শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।। পারক গল্পপত্র



নতুন সাহেব মানুষটির সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর মনে হয়েছিল মানুষটি ভারী অদ্ভুত, কিন্তু  সেই আলাভোলা, হুল্লোড়বাজ মানুষটির জীবনে যে এত গল্প লুকিয়েছিল তা বহুদিন ব্যক্ত করেননি মালাশ্রীদের কাছে।

অবশ্য করার মতো পরিস্থিতিও ঘটেনি। তাঁকে আমরা জেনেছিলাম শ্যামসাহেব নামে।

মালাশ্রীরা থাকেন ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রায় একশো কুড়ি কিলোমিটার দূরে পিন্দারা নামের একটি অতি দরিদ্র শহরে। কিন্তু জায়গাটা ছবির মতো, তাঁদের বসবাসের বাংলোটাও অসাধারণ। বাংলোর

বারান্দায় বসে থাকলে চোখে পড়বে অনতিদূরে একটি পাহাড়ের বাচ্চা বসে আছে আদুরে ভঙ্গি করে।

সেই বাংলোয় বেশ ক-দিন থাকা যায় দুচোখে এক স্বপ্নের ঘোর নিয়ে। মনে হয় বারান্দায় বসে থাকলেই কেটে যাবে সারাটাদিন। চারদিকে অপার প্রকৃতি এঁকে রেখেছে শুধু ছবি আর ছবি।

প্রাথমিক ঘোর কেটে গেলে ক্রমে চোখ-সওয়া হয়ে যায় গোটা ল্যান্ডস্কেপ। তখন আস্তে আস্তে প্রকৃতি হয়ে যায় পুরোনো, জীবন হয়ে যায় একঘেয়ে। অরিন্দম সান্যাল সকাল আটটার মধ্যে খেয়েদেয়ে

বেরিয়ে যান অফিসে, ফেরেন রাত নটা নাগাদ। ফলে সারাটা দিনের অফুরন্ত সময় কাটানো হয়ে ওঠে মালাশ্রীর পক্ষে দুঃসহ। একমাত্র অবলম্বন তিন বছরের মেয়েটা, দৌরাত্ম্যে সে তেমন দড় না হলেও তাকে সামলাতে হয় চোখে চোখে রেখে। কখনও বারান্দায় হাটতে হাঁটতে চলে যায় ধারের দিকে, কখনও বারান্দার ধারে গিয়ে নিচু হয়ে কিছু কুড়োতে গিয়ে বিপজ্জনকভাবে টাল খায়।

ঠিক এরকম একটি কর্মহীন সন্ধেয় বাড়ি ফেরার সময় মিস্টার সান্যাল সঙ্গে নিয়ে এলেন এক সুবেশ ভদ্রলোককে। কোটপ্যান্টটাই পরা স্মার্টদর্শন যুবক, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, কিন্তু ঠোঁটের কোণে

হাসির রেখা। তাঁকে সোফার আরামে বসিয়ে বললেন, মালাশ্রী, ইনি হচ্ছেন আমাদের সবাইকার শ্যামসাহেব। ব্যাঙ্গালোরে হেড অফিসে পোস্টিং। আজ হঠাৎ এখানে এসেছিলেন কম্পানির কাজে, ওঁকে ধরে নিয়ে এলাম তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব বলে।

ব্যাঙ্গালোর থেকে এতটা দূরে একটি বড়ো কম্পানির বিশাল কম্পাউন্ডে বাস করে এতদিনেও কোনও বাঙালির মুখদর্শন করা হয়নি মালাশ্রীর। কানাড়াভাষার অবোধ্য ভাষণে প্রতিদিন ভূষিত হতে

হয়, বাংলায় কথা বললে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে এখানকার বাসিন্দারা। হঠাৎ একজন বাংলাভাষীর দেখা পেতে রীতিমতো শিহরিত, উল্লসিত মালাশ্রী।  তাঁর মুখে ফুটে উঠল সদ্য-আলাপিতের হাসি।

মালাশ্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শ্যামসাহেব হাসির রেখা বিস্তৃত করে বাড়িয়ে দিলেন শক্তপোক্ত হাত, করমর্দনের সময় বেশ ঝাঁকিয়ে দিলেন হাতটা । বললেন, মিস্টার সান্যাল আমাকে বলেছেন মিসেস সান্যাল একটু হোমসিক, একজন বাঙালিকে দেখলে যারপরনাই খুশি হবেন। ঠিক

বলেছি কি না?

শ্যামসাহেবের কথায় মালাশ্রী খুঁজে পেলেন এক আশ্চর্য আন্তরিকতা। হেসে বললেন, নামে শ্যাম, কিন্তু গায়ের রং এত ফরসা যে, চেহারার সঙ্গে নামের মোটেই মানান নেই।

---- কিন্তু ম্যাডাম, আমার পুরো নামটা এখনও শোনেননি। মিস্টার সান্যাল আমার অফিসের ডাকনামটাই শোনালেন, পুরো নাম হল শেয়ামসুদ্দিন।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও মালাশ্রীর ভ্রূতে বোধহয় ঘনিয়ে এল কোঁচ। হয়তো এরকম বিদঘুটে নাম শোনেননি বলেই। শ্যামসাহেব শুনে যতটা অবাক হয়েছিলেন, তার চেয়েও বেশি বিস্মিত শেয়ামসুদ্দিন শুনে। তাঁর ভুরু তোলা চাউনি দেখে মিস্টার সান্যাল হেসে উঠে বললেন, হ্যাঁ, ওই শ্যাম শব্দটি

শেয়াম উচ্চারণ করেন বলে আমরাও প্রথমদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন এরকমভাবে বলেন নিজের নাম, তাতে উনি শুধু হেসেছিলেন, কোনও উত্তর দেননি।

শ্যামসাহেব নামের মানুষটি হা হা করে হেসে বললেন, প্রত্যেক মানুষের কিছু কিছু বিষয় গোপন থাকাই তো ভালো, তাই না, ম্যাডাম? তাতে সেই মানুষটিকে ঘিরে বেশ একটা রহস্য তৈরি হয়, রহস্য হলে তাকে নিয়ে একটা অন্য আকর্ষণ তৈরি হয়।

মালাশ্রী তখনও বিভ্রান্ত শ্যামসাহেবের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে। কিন্তু প্রথম আলাপেই বেশি কৌতূহল ভালো নয়, মিস্টার সান্যালের সঙ্গে তাঁকে গল্প করতে দিয়ে নিজে কিচেনে ঢুকলেন চায়ের ব্যবস্থাপনায়। চায়ের সঙ্গে কিছু স্ন্যাকসের কথাও ভাবছেন, সেসময় হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখলেন অদূরে দাঁড়িয়ে

শ্যামসাহেব, হাসি-হাসি মুখে বলছেন, ওনলি টি, নো টা কিন্তু।

মালাশ্রী হেসে বললেন, এই নির্বাসন পর্বে বিনা নোটিশে তেমন মুখরোচক টা বানিয়ে দিতে পারব তা আশা করলে মুশকিল। তবে ঘরে পকৌড়া বানানোর সরঞ্জাম আছে। মিনিট দশেক সময় দিলে কয়েকটা টা করে দিতে পারি চট করে।

---- ফাইন। পকৌড়ার নাম শুনলে আর নিজেকে সামলানো যায় না, ম্যাডাম। তথাস্তু, বলে শ্যামসাহেব ফিরে গেলেন সোফাসেটের আশ্রয়ে গা মেলে দিতে।

মিনিট দশেকের মধ্যেই দুটি প্লেটে পকৌড়া ছাপাছাপি করে মালাশ্রী এলেন আড্ডায় যোগ দিতে। শ্যামসাহেব মানুষটি যে ঠিক সাধারণ নয় তা তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেই উপলব্ধি করলেন মালাশ্রী। বাংলা ছেড়ে এসেছেন তা বছর কুড়ি হল যখন তাঁর বয়স বাইশ। প্রথমে একটা বিমা কম্পানির চাকরি নিয়ে চলে এসেছিলেন ব্যাঙ্গালোরে, সেখানে বছর দশেক চাকরি করার পর বহাল হয়েছেন মিস্টার সান্যালদের কম্পানির চাকরিতে। মালাশ্রীর সঙ্গে নিজের গুণপনার পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, ম্যাডাম, আপনার ঘরে ঢুকেই একটা গণেশের মূর্তি দেখে আমি খুব থ্রিল্ড্। কেন না আমার অনেক হবির একটি হল গণেশ জমানো।

----- গণেশ জমানো! মালাশ্রী কিছুটা হতবাক, তবে খুব বিস্মিত হলেন তাও নয়। গণেশ জমানোর হবি কারও কারও থাকে শুনেছিলেন কলকাতায় থাকতে।

---- আমার কাছে একশো বত্রিশ রকম গণেশের মূর্তি আছে, মানে এখনও পর্যন্ত জমাতে পেরেছি। ব্যাঙ্গালোরে আমার ফ্ল্যাটটি খুব বড়ো তা নয়, কিন্তু সেই ফ্ল্যাটের একটা ঘর শুধু গণেশ আর গণেশ।

শেয়ামসুদ্দিন নামটি নিয়ে মালাশ্রী যতবার ভাবছিলেন ততই ঘুরছিলেন এক গোলকধাঁধায়। এরকম ধরনের নাম এর আগে কারও শোনেননি, শোনেননি বলেই বারবার শ্যামসাহেবর মুখের উপর নজর আছড়ে পড়ছিল তাঁর, আর কী যেন খুঁজে বার করার চেষ্টা করছিলেন আনমনে।

---- তবে আপনাদের গণেশ দেখে বেশ ঈর্ষা হচ্ছে আমার। এই গণেশটির চোখদুটো আকারে একটু বড়ো, ফলে মানুষদের মতো তাকাচ্ছে আমাদের দিকে, তাই না?

মালাশ্রী হেসে বললেন, এই মূর্তিটা ব্যাঙ্গালোর থেকেই কেনা। তবে এখন ঠিক মনে করতে পারব না কোন দোকান থেকে কিনেছিলাম!

শ্যামসাহেব হাসলেন মালাশ্রীর কথায়, বললেন, একবার যখন আমার চোখে পড়েছে ঠিকই খুঁজে বার করে নেব এই মূর্তিটা। আমার আরও অনেক হবি আছে, যেমন যিশুর মূর্তি পেলেই কিনে ফেলি। দেশবিদেশের পুতুল জমানো আমার আর একটা নেশা । আর আছে রকমারি পাখি কেনা ও পোষার হবি। গা ঘেঁসাঘেসি করে থাকে এগারো রকম পাখি। টিয়া, ময়নার পাশাপাশি মুনিয়া, বদ্রিকা এরকম আরও কত কি!

চা ও পকৌড়া দ্রুত নিঃশেষিত হতে থাকে প্লেট থেকে। রাতও বাড়তে থাকে দ্রুত লয়ে।

একসময় শ্যামসাহেব উঠে পড়েন সোফা থেকে। তাঁর চমৎকার হাসিটি আরও একবার ভাসিয়ে দিয়ে বললেন, ম্যাডাম, আজ উঠি। কিন্তু সান্যালসাহেব যখন একবার ডেরা চিনিয়ে দিয়েছেন, মাঝেমধ্যে হানা দেব এ কথা নিশ্চিত।

মিস্টার সান্যালই উচ্ছসিত হয়ে বললেন, নিশ্চয়, নিশ্চয়, আপনি আসায় আমাদের ভ্রিয়মান সংসারে হঠাৎ যেন আলোর আবির্ভাব ঘটেছে।

শ্যামসাহেব চলে যাওয়ার পর মালাশ্রীর  মনে যে-প্রশ্নটি উথল দিয়ে উঠছিল, সেটিই তুললেন মিস্টার সান্যালের কাছে, বললেন, শেয়ামসুদ্দিন নামটি যেন কেমন কেমন! আসল নাম কি সামসুদ্দিন?

মিস্টার সান্যালও তেমন নিশ্চিত নন, বললেন, অফিসের রেজিস্টারে লেখা আছে ওভাবেই শ্যামসুদ্দিন, এস এইচ ওয়াই এ এম.... নামটা মুসলিম বলেই আমাদের ভ্রম হয়েছিল, কিন্তু পিতার নাম

লেখা আছে বলরাম সরকার।

---- অদ্ভুত নাম, তার চেয়েও অদ্ভুত তার হবিগুলো। মালাশ্রী বিড়বিড় করলেন কিছুক্ষণ।

শ্যামসাহেব চলে যাওয়ার পর ক-দিন আর যোগাযোগ নেই, হঠাৎ একদিন মিস্টার সান্যাল বাড়ি ফিরে বললেন, বুঝলে, শ্যামসাহেব দিনদুয়েক পরে এখানে আসছে, বলেছে, তোমার যে সারাদিন সময় কাটে না তা উনি বুঝতে পেরেছেন। ওর চিড়িয়াখানায় বদ্রিকাপাখির সংখ্যা বেড়ে গেছে নিদারুণভাবে। তার থেকে দুটো পাখি তোমাকে দেবেন একটা খাঁচায় ভরে। তাদের নিয়ে তোমার সময় কেটে যাবে।

মালাশ্রী কখনও পাখি পোষেননি, পুষবেন বলে ভাবেনওনি। দিনদুয়েক পরে শ্যামসাহেব সত্যিই ছোটো আকারের খাঁচায় ভরে নিয়ে এলেন দুটি সাদা ধবধবে বদ্রিকা পাখি। দেখতে ছোট্ট, নরম

তুলতুলে। খাঁচাটা মালাশ্রীর হাতে দিয়ে বললেন, দুটির একটি মেল, অন্যটা ফিমেল। এরা কিন্তু এখনও ফ্যামিলি প্নানিং শেখেনি। অতিদ্রুত বাচ্চা দেয়। বেশি হয়ে গেলে আপনি কাউকে প্রেজেন্ট করবেন।

শ্যামসাহেব মানুষটা খুবই হুল্লোড়ে, আজ মালাশ্রী অনেক কিছু খাবার বানিয়ে রেখেছিলেন, প্লেটে খাবারের বহর দেখে শ্যামসাহেব বললেন, নিশ্চয় আমার এই শক্তপোক্ত শরীরটা দেখে আমাকে রাক্ষস

ঠাউরেছেন। এত খাবার তো বিড়ালেও ডিঙোতে পারবে না!

হো হো করে হেসে বললেন ঠিকই, কিন্তু গল্পে-গল্পে নিঃশেষ করে ফেললেন ভর্তি প্লেটটা। তারপর প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিজেই লজ্জা পেয়ে বললেন, তা হলে ঠিকই ভেবেছেন আপনি, আমি একটা রাক্ষসই। আমার মিসেস শুনলে আমাকে যা-তা বলবে।

এরকম আরও বার দুই আসার পর একদিন শ্যামসাহেব বললেন, আমার আসাটা একতরফা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু, এবার ম্যাডামকে নিয়ে সান্যালসাহেব  ব্যাঙ্গালোরে না এলেই নয়। আমার মিসেস বারবার আপনাদের গল্প শুনে বলছে, তুমি কেমন মানুষ, হ্যাঁ? ওদের একবার আসতে বলবে না আমাদের বাড়ি?

মিস্টার সান্যাল কিছু বলার আগেই মালাশ্রী বললেন, আমরা যাওয়ার আগে একদিন আপনার মিসেসকে এখানে আনুন। আপনি একা আসছেন, আপনার মিসেসকে একবারও আনছেন না কেন?

শ্যামসাহেব আলতো হেসে বললেন, এইটেই তো মুশকিল। তাঁকে এত দূরে টেনে নিয়ে আসতে পারলে তো বিজয় করে ফেলা যেত। ব্যাঙ্গালোর শহরের কোনও সিনেমাহলেই নিয়ে যাওয়া যায়

না তো এতদূরের পথ!

মালাশ্রী বললেন, আমি যদি আপনার মিসেসকে টেলিফোনে বলি, তা হলে নিশ্চয় আসবেন।

শ্যামসাহেবের আবার হো হো হাসি, বললেন, আপনি এখনই টেলিফোন করুন। দেখুন যদি রাজি করাতে পারেন, তা হলে নিশ্চয় পরের সপ্তাহেই নিয়ে আসব। ওর নাম শবনম।

শবনম নামটা শুনে কেমন-কেমন লাগছিল মালাশ্রীর, কিন্তু শবনম নামটা আজকাল দু-ধর্মের মেয়েরাই ব্যবহার করে। মালাশ্রী সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে ধরলেন তাকে, বললেন, শবনম, আপনি

নিশ্চয় পিন্দারায় কখনও আসেননি? আপনার খুব যদি অসুবিধে না থাকে, তা হলে একবার আমাদের বাংলোয় এসে ঘুরে যান। অতিচমৎকার জায়গা।

ওপাশ থেকে এক অনিচ্ছুক কণ্ঠে  মালাশ্রী শুনলেন, আমার একটু অসুবিধে আছে, ম্যাডাম।

মালাশ্রী অনেক জোর করেও রাজি করাতে পারলেন না শবনম নামের এক অদেখা যুবতীকে ।

শ্যামসাহেব হেসে বললেন, জানতাম রাজি করাতে পারবেন না। চেনা বাড়িতেই যেতে চায় না তো অচেনা মানুষজনের কাছে যেতে ওর আরওই লজ্জা। এখন বলুন আপনারা কবে যাবেন? আপনারা গিয়ে বললে তবে যদি তিনি রাজি হন!

নির্দিষ্ট দিনে মালাশ্রীকে নিয়ে মিস্টার সান্যাল চললেন ব্যাঙ্গালোরে। গাড়িতে গেলেও ঘন্টা আড়াই। অতএব ছুটির দিনে শেষ-দুপুরে বেরিয়েও পৌঁছোতে সন্ধে। আবার এতখানি পথ ফিরতে হবে সেটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে ওঁদের। মালাশ্রীর মনে নানা কৌতূহল।

ব্যাঙ্গালোরের এক প্রান্তিক এলাকায় শ্যামসাহেবদের বাস। চারতলা ফ্ল্যাট বাড়ির দোতলায় মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটটি বেশ সাজানোগোছানো। ঢুকতেই ড্রয়িঙে একটি বিশাল গণেশমূর্তি, ফ্ল্যাটের ভিতরেও এখানে ওখানে টুকটাক দেবদেবীর উপস্থিতি । মালাশ্রী চোখোচোখি করলেন অরিন্দমের সঙ্গে। সোফায় বসতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন শবনম। হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বললেন, আপনারা হয়তো রাগ করেছেন আমি আপনাদের বাংলোয় না-যাওয়ায়। কিন্তু এই মাসটা আমার একটু অসুবিধে আছে বাইরে কোথাও যাওয়ার।

মালাশ্রী লক্ষ করছিলেন তাকে। শবনম অতিআধুনিকা সম্প্রদায়ের বলেই বোধহয় এয়োতির সামান্য চিহ্নটুকুও নেই তার শরীরে। সিঁথির কোনও গোপন কোণেও সিঁদুরবিন্দুটি নেই, হাতদুটোও খালি।

কিছুক্ষণ পরে মালাশ্রী ভাবলেন তিনি বোধহয় দিনদিন খুবই রক্ষণশীল হয়ে পড়ছেন, নইলে একালের এক যুবতীর শরীরে এত আকুল হয়ে এয়োতি চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছেন কেন! বড়ো অংশে শ্যামসাহেবের নানাবিধ হবির প্রদর্শনী । গণেশের মূর্তির প্রদর্শনীটি দেখার মতো। দেখলেন কাটুমকুটুমের আকারে। পুতুলের সংগ্রহটি দেখেও উচ্ছুসিত মালাশ্রী। বললেন, ছেলেবেলার সেই পুতুল খেলার দিনগুলো ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে আবার।

শ্যামসাহেব হা হা করে হেসে বললেন, যাক, আমার প্রচেষ্টা সার্থক হল। আমার হবি যে কাউকে ছেলেবেলার দিন ফিরিয়ে আনল তাতেই আমি খুশি। শবনমও তাই বলে। অবসর সময়ে পুতুলগুলো নাড়াচাড়া করে সময় কাটে ওর।

কথায় কথায় রাত ঘন হয়ে আসে, শ্যামসাহেব একটু পরেই কিচেন থেকে নিয়ে আসেন কিছু আহার্য। সেগুলো সেন্টার টেবিলে রেখে বললেন, শবনমের রান্নার হাতটি খুবই ভালো, কিন্তু আজ যা

আপনাদের দিচ্ছি সবই কিন্তু বাইরে থেকে আনানো।

খাবারের সুগন্ধে মালাশ্রী এতক্ষণ মোহিত হয়ে ভাবছিলেন নিশ্চয় শবনমের নিজের হাতের রান্না। শ্যামসাহেবের কথায় হতাশ হলেন এবার। পরক্ষণে মালাশ্রী এও লক্ষ  করলেন আহার্য যা পরিবেশন করার তা করছেন শ্যামসাহেব নিজেই, শবনম বসে রইল তাঁদের সঙ্গে গল্প করতে। এমনকী

তাঁদের সঙ্গে খাওয়ায় অংশগ্রহণও নয়।

ফেরার পথে মালাশ্রী বললেন, আমার কিন্তু কেমন-কেমন লাগছিল শবনমকে!

----- ঠিক আমাদের মতো নয়!

----- আমাদের মতো নয় মানে!

মালাশ্রী বিষয়টা ঠিক বোঝাতে পারলেন না অরিন্দমকে।

অরিন্দম বললেন, তুমি এনিয়ে বেশি মাথা না ঘামালেই পারো। সব মানুষ তো একরকম হয় না। ধরেই নাও শবনম একটু অন্য ধরনের।মালাশ্রীর তাতে আপত্তির কিছু নেই, কিন্তু তিনি কিছুতেই অরিন্দমকে বোঝাতে পারছেন না মেয়েদের চোখে সাধারণ নিয়মের এমন কিছু ব্যত্যয় ধরা পড়ে যা পুরুষেরা বুঝতে পারে না।

শ্যামসাহেবের অনেকদিন কোনও খবর নেই আর। মালাশ্রী কিছুদিন বিষয়টা নিজের মনে তোলাপাড় করে একসময় মাটি চাপা দিয়ে দিলেন যেমন আরও বহু বিষয়ে দিতে হয়। কিন্তু মাস তিনেক পরে হঠাৎ একদিন সন্ধের পর শ্যামসাহেবের আগমন, তেমনই হই হই হাসি, বললেন, ম্যাডাম, কেমন দেখলেন আমাদের ফ্ল্যাট?

মালাশ্রী উচ্ছ্বসিত শ্যামসাহেবের হবির প্রদর্শনী দেখে। কতবার করে বললেন গণেশের সংগ্রহের কথা । পাখিদের কথা। কিন্তু মেয়েলি কৌতূহল অতি বিষম বস্তু। হঠাৎ বলে বসলেন, কিন্তু আমার মনে

একটা খটকা লাগল আপনাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে। সব আছে, কিন্তু কোথাও একটা ব্যতিক্রমী বিষয় আছে যা আমি ঠিক উদ্ধার করতে পারিনি সেদিন।

শ্যামসাহেব বিষয়টি পলকে বুঝে ফেলে আরও হো হো করে হেসে বললেন, ঠিকই ধরেছেন, ম্যাডাম। আমি কিন্তু প্রথমদিনই বলেছি আমার নাম শেয়ামসুদ্দিন, তখন থেকেই নিশ্চয় আপনাদের কানে একটা খটকা ধরা পড়েছে। কিন্ত আমি ইচ্ছে করেই নামের রহস্য খুলে বলিনি। তা হলে বিষয়টা বলাই যাক।

সেদিন সন্ধেয় শ্যামসাহেব যে-গল্পটি শোনালেন তা সান্যাল-দম্পতির কাছে যেমনই আশ্চর্যের, তেমনই অদ্ভুত। শ্যামসাহেব ব্যাঙ্গালোরে এসে চাকরি জুটিয়ে ফেলার পর থাকতেন একটি প্রাইভেট মেসে। ব্যাচেলর মানুষ, তেমন চালচুলো নেই, পিছুটান নেই, কাটছিল বেশ তোফা। হঠাৎ তিনি যে বাড়ির মেসে বাস করছিলেন সেই বাড়ির একটি মেয়ের নজরে পড়ে গেলেন এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে।

এক মুসলমান বিত্তবানের বিশাল তিনতলা বাড়ি, তারই একতলায় গোটা চারেক ঘরে মেসবাড়ি হিসেবে ভাড়া দিয়েছিলেন সালমার বাবা। চারটে ঘরে থাকতেন আটজন পুরুষ, তার মধ্যে বেশিরভাগই ব্যাচেলর, দুতিনজন বিবাহিতও বাস করতেন যারা দেশের বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা রেখে আসতে বাধ্য হতেন। কট্টর মুসলমান পরিবারের মেয়ে সালমার সঙ্গে তাঁর প্রেম হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না কেন না সালমা কলেজে যাতায়াত করত নিজস্ব গাড়িতে চড়ে। সকালে সিঁড়ি বেয়ে নেমে সোজা গাড়িতে চড়ে কলেজে, আবার নির্দিষ্ট সময়ের পর গাড়িতে চড়েই বাড়ি ফিরে আসা। মেসবাড়ির ঘর থেকে সেই পরমাসুন্দরী মেয়েটির সঙ্গে চোখোচোখি হওয়ারও কোনও সুযোগ ছিল না তেমন। তাকে দূর থেকে দেখে কারও কারও যে দীর্ঘশ্বাস পড়ত না তা নয়, কিন্তু ওই পর্যন্তই। তাঁর মনে বিষয়টি তেমন রেখাপাত করেনি কেন না তিনি ছিলেন নিতান্তই মধবিত্ত ঘরের ছেলে, উচ্চবিত্ত এক মুসলমান তরুণীর প্রেমে পড়ার কোনও ইচ্ছেই জাগেনি কখনও।

হঠাৎ এক অদ্ভুত ঘটনার জেরে তাঁর জীবনের অভিমুখটাই গেল বদলে। অফিসের পর একদিন বাইকে চড়ে ঘরে ফিরছেন, হঠাৎ দেখলেন বাড়ি থেকে অনেকখানি পথ দূরে একটি দামি গাড়ি পড়ে আছে রাস্তার মাঝখানে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সালমা, মুখে প্রবল উৎ্কন্ঠা। সালমাকে দেখেই চিনতে পেরে দাঁড় করালেন বাইকটি, কাছে গিয়ে বললেন, গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে?

সালমা তাঁকে ঠিক চিনতে পারল না বোধহয়, নিঃশব্দে মাথা নেড়ে তাঁর দিকে তাকায় সন্দেহজনক দৃষ্টিতে। সালমার দৃষ্টি পড়ে পেলে তিনি বললেন, আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না,আমি আপনাদের বাড়ির একতলার মেসে থাকি আজ বছর দুই হল।

এটুকু বলার সঙ্গে সঙ্গে সালমার মুখের চেহারা বদলে গেল, তখুনি প্রকাশ করে ফেলল তার উদবিগ্নতা। বলল, দেখুন না, হঠাৎ কী একটা পার্টস ভেঙে গেছে, গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পার্টস কিনতে হবে, সেই সঙ্গে একজন মেকানিক নিয়ে আসি” বলে সেই যে ড্রাইভার চলে গেছে প্রায় একঘন্টা হতে চলল, তার দেখা নেই। এদিকে গাড়ি ফেলে আমি যেতেও পারছিনে, আবার এরকম নির্জন  জায়গায় আমার একা দাঁড়িয়ে থাকা খুব রিস্কি। 

শ্যামসাহেব তাকে বললেন, ড্রাইভার আসা পর্যন্ত আমি এখানে বাইক নিয়ে তোমার সঙ্গে অপেক্ষা করতে পারি। অথবা আমি গাড়ি পাহারা দিচ্ছি, তুমি কোনও ট্যাক্সি বা অন্য কোনওভাবে বাড়ি চলে যেতে পারো।

সালমা দ্বিতীয় পন্থাটাই বেছে নিল কেন না একটু পরেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল সেখানে। এরপর প্রেমপর্বের শুরু অনেকটা হিন্দি ছায়াছবির কায়দাতেই। লুকিয়েচুরিয়ে দেখা হত দুজনের, কেন

না গোঁড়া মুসলিম পরিবারের মেয়ের পক্ষে  এক বঙ্গসন্তান শ্যামলাল সরকারকে বিয়ে করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মেয়েরা যখন ভালোবাসে, অগ্রপশ্চাত বিবেচনা করে না, তার চাপে তার বাবাকে রাজি হতেই হল, কিন্তু অনেকগুলো কঠিন শর্তে । তার মধ্যে একটি শর্ত আমাকে ধর্মান্তরিত হতে হবে।

তারপর যা হয়, দুপক্ষের টানাপোড়েনের ইতিহাস অতিদীর্ঘ, সে সব কথা বিস্তৃত বলতে গেলে আজ আমার ব্যাঙ্গালোর ফেরা হবে না। অনেক দরাদরির পর আমি মেনে নিলাম আমার নাম শ্যামলালের

পরিবর্তে লেখা হবে শেয়ামসুদ্দিন। কিন্তু  আমিও সালমার নাম বদলে রাখলাম শবনম। ঠিক হল আমরা দুজনে যার যার ধর্ম পালন করব, তাতে অপরজন নাক গলাবে না।

তারপর যেমন চলছে দেখে এলেন নিজের চোখে । শবনমের এখন রোজা চলছে যার ফলে সে আপনাদের ঠিকমতো আপ্যায়ণ করতে পারেনি সেদিন। কিন্তু বাকি কর্তব্য ঠিকঠিক পালন করার চেষ্টা করেছে সেদিন। বলে আর একবার সেই পরিচিত হাসি উপহার দিয়ে বললেন, এবার নিশ্চয় রহস্য খোলসা করতে পেরেছি, ম্যাডাম।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন