শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সুব্রত ভৌমিক।। পারক গল্পপত্র



                                    ১

ডাকটা বাপনদের কারও। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ দিনাই ছুটতে ছুটতে এসে খবরটা ফেলেছিল, 'কী জিনিস বেরিয়েছে গুরু!'

     রতুর কেমন বোন। গতকাল এক হাওয়া ছাড়া সন্ধ্যায় ঢুকেছে। পানপাতা মুখ, মিঠাই আঁখি, উচ্চমাধ্যমিকে ৯০৫। কী করে যে পায়। মরাল পা, পরনে স্কিন-টাইট জিনস, উপরে ল্যাপ্টানো ছাড়া টপটার ধনুক শিরদাঁড়া বেয়ে ফাটাফাটি ঢেউ --- মা, মহামায়া, মহা সপ্তমীর অঞ্জলি চলছে। 

     রাস্তা ঘেঁষা প্যান্ডেল। গায়ে অর্ধডিম্বাকার চেয়ারগুলোয় এক ঝাঁক পাড়ার মেয়ে। যেন পাখি। আজ উড়বে? কত দূর? তারই মধ্যে থেকে বাপনদের ডাকে উঠে আসা রতু ফিরতি পথে অভির কাছ ঘেঁষল, 'কেমন?'

     'কী?'

     'যাতে চোখ যাচ্ছে।'

     সার সার পাঁচিলে বসা। অভি দেশলাই ঠুকল। হাসি-হাসি ঠোঁটদুটোয় একটা নিভে যাওয়া বিড়ি। ধরাচ্ছে। একমুখ ধোঁয়া ওড়াল, 'কোথায় থাকে, আকাশে?'

     'আজ্ঞে না, মাটিতেই। লক্ষ্ণৌ।'

     'লক্ষ্ণৌর মাটি ভাল। থাকবে?'

     'পুজোর ক'দিন।'

     'ক'দিন কিছু পতঙ্গ মরবে। নাকি মুঠোর?'

     'কেন, তুমিও মুঠো বাড়াবে নাকি?'

     'না রে, মুঠো করা জিনিস আমার মন থেকে পড়ে যায়। আরে, এই শোন --- '

     'অসভ্য, পাজি, ছুঁচো। দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি গিয়ে দিয়াকে সব বলছি।' রতু আর দাঁড়াল না।

     নাম তাহলে দিয়া? মানে কী?

     বিড়িটায় দু'আঙুলে টোকা মারল অভি। আরও কিছুক্ষণ রাবার টানার মতো এক বরাদ্দ যাপন, প্রাত্যহিকতা। ছিঁড়ে যেত। অভি উঠে পড়ল। পাঁচিলটা থেকে লাফিয়ে নামল। তারপর বাড়ি ফেরার জন্য রতুদের চেয়ারগুলোকে পাশ কাটতে যাবে, ভিড়টার ভেতর থেকে একটা ফোঁসা স্বর ভাসল, 'বিকেল হোক।'

     বিকেলটা কখন গড়িয়ে গেছে।

     ভাইঝির ডাকে ঘুম ভাঙল। না, বাবা-মা কেউ নেই। দাদার সংসারে থাকে। দাদা গরীব। অভি একমাত্র ভাই। পড়াশোনায় ভাল ছিল। ব্রাইট কেরিয়ার ছিল। সবাই যখন এইরকম নিশ্চিত, ঠিক সেই সময় দানটা ছেড়ে দেয়। শেষমেষ বি-এস-সি, বায়ো। কিছু টিউশানি করে।

     গতকালই শেষ মুহূর্তে সস্তায় কিছু পুজোর বাজার হয়েছে। বৌদির একটা নীলচে ব্লাউজ। ভাইপো আর ভাইঝির জন্য দুটো জামা। এতক্ষণ খেয়াল হয়নি, ছোট্ট ভাইঝি ডাকতে এসে ঘনঘন সেই জামাটার দিকেই আড়চোখে তাকাচ্ছিল।

    অভি হাত বাড়ায়, 'আরে, দেখি দেখি ---'

    'হ্যাত্।' অমনি ফিক্ করে হেসে একছুট।

     হাসিটা কেমন কান্নার মতো।

     সন্ধ্যায় আলাপ হল। রতুই করাল। সেই চোখ! যেন জ্বলছে। তাকালে কথার মতো লাগে। বলল, 'আগুন শুধু পোড়ায়, আলো দেয় না?'

     অভি প্রমাদ গুণল। রতুটা নির্ঘাৎ চুকলি কেটেছে। উত্তর করল, 'কে জানে, আমার তো পুড়তেই ভাল লাগে।'

     দিয়া যেতে গিয়ে থমকাল। 'দারুণ কথা বলেন তো আপনি।' বলে ক'পলক চোখ রাখল। তারপর আস্তে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল।


     রাত গভীর। সপ্তমীর রাতটা বেরিয়ে যাচ্ছে। মাথার নীচে ডান হাত। বাঁ হাতে ধরানো বিড়িটা অল্প অল্প ধোঁয়া ছাড়ছে। অভি চুপ। ছোট্ট ঘরটার শিক বেরনো সমাধানহীন ছাদটার দিকে অপলক তাকিয়ে। ঘরটায় কেউ আছে কি? ঘরময় একটা অচেনা গন্ধ। কার, কীসের!


                                   ২

পরদিন মহাঅষ্টমী।

     বেলা এগারটা নাগাদ অভি পুজোমন্ডপে এল। অমনি নাকে লাগা সেই গন্ধটা। কার! প্যান্ডেলটা ঘিরে আজও সেই আড্ডা, কলস্বন, ফুল্ল অধর ফেটে ঢলে ঢলে পড়া। এরই মধ্যে কোথাও গন্ধটা?

     অভি চেয়ারগুলোর দিকে তাকাল। থমকাল। দুটো স্থিরচোখ একদৃষ্টে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ বাঁধতেই পাশে বসা রতুর সঙ্গে গল্পে ঢুকে গেল। আর একবারও তাকাল না। শুধু কথা বলার সময় একটা চিলতে হাসি খেলে যাচ্ছে পাতলা ঠোঁটজোড়ায়। এর নাম কী!

     একটু সুযোগ হল। রতুই করে দিল বা। অভি মুখ খুলল, 'একটা প্রশ্ন করা যায়?'

     'আমাকে? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।'

     'আপনার কি কোনও গন্ধ আছে?'

     'মানে!' দিয়া চমকাল।

     'না, কাল থেকে একটা গন্ধ লাগছে নাকে।'

     কথাটার মীমাংসা হল না।

     এটা-সেটা ঢুকে পড়ল।

     ছেলেদেরও আড্ডা চলছে একধারে। অরূপ সান্ন্যাল সদর্প চিল্লাচ্ছে, 'আরে কী লেবার কী অফিসার, নাইন্টি থ্রি পার্সেন্ট নন্-বেঙ্গলি কী রকম প্র্যাকটিকাল জানিস! নো ফাউ আড্ডা, নো কিচ্ছু। স্রেফ ইনকাম এন্ড ডিপোজিট। এই করে সব বাড়ি-গাড়ি করে ফেলছে। পারবে তোর বাঙালি?'

     'সত্যি, এদের কোনও মন-টোনের ঝামেলা নেই। মেয়ে-ফেয়ে দেখলে ভাসে না।' --- দিনা সবিস্ময় বাজল।

     রতুদের আওয়াজ এল, 'দিনাদা, এবার জন্মে তুমি অমন অফিসার হোয়ো।'

     উত্তর এল, 'মরে যাব রে।'

     সকালটা এইভাবে।

     উঠোনটায় ক্রমশ বিকেলের ছায়া। পেয়ারা গাছটা অব্দি। জীবনের ছায়াটাও কি একদিন এইরকম দীর্ঘ হবে? হয়তো সেদিন এক-মাথা সাদা চুল, চামড়া ঝুলে গেছে। বারান্দার ছায়া পড়া এই সিঁড়িটায় বসে আজকের দিনটা জেগে উঠবে?

     বৌদি পাশে চা রেখে গেছে। একটু হেসে গেল যেন। সামনের বাড়ির ছেলেটা ছাদের উপর থেকে শুকানো বাজিগুলো উঠিয়ে নিয়ে গেল। ভাইপোটাও দেখছিল কি? হঠাৎ সলজ্জে থামটা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, 'কাকু, এক প্যাকেট কালীপটকা কিনে দেবে?'

     'আমার তারাবাজি।' ভাইঝিটি অমনি গলা জড়িয়ে পিঠে।

     মধ্যে কাকু, দু'হাত আকড়ে দুই ক্ষুদে।

     পিছনের একটা দোকান থেকে কিনে আনা হল। ভাইপো সব সময় আড়ষ্ট। বেশি আনন্দ পারে না। ক্লাস সিক্স। ছোট্ট এক প্যাকেট কালীপটকা পেয়ে হঠাৎ খুব ব্যস্ত হয়ে উঠল। অভির কেমন কান্না পেল। বেরিয়ে এল। আসতে আসতে ভাবল, আনন্দকেও চিনতে হয় কি? সব আনন্দ, আনন্দ না --- আনন্দের সান্ত্বনা।

     সন্ধ্যায় দেখা হল না। বাপনদের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। ঠাকুর দেখতে। অভি একা ভিড়ে হাঁটতে লাগল। দেখেছে, উৎসব তাকে কেমন একা করে দেয়। কেন? একটা পুজোমন্ডপের মাঠে বাউলগান হচ্ছিল। বসে পড়ল।

     পাড়ায় ফিরতে ফিরতে রাত। রতুরা চেয়ার ছেড়ে উঠে এল, 'কী ব্যাপার, কোথায় ডুব মেরেছিলে?'

     বলল।

     পাশে দিয়া। সঙ্গে আসা। রতু একটু সরে যেতে আস্তে বাজল, 'কেমন লাগল বাউলগান?'

     'লাগল।'

     'সন্ধেবেলা আসার কথা ছিল না?'

     'ভাইপো-ভাইঝি দুটো বায়না ধরল। থাকতে হল।'

     'ইস্। আর আমরা দেরি দেখে চলে গেলাম।'

     'স্বাভাবিক। আমার সব কিছুতেই দেরি হয়ে যায়। আর দেরিতে কিছু থাকে না।'

     দিয়া তাকাল। দেখল। তারপর ফের স্বর কাটল, 'এমন একা একা, পাশ কাটা? কিছু ভাবছিলেন বোধহয়।'

     'বোধহয়।'

     'কী?'

     'যা ভুল, লালিত হওয়ার চেয়ে ভেঙে যাওয়া ভাল।'

     দিয়া চমকাল। চুপ। এই কেরিয়ার-সর্বস্ব নিশ্চিন্ত জীবনটা কি একটু একটু নড়ছে? কাঁপছে? জ্বলন্ত চোখদুটোয় সেই তাত্। চাপা স্বরে হঠাৎ হিসহিসিয়ে উঠল, 'আপনি তো আমায় পাগল করে দেবেন দেখছি!' বলে ছিটকে বেরিয়ে গেল।


     মহাঅষ্টমীর রাত। আজ রাতটা অভির কেমন লাগল। কে জানে কেমন। মনের পর্দায় ভেসে ওঠা দুটো চোখ। চোখে আগুন। সে কি জ্বলছে, পুড়ছে? কোন্ আলোয়?


                                    ৩

নবমীর সকাল। ডায়ার্সের উপর নিপু, বাপন, শিবে ইত্যাদি। মেয়েদের ফাঁকে ফাঁকে গোঁজা। অঞ্জলির ভিড়। ভেঙে না পড়ে। কত রঙ!  স্কার্ট, চুড়িদার, টু পিস্ ...। এরই ভেতর থেকে ডান হাতে প্রসাদ, পিঠে এক ঢাল চুল ফেলা, বাঁ হাতে শাড়ির তলাটা একটু উঠিয়ে নড়বড়ে তক্তার সিঁড়িটা দিয়ে সাবধানে কে নামছে! অভি মুগ্ধ হল। কাছাকাছি হতে বলে উঠল, 'দারুণ লাগছে।'

     উত্তর এল, 'লাগুক। আর দেখতে হবে না।'

     অভি থতমত খেয়ে চুপ করে গেল।

     দিয়া চিলতে হেসে ফের গম্ভীর। ছড়ানো থালাটা থেকে প্রসাদ দিতে দিতে স্বরটায় হঠাৎ কেমন একটু ঝাঁজ লেগে গেল, 'পড়াশোনায় তো ভালই ছিলেন, দানটা ছেড়ে দিলেন কেন?'

     'হতো না।'

     'কেউ পারে না, কেউ জেতে না।'

     'পারতাম না।'

     'চেয়েছিলেন?'

     অভি ফণা ওঠাল, 'দেখুন ---'

     'আসলে জিতটায় আপনার এক ধরণের লোকসানও ছিল, তাই না?'

     'মানে!'

     'আপনার এই মন, কিছু টের পাওয়া, জীবনবোধটা হেরে যেত।'

     অভি চমকে তাকাল। দিয়া চোখ সরাল না। দু'মুহূর্ত চোখে চোখ। 'আজ পালাবেন না।' বলে সরে গেল।

      সন্ধ্যায় বেশ ভিড়। তারই মধ্যে আড়ষ্ট, ভরসা কম, একটা ক্ষুদে ভিখিরি কাছ ঘেঁষল। শোনা যায় না এমন স্বরে কিছু সাহায্য চাইল। পরনে সস্তা ফ্রক। চুলে একটা তুঁতে রঙের ক্লিপ। পুজোর বা। কেউ দিয়েছে। যেন এই উৎসব-আলোয় খানিক বিব্রত, সংকুচিত, বিপন্ন। অভি মানিপার্স খুলে দশটা টাকা হাতে দিল। এক বেলার মতো ডানা খুলে গেল। সেইদিকে তাকিয়ে খানিক গম্ভীর, আনমনা  --- কানে বাজল, 'এই?'

     তাকিয়ে দেখল, দিয়া। রাস্তার ওধারে দিয়া! রতুরা বাপনদের সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। সে যায়নি। কেন!

     পাশাপাশি হাঁটছে।

     মফস্বলটায় আজ গ্রাম ঝাঁপিয়েছে। মানুষই মারে। তবু তারই কাছাকাছি ঘুরঘুর করা সব মানুষ। জীবনের এই চারটে দিনের পাশ কেটে কোথাও পেঁৗছানো যায় না। চারদিকে একটা বাঁধভাঙা আনন্দ, খালাস। কিছু ছেলের কলার তোলা, কোমরে বাঁক --- মাইকের তালে নাচছে। কারও কারও চোখ লাল। গলায় ঢকঢক করে র-মাল ঢেলে এসেই বমি, বাওয়ালি --- 'এই, আমাকে চিনিস?'

     'কেন, তুই তো ভোলা। ভ্যান চালাস।'

     'না স্-সালা, আমি ভোলা না। আমার নাম ভোলা।'

     'তালে তুই কে?'

     'কে জানে।'

     পায়ে পায়ে অন‍্য এক প্যান্ডেলে। এবার দেখ, কেমন অলক্ষ্য জীবন! একটা গ্রামীণ শিশু বাপের জামা আঁকড়ে। একটা কাঠের নাগরদোল্লার দিকে চোখ। জামাটা হিড়হিড় করে তাকে ভিড়ের একধার দিয়ে টেনে নিয়ে চলেছে। মুখটা বাড়ি খেতে খেতে যাচ্ছে। অন্য একদিকে একজন রাশভারি মহিলা গম্ভীর মুখে নাগরদোল্লাটায় উঠল। চোখমুখ কঠিন, পাশে বাচ্চা। উপর থেকে এক পাক নামতেই হঠাৎ ফিক্ করে হেসে ফেলল। হাসিটা কী দারুণ। অভির মনে হল।

     দিয়া ধরল, সেও চড়বে।

     'হট্।'

     'কী হট্। কিচ্ছু হবে না। কেন, ৯০৫-রা চড়ে না?' --- ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি।

     এরপর ফুচকা, চুড়ি কেনা, এটা-সেটা।

     ফেরার পথে পাড়ার লম্বা পিচের রাস্তাটা কেমন বিষণ্ন লাগছে। কেমন নিঝুম, মায়াবী। সার সার টিউব লাইটগুলো জনবিরল জ্বলছে। দিয়া আজ দারুণ সেজেছে। জ্যোৎস্না ফেটে পড়ছে যেন। কাল দশমী। দিয়া হঠাৎই সেই কথা তুলল, 'কাল আপনাদের প্রতিমা যাচ্ছে?'

     'হ্যাঁ।'

     'আজকের দিনটা কী দারুণ, না?'

     'হ্যাঁ, কাল থাকবে না।'

     দিয়া ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। ফের সামনে তাকিয়ে বলল, 'কিন্তু এখনও তো আছে।'


     ঘুম আসছে না। ভাঙা ছাদটায় রাখা সেই চোখ। হায়, এত সুখ। তবু ব্যথা কেন? পাড়ার মাইকটায় বাজা সানাইয়ে মৃদু দরবারি কানাড়া ভেসে আসছে। যেন কে কাঁদছে। কালের গভীরে। পাশের বাড়ির দেয়ালঘড়িটায় ঢং ঢং করে রাত বারো। নবমীটা চলে যাচ্ছে। যায় ... যায়, জীবনভর শুধু ছেড়ে যাওয়া। আজ বেরনোটা ঠিক হল? হয়তো হল। কিন্তু আজ আছে, কাল ভাসান।


                                     ৪

ব্যস। পুজো ... পুজো, শেষ।

     বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ প্রতিমা ডুববে। পাড়াটার ঘরে ঘরে আজ বিজয়াদশমী। মিষ্টিমুখ। শত্রু-মিত্র বুকে টানা। দিয়াকে সারা সকাল দেখা গেল না। কেন!

     রাস্তার লাইটগুলো খোলা হচ্ছে।

     দিনগুলো ফের ডানামোড়া, ইচ্ছেহীন। বিসর্জনের সময় অনেকে নাচা-নাচি করবে আজ। তো পাশের বাড়ির একটা গোবেচারা ছেলে চট-ফেলা একটা বাথরুমে ঢুকছিল, হঠাৎই দু'বার কোমর নাচিয়ে একটা নাচের মুদ্রা করল, তারপর তাড়াতাড়ি একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফের নিস্পৃহ মুখে বাথরুমে ঢুকে গেল।

     বিকেল। ঢাকে বোল্ উঠছে, 'ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ/ঠাকুর যাবে বিসর্জন।' একটা প্রণামের হুড়োহুড়ি, অসুরের মুখেও মিষ্টি গোঁজা, গালে গালে সিঁদুর। মূর্তিগুলোর চোখে যেন জল।

     জীবনের আশ্চর্য চারদিন!

     কে মুখ ফেরাবে?

     সারা বছরের এক বন্ধ-মানুষ খুলে যায়। চারটে দিনের চিলতে আকাশ, বিভ্রম, বিমূঢ় উঁকি। বেরোবার মুখে বাপনরা মদ-ড্রাগ-সিদ্দি নিয়ে ভয়ংকর। যেন চলে যাওয়া দিনটাকে বাঁধবে। ধরে রাখবে। এভাবেই পাশের একটা ক্লাবের সঙ্গে এক তুমুল গন্ডগোল বাঁধিয়ে ফেলল। বিসর্জনটা শেষ হতেই একটা গা কাঁপা ছুটোছুটি। পরপর পড়া কয়েকটা বোম, ছিটকানো জালের কাঠি, রাস্তাঘাট সুনসান।

     ন'টা নাগাদ অভি রতুদের বাড়িতে এল। দুটো প্রণাম, একটা আলিঙ্গন। একটা পর্দা ফেলা ঘরে ঢুকল। দিয়া শুয়ে। গায়ে জ্বর। পায়ের শব্দে ফিরল। থুতনি টেনে ডাকল। মাথার কাছে একটা নীচু মোড়ায় বসতে বলল। প্রথমেই পাড়ার খবর, তার কোনও ভয় আছে কিনা, সারা সকাল কেমন কাটল। তারপর চুপ। দেওয়ালঘড়িটা শুধু স্তব্ধতা ভাঙছে। কানে বাজল, 'কাল চলে যাচ্ছি।'

     'জ্বর না?'

     'এখন নেই।'

     'ও।'

     দিয়া তাকিয়ে। নিঃশব্দে হঠাৎ অভির একটা হাত টেনে নিল। তারপর বালিশের তলা থেকে একটা প্যাক্ করা গিফট্ বার করে হাতটার মধ্যে গুঁজে দিয়ে মৃদু চাপ দিল। কী এটা?

     একটা দামি পারফিউম। অভি প্যাকেটটা খুলে নাক টানল। তারপর সিরসিরিয়ে উঠল, 'একী, এ তো সেই গন্ধটা!'

     দিয়া হাসল। উত্তর এল, 'হ্যাঁ, মুঠোয় থাকে না।'


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন