শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গীর্বাণী চক্রবর্তী।। পারক গল্পপত্র



বেলোয়ারি ঝাড়বাতির আলো বিশাল নাচঘরের প্রতিটা কোনায় চুইয়ে পড়ছে। মোতিবাঈয়ের চুনী পান্না মুক্তাখচিত ঘাগরায় তখন নাচের লহরীতে তুফান। সদ্য ভেট পাওয়া বিদেশী সুরার আমেজে ঘরের এককোনে বসে থাকা ঈশ্বরীপুরের রাজা রণজয় সিংয়ের চোখের পাতা প্রায় বুঁজে আসে। কিন্তু চোখ বুঁজে বসে থাকলে তো চলবে না। মোতিবাঈয়ের প্রতিটা বিভঙ্গ দেখতে চায় রণজয় সিং। মাঝেমাঝে সভাসদদের চিৎকারে মদিরার চটক ভেঙে গেলেও আবারও রণজয় সিং মোতিবাঈয়ের রূপের আগুনে ডুব দেয়। 

                                                                           

রাত্রির মধ্যযাম কখন যে পেরিয়ে গেছে কেউ তার খবর রাখে না। রাজপ্রাসাদের বাইরে আলোগুলো প্রায় নিভু নিভু। নাচঘরের পাশে দোতলার ঘরের জানলা ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি। তার ঘরের আলো কখনই নিভে গেছে। অন্ধকার ঘরে মোতিবাঈয়ের ঘুঙুরের আওয়াজ শুনতে শুনতে এই প্রাসাদের রাণীমা চন্দ্রাবতীর বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। কত কত রাত যে চন্দ্রাবতীর দীর্ঘশ্বাস শুনে সকাল হয়ে যায় তার হিসাবও কেউ রাখে না। চন্দ্রাবতী নামেই এই প্রাসাদের রাণীমা। আসলে নিজেকে তার নজরবন্দী অপরাধী ছাড়া কিছুই মনে হয় না। 

                                                                   

গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে। গোড়া সাহেবদের অত্যাচার চরমে। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরি করা রাজস্ব আদায়কারী ইজারাদাররা এক একটা যেন নরপিশাচ। রাজা উপাধিধারী এই নরপিশাচগুলোর অন্যতম ঈশ্বরীপুরের রাজা রণজয় সিং। প্রায় প্রত্যেকদিনই ঈশ্বরীপুরের রাজপ্রাসাদে রণজয় সিংয়ের দরবারের পাশে গুমঘরে ফাঁসী হয় রাজস্ব দিতে না পারা গরীব কৃষকদের। লোহার শিকলের ঘটাংঘটাং আওয়াজ, নিরীহ মানুষদের আর্ত চিৎকার তারপর সুড়ঙ্গ পথে মৃত মানুষটির দেহ চলে যায় ভাগীরথীর অতলতলে।

                  

আশেপাশের শতাধিক গ্রামের মানুষদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। চন্দ্রাবতী বাইরে না গেলেও কানে আসে তার সব খবর। খাস দাসী কমলা সব খবর চন্দ্রাবতীকে দেয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নিরীহ চাষীরা ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে শিবে ডাকাতের হাত ধরে। সে খবরও কমলার কাছ থেকে শুনেছে চন্দ্রাবতী। গ্রামের মানুষের কাছে শিবে ডাকাত সাক্ষাৎ ভগবান। মানুষটা যে কখন কোথায় থাকবে, কখন কোন জমিদারের কাছারি বাড়ি লুঠ করবে তা স্বয়ং ঈশ্বরও জানেন না। কমলার কাছ থেকে শিবে ডাকাতের গল্প শুনে শুনে চন্দ্রাবতীর বড় ইচ্ছে করে একবার শিবে ডাকাতকে দেখতে। ওই নামটা শুনলেই চন্দ্রাবতীর মনের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি খেলা করে যায়।  

                                                                             

(২)                                                                 

গথিক স্থাপত্যে তৈরি কারুকার্যময় রাজপ্রাসাদকে তখন স্পর্শ করেছে সকালের নরম আলো। চন্দ্রাবতীর একদম গা ঘেঁষে এসে কমলা ফিসফিস করে বলে, খবর শুনেছেন রাণীমা? আজ ভোরে শিবে ডাকাত ধরা পড়েছে।

                   

নিজের অজান্তেই চন্দ্রাবতী চমকে ওঠে। কমলার হাতটা ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, তুই সত্যি বলছিস? এখন কি হবে?

                                       

আর কি হবে।সবার ক্ষেত্রে যা হয় তাই হবে। কিছুক্ষণ পড়েই রাজাবাবু বিচারে বসবেন। তারপর ফাঁসীর সাজা।

                               

না…….. প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে চন্দ্রাবতী। নিজের কন্ঠস্বর নিজের কানেই বাজে। একটা অচেনা মানুষকে নিয়ে এতখানি উতলা হয়ে উঠেছে কেন সে,সেটাই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কমলাও যেন একটু অবাক হয়ে চন্দ্রাবতীর দিকে তাকায়। তারপর ধীরেধীরে বলে, আপনার জানলা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাবে বিচারসভা। এই শুরু হল বলে।

                          

 ত্রস্ত পায়ে চন্দ্রাবতী জানলার কাছে এগিয়ে যায়। পেছনে কমলা। নাচঘরের পাশেই রাজদরবার।চন্দ্রাবতীর ঘর থেকে স্পষ্টই দেখা যায় দরবারের সব কাণ্ডকারখানা। আসলে মহলটা এইরকম ভাবে তৈরি যে প্রায় প্রত্যেকটা ঘরের কোনো না কোনো জানলা থেকে রাজদরবার আর রাজা রণজয় সিং ও তার আসামীকে পরিষ্কার দেখা যায়। বিচারসভা বসলেই চন্দ্রাবতী দরবারের দিকে জানলাটা বন্ধ করে দেয়। নিরীহ প্রজাদের মৃত্যু মিছিল দেখতে ভাল লাগে না আর। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা একেবারেই অন্য। গরীবের ভগবান শিবে ডাকাত ধরা পড়েছে, ভাবতেই পারছে না চন্দ্রাবতী। 

                                        

চন্দ্রাবতীর পেছন থেকে কাঁধে আলতো ছোঁয়া তারপরেই কমলার কন্ঠস্বর, রাণীমা ওই দেখুন শিবে ডাকাতকে ধরে নিয়ে আসছে লেঠেলরা।

                                            

একমুহূর্ত তারপরেই চন্দ্রাবতীর মনে হয় পায়ের তলার সমস্ত মাটি যেন একেবারে সরে গেল। মাথাটাও টলে যায়। তবুও জানলার শিক ধরে অতিকষ্টে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে ঈশ্বরীপুরের রাণীমা। খুব অস্পষ্ট স্বরে চন্দ্রাবতী উচ্চারণ করে, শিবু দাদা এখানে ? 

                                                 

ঈশ্বরীপুর থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে ছবির মতন সাজানো গোছানো চন্দ্রাবতীর গ্রাম নীলকন্ঠপুর। বাবা,মা’র ভীষণ আদরের  চন্দু।  যার সকাল হয় পাখির কলকাকলিতে, বিকাল কাটে শিবু দাদার বাঁশীর সুরে আর রাত নামে মার গল্পে। পদ্ম দিঘীর ঘাটে শিবপদর বাঁশীর সুরে চৌদ্দ বছরের চন্দুর মনে হাজার প্রজাপতি ডানা মেলে ধরে। চন্দুর শিবু দাদা যে কতরকমের গল্প শোনায়। আশেপাশের শতাধিক গ্রাম ইংরেজ সরকার ইজারা দিয়েছে ঈশ্বরীপুরের অত্যাচারী জমিদার রণজয় সিংকে। তার সাথে সাথে রণজয় সিংয়ের নামের আগে রাজা খেতাবও জুড়ে দিয়েছে। রণজয় সিংয়ের শকুনের নজর প্রথম পড়েছে নীলকন্ঠপুর গ্রামের ওপর। শিবু দাদার কাছ থেকে এইসব কথা শুনতে শুনতে চন্দ্রাবতীর মনটা ভার হয়ে ওঠে। শঙ্কিত গলায় বলে, এর থেকে বাঁচার উপায় নেই শিবু দাদা? 

                                       

আছে রে চন্দু আছে। আমাদের একজোট হয়ে লড়াই করতে হবে।আমাদেরই দেশ, আমাদেরই মাটি, আমাদেরই ফসল। সেই ফসল কেড়ে নেবে। না দিতে পারলে বন্দী করবে। ফাঁসী দেবে।এটা বেশী দিন চলতে পারে না।তুই দেখিস এর প্রতিকার হবেই।

                                            

স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি চন্দ্রাবতী নীলকন্ঠপুরে খাজনা অনাদায়ে প্রথম বলি সে নিজে হবে। রণজয় সিংয়ের লোভের লালসায় নীলকন্ঠপুর পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। বন্দী হয় প্রচুর মানুষ। চন্দ্রাবতী জানে না তার বাবা মা বেঁচে আছে না মরে গেছে, চন্দু জানে না তার শিবু দাদা কোথায় হারিয়ে গেছে। শুধু এইটুকু মনে আছে রণজয় সিংয়ের লেঠেল বাহিনী যখন তাকে ধরে নিয়ে আসছিল পেছন থেকে ভেসে আসছিল বাবা মার বুকফাটা আর্তনাদ। তারপর সব অন্ধকার। 

                                              

 এই ঘর,তার মাঝখানে বিশাল পালঙ্ক আর একমাথা সিঁদুর নিয়ে বিমূঢ় চন্দ্রাবতী বসে আছে। সেইদিনই রাজা রণজয় সিং এসেছিল রাতে। লোভী দৃষ্টিতে চন্দ্রাবতীকে একবার দেখে বলেছিল,দাসী করে রাখতে পারতাম তোমাকে কিন্তু তোমার রূপ দেখে মনে হল তুমি দাসী নয় রাণী হওয়ারই যোগ্য।

                                            

চমকে উঠেছিল চন্দ্রাবতী। না কোন কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না তার। চন্দ্রাবতীর বিহ্বল মুখ দেখে ক্রুর হাসি খেলে যায় রণজয় সিংয়ের ওষ্ঠপ্রান্তে।তারপর  সাপের মত হিসহিসিয়ে বলে, ভেবো না রাণী হয়েছ বলে সব অধিকার তোমার আছে। তুমি এই প্রাসাদের বাইরে একপাও বেরুবে না। আর যদি সেই চেষ্টা কর তাহলে…………..।

                       

রণজয় সিংয়ের শক্ত থাবায় চন্দ্রাবতী ছটফট করে উঠেছিল। পরেরদিন বিছানায় পড়ে থাকা ব্যথা জর্জর শরীরটা কমলার সেবাযত্নে একটু একটু করে সেরে ওঠে। কিন্তু তারপরে আর একদিনও রণজয় সিং তার দিকে ঘুরে তাকায়নি।

                       

 রাণীমা শুনলেন। এখন কি হবে? শিবে ডাকাতের ফাঁসী হয়ে গেলে মানুষগুলোকে কে বাঁচাবে? কমলার কথায় চন্দ্রাবতী সম্বিত ফিরে পায়। তারপর ধীরেধীরে বলে, ফাঁসীর হুকুম হয়ে গেল তাই না?

                                                                               

(৩)

মোতিবাঈ প্রসাধন পর্ব শেষ করে জানলার ধারে এসে দাঁড়ায়। এইসময়টা বেশ ভালোই কাটে তার। চাষাভুষোগুলোকে ধরে নিয়ে আসে রাজাজীর লেঠেলরা। তারপর তাদের কান্নাকাটি, কত ক্ষমা টমা চাওয়া। তারপর সব শেষ। মোতিবাঈ কিছুতেই বুঝতে পারে না কি দরকার এই গরীবগুর্বো মানুষগুলোর বিদ্রোহ করার। অসম লড়াই। জানলার ধার ঘেঁষে মোতিবাঈ দাঁড়িয়ে থাকে। একবছর আগে লক্ষ্ণৌ থেকে তাকে বাংলায় নিয়ে আসে রাজাজী। মোতিবাঈয়ের রূপের ছটায় সারা ভারত তখন পাগল।

                                                              

দরবারের গুঞ্জনে মোতিবাঈয়ের চমক ভাঙে। আলতো চোখে দরবারের ওপর নজর বুলাতেই প্রায় ছ'ফুট লম্বা, ধবধবে ফর্সা, অসম্ভব কমনীয় মুখের শিকলে বাঁধা লোকটা হঠাৎ এক ধাক্কায় মোতিবাঈকে নিয়ে যায় একবছর আগের ভোরের ভাগীরথীতে। মোতিবাঈ তখন বজরার ছাদে সঙ্গীত সাধনায় মগ্ন। তখনও সূর্য ওঠেনি। সেদিন সন্ধ্যাতেই মোতিবাঈয়ের পৌঁছানোর কথা ঈশ্বরীপুরে। হটাৎই রে রে আওয়াজে ভীষণ গোলযোগ শুরু হয় বজরায়। কিছু বোঝার আগেই মোতিবাঈ দেখে তার সামনে মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব দর্শন এক দেবদূত। বজরার চারপাশে থম মেরে আছে পাঁশুটে অন্ধকার। তারমাঝে মশালের উজ্জ্বল আলোক বর্তিকার ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে আছে সে। খুব স্পষ্ট, খুব নিকটে। মোতিবাঈ বিহ্বল গলায় জিজ্ঞাসা করে, কে? কে আপনি? 

                        

আমি কে সেটা জানার চেষ্টা বৃথা। আর আপনি কে, কোথায় যাচ্ছেন? তাও আমার জানার দরকার নেই । গমগমে গলায় বলে ওঠে লোকটি।

                                

তবে আপনি কি চান? আমার বজরায় কেন এসেছেন? মোতিবাঈ জোড়ের সাথে কথাগুলো বলতে গিয়ে বুঝতে পাড়ে গলাটা কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।

                                     

এটুকু জেনে রাখুন মায়ের মুক্তির জন্য অর্থ সাহায্য চাই। করবেন? ভরাট গলায় লোকটা বলে ওঠে। 

              

মোতিবাঈ তখন সম্মোহিত। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে, সেরকম অর্থকড়ি কিছু নেই আমার কাছে এখন। মুজরো করে খাই। তবে আমার অলংকারগুলো নিয়ে যান। আমি জানিনা আপনি কে? কিন্তু আপনাকে ভীষণ বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে।

                        

 থমকে যায় লোকটি। আপন মনেই যেন বলে ওঠে, আপনার অলংকার? থাক আজকে আর দিতে হবে না। পরে যদি কোনদিন দেখা হয় তখন……………। কথাগুলো বলেই ঘুরে দাঁড়ায় সে। পরমুহূর্তে সবকিছু শুনশান। ঘোরলাগা চোখে মোতিবাঈ দেখে অস্ফুট ভোরের আলোয় বজরার পাশ থেকে একটা ডিঙি নৌকা আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। আয়তচোখের অপরূপ দর্শন দেবদূতের হঠাৎ আসা হঠাৎ চলে যাওয়া মোতিবাঈয়ের মনে তখন হাজার সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন আছড়ে পড়তে থাকে।



                                                                        

 (৪)

                                                             

পরেরদিন সাতসকালে চন্দ্রাবতীর ঘরে হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকে কমলা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, রাণীমা খবর শুনেছেন? মোতিবাঈকে মধ্যরাতে রাজাবাবুর হুকুমে বন্দী করা হয়েছে।

                                                    

 চন্দ্রাবতীর বিস্ময়ের আর সীমা থাকে না। খুশি হবে না ভয় পাবে বুঝে উঠতে পারেনা সে। আড়ষ্ট গলায় বলে, সে কি রে! কেন?মোতিবাঈয়ের অপরাধ কি? 

                                                       

কাল রাতে রাজাবাবুর কাছ থেকে চাবি চুরি করে কারাগার থেকে শিবে ডাকাতকে বের করতে গিয়েছিল। রক্ষীদের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় কমলা।

                                                    

চন্দ্রাবতী এত অবাক এর আগে কখনও হয়নি। নিজের মনেই বলে ওঠে, মোতিবাঈ শিবুদাদাকে কারাগার থেকে বের করতে গিয়েছিল! কিন্তু কেন?

                                                  

কমলা সবিস্ময়ে চন্দ্রাবতীর দিকে তাকায়। তারপর ধীরেধীরে বলে, শিবে ডাকাতকে আপনি চেনেন রাণীমা! শুনলাম মোতিবাঈও চেনে শিবে ডাকাতকে। সবাই বলাবলি করছে কাল একসাথে মোতিবাঈ আর শিবে ডাকাতকে ফাঁসী দেবে রাজাবাবু।

                                               

 কমলা…….. গাঢ় স্বরে ডেকে ওঠে চন্দ্রাবতী। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে, আমার একটা কাজ করে দিবি? চিরকাল তোর কেনা গোলাম হয়ে থাকব।

                                                 

কমলা জিভ কেটে দু'পা পিছিয়ে আসে। তারপর চন্দ্রাবতীর পায়ের কাছে বসে পড়ে বলে, রাণীমা আপনার সাথে আমি সবসময় আছি। আপনার জন্য প্রাণটাও দিয়ে দিতে পারি। 

                                              

সন্ধ্যা থেকে ঈশ্বরীপুরের রাজপ্রাসাদ প্রদীপের আলোয় সেজে উঠেছে। এই রাজপ্রাসাদের এটাই নিয়ম। যখন কোন বিদ্রোহী সর্দারকে ফাঁসী দেওয়া হয় তার আগেরদিন রাজাবাবু নিজের হাতে কুলদেবীর পুজো দেন। ঢাকঢোল কাঁসর ঘন্টার আওয়াজে রাজপ্রাসাদ গমগম করছে। 

                                                       

রাত্রির মধ্যযাম বেশ কিছুক্ষণ আগে পেরিয়ে গেছে। পুজোর হৈ চৈ এখন আর নেই। রাজাবাবু আর তার রক্ষীরা সবাই পুজোর প্রসাদ খেয়ে ঘুমে অচেতন। রাজকারাগারের তালা ঝনঝন করে খুলে যায়। মশালের আলোয় অবগুণ্ঠনবতী রমনীকে দেখে চমকে ওঠে শিবে ডাকাত আর মোতিবাঈ।

                                                           

শিগগিরি বেরিয়ে আস। কোথায় যাচ্ছ, কেন যাচ্ছ পরে শুনবে। তাড়াতাড়ি কর। অবগুণ্ঠনবতীর দৃঢ় গলার হুকুমে শিবে ডাকাত আর মোতিবাঈ দু'জনেই যন্ত্রচালিতের মত বেরিয়ে আসে কারাগার থেকে। তারপর রাজপ্রাসাদের ভেতরের সুড়ঙ্গপথ ধরে এগিয়ে চলে ওরা। কানে ভেসে আসে জলের কলকল শব্দ। সামনেই ভাগীরথী।

                                           

 শিবুদাদা কেমন আছ? রমনী মূর্তির ঘোমটা খসে পড়েছে। চন্দ্রাবতীর ঠোঁট ছুঁয়ে আছে মৃদু হাসি।

         চন্দু তুই ? শিবুর অবাক করা কন্ঠস্বর মিশে যেতে থাকে ভাগীরথীর কলরবে।

                                                  

 আড়চোখে মোতিবাঈকে একবার দেখে চন্দ্রাবতী বলে, হ্যাঁগো আমিই শিবুদাদা। কালকের মোতিবাঈয়ের অসম্পূর্ণ কাজটা আজকে আমি সম্পূর্ণ করলাম। ঠাকুরের ভোগে ঘুমের আরক মিশিয়ে দিয়েছিলাম কালরাতে। তবে আমি একলা নই, আমার সাথে ছিল কমলা। ওকে আমি দাসী বলে ছোট করব না, আমার বোন ভাবতে পার।

                                    

 মোতিবাঈ একটু এগিয়ে এসে চন্দ্রাবতীর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা গলায় বলে, রাণীমা আপনি কোনদিন রাজাবাবুকে কাছে পাননি আমার জন্যই তো। তারপরেও আমাকে ছাড়িয়ে আনলেন?

                                              

বারে তোমাকে আমি সাহায্য করব না! তুমি আমার শিবুদাদাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে আমার চোখদুটো খুলে দিয়েছ। আর ওই নরপিশাচ রণজয় সিং! তার কথা আজ আর নাইবা বললাম। ঘোর লাগা গলায় বলে  চন্দ্রাবতী। তারপর শিবুর দিকে তাকিয়ে বলে, আর দেরি কর না। তোমাদের জন্য নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। ভয় নেই। নৌকার মাঝি কমলার ভাই, ও তোমাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে।

                                               

কিন্তু চন্দু তোকে ফেলে আমি যাব কি করে? প্রাসাদে গেলে তোর কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছিস। কথাগুলো বলতে বলতে শিবুর গলা ভারভার হয়ে ওঠে।

                                                 

জানি,কালকের সূর্য আমি আর হয়তো দেখতে পারবো না। তবুও আমি তোমাকে বাঁচাতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে পরম প্রাপ্তি। যাও আর দেরি কর না। এটা ঈশ্বরীপুরের রাণীমার হুকুম।

                                                   

পুবের আকাশ হালকা লাল হয়ে এসেছে। ছলছলে চোখে চন্দ্রাবতী দেখে তার শিবুদাদা আর মোতিবাঈকে নিয়ে নৌকা ভাগীরথীর বুকচিরে কোন এক অচিন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেয় ঈশ্বরীপুরের রাণীমা চন্দ্রাবতী। 


                                                                ………. …………………………………

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন