শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

তন্বী হালদার।। পারক গল্পপত্র



কাবেরী রান্না ঘরের স্ল্যাবটায় খুব করে ঘষে ঘষে বেশ বড়ো বড়ো কতগুলো গোল গোল আঁকলেন। বৃত্তগুলো অবশ্য দেখেই বোঝা যাচ্ছে আনাড়ী হাতের আঁকা। একটাও নিখুঁত হয়নি। ঝুমা কাজে এসে রান্না ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দেখার পর স্বভাবসুলভ হি হি করে হেসে ওঠাটাকে বকুনি খাবে জেনেও দমন করতে পারলো না। কাবেরী শেষ গোল্লাটা ধীরে ধীরে নিখুঁত বানানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ঝুমার হি হি করে দমকা বাতাসের মতো হাসিতে কাবেরীর নিঁখুত করে গোল বানানোর বদলে কেমন ত্রিভুজ ধরনের হয়ে যায় সেটা। আর তাই স্বাভাবিক সব রাগ গিয়ে পড়ে ঝুমার উপর। রাগে চীৎকার করে ওঠেন কাবেরী - দেখলি তো তোর জন্য গোলটা হলো না। সারাক্ষণ দেখো দাঁত বের করে হি হি করেই যাচ্ছে। দেখ, এ মাসের টাকা দিয়েই তোকে আমি দূর করবো। 

ঝুমা প্রায় গায়ের উপর আচমকা পোকা পড়ার মতো টোকা দিয়ে কাবেরীর কথা ঝেড়ে দেয়। 

- সে তুমি আমাকে প্রতি মাসেই করো। এই দূর করতে করতে চার বছর হয়ে গেল। এখন দয়া করে সরো। আমাকে কাজ করতে দাও। সকালবেলা কাজ নেই তো বসে বসে ছোটো বাচ্চার মতো রসগোল্লার ছবি আঁকছে! তাও যদি হতো। 

কাবেরী এবার ভয়ানক রেগে যান। চোখ পাকিয়ে বলেন - দেখ ঝুমা, মুখ সামলিয়ে কথা বলবি। জানিস তো না কিছু। রামায়ণের গল্পও জানিস বলে মনে হয় না। ঐ লারেলাপ্পা সিনেমা ছাড়া বুঝিস কিছু? 

ঝুমাও এবার রুখে দাঁড়ায়। 

- দেখো দিদা, তখন থেকে বহুৎ আলফাল বকে যাচ্ছো। কি শুনবো তোমার ওই শিঙাড়া আঁকার গল্প? আমার অন্য বাড়িও কাজ আছে। সরো বাসনগুলো মাজতে দাও। বাপরে কি পিঁপড়ে হয়েছে। 

কাবেরী এতক্ষণে বলবার মতো কিছু যেন হাতড়ে পান। 

- সে জন্যই তো তোকে বলছি রামায়ণের গল্প জানিস? 

ঝুমার তখন ডান হাতে দুটো লাল ছোটো জ্বালানি পিঁপড়ে কামড়েছে। পিঁপড়ে দুটোকে পিষে মেরে গলা চড়িয়ে বাঁ হাত দিয়ে ডান হাত চুলকোতে চুলকোতে বলে - দূর বাপু, মাথাটা ঠিক আছে তো, না সকালবেলা নেশা করেছো? 

কাবেরী এবার রণচণ্ডীর মতো প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েন ঝুমার ওপর। 

- কি বললি তুই? আমি সকালবেলা নেশা করেছি! জানিস আমার বাপের বাড়ি নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বংশধর। নেহাৎ লাইব্রেরীতে বই পড়তে গিয়ে তোর দাদুর সঙ্গে ইয়ে হয়ে গেছিলো তাই। 

ঝুমা আবার হাসি চাপতে পারে না। হেসে ওঠে। 

- হি হি। নাও বলো তো কি বলতে চাও। ঝেড়ে কাশো। জ্বালানি পিঁপড়ের সাথে রামায়ণের কি সম্পর্ক? আর হ্যাঁ, ঐ তোমার রামায়ণ না পড়লেও টিভিতে দেখেছি। যাই বলো আমার কিন্তু দুর্যোধনকেই হেব্বী লাগে। পুরো সিক্স প্যাক না কি বলে তাই। তবে দিদা তুমি কিন্তু সেই সময়েই প্রেম করেছিলে। হুঁ এটা মনে রেখো। 

কাবেরী একটু নরম গলায় মুখ ঝামটা দেন। 

- চুপ কর। এখনকার মতো ছিল নাকি আমাদের সম্পর্ক। সকালে ভাব হলো আর বিকালে কেটে গেলো। আমাদের সময় ছিল ভালোবাসা। যেমনটা ছিল জয়দেব আর পদ্মাবতীর। আহা, দেহি পদপল্লব মুদারম। 

ঝুমার প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা হয়। কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে সে আর ধরতেই পারে না। রামায়ণ, জ্বালানী পিঁপড়ে, জয়দেব আর কে একটা মেয়েমানুষের নাম বললো, সব ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে। অসহায় মুখে তাকায় কাবেরীর দিকে। 

কাবেরী বলে - কাজে আসিস তো বেলা দুপুর গড়িয়ে। তোর জন্য আর চা না খেয়ে বসে থাকা যায় না। দাদু তাই রোজই তো সকালে বানিয়ে নিজে খায়, ফ্লাক্সে রেখে যায়। যা গিয়ে আমার আর তোর কাপ, ফ্লাক্সটা নিয়ে আয়, চা খেতে খেতে বলছি। 

ঝুমার এবার রাগে গা’টা কড়কড় করে। কোনো মানে হয় এখনও দু’বাড়ি কাজ বাকি। খুব বলতে ইচ্ছা করছিল - ‘চা’টা তো দাদু বানিয়ে দিয়ে গেছে। নিজে যদি করতে!


ডাইনিং টেবিলে বেশ আরাম করে বসেন কাবেরী। সবে ঝুমা চা’টা  ঢালতে যাচ্ছিল। কাবেরী আবার হাইহাই করে ওঠেন - দাঁড়া, দাঁড়া ঢালিস না, ঢালিস না। 

ঝুমা ভ্রূ কুঁচকে তাকায়। 

কাবেরী মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন - না বলে দিলে তো ঘটে কিছু নেই। বিস্কুট এনেছিস? 

ঝুমাও একই সুরে বলে - তোমার তো ঘটে রামায়ণ, রসগোল্লা, শিঙাড়া সব গিসগিস করছে। তুমিও তো আনতে পারতে। 

কাবেরী কিছু বলার আগেই গজগজ করতে করতে উঠে যায় ঝুমা। 

- দেখো না, তোমাকে ছাড়াতে হবে না। আমিই ছেড়ে দেবো। জ্বালিয়ে মারলো বুড়ি। 

শেষের কথার স্বরগ্রামটা একটু নামিয়েই বলে। 

কাবেরী ওদিক থেকে আবার চেঁচান - এই আমার জন্য টোস্ট আনবি না। নীচের বাঁ দিকের মাড়ীর একটা দাঁত ঢকঢক করছে। 

ঝুমার এবার হাসির বদলে কান্না পেয়ে যায়। 


বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে খেতে থাকেন কাবেরী। ঝুমার ফোনে ‘হে ইউ লিসেন টু মী ইউ আর মাই লাভ জানো তুমি’ রিংটোন বেজে উঠলে কাবেরী মুখ ভ্যাঙচায় - ঐ শ্যামের বাঁশি বেজে উঠলো। 

ঝুমা বলে - চুপ করো। বাণী বৌদির বাড়ি থেকে ফোন করছে। আজ বৌদি একটু তাড়াতাড়ি কাজে আসতে বলেছিল। 

ঝুমা বেশ মিষ্টি করে বলে - হ্যাঁ গো বৌদি, এই দিদার এখানে কাজে এসে একটু আটকে গেছি। আর বলো না, এসে দেখি দাদু মর্নিংওয়াকে গেছে আর দিদার সুগার বেড়ে বিছানায় শুয়ে। আমি না আসলে কি যে হতো। হ্যাঁ কাল রাতে মনে হয় গোচ্চের মিষ্টি সাটিয়েছে। লোভ তো কম না। 

কাবেরী গরম চা’ই এক ঢোকে গিলে ফেলে। কিন্তু কিছু বলার আগেই ঝুমা একহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাবেরীর। তারপর হেসে হেসে গলে যেতে যেতে বলে - ও তোমরা চলে যাচ্ছো। হ্যাঁ গো আমাদের পাড়াতেও সবাই বলাবলি করছে ঐ অসুখটা নাকি মারাত্মক ছোঁয়াচে। একজনের হলে তাকে যে ছোঁবে তারই হবে। আশপাশের মানুষদেরও নাকি রেহাই নেই। কি কান্ড বলো দেখি! ও তোমরা সে জন্য গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছো! খুব ভালো করছো। আজ তালে আর যেতেই হবে না? বেশ বেশ কবে আসবে ফোন করে দিও। সাবধানে যেও। 

মুখ থেকে হাত সরাতেই কাবেরী এই মারেন তো সেই মারেন। 

- মিথ্যেবাদী। আমার লোভ! রাতে গোচ্চের মিষ্টি সাটিয়েছি! দাঁড়া দাদু ফিরুক, তোকে আজই দূর করবো। 

ঝুমা বলে - রামায়ণের কেসটা বলবে, না বলবে না? 

কাবেরীর তাও যেন রাগটা পড়তে চায় না। বলেন - তোর মতো আকাট মূর্খকে বলে কি হবে! 

ঝুমা ‘অ তালে কাজে লেগে পড়ি’ বলে উঠতে গেলে কাবেরী বলেন - রান্না ঘরে পিঁপড়ে দেখলি? 

ঝুমা ঘাড় নাড়ে। 

- ঐ যে চকটা দিয়ে দাগ দিচ্ছিলাম ওটা লক্ষ্মণখড়ি। তাই গন্ডী কেটে দিচ্ছিলাম। তাহলে ওটা পার হয়ে পিঁপড়ে ঢুকতেও পারবে না। বের হতেও পারবে না। 

ঝুমা ঠোঁট কামড়ে বলে - এর সাথে রামায়ণের কি সম্পর্ক? 

কাবেরী মুচকি হাসেন। 

- আছে, আছে। রামায়ণে বনবাসকালে দুষ্টু মারীচ যখন সোনার হরিণের রূপ ধরে রাম সীতার কুটীরের সামনে ঘুরতে লাগলো তখন সীতা তাই দেখে রামের কাছে বায়না করে ঐ হরিণটা আমাকে এনে দাও প্রভু। 

দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে ঝুমা বলে - ন্যাকা মেয়ে মানুষ! বায়না ধরছে। 

কাবেরী দু’হাত কপালে ছুঁয়ে বলেন - ছি ছি তুই সীতা মা’কে ন্যাকা মেয়েমানুষ বলছিস! তোর নরকেও ঠাঁই হবে না। 

ঝুমা বলে - ভুল হয়ে গেছে। নাও ফিনিশ করো। দাদু এলো বলে। 

কাবেরী এবার একটু গতি বাড়িয়ে বলতে থাকেন - রাম তো গেল হরিণ ধরতে। একটু পরে রামের গলার স্বর নকল করে মারীচ চীৎকার করে - ভাই লক্ষ্মণ বাঁচাও, বাঁচাও আমাকে। সীতা লক্ষ্মণকে বলে - তুমি এখুনি যাও, তোমার দাদা বিপদে পড়েছে। লক্ষ্মণ অনেক বোঝায় দাদাকে কেউ বিপদে ফেলতে পারবে না কিন্তু …। 

কাবেরীকে থামিয়ে ঝুমা মহা উৎসাহে বলে ওঠে - এই জানো দিদা একটা সিনেমা দেখেছিলাম। রাম লক্ষ্মণ। অনিল কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, মাধুরী আর একটা নায়িকা কে যেন ছিল। 

কাবেরী রাগে চায়ের কাপ ছুঁড়ে দেন ঝুমার দিকে। 

কিন্তু ঝুমা ধোনির ক্যাচ ধরার মতো ধরে নিয়ে বলে - মাইরী। এই কান ধরছি, তুমি বলো। 

কাবেরী প্রায় গড়গড় করে বলেন - ঐ তো লক্ষ্মণ শেষ পর্যন্ত গেল দাদাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা গন্ডী কেটে দিয়ে বলে যায় - এই গন্ডীর ভেতরে থাকলে সীতার কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু রাবণ ব্রাহ্মণ ভিখারী সেজে এসে ভিক্ষা চায়। সীতা ভিক্ষা দিতে গেলে রাবণ বলে গন্ডীর ভেতর থেকে সে ভিক্ষা নেবে না। 

ঝুমা আবার কি যেন একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে। 

কাবেরী চোখ বুজিয়ে এবার বলতে থাকেন - সরলমতি মা সীতা ভিক্ষুককে ফিরিয়ে দিয়ে সংসারের অকল্যাণের ভয়ে গন্ডীর বাইরে আসে। আর যেই না বাইরে আসে রাবণ নিজের মূর্তি ধরে সীতাকে হরণ করে নিয়ে যায়। ঐ কেটে দেওয়া গন্ডীর নাম তাই লক্ষ্মণ গন্ডী বলে, বুঝলি? 


কলিং বেলটা বেজে উঠলে ঝুমা ছুটে যায়। যেতে যেতে বলে - বুঝলাম না বাঁচলাম। এবার বাকীটা দাদুকে শোনাও। 

মিহির হাতের রুপো বাঁধানো ছড়িটা ঝুমার হাতে দিয়ে বলেন - শুনছো আজকেই ঘোষণা হয়ে যাবে। 

কাবেরী কিছু বলবার আগেই ঝুমা জিজ্ঞাসা করে - কি ঘোষণা হবে গো দাদু? 

মিহির বলেন - আরে শুনছিস না করোনা নামে যে ছোঁয়াচে অসুখটা চারদিকে হু হু করে ছড়িয়ে পড়ছে, সেজন্য লকডাউন ঘোষণা হবে। এই অসুখটা হলে আমাদের ফুসফুস চালুনির মতো ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।  

ঝুমা আবার বলে - লকডাউন মানে? 

মিহির গায়ের ঘামে ভেজা ফতুয়াটা ছাড়তে ছাড়তে বলেন - সরকার আমদের ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করে দেবে। ঘরে থাকলেই আমরা ভালো থাকবো। এ সময় আমাদের মানে কারও বাড়ি কেউ যেতেও পারবে না। যতদিন না এই লকডাউন উঠবে তুই আমাদের বাড়ি থেকে যাবি বুঝলি। তোর দিদা তো পারবে না সামলাতে। তার উপরে সুগার। খুব সাবধানে থাকতে হবে ওকে।  

ঝুমার কাবেরীর একটু আগে বলা জয়দেব আর সেই কি একটা মেয়ের নাম বলেছিল তাদের প্রেমের কথা মনে পড়ে গিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে প্রায় লাফিয়ে ওঠে বলে - ও বুঝেছি, বুঝেছি। রামায়ণ। দিদা এতক্ষণ সেটাই বলছিল। হু সরকার লক্ষ্মণ গন্ডী দিয়ে দেবে। বাইরে গেলেই করোনা রাবণ কিডন্যাপ করবে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন