মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

জয়িতা ভট্টাচার্য।। পারক গল্পপত্র

   


   

(সে অনেক বছর আগের কথা)

       বৈঠকখানার ঘরটায় আলো জ্বলে উঠেছে রোজকার মতো ।একজন দুজন করে আসবে ।সাহিত্য আড্ডা গান ।

বাড়িটা কুসুমের ।পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ।মধ্য বয়স দুজনেরই ।গাঁথনি ভালো ।

কুসুমের বয়স বোঝা যায়না ।পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ ।দুটি বড়ো সোফা ,চেয়ার ,নানা ধরনের সাহিত্য পত্র ও বই ।

মিহিরবাবু এসেছেন আজ ।কুসুম আজ সাজেনি ।সাজে না বিশেষ ।আজ এলো খোঁপায় আল্গা জুঁই মালা শুধু। 

আজ দোল পূর্নিমা ।

_"কেমন দোল খেলা হলো মিহিরবাবু ?"

__" নাহ ।আমার কোনো বন্ধু নেই রঙ খেলার "

___" বোলপুর যাননি "

___" হ্যা প্রবোধদা সেখানের রাজবাড়ির লোক ।আমি গেলে খুব খাতির "

__ " তাই নাকি "

__" ওখানে গেলে পাগল হয়ে যাই "

__" তবে থাক গিয়ে কাজ নেই " কুসুম মাথা নীচু করে একটা নতুন ছোটো পত্রিকা ওল্টায় ।

___" তুই দোল খেলিসনি কুসুম ?"

__" নাহ । আপনার প্রাণের বন্ধু তো আছে সে রঙ খেলে না বুঝি"

__"কে"

__." কেন নরেনবাবু ।তিনি তো আপনার প্রাণাধিক প্রিয় বন্ধু "

       বাতায়ন প্রান্তে কুসুম গোধূলির রঙ দেখতে ব্যস্ততা দেখায় ।

আজ ইজাজ আসবে দেরীতে ।মাগরিবের নামাজ সেরে ।মাগরিব অর্থাত পশ্চিমে সূর্য ঢলে পড়ার পর যে নামাজ ।

পশ্চিমাকাশ লাল কমলার ক্যানভাস ।

___" নরেন ।জানি তুই তার কথাই বলবি "

অস্বস্তি আর রুষ্ট মুখে হাল্কা বিষাদ ।

___" তার সময় কোথায় ।তিনি ব্যস্ত মানুষ ।বেরসিক ।চেনেন শুধু অক্ষর "

__" ওরে নরেনের হৃদয় কতো বড়ো জানিস ,কত রোমান্টিক"

___" ছাই জানে ।মোটা মাথা সে ।এতবড়োয় কাজ নেই একটা ছোটো খাটো হৃদয় হলেও চলতো । বোঝেনা কিস্যু অক্ষর ছাড়া "

কুসুম  সংযত হয় ।

মিহির স্মিত হাসে ।ব্যাপার পেকে উঠছে দেখে কথা ঘোরায় ।

__". কী খেলি আজ "

__" ভাত ডাল এঁচোর "

ইজাজ ঢোকে শুভ্র বসনে ।সৌম্য চেহারা ।মুখে দেব ভাব ।

রাতে তার মিলাদ আছে ।মহম্মদের মহিমা সংকির্তন ও প্রসাদ বিতরন ।

সে আশ্রমবাসি তবে সুফি ভক্ত তাই সামাজিক বিধিনিষেধ নেই কোনো ।

কুসুম চা ও নোনতা খাবার নিয়ে ়আসে ।

নরেনের জন্য মনতরঙ্গে ঢেউ ।

নরেন ভুলে যায় সবই ।সে আপন খেয়ালে থাকে ।তবু শিশুর মতোই সরল আর মহা বেকার হয়েও সর্বদা দেশ সেবায় ব্যস্ত ।

কুসুম একটু বিশেষ চোখে দেখে তাকে কিন্তু নরেনের কোনো বিকার নেই ।

      

       বিকেলের এই বৈঠকি আড্ডা কুসুমের খোলা জানালা ।দুপুরের পর থেকেই মন উচাটন হয় ।আজ সে হাল্কা নীল শাড়ি আর গোলাপি জামা পরেছে।এখন আবার সেমিজের চলন এসেছে ।

বিমলবাবু প্রৌঢ় হয়েছেন ।তিনি না এলে সাহিত্যবাসর জমেনা ।আসে অল্পবয়সী জ্যোতিপ্রকাশ ।মুনিয়ারা আপা আর রেহানা দিদি আসে।এই মফস্বলে এখনো সান্ধ্যবাসরে মহিলা পুরুষ মিশ্র সমাগম প্রচলিত নয় ।

তবু গত বছর কয়েকে কুসুমের এই বৈঠক ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে ।সদস্য বাড়ছে ।

আজ তর্ক উঠেছে " মাল্যবান " উপন্যাসটি নিয়ে । জীবনানন্দ যদি এত একাতীত্বে না ভুগতেন ,এত উপেক্ষা ও পারিবারিক অশান্তি না সইতেন কেমন করে লেখা হত কালজয়ী রচনা গুলি ।এ বিষয় সকলেই একমত হতে চান জীবনে যন্ত্রণা না থাকলে ভালো লেখা রচিত হয়না।

কুসুম যাওয়া আসা করে ।এক জায়গায় বসে না । 

___" আমার মনে হয় মাল্যবান কে গড্ডালিকা স্রোতের মতো তাঁর নিজের জীবনের সাথে একাত্ম করে ফেলা ও সমগ্র স্ত্রী জাতির প্রতি নিষ্ঠুরতার তকমা লাগানো ছাড়া এখনো অবধি "মাল্যবানের" সাহিত্যিক মূল্যায়ন হয়নি ।"

স্বভাবত সল্পবাক কুসুম অবশেষে মত প্রকাশ করে ।

___" তাহলে কেন মৃত্যুর পর দীর্ঘ দিন লাবণ্য দাশ বইটি প্রকাশে বাধা দিয়েছিলেন ?" বিমলবাবু  প্রশ্ন করেন ।

___" হয়ত আপনাদের মতো পাঠকের জন্য " মুনিয়ারা ফুট কাটে।

__" তথ্যগুলি তো ভূমেন্দ্র বাবুর বই আর বোন সুচরিতা দাশের গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত ।আপনার নিজের কি অভিমত ইজাজ সাহেব " রেহানাদির হাতে চায়ের কাপ ।

বিশেষ দার্জিলিং চা আনীত হয় এ বাড়িতে অতিথিদের জন্য ।

____" আসলে বলতে চাইছি আমাদের এই লেখক নির্ভর পাঠাভ্যাস কবে পাল্টাবে ।

সাহিত্য গুণাগুণ নিয়ে তেমন মাথা ঘামানো হয়নি।বিশ্লেষণ যতটা হয়েছে ব্যক্তিগত দাম্পত্য সম্পর্কের ততটা হয়নি মাল্যবান উপন্যাসের লেখ্য শৈলীগুলো নিয়ে "

কুসুম আড়চোখে ঘড়িটা দেখে নেয় দরজায় কোনো ছায়া পড়েনা ।

___"মাল্যবানের প্রোটাগনিস্ট কে কাপুরুষোচিত মনে হয়েছে । নারী বোধহয় এতটা ইনট্রোভার্ট আর সাবমিসিভ পুরুষ পছন্দ করেনা  "

চমকে তাকায় কুসুম ।জ্যোতিপ্রকাশের মন্তব্যে যেন ঘরে বাজ পড়ে ।

       "  স্বামী ভালোমানুষ হলে কি স্ত্রী বিশৃঙ্খল হবার স্বাধীনতা পায় "

                  বিমলবাবু উত্তেজিত ।

"সেটা আলাদা প্রসঙ্গ তবে এটাও ঠিক যে আগ্রাসন নারী আশা করে পুরুষের কাছে তা না পাওয়ার বেদনা তাকে ঠেলে দিতে পারে অন্য কোনো বিস্ময়ের দিকে "

              মিহিরবাবু চিরকালই ভেবে চিন্তে দেরীতে মতপ্রকাশ করেন ।

কুসুম লেখিকা ।নামের থেকে দেবী ও দাসী দুটোই বাদ দিয়েছে ।

সে বড়ো একটা প্রকাশ্যে আসে না ।ঘরে থাকাই তার অভ্যেস ।

এখানে যারা আসেন তারা জানেন কুসুমের অতীত জীবন সচেতনভাবে অপ্রাসঙ্গিক ও বর্তমানে তার সাহিত্যজীবনটুকুরই প্রকাশ দেখা যায়।

         

     মাটি থেকে গরম বাষ্প যেমন পুঞ্জিভূত হয়ে মেঘস্তম্ভ সৃষ্টি করে ,কুসুমের সকাল এমন থম থমে আজ ।

নিশ্বাস বন্ধ করে কাজ করে যায় ।

কিছু পড়াশুনো ছিল হোমিওপ্যাথির ওপর ।কিছু ওষুধ এ্যালোপ্যাথ ।অধীত বিদ্যা । পূর্বজন্মের  কৃতকর্ম শেষ করে যখন চলে এলো এ ক্ষুদ্র গঞ্জে একরাতে নিকটস্থ বাড়িতে নিশীথে কান্না শুনে ছুটে গেছিলো ।বছর বারোর বালিকা ।সারাদিন মলত্যাগ করে ঝিমিয়ে পরেছে ।অবস্থাপন্ন চাষীঘর ।সে অনাহূতই ছিলো সেদিন ।তবু নীতিবোধের চেয়ে মানব বোধ তার ইন্দ্রিয় জয় করেছিলো ।

কলকাতা নামে সুদূর শহর থেকে আনা নানা ওষুধ ঘেঁটে পেয়ে যায় প্রার্থিত বড়িটি ।রাত থেকে তিনবার ।করে ।সঙ্গে নুন চিনি জল ।ব্যাধিটি জটিল নয় ।কিন্তু শিকড় গভীরে ।পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে নেই ন্যুনতম ধারনা ।

শিশু পরিচর্যা সম্পর্কে মায়ের কোনো ধারনা নেই ।

চল্লিশ কিমি দূরে  বহরমপুর ।মাঝে নেই কোনো হাসপাতাল ।

দিন মাস বছরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে কুসুম তাদের ভালোয় মন্দয়ে ।

মাঝে মাঝে ওষুধের লিষ্ট পাঠায় হরপ্রসাদ কে দিয়ে ।

কুসুম সকালে ডাক্তার দিদি ।সন্ধ্যায় সে বৈঠকি আড্ডায় মধ্যমণি ।

তেমন বুঝলে সকাল সকাল ভ্যান ভাড়া দিয়ে হাসপাতালে চালান করে ।

সারাসকাল কেটে যায় আজকাল রুগী নিয়ে ।

অপরাধী মনে হয় নিজেকে কুসুমের মহত প্রাণগুলি নিয়ে এরূপ মিছিমিছি খেলা......... হতাশ করে।

মিহিরবাবু বা ইজাজ এ ব্যাপারে উদাসীন ।

মসজিদে গরিবের জন্য আছে দীনজন সেবার ব্যবস্থা ।ছোটো একটি মাদ্রাসা একটি প্রাথমিক পাঠশালা ।

এখানে আকাশ ছোঁয়নি মাটি। নরেনের মতো আছে মানুষেরা ,আছে প্রদোষ বা তৌসিফ ।তারা শ্রেনীসংগ্রামের পক্ষে বা বিপক্ষে মাতিয়ে দেয় কুসুমের বৈঠক ।কুসুম চেয়ে দেখে বাইরে সীমাহীন তিমির রাত । পেঁচা আর ইঁদুরের মুখোমুখি সংঘাত ।

কিছু শিক্ষিত মানুষের বসবাস তবু তারা নিরুপায় সামগ্রিক উন্নয়নে ।

আজ সকালের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে ।

যুবক যুবতী বলা যায় ।ওরা এসেছে ডাক্তার দিদির কাছে ।

ছেলে পিলে হয় না ।ওঝা ,হোম যজ্ঞ ,পীড়বাবা সবই হয়ে গেছে ।হাসপাতালে পরীক্ষা হয়েছে মেয়েটির ।

পরী বন্ধ্যা নয় তবু দৈনিক নির্যাতন চলছে ।প্রহার ।পুরুষের বন্ধ্যাত্ব এখনো সেখানে যে অসম্ভব পরিকল্পনা।

অস্বস্তি হয় কুসুমের ।তখনো দিন ছিলো ।রোদেলা দিন ।আলাদা করে কথা বলতে চায় কার্তিকের সাথে ।

কিছুটা বিরক্ত হয় পরি।তবু কথা হয় ।নানা কথা হয় ।কুসুম ডাক্তার নয় ।কুসুম পুরুষ নয় ।তবু এক সময় জেনে ফেলে কার্তিকের যৌনরোগের কথা ।সে শহরে কাজ করতে গিয়েছিলো ফিরেছে ।বর্তমানে নপুংসক ।পরী ঢেকে রাখে এ লজ্জা ।

একের পর এক দন্ড মাথা পেতে নিচ্ছে পরী।এই আমাদের দেশ ।স্বামীর সঙ্গে একই সাথে উচ্চারিত হয় দেবতা শব্দটি ।

আকাশের মুখ কালো ।তবু সন্ধ্যার নামাজ সেরে বহূ দূর থেকে জঙলা পথ হেঁটে আসছে এক পুরুষ ।

কুসুম টের পায় না তার নীরব নিবেদন 

                  শনশন হাওয়া ,গাছগুলো ভুতুড়ে আমেজে ঘাড় নাড়ছে ।মেয়েরা আজ আসবে না ।এসেছেন ইজাজ ।

মিহিরবাবু ।আজ অনেকদিন পর এসেছেন সম্পাদক অমল হাজরা ।

বিদ্যুতকান্তি এসেছে ।অমল তার নতুন বইটি নিয়ে ।

আজ ফুলকপির সিঙারা আর চা আসছে রেকাবে ।পেয়ালায় ধূমায়িত চা ।

দরজা ঠেলে মুনিয়ারা বেগম ঢুকছে।হাতে ঘরে তৈরী তেলেভাজা ।

____"বহরমপুর কবিতা উত্সব কেমন হলো অমল ?"

___" নতুন কিছু নয় কলকাতা থেকে যে মুখগুলো আসে তারা প্রবোধবাবু ,মনেরেখ ,প্রভাসবাবু এরা সব ।একই মুখ বার বার। ।আঞ্চলিক কবিরা বিগলিত ।খাওয়া দাওয়া বিনি পয়সায় ।"

__" আপনি কবিতা পড়লেন নাকি বিদ্যুতবাবু?আপনি তো সদাই মঞ্চপ্রিয়"

কথার খোঁচাটা হজম করে বিদ্যুত ।আজ তর্কের পরিবেশ নয় ।

___" না তালিকায় নাম নেই "

__" সেকি ! "সমস্বরে বলে ওঠে কুসুম ও মিহির ।

___" আপনি তো প্রচুর পত্রিকায় লেখেন " 

___" সরকারি সহায়তায় অনুষ্ঠান ।তাদের ব্যাপার "

__".কুসুমদিদি আমার বইটা আজ উন্মোচন হলো উত্সবে "

___" এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে "

কাঁচের চুড়ির মতো ছন্ ছনিয়ে হেসে ওঠে কুসুম ।

সকলেই টেবিল থেকে একটা করে বই তুলে নেয় ।

ফ্যানের হাওয়ায় ফর ফর আওয়াজ ।

আলো ঘিরে আছে কিছু পোকা ।

___" তুমি খুবই মাত্রা সচেতক কবি ।যতটা ছন্দ নিয়ে ভাবছো ততটা দর্শন নয়।ভুল বললে মাফ চাইছি "

ইজাজ গলা ঝেরে মন্তব্য করে ।

___" আমার তো ছন্দভিত্তিক আকারমাত্রিক কবিতাই ভালো লাগে অন্ত্যমিল যুক্ত ।"

__" এভাবে ভাব বা কাব্যরস কি শৃঙ্খলিত হয়না?"    অমল হাজরার বয়স কম । গদ্যকবিতা পছন্দ করে ।

তার মাত্রাজ্ঞান সম্পর্কে অনেকেই প্রকাশ্যে সন্দেহ ব্যক্ত করে়ছে এর পূর্বে ।

__"রবীন্দ্রনাথ মুক্ত ছন্দে কবিতা লেখা প্রবর্তনের পর আধুনিক বা আধুনান্তিক কবিদের কাছে ছন্দবদ্ধ কাব্য কিছুটা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বোধহয় "।

__" ছন্দোবদ্ধ অক্ষরমাত্রিক কবিতা এখনো অনবদ্য লাগে  । " মিহিরবাবু আরো একটা সিঙারা তুলে নিলেন ।

__" পাঁচ মাত্রার ছন্দ আমার বিশেষ পছন্দ" কুসুম দুএকটি কলি বলে ।


"ভালবাসায়  ভালবাসায়

প্রহর কাটে  গোলাপকাঁটা

প্রহরের কি  দোষ দেব হে

প্রহর মোড়া  মলিনতায়।

একলা থাকা মলিনতায়

কেটেকুটে জিতেই গেলাম

শালের বনে জ্যোৎস্না এলো

জ্যোৎস্নাটুকু হাতে দিলাম।

সন্ধ্যে এলো, সন্ধ্যে গেলো

তোমার সাথে মদির ভারি

আমি তোমার সমুদ্রতে

নীলচে ভালবাসার বাড়ি।"

     কুসুমের মনে পড়ে     অমলকান্তি এমন করেই বলতো ।

মুনিয়রা গায়

____ "সখি ভালোবাসা কারে কয়

            সেকি কেবলি যাতনা ময়"

তুই বল দেখি চারে চারে  মুনিয়া ?কুসুম মজা পায় ।

___"অবুঝের ভালোবাসা 

        যাতনার পরিভাষা"

 থতমত মুনিয়ারা ।

"বিদ্যুত তুমি ছন্দে হাত পাকাও ভাই"

কুসুম মনোযোগী হয় ।

কুসুম এখন ঔপন্যাসিক তবু কবিতাই তার হৃদস্পন্দন ।

রাত বাড়ে কয়েকটা কবিতা পড়ে বিদ্যুত ।

মিহির আর কুসুম ডাকে আসা লেখাগুলি বাছাই করতে থাকে ।

ওরা অনেক রাতে যায় আজ ।নরেন ফোন করে ।কুন্ঠা ।ভালোনাবাসতে পারার কৈফিয়তে বুঝিবা !

প্রসঙ্গ পরবর্তী দিনের জন্য স্থগিত থাকলো।

একে একে চলে যায় সবাই ।

বসে আছে শুধু ইজাজ ।___"কিছু বলবে ?"

__"না ,বলছি তুমি ভালো আছো ত কুসুম"

ধরা পরে যাবার লজ্জায় তার ফর্সা মুখ কমলা লাগে রাতের আলোয় ।

অনেকক্ষণ বসে থাকে মুখোমুখি ।যেন কত কথা কওয়া হলো।

একসময় বিদায় নেয় সে

কুসুম রাতে সামান্য আহার করে ।


          রাত তাকে নিয়ে যায় অতীতে ।সেইসব স্বপ্ন দেখার দিনে ।অমলকান্তি গভীর রাতে আসে এখন ও।নিভৃত নিশিথে।মনে মনে কত কথা হয় ।গভীর রাত জঙ্গল পেরিয়ে ,পালিয়ে বেড়ানোর দিন ,বেয়োনেটের দিন।

             চাঁদপুরের এই গ্রামে কুসুম কখনো ছিলোনা।এখন এই মাঝ দুপুরে ফেরারী জীবনটা অপচয় মনে হয় ।কত অপচয় ।এ গ্রামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বার করে কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ ।কুসুম সম্পাদনার কাজ অনেকটাই করে ।বহরমপুর সদর হাসপাতালে যেতে হয় তখন নিজের লেখাগুলি ডাকে দিয়ে আসে।

এ গ্রামে পাশাপাশি বাস করে অন্ত্যজ মানুষেরা যাদের কাছে বই আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহার হয় ।ভ্যাপসানো ভাত ফোটার গন্ধ বাতাস ভারি করে ।

কুসুম কখনো ডাক্তারি পড়েনি ।নির্বাসনে যাবার সময় নিজের আত্মধারনার্থে যা কিছু সঞ্চয় ছিলো মানুষগুলোর আপতকালীন সুরাহা করতে গিয়ে কুসুম ডাক্তারদিদি বয়ে বসেছে ।অজ্ঞদের মাঝে প্রাজ্ঞতা বড়ো সংকোচের বিষয় ।

       কুসুম বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরুষদের বুঝিয়েছে একসময় অন্ত্বসত্তা স্ত্রীর যত্ন নেবার কথা ।শিশুদের জল ফুটিয়ে খাওয়নোর কথা ।পুস্টিকর সস্তা পথ্যের তালিকা দিয়ে বেরিয়েছে প্রতিটা পরিবারে।পঞ্চায়েত প্রধান একদিন রাতে মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন কুসুম একা নারী ও তার নানা বিপদ আপদের সম্ভাবনার কথা ।

সূর্য পশ্চিমেই প্রায় ।নিজের চেয়ে ছায়া দীর্ঘতর হয় ।প্রাথমিক শুশ্রষা টুকু সে করে ।দুপুর গড়িয়ে যায় ।ভাত আলু ডাল এটুকুই খায় সে ।কুসুম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নিজের কাছে ।

যেদিন সব শিশু এ গ্রামে মাছ পাবে পাতে সেও সেদিন খাবে ।

          আজ বিকেলটা সুন্দর করে দেয় নরেন ।সে থাকলে ঘরের দেওয়ালগুলোও হেসে ওঠে । ভবঘুরেপনা বন্ধ হয়েছে নরেনের ।ভোরবেলা উঠে অনেক দূরের চাকরী সেরে ফিরতে রাত ।দেখা হয় না ,কথা হয় না ,লিখতে পারছে না নরেন ।মানুষটার অসহায়তা দেখে কুসুমের মন কোমল হয় ।

___" এত কষ্ট সইবেনা তোমার ।"

____" এছাড়া যে উপায় নেই কুসুম "

___" যে লেখাটা দিতেই হবে কাল সেটা লিখেছো "

__"পারছি না কুসুম কিছুতেই হচ্ছে না ।কাগজের মন্ড তে ঘর ভরে গেলো সারা রাত তবু লেখা শেষ হলো না"

লেখকের এই  যন্ত্রণার কথা একজন লেখক শুধু অনুভব করতে পারে ।

বুকের ভেতরটা কেমন করে কুসুমের ।

নরেন তার কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিচ্ছে  ।গালে হাল্কা স্পর্শ ।

মেলার কথা মনে পরে কুসুমের ।নরেন ও সে ।নিভৃত মুহূর্ত, প্রতিরোধ ,অবদমনের ক্রিড়া।

অনেকদিন বিমলবাবু অনুপস্থিত ।শোনা যায় তিনি শয্যাশায়ী ।জ্যোতিপ্রকাশের সঙ্গে ়আসে মিহিরবাবু ।

__" অহো কি মনোহর দৃশ্য "

মিহিরবাবুর অকস্মাত আগমনে দুজনে তফাতে বসে  ।

আজ মিহিরবাবু অনবদ্য একটি কবিতা লিখে এনেছেন ।বাচনভঙ্গিটি অসাধারণ ।রেহানাদি ভারি সুন্দর শাড়িটি পরেছেন ।ভালো লাগছে দেখতে ।

আজ কতদিন পর ভালো লাগছে কুসুমের ।

সেকি নরেন এসেছে বলে ! 

সেকি গ্রামে প্রথমবার মুসলমান ঘরের মেয়েটি জেদ করে কলকাতার হোস্টেলে চলে গেলো বিজ্ঞান পড়তে বলে ! 

নাকি এই দোলপূর্নিমার আলো এমন করে চরাচর ভাসিয়ে দিচ্ছে বলে ............

       একেকটা রাত একেকটা পদক্ষেপ সূর্যোদয়ের দিকে ।লিখতে লিখতে মধ্যরাত ।যেদিন ওরা আসেনা। 

যুবশক্তি কাগজ টাকে নতুন উদ্যমে চালু করেছে ।সম্পাদকীয় ,ও খবরগুলো ভালো করে ছেঁটে বেছে পাঠায় ।কুসুমের নাম নেই কোনোখানে ।সে শুধু লেখিকা ।তার নিবাস কেউ জানেনা। কুমুদ রঞ্জন দাস ।তার ছদ্মনাম ।

যেদিন ওরা আসেনা সেদিন কুসুম চাঁদের সাথে একা। ময়লা ঝুল লেগে থাকা বিপন্ন চাঁদ ।খয়াটে মানুষগুলোর মতো ফ্যাকাশে অপুষ্টিতে ভোগা ।

কতগুলো ধুরন্ধর মানুষ ,কতগুলো মিথ্যে বিকৃত তত্ত্ব ,অশিক্ষিত রাত্রি ডেকে আনছে ।ভাঙছে সৌধ,ভাঙছে নির্মাণ, ভাঙ়ছে স্বপ্ন।

     বিকল্প প্রয়োজন ।অমলকান্তি রোদ্দুর হতে গিয়ে মর্গের হিমঘরে পচেছে ইঁদুরের বাসরে ।এমন রাতে ।

কুসুম রাতে ঘুমোয় না ।ঘুমোতে পারেনা ।

    সপ্তাহে  একদিন  ওরা আসে দূর দূরান্ত থেকে রাত ঠিক বারোটায় ।

গহীন বনের চিতার মতো নি়ঃশব্দ পায়ে ওরা আসে ।

ক্রমশ সংগঠিত হচ্ছে ওরা 

___"  আমাদের দরকার প্রকৃত সমর্থক ।আদর্শে অটল মানুষদের যারা মানুষের  জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ।" খ এর সঙ্গে একমত কুসুম  ।

__" আক্রমণ শানাতে গেলে লোকবল প্রয়োজন " ক মত দেয় ।

___" আমাদের মানুষরা প্রাপ্য সুবিধাগুলো পায়না ।অশিক্ষা আর ধর্ম এদের তাস ।আর কতদিন এরা নিরন্ন মানুষগুলোকে বোকা বানাবে আর কতদিন......." খ খেই হারিয়ে ফেলে ক্ষুব্ধ স্বরে।

.......................................

......কী কী যেন কথা হয় নিম্নস্বরে, অবশেষে

   নির্দেশ মেনে নেয়,অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ওরা যেমন করে এসেছিল।

        ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠে নরেন ।তিনবার ট্রেন বদল করে চাকরী করতে যায় ।সে জানে কুসুম চায় না সে চাকরী করুক ।ভবঘুরে সাধাসিধে পরোপকারী নরেনকে পছন্দ কুসুমের।

      ভোরের লালচে রেখায় স্বপ্ন দেখে কুসুম ।কুসুমের মতো আরো কিছু মানুষ ।অমলকান্তির স্বপ্নটা কেবল রোমান্টিসিশম্ ছিলো না ।


  আজ নিয়ে তৃতীয় সন্ধ্যা ।মা হারা বেড়ালছানা টা কেঁদেই যাচ্ছে নিম্নচাপের অবিরাম বৃষ্টির মতো ।কোনো কোনো সন্ধ্যা অলৌকিক হয়ে ওঠে ।অন্যমনস্ক রাতের আকর্ষণ ।

"ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি 

ভোরের হাওয়ায় কান্না পাওয়ায় তব ম্লান ছবি........" রেহানাদির আকুল কন্ঠস্বরে কুসুমের চোখে জল ।

একের পর এক গান ।চুটিয়ে তবলা বাজাচ্ছে রমেন ।সুর ঠিকরে পরছে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে

" পথ চলিতে যদি চকিতে যদি দেখা হয় পরাণপ্রিয় ,.....যদি গো সেদিন চোখে আসে জল ,লুকাতে সে জল করিওনা ছল 

়যে প্রিয় নামে ডাকিতে মোরে......"

কুসুমের বুকটা শূন্য লাগে।কুসুম আর কোনো পুরুষের প্রেমে পড়বে না কোনোদিন ।কোনো পুরুষ অমলকান্তি নয় ।

কেন নয় ! কেন তবু বেঁচে থাকার জন্যেই শুধু জল ফড়িংএর ভলোবাসা ?

 ইজাজ গজল গাইছে ।এবাদত প্রার্থনা করছে।কার কাছে??

"এ দেশে ঝরে শুধু ফুল .... আহত এক সময়ের দাস হয়ে আছে সমাজ ।হত্যালীলা ধর্মের নামে । ভেঙে যাচ্ছে আদর্শগুলো ।নষ্ট যৌবন চারিদিকে ।সহসা দেখলে মনে হয় এ দেশে বুঝি নেই কোনো শাসক।সেদিন রহিম চাচা বলছিলো এর চেয়ে কি ঔপনিবেশিক অবিভক্ত ভারতই উন্নত ছিলো না ? কথাটা উড়িয়ে দেবার নয় ।

মিহিরবাবুর সঙ্গে তর্ক হয় জয়ন্তদার ।

" একটা গনতান্ত্রিক দেশে সাম্যবাদী দলে যদি পচন দেখা যায় তা কেটে বাদ দেওয়াই ত ভালো "

__" ক্ষমতায় বা বিরোধীতায় একটি সুসঙ্গত বামপন্থী আদর্শবাদী দল একটি দেশের জন্য অনিবার্য নয়কি মিহিরবাবু "

কুসুম জানলাগুলি খুলে দেয় ।হাওয়া আসুক ।

___" বাম রাজনীতি সফল হতে গেলে একনায়কতন্ত্র আসবেই আর তা হতে হবে আদর্শবান ক্যারিস্ম্যাটিক ব্যক্তি ।তেমন কোনো স্টেট্সম্যান এই শতাব্দী পায়নি ।"

__" সোস্যালিষ্ট প্রতিটি নেতৃত্বকেই কেন তবে তীব্র সমালোচনা ও শত্রুতার মুখে পড়তে হলো জয়ন্তবাবু " মিহিরবাবু ঠিক কি বলতে চান কুসুম বুঝতে পারেনা ।

"একনায়কতন্ত্র সমর্থন যোগ্য  নয়।"__মিহিরবাবু নীরব হন

___" এই গনতন্ত্রও আজ ফ্যাসিসম ছাড়া কিছু নয় " জয়ন্ত চলে যেতে যেতে ফিরে তাকায় ।

 রাত বাড়ে ।ইজাজ আর কুসুম হেঁটে যায় চন্দ্রাহত বনানীর মাঝে ।কালো ছায়া পরে ।

__"ইজাজ আমি যদি না থাকি তবু কাজ যেন থেমে না যায় ...."

___" কুসুম ,কেন বলছ এসব কথা আর বলবেনা ।আল্লাহ্ তোমাকে রক্ষা করবেন "

ম্লান হাসে কুসুম ।কুসুমের সে নিভৃত হাসি অস্পষ্ট আঁধারে মিলিয়ে যায় ।

      ৩            

        আজ ঘরে ভীড় ।কুসুম আধশুয়ে ।সব আলো জ্বলছে ,সবাই এসেছেন ।বোঝা যায় আজ বিশেষ কোনোদিন ।কুসুমের হাতে ব্যান্ডেজ ,কয়েক জায়গায় ছড়ে যাওয়ার দাগ।আঘাতের চিহ্ন ।নরেন এত রাতে এখনো ফেরেনি ।সাইকেলে গেছে শহর থেকে টিটেনাস ও আরো কিছু ওষুধ আনতে ।এখনো সে ফেরেনি ।সে টাইপ করেই চলেছে ।সময়টা ভালো নয় ।

একটু ক্লান্ত লাগছে ।অল্প জ্বর আছে ।রেহানাদির ফর্সা মুখ ক্রোধে রক্তবর্ণ ।মিহিরদা বিডিও অফিসে ।

___" আমি জানতাম একটা কিছু হবেই এরকম " মৃণালিনী বলে ওঠে ।মিহিরদার বোন। "তবুও প্রতিবাদ করা মানুষের ধর্ম"--ক বলে ।"অনেকদিন ধরেই চলছে এই নারকীয় ব্যাপার ।পঞ্চায়েতকে অভিযোগ জানিয়ে ও কোনো লাভ হয়নি ।"

"আজ এত বড়ো ঘটনার পরেও বিকেলে দুটি কনস্টেবেল ছাড়া কেউ আসেনি ।"-----জ্যোতিপ্রকাশ বলে ।

শান্তি মাহাতোর আগে ডাইনি সন্দেহে খুন হয়েছে মালতি টুডু ।দুবছর আগে সনকা মুর্মূ ।

ঘরে গুঞ্জন ।সকলেই উত্তেজিত।এতদিন পর জাগ্রত ।অথচ  কুসংস্কারাচ্ছন্ন আদিবাসী সমাজে প্রায়ই কোনো নারীকে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মরক ,রোগ ভোগের জন্য ।ডাইনি প্রথা চলেছে আজ এই শতাব্দীতেও ।গ্রামের ক্লাবে সালিশি সভা বসছে ।একতরফা রায়ে নয় বিতারিত হচ্ছে নাতো পুড়িয়ে মারা হচ্ছে দুর্ভাগিনীদের ।

আজ সকলটা যেন মনে পরলেও শিহরন হচ্ছে ।বামপন্থী কর্মী হিসেবে গ্রামে গ্রামে আশ্রয় তথা কাজ করতে হয়েছে কিন্তু বিশেষ ভাবে নারী সম্পর্কে ভাব বার সময় হয়েনি ।

আজ তার বাহন যাতে করে সে শুশ্রষা করতে যায় সেই ভ্যানচালক শিবু রুদ্ধশ্বাসে এসে জানায় ভানুপাড়ায় শান্তি মাহাতো কে বেঁধে প্রহার করা হচ্ছে ।যেটা বলেনি সেটা কুসুম চাক্ষুষ ়দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়।মেয়েটিকে নগ্ন করে ফেলা হয়েছে ।এলো চুল ,জায়গায় জায়গায় ক্ষত ।ঝাঁটা হাতে সামনে এক আদিবাসী মানুষরূপী জানোয়ার ।

শিবুর কাঁধের গামছাটা দিয়ে কুসুম লজ্জা নিবারণ করে শান্তির ।দেখতে ভালোনা সে ।এখন আরো বিভত্স ।___"তু হঠ যা ডাগদার বহিন ,এ আপনা কিস্যা আছে উ ডাইনকে দিয়ে দে " তেড়ে আসে সর্দার ।কেউ প্রতিবাদ করেনা ।ভীড়ের মধ্যে আদর্শবাদী দলের কর্মী মুখ লুকোয় ।শাসক দলের কর্মীও ।

ইজাজ আড়াল করে দাঁড়ায় বটবৃক্ষের মত ।আপনমনে ঘাড় নাড়ে কুসুম ।

"কি হয়েছে ,জ্বরটা বাড়লো ?" 

__" নাহ কিছুনা " কুসুমের মনে কাঁটা ।এখানে লুকিয়ে আছে নোংরা রাজনীতি ।ইজাজের যাওয়া উচিত হয়নি ।

" ১৬৯২ সালেম গ্রাম ।ম্যাসাচুসেট্ সের কাছে ।প্রথম বলি হয় ডাইনি সন্দেহে ব্রিজেত বিশপ ।" কুসুম আপন বলে।               

  " ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে পাশ্চাত্য সভ্যতা ডাইনিপ্রথার নামে প্রায় কয়েক হাজার মানুষ হত্যা করেছেন ।শুধুমা়ত্র সালেম ট্রায়াল খ্যাত এই ডাইনি সন্দেহে প্রায় দেরশো জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে  পুড়িয়ে মারা হয়ে়ছে ।

___" তাহলে আমাদের দেশ পেছিয়ে কোথায় আর ।" রেহানাদি মুখ খোলেন প্রথম ।

__" ফারাক সময়ের ১৬০০ থেকে ১৭০০ খৃষ্টাব্দে র মধ্যে মূলত ডাইনি প্রথার নথি পাওয়া যায় "

___"ব্রিটেনের মাদার শিপটন নামে খ্যাত  মহিলা পুরোহিত ছিলেন দেখতে কদাকার এ শারিরীক বিকৃতির শিকার কিন্তু তাঁর জ্ঞান ছিলো নস্ত্রাদামুসের সমান।আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়।"

নরেন নিজেই কুসুমকে টিটেনাস দিচ্ছে ।একটা হাত চেপে আছে সে নরেনের ।সেই স্পর্শে লেগে আছে না ফোটা ফুলের পরাগ ।

মূলত আদিবাসী ও অন্ত্যজ সমাজের নারীরা আমাদের দেশে ডাইনি প্রথার বলি ।

__"সেটা কতটা কুসংস্কার আর কতটা কূট রাজনীতি বলা মুস্কিল ।সম্পত্তি লুঠ একটা বড়ো কারণ " বিমলবাবু রায় দেন ।

--- হাতটা ধরে আছে নরেন ।কুসুম অনেকটা বলে চোখবন্ধ করে ।জ্বরটা বাড়়ছে ।তার উচ্চ রক্তচাপ ,আজ ক়যেকটি চোট তারও লেগেছে শান্তিকে উদ্ধার করতে ।

" কিসের সাম্যবাদ কিসের বিপ্লব  কাদের জন্য আর কারাইবা চায় বিপ্লব ।"ইজাজ দৃশ্যত হতাশ ।

__" চারা পোঁতা হয়েছে জল দাও। অশিক্ষার আর কুসংস্কার দূরীকরণ কর্মসূচী নিতে হবে " বিমলবাবু বলেন 

-----"কে করবে সেটা"কুসুম ক্লান্ত স্বরে বলে।

আজ একজন শান্তি বাঁচল ।বাঁচেনি  সনকা তার দ্বিতীয় স্বামীর দ্বারা অন্ত সত্ত্বা হবার অপরাধে------------

_" মননের বিপ্লব চাই।

 প্রসাশন ক্ষমতা চায় যে কোনো মূল্যে ভুলে গেলে চলবে না" মিহির বলে। 

আজকের  ়ঘটনা সম্প্রচারিত গনমা়ধ্যমে ।বিডি়ও কাল তদন্তে আসবে ।

কুসুমের মনে হচ্ছে এর শিকড়ে গ়ভীর ষরযন্ত্র রয়েছে ।

সময় কম ।সে শর্ত ভেঙে়ছে ।যে কোনো মুহূর্তে  রাত নেমে আসবে .....

         

     গ্রামসমাজের সঙ্গে শহরের রাজনীতির অনেক তফাত ।এখানে কোনো আদর্শের কথা চলেনা ।অনেক মানুষ দেশের নামটাও জানেনা ।তারা বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে অমানুষ হয়ে গেছে ।এখানে রক্তই ফয়সলা করে ।শান্তার বেচেঁ ফেরায় তপ্ত আদিবাসীসমাজ ।

তাদের রোষের আঁচে বাতাস জোগাচ্ছে আঞ্চলিক রাজনীতি ।ব্লক অফিস  দখল নিয়ে দ্বন্দ ।তারা কুসুমকে আর বাড়তে দিতে চায় না।

   কুসুম নতুন এক গুপ্ত দল গঠনের কারিগর মাত্র ।

কাজটা কঠিন ।অসম্ভব নয় । অমলকান্তি বলতো স্বপ্ন দেখা বন্ধ না হয় ।

          ভগ্নদূতের মতো সন্ধ্যায় শিবু এসে খবর দেয় ভুবনডাঙার ওপারে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হচ্ছে ।আদিবাসীদের গ্রামের সালিশি বুঝিয়েছে শান্তা মুসলমান ঘরে রাত কাটাচ্ছে তাই ইজাজ তাকে বাঁচাতে এসেছিলো।শান্তাকে নিয়ে গেছে মুসলমানরা ।এমন গুজব ভানুপাড়ায়।

কুসুম উত্তেজনায় উঠে বসে ।মিহিরবাবু ও বিমলবাবু ওসির সঙ্গে কথা বলে ।বাকীরা ছুটে যায় দাঙ্গা থামাতে ।কুসুম বুঝতে পারছে সময় আগত ।

সমস্ত লিংক এর সাহায্য চায় খবর পৌঁছে দে়য় দিল্লী থেকে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলিতে যাদের সঙ্গে তাদের গোপন আঁতাত ।

___" আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে যে কুসুম আর প্রাণ না যায় এ ইতরের দেশে ।আমি যাই ।"

___" সাবধানে যেও নরেন ,নিজের খেয়াল রেখো" আপন মনেই বলে  কুসুম ,নরেন ত কখনই চলে গেছে ।

দরজায় দাঁড়িয়ে কুসুম ।তমসাচ্ছন্ন 

সামনের পৃথিবী ।

আগুন ।শুদ্ধ করে দগ্ধও ।

___" আমার এক্ষুনি যাওয়া প্রয়োজন কুসুম ।নরেন একা ,যেতে দাও "

__" না ইজাজ নরেনের সাথে লোক আছে ।ওরা তোমাকে চায় ।"

__" তবে আমি যাব ।এরা অবুঝ এদের বোঝাতে দাও ,আমি লুকিয়ে থাকবো ভয়ে তা কি হয় কুসুম "

__" না তোমাকে যেতে দেবো না প্রাণ থাকতে না " দুটি জ্বরতপ্ত হাত চেপে ধরে ইজাজের হাত ।

ইজাজ বিহ্বল হয় ।

  সারা রাত জেগে কাটে ।ভোরের দিকে জ্বরটা নেই ।পূব আকাশে লালিমা ।

ইজাজ শিশুর মতো কাঁদছে।

         শালবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যায় কুসুম মসজিদের দিকে ।আজান প্রায় শেষ ।           


  ৪        

চারিদিকে শিশিরবিন্দু।কোথাও নেই কোনো দ্বন্দ্ব  ।পৃথিবী এখন শান্ত ।স্থির ।

গাছেরা নিবিড় ভাবে দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধতায় ।সমতার নীরব ভঙ্গিমায় ।

সব অস্ত্র নিথর ।সব সন্ত্রাস ক্লান্ত হয়ে গেছে অবশেষে ।

মসজিদের সোপানে নিরাবরণ চরণ রাখে কুসুম ।

সেই মুহূর্তে নিঃশব্দ শিশিরের মতোই চাতালে ছড়িয়ে পড়ল রক্ত ।দমকে দমকে রক্ত উছলে পরে ।পিঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে ছোরা তরুলতার মতো শরীর লুটিয়ে পড়ে ।আবছা স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যায় আততায়ী।

তখনো গম্বুজের মাথায় অনুরণন


অাল্লাহ হু অাকবর

অাশহাদু অাল লাই লাহা ইল্লা 

অাশহাদুঅান্না মোহাম্মাদারুর রাসুলাল্লাহ

হাই‌য়ে অালাসসালাহ্

হাই‌য়ে অালালফালাহ্

অাসসালাতু খাইরুম মিনাননাউঁম

অাল্লাহ হু অাকবার অাল্লাহু অাকবার

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ


অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিলো।


(কেটে গেছে অনেকগুলো বছর এরপর)


      মুহূর্ত জুড়ে জুড়ে সময় হয় ,সময় জুড়ে জুড়ে কাল ।দিন কেটে গেছে ।মাসও ।সময়মতো কতগুলো বছর ।


আন্তর্জাতিক প্রতিনিধির পদার্পণ পাল্টে দিয়েছে আদিবাসী গ্রাম ।এখানে শৌচাগার ।সরকারি স্কুল ।পিচঢালা পথ চলে গেছে এঁকে বেঁকে । ভানুপাড়ায় পুলিশ ফাঁড়ি ।

     

তবু বসন্তের শেষদিনে একটা মেলা হয় ।বিরাট মেলা । আদিবাসী,সুফি সন্ত বাউল।

"কুসুম-মেলা" 

      

একটা জীর্ণ বাড়ির বৈঠকখানায় আজো আলো জ্বলে ।নিয়মিত আসে মিহিরবাবু ,বৃদ্ধ বিমলবাবু ,জ্যোতিপ্রকাশ ইত্যাদি,বৃদ্ধ  ন্যুব্জ  তবু আসেন বসেন।

 কিন্তু এ বাড়িতে কুসুমের কোনো ছবি নেই।চাঁদপুরেই নেই।

আছে মনে মনে কুসুম ,প্রতিটা হৃদয়ে আছে।

           কুসুম বেঁচে থাকে ধুলো আর বাতাসে।

শুধু নরেন কোনো কোনো রাতে সহসা আনমনা হয়,পাতা ঝরে ঝরে পড়ে।

ইজাজ পাকাপাকি আশ্রমবাসী ।তারও ভোরের আজানে মনঃসংযোগ নষ্ট হয়ে যায় মাঝে মাঝেই। 

শালবনে ভোর বেলা অশ্রু ঝরে পড়ে ।

     রেহানা একটি মলিন ছবি পেয়েছিলো আলমারিতে  ।আবছা এক যুবক ।সুদর্শন ,তেজদীপ্ত চোখ ।কুসুমের শাড়ির ভাঁজে ।

না অমলকান্তির নাম জানা যায়নি।

এ দেশের সব উচ্চশির আদর্শবান সাম্যবাদী যুবকের নাম অমলকান্তি


"কুসুম "  অমলকান্তিদের সেই বিপ্লবের নাম ........

               


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন