শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সমর সুর।। পারক গল্পপত্র



এক প্রকার দৌড়েই ট্রেনে উঠল নন্দু। হাঁপাতে হাঁপাতে কাছে এসে দাঁড়াতেই জিজ্ঞাসা করলাম আরে ভাই এইভাবে ট্রেনে উঠবার কি দরকার! নন্দু বলে ওঠে কি করব ?তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না যে।  সাতদিন যাই নি অফিসে ছুটি নিয়েছিলাম। তাই বলা হয় নি আজ বলব বলেই তোমাদের আর আমার কিছু অফিস কলিগদের তাই ছুঠে ট্রেন ধরলাম । 

--ঠিক আছে ঠিক আছে আগে বসো। এবার বলো কি প্রয়োজন।

 নন্দু পাশে বসে বলল পরশু মানে বৃহস্পতিবার তোমাদের ছুটি আছে ? সরস্বতী পূজোর দিন আমার বাড়ি যেতে হবে।

 পাশে বসা বন্ধু বাপির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললাম ঐ দিন ফাঁকা বলেই বাপির দিকে তাকতেই বাপি বলে ওঠে না রে আমার ডিউটি আছে। বুঝছি না পুলিশের চাকরী, ছুটির দিনে চাপ আরও বেশী।তবে পাঁচটায় বাড়ি ফিরব।তুই গেলে আমি যাব একসাথে থানা থেকে ফিরে এসে। এই কথা শুনে নন্দু বলে ওঠে ব্যাস,চলে এসো।না হলে খুব কষ্ট পাবো।

 আমি বললাম,তাহলে বাড়িতে বেশ বড় করেই সরস্বতি পূজো হয়।একথার জবাব না দিয়ে নন্দু মুচকি হেসে বলে এসো কিন্তু আপেক্ষায় থাকবো।শুধু বি.ডি,ও অফিসের কাছে এসে ফোন করো আমি তোমাদের রিসিভ করে নিয়ে যাবো।পাক্কা কিন্তু।

         এবার বাপিকে বললাম ঠিক বলতো কখন আসবি।আমি সেই বুঝে বাড়ি থেকে বেরব।

-দেখ,বাড়ি ঢুকতে ছটা বেজে যাবে,তারপর ফ্রেস হয়ে বেরতে বেরতে সাড়ে ছটা হবে।

--ওকে,এর বেশী দেরী করিস না।আমাকে তো ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। আর নন্দুর বাড়িও বেশ দূর।

এই কথা শুনে বাপি বলল চিন্তা করিস না,বাড়ি থেকে বাইক নিয়ে আসব তারপর নন্দুর বাড়ি থেকে তোকে সোজা স্টেশনে পৌছে দেব।

আশ্বস্ত হলাম ভালই হল তাহলে আর টেনশন থাকবে না।

          পরের দিন বাপির কথা মতোই সন্ধ্যা ছটা বাজতেই নিখিলের চায়ের দোকানের কাছে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে ছটা গড়িয়ে সাড়ে ছটা বেজে গেল বাপির কোন দেখা নেই।ফোন করছি অথচ বলছে নট রিচেবেল। তাহলে কি এখনও ট্রেনে বাড়ি ফেরে নি থানা থেকে অবশ্য ট্রেনে থাকলে এইরকম নটরিচেবল হয়। আবার ফোন করতেই রিং বেজে উঠল।কিন্তু ফোন রিসিভ করল না।কি জানি শেষ প্রর্যন্ত যাবে তো বাপি।না গেলে এইটুকুতো বলতে পারে সে যাবে না তাহলে আমিই নাহয় একি একাই চলে যাব অগত্যা।নাহলে ব্যাপারটা ভীষন রকম বাজে হবে। প্রতিদিন আমরা একসাথে ট্রেনে যাতায়াত করি বন্ধুর মতো নন্দু । আমাদের ভালোবাসেই বলেইতো বলেছে আর কতজনইতো একসাথে ডেলিপ্যাসান্জারি করি অন্য কাউকে তো বলে নি যাবার কথা।বাপি মনে হচ্ছে ঝুলিয়ে দিল আমায়।আমাকে আবার ট্রেন ধরে ফিরে যেতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতেই মনে হল আর একবার লাস্ট ট্রাইকরি ফোনে ধরলে ভাল না হলে আমিই একটা অটো ধরে চলে যাব নন্দুদের বাড়ি।ফোন করতেই এবার বাপি ফোন রিসিভ করে বলল দাঁড়া দাঁড়া পাঁচ মিনিট আমি রাস্তায় বাইক নিয়ে। 

    যাক শেষ প্রর্যন্ত বাপি এল একঘন্টা কুড়ি মিনিট লেটে।এসেই বলল আর বলিস না বাইক নিয়ে ছেলে বেরিয়েছিল। নে নে উঠে বস। চিন্তা করিস না দেরী হলে আমার বাড়িতো আছে নাকি !

       আর কোন কথা না বাড়িয়ে বাইকে উঠে  বসলাম। পারফিউমের ঘ্রাণে ম ম করছে বাপির গা থেকে। দাড়টারি সেভ করে বেশ মাঞ্জা দিয়েই এসেছে।বুঝলাম দেরীর কারন কিছুটা।বাপির বাইক চালানো দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। বেপরোয়া ভাব। ভয়ে ভয়ে বললাম আরে আস্তে  চালা এইসব জনবহুল ঘিঞ্জিরাস্তা কোথাও ঠুকে দিলেতো মুশকিল। কে কার কথা শোনে বরং সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে তুই চুপচাপ বসে থাক এইসব কানামদনা পাবলিক ডানবাম জ্ঞান নেই লাগলে লাগবে।আমার বাল ছিঁড়বে।

   পুলিশের ধর্ম যাবে কোথায়।বেপরোয়া উর্দির গরম। আর কথায় কথায় গালাগালি। মনে মনে একটু ভয়ও হচ্ছিল ওদের বাড়ি গিয়ে আবার বিগড়ে না যায় বাপি মাতলামি না করে বসে।করন সাতসকালেই পাইট মেরে এসেছে। পিছনে বসার সুবাদে হাওয়ার তোরে নাকে এসে বিঁধছে সেই অমৃত ঘ্রাণ তার সঙ্গে পারফিউমের। এযেন ঘ্রাণের ককটেল। হঠাৎ একটু ফাঁকা দেখে বাইকটা দাঁড় করালো দেখে বলে উঠলাম কি হল?

--কিছু না একটু মাইনাস করেনি ওখানে গিয়ে কোথাও করব কাকে বলব তার চেয়ে বরং খোলা হাওয়ায় ঝেরে দিই কাজটা।শোন তুই করে নে মাইনাস বলে পেচ্ছাপ করে কোমর থেকে একটি বোতল বের করে বাকি অংশটা ঢেলে নিলো মুখে। তাই দেখে আমি থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম মাল না খেলে হত না !ধুস্ রাখত ওখানে গিয়ে দেখিস কতজন টেনে আছে। আমিতো কারোর সাথে গল্প করব না বাল আর কেইবা আমাদের চেনে।


      যাক শেষ প্রর্যন্ত ভাল ভালই বি,ডি,ও অফিসের কাছে আসতেই বোঝা গেল বেশ জমাট পূজো। মাইক বাজছে,রাস্তা থেকে আলো বাড়ির গলি পর্যন্ত ।সেজেগুজে বড়ছোট

সবাই ঘোরাঘুরি করছে। একটু দূরে গিয়ে নন্দুকে ফোন করতেই নন্দু চলে এল।বাহ্ আজ যেন নন্দুকে আর ভাল লাগছে।অবশ্য নন্দু সবসময়ই ভীষন ঝিকঝাক থাকে। আজ যেন আরো বেশী ভাল লাগছে। আমাদের দেখেই  হাত ধরে বলল চলো,দাদা চলো তোমাদের খুব মিস্ করছিলাম বাড়ির গেটের মুখে আসতেই থমকে গেল পা।লোহার গেটের উপর ফুল দিয়ে প্রবেশদ্বার।আর ফুল দিয়ে লেখা।নন্দন ও নন্দিতা।শুভ বিবাহ।তারমানে নন্দন অর্থাৎ নন্দুর বিবাহবাসর অথাৎ

অর্থাৎ বৌভাত।বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম আমরা দুজনেই ।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কি করব এখন।অথচ একবারেও বলেনি আজ ওদের বৌভাত। এমনকি বিয়ের ব্যাপারটাও চেপে গিয়েছিল আমাদের কাছে।

             নন্দু বুঝতে পেরেই বলে,কি হলো চলো,দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?বাপি আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকলো।আমি বললাম তোমার আজ বৌভাত অথচ বলো নি? বিয়ে করলে তাও তো বলো নি।

নন্দু মুচকি হেসে সারপ্রাইজ দাদা এই বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বাড়ির ভিতরে।

     কিন্তু তখনও আমরা বুঝে উঠতে পারছিনা কি করব ফের একটু বেরিয়ে গিয়ে অন্তত একটি ফুলের তোড়া নিয়ে আসাই ভাল হবে। বাপি আমায় ঈশরা করতে থাকে চল বাজারে গিয়ে কিছু একটা নিয়ে আসি।বাপির মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝা গেল পুরো ধুমকি কেটে গেছে।এবার বাপি বলল নন্দুকে দাড়া ভাই একটা অন্তত ফুলের তোড়া নিয়ে আসি।না হলে কেমন যেন লাগছে। নতুন বৌমা তাকে একটা ফুল দিয়ে সৌজন্য দেখাতে পারব না এ হয় না !

এইকথা শুনে নন্দু বলে ওঠে ধুস্, তোমাদের উপস্থিতিই আমার শুভেচ্ছা।চলো চলো,বাবা দাঁড়িয়ে আছেন আলাপ করিয়ে দিই বলেহা হাত ধরে টেনে নিয়ে ওর বাবার কাছে নিয়ে গেল।

       নন্দুর বাবা বেশ সুন্দর চোস্তা,পাঞ্জাবি পরে হাসি মুখে অতিথি আপ্যয়ন করছেন।কাছে যেতেই নন্দু বলল,বাবা আমার ট্রেনের সহযাত্রী

দাদা কাম বন্ধু।বলতেই দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন আপনাদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে আরো উজ্জ্বল হলো রাত্রি।ওদের শুধু আশির্বাদ করুন যা ওনাদের নিয়ে বৌমার কাছে আলাপ করিয়ে দে।এই কথা বলতেই নন্দু দোতলার ঘরে নিয়ে গেল।যেখানে নব বধু বসে।তার কোলে মিষ্টি একটা ছোট্ট মেয়ে আলো করে বসে আছে বধুর মতো সাজে।ঘর ভর্তি আত্মীয় অনাত্মীয়র ভিড়।নন্দু এবার নন্দিতাকে বলে শোনো ইনি অরূপ দা আর বাপির দিকে তাকিয়ে বলে বাপিদা আমার বন্ধু এবং দাদা এই কথা শোনামাত্র খাট থেকে নেমে প্রণাম করতে যেতেই বাধা দিলাম দুছনেই।লজ্জা যেন আরো গভীর হলো শূণ্যহাত। তবুও বললাম তোমার জন্য অন্তত একটি ফুলের তোড়াও অনতে পারি নি।ও বলেই নি কিছু,আমরাতো সরস্বতী পূজো ভেবে এসেছি।

        লাজুক হেসে নন্দিতা স্মার্টলি বলে,উপহার বড় নয় দাদা,আপনাদের শুভেচ্ছা ও আশির্বাদ চাই আগামী দিনের জন্য।আমরা বলে উঠলাম আমাদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা সবসময় তোমাদের সঙ্গে বলেই তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে  এলাম ঘর ভর্তি লোকজন বেশ লজ্জাই করছিল।বাইরে এসে আবার বললাম,ঠিক করো নি নন্দু একবার বলা উচিত ছিল !     

     এবার নন্দু বলে ঠিক আছে পরে একদিন এসে ফুলের তোড়া দিয়ে যেও। হল তো। অনেকটাই হালকা হল মনটা এবার কৌতুহলবশে জিজ্ঞাসা করলাম,ছোট্ট মেয়েটি কি তোমার ভাগ্নি? ভীষন মিষ্টি ও স্মার্ট কি সুন্দর বসে আছে সব যেন পরখ করে দেখছে।

এবার নন্দু বলে ওঠে না দাদা ও আমার মেয়ে।

---মানে! বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম নন্দুর দিকে।নন্দু হেসে বলে উঠে আসলে নন্দিতা উইডো।দুবছর আগে ওর স্বামী কার এক্সিডেন্টে মারা যায় তখন বাচ্চাটা এক বছর।

--কি বলব,বুঝে উঠতে পারছিলাম না।তাহলে কি নন্দিতা তোমার অফিস কলিগ ?

     --না আমার অফিস কলিগ নয় আসলে বিয়ে করবো ঠিকই করেছিলাম।পাত্রী দেখাও চলছিলো।একদিন কাগজে বিজ্ঞাপনে দেখলাম নন্দিতার বিয়ের বিজ্ঞাপন তাই দেখে স্থির করলাম সেইমত প্রস্তাব দিলাম মাও বাবাকে বললাম এই মেয়েটিকে দেখো। একে যদি বিয়ে করি যদি ওনারা রাজি থাকে।একথা শুনেই বাবা বললেন,সাবাশ নন্দু সাবাশ।ধন্য আমি তোর বাবা হতে পেরে।

অপার বিস্ময়ে বললাম তোমার মা রাজি হলেন?

---মা বললেন সেতো ভাল নন্দু।তবে আর একবার ভাব।আমি বললাম,না মা আমি ভেবেই সিন্ধান্ত নিয়েছি। ব্যাস যোগাযোগ করো। ব্যাস্ তারপর ওরা রাজি হল  এখন তোমাদের আশির্বাদ এসো মায়ের  সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই বলে মাকে ডাক দিতেই মা এসে বলল বাবা আমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতেই ওর মায়ের পা ছুঁয়ে নমস্কার করতে ইচ্ছে হল।এই প্রথম আমার জীবনে দেখা এক রূপকথার বাইরের এক জগৎ। বিধবা মেয়ের বিয়ে হয় ঠিকই। প্রেম করে বা দেখাশুনা করেও হয় যদি সেখানে কোন প্রচুর দেনা পাওনা থাকে। এখানে তো তা নয় স্বয়ং বাবা মা নিজে দাঁড়িয়ে বিবাহ উৎসব করছে এমন আনন্দে। অথচ কোন দেনা পাওনা নেই। দরকারও নেই নন্দুর বাবা একজন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার।অগাধ সম্পত্তি গ্রামের বাড়িতে।সেই সব ছাপিয়ে যেন আরও অনেক অনেক বেশী ধনী মনে হল ওর বাবা মাকে। 

  নন্দু বলে ওঠে চল এবার বসে পড় তোমরাতো ফিরে যাবে আবার। তোমার লাষ্ট ট্রেনতো  ধরিয়ে দিতে হবে।  এছাড়া এর পর ভীড় হয়ে যাবে কারন প্রচুর আমন্ত্রিত আছে।

        বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম নন্দুর দিকে।খাওয়া চলার মাঝে বারবার ওর বাবা মা এসে দেখে গেল ঠিকঠাক সব পরিবেশন হচ্ছে কিনা।কি লাগবে দেবার জন্য তদবির করতে লাগলেন।    

তারপর  খাওয়া শেষ হতেই  বিদায় পর্বে পুনরায় নন্দুকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়ে বাইকে উঠে বসলাম। সারারাস্তা আমাদের কোন কথা হল না শুধু মাঝেমাঝে দেবী সরস্বতীর মুখটা নন্দুর মায়ের মতো লাগছিল।

       



    


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন