রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

দীপক কুমার মাইতি।। পারক গল্পপত্র



তখনও সূর্য ওঠেনি। সবে রাতের আঁধার সরছে। পুব দিক ফর্সা হচ্ছে। দিনমণির আগমন বার্তা সূচিত হয়েছে। ধান মাঠের আলে সুবল একাকী দাঁড়িয়ে। প্রকৃতির অপরৃপ শোভা দেখছে সুবল। চারিদিকে সবুজ ধানের গাছ। মৃদু বাতাসে দুলছে। তার মনে হয়, কতগুলো যুবতী মনের আনন্দে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। একে অপরের গায়ে লুটিয়ে পড়ছে। সুবল দেখে ধানগাছের উপর হালকা সাদা কুয়াশার আবরণ। সুবল ভাবে, প্রকৃতি-মা সযত্নে তার মেয়েদের গায়ে সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছেন। প্রথম শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে চান তার মেয়েদের। সুবল লক্ষ করে পুব আকাশ লাল করে সবে সূর্য উঁকি মারছে। সন্তানের শিরে জননীর স্নেহ চুম্বনের মতো সূর্যের প্রথম আলো এসে স্পর্শ করল সুললিত সবুজ ধান গাছের মাথায়। ধানগাছের মাথায় জমে থাকা শিশির বিন্দু সেই আলোকে হীরকদ্যুতি ছড়াতে লাগলো। সুবলের মনে হল, যুবতীর মাথার হীরক খচিত মুকুট ঝলমল করে উঠেছে। সবে ধানগাছে ফুল এসেছে। ধানগাছ এখন পোয়াতি। তাই প্রকৃতি-মা তাদের আগলে রেখেছে। আজ আশ্বিন মাসের শেষ দিন। আজ তো ডাক সাঁকরাত বা নলপোঁতা সংক্রান্তি। আজ পোয়াতি ধানগাছকে সাধ দেওয়ার দিন। সেই ভোররাতে চাষিরা মাঠে এসেছে নল পুঁততে। সুবলও এসেছে নল পুঁততে। সূর্য ওঠার আগেই নিজের প্রত্যেক জমিতে সে নল পুঁতেছে। পুঁততে পুঁততে বলে উঠেছে,  “অন সরসা কাকুড় লাড়ি , /যা রে পোক ধানকে ছাড়ি।”

কোথাও বলছে, “ এইরে আছে ওল, /বুডে়া মহাদেব কি বোল, /এইরে আছে শুকতা /ধান ফলবে গজমুক্তা। /এইরে আছেঝোটপাট - / সব পোকার মাথা কাট। /হরি-ই বো-ল , হরি-ই-ই বো-ও-ল। ”

     অনেকে এসেছিল। যে যার মাঠে নল পুঁতেছে। পরে আতপ চাল, ফল, মিষ্টি আর তালশাঁসকে এক সঙে মিশিয়ে মাঠের আলে রেখেছে। ফুলধরা সবুজ ধানগাছকে এই সব নিবেদন করা হয়েছে। পোকার উপদ্রব কমার জন্য ও ধানের ফলন যাতে ভালো হয় তারই কামনা করেছে সকলে মা লক্ষ্মীর কাছে। পুজো শেষে সবাই ফিরে গেছে। সুবল এখনও ফিরে যায়নি। প্রকৃতির শোভা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার জন্য থেকে গেছে। ধানগাছে ফুল এসেছে। মৃদু হিমেল বাতাসে ছড়িয়ে পডে়ছে ধান-ফুলের সুবাস। ছোটবেলায় আজকের দিনে সুবল তার বাবার সাথে আসতো। ওর বাবা ধান-ফুলের সুবাস নিয়ে বলতে পারতেন সে বছর কোন ধান কেমন ফলবে। সুবল পারে না। তবুও মাতাল করা ধান-ফুলের সুবাস নিতে থাকে। এই সুগন্ধ সুবলের মনে মাদকতার সৃষ্টি করে। কিন্তু আজ সে হতাশ। কিছুতেই সে সেই সুগন্ধ পাচ্ছে না। আজ দুদিন তাকে ঘিরে রেখেছে অন্য আর একটি সুগন্ধ। সেই সুগন্ধ যেন পণ করেছে অন্য কোন সুগন্ধকে সুবলের নাকে ঢুকতে দেবে না। এই সুগন্ধ সে প্রথম পেয়েছিল টগরের শরীর থেকে।       

টগর সুবলের বউ। এক বছরের মধ্যে প্রথমে বাবা ও পরে মা চলে যান। সুবল তখন সংসারে একেবারে একা। মামারা বুঝিয়ে শীতল পিঁড়িতে টগরের সাথে সুবলের বিয়ে দিয়ে দেয়। সে সব প্রায় সাত বছর আগের কথা। ওরা খুব সুখী। কিন্তু একটাই দুঃখ, আজও তাদের সংসার কচি কচি পায়ের দুষ্টুমি ভরা দাপাদাপি বা আধোআধো বোলের কলতান থেকে বঞ্চিত। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। দুজনের নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। সমস্ত ডাক্তারবাবু বলেছেন,আপনারা দুজনেই শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। সন্তান ধারণেও সক্ষম। তবুও সন্তান না আসার কারণ অজানা। চিকিৎসা শাস্ত্রানুসারে একে ইডিয়োপ্যাথি বলে। সময় হলেই হবে। চিন্তা করবেন না।

সুবল মেনে নিয়েছে। টগর পারেনি। ফলে সন্তান কামনায় তার নানা দেবতার থানে যাওয়া ও হাতে-কোমরে মাদুলির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাসের অধিকাংশ দিন হয় উপোস করে বা নিরামিস খায়। বিয়ের পর থেকে টগর বিশেষ এক ধরনের তেল মাথায় মাখে। তেলের সুগন্ধ তার খুব চেনা। চোখ বন্ধ করে থাকলেও ঘরে টগরের উপস্থিতি টের পায়।

 সংক্রান্তির আগেরদিন অনেক কিছু জোগাড় করতে হয়। প্রায় সব কিছু বাড়ির পিছনের বাগানে বা পুকুর পাডে় পাওয়া যায়। কিন্তু সংগ্রহ করতে বেশ সময় লাগে। সুবল ও টগর দুজনে বেরিয়ে পডে়। কেঁউ, অন্ সরষা, কাকুড় লাড়ি(শশাগাছের লতা) সহজে পেয়ে যায়। পুকুর পাডে় মাটি খুঁডে় বের করে ওল ও আদা। পাট ও ঝোট পাতাও সংগ্রহ করে। বেলগাছ থেকে বেল ও বেলপাতা পাড়ে। সব গুছিয়ে রাখে একটি নতুন ঝুড়িতে। পুকুর থেকে শালুক ফুল তুলে নেয়। পাড়ের এক জায়গায় নলগাছের জঙ্গল থেকে শক্ত কিছু নল কাণ্ড তোলে ওরা। কয়েকটি কলাপাতাও কাটে। সব সংগ্রহ হলে, টগর ঝুড়ি মাথায় ও সুবল নলকাণ্ড, বেলডাল, বোয়ালপাতা ও কলাপাতা মাথায় নিয়ে দুজনে গল্প করতে করতে পাশাপাশি হাঁটছিল। তখনই নতুন সুগন্ধ পায় সুবল। ও ভেবেছিল কোন বনফুলের গন্ধ। তাই থমকে দাঁড়িয়ে গন্ধের উৎস খোঁজে। পরে বুঝতে পারে টগরের শরীর থেকেই এই সুগন্ধ আসছে। ওকে দাঁড়াতে দেখে টগর বলে, কী হইলা? দাঁড়িইল কেনে? কিছু কী বাকি রইলা?

     সুবল বলে, তুমি লুয়া তেল কিনছ ?

   - কাই নাতো ! গেল মাসে তুমি যেটা আনি দিথিল সউটা অখনও শেষ হয়নি।

 সুবল থমকে যায়। তবে এই সুগন্ধ কোথা থেকে আসছে? টগর তাকে কখনও মিথ্যে কথা বলে না। তবে কী দূরে কোন ফুল ফুটেছে? তার সুবাস আসছে? টগর থেকে একটু এগিয়ে গেলে সুগন্ধ আর পায় না। কিন্তু টগরের কাছে এলে পায়। সুগন্ধের মাদকতা তাকে আচ্ছন্ন করে। সুগন্ধের উ ৎস কী ? ভাবতে থাকে সুবল। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে। বুঝতে পারে না। কথা না বাড়িয়ে দুজনে বাড়ি ফিরে আসে।

সন্ধ্যের সময় সংক্রান্তির পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়। টগর শিলনোড়া নিয়ে কেঁউ, কাঁচা তেঁতুল,অনসরিসা, কাকুড়লাড়ি, পাট-পাতা ও ঝোট-পাতা একসাথে বাটতে থাকে। সুবল নলকাঠি, বোয়ালপাতা ও কলাপাতা পুকুর থেকে পরিষ্কার করে আনে। উঠোনে খডে়র গাদার কাছে কলাপাতা সাজিয়ে রাখে। তার উপর নলকাঠি গুণে রাখে। তার প্রত্যেক জমির আলের ঈশান কোনে একটা করে নল পুঁততে হবে। টগর সব কিছুর মণ্ড নিয়ে এলে বোয়াল পাতায় সেগুলি মুডে় পুটলি তৈরি করে। মণ্ডসহ প্রিতটি বোয়াল পাতারপাতা পুটলি প্রত্যেক নলকাঠির ডগায় গেঁথে দেয়। পরপর কলাপাতায় সাজিয়ে রাখে। টগর প্রদীপ জ্বেলে সামনে রাখে। এবার শালুক ফুল ও বেলপাতা দিয়ে নল পূজা শুরু হয়। সুবল সর করে মন্ত্র পডে় বলে,  “ এথরে আছে ওল , /বুডে়া মহাদেব কি হরিবোল, /এথরে আছে নীল আদা , /ধান ফলবু গাদা গাদা। /এথরে আছে কেঁউ , /ধান ফলবে বেঁউন বেঁউন  /এথরে আছে খুদ মালিকা /উথরে আছে ওল,মহাদেবের ধ্যান করে বলরে হরি-হরি বোল“

 টগর ওর পাশে বসে শাঁখ বাজাচ্ছিল। সুবল তেলে সিঁদুর মেশায়। প্রত্যেক নলের গায়ে তেল-সিঁদুরের টিপ দেয়। তারপরে টগরের সিঁথিতেও সিঁদুর দেয়। ঠিক তখনই সেই সুগন্ধ আবার পায় সুবল। অবাক দৃষ্টিতে সুবল টগরের দিকে তাকিয়ে থাকে। টগর লজ্জা পেয়ে বলে, অমন হ্যাঁ করি কি দেখোট? মোর লাজ লাগেনি?

সুবল চোখ নামিয়ে মা লক্ষ্মীর উদ্দেশে প্রণাম করে। টগর প্রদীপ ঘুরিয়ে আরতি করে। শেষে গড় হয়ে প্রণাম করে দুজনে ঘরে ফিরে আসে।

 রাতে পাশাপাশি দুজনে বিছানায়। কিছুক্ষণের মধ্যে টগর ঘুমিয়ে পডে়। কিন্তু ঘুম নেই সুবলের চোখে। টগরের দিকে মুখ ফেরালেই সুগন্ধ তার নাকে লাগে। এই সুগন্ধের মাদকতায় মাতাল সুবল টগরকে আদর করতে যায়। সুগন্ধের উৎস যে টগরের শরীর বুঝতে অসুবিধা হয় না সুবলের। ভাবে টগর তাকে মিথ্যে বলল কেন? রাগে টগরের দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে শোয়। বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। আবার টগরের দিকে পাশ ফিরে শোয়। নিষ্পাপ ঘুমন্ত টগরকে দেখে সন্দেহ ভুলে যায়। আলগোছে টগরের চুল নিজের নাকের কাছে আনে। সেই পরিচিত তেলের সুগন্ধ। তার কিনে দেওয়া তেলের গন্ধ। টগরকে সন্দেহ করার জন্য সুবলের অনুশোচনা হয়। টগরকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে যায়। আবার তার নাকে লাগে সেই সুগন্ধ। নিশ্চিত হয় গন্ধের উৎস টগরের শরীর। সুবল ভাবে , তবে কী টগর কোন সেন্ট মেখেছে? কিন্তু পেল কোথায় ? ওকে চমক দেবে বলে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনেছে? সাত পাঁচ ভাবতে থাকে সুবল।

             

 

– কি গো, ভোর হইতে যায় মাঠকে যাবনি? গাঁয়ের সবু লোক তো চালি গেলা।

 ঘুম ভাঙ্গে সুবলের। সুবল উঠে পডে়। নল নিয়ে বেরিয়ে পডে় মাঠের উদ্দেশে। নল পুঁতে মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে সুবল। কিন্তু নতুন সুগন্ধ যেন তার পিছু ছাডে় না। এক নতুন সুগন্ধের সাগরে যেন সে ডুবে আছে। মনটা চঞ্চল হয় সুবলের। কীভাবে সুগন্ধের রহস্য ভেদ করবে ভাবতে থাকে। সুবল খেয়াল করে বেলা হয়ে গেছে। আজ মাঠ থেকে ডাক-জল না নিয়ে গেলে সংসারে কোন কাজ শুরু করা যাবে না। ঘটিতে করে মাঠ থেকে জল তুলে নেয়। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে। ঘরের চালে, চারিদিকে ও খড় গাদায় ঘটির ডাক-জল ছিটিয়ে দেয়। টগর বেরিয়ে আসে। ওর মাথায়ও ডাক-জল ছিটিয়ে দেয়। টগর ওর হাতে কাঁচা হলুদ ও কচি নিমপাতা দেয়। গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করে। সুবল হলুদ ও নিমপাতা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। টগর বলে, গেড়িয়ায়(পুকুর) এক পাটা জাল ফেল না গো। তাই নে আর অত বেলা তোমাকে বাজার ছুটতে হবেনি। মুই কটা নরম সজনাপাতা পাড়ি আনি। তাই নে মোর বি সাত শাক ভাজা উঁড়ানো( জোগাড় করা) হই যাবে।

সাত শাক ভাজা, বেগুন ভাজা, ওল-ভাতে, ওলের তরকারি ও মাছের টক দিয়ে দুপুরে সুবলের ভর পেট খাওয়া হয়। দুপুরে সুবলের ঝিমুনি আসে। কাজ সেরে টগর এলে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে পডে়। টগর আদুরে গলায় সুবলকে বলে, আজ তো ধান গাছকে সাধ দিল। মোকে সাধ দিব তো? সাধে কিন্তু ভালা জিনিস চাই মোর। বাজারনু বডে়া মাছ আনতে হবে।

 – ভগবান সে সুখ কবে দিবে কে জানে? তোর সাধ দেওয়ার সময় হউ। তুই যা চাইবু সবু দিবা।

টগর সুবলকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলে, ভগবান মোর মানত শুনছন গো। তোমার দুঃখ শেষ হবে গো। আগুর বছর তুমি বি গেরামের সবু লোকের মতন ছড়া কাটি মোকে কইব,   “রাত পুইনে সাঁকরাত গো খুকুর মা, /কি করটো গো খুকুর মা? /আশ্বিন ঘুরি গেলা ,/ তক্তোপোশে শাক বাছটো ওউ বিকালবেলা? / ওগো কাল যে ডাক সাঁকরাত কাঠি পুতার বেলা। / বোয়ালপাতা কাই পাবা /শাক উঁড়ইতে দিন গেলা।“

 চমকে ওঠে সুবল। মনে পডে় বাবার কথা। এই রকম এক সংক্রান্তির দিন মাঠে দুজনে দাঁড়িয়ে। ধানফুলের গন্ধে বিভোর বাপ-বেটা। সুবল বলে, বাপ , ওউ সময় মাঠে অত সুন্দর সুবাস ছড়ায় কেনে গো?

 - বাপ রে, এ যে পোয়াতির সুবাস। সব সুবাসের সেরা এ সুবাস। ধানগাছ পোয়াতি হইছে। তার সুবাস। তোর মার পেটে তুই যউদিন আইলু, তার গা নু এক লুতন সুবাস মুই পাইথিলি। তুই বি পাবু বাপ। যউদিন তুই বাপ হবু। তোর বউ-র শরীর নু পাবু। এ এক মাতাল করা সুবাস রে বাপ! সবু সুবাসের চাইনু একদম অলদা ও সোঁদর। ভগবানের লীলার সুবাস রে বাপ।

বাবার কথাগুলো মনে পড়তেই আনন্দে আত্মহারা হয় সুবল। দুহাতের শক্ত বাঁধনে টগরকে জড়িয়ে ধরে। টগরের শরীরে মুখ ডুবিয়ে ঐশ্বরিক সুগন্ধে সুবল মাতাল হতে থাকে।


1 টি মন্তব্য:

  1. Asadharan. Bibhuti Bhusan er pare ei soda matir Sugandha peye Pathak hisebe atyanta paritripta. Erakam aro lekha chai.Ebong Dipak baburi khamata achhe sei lekhar.Ajasra dhanyvad.

    উত্তরমুছুন