শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সুমনা চক্রবর্তী।। পারক গল্পপত্র



আজকাল সংসার আর কাজের চাপে কোথাও আর যাওয়া হয়ে ওঠে না সুজাতার। যত দিন যাচ্ছে, ততই সে যেন হাঁপিয়ে উঠছে। অথচ সংসারে এমন কিছু আহামরি কাজ তাকে করতে হয় না। দশ বছরের বিবাহিত জীবনের আনাচ কানাচ হিসেব করে দেখেছে সুজাতা। কোথাও কোনও গরমিল নেই। তবু যেন কোথাও ভুল হয়ে চলেছে। সে বুঝতে পেরেও কিছু করে উঠতে পারে না।

 ঘুম থেকে উঠে অভ্যাস মতো সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। দুধওয়ালা সাইকেলে বড় ক্যান ঝুলিয়ে চলে যায়। বাঁকের মুখের প্রথম বাড়িটার চিলেকোঠার ঘরের গায়ে সোনালি আলোর ছটা এসে পড়ে। স্নানঘরে যাওয়ার আগে সুজাতার কানে প্রতিদিনের মতো ভেসে আসে শ্বাশুরিমায়ের কণ্ঠস্বর। এটা সুজাতার কাছে দিন শুরু হওয়ার অ্যালার্ম। শ্বাশুরিমায়ের গলার আওয়াজ শুনে নিশ্চিন্তমনে সে স্নানে যায়। বছর দুই ধরে পক্ষাঘাতে জর্জরিত ঐ বয়স্ক মানুষটি সারাদিন শুধু কাছের মানুষগুলোকে সর্বদা দেখতে চান। 

স্নান সেরে সুজাতা শ্বাশুরিমায়ের ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়। জানলাগুলো খুলে দেয়, মশারি খুলে ভাঁজ করে রাখে। শ্বাশুরিমায়ের কপালে জ্বর আছে কি না দেখে নিয়ে বলে, “এখন একটু বার্লি খাবেন মা?”

অসুস্থ মানুষটি শিশুর মতো মাথা নেড়ে বলে, “ খাব, তুমি বসবে তো আমার কাছে?”

সুজাতা যন্ত্রের মতো হাত চালিয়ে বিছানার পাশে রাখা ছোট টেবিলে বাটিতে বার্লি তৈরি করতে করতে বলে, “ বসব মা। আপনি তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবেন। আমায় আবার জলখাবার করতে হবে”।

বৃদ্ধার মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এ বাড়িতে তার সাথে দুটো কথা বলার সময় নেই কারও। তার ছেলে সরকারি অফিসের বড়বাবু, কাজ ফেলে মায়ের সাথে কথা বলার মানুষ সে নয়। অবিবাহিত মেয়ে তার শাড়ির কারবার নিয়ে ব্যাস্ত। নাতি তো ছোট মানুষ। তার কথা ধরলে চলে না। এক এই বৌমাই তার সুখদুঃখের সাথী। 

সুজাতা বিছানার এক পাশে বসে বলে, “ আজ একটু সব্জি ঝোল করে দেব দুপুরে”।

বৃদ্ধা মাথা নাড়েন। এই মেয়েটিকেই বা কি বলবেন? সারাদিন সংসারের দিকে তাকাতে তাকাতে নিজের দিকেই তাকাতে পারে না বেচারি। বড় সংসারে কাজের লোক কম নেই, তবে যত্নের অভাব। তাই বৌমা একাই এসবের ভার নিয়েছে।

সুজাতা তোয়ালে দিয়ে শ্বাশুরিমায়ের মুখ মুছিয়ে দেয়। ঘর থেকে যাওয়ার আগে বলে, “আজ গরম জলে গা মুছবেন। কলিদির সাথে আমি থাকব”।

বৃদ্ধা জানেন, যতই তার দেখভালের জন্য লোক রাখা হোক না কেন, এই মেয়েটি তাকে একা ছাড়তে নারাজ। 

সুজাতা কলের পুতুলের মতো কাজ করে যায়। সকালে তার স্বামীর জন্য, ছেলের জন্য আর ননদের জন্য জলখাবার বানিয়ে খোঁজ নিতে যায় ঠিকে লোক এসেছে কি না। এরপর সকলে একে একে বেরিয়ে গেলে সে রান্নার তদারক করে। তারপর রান্না হয়ে গেলে শ্বাশুরিমায়ের জন্য বরাদ্দ কাজের লোকটির সাথে জুড়ে যায়। তার কেবলই ভয় হয়। তার অনুপস্থিতিতে অসুস্থ মানুষটি যেন বিপদে না পড়েন। 

সান্যাল বাড়ি এ অঞ্চলের এক বনেদি বাড়ি। এ বাড়ির তিন পুরুষ বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর খেতাব পেয়ে এসেছে। তবে বর্তমান কেউ এই পেশার সাথে যুক্ত নয়। সুজাতার শ্বশুরমশাই তো বিদেশ থেকেও অনেক সম্মান পেয়েছেন। তবে তার স্বামী আর ননদ এই পথে যায়নি কখনও। তারা ঘোর বাস্তববাদী, শিল্পের রঙিন দুনিয়া তাদের জন্য নয়। সুজাতার শ্বাশুরিমা কিন্তু বাস্তবের সাথে সাথে শিল্পের রঙিন জগতকেও সমান কদর করতে পারতেন। কারণ, তিনি ছিলেন নৃত্যশিল্পী। এককালে মনিপুরি নাচে জাতীয় খেতাব জেতা শ্রীমতী মাধুরী দেবী এই পরিবারে এসে যে চেনা ছন্দে জীবন শুরু করবেন সেটাই স্বাভাবিক ছিল। নৃত্যপটীয়সী হিসেবে এই পরিবারের গৃহবধূ নির্বাচিত হলেও অবশেষে পরিচিত হয়ে গেলেন রন্ধন পটীয়সী রূপে। ফলে সংসারের ইতিবৃত্তের বাইরে বেরিয়ে পুনরায় নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ তার কখনও হয়নি। সুজাতা তার বাবার কাছে সেসব শুনেছে। আর তখন থেকেই কোথাও যেন এই মানুষটার প্রতি তার ভালোলাগা তৈরি হয়ে গেছে। শিল্পকে ভালো না বাসলে এই আত্মত্যাগ সম্ভব নয়। তবে সংসারের কেউ কোনোদিন তাকে এই পথে হাঁটতে দেখেনি। সুজাতার খুব ইচ্ছে ছিল একান্তে শিল্পের রসাস্বাদনের। সেও আর হল না। পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী হলেন মাধুরী দেবী। ছেলেমেয়েরা যেন ভবিতব্য মনে করেই সহজে সব মেনে নিয়েছে। সুজাতা হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। দুবছরের কঠিন লড়াইয়ে সে তার শ্বাশুরিমায়ের পাশে আছে। আজ না হোক, কোনও একদিন তিনি ঠিকই সুস্থ হবেন। 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় সুজাতার সংসারে। সারাদিন পর তার ছোট ছেলেটা ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরে। সুজাতাও আবার ভাবনার মায়াজাল ছিঁড়ে কঠোর বাস্তবে নিজেকে বেঁধে ফেলে। তারপর সেই চিরাচরিত পরিশ্রান্ত স্বামীর দেখভাল আর ননদিনীর মানভঞ্জন- সবই যেন অদৃশ্য সংলাপে পরিবেশিত হতে থাকে। সুজাতা নিপুণ গৃহিণীর মতো সবকিছু সামাল দিতে থাকে।

হ্যাঁ, সংসার এমনই এক জগত, যার মাঝে একবার সহজে প্রবেশ করলে স্বয়ং বিধাতার অনুমতি ছাড়া কারও প্রস্থান সম্ভবপর নয়। এ অমোঘ সত্য সুজাতার শ্বাশুরিমা মাধুরী দেবী জেনেছিলেন বলেই তার যোগ্য উত্তরসূরি একরকম ভাবে এই সংসারকে ছায়া দিতে পারছে। একসময়ের মঞ্চ কাঁপানো শিল্পী আজ অকেজো দুটি পা নিয়ে সংসারের বোঝা হয়ে গেলেও তার হাতে গড়া এই অন্দরমহলে এখনও তার কদর আছে। অন্তত তার পুত্রবধূর কাছে তো বটেই। নিজের সন্তান কখনও পর হয় না। তারা এখন হয়তো সময় পায় না, তাই বলে মাকে তো আর ভুলে যাবে না। একদিন তাদেরও হয়তো সময় হবে মায়ের কাছে এসে বসার। 

মাধুরী দেবী্র মন খারাপ হয় ঠিকই, তবে তিনি কখনও চোখের জল ফেলেন না। এত দুর্বল তিনি নন। এই সংসারে তিনি অনেক যত্ন পান। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভালো নার্স রেখেই এরা দায় সারতে পারত। সেটা করে নি। একমাত্র পুত্রবধূ শত কাজের মাঝেও তার প্রতি যত্নের কোনও খামতি রাখে না। এই যত্ন মন থেকে আসে, লোকদেখানো নয়। তিনি এর পরিবর্তে হাসিমুখে ওদের আবদার মেনে নেওয়া ছাড়া আর কি করতে পারেন। এই যে এক ছাদের নীচে ছেলে, মেয়ে, বৌমা, নাতি সকলকে দেখতে পাচ্ছেন, এটা কি কম পাওয়া? মাঝে মাঝে তার মনে হয়, যদি তিনি সুস্থ সবল হয়ে ঘুরে বেড়াতেন তবে এত সেবা হয়তো পেতেন না। 

দরজা খোলার শব্দে মাধুরী দেবী মুখ ফিরিয়ে দেখেন তার বৌমা বিকেলের জলখাবার নিয়ে এসেছে। 

সুজাতা ঘরের কম পাওয়ারের আলোটা নিভিয়ে বড় আলো জ্বালিয়ে দেয়। প্রতিদিনের মতো শ্বাশুরিমায়ের কাছে বসে। এই সময় নার্স কলিদি শ্বাশুরিমায়ের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখে, জলের জায়গা পরিষ্কার করে, ওষুধপত্র গোছায়। নিয়মটা মাধুরী দেবী নিজেই করেছেন। তিনি তার বৌমার সাথে একান্তে সময় কাটাতে চান। 

সুজাতা পরিপাটি করে শ্বাশুরিমাকে খাইয়ে, মুখ মুছিয়ে বলে, “ ডাক্তারবাবু বলেছেন, আপনি চেষ্টা করলে হাঁটতে পারবেন”।

মাধুরী দেবী ম্লান হেসে বলেন, “ ভালোই হবে। তখন তুমি আর আমি রোজ একসাথে হাঁটব। কতদিন বাইরে যাই নি। আশপাশটা তো ভুলেই গেছি”।

সুজাতা পরম যত্নে শ্বাশুরিমায়ের পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “ তাড়াতাড়ি সেরে উঠুন মা। সব দেখাতে নিয়ে যাবো”।

মাধুরী দেবী যেন সুজাতার মনের ভেতরটা পড়তে পারেন। সংসারে তিনি একাই নন, এই মেয়েটিও বাঁধা পড়েছে। তার মতো বৌমাও বাইরের পৃথিবীর সাথে সংযোগ ছিন্ন করে বসে আছে। তবে কেউই নিজের ইচ্ছেতে নয়। তিনি কাঁপা কাঁপা হাতখানা বৌমার হাতে রেখে বলেন, “ জানি, তোমার জন্যই আমাকে আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে। আমার যে বড় দায় মা”।

তিনি আর কথা বলতে পারেন না, গলা বুজে আসে।

সুজাতা ধীরে ধীরে তার হাতে,পায়ে মালিশ করতে থাকে। সে নিয়মের ব্যতিক্রম হতে দিতে চায় না।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন