সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

শ্যামল সরকার।। পারক গল্পপত্র



মোরোঙ্গা বাস স্ট্যান্ডে বাস  থেকে যখন  রতিকান্ত নামল  ততক্ষণে কালচে গুড়ো গুড়ো অন্ধকারে মুখ ঢাকছে মনোরঞ্জনী গ্রাম । এদিকে ইলেক্ট্রিসিটির খুঁটি পোতা হয়েছে, তার ঝুলেছে খুঁটির মাথায়, তারের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের চলা শুরু হয় নি এখনও ।   পকেট থেকে সে বহু পুরানো লাল ডায়েরীটা বের করল । ছেঁড়া ছেঁড়া পাতাগুলো উলটেপালটে কি যেন খুঞ্জছে । তখনও সন্ধ্যার অন্ধকার ডায়েরির লেখাগুলো পুরো গিলতে পারে নি । নাম-ঠিকানা মনে ছিলই, তবু একটু ঝালিয়ে নিল ।  আকন্দের ধার ঘেঁসে হাত তিনেক চওড়া মাটির পথ ধরে সোজা দক্ষিণ, যতক্ষণ না একটা লম্বাচওড়া গেঁয়ো পানাপুকুর পথ আগলে না দাঁড়ায় ।


        হাঁটায় গতি বাড়াল রতিকান্ত । সে জানে রাত্রি পুরোপুরি নামতে আর বেশী দেরী নেই । পশ্চিমের লালাভ গোধূলির ছটা প্রায় মিশে গেছে কালচে সন্ধ্যায় । সে আশঙ্কা করেছিল  গ্রামে এরকম অন্ধকার পরিস্থিতি যখন তখন আসতে পারে ।  তাই পকেটে একটা টর্চ লাইট  নিয়েই  বেরিয়েছে । আসলে ওটা সবসময় মজুদ থাকে ওর । সুযোগ পেলেই প্লাগের ফুটোয় ওটার দাঁত গলিয়ে পাওয়ার পুরে রাখে গলা অবধি । সে পকেটে একবার হাত চালিয়ে ওটির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হল । কি মনে করে পকেট থেকে বের করে জ্বালিয়ে দেখল --- ঠিক আছে কিনা । হাসি পেল রতিকান্তর একা একা । আলোটাকে কেমন যেন নিরীহ মনে হল । কিন্তু একটু বাদেই অন্ধকার ঘন হয়ে এলে সেই হবে অন্ধকারের ঘন কালো চাঁই ফুটো করার বেশ কার্যকরী হাতিয়ার । শুধু মাঝে কয়েক মুহূর্ত সময় । ঐ সময়টাই সব । সময়ই ঠিক করে কার বল কখন বাড়বে, কখন কমবে । 


      এসব ভাবতে ভাবতেই রতিকান্ত খেয়াল করল সামনে কচুরিপানার ঘন বসতি । বুঝল --- এইই সেই পানাপুকুর । কি যেন নাম বলেছিল মহেশবাবু পুকুরটার, মনে পড়ছে না ঐ সময় । ডায়েরিটা আবার বের করল । এখন আর লেখাগুলো পড়া যাচ্ছে না । টর্চের আলো ফেলল পাতার উপর । তক্ষুনি একটি কৌতূহলী মুখ ভেসে উঠল ঐ মৃদু আলোয় । ভাঙ্গাচোরা মুখমণ্ডল,  

উসকোখুসকো, অল্প দাড়িগোঁফ, কাঁচাপাকা চুল, দু’চোখে অবাক জিজ্ঞাসা । রতিকান্ত দেখল ---- দাড়িগোঁফের মাঝখান থেকে ঠোঁট দুটো একটু নড়ে উঠল যেন । কানে ভেসে এল জিজ্ঞাসা ----- কাকে খুঁজছেন ? গা ছমছম করে উঠল রতিকান্তর । তবু ভয়ের অনুভুতিতে খানিক সামলে নিয়ে বলল ----- নিশিকান্ত চক্রবর্তীর বাড়ী চেন ? ভদ্রলোকের চোখে আলো ফুটছে না দেখে মহেশ বাবুর বলে দেওয়া ফিরিস্তি আউরে গেল -----  তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন  এক সময়, অবসর নিয়েছেন সম্প্রতি । এবার চিনতে পারল মানুষটি । বলল ----- হুম, খুব ভাল মানুষ ছিল নিশিমাস্টার । আর সেই জন্যই তার অমন করুণ পরিণতি । রতিকান্ত আবাক গলায় জিজ্ঞেস করল ---- কি পরিণতি হয়েছে তার ? সে আর এ কথার  জবাব দিল না । হাঁটা দিল তৎক্ষণাৎ । চলে যেতে যেতে পুরানো প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুলল না ---- এগিয়ে যেতে থাকুন সোজা, একটি বটগাছ পড়বে, তারপর একটি বড়ো পুকুর । ঐ পুকুরপাড়ের  বাড়ীটিই চক্রবর্তীদের । সোজা ঢুকে যাবেন, কোন ভয় নেই ।


     বাড়ী খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না । মহেশবাবু ঠিকই বলেছিলেন ---- শহরের চেয়ে গ্রামে অচেনা বাড়ি খুঁজে পাওয়া সহজ । গ্রামে সবাই সবাইকে চেনে । একটু নামডাক ওয়ালা লোকদের তো দশবিশ কিলোমিটার দূরে থাকা মানুষরাও চেনে । কাজেই তাদের খুঁজে বের করা কোন ব্যাপারই নয় । নিশিবাবু বাড়ী আছেন ? ----  বাড়ীর বাইরে থেকে রতিকান্তর হাঁক শুনে  একজন বেড়িয়ে এলেন । শীত পোশাকে চোখমুখ ঢাকা হলেও বোঝা যাচ্ছে – ভদ্রলোক  তারই মতো লম্বা গড়নের মানুষ ।  বললেন ---- কে ? উত্তর না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করল রতিকান্ত ---- নিশিদা বাড়ী আছেন ? ভদ্রলোক বললেন ---- আমিই নিশিকান্ত । আপনি কোত্থেকে এসেছেন ? রতিকান্ত তাকাল ভদ্রলোকের মুখের দিকে । শীত পোশাকে ঢাকা তার মুখ । মহেশবাবুর কথা মনে পড়ল । ভদ্রলোক তাকে বুদ্ধু বানিয়ে ছেড়েছে । তার মনে এখন আক্ষেপ হচ্ছে --- ঐ ভবঘুরে মানুষটার কথা বিশ্বাস না করলেই হত । এমন কড়া শীত মাথায় এত দূরে না এলেই হত । তবু উত্তর দিল এবার ---- শিলিগুড়ি, হাকিমপাড়া । আমার নাম রতিকান্ত চক্রবর্তী । নিশিকান্তর কি যেন মনে হল । বলল ভেতরে আসুন । 


 বাড়ী মানে একটি বেশ বড়ো উঠোনের চারপাশে চারটি ঘর । সবগুলোই কাঁচা, কিন্তু বেশ পরিপাটি করে রাখা । একপাশে একটি রান্নাঘর উত্তরে ।  উলটোদিকে দক্ষিণের ঘরটা একটু বড়ো । বোঝা যাচ্ছে ওটা বাড়ীর প্রধান শোবার ঘর । ওটির বারান্দার একপাশে একচিলতে কোঠা । ওটি ঠাকুরঘরই হবে । বারান্দার অন্য পাশে একটি লম্বা বেঞ্চ পাতা অতিথিদের বসার জন্য । পূবে আর একটি শোবার ঘর । সেটি তুলনায় ছোট । পশ্চিমে  গোয়াল  ঘর । এক   নজরে   মোটামুটি

সবটা অনুমান করে ফেলল বুদ্ধিমান রতিকান্ত ।  সব দেখে সে  বুঝেছে --- সচ্ছল পরিবার । একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা লম্বা ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছেন অত রাতে কে এল আগন্তুক । উল্টোদিকের শোবার ঘরের বারান্দায় রাখা বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন নিশিকান্ত বাবু ---- বসুন । তিনি ঘর থেকে একটি হ্যারিকেন এনে উঠোনের মাঝখানটায় রাখলেন । সারা বাড়ী আলোয় ভরে গেল । তারপর  বেঞ্চে আগন্তুকের পাশে সংশয়ের সাথে বসে বললেন --- বলুন ----- ? রতিকান্ত দেখল উল্টোদিকের বারান্দার রমণীও কোথায় যেন সরে গেছে হঠাৎ । তার মনে হল বাড়িতে আর কেউ নেই । চারপাশে একটি গ্রাম্য নির্জনতা, যেন একটি গভীর স্তব্ধতায় ডুবে আছে চারপাশ । রতিকান্ত তাকিয়ে দেখল ---- পাশের মানুষটির বিস্ময় এখনো কাটে নি । তার তার দিকে তাকিয়েই আছে । রতিকান্ত কিছু না বলে ধীরে ধীরে নিজের মাথার মাফলার-টুপি খুলে ফেলল । তারপর গৃহকর্তার সোজাসুজি তাকাল । প্রায় লাফ দিয়ে উঠল নিশিকান্ত ---- সেকি ! কে আপনি ? রতিকান্ত দাঁড়াল । শান্ত চোখে সোজা তাকাল তার দিকে । নিশিকান্তও মুক্ত করল তার মুখমণ্ডল । দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে অবাক । একজন যেন পরিষ্কার দর্পণে অন্যজনকে দেখছে । এক্কেবারে একই চেহারার দুজন ভিন্ন মানুষ । ঘটনার আকস্মিকতা খানিক সামলে নিশিকান্ত জিজ্ঞেস করল ---- আপনি কেন এসেছেন ?  রতিকান্ত বলল ---- আমি ড্রপেলগ্যাঞ্জারের গল্প শুনেছিলাম এক সময় । আজ আমার এক কলিগের কথায় প্রত্যক্ষ্য করতে এসেছি । নিশিকান্ত বলল --- আপনি কি জানেন ড্রপেলগ্যাঞ্জার দর্শনের ফল কি হয় ? চুপ রইল রতিকান্ত । নিশিকান্তরও মুখ দিয়ে আর কোন কথা আসছে না । গলা শুকিয়ে আসছে । সজোড়ে চিৎকার করতে চেষ্টা করল --- কে কোথায় আছ ?  গলা দিয়ে স্বর বেরোল না । রতিকান্ত এগিয়ে এল নিশিকান্তর দিকে । আর্তনাদ করে উঠল --- আমরা  ড্রপেলগ্যাঞ্জার নই । এটা জার্মানি নয়,  ভারতবর্ষ । এদেশে ড্রপেলগ্যাঞ্জার থাকতে পারে না । আমাদের নাম-পদবিতে এত মিল, হয়ত আমাদের ভেতর কোন হারানো সম্পর্ক আছে । আপনি শান্ত হওন দাদা । ওরা শান্ত হতে পারে নি । আশঙ্কিত, উদ্বিগ্ন নিশিকান্ত-রতিকান্ত  জ্ঞান হারাল চরম  উত্তেজনায় । মৃত্যু হল তাদের ।


   পরদিন গ্রামের লোকজন অবাক । দু’জন নিশি মাস্টার জড়াজড়ি করে পড়ে আছে উঠোণে । ওরা শুনেছে এ বাড়ীতে শুধু একা নিশি মাস্টার থাকে না, একজন মহিলাকেও নাকি কে কে দেখেছে কখনো কখনো থাকতে ।  ওরা ড্রপেলগ্যাঞ্জার জানে না, ওদের বিশ্বাস --- এ বাড়ীতে প্রেতের বাস । আজ  একই মানুষের দুটো মৃতদেহ দেখে ওরা প্রেতের আস্তিত্ব সম্পর্কে  নিশ্চিত হয়েছে  ।  মাস্টার মশায়ের মৃত্যু ওদের কষ্ট দিয়েছে ঠিক,  তবু এই প্রেতপুরীর যবনিকা ওদের শেষপর্যন্ত স্বস্তি দিয়েছে বিস্তর । 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন