শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কৃষ্ণেন্দু পালিত।। পারক গল্পপত্র



             গোবিন্দ বোস জানে সে অযোগ্য মানুষ। কোনরকমে স্কুল ফাইনাল পাশ করার পর দূর সম্পর্কের এক মামার দয়ায় পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে। এই যোগ্যতা নিয়ে আজকাল কোন চাকরিতেই উন্নতি করা যায় না। আবার “না” বলে কিছু হয় না। কাকে কোথায় কখন ধরতে হয় সে জানে। মোসাহেবি খুব বড় ধরনের আর্ট, ওটা সবাই পারে না। আনুগত্য প্রকাশের ভাষাটা সে খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছে। আর করেছে বলেই সামান্য কনেষ্টবল হয়ে ঢুকে আজ একটা তারার মালিক। যখন যাকে বড়বাবু হিসাবে পেয়েছে তাকেই অকাতরে তেল দিয়েছে। এখন যেমন হেমন্ত সরকারকে দিচ্ছে। সবসময় হেমন্তবাবুর লেজ হয়ে আছে। দিনের মধ্যে যতবার দেখা হয় ততবার স্যালুট করে। সহকর্মীদের কে কোথায় কী করছে, কে কী বলছে সব ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কানে তোলে। উপযাচক হয়ে ফাইফরমাশ খেতে দেয়। এসব নিয়ে সহকর্মীরা পেছনে হাসাহাসি করে, কেউ কেউ মুখের উপর দু কথা শোনায়, গোবিন্দ বোস গায়ে মাখে না। লজ্জা ঘৃনা ভয় তিন থাকতে নয়। অনেক চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত তাঁর আচরণে কেউ প্রভাব ফেলতে পারেনি। 

     কেবল কালকের ঘটনাটা যা একটু অন্যরকম। ওটাকে অ্যাকসিডেন্ট বলা যায়। 

     সন্ধ্যার দিকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাজারে বেরিয়েছিলেন বড়বাবু হেমন্ত সরকার। কোয়াটার থেকে বাজারের দূরত্ব বেশ খানিকটা। তবু হেঁটেই যাচ্ছিলেন। ওদিকে উন্নয়নের জন্যে রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। কিছু দূর অন্তর অন্তর দেড় মানুষ সমান গর্ত। আর লোডশেডিংটা তখনই হতে হল। হেমন্ত সরকারের মনে পড়ল তিনি টর্চ নিয়ে বেরন নি। এসব ছোটখাটো ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে গেলে থানার বড়বাবুর চলে না। তিনিও গুরুত্ব দিলেন না। যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাঁটছিলেন। আর এই আত্মবিশ্বাসই তাঁর পতনের কারণ হল। অন্ধকারে ঠাওর করতে পারেননি, গর্তের কোনায় পা পড়তেই পা হড়কে গেল। গোবিন্দ বোস তখন রুটিন টহল দিয়ে ফিরছিল। গাড়ির হেড লাইটের আলোয় দূর থেকে দেখল কেউ একজন গর্তের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে এসে তাকে উদ্ধার করে এবং দেখে বড়বাবু হেমন্ত সরকার। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। 

     এক্সরে করার পর বোঝা যায় ডান পায়ে ফ্রাকচার হয়েছে। 

#

     একটু আগে প্লাস্টার করে বেডে দেওয়া হয়েছে হেমন্ত সরকারকে। বিছানায় শুয়ে তিনি যত না যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তার চেয়েও বেশি গাল দিচ্ছেন গোবিন্দ বোসকে। সেই সাথে শাসাচ্ছেন, হারামজাদাটারে এবার যমের দখিন দুয়োরে ট্রান্সফার  করব।

     যে উদ্ধার করল তাকেই গাল! আবার সাজা দিতে চাইছেন! থানার বাকি পুলিশেরা বিস্মিত। রহস্য তো কিছু একটা আছেই। কিন্তু কাকে জিঙ্গাসা করলে পাওয়া যাবে? ঘটনার সাক্ষী তিনজন মাত্র। তাদের মধ্যে একজন বড়বাবু। তাকে জিঙ্গাসা করার সাহস কারও নেই। দ্বিতীয়জন গাড়ির ড্রাইভার। আজ সকালেই সে এক সপ্তাহের ছুটিতে মাসির মেয়ের বিয়েতে গেছে। বাকি থাকল গোবিন্দ বোস। কাল সন্ধ্যা থেকে সে অপরাধীর মতো মুখ গোমড়া করে ঘুরছে। বড়বাবু সম্পর্কে কিছু জিঞ্জাসা করলেই সেখান থেকে সটকে পড়ছে। হাভভাব দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, বড়বাবুর এই অবস্থার জন্যে সেই দায়ী। 

     রহস্য যত ঘোরালো হচ্ছে, কৌতূহল তত বাড়ছে। অথচ কৌতূহল মেটানোর কেউ নেই। সবাই যখন হতাশ হয়ে একরকম হাল ছেড়ে দিতে বসেছে, হাবিলদার হরিপদ বলল, বসন্তকে ধরলে কাজ হতে পারে।

     -হোমগার্ড বসন্ত? 

     -হ্যাঁ। বসন্ত লোকাল মানুষ। গোবিন্দ বোস পরিবার নিয়ে তার বাড়িতে ভাড়া থাকে। শুনেছি বসন্তর বউয়ের সাথে গোবিন্দদার বউয়ের ভালো সম্পর্ক। বসন্তর বউকে গোয়েন্দা হিসাবে লাগালে কাজ হতে পারে। 

     বসন্তকে ধরা হল। এক কথায় রাজি হল সে। এ ধরনের দায়িত্ব পেয়ে খুশিই হল। 

     চব্বিশ ঘণ্টাও লাগল না। পরদিন সকাল সকাল পুলিশ ব্যারাকে এসে হাজির, মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। ব্যারাকে তখন কেউ দাড়ি কামাচ্ছে, কেউ তেল মাখছে, কেউ জামাকাপড় কাচছে। সবাই ব্যস্ত। তবু বসন্তকে দেখে সমস্ত কাজ ফেলে সবাই উঠে এল। সবার একটাই জিঞ্জাসা, কিছু জানা গেল?

     -গেল মানে, দায়িত্ব যখন নিয়েছি...

     -তাড়াতাড়ি বল। 

     -বলছি। আগে একটু হেসে নিই। শোনা অবধি পেটের মধ্যে গুরগুর করছে। কিছুতেই হাসি সামলাতে পারছি না। 

     বসন্ত হাসতে শুরু করল।

     অন্যরা বিরক্ত হয়, এত হাসির কী হল! 

     বসন্ত হাসতে হাসতে বলে, শুনলে তোমরাও হাসি সামলাতে পারবা না।

     -সে তখন দেখা যাবে। আগে বল তো কী হয়েছে।

     বলছি শোন, বসন্ত আরও একচোট হেসে নিয়ে বলল, একবার নয় একবার নয়, দু-দু বারের চেষ্টায় বড়বাবুকে গর্ত থেকে তুলেছে গোবিন্দদা। 

     -প্রথমবার কী হাত ফসকে গিয়েছিল?

     -তা একরকম বলতে পারো। তেল দেওয়ার একটা লিমিট থাকে, বেশি হলে হাত স্লিপ তো করবেই। আর তাতেই বড়বাবুর পা ভেঙেছে। 

     -পরিষ্কার করে বল। 

     -সে ভারি মজার ব্যাপার। মনে পড়লে...এই দেখ, আবার হাসি পাচ্ছে। 

     -হাসবি পরে, আগে বলেনে...

     -গোবিন্দদা গাড়ির হেড লাইটের আলোয় দেখেছিল একজন গর্তের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে মুখ চিনতে পারেনি। ভেবেছিল কোন মাতালটাতাল হবে। কাছে এসে লোকটাকে তোলার জন্যে গর্তের মুখে হাত বাড়িয়ে বলেছিল, হাতটা ধর। উঠে আয় হতচ্ছাড়া। বড়বাবু হাত ধরে ওঠার চেষ্টা করতেই গাল দিতে শুরু করল, বাপরে কী ভার! কে রে তুই, মোষের বাচ্চা নাকি? আজ এমন প্যাঁদাব জীবনেও মদ খাবিনে। 

     বড়বাবু উত্তর না দিয়ে উঠে আসার চেষ্টা করেন। একেবারে গর্তের মুখে যখন উঠে এসেছেন, মজা করে বললেন, বাঁচালি গোবিন্দ। তবে কিনা একটু বেশিই গালাগাল দিলি।...ব্যাস, বড়বাবু আবার গর্তে। প্রথমবারে তেমন কিছু হয়নি, কিন্তু দ্বিতীয়বারে পা ভেঙে গেল।

     -পড়ল কেন? গোবিন্দদা হাত ছেড়ে দিয়েছিল নাকি?

     -তবে আর বলছি কী!

     -হাতটা ছাড়ল কেন? ভয়ে? 

     -ভয়ে নয়,অভ্যাসে। অতি ভক্তি দেখাতে গিয়ে। তারপর আবার হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতে বলল,  হাত ছেড়ে সটান উঠে দাঁড়িয়েছিল গোবিন্দদা। তারপর বড়বাবুকে দেখলে যা করে, লম্বা একখানা স্যালুট...  


২টি মন্তব্য: