শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

লতিফ হোসেন।। পারক গল্পপত্র



উদোম গায়ে নিজেকে দেখলে ক্যামন নোংরা মনে হয় আম্বিয়ার। ধরলার জলে পা ডুবিয়ে শরীর মাপে ভাতারখাকি। নিজেকে এমন ভাবতে গা ঘিন ঘিন করে। চোরা স্রোতের অস্থির জলে নিজের কম্পিত মুখ দেখে লজ্জিত হয়। 

--'ভাতারখাকি রে মাগি! ভাতার খাছিস, সংসারটাক খাছিস! এল্যা মোক খাবু!'

শহিদুলের মায়ের কুঁচকে থাকা ভ্রুতে ছেলে হারানোর বেদনা লেপ্টে থাকে। ছেলের প্রশ্নে উত্তরাধিকারের দম্ভ কফ হয়ে আটকে যেতে চায় বুড়ির গণ্ডদেশে। কেঁদো স্বরে শ্বাস মাখিয়ে বলে-- 'শহিদুল রে মুই ক্যামন মাও, ব্যাটার কবর দেখিবার জইন্যে কি এই বাঁচি থাকা!' 

আম্বিয়ার তাতে দোষ কী! বছর ঊনিশের শরীরে স্বামী হারানোর কষ্ট আছে,... তবু খিদে! ঊনিশের খিদে মেটাবে কে! 

নদীময় অজস্র মুখ দেখে আম্বিয়া, শহিদুলের মুখ। শহিদুলের মুখ ভাসে ধরলার জলে জলে...। স্তনের ভাঁজে লেপ্টে থাকা কাপড় আলগা ক'রে বুক সমান স্রোতের মাঝে গিয়ে দাঁড়ায়।  এক হাত যোনি দেশে। সরপুঁটির দল ফর্সা দেহের  সর্বত্র আলতো মুখে স্পর্শ করে। আম্বিয়া ভাবে-- ধরলা রে তুই-এ মোর ভাতার...তুই-এ মোর শহিদুল..! চ্যাং-গতা-ডাইরক্যা-খইলসার মিছিলে  আটকে থাকে প্রিয় সাধ...

--'এইবার বাড়ি গেইলে শিদলের আওটা রান্ধিয়া খোয়াবু আম্বিয়া? ইস্ রে কদ্দিন থাকি খাং না লাপা শাকের প্যালকা...!'

-- 'খোয়াইম রে খোয়াইম,,, তুই-এ না মোর জান'...!!

রাত গভীর হলে চাইনিজ ফোনের হালকা আলো প্রাণ নিয়ে জেগে ওঠে। কামনার স্বেদ-এ বিন্দু বিন্দু ইচ্ছে জমে যেন পূর্ণতা পায় হাজার হাজার বছরের আদম-হাওয়ার ইতিবৃত্ত...

-- 'একটা কিস করবু রে আম্বিয়া!!' 

-- 'এঃ, আরও কিস কইতে হয়! চুমা কইতে পারো না?'

-- 'হ্যাঁ হ্যাঁ তাই দে,, চুমা দে! ভাটিয়া হছিস নাকি! দেশি কথাত ভাটিয়া মিশাইস ক্যানে...!!'

'ভাটিয়া' কথায় হেসে ওঠে আম্বিয়া। লবণাক্ত ঠোঁটে হাসির ঢেউ এনে বলে-- ''দেশি ভাটিয়া ভাই ভাই, বাদ দ্যাও বাহে তোমার ঘ্যান ঘ্যান। কদ্দিনে যে তোমাক কাছত পাইম্! আর ভালে না নাগে!'

--'এই তো, মুই তোর কাছতে আছং! আয় মোর বুকত্ আয়‌!!'

--'এ আসায় কি আর সাধ মেটে!' 

নিশ্বাসের ক্রমাগত স্বরে শত শত যোজন-ব্যাপী দূরত্ব ঘুচে মিলনই চরম সত্য হয়ে ওঠে...।

নির্জন রাতের শরীর ভেঙে দূরাগত চুম্বনের অমোঘ আকর্ষণে আম্বিয়া বিবি ল্যাংটো হয়। সমস্ত শরীর জুড়ে সেলফোনের প্রলেপ দেয়। বলে -- 'শহিদুল... তুই-ই মোর শহিদুল'। 

নির্জীব বস্তুটাই শহিদুল হয়ে তৃষ্ণা মেটায় বছর ঊনিশের ভর-যুবতীর।

পানকৌড়ির আকস্মিক ঝাপটে হুঁশ ফেরে আম্বিয়ার। ছোঁ মুখে মৃত্যুর গন্ধ। স্রোতের উল্টো পিঠে  কচুরিপানায় আটকে যেতে থাকে ক্ষয়িষ্ণু সময়...

ভেজা শরীরের গাল ছুঁয়ে আম্বিয়া স্বপ্ন দেখে। দিবা স্বপ্ন। একটি কোভিড মুক্ত সমাজের স্বপ্ন। লকডাউনের অভিশাপ ধরলার শুষ্ক চর শুঁষে খেলে এমনই একেকটি স্বপ্নের জন্ম নেয়। শহিদুল কাজ ফিরে পেয়েছে। হ্যাঁ হ্যাঁ কাজ। কাজ মানেই দু-মুঠো ভাত। ভাত-স্বপ্ন সত্যি হলে ভালোবাসার তটভূমিতে ঝড় আসে...। 

--'না না, গালাত দড়ি দেয় নাই মোর শহিদুল। সাধের সংসার ধরলার পানিত ভাসে দিয়া, একটা গোটা মানষি এমন করি ডুবি যাবার পারে? না...না...পারে না...কোনও দিন না...।'

তবু্ও স্বপ্ন মুছে, সময়ের পাঁজরে সত্য এসে ধরা দেয়। ভুবনগ্রাসী শবের মিছিলে শহিদুলেরা ক্রমশ হেঁটে যায়। 

সমগ্র আকাশটাকে কাঁপিয়ে চীৎকারের ইচ্ছে জয়গাঁর পাহাড়ের মতো ভর করে  আম্বিয়ার মনে। কিন্তু পারে না। দু'হাতের ধারালো নখে, দুটি স্তন খামচে ধরে। ফর্সা বুকের বৃন্ত ঘিরে রক্তের ফিনকি...। ধরলার ঘোলা জল ক্রমশ লাল হয়...।


কাদা-মাটির পৃথিবী যেভাবে শ্রমিকের রক্তে লাল হয় আর ইচ্ছেগুলো আম্বিয়া হয়ে কেঁদে চলে। অবিরাম সে কান্না... 


..............................


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন