সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গৌতম দে।। পারক গল্পপত্র



-তোর মনে আছে তো সুখেন...।

-কি দাদবাবু?

-সামনের রোববার মিটিং আচে কোলকাতায়। এরই মধ্যি ভুলে গেলি সব! রানা দুবে দুধ সাদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছে বিরক্তি সহকারে আবার বলে-ভুলে গেলে চলবে? তোরা হল গিয়ে পার্টির সম্পদ। তোদের জন্য পার্টি কত নতুন নতুন ভাবনা ভাবে, তা তো জানিস...কত প্রকল্প তোদের জন্যই তো রচনা করেছে...।

-হ্যাঁ দাদাবাবু। সে আর বলতে। ঠিক কথাই বলেছেন। সুখেন কাঁচুমাচু মুখে বলে-যাব তো বটেই। আপুনেরা আমাদের মা-বাপ। আপনাদের কথা অমান্য করতি পারি! সে সাহস আছে নাকি আমাদের! কি যে বলেন দাদাবাবু...।

-মনে থাকে জেনো...।

-তা দাদাবাবু, যাব কিভাবে?

-অনেকেই যাচ্ছে ট্রেনে। আমরা যাব বাসে। দশটা বাস ভাড়া করেছি। কোনও অসুবিধা হবে না। দুপুর বারোটায় ছাড়বে। ঠিক সময় বউ ছেলেমেয়েকে নিয়ে উঠে পড়বি বাসে। আর যেন বলতে না হয়। বলে রানা দুবে দলবল নিয়ে আর দাঁড়ায় না। সে হনহন করে চলে যায়। তার অনেক কাজ আছে। অনেকের বাড়ি যেতে হবে। জনে জনে বলতে হবে। মনে করাতে হবে। আগামী রোববার শহরের ময়দানে বিশাল জমায়েত। হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। 

বোবার মত সেদিকে তাকিয়ে থাকে সুখেন।

এই মফসসল শহরে রানা দুবের বড় ব্যাবসা আছে। সে লোহার ছাঁটের কারবারি। দোকানও আছে বিরাট। একেবারে বড় রাস্তার ধারে। অনেকটা কারখানার মত। অনেক লোকজন কাজ করে। বাপ ঠাকুরদার আমলের ব্যাবসা। তখন এতটা জমজমাট ছিল না। রানা দুবের হাতে পড়ে সেই ব্যাবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে এখন। কারখানার লাগোয়ায় বিশাল আধুনিক বাড়ি তার। কয়েকটা দামী গাড়ি আছে। তাতে চড়ে সে। শহরের অনেক দূর অবধি তার নামডাক। তার হাতও অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে। শহরের অনেক নামী নেতারা তাকে ভালমত নামে চেনে। জানে। ফলে সবাই তাকে সমঝে চলে। তার মুখের ওপর কেউ কথা বলতে সাহস করে না। তাকে ঘিরে থাকে অনেক চ্যালারা। চ্যালাদের মধ্যে কয়েকজন মহিলাও আছে। তারা সব মাহিনা করা লোকজন। রানা দুবের কথায় ওঠবস করে। কাউকে 'মায়ের ভোগে' পাঠাতে তাদের হাত কাঁপে না। রানা দুবের এক ইশারাই কাফি। চ্যালারা সব সময় প্রস্তুত। একেবারে গভীর রাত পর্যন্ত তার ছায়া হয়ে পাশে পাশে চলে। ঘুরঘুর করে।

কালো মুসমুসে গায়ের রঙ। বিশাল ভুঁড়ি। সামনের দিকে উঁচিয়ে আছে। সব সময়ের জন্য দামী জামা কাপড় পরে। তার রঙও সাদা। এমন কি জুতোও। গলায় ছাগল দড়ির মত মোটা সোনার চেন। একটা নয়। দুটো। হাতে সোনার বালা। কবজিতে দামী ঘড়ি। ডান কানে হীরের দুল। বাঁ হাতের মাসলে ড্রাগন আঁকা এক বিশাল ট্যাটু। দশ আঙুলে বিভিন পাথর বসানো বারোটা সোনার আংটি। জ্যেতিষীর কথা মত, সমস্ত গ্রহনক্ষত্রকে প্রাণপণে বশে রাখার চেষ্টা। তাতে নাকি ভাগ্যের চাকা গড়গড়িয়ে চলছে।

সেদিকে তাকিয়ে সুখেন গামছায় রোগা প্যাকাটি শরীরটা মুছতে মুছতে নিজের মনেই ফিসফিস করে অনেক কিছু বলতে থাকে। না গেলে, অনেক কথা উঠবে অমনি। বলবে সুখেন অন্য পার্টিতে মন দেচে। 'একঘরে' করে দেবে তখন। দরমার ঘর। ভাঙতে কতক্ষণ। বাড়ি ভেঙে দিতেও পারে। জ্বালিয়ে দিলেও কেউ কিছু বলতে পারবে না। 

ঘরে যুবতী বউ আছে। আছে ছোট ছোট দুটি ছেলেমেয়ে। বড়টা ক্লাস থিরিতে পড়ে। ছোটটা টুতে। দুপুরের খাওয়াটা ইস্কুলেই মেরে দেয়। কখনওবা হাতে করে বাড়ি নিয়ে আসে। তারপর যদি বউটারে গণধর্ষণ করে। তখন? 

এইরকম সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে সুখেন। ভাবনা যেন আপনা আপনি মগজে জেগে ওঠে। তখন কাউকে কিছু বলতে পারে না। 

আরও আছে গো... আরও আছে। একশ দিনের কাজে তার নাম আছে। নাম আছে তার বউ মালতিরও। তাকে কাজে যেতে হয় না। তবুও তার নামে টাকা তোলা হয়। তবে পুরোপুরি হাতে পায় না। 

রানাবাবুর হাত দিয়ে সেসব খানিকটা আসে। সুখেনের টাকাও রানাবাবু দেয়। সেটাও পুরোপুরি নয়। তবু কাজ করতে হয়। পেট তো আর মানবে না। মালতিকে যেতে হয় না। সুখেনকে যেতে হয়। এখনও অনেক টাকা বকেয়া আছে রানাবাবুর কাছে। কবে দেবে কে জানে! এরকম শুধু সুখেনের একার নয়, অনেকের আছে। 

গত বছর পঞ্চায়েত ভোটের সময় মালতিকে একটা সুন্দর শাড়ি উপহার দিয়েছিল। দামী শাড়ি। লাল রঙ। জরির পাড়। মালতির গায়ের রঙ ফর্সা। দেখতে শুনতে ভাল। শরীরে কষ আছে। রানাবাবু সুখেনের হাতে শাড়িটা দিয়ে বলেছিল-এই শাড়িটা বউকে দিস। আমি নিজে হাতে বেছে রেখেছি...তোর পছন্দ হয়েছে তো?

সুখেন ঘাড় কাত করেছিল শুধু। সেদিন মুখে কিছু বলেনি। শুধু হেসেছিল। তার মানে বউয়ের দিকেও তার নজর আছে।

-তোর বউকে মানাবে ভাল। গায়ের রঙ ফর্সা। তারপর হাসতে হাসতে আরও বলেছিল রানাবাবু-শুধু তোর বউ নয় রে, এ গাঁয়ের প্রতিটা মেয়ে বউকে পার্টির তরফ থেকে আগাম পুজোর উপহার দিচ্ছে...। বলেই দলবল নিয়ে হা হা করে হেসে উঠেছিল আরেকবার।

মালতি দরমার ফাঁক দিয়ে শোনার পরও ঘরের বাইরে এসে নতুনভাবে জিগ্যেস করে-কি বললে গো তোমাদের নেতা?

-শুনলি তো সব কিছু। রোববার কলকেতা যাতি হবে। মিটিন আচে।

-সে তো আমিও শুনলাম। বকেয়া টাকার কথা বললে না কেন? 

মালতির এই প্রশ্নে সুখেন কিছু বলে না। অনেক টাকা বাকি আছে। এটা ঠিক কথা। তা বললেও কিছুতেই দিতে চাইবে না এখন। এটাও ঠিক। এভাবে সরকারের ঘর থেকে কত লোকের টাকা নিজের পকেটে ভরে রেখেছে রানা দুবে। না চাইলে কিছুতেই দিতে চায় না। তাও অর্ধেক দেয়। পুরোটা নয় কেন? বললে অমনি দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। বলে-পার্টির ফান্ডে যাবে। পার্টি তোদের অ্যাত উপকার করছে, পার্টির চাঁদা দিবি না! আমরাও দি বুঝলি? 

এরপর আর কিছু বলার থাকে না সুখেনদের। মালতিও জানে সেসব। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে-হে ভগবান, মরণ হয় না কেন তোদের...!

আজ সেই দিন। বিশাল জমায়েত ময়দানে। গ্রামের অনেকেই আগের দিন ট্রেনে করে চলে গেছিল। শুনেছে শিয়ালদা আর হাওড়া স্টেশনে দুদিন ধরে ম্যারাপ বাঁধা আছে। মাইক বাজছে সর্বক্ষণ। গান হচ্ছে কতরকমের। হিন্দিতে। কখনওবা বাংলায়। জেলার নেতারা মাঝেমধ্যে বক্তৃতা দিচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে দলে দলে মানুষ ট্রেন থেকে নেমে মিছিল করে এখানে জমায়েত হচ্ছে। তারপর সেখান থেকে যুবভারতী স্টেডিয়ামে। ওখানে থাকা খাওয়ার বিশাল আয়োজন হয়েছে। রমরম করে চিকেন বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। সপাটে কবজি ডুবিয়ে খাও। আর কি চাই! 

এসব অবিশ্যি শোনা কথা সুখেনের। সত্যি মিথ্যে কিনা জানে না সে। যা শুনেছিল তাই মালতিকেও বলেছিল। মালতি অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল-এইসব খরচাপাতি কি রানাবাবুর?

-আরে বাবা তাই হয় নাকি! সুখেন গড়গড়িয়ে বলেছিল-এসব খাইখরচা হল গিয়ে পার্টির। আর ওদের দায়িত্ব হল লোক আনার। যে যত বেশি লোক আনবে, সে তত বেশি জোরদার মাতব্বর। যেমন আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আজ রানাবাবু...।

-এর খরচা কি গভমেন্টের?

-না পার্টির। বকলমে রানাবাবুর।

-তুমি এতো কিচু জানলে কি করে?

-না জানার কি আছে! একটু চোখ কান খোলা রাখলে তুমিও জানতে পারবে। এরজন্য লেখাপড়ার দরকার লাগে না। সুখেন খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিল সেসব। তারপর মালতি আর কোনও প্রশ্ন করেনি।

তো আজ যাচ্ছে সুখেনরা। পরপর দশটা বাস দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। এই প্রথম রানা দুবে সবুজ পাঞ্জাবি পরেছে। কখনও ডান হাত আবার কখনও বাঁ হাত তুলে তদারকি করছে। এক এক করে অনেকেই আসছে। সবাই সুখেনের চেনা পরিচিত। ওই তো কুন্তিপিসি এসেছে। কুন্তিপিসিকে দেখে অনেকের মত অবাক হয় সুখেনও। বয়স তার কম হয়নি। আশির ওপর তো হবেই। এই বয়সে সেও যাচ্ছে মিটিঙয়ে। এখনও কয়েকটা দাঁত ছাগল খোটার মত গালে উঁচিয়ে আছে। সবগুলো পড়ে যায়নি। খনখনে গলায় সে বলে-সেই ছেলেবেলায় একবার সোয়ামির সঙ্গে কোলকেতায় গেচিলুম এখন আবার যাচ্চি। কি আনন্দ নাই হচ্চে! বলেই একগাল হেসে নেয় কুন্তিপিসি।

-আমি এই পেরত্থম। বলে মালতি ছোটটাকে কাছে টেনে নেয়। বাপ ন্যাওটা মেয়েটা মাকে জড়িয়ে ধরে অমনি। বড়টা বাসের জানলার ধারে বসেছে। সেদিকে তাকিয়ে মালতি আবারও বলে-জানলা দিয়ে মুখ বাড়াবি না একদম। মনে থাকে ঝ্যানো...। 

ছেলে মায়ের এই কথা পাত্তা দিল না। সে এক মনে প্রকৃতিকে দেখতে লাগল। মাঠের পর মাঠ ধানগাছ মাথা তুলে তাকে যেন টা টা করছে। নারকেল গাছটাকে বাবার মত লাগছে। বাবার চুলগুলো অমনি। বড় বড়। ঝাঁকড়া। নারকেল গাছটাকে দেখে হঠাৎ কেন তার বাবার কথা মনে পড়ল তা বলতে পারবে না। দূরে নীল রঙে ডোবা আকাশ। টুকরো টুকরো সাদা মেঘের দল তাদের মত চলেছে কোথায়? জানে না সে। তারাও কি আমাদের সঙ্গে চলেছে! সে অমনি মাকে জিগ্যেস করে-মা আমরা কোথায় যাচ্চি?

-কোলকেতায়।

-সিটা কোথায়?

-জানি না।

-অনেক দূর?

-হুম।

-বাস কখন ছাড়বে?

-এই তো এখনই...।

-তোমার কি এই দুটি? কুন্তিপিসি জিগ্যেস করে।

-হ্যাঁ।

-তোমার সোয়ামি আসেনি?

-হ্যাঁ। এসেছে। ওই তো...। বলে মালতি ডান হাত বাড়িয়ে দেখায়। সুখেন ডান দিকের জানলার ধারে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে মালতি একটু হাসে। ঘোমটাটা আরও একটু টেনে নেয়। ফর্সা নাকের ডগাটা আর লাল ঠোঁট জোড়া দেখা যায়। আজ সে রানা দুবের দেওয়া দামী লাল শাড়িটা পরেছে। অনেকটা বড় লোকের বউদের মত দেখাচ্ছে।

-তুমি কোন গেরামের মেয়ে বাছা? কুন্তিপিসি আলত করে জিগ্যেস করে।

-ঢেঁকিডাঙা গেরামের...। 

-ওমা তাইনাকি গো! কুন্তিপিসি অবাক হয়। তারপর আবার বলে-ওটা হল গে আমার বাপের ভিটা। গদাই লস্করকে চিনো?

-না ঠাম্মা।

-উনি হলেন গে আমার বাপ। সে বহুকাল আগে মারা গেচে। বলতে বলতে কুন্তিপিসির গলার স্বরে বাদল মেঘের ছোঁয়া লাগে। অনেক কিছু বলতে চায়। কিন্তু এইমুহূর্তে কিছু বলতে পারে না। হাঁ করে বাসের জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে। তার দৃষ্টি চলে যায় অনেক দূর।

হইহই করে সব বাস নিমেষে ভরতি হয়ে গেল। সবার মধ্যে বিপুল উত্তেজনা। যেন একটা 'উৎসব' 'উৎসব' ব্যাপার। তারপর এক এক করে বাসগুলো ছাড়তে লাগল। অনেকটা পথ যেতে হবে। কেউ মারল সিটি। তারপর এক এক করে তীব্র সিটিতে মুহূর্তে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। এই বিপুল সিটির মধ্যে ‘বন্দেমাতারম’ ধ্বনি বাদ গেল না। 

কুন্তিপিসি বহু বছর পর এই শব্দটি শুনল। শুনে ভাল লাগল তার। মনটা খুশ হয়ে গেল। অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল এই মুহূর্তে...। 

ধর্মতলার কাছাকাছি আসতেই সুখেনদের বাসগুলো আটকে পড়ে। শুধু সুখেনদের নয়, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসংখ্য বাস লরি ম্যাটাডর দাঁড়িয়ে যায়। সবাই হইহই করে নামতে থাকে। তারপর মিছিল করে এগিয়ে যায়। ব্যাপক ভিড় জমে যায়। মানুষে গাড়িতে জটলা। অনেকের কাঁধে পার্টির পতাকা। 

সুখেনও বউ ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে। চেনা পরিচিত মানুষজনদের আর দেখা যায় না। সে বউ ছেলেমেয়েকে নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। সুখেনের দুহাতে দুই ছেলেমেয়ে। গটগট করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। মালতি সুখেনের হাঁটার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। তার মাথায় ঘোমটা উধাও। শাড়ির আঁচল কোমরে আঁট করে গোঁজা। সে একরকম ছুটে স্বামীর ডান হাতটা চেপে ধরে বলে-একটু আস্তে আস্তে হাঁটো না কেনে...!

-আস্তে হাঁটলে হবে! ওদের থেকে দূরে থাকতে হবে...।

-কেন?

-আমরা তো মিটিঙয়ে যাব না।

-তালে যাব কোথা?

-চ না, এট্টু ঘুরেঘারে কোলকেতাটা দেখি। সুখেন খুব উৎসাহ নিয়ে বলে বটে। কিন্তু কোথায় যাবে, সে নিজেও জানে না। তবুও বলে-সেই খোকার মত বয়সে বাপের হাত ধরে এসেচিলুম ইখানে, কোথায় গেচিলুম এখন আর মনে নাই...আর এখন...।

-তুমি তাও এসেচ। আমি তো এই পেরত্থম। বলে মালতি প্রাণখুলে হেসে ওঠে। খুব খুশি হয়। মেয়ে টুবলি চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তার খিদে পেয়েছে খুব। ছেলে টুবলাও বলে আমারও। সুখেন দুজনকে দুই প্যাকেট পটেটোচিপস কিনে দেয়। তাতে খুশি ছেলেমেয়ে।

গড়ের মাঠের দিকে আজ যাওয়া যাবে না। গাড়ির ভিড়। মানুষের ভিড়। আশপাশে বড় বড় বাড়ির ভিড়। সেসব দিকে হাঁ করে তাকাতে তাকাতে মালতিরা হেঁটে চলে। ভিক্টোরিয়ার ফুটপাত ধরে হাঁটতে গিয়েই চমকে ওঠে। বাপরে! কত সুন্দর বাড়ি! যেন রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের মাথায় আবার একটা পরি।

-পরি কেন? হাঁটতে হাঁটতে মালতি জিগ্যেস করে স্বামীকে।

-জানি না।

সেদিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে মালতি। কি সুন্দর বাগান! মালতির যেন বিস্ময়ের শেষ নেই। তার বড় বড় চোখ আরও বড় হয়ে ওঠে। এক ঝলক থম মেরে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করে-এখানে বুঝি রাজা রানি থাকে?

-না।

-তুমি কি করে জানলে? তারপর ছেলেমানুষের মত বায়না ধরে-চলো না গো, রাজপ্রাসাদ ঘুরে আসি।

-টাকা লাগে ঢুকতে।

-তাইনাকি!

-হুম।

বহু মানুষ ঘুরছে। বসে বসে গল্প করছে। প্রাসাদের গায়ে যেন স্বর্গের সিঁড়ি। মালতির মনে হয়। সেই সিঁড়ি বেয়ে মানুষ উপরে উঠছে। নামছে। কেউবা সেখানে বসে আছে। ধবধবে রাজপ্রাসাদের কতই না অহংকার। সেদিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে যায় মালতি। একটু যেন রাগ হয়। স্বামীকে আবারও জিগ্যেস করে-আমরা কোথায় যাচ্ছি বলতো?

কিছু বলে না সুখেন। মালতিও ছাড়বার পাত্র নয়। সে আবারও বলে-কি গো বলছ না কেন?

-চ না। রাজপ্রাসাদের থেকেও অবাক হবি দেখলে।

-কি? কি গো? বার বার আগ্রহভরে জিগ্যেস করে মালতি।

সুখেন কোনও উত্তর দেয় না। তার আগেই সেই জায়গায় এসে পড়ে। বহু আকাঙ্খিত জায়গা তার। কামান। যুদ্ধের কামান। এই কামানের একটা ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস সুখেন জানে না। জানে না মালতিও। সুখেনের মত অনেকেই হাঁ করে সেই কামানটাকে দেখছে। মালতিও স্বামীর কাছে সরে আসে। তারপর ফিসফিস করে জিগ্যেস করে-এটা কি গো?

-কামান। সুখেন বলে-গুলেকাকা বলেছিল এর নাম নাকি প্যাটন ট্যাংক। 

-এটা দিয়ে যুদ্ধ করে?

-হুম। ছোট্ট করে বলে সুখেন। তারপর ঘুরে ঘুরে দেখে প্যাটন ট্যাংকটাকে। গুলেকাকা আরও অনেক কিছু বলেছিল। এখন আর তেমন মনে নেই। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ব্যবহার হয়েছিল এই কামান। এখন অচল। আরও আধুনিক কামান বেরিয়েছে। সেই পুরনো স্থবির কামানের চারপাশে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে সুখেন। কামানের চারপাশে লোহার বেড়া আছে। আছে লোহার গেট। খোলা পড়ে আছে। ঠিক খোলা পড়ে নেই। ভেঙে পড়েছে। সেই গেট দিয়ে অনেক মানুষ অনায়াসে ঢুকে যাচ্ছে ভিতরে। বাচ্চা ছেলেদের উৎসাহটা সবচেয়ে বেশি। কামানের মাথায় গিয়ে চড়ে বসেছে। কেউ আবার কামানের নলের ওপরও। কামানের ঢাকনা খুলে অনেকেই ঢুকে যাচ্ছে ভিতরে। আবার বেরিয়ে পড়ছে নিমেষে। আবার অনেকে সেলফি তুলছে কামানটিকে পিছনে রেখে। 

সুখেনকেও এমনই ছেলেমানুষে পেয়ে বসে। সেও ছেলেমেয়ের হাত ছেড়ে একছুটে উঠে পড়ে কামানের ওপর। তারপর কামানের ভিতর ঢুকে পড়ে। কামানের নলটা ময়দানের দিকে ঘুরিয়ে মুখ দিয়ে গোলা ছুটে যাওয়ার মত আওয়াজ করে। ঢিক...ঢিক...ঢিক... ঢিসুম... ঢিসুম... ঢিসুম...। 

একমাত্র সেই শুনতে পারে ভয়ংকর আওয়াজ।

সুখেনের ছেলে টুবলা মাকে ধাক্কা মেরে জিগ্যেস করে-বাবা কোথায়? মালতি কোনও উত্তর দেয় না। সে তাকিয়ে থাকে কামানের দিকে...। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন