মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বাসুদেব দাস।। পারক গল্পপত্র



ভাগ-বাটোয়ারা

নগেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস


        শরৎ আর হেমন্ত দুই সহোদর,কিন্তু দুজনেরই প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ

বিপরীত।দাদা শরৎ অদৃষ্টবাদী।তাই অল্পেই সন্তুষ্ট এবং অলস। বাবা কিছু

জমি-বাড়ি কিনে রেখে গিয়েছিল। সেগুলি চালিয়ে যাওয়া ছাড়াও জাহাজ কোম্পানির কেরানিগিরি করে।তাতে যা সামান্য পায় তা দিয়ে সংসার চালানো ছাড়া ভাইকে ভালোভাবে পড়াশোনা করিয়ে একটা ভালো চাকরি পাইয়ে দিয়ে সংসারটা সুখের করে তুলবে-এটাই ইচ্ছা।কিন্তু হেমন্তের পড়াশোনায় মোটেই মন ছিল না।পরপর তিনবার চেষ্টা করেও প্রবেশিকা পরীক্ষাই পাশ করতে পারল না।

        তবু উচ্চাকাঙ্খা তার যুবক মন থেকে গেল না।অদৃষ্টের ওপর নির্ভর না করে

থেকে স্বাধীনভাবে উপার্জন করতে পারবে কিনা তার জন্য চারপাশে খবরা খবর

করতে লাগল।

        দাদা দেখল,ভাইয়ের অদৃষ্ট নিতান্ত মন্দ।লেখাপড়া শিখল না। এখন কোথাও

চাকরির চেষ্টা না করে দিনরাত ঠিকাদারের ঘর,ধানের ব্যাপারী,বাঁশের

ব্যাপারী ইত্যাদিদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানোটাই তার প্রধান কাজ হয়ে

উঠেছে।জাহাজের সাব এজেন্টকে খাঁটি ‘অ্যাপ্রেন্টিস’রূপে অফিসে কাজ শেখার

জন্য দিয়েছিল।কোনোভাবে দুই মাসের মতো অফিসে হাজির হয়েছিল,কিন্তু তার মন বসল না।অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিল।দাদা কত বলল,কিন্তু সমস্তই মিথ্যা।তখন তিনি স্ত্রী কমলিনীর সঙ্গে পরামর্শ করে হেমন্তের বিয়ে দেবার কথা

ভাবলেন।সংসারে প্রবেশ না করলে মানুষের চৈতন্য হয় না।

        হেমন্তের কিন্তু বিয়ে করার ইচ্ছা নেই।সে ভাবে-এই দেশের মানুষ এমনিতেই

বাড়ি-ঘর ছাড়তে চায় না,তার মধ্যে বিয়ে করলে বাড়ির ভেতর থেকে দরজার মুখেও যাওয়া ভুলে যাবে। তার জীবনটা এভাবে বাড়ির ভেতরেই কাটিয়ে দেবে এটা সে মোটেই চায় না। বাড়িঘর কেন,প্রয়োজনে দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে দেখবে,কিছু রোজগার করতে পারে কি না পারে।যদি পারে ভালো! নাহলে বিয়ে তার কপালে নেই।

         হেমন্তের এই সমস্ত কথা ধোঁপে টিকল না। দাদার রাগ দেখে সে বিয়ে করতে বাধ্য হল।কমলিনী একজন সঙ্গী পেয়ে খুশি হল। মেয়েটির নাম কুমুদিনী।

কাজ,কর্ম সব কিছুতেই শৃঙ্খলা এল। কিন্তু শরৎ হেমন্ততকে চাকরিতে ঢোকাতে

পারল না।সে গেলে এখনও জাহাজের বড়ো বাবু তাকে শিক্ষা-নবিশী হিসেবে ভর্তি করে নিতে রাজি আছে।

        দাদা একদিন অধৈর্য হয়ে বলে দিল যে এমন ভাইয়ের মুখ দর্শন করাও পাপ।হেমন্ত কিছু না বলে চুপ করে রইল।

        পরের দিন সকালে উঠে হেমন্ত বেড়াতে বের হল,কিন্তু ফিরে এল না।এমনিতেই কোথাও বেড়াতে গেছে বলে সবাই ভেবেছিল।যখন দেখল –রাত হয়ে গেছে তবু বাড়ি ফিরে এল না,তখন সবারই চিন্তা হতে লাগল।হেমন্তের স্ত্রী কুমুদিনীকে জিজ্ঞেস করেও কোনো খবর পাওয়া গেল না।


*    *                        *              *               *

        ক্রমে দুই চারজন পরিচিত মানুষ শরতের কাছে এল।কেউ দুঃখ প্রকাশ করে বলল,কেউ শরতের ভ্রাতৃস্নেহ এবং হেমন্তের অকৃতজ্ঞতার কথা তুলে তার

উদ্দেশ্যে গালি দিতে লাগল। যেখানেই যাক না কেন,কিছুদিন পরে যে ফিরে এসে

দাদার পায়ে ধরতে হবে,সেরকম ভবিষ্যৎবাণীও করল।আদ্যনাথ কাকা সবার উপরে টেক্কা দিয়ে ‘আমি আগে থেকেই জানি-এই কুষ্মাণ্ডের মতিগতি।তুই হলি রামচন্দ্র,কিন্তু সে তো লক্ষণ নয়-ভরত।সে ফিরে না এসে কোথায় যাবে?’

        শরতের রাগ হলেও তার মনটা আজ খুব খারাপ হয়ে গেল।‘আসবে বলে’কথাটা বড় ভালো লাগল এবং মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাল –যেন এই কথা সত্যি হয়,সে যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। অন্য কিছু চাই না।এই ছোট ভাইটিকে কত ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে।বাবা বহুদিন আগে ইহলোক ত্যাগ করেছে।মায়ের মৃত্যুর সময় কীভাবে ভাইয়ের হাত তার হাতে তুলে দিয়েছিল,-সমস্ত কথা মনে পড়তে লাগল।চাকরি

না করলে নেই,যে কতদিন ভগবান এক মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করবে,হেমন্ত ও নিশ্চয় তার ভাগ পাবে।তার অদৃষ্টে লেখাপড়া ছিল না,তাই হল না।চাকরি না করার জন্য তাকে কড়া কথা বলায় শরৎ মনে মনে দুঃখ বোধ করতে লাগল।

        সাতদিন পরে শরৎ একটা চিঠি পেল।কলকাতা থেকে হেমন্ত লিখেছে,‘আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে পারিনি বলে কিছু মনে করবেন না। আগে থেকে জানিয়ে

দিলে আমার আসা হত না। চাকরি পেয়েছি।আফ্রিকা যাচ্ছি।কাল সকালে আমাদের জাহাজ ছাড়বে।’

        ঠিকানা নেই।কোথায় উত্তর পাঠাবে বুঝতে পারল না।বেতন কত সেটাও

লিখেনি।টেলিগ্রাম করে খবর আনারও কোনো উপায় নেই।কারণ,এই চিঠি পাওয়ার আগেই জাহাজ কলকাতার বন্দর ছেড়ে চলে গেছে।শরতের মনটা অস্থির হয়ে উঠল।সমস্ত শুনে

হেমন্তের স্ত্রী কুমুদিনী কাঁদতে লাগল।কমলিনী সঙ্গে সঙ্গে চোখের জল ফেলতে

লাগল।শরৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-‘যাক,যার যা কর্মফল ভুগুক।’


*                        *              *               *

        ‘ডব্লিউ বনফিল্ড এণ্ড কোম্পানি’আফ্রিকার গভীর জঙ্গল থাকা কিছুটা জায়গা নিরানব্বই বছরের জন্য ম্যাদি-পাট্টা করে নিয়েছে। সেই বন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করার জন্য ভারতবর্ষ থেকে অনেক শ্রমিককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেই শ্রমিকদের চালানোর জন্য কিছু মহুরির প্রয়োজন।জায়গাটা বড়

ভীষণ।সিংহ,বাঘ,আদি অনেক হিংস্র জন্তুর দ্বারা  জঙ্গলটা পরিপূর্ণ।নানা

জাতীয় বিষধর সাপের ও অভাব নেই। ডাঁশ,মশা প্রভৃতির অত্যাচারে দিন-রাত

মশারির ভেতরে থেকে কিছুটা শান্তি পাওয়া যায়।অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর জায়গা।

শুধু তাই নয়,এক ধরনের ডাঁশ নয়,মশাও নয় এমন এক প্রাণী আছে যা কামড়ালে

মানুষ ঘুমোতে ঘুমোতে মৃত্যুবরণ করে। এই সমস্ত কারণে বেতন ভালো না হলে কেউ সেখানে যেতে চায় না।এর আগে যাওয়া অনেকেরই কয়েকমাসের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে।যে কয়েকজন আছে,তারাও চলে আসতে পারলেই বেঁচে যায়।তাই মাসিক ১৫০ টাকা বেতনে সেখানে লোক নিয়ে যাচ্ছে।সেটাও বছরে ২৫ টাকা করে বেড়ে গিয়ে তৃতীয় বছরে পুরোপুরি ২০০ টাকা করে পাবে।তিন বছরের এগ্রিমেন্ট করে যেতে হবে।লেখাপড়া বেশি না জানলেও হবে।যা প্রয়োজন তা হল সাহেবের কথা শ্রমিকদের এবং শ্রমিকদের কথা সাহেবদের বোঝানোর মতো কাজ চালানোর ইংরেজি জ্ঞান থাকা

স্বাস্থ্যবান মানুষ।

        হেমন্তের সেই সমস্ত গুণ ভালোই ছিল।স্কুলে পড়ার সময় ক্লাসে পড়া পারুক না পারুক ইয়ার্কির ছলে সঙ্গের ছাত্রদের সঙ্গে শুদ্ধ হোক বা ভুল হোক ফরফর করে ইংরেজি বলতে পারত। এটাই পরবর্তীকালে তাকে ইংরেজিতে কথা বলার শক্তি জোগাল।সমস্ত রকমের খেলা এবং জিমনাস্টিকে সে একজন ওস্তাদ।তাছাড়া ডাম্বেল ইত্যাদির সাহায্যে ব্যায়াম করা এবং পশ্চিমের শ্রমিক,রাঁধুনি বা অন্য কোনো মানুষ,যে একজন কিছুটা কুস্তির প্যাঁচ জানত সেখানে গিয়ে যে কয়েকটি প্যাঁচ পায় সেগুলি শিখে নেওয়া হেমন্তের একটি প্রধান কাজ ছিল।শরীরে কিছু শক্তিও হয়েছিল। শুধু এই শক্তির ওপরে নির্ভর করে সে বিদেশ যেতে সাহস করল। কেউ যদি তাকে একটা ঘুসি মারে তাহলে সেও তাকে ছেড়ে দেবে না।

        এই যাত্রায় কোম্পানি মোট ১৬ জন মহুরি নিয়ে যাচ্ছে।সবাই বাঙালি,একমাত্র

হেমন্তই অসমিয়া।

        সকাল সাতটার সময় জাহাজ ছেড়ে দিল।নতুন জায়গা দেখার নতুন আনন্দে সবাই মাতোয়ারা।সাড়ে বারোটার সময় জাহাজ যখন গঙ্গা সাগর ছেড়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ল তখন সমস্ত ভারতীয়রা মাতৃভূমির দিকে তাকিয়ে রইল।চারপাশে কেবল নীল জল। একেই

কালো পানি বলে।ওপরেও উজ্জ্বল নীল আকাশ।

        জাহাজ কলম্বো গিয়ে সেখানে দুদিন থেকে সোজাসুজি আফ্রিকায় যাবে।ডেকের মধ্যে প্রায় দুশো শ্রমিক সেই জঙ্গল কেটে কোম্পানির অর্থাগমের পথ পরিষ্কার করার জন্য যাচ্ছে। এইভাবে প্রায় প্রতিমাসে শ্রমিক চালান হচ্ছে।হেমন্ত

ভাবল,-‘হে ভারতমাতা তোর সন্তানের পরিশ্রমের সুফল ভোগ করবে অন্য দেশের কোম্পানি।এই রকম সুসন্তানের জন্ম দিতে পারিস না,যে অহোপুরুষার্থ করে এই ধরনের কোম্পানি খুলে বাইরের টাকা ঘরে আনতে পারবে?’

        হেমন্তের দেশ ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার কথা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।তার যেখানে যত পাওনাদার ছিল সবাই এসে শরতের এখানে হাজির হল।বাজারের একজন কাপড়ের দোকানি জানাল,তার দোকান থেকে হেমন্ত দুই জোড়া কোট পেন্ট এবং আধ ডজন শার্ট দুই চারদিনের মধ্যেই টাকা দিয়ে দেব বলে বাকিতে নিয়ে গেছে।তার বাকিটুকুর জন্য সবাই ভালো করে ঘিরে ধরল।শরৎ সবাইকে বলে দিল, আমি সেসবের কিছুই জানি না।

যে বাকি নিয়েছে সে দেবে।তাকে বাকি দেবার আগে আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল কি? আমি তার জন্য মোটেই দায়ী নই।‘’

        দোকানি অবশ্য চলে গেল,কিন্তু যাওয়ার আগে হেমন্তের উদ্দেশ্যে

–‘জূয়াচোর,ঠগ বদমাশ’ইত্যাদি খারাপ খারাপ কথা বলে গালিগালাজ করে গেল।শরৎ আর কী করবে? কথাগুলি শুনে হজম করে নিল।কিন্তু কুমুদিনীর অন্তরে বড় আঘাত লাগল।–একজন সাধারণ দোকানি ভদ্রলোকের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এতগুলি কথা শুনিয়ে গেল।তার ইচ্ছা করতে লাগল –বড়দাদা একটা দা দিয়ে দোকানির মাথাটা যেন কেটে নিয়ে আসে।তিনি যদি পুরুষ মানুষ হতেন তাহলে কখনও এই গালিগালাজ শুনে

বসে থাকতেন না।কিন্তু যার ধার শোধ করার কোনো উপায় নেই ,তার ধার করা বা বাকি করে জিনিস কেনার দরকার কি?

        আবার ভাবলেন,যার স্বামীর এক জোড়া শাড়ি কিনে দেবার ক্ষমতা নেই,তার স্ত্রীর কানে সোনার দুল,হাতে বালা এবং গলায় হাড় পরার যৌক্তিকতা কোথায়?

        তখনই কুমুদিনী নিজের শরীর থেকে অলঙ্কারাদি খুলে নিয়ে স্বামীর কোট-পেন্ট

প্রভৃতির দাম এবং কার কত টাকা পাওনা আছে সমস্ত কিছু দিয়ে দেবার জন্য

কমলিনীর মাধ্যমে ভাশুরের হাতে তুলে দেবার জন্য অনুরোধ জানাল।কমলিনী

গহনাগুলি হাতে নিয়ে তাকে বলল,‘তুমি পাগল হয়ো না,অলঙ্কার মেয়েদের আপদ

বিপদের সম্বল।এগুলি চলে গেলে পরে কী হবে?’

        ‘পরে!আমার অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে,-আপনি এগুলি দিয়ে আসুন!’

        কমলিনী সেসব নিয়ে স্বামীর হাতে তুলে দিল।শরৎ ভ্রাতৃবধূর পতিভক্তি এবং

আত্মসম্মান বোধ দেখে আনন্দিত হলেও সেগুলি নিল না। স্ত্রীকে বললেন-‘দোকানির কথায় বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ নেই।এর মধ্যে অন্য কোনো বন্দোবস্তও থাকতে পারে।জিনিসের ভালো-খারাপ,বেশি-কম ও হতে পারে।হেমন্ত যখন ফিরে আসবে,তখনও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।তা নাহলে হেমন্তের চিঠি এলে দাম।দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।এখন চুপচাপ থাকতে বলে দাও গিয়ে।’

        সেদিন এই পর্যন্ত।কিন্তু কুমুদনী অস্থির হয়ে উঠল,যেদিন থেকে প্রতিদিন

শুনতে লাগল সারা রাজ্যের মানুষ শরতের শুভাকাঙ্খী সেজে এসে হেমন্তের

নিন্দা করতে লাগল।সেসব শুনে ভাশুর কিছু বলে না,বরং ওদের তামাক-তামূল

ইত্যাদি খাইয়ে সন্তুষ্ট করে।মাঝে মধ্যে কুমুদিনীর মনে হতে লাগল –এই সংসার

ছেড়ে জঙ্গলে অথবা মায়ের ঘরে চলে যায়।কুমুদিনীর পিতার তখন মৃত্যু হয়েছিল।

        সমুদ্র উপকূলের একটি ছোট নগর থেকে নদীপথে নৌকা,জাহাজ এবং পরে ঘোড়া,গরুর গাড়ি,গাধা প্রভৃতির সাহায্যে পাঁচ-ছয়শ মাইল যাওয়ার পরে হেমন্তদের দলটা তাদের কর্মস্থলে গিয়ে হাজির হল।পঞ্চাশ ষাট জন মানুষ একত্রিত হয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজ করে।তা নাহলে দিনের আলোতেই হিংস্র জন্তুর হাতে পড়ার ভয়।রাতে বাঁশ কাঠ ইত্যাদির বেড়া দিয়ে ঘিরে তার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে ১৫০-২০০ শ্রমিক,বাবু,সাহেব মিলে থাকার ব্যবস্থা। সাহেব আর বাবুরা মাঝখানে এবং তার চারপাশে থাকে শ্রমিকরা। গরু,ঘোড়া প্রভৃতির জায়গাও সেই খোড়লের মধ্যে।

        এত বন্দোবস্থের মধ্যেও প্রথম রাতে হেমন্ত যা দেখল তাতে তার মতো যুবকের

সাহসী হৃদয়ও ভয়ে কেঁপে ঊঠল।কোনোভাবে একটা সিংহ গড়ালের বেড়ার ওপর দিয়ে বেয়ে বেয়ে ভেতরে ঢুকেছিল।কাফ্রি শ্রমিকরা সিংহের গতিবিধি সম্পর্কে বেশ ওস্তাদ।কোনো রকমে টের পেয়ে মরণের হাত থেকে রক্ষা পেল।কিন্তু একজন ভারতীয় শ্রমিকের ইহ-জীবনের রোজগারের প্রয়োজন চিরকালের জন্য নাই করে দিয়ে পশুরাজ তাকে বিড়াল নিয়ে যাবার মতো করে মুখে নিয়ে চলে গেল।মহা গোলমাল বাঁধল।বন্দুকের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ হল,কিন্তু অনেক পরে।দেশবাসী যে কাকে বলে তা বিদেশে না থাকলে বোঝা যায় না।আজ বিদেশে এসে হেমন্ত দেশবাসীর ভালোবাসা ভালো করে বুঝতে পারছে।একজন দেশবাসীর মৃত্যুতে তার মন উদাস হয়ে গেল।

        কয়েকদিন পরে হেমন্ত দেখল,এই ধরনের ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটছে।কিন্তু দেখে

দেখে আর মরণের চিৎকার শুনে শুনে তার সহ্য হয়ে গেছে।মনের মধ্যে আর কোনো

ধিক্কার দেখা দেয় না।সিংহ,সাপ,বাঘ যত মানুষ ধ্বংস করা সম্ভব করেছে।তার

বাইরে জংলী অসুখে পরে দিন রাত মানুষ মরে সাফ হয়ে যাচ্ছে।তার ওপরে চালকের

অত্যাচারও কোনো অংশে কম নয়। সেইসব দূর-দূরান্তের জঙ্গলের ঘটনা সভ্য জগতের

কানে আসে না।এলেও কালার ভান করে পড়ে থাকে।

        হেমন্ত চাকরিতে প্রবেশ করার দ্বিতীয় মাস থেকে দাদার নামে ত্রিশ এবং

স্ত্রীর নামে দশ টাকা নিয়মানুসারে পাঠাচ্ছে।একথাও জানতে পেরেছে যে, যে

সমস্ত মানুষ আগে তার নিন্দা করেছিল তারাই এখন বলে বেড়াচ্ছে—‘আগেই বলেছি

না,হেমন্ত একজন মানুষ হবে।তার জন্য তোমাদের কোনো চিন্তা নেই।’

        আদ্যনাথ কাকা হাসতে হাসতে বললেন-‘দেখ,আমার কথা তোমরা বিশ্বাস করতে চাও

না।এখন দেখ!আমি কি আগেই বলিনি?’

        মহুরি ছাড়াও একজন ছোট সাহেবের জংলি অসুখ হল।সেখানে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত

জেনে তিনি ছুটি নিয়ে স্বদেশের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।হেমন্তের

কথা-বার্তা,স্ফুর্তি,কাজে তৎপরতা দেখে বড় সাহেব খুব খুশি হয়েছিলেন।তাছাড়া

একদিন বড় সাহেবকে একজন কাফ্রি শ্রমিকের আক্রমণের হাত থেকে হেমন্ত রক্ষা

করেছিল। তার পুরস্কার স্বরূপ সেই সাহেবের জায়গায় তাকে বসিয়ে দেওয়া

হল।কিন্তু বেতন মাত্র চারশো টাকা।সাহেব ছয়শো টাকা করে পেতেন।হেমন্ত খুব

খুশি হল।তার জীবনে সে কখনও মাসে চারশো টাকা করে বেতন পাবে সে কথা

স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।তাছাড়া এখন তার মহুরিদের থেকে পরিশ্রম অনেক

কম।হিংস্র জন্তুর হাতে মরার ভয় প্রায় নেই বললেই হয়।

        বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হেমন্ত দাদা এবং স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠানোর

পরিমাণ আরও দশ টাকা এবং পাঁচ টাকা করে বাড়িয়ে দিল।কিছুদিনের মধ্যেই এই

কথা জানাজানি হয়ে পড়ল।আত্মীয়-স্বজনরা পুনরায় এসে শরতের কাছে হেমন্তের

প্রশংসা করে গেল।আদ্যনাথ কাকা এবার নিজের ভবিষ্যৎ বানী সফল হওয়া সম্বন্ধে

শরতকে শুনিয়ে তার কাছ থেকে দুই টাকা ধার নিয়ে গেল।অন্যরা এসে নিজের নিজের

দাদা বা ভাইয়ের মনুষ্যত্বের অভাবের কথা বর্ণনা করতে লাগল।তারা নাকি অনেক

টাকা রোজগার করে,কিন্তু প্রকৃত অভাবের কথা জানতে পেরেও সাহায্য করে

না।অথচ বাইরে খরচ করার সময় কোনো ত্রুটি দেখা যায় না।

        হেমন্তের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পুনরায় তিন বছরের চুক্তি করা

হল।বড় সাহেব তাকে খুব ভালোবাসে।নতুন করে বন্দোবস্তে পাঁচশো টাকা করে ঠিক

করা হয়েছে।মাসিক ছয়শো টাকা দিয়ে সাহেবদের সমান করে দিলে কোম্পানির

ডিরেক্টররা অসন্তুষ্ট হবে।কারণ ভারতবাসীদের সাদা সাহেবের সমান বেতন দেবার

নিয়ম নেই।তাই একশো টাকা কম করে দেবার পরামর্শ দেওয়া হল।যাই হোক না,বহুদিন

বাড়ি ঘর ছাড়া হয়ে আছে—একবার দেখে আসা প্রয়োজন বলে হেমন্ত তিন মাসের জন্য

ছুটি নিয়ে বাড়িতে এল।জঙ্গলের মধ্যে খাওয়া দাওয়া এবং যৎসামান্য কাপড় চোপড়

ছাড়া তার আর কোনো খরচ ছিল না।খাওয়ার জিনিসও কোম্পানি পাইকারি হারে কিনে

বিনা লাভে নিজের মানুষদের জুগিয়েছিল।সেইজন্য বেতনের বেশিরভাগই জমা

হয়েছিল।তারপরেও এদিক ওদিক করে শ্রমিকের হাজিরা লেখা,কুইনাইনের পরিবর্তে

শ্রমিকদের মাঝে মধ্যে দেশি ওষুধ খাওয়ানো প্রভৃতির জন্য অন্য সাহেবের মতো

হেমন্ত ও মহুরিদের এবং ডাক্তারদের কাছ থেকে একটা অংশ পেত।তা থেকেও কিছু

টাকা রোজগার হত।বাড়িতে এসে কাপড় চোপড় আদি ছাড়াও দশ হাজার টাকা দাদার হাতে

তুলে দিল। সঙ্গে স্ত্রীর হাতে ৫০০ টাকা আলাদা করে দিল।

        হেমন্ত তিন বছর পরে ফিরে এসেছে। তারপরে আবার এতগুলি টাকা নিয়ে ফিরেছে।

এই কথা বাড়ির কেউ কখনও আশা করেনি।তার খাতির যত্নের আর সীমা রইল না।

প্রতিবেশীরা শুনল –অনেক টাকা এনেছে।কিন্তু কত টাকা তা কেউ জানে না। তাই

নিজ নিজ অনুমান এবং কল্পনার আশ্রয় নিয়ে কেউ লাখ টাকা,কেউ পঞ্চাশ হাজার

বলে বেড়াতে লাগল। যাদের যাদের মনে হিংসা হতে লাগল তারা বলল‘ইস লাখ টাকা

কি মুখের কথা নাকি?খুব বেশি হলে হয়তো দুই-চার হাজার টাকা এনেছে।তার মধ্যে

ওর বিদ্যা বুদ্ধিই বা কতটুকু? এসব বড় বড় কথা রেখে দে।’

        আদ্যনাথ কাকা প্রতিদিন হেমন্তদের বাড়িতে আসতে লাগল।এতদিন  কুমুদিনীকে

সান্ত্বনা দেওয়া তার বাইরে যে আর কেউ ছিল না সে কথা প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে

দিতে লাগলেন।প্রথম দিন পাঁচ টাকা এবং তারপর থেকে প্রতিদিন দুই চার আনা

করে চেয়ে নিতে লাগলেন।

        ছুটির তিনমাস বড় আনন্দের সঙ্গে ,কিন্তু খুব দ্রুত পার হয়ে গেল।দেনাদার

পাওনাদার সবার সমস্ত রকম সমস্যার নিস্পত্তি হয়ে গেল।আত্মীয় স্বজনের

দিন-রাত আসা যাওয়া।টাকা আছে বলে জানতে পারলে মরচে ধরা আত্মীয়তা বা

বন্ধুত্ব মেজে ঘষে মসৃণ করে তোলা মানব সমাজের দস্তুর।

        শরতের একটি ছেলে হয়েছিল।তার বয়স এখন আড়াই বছর।এই কয়েকদিন কাকুর কোলে

কোলে ঘুরে ফিরে মিষ্টি বিস্কুট ইত্যাদি খেয়ে তার সঙ্গ ছাড়তে চাইছে না।

সেইজন্য হেমন্ত ও বাড়ির বাইরে যেতে পারছে না।কুমুদিনী স্বামীর দীর্ঘ

প্রবাসের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।কিন্তু হেমন্তকে তার কর্তব্যবোধ

বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল।বয়স এবং শক্তি থাকতে থাকতে টাকা রোজগার

করতে না পারলে আর কখন রোজগার করবেন?বিশেষ করে ‘এগ্রিমেন্ট’করা চাকর যখন।

        দাদা পঞ্জিকা দেখে একটা ভালো দিন ঠিক করে দিল। সেদিন বাড়ির সবার চোখেই

জল,হেমন্ত সম্পর্ক অনুসারে প্রণাম-আশিস নিয়ে এবং জানিয়ে আবার কর্মস্থলের

উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল।

        জামাইকে দেখাশোনা করার জন্য শাশুড়ি পার্বতী এসে এই তিনমাস এক সঙ্গেই

রয়েছে।তিনিও হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন।

        শরৎ ভাঙ্গা ঘরবাড়ি সংস্কার করে নিলেন।কমলিনী ঘর বাড়ি নতুন করে সংস্কার

করে গৃহ-বিলাসিতার পরিচয় দেবার পরামর্শ দিয়েছিল।কিন্তু তাঁর দৃষ্টি

অন্যদিকে ছিল।বসে খাবার মতো যাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে তাদের পক্ষে শহরে

সুন্দর ঘর-বাড়ি শোভা পায়।যাদের সামান্য চাকরির ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের

পক্ষে নগরে বাড়িঘর তৈরি করে টাকা আটকে রাখা কোনোমতেই যুক্তিযুক্ত নয়।আজকে

তার অভাব হলে পরিবার মাটি কামড়ে থেকে বেঁচে থাকতে পারবে না।তারচেয়ে

গ্রামে জমি-মাটি কিনে রাখতে পারলে বিপদের সময় অন্তত পেটের দুমুঠো ভাত

জুটে যাবে।ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা?টাকা থাকলে বোর্ডিঙে অথবা কারও বাড়িতে

আশ্রয় নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।তিনি অর্ধেক টাকা ব্যাঙ্কে রেখে

বাকি অর্ধেক দিয়ে একটা খাট কিনে রাখলেন।

        শরতদের অবস্থার পরিবর্তন হল।কমলিনী বাড়ির কর্ত্রী।কুমুদিনী কেবল অবসর

সময়ে মাছের খোসা দিয়ে নানা নক্সা,টেবিল-ক্লথ ইত্যাদি তৈরি করে।কমলিনীর

ছোট ছেলে বসন্ত।একবার মায়ের কোলে,একবার কাকিমার কোলে থাকে।সংসারটা বড়

সুখের হয়ে উঠল।হেমন্ত একা কেবল প্রবাসে।এটাই যা দুঃখ।

        আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া বেড়ে গেছে।অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে বোধকরি

বিদ্যাবুদ্ধিও বেড়ে গিয়েছিল।না হলে যে সমস্ত মানুষ কখনও শরৎ কে গ্রাহ্যই

করত না তাদের প্রতিটি কথায় তাঁর কাছে পরামর্শের জন্য তারা তাঁর কাছেই

আসতে শুরু করল কেন?কিন্তু অসূয়া প্রবৃত্তি,পরশ্রীকাতরতা কিছু মানুষের

মধ্যে বেশ প্রবল। শরতদের সুখ দেখে ওদের অসহ্য বোধ হল।কুমুদিনীর ওপরে

অতিমাত্রায় সহানুভূতি সম্পন্ন হয়ে উঠল।কমলিনীরা যে তার সর্বনাশ করতে শুরু

করেছে ,একথা বলে বলে দিন রাত কুমুদিনীর মন ভাঙাল।তার ফলে ঘর ভাঙল।

        আদ্যনাথ কাকা হেমন্তের সামনে যখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিল,তখন

কমলিনী হেসে ফেলেছিল।কাকা ভাবলেন,এই কমলিনী মেয়েটির প্রগলভতা বা হালকা

চাল তার প্রাপ্তি কমাল।নাহলে যে মানুষ লাখ টাকা বাড়ি নিয়ে এসেছিল,সেই

মানুষ কি তাকে একশো টাকাও হাতে দিত না?নিশ্চয় দিত।এমনিতে না দিলেও ধার

হিসেবে নিশ্চয় দিত।

        আদ্যনাথ কাকা কারও বাবার ভাই অবশ্য নিশ্চয় নয়,কিন্তু তিনি এই নগরের

সবারই কাকা।সবার বাড়িতেই তার অবাধ গতি।সবার কাছ থেকেই টাকাটা,সিকিটা

চাইলেই পায়।কখনও কখনও ধার বলে নিয়ে যায়। না বললেও চলে –আজ পর্যন্ত শোধ

করার কথা কেউ শুনেনি।তিনি কমলিনীকে না শুনিয়ে কুমুদিনী এবং তার মায়ের

প্রশংসা করে মাঝে মধ্যে দুই এক টাকা আদায় করে নিতে লাগলেন।কেবল এটা হলে

কথা ছিল না।কুমুদিনীকে বোঝাতে লাগলেন এই সংসার তাঁর স্বামীর।শরতের আর কত

টাকা উপার্জন?

        পার্বতী পতি বিয়োগ বিধুরা মেয়েকে ছেড়ে বাড়ি যেতে পারেনি।কুমুদিনী ছেড়ে

দেয়নি।বাড়িতে জা-দেবরের সঙ্গে সব সময় ঝগড়া লেগে থাকে বলে তাকে আলাদা করে

দিয়েছিল।এখন একা নিঃসঙ্গ তিনি।তাই ঘর-বাড়ি  ছেড়ে জামাইয়ের বাড়িতে

স্থায়ীভাবে থাকতে লাগলেন। কয়েকদিন থেকে তিনি জামাই এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ

ভেবে অস্থির হয়ে উঠলেন।কুমুদিনীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে তার একটু

শক্ত হওয়া উচিত,নাহলে নিজের সম্পত্তি অন্যে ধ্বংস করবে। কাকা সেই কথারই

পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন।কুমুদিনী সত্য যুগের মেয়ে নয়,এই কলি যুগের

মেয়ে।নিজের স্বামীর উপার্জিত সম্পত্তিতে কর্তৃত্ব পছন্দ হল না। প্রতিবেশী

দুই একজন বয়স্ক মহিলার ‍কাছ থেকেও এই বিষয়ে সহানুভূতি পেয়ে কুমুদিনী

একদিন আত্মপ্রকাশ করল।কী এক সামান্য কথা নিয়ে জায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে খাওয়া

দাওয়া বন্ধ করে দিল।পার্বতীর মনোবাঞ্ছা পূরণ হল।

        শরৎ নিরুপায় হয়ে ঝগড়া মিটিয়ে দেবার জন্য আদ্য কাকাকে মিনতি

করেছিল।‘আচ্ছা বলব।এ কি কথা,নিজের পেটের ভাই-দাদার সংসার।তারমধ্যে আবার

এসব কি?আমি বুঝিয়ে বলব,লোকের টাকা ভেঙ্গে ভোগ করার সুবিধা আর বেশিদিন

চলবে না।তুই কারও কথা শুনিস না।’

        পার্বতী হাসতে হাসতে সামনেই বসা থেকে বলে উঠল,স্বার্থ!স্বার্থ!!আমি

এখানে থাকতে মিল হতে দেব না।আলাদা যখন হয়েছে হয়েছেই।

        কাকা অভয় দিয়ে উত্তর দিল,‘আমি থাকতে তোমাদের কোনো ভয় নেই।অধর্ম করে কারও

সর্বনাশ করাটা আমি সইতে পারি না।তবে দুটো টাকা না দিলে আমার তো আজ চলছে

না।তোমাদের খেয়ে পরেই তো মানুষ।’ আদ্যনাথ কাকার ধর্মজ্ঞান দেখে কুমুদিনীর

হাসি উঠেছিল।কিন্তু এরকম একজন সহানুভূতি দেখানো মানুষকে বড় ভালো লাগল।পরম

সমাদর করে বসিয়ে তামাক এনে দিল।নানা গোপন পরামর্শের পরে দুটো টাকা দিয়ে

বিদায় করে দিলেন।যাবার সময় আদ্যনাথ কাকা শরৎ এবং কমলিনীর সঙ্গে দেখা করে

বললেন,কানের কাছে ফিসফিস করে,‘ভয় নেই!অবুঝ! রাগ করে আলাদা রেঁধে

খাচ্ছে।কয়েকদিন খেতে দাও।তোমাদের ওপরে ভক্তি আছে।আচ্ছা,আজ এলাম।আগামীকাল

আবার আসব।বুঝিয়ে সুজিয়ে ঠিক করব। তবে আমার দুটো টাকার প্রয়োজন

ছিল।তোমাদের খেয়ে পরে মানুষ।শরৎ স্ত্রীকে একটা টাকা এনে দিতে

বললেন,‘উপকারী বন্ধুর বড় অভাব।’

        হেমন্ত দাদা এবং বৌদির বিরুদ্ধে স্ত্রীর কাছ থেকে নানা ধরনের অভিযোগের

চিঠি পেতে লাগল।দোষের অন্ত নেই।বিদেশে থেকে,এই সমস্ত ঘরোয়া বিবাদের কথা

জানতে পেরে কিছুটা অশান্তি পেলেন।বুঝতে পারলেন ঘরে শনির প্রবেশ

ঘটেছে।দাদা এবং বৌদি কিন্তু ভেতরের কোনো কথা না লিখে একটা চিঠিতে

শুধুমাত্র লিখেছিলেন-তার  স্ত্রীকে অর্থাৎ কুমুদিনীকে কর্মস্থলে নিয়ে

যেতে পারলে ভালো হত।বিদেশে একা একা থেকে হেমন্তও যে কখনও কখনও এমন কথা

ভাবেনি তা নয়।কিন্তু অস্বাস্থ্যকর বিদেশ,-সাত সাগর,তেরো নদীর পার!অবশ্য

বর্তমানে জঙ্গল কাটা প্রায় শেষ।এখন নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির

সাহায্যে চাষ-বাস করা হচ্ছে।কোম্পানির লাভের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলায়

নগর না বসলেও বড় লোকালয়ের সৃষ্টি হয়েছে।নানা ধরনের কলকারখানা গড়ে উঠেছে।

তাতে কী আসে যায়? চাকরি জীবন স্বাধীনচেতা মানুষের কখনও ভালো লাগে না।

টাকা রোজগারের জন্য বিদেশে পড়ে থাকলেও বিদেশে জীবন কাটানোয় তার মোটেই

ইচ্ছা নেই। বিশেষ করে প্রবাসে বাস করার ফলে দেশের প্রতি টান এবং জাতির

মান সম্ভ্রমের দিকে দৃষ্টি অনেক বেড়ে গেছে। তাই কুমুদিনীকে নিয়ে যাবার

মতো অসম্ভব চিন্তা মনে স্থান দিলেন না।বরং তার বিশ্বাস হল –স্ত্রীর নামে

আরও পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দিলে এবং কমলিনীর নামে আলাদা করে প্রতি মাসে কুড়ি

টাকা পাঠিয়ে দিলে পরস্পরের প্রতি হিংসা দূর হয়ে দুই জায়ের মিল হবে।

        হেমন্তের শুভ ইচ্ছা ফলল না।কমলিনীকে আলাদা টাকা পাঠাতে দেখে হিংসায়

পার্বতীর এবং কুমুদিনীর অন্তর জ্বলে পুড়ে যেতে লাগল।আদ্যনাথ কাকা সেই

আগুনে ইন্ধন জোগাতে লাগলেন।কুমুদিনী নানা মান অভিমান করে স্বামীকে চিঠি

লিখলেন-হেমন্তের এই ধরনের ব্যবহারে শ্ত্রুরা হাসছে,মিত্ররা কাঁদছে।

        অন্য জায়গায় চাকরি করায় দাদা-ভাইয়ের মধ্যে ভক্তি-ভালোবাসা বৃদ্ধি পেলেও

হেমন্ত কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়ল।কারণ,অন্যের মেয়েকে বিয়ে করে এনে সুখ

দুখের ভার মাথা পেতে নিয়েছে যখন –সে যাতে অখুশি না হয় সেদিকেও দৃষ্টি

রাখতে হবে।হেমন্ত ভেবে চিন্তে কুমুদিনীকে একটি চিঠি লিখল-‘তোমার কথাই

রাখা হবে। বৌদির সঙ্গে মিলে মিশে থাকবে।শ্ত্রু হাসে-এই ঘরোয়া বিবাদের কথা

জানতে পেরে।আমার এগ্রিমেন্ট শেষ হতে আর দেরি নেই।আমি গিয়েই সম্পত্তি ভাগ

করে নেব।এখন চুপ করে থাক।’

        চিঠি পেয়ে কুমুদিনীর মহা আনন্দ।পার্বতীর আনন্দ দেখে কে?পরামর্শদাত্রী

অন্যন্য মহিলারাও কুমুদিনীকে এই সৎ পরামর্শ আগেই দিয়েছিল বলে!আদ্যনাথ

কাকা হাসতে হাসতে বললেন দেখলে তো? দাও দশ টাকা দাও তো দেখি!

        কিছুদিন পরে হেমন্ত সুস্থ শরীর আর অনেক টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে এল।কলকাতা

থেকে বাড়ির সকলের জন্য কাপড়,বসন্তের জন্য বিস্কুট,বিলেতি মিষ্টি এবং নানা

কল-কবব্জা  থাকা পুতুল নিয়ে এসেছে।তার বিশ্বাস,শৈশব থেকে কল-কব্জা নিয়ে

মেতে থাকলে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার বা বৈজ্ঞানিক আলোচনার প্রতি প্রবৃত্তি

জন্মায়।বসন্তের বয়স এখন প্রায় ছয় বছর বয়স।তার একটি ছোট বোন হয়েছে।তার

জন্যও পুতুল আদি এনেছে।সেগুলি পেয়ে তার মহা আনন্দ।কুমুদিনীর কথা বলার

প্রয়োজন নেই-বিদেশ থেকে স্বামী এসেছে।তাও আবার খালি হাতে নয়,অনেক টাকা

নিয়ে এসেছে।এতদিন পরে সম্পত্তি ভাগ করে নিয়ে প্রকৃত অর্থে আলাদা হতে

পারবে।কার ও আজ্ঞাবাহক হয়ে থাকতে হবে মা।

        আনন্দ নেই কেবল শরৎ আর কমলিনীর।কারণ লোকে জানতে পেরেছিল বাড়ি এসে তার

প্রধান কাজ হবে –সম্পত্তি ভাগ করে নেওয়া।শরৎ অদৃষ্টবাদী হলেও রোজগারি

ভাইয়ের সঙ্গে আলাদা হতে হবে ভেবে মনে মনে কষ্ট পাচ্ছিল।কিন্তু সাবালক ভাই

যদি দুঃখের দিনের স্নেহ ভালোবাসা ভুলে গিয়ে স্বোপার্জিত সম্পত্তি নিয়ে

চলে যায় তাতে তারতো বলার কিছু নেই।ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ?কপালে যা আছে তাই

হবে।এত মন খারাপ করার কী আছে?—বুঝেন সবই,কিন্তু মন মানে কোথায়?মুখ গম্ভীর

হয়েছিল।মনে একটা বড় অভিমান ছিল যে ছোট ভাই স্ত্রীর কথায় তাকে স্বার্থপর

পাষণ্ড ভাবল।হতে পারে,কোথাও কোনও ব্যবহারে হয়তো উনিশ-বিশ হয়েছে। হতে

পারে,কাজে হয়তো ভুল ত্রুটি হয়েছিল।কিন্তু কার ভুল হয় না?ভাই এরকম শিক্ষা

পেয়েছিল যে দাদার চেয়ে নিজের স্ত্রীর জ্ঞান বেশি বলে ধরে নিয়ে,সে কোনো

কথা জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন মনে করল না।এক তরফা ডিক্রি দিয়ে দিল।তার থেকে

আলাদা হতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করল না,একটুও খারাপ  লাগল না?

        হেমন্ত দাদার সঙ্গে কথা বলার সময় কমলিনী চা এবং জলখাবার এনে দিল। খেতে

যাবে,এমন সময় পার্বতী তাকে ডেকে পাঠাল,‘তোমার শোবার ঘরে চা খেতে ডাকছে।’

        হেমন্ত একবার মুখ তুলে ‘যাচ্ছি’ বলে বসন্ত এবং তার ছোট বোনকে ডেকে এক

সঙ্গে বৌদির দিকে এগিয়ে গেল।তা দেখে শরতের দুচোখ থেকে দুই ফোঁটা আনন্দের

অশ্রু ঝরে পড়ল।কমলিনী ছেলে আর মেয়েকে বলল, ‘কাকার খাবার সময় তোরা কী

অসুবিধা শুরু করেছিস? আয়,চলে আয়।’

        মায়ের ধমক খেয়ে দুজনেই একবার কাকুর মুখের দিকে তাকাল।আপন বলে

জানলেও,একজনের কিছুটা পরিচিত হলেও ছোটটি একেবারেই অপরিচিত।কিন্তু কাকুর

স্নেহময় দৃষ্টি দেখে মায়ের শাসনের কারণ বুঝতে পারল না। হেমন্ত বৌ্দির

কথার উত্তরে বলল, ‘না কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তোমরা খাও।’তখন ভাই-বোন

দুজনেই একবার মায়ের দিকে অনুমতির জন্য দৃষ্টিপাত করল।মাকে একটু হাসতে

দেখে দুজনেই নির্ভয়ে কাকার জলপানের ভাগ নিতে লাগল।

        কুমুদিনী দেরি দেখে মায়ের মাধ্যমে আবার স্বামীকে তাগিদা দিয়ে পাঠাল- ‘চা

ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

        হেমন্ত লজ্জা পেল।একবার দাদা আর একবার বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে শাশুড়ির

দিকে মুখ করে বলল, ‘কী আছে,এখানে নিয়ে আসতে বলে দিন

  *                 *                 *                  *

    *               *

        স্ত্রী যে শয্যাগুরু –কুমুদিনী সে কথা ভালো করে প্রমাণ করল।সারা রাত

স্বামীর কানে বিষ ঢালল।শরৎ এবং কমলিনীর অসৎ ব্যবহার,স্বার্থপরতার কথা বলে

বলে হেমন্তকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করাল যে দেরি না করে কাল সকালে প্রতিবেশীদের

ডেকে এনে ওদের চোখের সামনে সম্পত্তি ন্যায্যমতে ভাগ করে নেওয়া হবে।

   *                 *                 *                  *

     *               *

        আজ শরৎ এবং হেমন্ত সম্পত্তি ভাগ করে নেবে।যাকে যাকে ডাকা হয়েছে সকলেই

এসেছে। বিনা আমন্ত্রণে ও কিছু লোক কেবল তামাশা দেখতে এসেছে।আদ্যনাথ কাকা

আজ যেন যৌবন ফিরে পেয়েছে।তাঁর স্ফুর্তি আর দৌড়াদৌড়ি দেখার মতো।একবার

পার্বতী আর কুমুদিনীর কাছে,একবার হেমন্ত আর শরৎ বসে থাকা জায়গায় ঘোরাফেরা

করছে। হেমন্তের মুখে মৃদু হাসি।কুমুদিনী চিকের আড়ালে,তার মুখেও হাসি

ছড়িয়ে পড়ছে।পার্বতীর দৃষ্টি চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে-মেয়ে জামাইকে যেন

ঠগানো না হয়।আর শরৎ ?—ধীর গম্ভীর,কথা-বার্তা নেই।কমলিনীর চোখে জল-একটা

অনির্দিষ্ট আশংকা এবং কোনো অজানা উত্তেজনা থেকে।

        বাক্স-পেঁটরা,বিছানা-পত্র,এক এক করে সমস্ত জিনিস বের করে দেওয়া হল।কেবল

হাড়ি,কলস,ডালা,কুলো,পাচি প্রভৃতি সাধারণ জিনিসগুলি বাকি রইল।হেমন্ত

লজ্জাহীনের মতো বলল,‘কারও ঘরে একটা হাড়ি পর্যন্ত রাখতে পারবে না। সমস্ত

বের করে আন। দুই দাদা ভাইয়ের মুখের সামনে ন্যায্যমতে ভাগ করা হবে।যেন পরে

কারও কোনো কথা বলার মতো সুযোগ না থাকে।’

        শরৎ কী আর বলবে?কেবল জিজ্ঞেস করল, ‘ছেলেমেয়েদের জিনিসগুলিও বের করতে

হবে?’হেমন্ত স্ত্রীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে পরে বলল,‘ ভাগাভাগি যখন

হচ্ছেই তখন ভালো করেই হোক।’

        শুনে শরতের ভ্রু একবার কুঞ্চিত হল।এই কথায় কেউ কেউ হেমন্তকে ছোট

মনের,খুব খারাপ বলতে লাগল।আদ্যনাথ কাকা বলে উঠলেন,‘আমাদের  হেমন্তের যেমন

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তেমনই বিবেচনা।দেখ দেখ কী বলছে!’

        শরৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কেবল সেসব কেন ছেঁড়া কাপড় চোপড় পর্যন্ত বের

করে দিল।হেমন্ত গম্ভীর ভাবে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল,‘সব বের করা হয়েছে না

এখনও কিছু বাকি আছে?’

        পার্বতী দৌড়ে কমলিনীর ঘরের ভেতর ঢুকে একটা পিতলের কলস এবং একটা ঘটি বের

করে বলল, ‘এই যে সবাই দেখুন কত বড় চোর।’

        কমলিনী চিৎকার করে উঠল,ঐ দুটো আমার বাপের বাড়ির।’

        শরৎ রাগ করে বলল,‘চুপ,একদম আওয়াজ করবি না। বের করতে বলা হয়েছিল,কেন রেখে দিলি?’

        বসন্ত এবং তার বোন খেলনাগুলিকে বের করে দিতে দেখে সেগুলি আনতে

গিয়েছিল।পার্বতী দৌড়ে গিয়ে তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে রেখে দিল।ওরা কাঁদতে

লাগল।হেমন্ত দেখে ভ্রুকটি করল এবং সমস্ত কিছু বের করা হয়েছে শুনে হেমন্ত

গম্ভীর হয়ে উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন করে বলল,‘ দুই ভাই-দাদা কেই আপনারা

জানেন।শৈশবে বাবার মৃত্যুর পরে এই দাদা আমাকে লালন পালন করে মানুষ

করেছিল,শিক্ষা দান করেছিল,পরে বিয়ে দিয়ে সংসারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।    ’

        সবাই উত্তর দিল,‘আমরা সেসব কথা জানি।’আদ্য কাকা বললেন,‘তবে তোমাদের বাবা

কিছু জমি-বাড়ি কিনে গিয়েছিলেন না?’শরৎ কেবল তার নিজের অর্জিত টাকা দিয়ে

সংসার প্রতিপালন করেছিল বললে অন্যায় হবে।’

        ‘আমি কখনও এমন কথা বলি না।’-বলে শরৎ গর্জে উঠল।

        হেমন্ত পুনরায় বলতে লাগল,‘ঠিক কথা।সেইসব আমি জানি আপনারা জানেন কি সেই

জমি থেকে যতটুকু ধান পাওয়া যায় ,তাতে আমাদের ছয়মাস চাল কিনতে হয় না।বাকি

খরচটুকু দাদা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত টাকা দিয়ে চালাতেন-এ বিষয়ে কোনো

সন্দেহ নেই।যাই হোক না কেন,দাদা সংসার চালানোর টাকাটা সুদে-মূলে ধরলে কত

হতে পারে?’

        ‘কত আর হবে?মাসে ত্রিশ টাকা করে ধরলে বছরে তিনশো ষাট টাকা আর দশ বছরে

ছয়ত্রিশ শো টাকা হবে।তোমার জন্য তার অর্ধেক ধর’বলে কাকা এবার পার্বতীর

সঙ্গে পরামর্শ করে এল।

        হেমন্ত ‘আচ্ছা,আদ্যনাথ কাকার কথাই ধরে নেওয়া যাক।তাছাড়া চক্রবৃদ্ধি

সুদের হিসেবে মোট টাকা পাঁচ হাজারের বেশি হবে।এই পাঁচ হাজার টাকা আমি

দাদার মেয়ের নামে আলাদা ভাবে লিখে দিচ্ছি।’একথা বলে পাঁচ হাজার টাকার নোট

বের করে দাদার পায়ের কাছে রেখে দিল।শরৎ কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

        আদ্যনাথ বললেন,‘বাবা শরৎ ভালো করে রেখে দে। শরৎ কিছু বলল না,টাকাটা

স্পর্শ পর্যন্ত করল না। হেমন্ত পুনরায় বলতে লাগল,‘আচ্ছা!অন্য মাল

পত্র,টাকা পয়সা আমার অর্জিত টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে যখন সেগুলি একদিকে আর

আমি অন্য দিকে দাঁড়ালাম। দাদাই বলুন,তার কী চাই?’পরে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে

বললেন,‘তোমার কী চাই বল? আমাকে চাই না এই সম্পত্তি চাই?’

        কথা শুনে সবাই অবাক।কুমুদিনীর মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল।মনের আবেগে

দাদা ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।

--------


 ★লেখক পরিচিতি-১৮৮১ সনে অসমের লক্ষ্মীমপুরে নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর জন্ম হয়। তিনি আবাহন যুগের একজন অন্যতম ছোট গল্পকার।তিনি ১৯৩১ সনে শিবসাগর জেলায় অনুষ্ঠিত অসম সাহিত্য সভার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৩ নভেম্বর১৯৪৭ সনে তাঁর মৃত্যু হয়।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন