রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

আবেশ কুমার দাস।। পারক গল্পপত্র



মশারি সরিয়েই টের পেল ভাস্কর। অস্বস্তিটা নেই আজ আর একদম। অস্বস্তি! ভয়ই বলা ভাল। আসলে চৌতিরিশ বছরের দাঁড়াখাড়া একটা লোক ভয় পাচ্ছে রাতে একা শুতে, ভাবতেও কেমন লাগে।

দক্ষিণের ব্যালকনিতে ঝুলছিল একরাশ কাপড়জামা। রোজ রাতেই ঝোলে। অন্ধকারে। বিছানায় পাশ ফিরতে চোখ পড়ে যায়। ক’দিন থেকে ছ্যাঁত করে উঠছে বুকের ভেতরটা। মানুষের শরীরের মতো লাগছে অন্ধকারে মিশে যাওয়া জামাকাপড়গুলোকে। অথবা একটু ভুল হল। মানুষের ঠিক স্বাভাবিক অবয়ব অবশ্যই নয়...

কিছু করার নেই। এই ঘরেই শুতে হবে আপাতত। ব্যালকনিতেও ঝুলবে কাপড়জামা। সারাদিনই কাচাকুচি চলছে এখন। কী দিনকাল পড়ল! বাড়ি থেকে বেরোনো মানে মহা ফইজুতি। আলমারি থেকে নামানো পাটভাঙা জামাও ডেটলজলে ফেলে দিতে হচ্ছে আধঘণ্টা বাইরে থেকে ঘুরে এসেই। আর দিনভরই বাড়ির আনাচকানাচে শুকোচ্ছে গেঞ্জি, পাজামা, আটপৌরে শাড়ি। সন্ধ্যা লাগার আগে আগে বাগান থেকে, ছাদ থেকে, খিড়কির চাতাল থেকে তুলে আধশুকনো কাপড়গুলোকে মেলে দেওয়া হয় ব্যালকনিতে।

দোতলার এই পশ্চিমের ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিটা। ঘরটা মা-বাবার। দু’জনেরই ঠান্ডার ধাত। বসানো হয়নি এসি মেশিন। ভাদ্রের ভ্যাপসা রাত। দক্ষিণের বড় জানলাটা এঁটে শোওয়ার কথা ভাবাও যায় না। আবার খোলা থাকলেও পাশ ফিরতে চোখ চলে যায় ব্যালকনির দিকে...

পুচাই-মনাইরা এসেছিল এপ্রিলের মাঝামাঝি। সেই থেকেই এ-ঘরে চলে এসেছে ভাস্কর। আসলে তিনটে বিছানা বাড়িতে। একতলার ডিভানটা সিঙ্গল বেডের। বাবা এখন শোয় ওখানে। এ-ঘরের খাটটা পাঁচ বাই সাতের। লম্বায় তিনজনে কুলোবে না। আড়ে শুলেও পা ঠেকে যায় মশারিতে। ভাস্কর-জয়িতার খাটটা সেখানে ছয়-সাতের। মাথায় খাটো তিনজনে আড়ে শুতে পারে অনায়াসে। জয়িতার অনুপস্থিতিতে বেডরুমটা আর আটকে রাখেনি ভাস্কর। দুই বোনঝিকে নিয়ে মা ইদানীং শুচ্ছে ওখানেই।

ক’দিন ভাবছিল। একতলায় চলে গিয়ে এ-ঘরে ফিরে আসতে বলবে নাকি বাবাকে। সাতপাঁচ ভেবে আর পাড়েনি কথাটা। আসল কথাটা তো আর বলা যায় না মুখ ফুটে। বললেও বিশ্বাস করবে না কেউ। হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। যদি এপ্রিলেই কায়েম হত এই ব্যবস্থা, সমস্যা ছিল না। কিন্তু এখন বলতে গেলে চলে আসবে অনেক জটিলতা। একেই বিয়ের পর না চাইলেও দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় মা-বাবার সঙ্গে ছেলের...

মোটর সাইকেলে সাঁইথিয়া যাওয়ার কথাটাতেই যেমন সন্তুষ্ট হয়নি মা। মুখে কিছু বলছে না। কিন্তু বুঝতে পেরেছে ভাস্কর। সামান্য ঘর বদলানো নিয়ে আর জটিলতা বাড়িয়ে লাভ নেই। কোনও কিছুই তো আর চিরন্তন নয়। ট্রেন চালু হবে। আবার সপ্তায় সপ্তায় বাড়ি ফিরবে জয়িতা। জুনের পর দু’ দফায় সাতদিন করে এসে ঘুরে গেল যেমন। ওই ক’দিন তো জয়িতাকে নিয়ে নিজের ঘরেই শুয়েছিল ভাস্কর। তাছাড়া পুচাই-মনাইরাও কি আর এ-বাড়িতে পড়ে থাকবে চিরকাল!

ভিডিয়োকল শেষ করে না-ঘুমোনো অবধি অগত্যা এককাতে শুয়ে থাকছে ইদানীং ভাস্কর। জানলার দিকে পেছন ঘুরে। নেহাত পাশ ফিরতে হলেও বুজে থাকছে চোখ...

হত না এসবের কিছুই। সব হিসেব ওলট-পালট করে দিল এই শালার লকডাউন। ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে হল। আর মার্চের শেষেই টানা আড়াই মাসের জন্য বাড়িছাড়া হতে হল জয়িতাকে। কিছু করারও ছিল না। হেলথের স্টাফ। জুনে গাড়িঘোড়া পথে নামতে আসতে পেরেছিল অবশেষে। টানা ভাড়ার গাড়িতে। প্রায় পৌঁনে দুশো কিলোমিটার রাস্তা। সপ্তায় সপ্তায় যাওয়া আসা পোষায় নাকি! মাসে একবার করে এলেও অন্তত দিন সাতেকের ছুটি আর তিন-চারজন সঙ্গী না পেলে কুলোয় না ভাড়ায়। ছুটি বলতে এই পরিস্থিতিতে অবশ্যই নরমে গরমে ম্যানেজ করা আনঅফিশিয়াল লিভ। আর সঙ্গী বলতে ইছাপুরের স্বাতী, হালিশহরের অলিভিয়া বা কল্যাণীর প্রীতম। চুঁচড়ো, পাণ্ডুয়ার লোকও আছে দু’-একজন। হেলথেরই স্টাফ সব। কেউ আছে মল্লারপুরে। কেউ রামপুরহাট। গণদেবতার পরিচিতি। তা সেই ট্রেন যতদিন না চালু হচ্ছে আবার, এভাবেই দেড়-দু’মাসে একবার করে এসে ঘুরে যেতে হবে।

ততদিন এই পশ্চিমের ঘরে দক্ষিণের ব্যালকনির লাগোয়া জানলা খুলে শুতে হবে ভাস্করকেও। সমস্যা তো ছিল না কিছুই। কী যে হল হঠাৎ! সেই ক্লাস সেভেন-এইটের বাচ্চা ছেলেটা কি আর আছে ভাস্কর! তখন লাগত এমন ভয়। বাবলিদার বাবার ঘটনাটা শুনেছিল সদ্য সদ্য। রাতে একা বাথরুমে যেতে গা শিরশির করত। এই বুঝি সামনে চলে এল...

তারপর কলেজ গিয়ে বদলে গেল কতকিছুই। খুঁজে খুঁজে বের করেছিল বরার সেই অশ্বত্থগাছটাকে। অনেক লোক নাকি গলায় দড়ি দিয়েছিল গাছটায়। একদিন সন্ধ্যাবেলা সাইকেল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পেচ্ছাপ করে এসেছিল গাছটার গুঁড়িতে।

সেই লোক নাকি আজ ভয় পাচ্ছে রাতে একা শুতে! তাও নিজের বাড়িতে...

কবে থেকে আবার শুরু হল সমস্যাটা! মনে করার চেষ্টা করছিল ভাস্কর। রাজার অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা শুনে থেকেই কি! হতে পারে। সকালের টিউশন সেরে ফেরার পথে দেখে এসেছিল মনাই। বডি এসেছে রাজার। বাজারের উপরই বলতে গেলে বাড়ি। এই পরিস্থিতিতেও জমে গিয়েছিল ভিড়। আর আছাড়িপিছাড়ি কাঁদছিল রাজার দিদি।

এসব শুনলেই খারাপ হয়ে যায় মনটা। মানুষ তো মরবেই। অল্প বয়সে মরাও কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু বডি আসবে অথচ শেষ-দেখা আর দেখা হবে না বাড়ির লোকের— এটাই খারাপ লাগে। রাজার বডিও এসেছিল কালো প্লাস্টিকে মুড়ে। দূর থেকে একঝলক দেখেছিল মনাই। প্লাস্টিকটা। খেতে বসে বলছিল, ওইটুকু প্লাস্টিকের মধ্যে যে ধরে যায় মানুষের শরীর...

অ্যাই চুপ কর তো, তাড়া দিয়েছিল মা, খাওয়ার সময় যত অখদ্যে-অবদ্যে আলোচনা তোদের। ভাল্লাগে না একদম।

মাথা নীচু করে খাচ্ছিল ভাস্কর। আড়চোখে একবার দেখে নিয়েছিল মাকে। কেন যে টিকটিক করে মা, বোঝে ভাস্কর। চুপ করে যাচ্ছে বারেবারে ইদানীং। মোটর সাইকেলে সাঁইথিয়ায় যাওয়ার কথা উঠলেই...

এদিকে জয়িতাও প্রায় রাতেই তুলছে কথাটা। যেতে বলছে। অগাস্টের শুরুতে শেষবার এসেছিল। এক্ষুনি আবার আসা মুশকিল। নিজে হয়তো ম্যানেজ করতে পারবে ক’দিনের ছুটি। কিন্তু ভীষণ কড়াকড়ি এখন রামপুরহাট ব্লকে। যখনতখন ভিজিটে আসছে সিএমওএইচ অফিস থেকে। যাকে পাচ্ছে না ঠুকে দিয়ে যাচ্ছে শো-কজ। প্রীতমরা না এলে মোটে দু’-তিনজনে পোষাবে না গাড়িতে এসে। তাছাড়া শুধু এলেই তো হল না। ফেরার খরচও আছে। তার চাইতে ভাস্কর গিয়ে যদি থেকে আসে দশ-বারোদিন। বাড়ি বসে অফিসের কাজ তো সাঁইথিয়ায় থেকেও করা যায়।

কথাগুলো ভুল নয়। জয়িতার দিকটাও বোঝে ভাস্কর। আর জয়িতাই তো নয় শুধু, সম্পর্কটায় জড়িয়ে আছে সে নিজেও। সাতমাসও পুরোয়নি বিয়ে হয়েছে। মাঝের বেশিটা সময়ই খেয়ে নিল লকডাউন। তাও তো বাড়িতে আছে ভাস্কর। এপ্রিল থেকে এসে রয়েছে দুই মাসতুতো বোন। ঘোর লকডাউনের মধ্যেও বাজারে বেরিয়ে দেখা হত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। কিন্তু জয়িতা...

এসব সাতপাঁচ ভেবেই আর নাকচ করতে পারেনি প্রস্তাবটা। যেতেও পারেনি।

ঝুলিয়ে রেখেছে এটা-সেটা অজুহাত তুলে...

ভাবতে হবে জয়িতার বাড়ির পরিবেশটাও। আজ সবাই ঘরে। কিন্তু খুড়তুতো ভাইদের মোটর সাইকেলে হরদম হিল্লিদিল্লি করতে দেখেছে মেয়েটা এই সেদিনও। চন্দনের ঘোরাঘুরি তাও ব্যবসার কাজে। বাংলার মধ্যেই। সুজন তো দিঘা যাওয়ার কথা বাড়িতে বলে গিয়ে উঠেছিল গোয়ায়। একুশ না পেরোতেই মোটরবাইকের চাবি হাতে পেয়ে গিয়েছে তর্পণও। অল্প বয়সে জয়িতার বাবাও শিমুলতলায় গিয়েছিলেন নিজের বুলেট নিয়ে। সেই আমলের বুলেট। পাঁচশো সিসি-র। জয়িতা অবশ্য ছোট থেকে মানুষ অনেক রক্ষণশীলতার মধ্যেই। ঘেরাটোপে। মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ পরাও নাপসন্দ ভাস্করের শ্বশুরবাড়িতে।

এসব বিধিনিষেধ আবার নেই এ-বাড়িতে। সেই তুলনায় অনেক লিবারাল। অল্পস্বল্প পানাহারেও আপত্তি নেই তত। ছাদে কত পিকনিক হয়েছে বন্ধুবান্ধব নিয়ে। সৌম্য, অমিত, বিতনুদের কথা বাঁয়ে থাক। পিয়ালি, অজন্তারাও এসে ঠোঁট ছুঁইয়েছে বিয়ারের বোতলে। এমন পিকনিকের কথা আবার ভাবতেও পারবে না ও-বাড়ির ছাদে চন্দন বা সুজন। কিন্তু দু’ চাকা নিয়ে যথেষ্ট ভয়ভীতি আছে এ-বাড়িতে। ব্যারাকপুর-বেলঘরিয়া অবধি ঠিক আছে। তার বেশি গেলেই ভয়। জেদাজেদি করে কতবার চলে গিয়েছে অবশ্য ভাস্কর। যতক্ষণ না বাড়ি ফিরেছে সমানে ঘরবার করেছে বাবা। কুটোটিও দাঁতে কাটেনি মা। সেখানে সাঁইথিয়া...

কিন্তু এখন কিছু বলতেও পারছে না দু’জনের কেউই। বাবা তো বলা ছেড়ে দিয়েছিল বহুদিনই। মা বলত। জয়িতাই যেতে বলছে শুনে এই পরিস্থিতিতে আর ঠোঁট ফাঁক করেনি মা-ও।

অথচ এই তো ক’ রাত আগেও খোলামেলা কথা হচ্ছিল মার সঙ্গে। মনাইয়ের আর-একটা টিউশন ধরা নিয়ে। খেয়েদেয়ে উপরে চলে এসেছিল পুচাই-মনাই। বিছানা ঝেড়ে মশারি টাঙাতে। মা-ই সরিয়ে দিয়েছিল আসলে ওই ছুতোয়। অ্যাকোয়াগার্ড থেকে জল ধরছিল তখন ভাস্কর। এঁটো বাসন নামিয়ে হাত ধুয়ে এসে বসল মা। বলল, ছোটটা তো আবার একটা টিউশনি ধরছে...

সে কী! আর পারবে! কতগুলো করবে আর!

কী করবে। মেসোর শরীর ভাল নয়। রোজদিন দোকানও খুলতে পারছে না এখন...

আবার বাড়ল নাকি সুগারটা!

হতে পারে। চিন্তায় চিন্তায়। আর দোকান খুললেও সেই বেচাকেনা কি আর আছে...

জানে ভাস্কর। ভাবলেই কেঁপে ওঠে বুকের মধ্যেটা। মাসি-মেসোর কথা ভেবে। কলেজপড়ুয়া বয়স্থা মেয়ে দুটোর ভবিষ্যৎ ভেবে। অতগুলো টাকা নষ্ট করল নিজেরা হাতে করে। বারবার নিষেধ করা হয়েছিল তখন। তাড়াতাড়ি বেশি লাভের আশায় ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিস থেকে তুলে তুলে টাকাগুলোকে বেসরকারি জায়গায় না বসাতে। এখন হাত ফাঁকা। তাতে ছোট ব্যবসায়ীদের শিরদাঁড়া একেবারে ভেঙে দিয়েছে লকডাউন। রোজগার তলানিতে। যা জমা আছে ভেঙে ভেঙে আর ক’দিন! তাই তো এবেলা-ওবেলা টিউশন ধরেছে হালে পুচাই-মনাই। যতটা পারে বাবার হাতে হাতে জোগান দেওয়া। এসবের আগাম আঁচ পেয়েই না দুই বোনঝিকে নিজের কাছে এনে রেখেছে মা। সেই এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকেই। তৃতীয় দফায় সেই যেবার বাড়ল লকডাউনের মেয়াদ। এখানে থাকলে তাও দু’ বেলা মাছটা-মাংসটা অন্তত খেতে পাবে মেয়ে দুটো।

এসব কথাই হচ্ছিল সেদিন রাতে নীচে বসে মায়ের সঙ্গে। প্রায় সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছিল শুতে আসতে। মুখ থমথমে হয়ে গিয়েছিল জয়িতার। বলছিল, বাবা, রাতের এই দেড়-দু’ ঘণ্টার ভিডিয়োকলই তো অক্সিজেন সারাদিনের...

বাকিটা বুঝি কার্বন ডাই অক্সাইড!

ইয়ার্কি কোরো না তো। ভাল লাগছে না...

অনেক মেহনত করতে হয়েছিল সেদিন মেয়েটার মান ভাঙাতে।

সেই রাতেই হঠাৎ কথাটা পেড়েছিল জয়িতা। শুনেই কেঁপে উঠেছিল বুকটা। সেদিনই প্রথম। মনে পড়ছে এখন। তখনও কিন্তু বেঁচেই আছে রাজা। সেদিনের ভয়টা আসলে ছিল অন্য জাতের। অ্যাক্সিডেন্ট-ফ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে নয়...

যা ভয় করেছিল সেটাই ফলল অতঃপর। যে মায়ের সঙ্গে অত কথা হল আগের রাতেই, জয়িতার আবদার শুনে কেমন গুটিয়ে গেল সেই মা-ই পরদিন থেকে।

বিয়ের পর না চাইলেও যে কোত্থেকে তৈরি হয়ে যায় এই দূরত্ব...

দুই তরফেরই অনেক কথা এখন নিজের মধ্যেই রেখে দিতে শিখছে ভাস্কর। নিজে থেকেই শিখছে। কেউ কিন্তু দিচ্ছে না উপদেশ। একেই কি বলে পরিণতি!

মনে পড়ে মাত্রই এক বছর অতীতের সেই পুরনো পৃথিবীটার কথা। রোজ রোজ এত রাশি রাশি কাপড়জামা ব্যালকনিতে ঝুলত না রাতে। অন্ধকারে আচমকা চোখ চলে গেলে ছ্যাঁত করে উঠত না বুকের মধ্যেটা। মনে হত না বাসের চাকায় তালগোল পাকিয়ে যাওয়া, বেলচা দিয়ে খুঁড়ে তোলা রাজার শরীরটাকে মোড়ানো কালো প্লাস্টিকটা ঝুলছে তার থেকে। কোনও কিছুতেই ছিল না ভয়ডর। যার যে কথাটা, যে ব্যবহারটা মনে হত অনৈতিক, সোজাসুজি বলে দেওয়ার সাহস ছিল মুখের উপর। সেই সাহস ছিল বলেই হয়তো ছোটবেলার সব অমূলক ভয়গুলো পালিয়েছিল খিড়কির দোর দিয়ে। আজ সংসারের সুস্থিতির প্রয়োজনে যতই চেপে রাখছে সবকিছু নিজের মধ্যে, বালখিল্য ভয়গুলোও একে-একে হাজির হচ্ছে সটান সদর দিয়েই। ভয়গুলো যে অমূলক, ভয়গুলো যে বালখিল্য— বেশ বোঝে ভাস্কর। সত্যিই তো আর তাকালেই ব্যালকনির গ্রিলের ফাঁকে আজ দেখতে পাবে না বাবলিদার বাবার সেই মোজা পরা পা দুটো। শুধু যে চিহ্নটুকুর সূত্রে এক সপ্তা পর মর্গ থেকে শনাক্ত করা গিয়েছিল বড়বাজারে মাল তুলতে গিয়ে বেমালুম উবে যাওয়া মানুষটাকে। কিন্তু সব বুঝেও আর ব্যালকনির দিকে তাকাতে পারছে কই আজ ভাস্কর! যেভাবে দু’ তরফের কেউই ভুল নয় বুঝেও পারছে না মাঝখানে জমে থাকা বরফটাকে কিছুতেই গলাতে। শেষে বুঝে নিয়েছে অনেক কথা এখন থেকে চেপে রাখতে হবে নিজের মধ্যেই। এর নামই যদি হয় পরিণতি, তার মূল্য কি তবে এতটাই! এতকালের স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বটাকে স্রেফ বদলে যেতে দেওয়া...

সংসারে এত মূল্য দিতে হয় বুঝি পুরুষকে! টের পায়নি তো আগে! ব্যালকনির অন্ধকারে সিগারেট টানতে টানতে ভাবছিল ভাস্কর। উপলব্ধি করছিল ভয়টা একদমই নেই আজ আর। আর তাই বিগত ক’ রাতের মতোই ভয়টা পেতেই চাইছিল প্রাণপণে। চাইছিল আঁতকে উঠতে। নেট থেকে খুঁজছিল বীভৎস অ্যাক্সিডেন্টের ছবি। দেখতে চাইছিল একটা দলা পাকানো মৃতদেহের চিহ্ন। এক রাতের মধ্যে আচমকা খোলসা হয়ে গিয়েছিল এই আচমকা ভয়ের যাবতীয় নেপথ্য রহস্য।

নেট অন করতেই বুঝেছিল ক’টা নোটিফিকেশন ঢুকেছে ফেসবুকে। খুলে দেখে মনাই-এর ট্যাগ করা পোস্টটায় লাইক-রিঅ্যাক্ট দিয়েছে কেউ কেউ। হেসেই ফেলল ভাস্কর...

রাগটা কমে আসছিল ধীরে ধীরে। মনে পড়ছিল, দশ মিনিটও ছিল না আজ ভিডিয়োকলে।

তার মধ্যেই যা নয় তাই বলা হয়ে গেল জয়িতাকে...

মাকে বলেছ মনাইকে বারণ করতে? এসব পোস্টে আর ট্যাগ করতে?

বলেছি। পছন্দ হয়নি আমার পোস্টটা...

সবই তোমার পছন্দমাফিকই চলবে এ-কথা মনে হল কেন! কী শুরু করেছ কী তুমি! সবেতেই খুঁজে খুঁজে ঠিক একখানা ঝামেলা বাধানো।

যা বোঝো না বলবে না তো একদম, তখন সুর চড়েছে জয়িতারও, কেন বলেছি বোঝো! এসব মেয়েলি ব্যাপারে থাকবে না তুমি একদম...

যেন ঘি পড়ল আগুনে। দপ করে জ্বলে উঠল মাথার ভেতরটা। ভিডিয়োকল চলছিল। ফোনের পর্দার এককোনায় নিজেরই গনগনে মুখখানা দেখতে পাচ্ছিল ভাস্কর। যেন আগুনের হলকা ঠিকরে বেরোচ্ছিল বিস্ফারিত চোখ দুটো থেকে। সত্যযুগ হলে বোধহয় স্রেফ ভস্ম হয়ে যেত জয়িতা।

তার মানে! আমার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে তুমি আর আমি কিছু বলব না! কী ভেবেছ তুমি! বিয়ের সময় দাসখত লিখে দিইনি আমি। অনেককিছুই অপছন্দ হতেই পারে তোমার। কিন্তু সব ব্যাপারে কথা বলতে যাওয়া বন্ধ করো। অন্যের প্রাইভেট স্পেসকে সম্মান করতে শেখো। কোনও সমস্যা মনে হয়নি আমার পোস্টটায়। আফটার অল আমরা দুটো আলাদা আলাদা মানুষ। পছন্দ-অপছন্দও আলাদা হতেই পারে। রাইট? জাস্ট কথা বলতে ইচ্ছে করছে না আজ আর...

আর একটাও শব্দ খরচা না করে কেটে দিয়েছিল ফোনটা।


ঘুমচোখ খুলে থেকেই খচখচ করছিল মনটা। আহা, সেই কবে থেকে একা-একা সাঁইথিয়ায় পড়ে রয়েছে মেয়েটা! ভিডিয়োকলের আশায় হাপিত্যেশ করে বসে থাকে। আর এতগুলো কথা শুনিয়ে দিল কাল ভাস্কর...

আসলে রাগ পড়ে গেলে সে বরাবরই অন্য মানুষ।

খেয়েদেয়ে ল্যাপটপ নিয়ে খানিক বসেছিল কাল রাতে। মিনিট দশ-পনেরোর কাজই ছিল। শেষ করে এনেছে। তখনই ঘরে এসেছিল মনাই, দাদাভাই, তোমার সঙ্গে কথা ছিল একটা...

বল।

আমি বাড়ি চলে যাব কালকে...

সে কী! কেন রে!

এমনি...

আর পুচাই?

ও কী করবে জানি না। কিন্তু আমি চলে যাব...

অবাক হয়ে গিয়েছিল ভাস্কর। কিন্তু আর কিছু না ভেঙেই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল মনাই। পরে মায়ের কাছে সবটুকু শুনে মেজাজ খাপ্পা হয়ে উঠেছিল ভাস্করের। ফেসবুকের সামান্য একটা পোস্টে ট্যাগিং থেকেও জল গড়িয়ে গেল এতদূর!

রোড অ্যাক্সিডেন্টে ক’দিন আগেই মারা গেল ভাটপাড়ার একটা ছেলে। খবরটা বাজারেও বলাবলি করছিল সেদিন কেউ কেউ। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিল। হেলমেট ছিল না সেদিন। মোটর সাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে চোট লেগেছিল মাথায়। আর জ্ঞান ফেরেনি। এই অবধি কিছুই বিশেষত্ব ছিল না খবরটায়। কিন্তু ফেসবুকে পোস্টটা অত শেয়ার হয়েছিল অন্য কারণে। ছেলেটা মারা যেতে শরীরের চারখানা অরগ্যান ডোনেট করেছে ওর বউ। মরে গিয়েও চারটে অন্য লোকের শরীরে বেঁচে থাকবে ছেলেটা...

ওই কারণেই পোস্টটায় ভাস্করকে ট্যাগ করেছিল মনাই।

সাড়ে সাতটার দিক করে একবার বাড়িতে ফোন করে জয়িতা। ভাস্করকে নয়। মা বা বাবার ফোনে। মামুলি কথাবার্তা হয় খানিক। এই সময়টা সচরাচর ধারেকাছে থাকে না ভাস্কর। মা-বাবা ওই সময় বসে থাকে ড্রয়িংরুমে। টিভিতে বাংলা সিরিয়াল চলে। ধারেকাছে না থাকার সেটাও একটা কারণ...

আর কাল তো বাড়িতেই ছিল না ওই সময়। বেরিয়েছিল। মিষ্টি আনার ছিল সকালের জন্য। সিগারেটও ফুরিয়ে এসেছিল।

কী কথা হয়েছে জয়িতার সঙ্গে বাড়ি ফিরতেও বলেনি মা...

হয়তো ভেবেছিল মনাইকেই বুঝিয়ে বলবে সরাসরি। মনাই যে একেবারে বাড়ি চলে যাওয়ার কথা বলে আসবে ভাস্করকে, আঁচ করতে পারেনি মা-ও হয়তো। নতুন টিউশনটা সেরে ফিরতে ফিরতে প্রায় ন’টা হয় মনাইয়ের। তখন কি আর পাড়া যায় ওসব কথা! খেয়েদেয়ে উঠে যখন ল্যাপি নিয়ে বসেছে ভাস্কর, তখনই পাশের ঘরে মনাইকে ডেকে কথাটা বলেছিল মা।

তাও অত রেগে হয়তো উঠত না ভাস্কর। জয়িতার কথার সুরেই তখন চড়ে গিয়েছিল মেজাজ...

সকাল থেকে খারাপ লাগছিল মনটা।

কিন্তু দশটা থেকে ডিউটি থাকে জয়িতারও...

দুপুরে খেয়েদেয়ে ফোন করল ভাস্কর।


লাইটপোস্টের আলোটা খারাপ হয়ে বসে আছে ক’দিন থেকে। গলির ভেতর একটাই পোস্ট। ভাস্কর-জয়িতার দক্ষিণখোলা বেডরুম থেকে তাও দেখা যায় দূরে বড়রাস্তার আলো। কিন্তু পশ্চিমের ঘর আর লাগোয়া ব্যালকনি থেকে আদহাটা রোডকে আড়াল করে রাখে মাঝে বিল্লুদের বাড়িটা। বেশি রাতে একেবারে নিকষ অন্ধকার হয়ে থাকে গলিটা। সন্ধ্যাবেলায় যার যার বাড়ির জানলা থেকে ঠিকরে আসা আলোয় সমস্যা হয় না অতটা। আর দায়ে না পড়লে রাস্তায় বেরোচ্ছেই বা কে এখন! কিন্তু বেশি রাতে যখন একে-একে নিভে আসে ঘরবাড়ির আলো, গলির ভেতর এক্কেবারে ভূতুড়ে অন্ধকার...

দেড়টা বাজে। ভিডিয়োকল শেষ হল এই সবে। 

দুপুরেও অনেকক্ষণ কথা হল আজ জয়িতার সঙ্গে...

শেষ অবধি সবটাই চুকে গিয়েছে ভালয় ভালয়। মা বোঝানোয় থেকে গিয়েছে মনাই-ও।

একটু আগেও দুপুরের কথাটাই আবার বলছিল জয়িতা, আমি বুঝেছি অত ভেবে ট্যাগ করেনি ও। এখন বুঝবেও না ও কেন এত চিন্তা করছি আমি। তুমিও বুঝতে পারবে না। কিন্তু আমার দিকটা ভেবে দেখো তো একবার। দু’দিন পর তুমি সাঁইথিয়ায় আসছ। এতটা রাস্তা। তার আগে যদি এমন পোস্টে কেউ তোমাকে ট্যাগ করেছে দেখি আমি...

কিছু একটা বলতে গিয়েছিল ভাস্কর।

কিন্তু না থেমে বলে যাচ্ছিল জয়িতা, আজ যদি তুমিও দেখো, কোনও ডাক্তার মারা গেছে কোভিডে আর হেলথের স্টাফদের রেসপেক্ট দেখিয়েই পোস্ট দিয়েছে কেউ ফেসবুকে, তুমিও কি চিন্তা করবে না আমার জন্য...

যুক্তিটা একেবারে ফেলে দিতে পারেনি ভাস্কর।

মাঝেমধ্যে একসঙ্গেই হয়ে যায় একাধিক সমস্যার সমাধান। জয়িতা নিজেই বলছিল আজ, এখন সাঁইথিয়ায় আসার দরকার নেই তোমার...

গায়ের জোর দেখাতে গেলে সমস্যা বাড়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বরং চুপ থাকলে আর কূটনীতির পথ নিলে মিটে যায় সব সমস্যা। বহুদিন থেকে বহু লোকের মুখেই কথাটা শুনেছে ভাস্কর। নিজেও যে অবিশ্বাস করত, তা নয়। কিন্তু বোধহয় ইগোয় বাধত নিজেকে বদলে ফেলায়। যাক, শান্তিতে ঘুমোনোর কথাই ছিল আজ রাতে।

কিন্তু বড্ড অন্ধকার গলিটা। আর ব্যালকনিতে ঝোলানো কাপড়গুলোও অন্ধকারে আকৃতি নিয়েছে তালগোল পাকিয়ে যাওয়া বিকৃত মানবশরীরের...



৩টি মন্তব্য: