সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সসীমকুমার বাড়ৈ।। পারক গল্পপত্র



শিয়ালদায় ট্রেনের চাকা গড়াতেই খইয়ের মতো ছেলেমেয়েগুলো খইয়ের মতো ফুটতে শুরু করল। হুমা হাসতে হাসতে বলল-পাখির দেখা না মিললে পক্ষিবাবুকে কিন্তু  ট্যুরের পুরো খরচ বইতে হবে।

-পাখির দেখা মিলবে না মানে, আমরা তো পাখি সঙ্গে নিয়েই যাচ্ছি। অবন চলন্ত গাড়ির জানালায় চোখ রেখে বলল। হুমা মুখ টিপে হাসল।

কনিষ্ক অবাক হয়ে বলল-দাঁড়া, দাঁড়া, পাখি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি, মানে?

-এমন এক কিংবদন্তি পাখি যাকে চোখে দেখা যায় না। যে থাকে দৃষ্টির অগোচরে। সেই পাখি আজ চোখের সামনে।

-আরে অবন, সকালবেলা কী হেঁয়ালি শুরু করলি মাইরি। সঙ্গে পাখি কোথায়?

-তুই কি হুমা নামের মানে জানিস?

-না।

-তা হলে আর বুঝবি কেমনে? হুমা হলো ইরানের কিংবদন্তি পাখি। হু মানে জল আর মা হল আত্মা। জলের জীবন। যার দর্শন পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার, সেখানে হুমাকেই সঙ্গেই নিয়ে যাচ্ছি। দুই চারটা পরিযায়ী পাখির দেখা না মিললে দুঃখের কি আছে।

সবাই প্রায় কম্পার্টমেন্ট কাঁপিয়ে হেসে উঠল।   

একদিনের এক্সকার্সন ট্যুর, প্রয়োজনে দুই তিন দিন। অধ্যাপক প্রোষিত বাগচী গাইড কাম  টিম লিডার, সে  চায় ট্যুরটা আনন্দ মুখর হোক। অধ্যাপক মুখোমুখি বসলে ছাত্ররা প্রাণ খুলে কথা বলতে দ্বিধা করে, তাই সে আর দীপাঙ্কর মন্ডল, সামান্য দূরে বসেছে। দীপাঙ্কর মন্ডল তার বন্ধু স্থানীয় এক উচ্চপদস্থ আমলা। সে বার্ডস ফটোগ্রাফার, পাখির ছবি তোলা তার নেশা। পাখির ছবি তুলতে তলতে খানিকটা অপেশাদার পক্ষী বিশারদ হয়ে উঠেছে। 

পূর্বস্থলীতে নেমে টোটো চেপে চুপির ঘাটে পৌঁছে দলবল অবাক, ডিসেম্বরে চুপির চরে পর্যটকের মেলা লেগে থাকে। এখন সব উধাও। কেমন শ্মশান শ্মশান। দীপাঙ্কর প্রায় প্রতি বছর এই সময়টায় একবার চুপি আসে। চুপি-কাষ্ঠশালীর পাখিরালয় তাকে টানে। শুধু পাখি নয়, এখানকার প্রকৃতিক দৃশ্য অন্য যে কোনো হ্রদ থেকে আলাদা। সে জয়ন্ত প্রামাণিককে ফোন করতে যাবে তখনই সে ভুশ করে উদয় হলো।  সঙ্গে সাগরেদ সমীর।  দীপাঙ্কর বলল-জয়ন্ত ঘাটের এই চেহারা কেন?

জয়ন্ত মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল-স্যার, চুপির জলে কালা বাতাস লাগছে। 

-তা হলে আমাদের পাখি দেখা হবে না? লেকে নামা নিষেধ আছে নাকি।

-না, তা নেই, তবে কেউ সাহস করে নামছে না। আমি ভাবলাম আপনি একা আসবেন তাই কিছু বলিনি। সঙ্গে এতগুলো ছেলেমেয়ে আসবে বলেননি তো স্যার, তা হলে বারণ করতাম।

প্রোষিত এগিয়ে এসে বলল-আমরা এসেছি যখন তখন হ্রদ দেখেই যাব। তার আগে জয়ন্ত তুমি বলো, কী ঘটেছে?

-স্যার, বিলে একটা লাশ পড়েছিল গত নভেম্বর মাসে। সেই থেকে ঘাট বন্ধ।

-শোনো জয়ন্ত, নির্জন বিল ঝিল হ্রদে দুই একটা লাশ পড়েনি এমন কোনো জলাশয়  দেখেছ কখনও। 

জয়ন্ত ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল।

দীপঙ্কর মণ্ডল বলল-প্রফেসর বাগচী, সাবধানের মার নেই। এক নৌকায় হবে না, দুই নৌকায় ভাগাভাগি করে উঠতে হবে আমাদের। 

জয়ন্ত খুশি হলো। সে বলল-স্যার, এমনিই পঞ্চায়েত সমিতি নিয়ম করেছে চারজনের বেশি নৌকায় নেওয়া যাবে না। আমার ডিঙ্গি বেশ বড়, আট দশজন উঠলেও কিছু হত না। সরকারের নিয়ম মেনে আপনারা দুই নৌকায় ওঠেন। সমীর ছেলেটা ভাল, তার নৌকায় মন্ডল স্যার থাকলে আর এই নৌকায় আমি মোটামুটি সামলে নেব। 

ডিঙ্গি দু’টি সামনে পিছনে চলছে। প্রোষিতের সঙ্গে এসেছে হুমা, অবন। অন্য নৌকায় দীপঙ্কর মন্ডল, তানিয়া, কনিষ্ক, প্রণব। প্রণব নৌকায় উঠতে গড়মসি করছিল। অশ্বক্ষুরাকৃতি লেকটার জলরাশির মধ্যে কোথায় লাশটা ভেসেছিল ভেবে প্রণবের শরীরে চেপে বসেছে একটা ঠান্ডা ভাব। নৌকা চলতেই প্রণবের ভিতরে শিরশির করে উঠল। অন্যদের মাথায় বিস্তীর্ণ আকাশ। নিচে কাচ স্বচ্ছ জল, একেবারে তলদেশ দেখা যাচ্ছে। চিলিক কেটে যাচ্ছে সরপুঁটিদের ঝাঁক। বাঁ দিক বরাবর সরষে ক্ষেত। এমন চোখ জুড়ানো পরিবেশে গান করতে ইচ্ছা হচ্ছে হুমার, নাচতে ইচ্ছা হচ্ছে তানিয়ায়। দুই মাঝি তাদের বারণ করে দিয়েছে বিলের নিস্তব্ধতা ভাঙা যাবে না। প্লাস্টিক ফেলা যাবে না জলে। ইতিমধ্যে অবন আর দীপাঙ্কর মন্ডল ক্যামেরার লেন্স তাক করেছে পাখির বিচরণে।  

নৌকার গতি ডেড স্লো হয়ে এলো। নৌকা থেকে চল্লিশ পঞ্চাশ ফুট দূরে এক ঝাঁক বেলে হাঁস, যেন  ফুল। জয়ন্ত বলল- হাঁসগুলো রেড ক্রেসটেড পোচার্ড। বৈজ্ঞানিক নাম নেট্টা রুফিনা। নেট্টা শব্দটা এসেছে গ্রীক থেকে আর ল্যাটিন থেকে রুফিনা।  যেগুলোর মাথা সোনালী লাল রঙের ওগুলো পুরুষ, ছোট ধূসর রঙের গুলো মেয়ে হাঁস। প্রাণি জগতে পুরুষরাই বেশি সুন্দর। এরা শীতেই মধ্য এশিয়া, মোঙ্গলিয়া থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। চুপির বিলে এদের সংখ্যাই বেশি। এবার তো পিকনিক পার্টি নেই, হৈ-হল্লা নেই। আগে ডিজের উৎপাতে পাখির কানে তালা লেগে যেত। এবার কত পাখি এসেছে। হুল্লোরবাজ মানুষজন আসেনি। আমরা খুব কষ্টে আছি কিন্তু চুপি ভাল আছে। 

অবাক বিস্ময়ে হুমা জয়ন্ত’র কথা শুনছিল। বিস্ময়টা শুধু তার নয়, দু’টো নৌকার। জয়ন্ত আর সমীর যেন একই পৃষ্ঠা মুখস্ত বলে যাচ্ছে। ক্যামেরার সাটার পড়ার শব্দে হুমা চিন্তার ঘোর কাটল, সে জয়ন্তকে জিজ্ঞেস করল-দাদা, আপনি তো দেখছি রীতিমতো পক্ষী বিশারদ।

জয়ন্ত চাপা স্বরে বলল-না দিদিভাই, নামটুকু সই করতে পারি। আগে বিলে মাছ ধরতাম বারো মাস। এখনও ধরি, তবে শীত এলে পাখি ফটোগ্রাফারদের নিয়ে সকাল সকাল জলে নেমে পড়ি। তারা এক একজন পাখির পণ্ডিত। তাদের কথা শুনে শুনে কিছুটা শিখেছি। অনেকে বইয়ে, নেটে আমার নাম, ফোন নম্বর ছেপেছে। সারা বিশ্ব থেকে কত যে ফোন আসে নৌকা ভাড়ার জন্য। আমার একার পক্ষে সম্ভব নয় তাই বেশ কিছু ছেলেকে আমি শিখিয়ে নিয়েছি। ওই যে সমীরকে দেখছেন, ও সারা বছর বম্বে ঠাকুর গড়ে। শীতে বাড়ি চলে আসে, তখন এখানে একটু আয় বেশি। জয়ন্ত আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই প্রোষিত বলল-জয়ন্ত, নৌকাটা পাড়ের দিকে নলখাগড়া ঝোরার এদিকে একটু এগোও। 

-না স্যার, ওদিকটায় যাওয়া যাবে না। জয়ন্ত শুকনো গলায় বলল।

-কেন?

-না, মানে... কচুরিপানার চাক ভেঙে যেতে হবে। এই পড়াবেলায় পাখিরা কচুরিপানায় আরাম করে। 

-জয়ন্ত, কচুরিপানার মধ্যে তো আমরা দু’একটা ব্লাক হেডেড আইবিস দেখতে পারি।

-স্যার, তা দেখতে পারেন, কিন্তু ওই ঝোঁপের কাছে যাওয়া যাবে না। জয়ন্ত গলায় একটা মরিয়া ভাব। 

-বডিটা কি নলখাগড়া ঝোঁপের মধ্যে পড়েছি, না বাইরে? প্রোষিত নির্লিপ্তভাবে বলল। কিন্তু নৌকার আরোহীদের মধ্যে বডি শব্দটায় তড়িৎ বাহিত হয়ে গেল। জয়ন্ত শক খাওয়া মানুষের মতো মিনমিনে গলায় বল-স্যার, আপনি জানলেন কি করে? 

-তা হলে তুমি বলছ,বডিটা এখানেই পড়েছিল। একটা লোকাল পেপারে ছবিসহ ছোট্ট একটা খবর করেছিল। কলকাতার বড় পেপার জেলে মাঝিদের মৃত্যুর খবর ছাপার ফুরসত পায়? বাংলার মানুষ রাজনৈতিক খুনোখুনির খবর ভাল খায়। এমন কত রহস্য যে দিনের আলোয় চাপা পড়ে যায়।

দীপাঙ্কর মণ্ডল হেসে উঠল-মিঃ বাগচী, ছাত্রদের গোয়েন্দাবিদ্যার প্রাথমিক পাঠটা দিতেই এসেছেন নাকি?

-রথ দেখা আর কলা বেচা যাকে বলে। রোমিত বাবু বিয়ে থা করেছে, সব সময় সঙ্গ দিতে পারে না। ছেলেমেয়েগুলোর খুব আগ্রহ আমাকে নিয়ে, তাই ভাবলাম ওদের সঙ্গে নিয়ে যাই।

জয়ন্ত একটু গাই গুঁই করলেও নৌকার গলুইয়ে মুখ ঘুরাতে ঘুরাতে বলল-দেখেন স্যার, আমরা জেলে-মাঝি মানুষ। কেস খামারিতে যেন না জড়াইয়া যাই। 

-ভরসা রেখে দেখো জয়ন্ত। বডি যেখানে পড়েছিল ঠিক তার কাছে যাও। 

পাখিরালয়ে পাখি দেখতে এসে একি হ্যাপারে বাবা, প্রণবের মুখ শুকিয়ে কাঠ। সে ফিসফিস করে তানিয়াকে বলল-এই তানিয়া, তোরা জানতিস এমন একটা পরিকল্পনা নিয়ে স্যার এসেছেন? পাড়ের কাছে নৌকা ভিড়লেই আমি নেমে যাব। আমার হাত পা কেমন কাঁপছে। 

-পাগল নাকি, খুনি কখনও জলে থাকে? ডাঙ্গায় থাকে রে। বেঘোরে প্রাণটা হারাবি। তানিয়া চাপাস্বরে বলল।

-সব জেনে শুনে আমাকে বললি না কেন, আগে জানলে আসতাম না।

-কে বলল, আমরা জানতাম। তবে গোয়েন্দা স্যারের সঙ্গে আসবি আর ঝুঁকি থাকবে না তা কখনও হয়। জানতিস তো, স্যার এ্যালিফ্যান্টা দ্বীপের মতো কত ভয়ঙ্কর রহস্য সমাধান করেছন। ঝুলি ভর্তি সাফল্যে। আমি তো এক্সসাইটেড শেষ দেখার আশায়।

-ঘাটে তো ফিরবে নৌকা, যত রাত হোক ফিরে যাব।  

নৌকা পাড়ের কাছাকাছি নলখাগড়া ঝোরার কাছে চলে এসেছে। সবার চোখ আটকে গেল আয়াতাকৃতি করে কাঁচা বাঁশের পোতা খুঁটিতে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ লেখা ফিতা দিয়ে ঘেরা রয়েছে। ফিতায় হাওয়া লেগে ঝরঝর করা শব্দ যেন আর এগোতে বারণ করছে। নৌকা থামল। প্রোষিতের দেখাদেখি প্রণব বাদে সবাই উঠে দাঁড়াল গণ্ডিবদ্ধ জলটুকু দেখতে। জলাঘাস, কচুরিপানা এলোমেলো। বাইরে কিছু একটা পাড়ের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্ন। ঘাসপাতা তীরের দিকে মাথা চাপা। প্রোষিত বলল-জয়ন্ত, তুমি বডিটাকে দেখেছ।

-হ স্যার, কামে বেড়িয়ে আমরাই প্রথম দেখলাম রাখাল খুড়ার দেহ। রাতে মনে হয়, জাল পাততে নামছিল বিলে। খুড়া ছিল কই মাছ ধরার ওস্তাদ। পুলিশে খবর দিলাম। সমীরও দেখেছে।

-বডি উপুর হয়ে ছিল?

-হ স্যার।

-জয়ন্ত, পুলিশগণ্ডির বাইরে লগিটা সোজা করে জলের মাপ নেও তো।

জয়ন্ত খুঁটির গা ঘেঁষে সরু বাঁশের লগিটাকে তল পর্যন্ত নামিয়ে দিল। লগিটাকে তুলে প্রোষিকে দেখালো-এই দেখুন স্যার, মাজা জলের উপর হবে। 

-শরীরে ক’টা দাগ ছিল?

জয়ন্ত সাবধানী হয়ে গেল-আমরা কি গুনতে পারছি, পুলিশ ধারে কাছে ঘিষতেই দেয়নি। রাখাল খুড়ার গায়ে কোনো কাপড় চোপড় কিছু ছিল না। পাশে ভাসছিল খাটো ধুতি। খানিকটা দূর থেকে দেখেছি খুড়ার দাফনার নিচে গোল গোল রক্তচাকা দাগ। চাকা চাকা বিভৎস দাগ দখে আমাগো পিলে চমকানোর অবস্থা। এমন ভয়ঙ্কর কামড়ের দাগ বাপে জম্মে দেখি নাই স্যার।  

প্রোষিত তার রুকস্যাক ব্যাগ থেকে কয়েকটে ছবি বের করে দুই নৌকায় দিয়ে দিল। অন্য নৌকার মাঝি সমীর চিল্লিয়ে উঠল-এ তো রাখাল জ্যেঠার বডির ফটো। দ্যাখেন, সারি সারি দাঁতের চাকার মাঝখানে কেমন একটা ফুটো। বডি পাড়ে তোলার পরেও ফুটা দিয়ে রক্ত চুইয়া পড়ছিল। স্যার, এবার ফেরেন সন্ধ্যা হইয়া আইছে। আজকাল রাতে বিলের জলে রক্তচোষা পেত্নী বারায়। ও কমলিনীর আত্মা।

হুমা জিজ্ঞেস করল-কমলিনী আবার কে?

-সে ছিল দেবু নাইয়ার অতিপ্ত বউ। তার নোলা কিছুতেই মিটত না, শেষে চুপির জলে ডুবে মরল। রাতের বেলা খোলা চুলে কচুরিপানার উপর দিয়া সে সাদাথানে ঘুরে বেড়ায়, আর পেত্নীর মতো কাঁদে। জেলারা নাকি অনেকবার দেখেছে। 

দুই নৌকায় উৎকণ্ঠার নীরবতা নেমে এসেছে। ছবিতে জ্বল জ্বল করছে রক্তচাকা দাগ। একাধিক সারিবদ্ধ দাঁতের গোলাকৃতি দাগের ঠিক মাঝখানে একটি করে ফুটো। ফুটো থেকে রক্ত গড়ানোর স্পষ্ট দাগ। 

দীপঙ্কর মন্ডল বলল-প্রোষিতবাবু, এবার ফিরি। কাল অফিস আছে। সাড়ে ছয়টার ট্রেনটা না ধরতে পারলে ফিরতে অনেক রাত হবে। ছেলেমেয়েদের  নিয়ে বিলের জলে আর থাকাটা ঠিক হবে না।

নৌকা ফিরছে ঘাটের দিকে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা দ্রুত নেমে যাচ্ছে সবুজ চক্রাবালের পিছনে।  সূর্যের পিছন পিছন ফিরছে পাখিদের ঝাঁক। উৎকণ্ঠা কেটে সবার মন এখন খানিকটা ফুরফুরে। হঠাৎ সমীর বলে উঠল-ওই দ্যাখেন স্যার, ভ্যাসালের মাথায় একটা অসপ্রে বসে। এবার বিলে তিনটা আইছে। এই সময় অগো দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। এটার আজকে পেট ভরেনি। সাধারণত সকালে শিকার করে। তাবে এক দুই কিলোমিটারের মধ্যে এই বিকালেও শোলের ঠোঁট বোটকা দিতে জাগলেই হলো, পেরান যাবেই বাজের থাবায়। 

-সমীর ঠিকই বলেছে, বাজপাখি, ঈগল এদের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর। তিন কিলোমিটার দূর থেকে দেখতে পায়। নির্ভুল লক্ষ্যে ছোঁ দিতে পারে। হ্রদ, নদী, সমুদ্রে এরা মাছ শিকার করে। একমাত্র আণ্টারটিকা মহাদেশ বাদে সব মহাদেশেই অসপ্রের বাস। দীপাঙ্কর মণ্ডল বলল। 

ক্যামেরায় অবন দীপাঙ্করের চোখ। বাকিদের চোখ বাজপাখির শ্য্যেনদৃষ্টিতে। তার রাজকীয় গ্রীবা ভ্রুক্ষেপহীন। একমাত্র প্রোষিতের মন নেই বাজের চোখে। তার মাথায় হাজার প্রশ্ন, কে শুষে খায় রক্ত? হঠাৎ বাজপাখিটা মিসাইল বেগে উড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিমগ্ন জলের বুকে, থাবায় একটি শোল মাছ গেঁথে তুলল। মাছটি লেজ ঝাঁপটাচ্ছে। তুষ্ট পাখায় পাকিটা ফিরে গেল রাত আশ্রয়ে। প্রোষিত ভাবল রাখাল হালদারের মৃত্যু কি অমন ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে এসেছিল। কচুরিপানা অতটা ওলট পালট ছিল কেন?

ঘাটে নৌকা পৌঁছাতেই একটা কালো রঙের বাইক উদয় হলো। গতি সামান্য কমিয়ে দুই গাট্টাগোট্টা আরোহী যেতে যেতে বলে গেল-মরণ ডাকছে আয়, আয়। তাদের মাথায় গামছার পেট্টী বাঁধা। গুম গুম আওয়াজটা ক্রমে বিলিন হয়ে গেল। প্রোষিতের নজর এড়াল না। 

প্রোষিত বলল-মন্ডল সাহেব, আমি থেকে যাব, এখানে পূর্বস্থলী দুই পঞ্চায়েত সমিতির কটেজ আছে, কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে?

প্রণব বাদে অন্যরা লাফিয়ে উঠল-স্যার, আমরাও থাকব। 

দীপাঙ্কর মণ্ডল বিডিওকে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল-আমাদের গোটা তিনেক কটেজ লাগবে। -আচ্ছা, আচ্ছা। -না না। থাকবেন জাঁদরেল গোয়েন্দা অধ্যাপক প্রোষিত বাগচী, সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা।. ..বেশ বেশ। থানাকে যা ইনস্ট্রাকশন দেওয়ার, তা আমি দিয়ে দেব। ফোনটা বন্ধ করে সে প্রোষিতকে বলল-এখন তো পর্যটক নেই, যে ক’দিন ইচ্ছা থাকতে পারেন। ওঁ কেয়ারটেকারকে বলে দেবে। তাকেই ভাড়া দিতে হবে। চাইলে সে রান্নাবান্না করে দিতে পারে। বিডিও বলল, একটু সাবধানে থাবেন। 

প্রণব আর দীপাঙ্কর মণ্ডল স্টেশন যাওয়ার টোটোতে উঠে বসল। টোটো স্টার্ট দিতেই প্রণবের ধরে প্রাণ এলো। সে আর পিছনে তাকাল না।  

পাখিরালয় কটেজে ঢুকেই ছাত্রছাত্রীরা হৈ হৈ করে উঠল। বেশ সাজানো গুছানো। কটেজের সীমানা ঘেঁষে হ্রদ, পুব দক্ষিণে খোলা মাঠ। মাঠের পর হুগলী নদী, ওপারে মায়াপুরের নির্মিয়মান ইস্কন মন্দিরের মাথায় আলো জ্বলে উঠেছে। ছাত্রছাত্রীরা প্রোষিতের কাছে বায়না ধরল-চা টিফিন খেয়ে সরষেক্ষেতে চাঁদ দেখতে যাবে। ফিরে ডিনার হবে।

-বেশ তো আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব। প্রোষিত বলল। 

কনিষ্ক বলল-আমার চারটা কলেজে পড়া ছেলেমেয়ে এক সঙ্গেই তো যাচ্ছি। স্যার, আপনি বরঞ্চ বিশ্রাম নিন।

-ঝিলের পাশের মাঠকে আমি অতটা হাল্কা ভাবে নিতে পারি না। তোমাদের দায় দায়িত্ব এখন আমার। এখানে থাকব সেটাই পুরোপুরি ঠিক ছিল না।

-স্যার, আমরা তো বলেই এসেছিলাম প্রোয়জনে দু’একদিন থাকতে হতে পারে। ইতিমধ্যে সবাই বাড়িতে ফোন করে দিয়েছি। 

ফ্রেস হয়ে  লনে এসেছে সবাই। লনে গার্ডেন টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে। পুরো কটেজ জুড়ে আজ ওদের রাজত্ব, আর কোনো পার্টি আসেনি। ক্যান্টিন বয় তেলে ভাজা আর মুড়ি মাখা দিয়ে গেল। 

তানিয়া বলল-বাঃ ক্যান্টিনয়ালাদের আসরি মেজাজ বোধ আছে তো। অনেক দিন ঝালমুড়ি আর গরমাগরম চপ খাইনি।

-সবাইকে তার কাস্টোমারের মুড বুঝেতে হয় ম্যাডাম। আহা রাতে লেকের জলে ভাসতে ভাসতে এই টিফিনটা হলে কী মজাটাই যে হত? অবন বলল। 

-বিলের পাড়েই বা কম জমেছেটা কি? চা-টাও জব্বর বানিয়েছে। তানিয়া উত্তর দিল। তানিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই কিছু একটা দ্রুম করে পড়ার শব্দ হলো। কেয়ারটেকার তার ঘর থেকে বলল, ছোটন দ্যাখ নাড়কোল পড়ল মনে হয়। 

-শিগ্‌গির সবাই ঘরে ঢোকো। কুইক। প্রোষিত দুই বাহু প্রসারিত করে সবাইকে আগলে ঘরের দিকে নিয়ে গেল। তারা ডরমেটরিতে ঢুকে গেল। বাইরের শোনা গেল ছোটনের গলা-দাদা, কোথাও কিছু দেখলাম না। একটা আধলা ইট পইড়্যা আছে।

সবাই উৎকণ্ঠিত, নির্বাক। শেষে অবন প্রোষিতকে জিজ্ঞেস করল-স্যার, রাতে কটেজে ইট ছুড়তে আসবে কে?

-কে জানি না। তবে আমাদের ভয় দেখাতে চায়। বিকেল থেকে আমাদের উপর নজরে রাখেছে। 

-কেন স্যার, লোকটাকে তো মাছে কামড়ে মেরেছে। আর আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। হুমা বলল। 

অবন বলল-তুই একটা বুদ্ধু, আরে কেন বুঝিস না, এমন কেউ আছে যে চায় না হ্রদের জলে পাখি দেখতে কেউ নামুক। আর সে হয়ত স্যারের পরিচয় জানে। 

-মাছেই যদি কামড়ে মারে লোকটাকে, তা হলেই তো ওই প্রশ্নটা মিটে যায়। এত বড় হ্রদে বিশাল বিশাল বোয়াল বা শোল মাছের মতো রাক্ষুসে মাছ কি নেই? ও সব মাছ নাকি মানুষও কামড়ায়। যদি খুনই না হয়, তাহলে পর্যটকদের জলে নামলে কার ক্ষতি?  

কনিষ্ক জিজ্ঞেস করল-স্যার, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি আপনি দেখেন?

-হু।

-রিপোর্টে কি আছে?

-রিপোর্টে বলা হয়েছে মাছ জাতীয় কোনো প্রাণি কামড়েছিল, তবে মৃত্যু অতিরিক্ত মাত্রায় রক্ত ক্ষরণে।

হুমা উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারল না -তা হলে তো ল্যাঠা চুকেই গেছে। ঢিল টা কেয়ারকে শাসানোর জন্যও ছুড়তে  পারে।

-কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে এমন কোন মাছে কামড়ালো? এই অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের শেষ মাথায় এখনও নদীতে সংযোগকারী একটা খাল আছে। বোয়াল, মহাশোল, ক্যাট ফিস জাতীয় কোন মাছ বা নদী থেকে আসা কোন রাক্ষুসে মাছে এমন কামড়ায় তা আমাদের জানা দরকার।

অবন বলল-তার মানে স্যার, আপনি মৃত্যুটাকে মামলি একটা জলজ প্রাণির আক্রমণেই মেনে নিতে রাজি নন।

প্রোষিত কিছু বলল না। সে প্রসঙ্গ ঘুরাল-এর পরেও চর জ্যোৎস্না দেখতে যাবে তোমরা?

সবাই হৈ হৈ করে উঠল-হ্যাঁ হ্যাঁ যাব, যাব। আপনাকেও সঙ্গে যেতে হবে। 

সত্যিই চুপির চর এখন নৈস্বর্গিক মায়াবী। চুপির হ্রদ আসলে গাঙ্গেয় বাঁওর। নদী তার গোলাকৃতি বেড় কেটে দিয়ে সোজা নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে। চরের উর্বর পলিমাটি সর্ষেফুলে ঢেকে আছে। জ্যোৎস্না আলোয় চর হলদে মোম আভায় মাখামাখি। হ্রদও শান্ত নির্জন। দুই একটা কোয়াক কোয়াক ডাক ভেসে যাচ্ছে। অন্যরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি হাঁচির উৎস লক্ষ্য করে প্রোষিত লাগাল দৌড়। তার পিছন পিছন অন্যরাও ছুটল। তাদের পায়ের শব্দ পেয়েই বেশ খানিকটা দূরে একটা লোক ক্ষেতের মধ্য থেকে ভুশ করে মাথা তুলে নদীর দিকে পালাতে চেষ্টা করল। কোনোক্রমে নদী অবধি যেতে পারলেই সাঁতার কেটে ওপারে উঠে পগারপার। কিন্তু প্রোষিতের মাঠে প্রাকটিস করা দৌড়বাজ। সে ক্ষিপ্র বেগে দূরত্ব কমিয়ে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার টুঁটি চেপে ধরল -উঁহু, নড়াচড়া করলে একেবারে ঘিলুতে বুলেট গেঁথে দেব। 

লোকটা ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে।

এতক্ষণে ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারল, অধ্যাপকের পাঞ্জার উঠে এসেছে পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র মিনি গান হ্যান্ডেল রিভলবার। যা পাঞ্জার মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায়। চিনা চশমার খাপেও লুকিয়ে রাখা যায়। লোকটার উদোম গা, লুঙ্গি কোছা মেরে পরা। সদ্য জল থেকে উঠে আসায় কোচা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়াচ্ছে। এমনিই শীতের ভেজা তার উপর ঘাড়ের সঙ্গে চেপে আছে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত কোল্ড কিলার। লোকটা ঠকঠক করে কাঁপছে। প্রোষিত তার থেকেও ঠান্ডা গলায় বলল-এখানে কী করছিলে?

-আঃ আঃ আজ্ঞে মুই মাছ ধরেতে গেছিলাম। লোকটা তোঁতলাচ্ছে। 

-তাহলে পালাচ্ছিলে কেন চাঁদু?

-আপনাগো এই রাইতে দেইখ্যা ডরাইয়া গেলাম। 

-মাছ ধরার জাল, কোচ বা ভুনি কোথায়?

-না না ছ্যার, মুই ওইন্যের জাল থেকে কডা মাছ চুরি করতে আইছিলাম। হেই জইন্য আপনাগো দেইখ্যা ডরাই গেলাম। 

প্রোষিত ধমক দিল-ফের মিথ্যা কথা।

-না ছ্যার, মুই কিছ্যু জানি না। মুই গরীব মানুষ, ছাইয়্যা দ্যান ছ্যার। 

তখনই অবন একটা বড় অ্যালোমিনিয়ামের হাঁড়ি নিয়ে এসে বলল-দেখুন স্যার, লোকটা যেখানে লুকিয়েছিল সেখান এটা পেয়েছি। 

-আরে এ তো মাছ চাষের হাঁড়ি। বলেই প্রোষিত লোকটার গর্দানের উপর একটা জোরে গাট্টা দিল-বলো, মেছো হাঁড়িতে কী এনেছিলে।

লোকটা চূড়ান্ত ভড়কে গিয়ে কেঁদে ফেল-ছ্যার, মুই কিছু জানি না। রাইতে মোটা মতন ভজা হরি নামে দুইডা ব্যাডা হাঁড়ি করে মাছ দিয়া যায়, বিলে ছাড়ার জন্য। মাছের পোনা বিলের জলে ছাড়লে সাত আটশো টাকা দ্যায়। 

-ভজা হরিকে চেন?

-না ছ্যার, সন্ধার পর আহে। আমাগো গেরামে থাকে না, কোথা থাইক্যা আহে জানি না। নগদ দুইডা পয়সা পাই বলে জানার ইচ্ছাও হয় নাই। লোক দুইডা কইল, আমরা তোগো জিয়নী গো ভাল চাই। বিলে এই মাছের পোনা ছাড়, দেখবি বিলের মাছে তোগো সাত পুরুষ ধনি হয়ে যাবে। রাতেই ছাড়তে হয় এই পোনা, কাউরে এখন কবি না কিন্তু। 

-কি মাছের পোনা?

-মুই জানি না। হাঁড়ির মুখ তো কাপড়ে বাঁধা থাকে। একদিন মুখ খোলার সময় একটা মাছ লাফাইয়া পড়ছিল, আঁন্ধারে লাগল কুচয়্যা মাছের মতন। এবার মোরে ছাইয়্যা দ্যান ছ্যার। আর কোনোদিন মাছ ছাড়তে আমু না।

-এখনই ছাড়া যাবে না, পুলিশকে হ্যান্ড ওভার করতে হবে। অবন লোকটাকে তোমরা ওকে নিয়ে চল। সাবধানে যেতে হবে। আশেপাশে ওর দলের লোক লুকিয়ে থাকতে পারে। 

আবন আর কনিষ্ক লোকটার দু’দিক থেকে ডানা ধরে টেনে নিয়ে চলল কটেজের দিকে। পিছনে তানিয়া-হুমারা উত্তেজিত। 

কটেজ গেটে একটা জীপ দাঁড়িয়ে আছে। তারা সেখানে পৌঁছাতেই গাড়ি থেকে নেমে এলো এক পুলিশ অফিসার। সে প্রোষিতের কাছে এগিয়ে এসে বলল-গুড ইভিনিং স্যার, আমি পূর্বস্থলী থানার ইনস্পেক্টর ইন চার্জ। বিডিও সাহেব বলল আপনি এসেছেন, রাতে এদিকটায় প্যাট্রোল পাঠাতে। ভাবলাম আমিই যাই, আপনার সঙ্গে দেখা করে আসি।

-আপনি আমাকে চেনেন নাকি।

-আরে আপনাকে ইউনিফর্ম সার্ভিসের অনেকই চেনে। তা ছাড়া স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকেও একটা নির্দেশ এসেছে। হঠাৎ করে লোকটার উপর তার চোখ পড়ল-এই ভাই, তোমরা এই জেলেটাকে অমন করে ধরে এনেছ কেন? ও বিলে মাছ ধরে আর পূর্বস্থলী বাজারে বিক্রি করে। এই তোর নাম কী?

-ছ্যার, বুধু নাইয়া।

-আই সি সাহেব, ঘটনাটা পরে বলব। ওকে কয়েকদিন আটকে রাখা জরুরী।

-হাবাগোবা জেলেটাকে আটকে কী করব?

-আপাতত কয়েকদিন ওকে সেফ কাস্টডিতে রাখা দরকার।

-শুনেই বুঝেছি, আপনার আসার উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়েছে কোনো জলজ প্রাণির কামড়ে মারা গেছে?

প্রোষিত হাসল-আপনারা কি প্রাণিটির নাম জানেতে পেরেছেন?

আই সি আমতা আমতা করে –না, তা পারিনি। তবে আমার মনে হয়, পিরানহার ঝাঁকের সামনে পড়েছিল রাখাল হালদার। যা রাক্ষুসে মাছ। কতগুলো কামড়ের দাগ দেখেছেন?

-পিরানহার ঝাঁকের সামনে পড়লে হাঁড় থেকে মাংসের শেষ টুকরো পর্যন্ত খুবলে নিতে লাগত মাত্র পাঁচ মিনিট। লোকটার গায়ে দাঁতের দাগ ছিল শুধু, মাংস খোয়া যায়নি। এই হ্রদে পিরানহা আছে এমন কথা তো ফিসারি দপ্তরও জানে না। তারা খুব উদ্বিগ্ন। ফিসারি দপ্তর ঘাতকের নাম জানতে চায়। আপনার হেল্পও লাগবে। 

-আচ্ছা স্যার। গুড নাইট।

-গুড নাইট।

আই সি গাড়িতে উঠে বসল। বুধু আর মাছের হাঁড়িটাকে জীপে তোলা হয়েছে। হেড লাইট দপ করে জ্বলে উঠল।  স্পিড নিতে নিতে আই সি বলল-স্যার, রাতে আর বাইরে বেরনো ঠিক হবে না। 


জয়ন্ত প্রামাণিক সকাল সকাল এসে হাজির। এই সময়টা পাখি দেখা আইডিয়াল টাইম। সমীর আসেনি। তাকে রাতে কারা যেন শাসিয়েছে, জলে নামা যাবে না। প্রোষিত তাকে বলল-জয়ন্ত, কাল তুমি বলেছিলে জলধর হালদার নামে একজন খুব অভিজ্ঞ জেলের কথা। আমরা তার বাড়ি যাব।

-আচ্ছা স্যার। সে একডালা’য় থাকে। ওই যে দ্বীপের মতন গ্রামটা ওখানে জলধর হালদারের বাড়ি। ভালই হবে পাখি দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে। 

হুগলী নদীর ওপারে মায়াপুরের ইস্কন মান্দিরের চূড়া ছুঁয়ে সূর্য উঠছে। পুরো বিলে পাখির উৎসব লেগেছে। দেশি বিদেশি গ্রে-হিরন, মোর হেন, শামুক খোল, গ্রে লঙ্গুর, অসস্প্রে, চখা-চখীর মতো কত যে পাখি জলে। পাখিরা চুপি-কাষ্টশালীর মানুষজনের দেওয়া নিরাপত্তায় বিশ্বাস রাখে। তারা যেন পাখিদের কুটুম। জয়ন্ত নৌকা ভিড়াল-আমরা এসে গেছি একডালা। ডান দিকের গ্রামটাই একডালা। বিলটা এক সময় বেড় দিয়ে ঘিরে ছিল এই গ্রাম কয়টাকে। এখন বাঁওরের দুই পাড় বেঁধে মাঝের গ্রামগুলির যোগাযোগের রাস্ত করা হয়েছে।

হ্রদের ধারেই বৃদ্ধ জলধরের বাড়ি। তাকে পাওয়া গেল হ্রদের পাড়ে। একা বসে জলের দিকে চেয়ে ভাঙ্গা গলায় ভাটিয়ালি গাইছে-ওরে বৈঠা নিয়া নামলাম জলে/ মন পবনের নৌকা পাইলাম না/ আকাশ পানে মাস্তু্লে তুললাম সাদা পাল/ হাওয়া হইয়া তুমি আইলা না রে দয়াল...

-ও জ্যেঠা, বাবুরা আইছেন, আপনার লগে কথা কইতে চায়। জয়ন্ত তাকে ডাকল।

-কেডা, ও জয়ন্ত। মুই বুড়া একটা বাতিল মানুষ, মোর লগে কী কবে? এই বিল পাড়ে বইয়াই কবেন না বাড়ি যাবেন আপনেরা।

-না না, আমাদের এখানে কোনো অসুবিধা হবে না। প্রোষিত বলল।

-কন তালি।

-জলধর বাবু, এই বিলে তো আপনার অনেক অভিজ্ঞতা শুনেছি।

জলধর জলের দিকে তাকিয়ে বলল-কী অভিজ্ঞতা মুই জানি না বাবা, তবে এই বিলের জলেই মোর জন্ম। সেবার বন্যায় আমাগো একডালা ভাইস্যা গেছিল। মা পোয়াতি ছিল, নৌকার উপর মোর জন্ম হইল। সারা জীবন কাটাইলাম চুপির জলে। এখনও বিলে নামতে ইচ্ছা করে কিন্তু মাথা টলে, তাই বিলের জলের গন্ধ শুঁইক্যা দিন কাটাই। 

-এই ছবিগুলো দেখে একটু বলুন তো, কামড়ের দাগগুলি কী মাছের।

বৃদ্ধ জলধর ছবিগুলো একেবারে চোখের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করল। বেশ কিছু সময় পরে বলল-চোখেও আইজকাইল আর ভাল দেখতে পাই না কিন্তু এইডা মাছের কামড় হয় ক্যামনে? মাছ কামড়াইলে তো পুলিপিঠার নাহান দাগ হবে। গোল হয় না তো। আর ঘন কু্চি দাঁত থাকে। দুই একটা ভোঁদর নামে জল, হ্যেরা মানুষ কামড়ায় বাপের জম্মে শুনি নাই, আর ভোঁদরের নিচের পাটি দুইডা বড় দাঁত থাকে। মুই হলপ কর‍্যা কইতে পারি এই বিলের মাছ বা ভোঁদর কামড়াইলে মধ্যেখানে এমন ফুটা হবে না। আপনারা কখনও শুনছেন মাছে কামড়াইলে মাঝখানে রক্তচোষা ফুটা হয়? গঙ্গায়ও এমন দৈত্য মাছ কখনও দেখি নাই। মাছের দেবতা মাকালদেব কোনো রূপ ধরয়্যা আইছে কিনা কইতে পারমু না। শুনছি একটা মরা বোয়াল মাছের গায়েও এমন দাগ ছিল।

-একটা না জ্যেঠা, দুইডা মড়া বোয়াল ভাইস্যা উঠেছি। জয়ন্ত বলল।  

-কর্তা, আর একটা কথা বলুন, এই বিলের উপর কারও কী কোনোদিন নজর পড়েছিল?

-বাবা, বিল আমাগো কয়শো মাইনসের প্যাট চালায়। কেউ নজর দিলে হ্যের লাশ পইড়্যা যাইত না? বিপিন ঘোষ এ্যকবার বি.এল.আর.ও অফিসে গেছিল বিল ইজারা নিতে। মোরা রামদা, অ্যাওড়া, কুড়াল লইয়া রুইখ্যা দাঁড়াইছিলাম। সে আর নোলা দেখানোর সাহস পায় নাই। সে কোন যুগের কথা, বিপিন মইর‍্যা ভূত হইছে। হ্যের পোলা নাকি মস্ত বড় মাছের কারবারি। দ্যাশ বিদ্যাশের মাছ আমদানি রপ্তানি করে। বিদ্যাশি পোনার চাষ করে। 

সান্ধ্য লনে ছেলেমেয়েগুলো মোবাইলে একটু সাউন্ড বাড়িয়ে ওয়ালি ভাইদের কাওয়ালি-দমা দম মাস্ত কালান্দার ...শুনছে আর তালি বাজিয়ে নাচছে। চুপি তাদের ষোলআনা পুষিয়ে দিয়েছে। নাচতে নাচতে অবন টুক করে প্রোষিতের কটেজে এলো, তাকে বলল-স্যার, স্টেশন থেকে বেরতে গিয়ে একটা সাইনবোর্ডে দেখলাম শঙ্করপুর ফিস হ্যাচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন। জলধর দাদু মনে হলো ওই সেন্টারের কথাই বলছে। 

-গুড অবজার্ভেশন। ডিনারে আলোচনা হবে। বলেই প্রোষিত ল্যাপটপে মন দিল। 


ঘোষ ফিস ফার্ম এণ্ড্য ট্রিনিং সেন্টারের পেল্লায় গেটেই তাদের আটকে দেওয়া হলো।  ইনস্টিটিউট অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ, দারোয়ান কাউকে ঢুকতে দেবে না। প্রোষিত নিজের পরিচয় দেওয়া সত্তেও তার এক কথা, কাউকে ঢুকতে দেওয়া আ্দেশ নাই। তখনই পুলিশের একটা এস.ইউ.ভি, পিছনে একটা জীপ এসে থামল। আই সি-কে  নেমে আসতে দেখেই দারোয়ান সেলাম ঠুকল। 

আই সি জিজ্ঞেস করল-সাহেবদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছ কেন?

-স্যার, ওনরা যে আপনার লোক বলবে তো। দারোয়ানের অস্বস্তি বাড়ল।

কয়েকশো বিঘা জুড়ে ফার্ম। হুগলী নদীর সঙ্গে খাল কেটে জোয়ার ভাটার জল মাছ চাষের উপযোগী করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিছুদূর যেতেই বিপরীত দিক থেকে মাঝারি উচ্চতার একজন লোক এগিয়ে এসে স্বহাস্য বদনে আই সিকে উদ্দেশ্য করে বলল- স্যার, আপনি আসবেন আগে বলবেন তো, দুপুরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতাম। ও ভজন, স্যার এসেছে ডাব পাড়ার ব্যবস্থা কর জলদি। তারপর প্রোষিতকে এক ঝলক দেখে বলল-স্যার, ওঁনাদের তো চিনতে পারলাম না। 

-অতীন বাবু,  উনি  প্রোফেসর প্রোষিত বাগচী, সঙ্গে ওঁর ছাত্রছাত্রীরা।

-কিন্তু এখন তো ইনস্টিটিউট বন্ধ আছে। এমন হুটহাট চলে এলে হয়, আগে বলে কয়ে এলে ইনস্ট্রাকটরকে বলে রাখা যেত। 

প্রোষিত বলল-অতীন বাবু, আপনার ব্যস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনি আর ভজনরা একটু সময় দিলেই হবে। আমরা এসেছিলাম পাখিরালয় দেখতে, আপনার ফার্মের খুব নাডাক শুনে মনে হলো দেখে যাই পশ্চিমবঙ্গে মর্ডান ফিস ফার্মিং কেমন এগিয়েছে।  আপনি নাকি বহু প্রজাতির মাছ এদেশে এনেছেন। 

-ওই আরকি। মনোপিয়া, ভিয়েতনামি কৈ, পাবদা আমার ফার্মেই প্রথম চাষ শুরু হয়েছিল। আমি মাছ চাষিদের হাতে কলমে শিখাই। গরীব চাষিরা যদি একটু লাভের মুখ দেখে।

-এই সব মাছের কোয়ারেনটাইন করেছিলেন?

-এই আপনাদের এক সমস্যা, সাংবাদিকের মতো প্রশ্ন করতে শুরু করবেন। আরে বাবা এত বড় ব্যবসা কি বে-আইনিভাবে করা যায়। সামনে যে দু’টো পুকুর দেখছেন তাতে এবার ইলিশের বাচ্চা ফুটিয়েছি। একটা পুকুর থেকে আর একটা পাম্পে জল ফেলে, পাড় কেটে দিয়ে আবার উল্টো স্রোত তৈরি করা হয়েছে নদীর মতো।

আই সি জিজ্ঞেস করল-অতিনবাবু মাছে বেড়েছে?

-বেড়েছে বিঘাত খানেক, তবে গ্রথ পুওর।

প্রোষিতের ইশারায় কনিষ্ক পুকুরের কিনারে নেমে রিফ্রাক্টোমিটার সালাইনিটি যন্ত্রটি বের করে জলে লবণের মাত্রা মাপতে গেল। অতীন ঘোষ চিল্লিয়ে উঠল-এই ছেলে তুমি করছটা কী?

প্রোষিত বলল-জলে লবণের ঘনত্ব মাপছে।

-এই উঠে এসো, আমাকে না বলে আমার পুকুরের নামতে কে বলেছে?

তখনই প্রায় কনিষ্কের কান ঘেঁষে এক কাদি ডাব পড়ল। নিচ থেকে ভজন বলল-হরলাল, ঠিকঠাক ডাব ফেল। 

কনিষ্ক অন্যদিকে ছিটকে পড়ে কোন রকমে বাঁচল। তবু সে ভিজা জামাপ্যান্টে লবনের মাপ নিল। নিয়ে বলল-ফাইভ হানড্রেট পার্টস পার মিলিয়ন। ঠিকই আছে স্যার। 

অতীন ঘোষ বেঁকে বসল-আমি আর একটা পুকুরও দেখাব না।

প্রোষিত বলল-আপনি আমাদের পুকুর দেখাতে বাধ্য মিস্টার ঘোষ। 

-মামদোবাজি। পুকুর না দেখালে আপনি কী করবেন?

-ফিসারি দপ্তরের দেওয়া অনুমতি আমার কাছে আছে। কাল দুপুরে আমরা নম ভাণ্ডারটিকুরি’র কয়েকজন মৎস্য চাষীর পুকুর দেখেছি। থানার কাছে কাছে উপরয়ালাদের নির্দেশ আছে আমাদের সহযোগিতা করার জন্য। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক যুগ্ম সচিব আমদের সঙ্গে ছিলেন, তিনি নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

আই সি’র মুখ ব্যাজার। 

হরলাল নেমে এসেছে। পুরো দলটা নদীর দিকে এগোল। সব পুকুরেরই ফ্রেস ওয়াটারের লবণ ঘনত্ব মোটামুটি পাঁচশো কাছাকাছি ঘোরা ফেরা করছে। অপেক্ষাকৃত আড়ালে একটা পুকুরের স্লাইনোমিটার নামাতেই অবন উত্তেজিত ভাবে বলল-স্যার, এই পুকুরের জলে শতকরা সাড়ে তিন ভাগের বেশি লবণ আছে।  থার্টি ফাইভ পয়েন্ট টু পার্টস পার থাউজেন্ড, সমুদ্রের জলের মতো। 

প্রোষিত তৎপর হয়ে উঠল। সে আই সিকে বলল-এদের প্রত্যেকের গতি রেস্টিকট্রেট করুন। 

ইতিমধ্যে ছেলেমেয়েরা তিনজনকে ঘিরে ফেলেছে। তাগড়াই চেহারা ভজন হুমাকে ধাক্কা দিয়ে পালাতে চেষ্টা করল কিন্তু অবন অতর্কিতে তার কান সোজা ঘুষি চালাল। কান চেপে ধরে ভজন মাটিতে বসে পড়ল। আই সি’র সঙ্গে আসা পুলিশ তার ইশারায় তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা অতীন-সহ তিনজনকেই ঘিরে ফেলেছে। প্রোষিতদের গাড়ির পিছনে জয়ন্ত বসেছিল। সে একটা খ্যাপলা জাল নিয়ে নেমে এলো। প্রোষিত বলল-জয়ন্ত ওই পুকুরটায় জাল ফেলো। 

অতীন ঘোষ তর্জন গর্জন শুরু করল-আমি আপনাদের নামে মাছ চুরির কেস দেব। আই সি সাহবে, আপনি  প্রায় প্রতি সপ্তায় আমার বাগানবাড়িতে মস্তি করতে আসেন, কখনও কোনো অবৈধ কারবার দেখেছেন এখানে?

আই সি’র আঁতে লাগল, সে দাবড়ি দিল-চুপ, একদম মুখ বন্ধ করে থাকো।

-জয়ন্ত, বেশি জলে নামবে না। ধার থেকে জাল ফেল। প্রোষিত বলল।

-স্যার, কিছুই তো উঠছ না। 

-ভালো করে একটু দূরে জাল ছুড়ে দেখ।

হঠাৎ জয়ন্ত চিৎকার করে উঠল-ওরে বাপরে, স্যার বাইন মাছের মতন তিন চার ফুট লম্বা ভয়ঙ্কর মাছ উঠেছে দুই দু’টা। তেড়ে আসছে কামড়াতে। 

-সাবধান। 

অবন আর কনিষ্ক ছুটে গেল। তিন জনে ধরাধরি জালটা পাড়ে নিয়ে এলো। জাল ফেলতেই সবার চোখ ছানাবড়া। আই সি বলল-এ তো মারাত্মক সাপ।

-না, সাপের তো চেরা জিভ আর বড় দু’টো বিষদাঁত থাকে। মুখের দিকে তাকান কেমন গোলাকারে হাঁ করে আছে, চার দিকে কত সারি দাঁত। তাকিয়ে থাকুন তা হলেই বুঝতে পারবেন, মাছটার জিভ কত বিভৎস ভয়ঙ্কর।

হঠাৎ করে হুমা ছিটকে বেরোল জটলা মধ্য থেকে-হায় আল্লা, পেটের মধ্য থেকে ওটা বেরোচ্ছে?

-হুমা, ভয় নেই, ওরা জাল থেকে বেরোতে পারবে না। পেটের মধ্য থেকে যেটা বেরোচ্ছে আর ঢুকছে সেটাই জিভ কাম দাঁতের ড্রিল মেসিন। জিভের মাথায় চামড়া ফুটো করার দাঁত। 

আই সি প্রোষিতের কাছে চলে এলো-মাছটিকে আপনি চেনেন নাকি?

-বলছি আপনাকে, তার আগে গাড়ি থেকে ওই লোকটাকে নামান। 

অই সি একজন কনস্টাবলকে বলল-বুধু হালদারকে গাড়ি থেকে নিয়ে আসো।

তাকে নিয়ে আসতেই সে ক্রুদ্ধভাবে তেড়ে গেল ভজনের দিকে-আরে এই হালারপোরা মোরে ভুল বুঝাইয়া মোরে কেস খাওয়াইছে। হালাগো মুই খুন কর‍্যা ফেলামু। 

-এদের তুমি চেন বুধু? আই সি জিজ্ঞেস করল।

-এই লোক দুইডা নাম কইছে ভজা আর হরি। তবে শঙ্করপুরের বাসিন্দা না, তালি আগেই চিনতে পারতাম। 

-এই জালে যে মাছ দেখছ, এগুলো দেখেছ আগে কখনও।

-জলে পড়ার সময় একটা মাছ লাফাইয়া উঠছিল। ঠিক এই রহম। আগে যদি জানতাম এরা মানুষ খায়, তালি কী কাম করতাম। স্যার, মোরে ছাড়্যা দ্যান, মোর কোনো দোষ নাই। 

প্রোষিত বলল-আই সি সাহেব, এই তিনটাকে মনে হয় অ্যারেস্ট করতে পারেন। অতীন একটা ধূর্ত শিয়াল, চালের অন্ত নাই। এই ভজা-হরি ওর ম্যাসেলম্যান। কাল সন্ধ্যা থেকে আমাদের পিছনে লেগেছে। একটু আগে ডাব ফেলে কনিষ্ককে খুন করতে চেয়েছিল। আর বুধু থাকবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। 

অতীন, ভজা, হরিকে হাতকড়া পড়ানো হলো। বুধুকে আই সি বলল-ধনো, তুমি এখন থাকো, থানায় সই সাবুধ করিয়ে ছেড়ে দেব। বুধুর মুখে এক ঝলক স্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল।

-প্রফেসর, এবার বলুন এটা কী মাছ? আর বুঝলেন কী করে অতীন ঘোষের পুকুরেই এই রক্তচোষা বান মাছটা পাওয়া যাবে। 

-কলকাতায় বসেই মৃত রাখাল হালদারের ছবিটা পেয়ে বুঝেছিলাম এটা সি ল্যামপ্রে ফিস-এর আক্রমণে ঘটেছে। কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, চুপির হ্রদে মাছটা আসবে কোথা থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশে কেন গোটা এশিয়ায় সি ল্যামপ্রে নেই। আমেরিকার গ্রেট লেকগুলোতে এই রক্ত চোষাদের খুব উপদ্রব। ওদেশে সি ল্যামপ্রে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকার কমিশন গড়েছে। 

-তাই নাকি!

-হ্যাঁ, মাছটা বড় খতরনক। অগভীর স্বচ্ছ মিস্টি জলের লেকে এদের জন্ম হয়। তারপর লার্ভাগুলো আস্ত আস্তে সমুদ্রে নেমে যায়। তখন খাবার দাবার নিরামিষি। সমুদ্রের অ্যালগি খেয়ে দিব্যি চার পাঁচ বছর কাটিয়ে দেয়। পূর্ণ বয়স্ক হলে ডিম পাড়তে উজানে লেকের মিস্টি জলে আসে পরজীবীর দল। সেখানে এক দেড় বছর থাকে। কোনো কোনো জাতের ল্যামপ্রে তিন চার ফুট লম্বা হয়ে যায়। ওজন হয় দুই আড়াই কেজি। রাক্ষসগুলোর মধ্যে জেগে ওঠে ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসা। রক্ত চুষে টন টন মাছ শেষ করে দেয়। মানুষকে বাগে পেলেও জোঁকের মতো গোলাকৃতি মুখ বসিয়ে দেয়। অসংখ্য দাঁতে কামড়ে ধরে চামড়া। পেটের থেকে শূন্য চ্যানেল থেকে বেরিয়ে আসে জিভ দাঁত। জিভটা মোচড় দিয়ে চামড়া ফুটো করে দেয়, সেখান দিয়ে রক্ত গলগল করে বেরয়। আর দাঁতের গোড়া থেকে এক ধরণের রস নিঃস্বরণ করে, ফলে রক্ত কিছুতেই জমাট বাঁধে না। রক্তচোষারা তখন পরে ডিম পাড়ে। ডিম ফার্টিলাই হলে মেইল ফিমেল মারা যায় কিন্তু জলের নিচে রেখে যায় হাজার হাজার ভ্যাম্পেয়ারের বংশধর। 

-সর্বনাশ, চুপি লেকের সঙ্গে তো গঙ্গার সংযোগ আছে। আমেরিকার লেকের মতো। চুপিতে লার্ভা হলে অনায়সেই বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে, সময় হলে তো রক্তচোষারা ফিরে আসবে বাংলার খাল বিলে। বাংলা ছেয়ে যাবে রক্তচোষায়। কিন্তু ব্যাটা মাছটা পেল কোথায়?

 -বুঝলেন ইন্সপেক্টর সাহেবে, কিছুটা কাকতালীয়ভাবে আমরা বুধুকে ধরে ফেলি। আর বৃদ্ধ মৎস্যজীবী জলধর হালদারের কথায় খুলতে থাকে রহস্যের দরজা। বুঝে যাই ভদ্রবেশি শিক্ষিত অতীন ঘোষ মৎস্য গবেষণার নামে গোপনে বয়ে বেড়ায় বাপ বিপিন ঘোষের লালসার উত্তরাধিকার।

-তাই নাকি! জানোয়ারটার তো টাকা পয়সার অভাব নেই।

-লালসা হলো ছোঁয়াচে রোগ, শেষে আছে? ওর বাপ ছিল মাছের মস্ত আড়ৎদার। তার লোভ হয়েছিল পুরো চুপির বিলটাকে ইজারা নেবে কিন্তু জেলে চাষীদের প্রতিরোধে পিছু হাঁটে। মৎস্যবিজ্ঞান নিয়ে পড়া অতীন ঘোষের মাথায় খেলে যায় সি ল্যামপ্রের রক্তচোষা মারণ ক্ষমতা। ও রক্তচোষা দিয়ে মৃত্যুফাঁদ পাতে। জলের নিচে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টি করতে। সি ল্যামপ্রে দিয়ে দুই চারটা রক্তশূন্য লাশ ফেলতে চেয়েছিল। বোয়াল মাছ মারা যাচ্ছিল। রাখাল হালদার প্রথম শিকার। পিশাচটা এক ধাক্কায়ই অনেকটা সফল হয়েছে। বিল থেকে জেলেরা ভয়ে পালাচ্ছিল, আর সুযোগ করে ও পুরো বিলটাই আতত্মস্যাৎ করত। 

আই সি অতীন ঘোষের দিকে ঘুরেই সটান তার পাছায় বুটের লাথি মারল-বল শালা, পোনা পেলি কোথায়?

অতীন ফোঁস করে উঠল-স্যার, সবার সামনে এভাবে মারবেন না কিন্তু।

-ইস্‌ ইমানদার কোথাকার। আগে বল শালা, নইলে পাছায় তোরই রক্তচোষা লাগিয়ে দেব।

-ওরে বাবারে, ওটা করবেন না স্যার। আপনি তো জানেন আমার বিদেশ থেকে ডিম, পোনা আনার লাইসেন্স আছে। গ্রেট লেকের ফিসারি কমিশনের লোকেরা ল্যামপ্রে মাছের নিধন চালায়, আমি এক কর্মিকে দু’শো ডলার দিয়ে শ’খানেক লার্ভা ম্যানেজ করি। মাছের ক্যান্টেনারের মধ্যে ড্রামে লুকিয়ে লার্ভা নিয়ে আসি কলকাতা ডকে। সেখানেও আগে ম্যানেজ করে রেখেছিলাম, কাস্টম তল্লাশি হয়নি। তারপর আমার ফার্মেই সমুদ্রের কৃত্তিম জল আর পরিবেশ তৈরি করে ল্যামপ্রে গুলোকে বড় করেছি। বিলটা একটা বিরাট সম্পদ, বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণের বড় সাধ ছিল।  

সবাই হাঁ করে আছে লোকটার দিকে, কী করে জলের নিচে আতঙ্ক পোষে?

প্রোষিতের মাথায় কিছুতেই মেলে না, সি ল্যামপ্রে বড় রক্তচোষা না অতীন ঘোষ? অতীন ঘোষ যে গরীবের রক্ত চুষে খেতে চায়।



  

 


  

  




 


 

                              


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন