বলে – তারা এই হসপিটাল থেকে ফোন পেয়ে এসেছে। এখানেই ওনার স্বামী রামবিলাশ কাজ করত, তারপর তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, বলে – যে করেই হোক রামবিলাশকে খুঁজে দিতে হবে। শুধু রামবিলাশের রোজগারেই তাদের সংসার চলে !  এখন কি করে চলবে। প্রায় সবার পা ধরে আকুতি মিনতি করতে থাকে। রিসেপসনের তিনজন এ ওর মুখের দিকে চাওয়াচাই করে। ভাষা খুঁজে পায় না কি  বলবে। অবস্থা বেগতিক দেখে বিশ্বজিৎকে ডেকে তাদের ম্যানেজারের ঘরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।


হসপিটালের সামনের দিকের লিফট ভালোই আছে কিন্তু পিছনের দিকের লিফট মাঝে মাঝেই আটকে যাচ্ছে ওই জন্য ওটা এখন ব্যবহার হচ্ছে না। এক সপ্তাহ হল খবর দেওয়া হয়েছে মেকানিক্সকে। আজ দুইজন ইঞ্জিনিয়ার এসেছেন। তাদেরকে পাঠান হল পিছনের লিফটের দিকে। কয়েক মিনিট পরে তারা ফিরে এসে বলে ওখানে ভীষণ দুর্গন্ধ – কাজ করা যাবে না। কর্তৃপক্ষর কাছে খবর গেল। জমাদার সমেত সবাই ছুটল সেখানে। লিফট থেকে ভীষণ পচা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।  সামনে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু লিফটের মাঝে  পাদানিতে বিশাল গর্তটা ছিল সেটা বহুদিন ধরে সারানো হয়নি। ইঞ্জিনিয়াররা নাকে কাপড় দিয়ে আসতে আসতে  লিফটের বিভিন্ন কব্জাগুলি খোলার পর দেখা যায় রামবিলাশের পোঁচে যাওয়া দেহ লিফটের নিচে। বিশ্বজিৎ ভাবে – সে জানত রামবিলাশ এই লিফটে চড়ে প্রতিদিন তিনতলার বাথরুমে স্থান করতে যেত অথচ একবার তার মাথায় এটা এলো না কেন !


৫টি মন্তব্য: