শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

রাজেশ ধর।। পারক গল্পপত্র



অশোক , আমাদের গলির ছেলে। প্রায় সমবয়সী আমরা। তো! সেই অশোকের বউ মারা গেল। একেবারে জলজ্যান্ত বউটা। বয়স কত হবে পঁয়তিরিশ, ছত্তিরিশ হবে। আমাদের গলি শুধু না, পুরো পাড়াতেই ব্যাপক সহানুভূতির ঝড় চলল। সেদিন সন্ধ্যাবেলায়, আমাদের বাড়িতে অদ্ভূত কান্ড! সিরিয়াল, সিনেমা, খবর …কিছুই চলল না! টিভি…বন্ধ! আরো আশ্চর্য! বসার ঘরে আমার মা, বৌ একসাথে বসেছিল। আমার ক্লাস এইটে পড়া মেয়েকে মাধ্যম করে দুজনেই যৌথ শোক পালন করছিল! অথচ, এর আগে দুজনের মুখেই ঐ বউ-এর কোন প্রশংসা শুনি নি, তার বদলে…থাক সে কথা!

                        আমি ছাদে চলে গিয়েছিলাম। অশোকদের বাড়ির সামনে সেই গাড়িটা…স্বর্গরথ। সাত আটজন ধরাধরি করে অশোকের বউ-এর দেহ নিয়ে এনে গাড়িতে রাখল। অশোকের ছোট্ট মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় বসে পড়েছিল। ভাবলেশহীন অশোক মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে এগিয়েছিল শ্মশানের দিকে।

 

  দিন চার-পাঁচ পরে অফিসটাইমে অটোর লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। ও এম-এইট্টিটা চালিয়ে ফিরছিল। দুধের ক্রেটগুলো সব ফাঁকা। একটু অবাক হয়েছিলাম। এর মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হল! আবার বাস্তবটাও তো ঠিক! পেট তো কথা শোনে না! কী মনে হল! লাইনে দাঁড়িয়েই অশোককে ডাকলাম।

 

                    কারুর একটা ফাঁকা প্লট পড়েছিল। সেখানেই অশোকরা বাড়ি করে এসেছিল। তখন আমার বছর বারো বয়স। এই জবরদখল উদ্বাস্তু-কলোনি তখনও জংলা, বাগান আর ডোবায় ভরা। সামনের বাইপাস, মেট্রো-রেল কেউ ভাবতেই পারত না!সেটা আমাদের কিশোর বয়স। চকচকে লাল-নীল জামাপ্যান্ট পড়ত ও। আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু রাস্তায় চোখাচখি হলে ও হাসত। কখনওসখনও আমাদের সাথে ব্যাট-বলও খেলেছে। ও ‘লেটু’ মানে বাঁ-হাতি ছিল। দারুন ফিল্ডিং করত।  কিন্তু কেন যেন আমরা ‘বন্ধু’ হলাম না। পাড়াতেও ঠিক তাই। পাশের বাড়ির নারকেল পড়লে ওরা বেমালুম হজম না করে ডেকে দিয়ে দিত। তবুও কারুর সাথেই বাটিভর্তি তরকারি দেওয়ানেওয়া হল না ওদের।  কেউ ওদের নেমন্তন্ন করত না। ওর বাবা পোর্টে চাকরি করত। ঝকঝকে নীল সাইকেল চালিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অফিস যেত। ওর মাকে বাইরে দেখাই যেত না। কখনও বেরোলে রিক্সায় যেত-আসত।

                         তারপর কবে যেন সব পালটে গেল। বাবা, একদিন মাকে বলছিল, ইউনিয়ানের গন্ডগোলে ওর বাবার চাকরি চলে গেছে!… চাকরি গেছে তো কী হয়েছে, আর একটা কাজ পাওয়াই যায়…এসবই ভাবতাম! কয়েক বছরের মধ্যে অশোকের বাবা মারা গেল! তারপর কখন যে অশোক ‘দুধআলা অশোক’ হয়ে গেল সেটাও জানতে পারিনি।              

                    তো…দুধওলা অশোক দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি একটু এগিয়ে গেলাম। সেই ভাবলেশহীন চোখমুখ। একবার ভাবলাম ওর পিঠে কি হাত রাখব! না, বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। গলা একটু খাঁকারি দিয়ে নিলাম;

‘কেমন আছিস?’

ও সেই দৃষ্টিতেই তাকিয়ে বলল;

‘এই তো!’

কথা আসছিল না…তবুও;

 ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

‘হাসপাতালে?’

‘হাসপাতালে…কেন?’

‘মা, ভর্তি।’

‘কাকিমা, হাসপাতালে ভর্তি? এ বাবা…এর মধ্যে? অ্যাম্বুলেন্স কখন এল? ’

অশোক গাড়ি স্টার্ট দিল;

‘ মা, তো এখানে থাকত না। পেয়ারাবাগানে ছোটমামার বাড়ির কাছে  ভাড়া থাকত। ওরাই ভর্তি করেছে রাতে।  ভোরবেলাতেই ফোন করেছিল। কিন্তু কী করে যাব তখন, দুধ না দিলে আজকের রোজগার হবে না আবার মালটাও নষ্ট! দুদিকেই ক্ষতি! …এই এখন যাচ্ছি! চলি রে…’

ওর পিঠটা হারিয়ে যাচ্ছিল চোখের সামনে থেকে। আমার বুকের মধ্যে একটা চাপ ব্যাথা হচ্ছিল। বৌ জমিয়ে রান্না করেছে। ভরপেট খেয়েছি। অ্যাসিডিটি হয়ে গেছে। ঢেকুর তোলার চেষ্টা করছিলাম। একটা অচেনা লোক অশোকের মেয়েটাকে কোলে নিয়ে এসে লাইনে দাঁড়াল। হয়ত হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। তখনই আচমকা আমার মনে হল…আরে! আজকাল এত অল্পবয়সে কারুর বৌ মরে না। কী হবে অশোকের, ওর সংসারটার…এ, তো দারুন প্লট! একটা গল্প লিখলে কেমন হয়! যদিও প্লটের ওপর গল্প লিখলে ইন্টেলকচুয়াল-কলকে টানা যায় না! তবুও…ওদিকে বেশ কয়েকটা ছোট কাগজ গল্প চাইছে। পয়সাকড়ি দেবে না। কিন্তু গল্পকার পরিচিতিটা তো ওরাই বাঁচিয়ে রাখে। ওকে…দেখাই যাক। এটা নিয়েই একটা গল্প লেখা যাবেখন। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।

                        বিকেলে বাড়ি এসেই দেখি মা-এর ঘরে আলো নেভানো। চুপ করে শুয়ে আছে ভর সন্ধেবেলায়। গিন্নি জানাল, অশোকের মা দুপুরে মারা গেছে। ওখান থেকেই ওরা শ্মশানে নিয়ে গেছে…

 

                                                                                          (২)

  ছেলের বৌটার মরার খবর দিয়েছিল ছোটভাই। আমার কোন ফোন নেই। ফোন থাকলেও মনে হয় চালাতে পারতাম না। স্কুলেই তো যাইনি! আর ফোন কেনার বা পয়সাই বা কই? এক বাড়িতে রান্না করি। সেই পয়সার পুরোটাই চলে যায়, এই বেড়া আর টালির ঘরটার ভাড়া দিতে। কাজের বাড়ি থেকেই দুবেলার খাওয়া দেয়। তাতেই চলছে। আর বাকি, খরচ, ওষুধপত্তর! সেসব তো কিছুই হচ্ছে না! তবু বেঁচে আছি! মাস তিনেক ধরে পেচ্ছাপ হয় না ঠিকমত! পা ফুলে যাচ্ছে, খেতে ইচ্ছা করে না, কখনও আবার খুব খিদে পায়, চোখে অন্ধকার দেখি, চারিদিক ঘুরতে থাকে…বুঝি, আর মনে হয় হল না! অবিশ্যি…অশোককে এসব বলিনি। বৌটা তো চিরটাকাল রোগে ভুগে জ্বালিয়ে গেল। কীই বা রোজগার করে ছেলে!তাও তো লুকিয়ে লুকিয়ে এটা, ওটা দিয়ে যায়। কখনও হাতে পঞ্চাশ-একশ গুঁজেও দেয়। তাও বুকটা মাঝেমাঝে হায়হায় করে ওঠে। মুখ দেখে কি ছেলে কিছুই বোঝে না !

            সেদিন এল তখন রাত নটা। লাইট নিভিয়ে শুয়েছিলাম। ঘরে ঢুকেই বলল, একি ‘ লাইট জ্বালাওনি কেন? ‘টিভি দেখছ না’ বলার পরেই জিভ কেটে মাথা নীচু করল। হয়ত মনে পড়ে গেছিল এখানে টিভি নেই। ধমকে মানুষ করিনি। তাই চুপ করেই থাকলাম। বিয়ের কিছুদিন পরেও দেখেছি। আমি এভাবে চুপ করে থাকলে বলত---‘মা, রাগ করেছ!’ তারপর জড়িয়ে ধরত।  আজকাল যদি ওর মন যুগিয়ে না বলি বা বেগতিক কিছু বলে ফেলি তাহলে ও চুপ করে যায়। আমার তখন খুব রাগ হয়!

 

         আমার হাতে কুড়িটা টাকা আর এক প্যাকেট দুধ দিয়ে ও চলে গেল।  মনে হয় অনেক দুধ বিক্রি হয়নি, ফ্রিজেও আর জায়গা নেই! খুব ইচ্ছা করছিল, নাতনির কথা জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু বললাম না! ‘মেয়ের কথা’ বলতে গিয়ে ‘মেয়ের বাপ’, চলে যাবে ‘মেয়ের মা’র কত শরীর খারাপ সেই কথায়। ওহ!...ছেলেটার মাথাতে কি কিচ্ছু নেই! একটা মেয়েমানুষ ওর মাথাটাই খেয়ে নিল! আরে আমাদের কী ঐ শরীর খারাপ ছিল না! একদিনও জানিয়েছি মানুষটাকে! প্রত্যেক মাসে পেটের ব্যাথায় মরে যেতাম! সেই সময় এতকিছু ব্যবস্থা ছিল? ঘরের কাপড়-চোপড়েই সব মিটিয়েছি।  ঐ মহারাণীর মত শুয়ে থেকেছি? রান্নাবান্না, বাসন-কোসন, কাচাকুচি সব করেছি। কই আমাদের কিছু হয়েছে? আর ইনি ত এমন মড়াকান্না কাঁদলেন যে নার্সিংহোমে হাজার-হাজার টাকা খরচা হয়ে গেল। কিন্তু বলে না…ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! ঐ ওপরে বসে একজন দেখছে! গুরুদেব দেখছে। শাশুড়িকে তাড়িয়ে ছাড়লি! কী হল, এখন! উল্টোপাল্টা চাকু চালিয়ে এমন রোগ এনে দিল যে…এই বয়সেই ছেলেটার কপাল পুড়ল!

              হে, মা মঙ্গলচন্ডী…কী হবে ছেলেটার? হাত পুড়িয়ে রান্না করবে? নাকি ঐ বাচ্চা মেয়েকে দেখবে? নাকি রোদে, জলে পুড়ে-ভিজে দুধ দেবে লোকের বাড়ি! রাত তিনটেয় উঠে দুধ আনতে যায়। ওদিকে তাগাদা সেরে এসে শুতে শুতে রাত এগারোটা-বারোটা! বাঁচবে তো আমার ছেলেটা! হায় রে…কী করে গেলি, অলক্ষ্মী…সর্বনাশী! তোর মরার দিনও তোর জন্যে একটুও চোখের জল ফেলতে পারলাম না!

                 আচ্ছা কী করি এখন আমি? রাত সাড়েনটা বাজে! আমার তো যাওয়া উচিত! ছেলেটা একা। নাতনিটা নিশ্চই খুব কাঁদছে। না, না , ছেলে একা হবে কেন! ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ত থাকবে! কিন্তু তারাই বা কজন! শালাটা তো নাকি, সেই দুবাই না কী বলে, সেখানে গাড়ি চালায়! বললেই আসতে পারবে? আর শাউড়ি তো মারা গেল বচ্ছরখানেক আগে। একা শ্বশুর, সেও তো রোগে ভুগে ভুগে এক্কেবারে চিমসে মেরে গেছে!একটু হাঁটতে গেলে হাঁপায়! কী কপাল দেখ, মেয়েটা দেখত…সেও তো গেল! তা যাবে না! ভাল মানুষের মন্দ করলে আর কী হবে!

                বিয়ের আগে অশোকের সঙ্গে বাড়িতে আসত! কী ভাল কথাবার্তা, ব্যবহার। সেই মেয়ে; বিয়ের দু-তিনমাস যেতে না যেতেই পালটে গেল…মুখ গোমড়া, মুখ ভার। কথা বলি উত্তর দেয় না। গরীবের সংসারে এমনিতেই কত ঝঞ্ঝাট, সেখানে অমন করলে হয়? চিরটাকাল শাউড়ি-বউ-এর ঝগড়া হবে, হবেই! এটাই তো জগতের নিয়ম!কিন্তু ঝগড়া থামলে বৌকেও মা, বলে কাছে আসতে হবে। শাউড়িকেও নিজের মেয়ের মত দেখতে হবে। আর, আমার তো কোন মেয়েই নেই! একটা মেয়ের জন্য কত লুকিয়ে কেঁদেছি আগে, ভাবতাম ছেলের বৌ হলে তাকেই সব আদর দেব। সেই বৌ কিনা, শেষ পর্যন্ত এমন করল যে… অশোক, সবার সামনে…আমাকে…। হায়, হায়…? তোর মুখে কোন আগুন দিয়েছি রে! ছেলেটাকে দিয়ে এতবড় পাপ করাতে পারলি!

                  পাপের শেষ নেই তোর! মেয়েটাকে মিথ্যে বলে বাপের বাড়ি রেখে দিয়েছিস। তোর বাপ নাকি খরচা করে ওকে পড়াচ্ছে। জানি…সব টাকা দিচ্ছে অশোক, আর নাম কিনছিস তোরা? মেয়েটা এসে আমার কাছছাড়া হয় না। তাই আর বাপের বাড়ি থেকে আনছিসই না! এখন…এখন কী হবে রে! কোথায় থাকল মেয়ে, কোথায় তোর সংসার!কিন্তু মরার পরেও মুক্তি পাবি? ঠাকুর দেবতা করলি না!জপ-তপ-গুরুদেব করলি না! ব্রত-উপোস, তাও করলি না! নে এখন,পেত্নি হয়ে ঘোর! হে গুরুদেব…এই অলুক্ষুনে ভুতনির ছায়া থেকে ছেলেটাকে বাঁচিয়ো! হে বারের ঠাকুর, হে মা শীতলা, …তোমরা দেখ? ছেলেটা এখন শ্মশানে যাবে পোড়াতে! ওখান থেকেই তো পেছনে লাগবে গো!চোদ্দোদিনেও ছাড়বে না। বাড়ির চারিদিকে ঘুরে বেড়াবে! কী হবে? আর যদি আমাকে দেখে! তাহলে তো …! আমি বড় শত্তুর।

 

             কী করব? যাব এখন? গেলে মেয়েটাকে সামলাতে পারি! কিন্তু ছেলে তো খবরও দিল না! কোনভাবে একটা খবর দিতে পারত! তবে…ও ছেলে আর আমার সেই ছেলে নেই! অশোক …তুই কী করে পারলি রে! একবারও মনে থাকল না তোর! তোর বাবা, আমি  কীভাবে তোকে মানুষ করলাম? এতটুকু জল লাগতে দিয়েছি গায়ে? তোর বাবা মরে গেল, তাও তোকে কলেজে পড়িয়েছি…কীভাবে সব ভুলে গেলি? রাতে আমায় না জড়িয়ে ঘুমোতে পারতিস না! আমারও অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরে একদিনও খোঁজ নিয়ে দেখেছিলি, মা সারারাত ঘুমোল না জেগে থাকল! যা, বলেছে ঐ মেয়েছেলে সব শুনেছিস, মেনেছিস! একটাদিনও মায়ের হয়ে একটা কথা বললি না? যেদিন চলে এলাম…একটাবার আটকালি না! কিন্তু আমি কী করি…আমি যে মা, আমাকে যে যেতেই হবে তোর কাছে! কিন্তু পেত্নিটার নজর…। এই যে, শরীরটা খুব খারাপ লাগছে, বুক ধড়ফড় করছে…মাথা ঘোরাচ্ছে! নাহ…হারামজাদি আমাকেও খাবে!

 

…………গল্পটা এভাবেই শুরু করলাম। কিন্তু দাঁড়াচ্ছে না, বুঝতে পারছি। অশোকের ফিলিংসে যেতেই পারছি না! এই স্টাইলটা  নিজের ইচ্ছেমত আমায় টেনে নিচ্ছে। না, না…এভাবে বাড়তে দিলে চলবে না! অন্য রাস্তা দেখতে হবে।

 

                                                                                    (৩)

    শাশুড়ির ঘরে একটা মস্ত বড় লক্ষ্মী ঠকুরের ছবি ছিল। ছবিটা নাকি তিনপুরুষ ধরে পুজো পাচ্ছে। মালক্ষ্মীর  পায়ের কাছে একটা প্যাঁচা।  পোকায় কেটেছিল বলে সেটাকে  ভালমত বোঝা যেত না। কিন্তু চোখদুটো আর কপালটা দেখা যেত। অত পুরনো ছবিতেও খুব ছোট্ট কালির ফোটার মত চোখদুটো দেখলে মনে হত একনজরে তাকিয়ে প্যাঁচাটা সব দেখে ফেলছে। কিছুতেই নজর সরানো যেত না। কেমন গা শিরশির করে উঠত। জয়িতা তাই বিয়ের পর থেকেই রোজের ঠাকুর পুজো করত না। সেটা নিয়ে শাশুড়ির রাগ জানত। কিন্তু ও পারত না…জাস্ট পারত না!                     

                         শাশুড়ি যেদিন চলে গেল সেদিন ওর মারাত্মক পেটে ব্যাথা-বমি। সকাল থেকে উঠতেই পারেনি। বিকেলে কোনমতে উঠে শাশুড়ির ঘরটা ঝাড় দিতে গেল। ভ্যাপসা গন্ধ,সিমেন্টের চটলা ওঠা মেঝে আর পলেস্তারা খসা দেয়ালে বড় বড় সাদাটে নোনার দাগ। জয়তীর গা ছমছম করছিল। মাথার ওপরে সিলিং ছাড়া ভাঙাভাঙা টালির চালা। সেখান থেকে একটা অদ্ভূত খসখস শব্দ এল। তাকাল ও…  ঘুনধরা একটা বাঁশ। তার ওপরে একটা প্যাঁচা বসে আছে। ঘরের আলোটা জ্বেলে ভাল করে দেখল ও। তারপর বুঝল। এটা সেই লক্ষ্মীঠাকুরের ফটোর প্যাঁচা। সেই কপাল, সেই চোখ, সেই ভেতর পর্যন্ত চিরে দেওয়া নজর!কিন্তু প্যাঁচাটা লক্ষ্মীপ্যাঁচা ছিল না। সেটা ছিল হুতুমপ্যাঁচা। অনেকক্ষণ ঘর ঝাড় দিতে না পেরে দাঁড়িয়েছিল জয়তী।

      রাতের তাগাদা থেকে ফিরে আসার পর অশোককে সব  বলল জয়তী। অশোক একবার গিয়ে দেখে আসল। তারপর বলল;

‘ ওর মনে হচ্ছে,যাওয়ার ইচ্ছে নেই। সেই ঠাকুরদার আমলের ছবি। রোজ পুজো পেত!...তবে কোন ক্ষতি করবে না নিশ্চই। তুমি এক কাজ কর, ভয় লাগলে ওর সামনে যেও না। আবার এমন হতেও পারে; দেখ, কয়েকদিন পরে মালক্ষ্মী ডাকলে চলে যাবে!’

 

 

                       কিন্তু প্যাঁচাটা গেল না। ঐ ঘরটাতেই থেকে গেল। ঐ একই জায়গায় বসে থাকত। দিনের বেলায় চোখ বন্ধ করে ঝিমোত। রাতেও ঘর থেকে বেরোত না। কয়েকবার মাঝরাতে গিয়ে আলো জ্বালিয়ে দেখেছে জয়তী, সেই একই জায়গায় ঠায় বসে আছে। তবে জয়তী গেলেই দিন বা রাত… বোজা চোখ খুলে সেটা তাকাত ওর দিকে। ব্যাস জয়তীর বুকে পড়ত একের পর এক হামানদিস্তার বাড়ি।

    

                    মেয়ে, অশোক সবাই জানত প্যাঁচাটা ঐ ঘরেই রয়েছে। কিন্তু তাদের এ নিয়ে কোন মাথা ব্যাথাই ছিল না। মেয়েটা মাঝেমধ্যে গিয়ে চালের খুদ, গম ছড়িয়ে দিয়ে দেখত প্যাঁচাটা খায় কিনা। জয়তী কতবার বলেছে, প্যাঁচা তার ওপরে হুতুম প্যাঁচা রাক্ষুসে পাখি। ইদুর, ব্যাঙ শিকার করে খায়। তার কাছে যাওয়ার দরকার নেই। সুযোগ পেলে হয়ত মানুষের মাংস খাবলে নিতে পারে। এসব কথা শুনে অশোক হো হো করে হেসে উঠত। সেই হাসি শুনে জয়তী আরও রেগে যেত। ওর খুব ইচ্ছে হত প্যাঁচাটাকে মেরে তাড়াতে। কিন্তু কেমন যেন ভয় লাগত। ঠাকুরের প্যাঁচা…নিজের বাবা, মা, মেয়ে, ও নিজে… সবাই রুগ্ন। কী হতে কী হয়! বাপের বাড়িতেও প্যাঁচাটার কথা তুলছিল। বাবা তো  হেসেই উড়িয়ে দিল। কিন্তু মা, সব শুনল তারপর বলল;

‘না, না ঘরের মধ্যে এমন হিংস্র পাখি রাখা যায় না…ইদুরের টোপে বিষ মাখিয়ে খাওয়াতে হবে। ঐসব র‍্যাট কিলারে হবে না। জোগাড় করতে হবে। এখন আবার বনদপ্তরের যা ঝামেলা!’

 

মা সেই বিষ এখনও জোগাড় করতে পারেনি। জয়তীও নিজের থেকে মাকে আর কিছু বলেনি। একটা প্রাণীকে মেরে ফেলা…কিছুতেই মন থেকে সায় দেয়নি। তবে মা, কিন্তু খোঁজ নেয়। প্যাঁচাটা জ্বালাচ্ছে না তো! ও সত্যি কথাটাই বলে। হ্যাঁ সত্যি এটা ঠাকুরেরই প্যাঁচা…সেই যে প্রথমদিন চুপচাপ বসে ছিল সেই থেকে একইরকম। আর সংসারটাও খারাপ চলছে না!

 

 ও অশোককে জিজ্ঞাসা করে;

‘হ্যাঁ গো,  তোমার ব্যাবসা কি আগের থেকে একটু ভালোর দিকে?’

‘কই…না, তো!’

‘তাহলে যে আজকাল, সংসার খরচ নিয়ে খ্যাচখ্যাচ কর না!’

‘আরে সে, তো…একজন মানুষের খরচা কমে গেছে, তাই একটু রিলিফ…’

জয়তী চুপ করে যায়। অন্ধকারে বিছানায় উঠতে গিয়ে নিশ্চই অশোক মশা ঢুকিয়েছে। পুরোনো পাখার হাওয়া মশারি ভেদ করে গায়ে লাগে না। মশাগুলো হঠাৎ হঠাৎ  কানের কাছে প্যা,প্যা করে। খুব গরম লাগে জয়তীর। নীচে নেমে, কলসি থেকে জল খায়। তখনই প্যাঁচার নড়াচড়ার সেই খসখস শব্দটা কানে আসে। আশ্চর্য, ঘরটা তো উঠোনের ওপাশে অথচ কী করে শোনা যাচ্ছে? বিছানায় এসে আবার শোয় জয়তী। ফের জানতে চায়;

‘ মেয়ে বলছিল তুমি নাকি ওকে নিয়ে একদিন ঐ মহিলার কাছে গিয়েছেল, আবার টাকা দিয়ে এসেছ! খরচা তো তাহলে একই আছে!’

‘ সম্বোধনটা ঠিক কর। মহিলা আবার কী? সে তো আমার মা!’

‘এর থেকে ভাল ভাবে আমি বলতে পারব না সে তুমি জান! তাহলে যোগাযোগ ঠিকই আছে!’

‘ সে তোমার ব্যাপার! মা-ছেলের যোগাযোগ থাকবে না?’

‘ হ্যাঁ, সে আর আমার থেকে কে ভালভাবে জানে? তবে সবার সামনে নিজের মাকে…ঐ পাপকাজটা করে আমার বদনাম না করলেও পারতে!’

‘আমার চটকা রাগ আছে…আর সেটা তুমি দারুনভাবে কাজে লাগাতে পার! তবে আবার কিন্তু আমার রাগ হয়ে যাচ্ছে!’

জয়তী চুপ করে যায়।  হঠাৎ করে মাথায় আসে একটা কথা, এতদিন না খেয়ে প্যাঁচাটা কী করে বেঁচে আছে!

 

                        কিন্তু প্যাঁচাটার খোঁজ আর নেওয়া হয় না। জয়তীর পেটে ব্যাথা বাড়তে থাকে। নার্সিংহোমে ভর্তি হতে হয়। কীভাবে সব টাকা জোগাড় করে ওকে সারিয়ে নিয়ে আসে অশোক, তার কিছুই সে জানতে পারে না। বাড়ি ফিরে এসে সারাদিন শুয়ে থাকতে থাকতে কত কথা মাথায় আসে। এক একবার তার মনে হয়… যেসব কথা ভেবে সংসারে এত অশান্তি; শাশুড়ি চলে গেল…। তা যদি সত্যি হয়, তাহলে কি অশোক তাকে এত কষ্ট করে বাঁচিয়ে নিয়ে আসবে? আবার সে ভাবে… ও না থাকলে মেয়েটাকে মানুষ করবে কে? আর অশোক তার মায়ের পরে মেয়েটাকেই সব থেকে বেশি ভালবাসে। হাসপাতালে জয়তীর মাও একই কথা বলেছিল। মাঝমাঝে ওর মনে হয়…এর থেকে মরে গেলেই ভাল হত! এ একটা সংসার? যাকে ভালবেসে বিয়ে করল! যার জন্য বাবা-মার কথা না শুনে নিজের কেরিয়ারটা জলে ফেলে দিল। সেই লোকটাকে কোনদিন চিনতেও পারল না? দুনিয়ায় মা-ছেলে কি আর নেই?

              

                      বেশকিছু দিন কাটল। শরীর থেকে রক্ত বেরোনো থামল। কোনমতে সেদ্ধভাত রাঁধতে শুরু করল জয়তী। সংসারে একটু শ্রী ফুটে উঠছিল।  তারপরেই রোদেপোড়া এক শেষ সকালে প্যাঁচাটা উড়ে এসে ওর সামনে মেঝের ওপর বসল । ও তখন রান্নাঘরের দাওয়ায় বেগুন কুটছিল। প্যাঁচাটা ওর দিকে তাকাল। এতদিনে প্যাঁচাটার ওপরে কেমন একটা টান হয়ে গেছিল ওর!শ্ত্রুতাও তো একটা সম্পর্ক নাকি!কিন্তু সেই ভরা দিনের বেলায় জয়তী বুঝল; প্যাঁচাটা নজর চালিয়ে তার ভেতরটা দেখছে! নিমেষের মধ্যে ও বুকটাকে পাথর করে নিল। হামান্দিস্তার হাজার বাড়িতেও তাকে  ভাঙা যাবে না। প্যাঁচাটা মালক্ষ্মীকে যা বলে বলুক!কিচ্ছু যায় আসে না!

                      ঠাকুর-দেবতারাই মানুষ তৈরি করেছে। তারা জানে না, মানুষ কত নোংরা হতে পারে? বিয়ের পর থেকে কথায় কথায় ওকে শুনতে হয়েছে ‘অলক্ষ্মী, ডাইনি, রোগের ডিপো’ আরও কত কী! কিন্তু ও তো কোন উত্তর দিত না! কিন্তু এক বাচ্চার বাপ, বুড়ো-দামড়া ছেলে সে যদি ঘুম থেকে উঠে তার মাকে জড়িয়ে একঘন্টা বসে থাকে! তার মা যদি দিনের পরদিন শরীর খারাপের নামে ছেলেকে কাছে নিয়ে শোয়…তাহলে  সেই কাজ না করতে বলে কি সে ভুল করেছে? কখনওই না। হ্যাঁ…কায়দা করে ছেলেকে সে সরিয়ে এনেছিল…কিন্তু মহিলা তাতেই উন্মাদ হয়ে যাবে?

                        আপনমনে এইসব ভাবছিল জয়তী। তারমধ্যেই কখন যে সেই প্যাঁচাটা লাফিয়ে এসে ওর বাঁচোখটা ঠুকরে খেতে শুরু করেছে সেটা ও বোঝনি। চিৎকার করে প্যাঁচাটাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল ও। ওর সারা মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। বাড়িতে কেউ নেই। মেয়েটাও নেই। কী করে ও? ব্যাথায় মাথাটা ছিড়ে যাচ্ছে। কিন্তু নাছোড়বান্দা প্যাঁচাটা খেয়েই যাচ্ছে ওর রক্ত, মাংস…হাড়ের মজ্জা…

 

           ধুর, এ কোথায় চলে যাচ্ছি! যা বলতে চেয়েছিলাম। তার ত ধারেকাছে যেতে পারছি না। না, না…এভাবে লিখলেও হবে না। প্যাঁচাটা গোটা গল্পটাকেই খেয়ে নেবে!

 

                                                                                     

                                                                                  (৪)

              অশোক জানত ওর বৌ আর মা , দুজনেরই কেউই কাউকে পছন্দ করে না। সুযোগ যদি পায় তাহলে…। কী করে সেকথা ও জানল? সে তো তাহলে বলতেই হয়! একদিন সকাল ফুরোলে সে হঠাৎ করে বাড়ি আসে। তার খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিল। সে প্রথমে মাকে ডাকল। কোন উত্তর এল না। বুঝল মা নিশ্চই রোজের রুটিনকাজ, প্রতিবেশী কারুর বাড়ি থেকে ফুল তুলতে গিয়ে গল্পে মেতে গেছে। কিন্তু বৌ, কই! কে খেতে দেবে? বৌ-এর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সে  রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল। সেখানে তখন ওর বৌ একটা বটিদাকে শান পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে চকচকে করছিল।  চিৎকার না করে ও বৌ-এর একেবারে পিছনে গিয়ে দেখল সেটা মোটেও বাড়ির  বটি না; একেবারে একটা আনকোরা বটি।

                      আরেকদিন; মার ঘরে ঢুকে ও দেখেছিল, ঠাকুরের আসনের সামনে হাতজোড়, চোখবন্ধ… মা বসে আছে। খুব আস্তে আস্তে বিড়বিড় করছে। ও একটুও আওয়াজ না করে মায়ের পিছনেই বসে পড়ল।  কান পেতে থাকল অনেকক্ষণ তবে ও শুনতে পেল। মা একটা মন্ত্র বলছে;

                                                                  ‘ডাইনি রে তুই উঠে যা, চলে যা, মরে যা

                                                                         না যদি যাস,  পেত্নি  ওরে

                                                                          নিজের মায়ের মাথা খা

                                                                          বাপের খা…খা খা খা।। ’

আমি  উঠে এসেছিলাম। ম জানতেও পারে নি।

 

              তো এইভাবে কী করে চলবে! ওদিকে আমি আবার পাড়ার শান্তি কমিটির সদস্য মানে মেম্বার। তাই একদিন ওদের দুজনকে একটা বড় বস্তায় পুড়ে আমি চললাম। অনেকটা রাস্তা হাঁটলাম। নিশ্চই ওরা প্রথমে বস্তার ভিতরে নিজেদের মধ্যে একটা আলোচনায় বসেছিল। বস্তাটা খুব নড়ছিল। হাটতে অসুবিধা হচ্ছিল আমার। করলাম কী! ধোপারা যেভাবে আগেকার দিনে পাটায় ফেলে কাপড়ে আছাড় দিত সেইভাবে বার কয়েক বস্তাটাকে খোয়াওঠা এবড়োখেবড়ো রাস্তায় দিলাম আছাড়।  কাঠের মসৃণ ঢালু পাটা ছিল না, তাই জুতসই হয়নি ব্যাপারটা। কিন্তু বস্তার ছটফটানি থেমে গেল।

                 আমি আরও অনেকটা গেলাম। আবর্জনা ফেলার একটা ডাম্পিং গ্রাউন্ড এল। বিশাল উচু টিলার মত। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সমতল শহরে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা পাহাড়। কিন্তু কালচে-ছাইছাই রঙের, তার মধ্যে সাদাটে প্লাস্টিকের টুকরো-গুঁড়ো চকচক করছিল। আমি সেই টিলা-ঢিপির বেশ খানিকটা ওপরে উঠলাম। তারপর সেখানে ঝোলার মধ্যে থেকে মাকে বার করলাম। বৌ চেঁচাচ্ছিল…আমার বের করো, আমায় বের করো…দম আটকে মরে যাব। আমি প্রচন্ড জোরে ধমক দিয়ে বললাম;

‘চোপ…ওল্ড লেডিস ফার্স্ট!’

মাকে টিপেটুপে দেখলাম। না…হাড়গোড় বেশি স্থানচ্যুত হয়নি, মোটের ওপর ঠিকই আছে, মা বলে চেনা যাচ্ছে। মাকে বসিয়ে দিলাম জঞ্জালের ওপরেই। আমার নখগুলো বেশ বড়বড়, তাই দিয়ে একটা লম্বাটে গর্ত খুঁড়তে লাগলাম। মা জিজ্ঞাসা করছিল;

‘ওরে কী করছিস…এসব খুঁড়ে কী হবে?’

আমি বলছিলাম;

‘দেখো না কী হয়? দেখো না!’

আমার হাতে শুকনো আবর্জনার স্তর পড়ে গেল। নখের ভেতরে জঞ্জাল জমে আঙুলগুলো আরও লম্বা হয়ে গেল। তারপর আমি মাকে ঐ গর্তে শুইয়ে মাটি চাপা দিয়ে দিলাম। মা  বলল,

‘তাহলে এখানেই আমায় রেখে গেলি। খাবার জল, দিলি না?’

আমি বললাম;

‘একটু পরেই তোমার দমবন্ধ হয়ে যাবে। খিদে তেষ্টা আর কিছুই পাবে না!’

আবার আমি ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। 

 

   

                    তারপর আরও অনেক অনেক হাঁটলাম। কাগজের কাপ, প্লাস্টিকের বোতল ছড়ানো সমুদ্রের তীর –কেন্দ পাতা-মহুয়ার শুকনো জঙ্গল, পিলখানার রক্তমাখা কাদা আর পচা নালার ধারের দেশি মদের ভাটিখানার  ঝিমধরানো গন্ধ পেরিয়ে একসময় বাড়ি ফিরলাম। দেখি মেয়ে বসে আছে আমার জন্য। এখনও খায়নি। আমায় বলল ও;

‘বাবা, যা ধুলো-কাদা-নোংরা মেখেছ উপায় নেই! রাত হলেও চান করে এস, যাও! দেরি কোরো না। বড্ড খিদে পেয়েছে, যাও’

 

আমি স্নান করে এসে খেতে বসলাম। দেখি মেয়ে ভাত বেড়েছে। গরম ঝরঝরা ভাত, পেঁয়াজ দিয়ে মুসুরিরি ডাল, আলুর ভাজা পোস্ত, তেলাপিয়ার গায়েমাখা গায়েমাখা ঝাল, শুকনো কুলের মিস্টি চাটনি। বা রে! সব যে আমার প্রিয় রান্না। জিজ্ঞাসা করলাম ওকে;

‘কবে এত রান্না শিখলি তুই?’

ও একটা কুলের বিচি চুষতে চুষতে বলল;

‘ মাকে , ঠাম্মুকে জিজ্ঞাসা করলাম, ওরা বলে দিল। তাই শুনে শুনে করলাম।’

আমি চোখ বুজে ডালের ঘন অংশটা জিভ আর টাগরায় অনেকক্ষণ ধরে রাখার পর বললাম;

‘ ওরা বলতে পারল?’

‘ হ্যাঁ তো! কোন অসুবিধাই হল না বলতে!’

আমার মাথায় এল মাকে জঞ্জালেই পুতি কি বৌকে…হাতে পায়ে গলায় ইট বেঁধে নিকাশি খালে ফেলে দি…আগে দুজনেরই মুখ ভাল করে কাপড় ঢুকিয়ে তারপর স্টিকিং প্লাস্টার দিয়ে আটকে দেওয়া উচিত ছিল। এইসব ভাবতে ভাবতে খাওয়া হয়ে গেল। মেয়ে রাতে আমার কাছেই শুল।

      

            সেদিন রাতে মেয়েটা ঘুমোতে পারছিল না। শুধু এপাশ ওপাশ ছটফট করছিল। আমি অনেকক্ষণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। তাও ওর ঘুম হল না। আমার খুব রাগ হয়ে গেল! জানতে চাইলাম কেন ও এমন অস্বস্তি করছে, ওর কি মা, ঠাকুমার কথা মনে পড়ছে? ও মাথা নাড়িয়ে বলল তেমন কিছু না। এমনি নাকি ঘুম আসছে না! আমি উঠে আলো জ্বালালাম। বারান্দায় গিয়ে ঝোলাটাকে নিয়ে এলাম। তারপর মেয়েকে ঝোলায় পুড়লাম। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে, দরজায় তালা দিয়ে যেই বেরোতে যাব দেখি উঠোন দিয়ে মা আর আমার বৌ , দুজন; দুজনের থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখেই বারান্দায় উঠে আসছে…

 

ওহ!  না, না এটা একটা অবাধ্য অখাদ্য গল্প! কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না। অশোকের ওপর মায়া করে মা-বৌ-মেয়ে এসব প্লটের ওপর লিখতে গেলাম। কিন্তু…হচ্ছে না! একুশ শতকের দুই-এর দশক এটা। সমাজ, ফ্যামিলি, ইকোনমিক্স সব পালটে গেছে। পালটে গেছে গল্পের স্টাইল, এক্সপেরিমেন্ট…সেইজন্যই মনে হয় গল্পটা এত ডজ করছে। নাহ…বানানো গল্প হয়ে যাচ্ছে। এমন গল্প ছাপলে রেপুটেশান খারাপ হয়ে যাবে। … ফালতু একটা গল্প লিখতে গিয়ে কত সময় নষ্ট করলাম।

 

                                                                                    (৫)

                    বছর পাঁচেক পরের একরাত। নিয়মমত দুপেগে হয়নি। চার পেগ হুইস্কিতেও ঘুম আসছে না।  একটা সিগারেট খেয়ে দেখি! উঠে ব্যালকনিতে এলাম।  আমাদের বাড়িটা এখন ডেভেলপড। মা মরতেই করে ফেলেছি। প্রোমোটারটা ধরাই ছিল। বলেছিলাম;

‘বুড়িটাকে মরতে দিন। ওল্ড ইমোশনাল বাগ…জুজুবুড়ি!’ যাক এমন একটা ফ্ল্যাটে থাকলে বেশ কেমন একটা ফিলিংস হয়! একটা ওয়াগনার বুক করেছি…রেড। সামনের মাসে ডেলিভারি।  

                          সামনে প্রায় হাফ কিলোমটার লম্বা, ফুট চল্লিশেক চওড়া পুকুরটা।  সরকারি খাতায় ১ নং ঝিল। আমাদের ছোটবেলায়  এমন পুকুর অনেক ছিল। আমরা এগুলোকে গঙ্গা বলি। প্রায় সবগুলোই বুজিয়ে ফ্ল্যাট উঠেছে বা উঠে গেছে। শুধু এইটা আর বাজারের কাছে একটা; পৌরসভার কন্ট্র্যাক্টারদের নজরে পড়ে গেছে। আজকাল বছরে বছরে পানা পরিস্কার হচ্ছে, পাড়ে ফুলগাছ লাগানো হচ্ছে। তেলাপিয়া চাষ হচ্ছে।

                এখান থেকে মাত্র ফুট তিরিশেক দূরেই এই গঙ্গার পূর্ব প্রান্ত। ওখানে দুটো বিশাল কৃষ্ণচুড়া আর শিশুগাছ প্রায় পাশাপাশি। একটা মিউনিসিপ্যালিটির জলের কল।  আড্ডা মারার জন্য একটা বাঁশের ফালি-মাচা দীর্ঘকাল ধরেই ছিল। কোন একটা প্রোমোটার সেটাকে পাকা করে একটা বেশ চওড়া বেদি বানিয়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে… ওখানে কে যেন বসে আছে। নেশা কেটে গেছে । একটু নজর করলাম। যদিও মিউনিসিপ্যালিটির কোন ল্যাম্প পোস্ট ওখানে নেই। তবুও যতটুকু আলো এদিক সেদিক থেকে আসছে তাতেই বুঝলাম। গামছা পরে খালি গায়ে বসে আছে অশোক। ঐ বেদির পিছনেই রাস্তার ওপারে ওদের বাড়ি।

                মুখটা দেখা সম্ভব ছিল না। ও নিশ্চই ভোররাতে দুধ আনতে যায়। কিন্তু তার তো অনেক দেরি! তাহলে ও ওভাবে জেগে  বসে আছে কেন! আমার বেশ মাথা যন্ত্রণা হচ্ছিল।  অ্যাসিডিটির রোগটা বাড়ছে। এখন আর ঘুম আসবে না। যাই পুকুর পারেই যাই। একবার দেখাই যাক না!

  

 

                   অশোককে একটা সিগারেট দিয়ে নিজে ধরালাম। প্যাকেটে দুটোই ছিল। খালি প্যাকেটটা ছুড়ে ফেললাম, গঙ্গায়। সেই অশোক এখনও অসাক্ষাতে যাকে আমরা ‘বাইরের লোক’ বলি  সেই আমায় বলল;

‘ পুকুরটাকে নোংরা করিস না রে! এটাই তো শুধু আছে…যদি বুজে যায়! আগুন লাগলে সবাই বোকার মত পুড়ে মরব।’

ভাল করে মনে করলাম।  ওর বৌ মরার কয়েক দিনের মধ্যে অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ ওর সাথে কথা বলেছিলাম। কয়েকদিনের মধ্যে  ওর মা মারা গেল। তখনও আমি ওদের বাড়ি যাইনি।  কথা ঘোরানোর দরকার ছিল। কিন্তু কী নিয়ে কথা বলব আর ও সেকথারই বা উত্তর দেবে কেন! বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থাকলাম। হাতের সিগারেট শেষ হয়ে গেল। তার একটু পরে উঠে দাঁড়ালাম। ঘুরে চলে যাব, অশোক জলের দিকেই তাকিয়ে বলল;

‘ তুই মনে হয়,  নমিতাকে নিয়ে কিছু জানতে চাইছিস না?’

নমিতা! কে…নমিতা? ও হ্যাঁ…মনে পড়ল।  রান্নার কাজ করে। অশোকের বাড়িও রেঁধে দেয়। আমাদের বাড়ি কাজ করে লতিকার সঙ্গে আমার স্ত্রী একদিন অশোক-নমিতা,এসব নিয়ে কী যেন বলছিল! তখন, মুরুকামির একটা অনুবাদ করছিলাম। তাই আর খেয়াল করিনি। আমি আবার বসে পড়লাম। কিন্তু চুপ করেই থাকলাম। ও আবার মুখ খুলল। ঠিক যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে;

‘ হুঁ…কিছুটা ঠিক। ওর বর মরেছে দশ বছর। আর আমারও তো জানিস…তাই  দুয়ে দুয়ে চার হয়েছে কয়েকবার। বাঁচতে গেলে সবই লাগে ভাই। কিন্তু যেভাবে পাড়ায় আলোচনা হয়, তেমন কিছু না রে।’

 

               ইচ্ছে থাকলেও আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না। কিন্তু ও, কত বলিষ্ঠভাবে কথাটা বলল! গল্পে কি এভাবে লিখতে পারতাম? ও আবার চুপ করে গেল। তার অনেকক্ষনপর আমি বললাম। হয়ত এটা না বললেই ভাল হত। আর আমারও এখন আর এসব জানার দরকার নেই। তবুও বলেই ফেললাম;

‘ না আমি বলছি, কাকিমা নেই। তোর বৌ নেই…মনে মনে খুব ভুগিস… না রে!’

ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই কুড়ানোকাঁচানো আলোতেই দেখলাম, ওর চোখদুটো মনে হচ্ছে পাথরবসানো! তারপর পাথরে হাসির ফুলকি দেখলাম। হাসছিল আর বলছিল অশোক;

‘ আচ্ছা, আচ্ছা…তুই তো আবার লিখিস টিখিস। হ্যাঁ কাগজে তোর নাম দেখেছি আমি…না রে, কিছু বুঝতে পারি না রে! দুধের ব্যবসায় খুব চাপ বাড়ছে …তার মধ্যে লোভে পড়ে বাড়িটা এমন প্রোমোটারকে দিলাম, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না…টাকাপয়সাও কিছু দেয়নি। এদিকে একলা মেয়েটাও কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে, আর আগের মত আসে না আমার কাছে, কিছু বলে না…আমারও সুগার বেড়েই যাচ্ছে। এইসব ভাবতে ভাবতে…ওসব কিছুই মনে পড়ে না!’

আরেকবার হেসে উঠেই হঠাৎ চুপ করে গেল অশোক। তারপর আবার আচমকা কৈফিয়ত দিতে শুরু করল;

‘তাহলে কেন এখানে এত রাতে একা বসে আছি, কেন…সেটাই মনে মনে ভাবছিস… তাই তো! এই জল, আমাদের গঙ্গা… এর কাছে চাইছিলাম রে। মেয়েটার বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত যেন বেঁচে থাকি। আমায় যেন বাঁচিয়ে রাখে…কী আশ্চর্য দেখ! হয়ত আর কদিন বাদে একে ছাই ফেলে ফেলে বুজিয়ে মেরে ফেলবে , দেখেও তখন দেখব না…তবুও এর কাছেই চাইছি! এই …’

ফের চুপ করে গেল অশোক।

 

                              আধঘন্টা নাকি এক, বলতে পারব না। কিন্তু কেউ কোন কথা বলিনি। তারপর ঠিক করলাম। এবার চলে যাই। কিন্তু কিছু তো বলে যেতে হয়। তাই গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু না ভেবেই বলে ফেললাম;

‘ভাই, একটা বিয়ে করলে হয় না?’

সেই পাথরের চোখদুটো তাকাল, এবার শুকনো নজর;

‘ পলিটিক্যাল অনার্স পড়েছিলাম দুবছর। বাবা মরে গেল জানিস তো! আর হল না…এস জি স্যার বলতেন। সম্পত্তির যাতে অসংখ্য বাটোয়ারা না হয়, দাসদাসীগুলো যাতে নিজেরই আয়ত্তে থাকে তাই নাকি বিয়ে ব্যাপারটা চালু করেছিল ছেলেরা…তারপর কতদিন কতযুগ চলে গেল জানি না। সিনেমা দেখে, গান শুনে বুঝলাম প্রেম একটা বিরাট কিছু ব্যাপার…পুজোটুজোর মত। কিন্তু প্রেম করতে গেলে প্রেমিকা লাগে, আর সে বলে বিয়ে করো। মাও বলে বিয়ে করো…কিন্তু তার পছন্দে! কিন্তু আমি তো আধুনিক…তাই প্রেমিকাকেই বিয়ে। তারপর…তারপর, মায়ের কাছে বৌ হচ্ছে যম-রুগি, পেত্নি, ডাইনি আর বৌ-এর কাছে মা নাকি ছেলেখাকি। দুজনকে যতই বোঝাও, তারা কিছুতেই বুঝবে না। তুমি জোর করবে? তাহলে তো অত্যাচারী পুরুষ। অতএব চুপ করে থাক।  সীমান্তের উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে একদিন কু-ইঙ্গিতের কথা সহ্য করতে না পেরে বৌকে মারতে আসে মা। তুই থামাতে যাস। মা উন্মত্তের মত আচরণ করতে থাকে। শেষে বটি দিয়ে নিজের গলা কাটতে যায়। বাধ্য হয়ে মার গালে এক চড় মেরে তুই শান্ত করতে যাস। হ্যাঁ…ঠিক তাই। তারপর পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু সারাজীবনের মত তোর নামের সাথে একটা বিশেষণ যোগ হয়ে যায়…মহাপাপী। পরেরদিন মা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়…  এই সিনেমা যে পর্দায় হয়েছে সেখানে আবার বিয়ের ছবি?’

‘কিন্তু এখন তো, তোর মা নেই!’

‘ মেয়ে আছে যে…’

 

                              সঙ্গে সঙ্গেই চলে এসেছিলাম। সেরাতে আর ঘুম আসেনি তবুও চলে এসেছিলাম। ওর সাথে কথা বলতে বলতে গল্পের একটা পরিণতি মাথায় খেলতে শুরু করেছিল সেটাকেও  ওখানেই ফেলে এসেছি। আমার বেডরুমের জানালা দিয়েও পাকা বেদিটা দেখা যায়। ভোররাত পর্যন্ত অশোক ওখানে ঐভাবেই বসেছিল। আমিও ঘুমোতে পারিনি, ভাবছিলাম…যার বন্ধু হতে পারিনি সে এত কৈফিয়ত কেন দিল…কেন!

                

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন