শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অমর মিত্র।। পারক গল্পপত্র




বাড়িতে নাট্য চর্চা, আমি ভেবেইছিলাম অভিনয় করব  আর নাটক লিখব। ১৯৬৯-৭০ নাগাদ আন্তন চেখভের একটি গল্প ‘মুখোস’ নাটকে রূপান্তরিত করি। আমার এক বন্ধু গৌতম লাহিড়ী অভিনয় করত নাট্য পরিচালক গণেশ  মুখোপাধ্যায়ের শ্রীমঞ্চ নাট্য দলে। তার জীবন ছিল হতাশায় ভরা। অভিনয়ে প্রার্থিত জায়গায় যেতে পারে নি। পরে সে আত্মহত্যা করে। নাটকে তার জ্ঞান ছিল প্রখর। মুখোস তার খুব ভাল লাগল।  কয়েকজনকে পড়ে শোনাল, কিন্তু মঞ্চস্থ হয় নি। ওই সময়টা ছিল নাটকের স্বর্ণযুগ। পিপলস লিটল থিয়েটার, নান্দীকার, থিয়েটার ওয়ার্কশপ, চেতনা, আরো কত দল। কত আশ্চয সব নাটক,  মধুসূদনের প্রহসন থেকে নটী বিনোদিনী, ব্যারিকেড, তিন পয়সার পালা, শের আফগান, মঞ্জরী আমের মঞ্জরী, রাজরক্ত, চাকভাঙা মধু, নরক গুলজার, জগন্নাথ, মারীচ সংবাদ, আরো কিছু পরে পরবাস, সাজানো বাগান। সেই সময় ভাল সিনেমা, ভাল নাটকের ছিল। সিনেমা, নাটক দেখে আর কেমিস্ট্রিতে মন না দিয়ে গল্প উপন্যাস পড়ে আমার রেজাল্ট খারাপ হয়। স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তাম কেমিস্ট্রি অনার্স। স্কটিশের ছাত্র ছিলেন বিখ্যাত সব মানুষ। আর সেই সময় কবি নিশীথ ভড় ও পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল মনে হয় থার্ড ইয়ার বা সেকেন্ড ইয়ারে পড়তেন। আমি একটি গল্প লিখে কলেজ ম্যাগাজিনে দিয়েছিলাম, গল্প হয়নি। তাই ছাপাও হয় নি। নাটকে অভিনয় করব বলে নাম দিয়েছি। বাদ। কেন না আমাদের পাড়ার মানুষ নিবার্চক আমাকে চিনতেন। আর তাই চরম তুচ্ছতায় বাদ দিলেন। কলেজে হয়েছিল ঋত্বিক ঘটকের জ্বালা নাটকটি। অভিনয় আমি করতাম পাড়ায়। আমার দাদা মনোজ মিত্রের একটি নাট্যদল ছিল, ঋতায়ন, সেখানে নীলা নামের একটি নাটকে আমি অভিনয় করেছিলাম, তখন আমি ক্লাস এইট। কিশোর বালক।  নীলা নাটকের দুটি শো করেছিলাম। ঋতায়ন প্রযোজিত নীলা নাটকে আমি বেশ বড় একটি চরিত্রে ছিলাম। একটি শো থিয়েটার সেন্টারে অন্যটি মিনারভা হলে। সে ৫০ বছর আগের কথা। নাটকের  রিভিউ বেরিয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকা এবং জলসা পত্রিকায়। আমার অভিনয়ের প্রশংসাই হয়েছিল। চরিত্রটির নাম ছিল 'আনন্দ '। আনন্দবাজার লিখেছিল বাবুজি মিত্রর ( আমার ডাক নাম বাবুজি ) আনন্দ নিরানন্দের নয়। একদিন  বিকেলে দাদার সঙ্গে সেই নীলা নাটকের কথা হচ্ছিল। নাটকটি হারিয়ে গেছে। আমি তারপর চেষ্টা করেও নাটকে থাকতে পারিনি। কিন্তু গত পনের বছরে আমার গল্প উপন্যাস নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। 


যাই হোক কলেজে অভিনয় হলো না, গল্পও ছাপা হলো না কলেজ ম্যাগাজিনে, রেজাল্টও খারাপ হলো। নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম। এম,এস,সি, পড়া হল না। কিন্তু সাহিত্যের পাঠ বাড়ছে। আমি বেলগাছিয়া, টালা পারকের সামনে বড় হয়েছি। এই অঞ্চল ছিল বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের আবাস। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস ও শনিবারের চিঠি পত্রিকার প্রেস, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, গৌরকিশোর ঘোষ, গৌরিশঙ্কর ভট্টাচায---আরো অনেকে। শৈলজানন্দের বাড়িতে ভাড়ায় থাকতেন কবি শঙ্খ ঘোষ, অমিতাভ দাশগুপ্ত, নিখিল সরকার শ্রীপান্থ। লেখকদের দেখতাম ঈশ্বরের মতো। তাঁরা তাঁদের গল্প, উপন্যাস, কবিতায় এক নতুন ভুবন সৃষ্টি করেন, নতুন মানুষের জন্ম দেন। নতুন কথা বলেন। মনে পড়ে তারাশঙ্করের মৃত্যুদিনের কথা। সকাল থেকে তাঁর বাড়ির সামনে বসে ছিলাম।  দেখেছিলাম বড় মানুষেরা সকলে আসছেন তাঁকে প্রণাম জানাতে। আমি সমস্তদিন ধরে তাঁকে গড় করেছিলাম। 

   

আমাদের পাড়া থেকেই প্রকাশ হত একটি সাহিত্য পত্রিকা, একাল। সম্পাদক নকুল মৈত্র ও ভরত সিংহ। আমি একটি গল্প লিখে তাঁদের দিয়েছিলাম। একটি গল্প পাঠিয়েছিলাম অনুষ্টুপ পত্রিকায়। ছাপা হয় নি। অনুস্টুপ সম্পাদক আমাকে দুঃখ প্রকাশ করে ও কিছু উৎসাহব্যঞ্জক কথা লিখে পোস্ট কার্ড পাঠিয়েছিলেন। সেই পোস্ট কার্ড বন্ধুদের দেখিয়েছিলাম। একাল পত্রিকার সম্পাদকদ্বয় ছিলেন খুব সামান্য চাকুরে। কিন্তু অসামান্য মনের। সাহিত্য-অন্ত প্রাণ। নকুলদা থাকতেন বস্তির ভিতরে। তাঁর বাড়িতে  প্রতি রোববার সকালে সাহিত্যের আড্ডা হতো। সেখানে নতুন লেখা গল্প পড়ে শোনাতেন অনেকে। আমিও শুনিয়েছি। একাল পত্রিকায় সুবিমল মিশ্র লিখতেন, দিলীপ সেনগুপ্ত, যিশু চৌধুরী।  একাল থেকে প্রকাশিত হয়েছিল সুবিমল মিশ্রর গল্পের বই, হারাণ মাঝির বিধবা বউ-এর মড়া বা সোনার গান্ধী মূর্তি। উচ্চারিত হওয়ার মতো বই। অসম্ভব ভাল সব গল্প। আমার দুটি লেখা একালে ছাপা হলো, ‘ধূসর কুয়াশায় সমুদ্রের ভাঙন’ ও ‘বিপন্ন সুখের মাঝে’। তার আগে প্রতিশ্রুতি পত্রিকায় দুটি গল্প ছাপা হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল মাসিক কিংবা সাপ্তাহিক পত্রিকা। খুব ভাল মনে নেই। সেই পত্রিকা ছাপা হতো আমার বন্ধু বিপুল সোমদের বউবাজারের প্রেস থেকে। বিপুল সোমের দাদা নীতিন সোম ছিলেন খুব বড় ইঞ্জিনিয়ার। সিভিল মনে হয়। তিনি নির্মীয়মাণ ঢাকা মেট্রোর একজন উপদেষ্টা। কিন্তু তার বাইরে তিনি সাহিত্য এবং সঙ্গীতের সমঝদার। আমাকে স্নেহ করতেন। তিনিই বলেছিলেন  সম্পাদক ব্রজেন ভট্টাচার্য মশায়কে আমার গল্প ছাপতে। প্রথম গল্প দিগভ্রান্ত। দ্বিতীয় গল্প পুজো সংখ্যায় “বিল্লুর জন্য কিছুক্ষণ” কেউ কেউ ভাল বলেছিলেন, কিন্তু কেন তা এখন বুঝি না। তবে প্রচলিত গল্পের থেকে আলাদা লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই লেখাগুলি হারিয়ে গেছে। প্রতিশ্রুতি পত্রিকায় ঝড়েশ্বর লিখতেন।  ওঁর নাম দেখতাম।      


এম,এস,সি, হল না। দূরে পাঠিয়ে পড়ানর ক্ষমতা ছিল না বাড়ির। নিম্নবিত্ত পরিবার। বাবা অবসর নিয়েছেন। বরং আমার একটা চাকরি হলে ভাল হয়। আর আমিও কেন জানি না বাড়ি থেকে বেরোতে চাইছিলাম। বেকার, লিখতে চাইছি, হাতড়াচ্ছি কী লিখব। চাকরি নিয়ে মেদিনীপুর গেলাম। সঙ্গে বই। আন্তন চেখভ,  তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, পুশকিন, গোগোল----রুশ সাহিত্য তখন অনূদিত হয়ে আসত। আমি চেখভ পড়ে গল্প লেখা শিখেছি তখন। আর আমাদের রবীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র। বাংলা সাহিত্যে অনেক অসামান্য গল্প লেখা হয়েছে। অতি সাধারণ লেখকও কয়েকটা ভাল গল্প লিখে গেছেন, আমি অনেক লেখককেই পড়ে শিখেছি। কিন্তু স্টাইল আর জীবনের অনন্ত গভীরে প্রবেশ তার প্রাথমিক পাঠ ওই তিনজনেই হয়েছিল। কল্পনা আর বাস্তবতা, দুইয়ের এক হয়ে যাওয়া, কল্পনাই যে সাহিত্যের মূল বাস্তবতা,  লেখার আসল জায়গা, তা আমি শিখেছিলাম প্রেমেন্দ্রে। মনে করুন, তেলেনাপোতা আবিষ্কার। এখনো আমাকে স্তম্ভিত করে ওই গল্প। আর করে অচিন রাগিনী ( সতীনাথ ভাদুড়ী)। মহাশ্বেতা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে পড়ি ১৯৭৮ নাগাদ। পরে আসব তাঁদের কথায়। দেবেশ রায়কে পড়েছি ১৯৭২-৭৩ নাগাদ। 

   

 মেদিনীপুর শহর আমার প্রথম বাড়ির বাইরে একা যাওয়া। খুব মন খারাপ হত কলকাতার জন্য। মেদিনীপুর শহরে তো পাঁচ মাস। সন্ধ্যেয় জেলা গ্রন্থাগারে গিয়ে পার লাগেরকোভিস্ট-এর বারাব্বাস উপন্যাস পড়লাম কয়েদিন ধরে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অনূবাদ ছিল। তারপর এপ্রিল মাসে আমাকে যেতে হল মূল ভারতবর্ষে। ডেবরা থানার এক গন্ড গ্রামে। বাস থেকে নেমে কংসাবতী নদী পার হয়ে এক গ্রীষ্মের বিকেলে আমি বেডিং আর সুটকেস নিয়ে আমার হল্কা ক্যাম্পে পৌছলাম। চাকরিটা জরিপের কানুনগোর। সে ছিল প্রায় জনবিরল একটি আধ-পাকা বাড়ি। কাদামাটি আর ইটে গাথা দেওয়াল আর টালির চাল। ওইটি আসলে তহসিলদারের খাজনা আদায়ের কাছারি। দুটি ঘর আমার অফিসের জন্য। আমার সেই অফিস, সেই নির্জনতা, অধীনস্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মেস করে থাকা, সকাল আর সন্ধেয় অফুরন্ত অবসর নিয়ে আমি করব কী ? গ্রামের মানুষের সঙ্গে বন্ধুতা হচ্ছে। খুব গরিব গ্রাম। আর খুব সাধারণ ভাবে বেঁচে থাকা সেই সব মানুষের। আমি এই জীবনের সঙ্গে পরিচিত নই। বিস্ময় আর বিস্ময়। কৌতূহলে কত কিছু জেনেছি। ধান আর মানুষ। আকাশের মেঘ আর মানুষ। ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম আর মানুষ। বর্গা চাষী, খেতমজুর, ভূমিহীন চাষী, খাজনা আদায়ের ত’সিলদার। জমির প্রতি মায়া আর ভূমি-লিপ্সা, ভূমিক্ষুধা। আর নানা রকম বিপন্নতা। ১৯৭৪-এর সেই গ্রীষ্মে আমি একটি গল্প লিখি, মেলার দিকে ঘর। সেই গল্প প্রকাশিত হল একাল পত্রিকায়। সেই গল্প প্রকাশের পর  নানাজনের কথা শুনে মনে হয়েছিল লিখতে পারব। সেই প্রথম আত্মবিশ্বাস জন্মাল। একাল পত্রিকা ছাপা হয়েছিল ১৫০ কপি। তা আর ক’জনের হাতে যাবে।  মেলার দিকে ঘর গল্প পড়ে আমাকে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় ও প্রভাত চৌধুরী  কবিপত্রে লিখতে বলেন। মূলত কবিতার পত্র, কবিপত্রে তখন গল্প লেখকদের একটা জায়গা ছিল।  আমি কবিপত্রে পুজোয় লিখি পার্বতীর বোশেখ মাস। সেই সময়ে পরিচয়ে একটি গল্প লিখি শকুন্তলার জন্ম। ১৯৭৫-এ কবিপত্র একটি গল্প সংখ্যা করে, সেখানে মেলার দিকে ঘর আবার ছাপা হয়। তখন আমার বন্ধু হয়েছেন, কবি তুষার চৌধুরী, সমীর চট্টোপাধ্যায় , সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, অনন্য রায়, গল্প লেখক শচীন দাস, অসীম চক্রবর্তী, দীপঙ্কর দাস। আর আলাপ হয়েছে চন্ডী মন্ডল, রমানাথ রায়, আশিস ঘোষ, সুব্রত সেনগুপ্ত----শাস্ত্র বিরোধী লেখকদের সঙ্গে।  চন্ডী মন্ডল অবশ্য শাস্ত্র বিরোধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। থাকতেন আমাদের শ্যামবাজারে, পাল স্ট্রীটে। সমীর চট্টোপাধ্যায় একটি পত্রিকা করতেন, সংক্রান্তি। আমি সংক্রান্তিতে লিখেছি। আমাদের বন্ধুতা এখনো অম্লান। সমীর আর লেখেন না, কিন্তু খুব ভাল পড়ুয়া। একদিন দুপুরে কফি হাউসে তুষার আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল বাসুদেব দাশগুপ্তর সঙ্গে। তুষারই আমাকে তাঁর রন্ধনশালা বইটি পড়িয়েছিল। সমস্ত দুপুর কফি হাউসে বসে বাসুদেবের সঙ্গে আলাপ, তিনি আমার দুটি গল্প পড়েছিলেন, মেলার দিকে ঘর আর পার্বতীর বোশেখ মাস। কিছু উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলেছিলেন। আমি রতনপুর, রন্ধনশালা, বসন্তোৎসব গল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। বাংলা সাহিত্যের নানা লেখক নিয়ে কথা হয়েছিল অনেক। বাসুদেবের গল্প এখনো আমার প্রিয়। 

      

আমি যখন লিখতে আরম্ভ করি, আমাদের সামনে ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনে রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙার ডাক, শাস্ত্র বিরোধী লেখকদের গল্পের ফর্ম ভাঙার আন্দোলন, ক্ষুধার্ত পত্রিকার লেখকদের সব ঐতিহ্য অস্বীকারের অঙ্গীকার---- আমাকে সব কিছুই প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু মনে হয়েছিল নিজের মতো করে নিজেকে তৈরি করতে হবে।

     

মেলার দিকে ঘর কবিপত্রে রিপ্রিন্ট হলে অনেকে পড়েছিলেন। অধ্যাপক অমলেন্দু বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আলোক সরকার, সন্তোষকুমার ঘোষের কথা মনে পড়ছে। তাঁরা তাঁদের মুগ্ধতা জানিয়েছিলেন।  এরপর পরিচয় হয় দেবেশ রায়, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। পরিচয় পত্রিকায় ১৯৭৬-এর পুজো সংখ্যায় আমার গল্প প্রকাশিত হয় না জানতেই। কতদিন আগের কথা এসব। গল্প কবিতা পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের প্রেসে ছাপা হত কবিপত্র। সেই দপ্তরেই আলাপ হয় অসীম রায়ের সঙ্গে। তাঁর অনেক গল্প, অনি, ধোঁয়াধুলো নক্ষত্র, আরম্ভের রাত, শ্রেণীশত্রু এইসব গল্প আর গোপালদেব, রক্তের হাওয়া, অসংলগ্ন কাব্য ইত্যাদি উপন্যাসে অসীম রায় ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক। আর জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। তাঁর সঙ্গে গল্প করার দুর্লভ অভিজ্ঞতা হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটে। তাঁকে এখনো পড়ি। মনে পড়ে কলেজ স্ট্রীট থেকে খুঁজে পেতে পাওয়া কথাশিল্প প্রকাশনীর বই অন্তর্জলী যাত্রা। মনে পড়ে কমলকুমারকে পড়েছিলাম সমস্ত দুপুর সন্ধ্যা...। পুস্তক পাঠের অমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল পরে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প পড়ার সময় বা কুবেরের বিষয় আশয় পড়তে গিয়ে। চরিত্রে কিন্তু এই দুই লেখক দুই মেরুর। লিখতে লিখতে পড়া। ১৯৭৭-এর এক সকালে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। ওই সময় শৈবাল মিত্র। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হওয়া, সাহিত্যের আড্ডায় বসা জীবনের পরম প্রাপ্তি মনে হয়। অতি বর্ণময় এক মানুষ ছিলেন তিনি। অমৃত পত্রিকার সম্পাদক, ছেড়েছেন আনন্দবাজার। তা নিয়ে কত কথা। শ্যামল ১৯৭৭ সালে অমৃত পত্রিকায় আমার একটি গল্প ছাপেন গাঁও বুড়ো। পুজোয় ছাপবেন বলে নিয়ে, সাধারণ সংখ্যায়। তিনি আমাকে তখন ঠিক পছন্দও করতেন না।  কোনো লেখা পড়েন নি। এমনিতে কখন কী বলবেন, তার কোনো আগাম ধারণা করা দুঃসাধ্য। ভয় করতাম। কিন্তু গাঁও বুড়ো ছাপার পর তিনি আমাকে উপহার দেন তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘কুবেরের বিষয় আশয়’। গল্পটি তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তারপর শ্যামলের সঙ্গে কত দুর্লভ দিন কাটিয়েছি। জীবনকে চিনেছি কত রকম ভাবে। তাঁর মৃত্যু তো আমার এই জীবন থেকে কিছু একটা চলে যাওয়া। গাঁও বুড়ো পড়ে মহাশ্বেতাদি বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ক্রমশ আলাপ বাড়তে থাকে। ১৯৭৮ সালে আমার কর্মস্থল ঝাড়গ্রামের এক কো-অপারেটিভ ব্যাংক থেকে ২০০০টাকা ঋণ নিয়ে আমার প্রথম বই মাঠ ভাঙে কালপুরুষ প্রকাশ করি। তখন আমি মাইনে পাই ৫০০টাকা। ২০০০-এ চার কাঠা জমি হতো, কোনো এক সহকর্মী বলেছিলেন। তিনি জানতেন, আমি ভাড়াটে বাড়ির বাসিন্দা।   প্রণবেশ মাইতি মাঠভাঙে কালপুরুষের প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন। একটি পয়সাও নেন নি। কবি প্রভাত চৌধুরীর বাড়িতে বইটি প্রকাশিত হয় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে। বন্ধুরা, তুষার, সমীর, পবিত্রদা, শচীন, দীপঙ্কর---ছিলেন। ১৯৭৮ –এ অমৃত বিনোদন সংখ্যায় আমি আমার প্রথম উপন্যাস লিখি, নদীর মানুষ। এই সময় কিংবা আগে পরে আলাপ হয় স্বপ্নময়ের সঙ্গে। অভিজিৎ সেনের সঙ্গে আলাপ মহাশ্বেতাদির বাড়ি। অমৃত পত্রিকায় আমি একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলাম ১৯৭৯-তে। ৬ মাস। পাহাড়ের মতো মানুষ। এরপর অমৃত বন্ধ হয়ে যায়। তখন কবিপত্রে নতুন লেখকরা এসে গেছেন। রবিশঙ্কর বল, স্বপন সেন--- এঁদের কলমে ছিল মৌলিক ভাবনা। রবিশঙ্কর, স্বপন সেন কেউই নেই এখন ।


১৯৮০ সালে আমি লিখি দানপত্র নামের একটি গল্প। এক বৃদ্ধ  সাঁওতাল পুরুষ সায়েবমারি বাস্কে তার স্থাবর, অস্থাবর, এই প্রকৃতি, পাহাড় অরণ্য নদী, সব দান করে দিচ্ছে তার পৌত্র সায়েবমারি বাস্কেকে। সবকিছুই একদিন সাঁওতালজাতি, আদিমানবের ছিল, এখন কিছুই নেই। দানপত্র লিখি দলিলের আঙ্গিকে। দানপত্র ছাপা হয়েছিল অনীক পত্রিকায়। বহরমপুর থেকে বেরোত তখন, এখন কলকাতা। টানা ৩০ বছর  ওই পত্রিকাটিতে আমি লিখেছি।  হ্যাঁ, সাহিত্য অকাদেমির আধুনিক বাংলা গল্প সংকলন, চতুর্থ খন্ডে ‘দানপত্র’ সংকলিত। সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন, “...এই রচনা আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের এক গোষ্ঠীপতির আকাশ, নদী, অরণ্যের ওপর মানুষের অধিকার সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক ঘোষণার কথা মনে পড়িয়ে দেয়।“

       

আমি চাকরির জন্য অনেক জায়গায় ঘুরেছি। শহর নয়, প্রত্যন্ত গ্রাম, গঞ্জ। মেদিনীপুর হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা। প্রথম বয়সে তো অপশন দিয়ে চাকরিস্থলে যেতাম। সবটাই লেখা আর নতুন জায়গা ও মানুষ দেখার লোভে। বাঁকুড়াজেলায় বদলি হয়ে গিয়েছিলাম উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চল শালতোড়ায়। বাঁকুড়া বাস আমাকে নতুন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ করেছিল, তখন আমি বছর চৌত্রিশ। প্রথম সন্তানের বয়স, দেড়। তাদের রেখেই একা চলে গেছি। খরায় পোড়া পৃথিবী যে কী তা দেখেছি ওই জেলায়। আর দেখেছি অপরিসীম দারিদ্র, দারিদ্রকে তুচ্ছ করে মানুষের বেঁচে থাকা। বাঁচতে চাইলে কত রকমে বাঁচা যায়। বিভূতিভূষণকে আমি শালতোড়া বাসের সময় পড়েছি নিবিড়ভাবে।  বাঁকুড়ার ওই গঞ্জ, যাকে কখনো ন’পাহাড়ি, কখনো ‘হাঁসপাহাড়ি’ নামে এঁকেছি আমার গল্পে, উপন্যাসে, আমাকে দিয়েছে উজাড় করে।  নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা, রাত, পূর্ণিমা অমাবস্যা, বিহারীনাথ পাহাড়, এক বাউরি যুবক, কতকিছু যে আমার জীবন দেখার আদলকে বদলে দিয়েছিল। 

       

আমি আমার জীবনের অনেকটা সময় জলে দিয়েছি সরকারী চাকরিতে। এদেশে লেখাকে বৃত্তি হিসেবে নিয়েছিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সমরেশ বসু। এর ভিতরে মানিকের অবর্ণনীয় দারিদ্রের কথা আমরা জানি। তাঁর বেদনাদায়ক অকাল প্রয়াণের কথা আমি জানি। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীও কম দারিদ্রের ভিতর দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন নি। কেউ একজন লেখক আমাকে বলেছিলেন, খালি পেটে লেখা হয় না। তাই জীবিকার কথা ভাবতে হয়েছিল প্রথম থেকে। কিন্তু অনেক ক্ষমতাধরের চাকরি করি নি। যা করেছি তা আমার লেখায় সাহায্য করেছে। আমি ক্ষমতাকে ভয় করি। ক্ষমতা অন্ধকার বিবরবাসী সাপের মতো বিষ ধারণ করে। তাতে লেখা নষ্ট হয়। কেন না সাহিত্য তো চিরকাল তাদের কথা বলেছে যারা ক্ষমতাহীন। সাহিত্য চিরকাল দুবর্লের নিরূপায়তার কথা বলেছে।  ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করে দুবর্লের কথা অনুভব করা কঠিন। ঠিক এই কারণেই জনপ্রিয়  রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ক্ষমতায় গিয়ে বদলে যান।     

   

আমার চাকরি, বদলি, দূর গঞ্জে একা থাকা, নিঃসঙ্গতা—সব পেয়েছি আমার ওই জলে যাওয়া সময় থেকে। একবার দেবেশ রায়কে বলেছিলাম, সারাটাদিন কী ভাবে নষ্ট হয়ে যায়, যদি লিখতে পারতাম, জানলার ধারে বসে ভাবতে পারতাম ফেলে আসা সময়কে, যদি ইচ্ছে মতো বেরিয়ে পড়া যেত, জীবনটাকে অন্যভাবে দেখা যেত। তিনি বলেছিলেন, সত্যি, সারাটা দিন যদি ওতে যায়, লিখবে কী করে? কিন্তু একটা বড় সত্য আমি দেখতে পেরেছি তো দেশটাকে। ক্ষমতাহীন মানুষকে দেখেছি তো গ্রামে-গঞ্জে। দেখেছি অসামান্য প্রকৃতি,তার একটা চাপ ছিলই মনের ভিতরে। প্রকৃতিই লিখিয়ে নিয়েছে অনেক লেখা। নিঃসঙ্গবাস আমার কল্পনাকে বিস্তৃত করতে পেরেছে। আবার সেই শালতোড়ার কথা বলি।  ছোট ছোট পাহাড়, বিলীয়মান শাল মহুয়া পিয়ালের বন, অভ্র চিকচিক দিগন্ত বিস্তৃত টাঁড় জমি, প্রায় অচ্ছুৎ বাউরি পাড়া, পাহাড়গোড়ায় নিঃঝুম জলাশয়, মাঠ পেরিয়ে দূরে কোথায় একটি মধ্যবয়সীর চলে যাওয়া। আমি একটি দৃশ্য থেকেই একটি গল্প লিখেছি কতবার। মনে পড়ে, ভাদ্র সংক্রান্তির আগের দিন সমস্তরাত ভাদুগান শোনা এমন এক ভাদু গায়িকার কন্ঠে, যাঁর বাবা ছিলেন এক অসামান্য লোকসঙ্গীত গায়ক, কিন্তু কালান্তক কুঠো রোগে সমাজ থেকে পরিত্যক্ত তখন। তাঁর কাছে গিয়েছিলাম আমি কৌতুহলে। ভাদু গায়িকা সেই যুবতীর গান শুনে আমি পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। ওই গান আমার উপন্যাস সমাবেশ-এ আছে।  এই যে দেখা, এসব দুদিনের জন্য ঘুরে আসা নয়। আমি একাই থেকেছি বছরের পর বছর। শালতোড়ায় বিহারীনাথ পাহাড়। মাইল পনেরর ভিতরে শুশুনিয়া একদিকে, বেড়ো পাহাড় অন্যদিকে। অনেকদিনবাদে ২০০৯ সালে আমি গিয়েছিলাম শালতোড়ায় গড়ে ওঠা নেতাজি মহাবিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে। স্তম্ভিত হয়েছিলাম। খুব হতাশ হয়েছিলাম সেই প্রকৃতির ধ্বংস যজ্ঞ দেখে। ক্রাশার ভাঙছে পাহাড়, স্পঞ্জ আয়রন ফ্যাক্টরি কালো করে দিয়েছে বনভূমি। ক্ষমতাবানেরা এইসব করেছেন।

       

আমি কল্পনা করতে ভালবাসি। আঁকাড়া বাস্তবতায় বিশ্বাস করি না। আকাঁড়া বাস্তবতা আমাকে আমার সৃজন কর্মে তৃপ্ত করে না। মনে হয় আমি আমার প্রার্থিত জায়গায় পৌছতে পারব না। জীবন আর এই পৃথিবীর মানুষের বাঁচার ভিতরে যাদু আছে। জীবন বিভ্রমে ভরা। স্বপ্ন আর কল্পনা ব্যতীত জীবন হয় না।  জীবন যেটুকু চিনেছি, তাকে তো নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছি। সাহিত্য তো সৃজনকর্ম। আমার যা বলার কথা তা বলব আমি নিজের মতো করে। আমি আমার বাস্তবতা খুঁজব এক মায়াবী আলোর ভিতরে। গল্প বানাতে হয় দৈনন্দিনতার ভিতর থেকে। যাপিত জীবন থেকে। গল্পের সূত্র খুবই সামান্য। হয়ত শূন্য থেকেই যাত্রা হয় গল্পের। তারপর তা নিজের মতো করে গড়ে উঠতে থাকে।   কী ভাবে গল্প হয়ে ওঠে  তাও যেন অজ্ঞাত। এ কি শূন্য থেকে নামিয়ে আনা শাদা পায়রা, কিংবা লাল নীল সবুজ রুমাল।আমি নগর ও গ্রাম—দুইকে অনুভবের চেষ্টা করেছি সমস্তজীবন ধরে। সামাজিক ন্যায় অন্যায় আমাকে প্রতিনিয়ত বিব্রত করে, তা লেখায় চলে আসে।  তাই ভিখারি পাশোয়ানের অন্তর্ধান নিয়ে নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান যেমন লিখি, তেমনি রাষ্ট্রের অন্য সব আগ্রাসনের কথাও লিখি গল্পে, উপন্যাসে। আমি এইটুকু জানি মানবিক মুহূর্ত, মানুষের নিরূপায়তা, বেদনাবিদ্ধ জীবনের নীরবতা, অশ্রুত বেদনাকে খোঁজাই লেখা। আর লেখার ভিতরে আমি নিজে যেন কীভাবে চলে আসি। আমি তো নিজের কথাই যেন বলি। এমনও হয়েছে লিখে আমি গোপনে চোখের জল ফেলেছি। আসলে একজন লেখক সমস্তজীবন নিজের কথাই বলে যান। আর একজনের জীবনে কত কথার না জন্ম হয়, হয়েই যায় প্রতি নিয়ত। মনে করি সাহিত্য সাধনার জায়গা। 

 

 আমার কোনো ক্ষোভ নেই। বরং নিজের মতো করে লিখতে পেরেছি, সেই আনন্দটি পেয়েছি। আমাকে কেউ ফেলে দেননি। আমি নিজেই টের পেয়ে তাঁদের পরিত্যাগ করেছি।  আমি কোনোদিন ভয়ের ভিতরে থেকে লিখিনি, এই বছর লিখছি, পরের বছর দেবে তো লিখতে, এই ভয়ে কুঁকড়ে থাকিনি।  যিনি আমাকে অসম্মান করেছেন, নিজেই সরে এসেছি তাঁর কাছ থেকে।  কোকিল, হস্তান্তর গল্প ফেরত দিয়েছেন বড় পত্রিকার গল্প নিবার্চক, উপন্যাস চেয়ে নিয়ে ফেরত দিয়েছেন তিনদিন বাদে, আমি সরে এসেছি। বড় কাগজ থেকে সরে এসে নিশ্চিন্ত হয়েছি। আমি আমার মতো লিখব। চার বছর পান্ডুলিপি ফেলে রেখেছেন প্রকাশক। খোঁজ করতে গিয়ে চরম অপমানিত। সে কবের কথা। নেমে এসে রোদে পুড়েছিলাম বহুসময়। পরে অবশ্য তিনিই তিন মাসের মধ্যে প্রকাশ করেছিলেন বইটি। কেন অপমান তা আমি আজও বুঝি না। আর একটি কথা সত্য কলেজ স্ট্রিট বই ছেপেছে বলে আমাদের অনেকের পক্ষে লিখতে সুবিধে হয়েছে। 

     

লেখক কেউ একদিনে হয় না। সমস্তজীবন লাগে। এমনও হয়, তারপরেও হয়তো দেখা গেল তাঁকে বিস্মৃত হলেন সুধী পাঠক। সতীনাথ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর মতো বড় গল্প লেখককে সেই ভাবে পড়া হয় না। অথচ তিনি তো লেখকের লেখক। এই লেখকরা কোনোদিন একেবারে মুছে যান না। তরুণ প্রজন্ম তাঁদের খুঁজে বের করেনই। আবার ঢাকঢোল পিটান কত লেখক মুছে গেছেন মৃত্যুর পর। অথচ জীবৎকালে কম পঠিত লেখক তাঁর লেখার গুণে আবার ফিরে এসেছেন স্বমহিমায়, যেমন এসেছেন সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার  থেকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়।  

    


1 টি মন্তব্য: