রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সুব্রত হালদার।। পারক গল্পপত্র



প্রতি সোমবার করে বুট-স্যুট-টাই পরা একটা ইয়ং ছেলে হাসেমনগর বাজারে বাস থেকে নামে। বাজারটা দু-তিন বার চক্কর কেটে প্রদ্যুতের চা দোকানে বসে। খানিক্ষণ চুপচাপ থেকে এককাপ চা আর বিস্কুটের অর্ডার দেয়। চা খেয়ে কিছু সময় চুপচাপ বসে থেকে আবার ফিরতি বাসে কোলকাতার দিকে রহনা দেয়। মাস খানেক ধরে ছেলেটা এমন করছে । ব্যাপারটা বাজারের অনেকের নজরে আসে। ফিস ফিস করে নিজেদের মধ্যে বলাবলিও করে । কিন্তু কেউ মুখ ফুটে তাকে জিজ্ঞেস করে না, কেন সে বাজারে আসে, চা খায় আবার চলে যায় ? ভয়ও পায় কেউ কেউ। যদি পুলিশের গোয়েন্দা হয় ! জিজ্ঞেস করে আর বাইরের ঝামেলা কে সেধে ঘরে তোলে। আলম মোল্লা, মুরুব্বি মানুষ । বাজারের পয়সাওয়ালা দোকানদার। উটকো ঝুটঝামেলা সামলাবার ক্ষমতা রাখে। মুরুব্বি সাহেবই একদিন সরাসরি ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি বাপু আমাদের এখানকার ছেলেপিলে নও বলে মনে হচ্ছে। এলাকার দু’চারটে গ্রামের মানুষদের আমরা চিনি। নামধাম সক্কলের না জানলেও মুখচেনা সবাই। তা কোথা থেকে আসছো তুমি, বাপজান ? অপরিচিত ঘরের ছেলে। নিয়ম করে এখানে আসছো আবার ফিরে যাচ্ছো। আমরা গ্রামের মানুষ তো। তোমাকে নিয়ে সব্বাই বলাবলি করছে। তাই প্রশ্নটা আমিই সকলের হয়ে করলাম।” 


এই সময়টার জন্যে এতদিন ধরে অপেক্ষা করছিল অলোকেশ। প্রথম দিনই বাস থেকে নেমে এই হাসেমনগর বাজারে কাউকে তার দরকারের কথা পাড়তে পারতো। কিন্তু সে সেটা চায়নি। সে চাইছিল, তার প্রতি এখানকার মানুষের আগ্রহ বাড়ুক।মানুষ তাকে প্রশ্ন করুক, তার এখানে আগমনের কারণ কি ? তখন সে অতি সহজে নিজের কথা বলতে পারবে। উপুটে একজন হঠাৎ উপযাচক হয়ে কাউকে কোন কথা বলতে গেলে মানুষ তাকে পাত্তাই দেবে না। আগ্রহ ভরে কোন কথা শুনবে না। একদম সূত্রে ফেলা অঙ্কের মত মিলে গেল। এখন এই মানুষগুলো কৌতূহলের সঙ্গে তার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করছে। অলোকেশ উৎসাহ নিয়ে বলল, “আমি কোলকাতার ‘নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিঃ’ এর ডেপুটি ম্যানেজার, অলোকেশ রায়। কোম্পানী আমাকে পাঠিয়েছে এলাকার মার্কেট সার্ভে করে যে জায়গা উপযুক্ত বলে মনে হবে সেই জায়গায় অফিস খোলার সুপারিশ করার জন্যে।তা আমি জামরুল তলা, বারিকোল বাজার, বিদ্যুৎ নগর এলাকা ঘুরে দেখে আপনাদের এই হাসেম নগর বাজারটা  মনোনিত করেছি। এইজন্যেই এখানে বারবার আসছি, এলাকা দেখছি, মানুষের সুযোগ সুবিধাগুলো খেয়াল করার চেষ্টা করছি। আমার তো মনে হ’ল এখানকার সিংহভাগ মানুষ চাষবাসের উপর নির্ভর করে সংসার চালায়। আমাদের কোম্পানীর কাজ হ’ল, এলাকার চাষীদের চাষবাসে সাহায্য করা। চাষীকে সার দিয়ে, সেচের যেখানে অসুবিধা আছে সেখানে পাম্পসেট দিয়ে, ট্রাক্টর দিয়ে এবং প্রয়োজন হলে সামান্য সুদে নগদ দাদন দিয়ে সাহায্য করা। না, আপনারা ভাববেন না যে আমাদের কোম্পানীর নামের সঙ্গে যেহেতু ‘নেটওয়ার্ক’ শব্দটা জড়িয়ে আছে, সেহেতু আমরা ওই চিট ফান্ডের টাকা তোলার কাজ করতে আসছি এখানে। কোন টাকাপয়সা মানুষের কাছ থেকে নিয়ে পরে সুদ সমেত ফেরত দেবো বলে আর দেব না। সব টাকা গায়েব করে দেবো,  সেই কাজ করতে আসছি না। চাষীবাসি মানুষকে চাষবাসের সাহায্য করে বিনিময়ে যৎসামান্য সুদ থেকে যা পাওয়া যায় সেটাই আমাদের আয়।আর অনেক মানুষ যদি আমাদের সাথে যুক্ত হয়, গড় আয় কিন্তু আমাদের খারাপ হবে না। অথচ মানুষও উপকৃত হবে। এককথায় মানুষের সেবা করে যাওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য। এখন আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা যদি কেউ বা সমবেতভাবে চেষ্টা করে আমাদের জন্যে একটা অফিসঘরের ব্যবস্থা করে দেন। ভাড়ার জন্যে কোন অসুবিধা হবে না। মোটামুটি বাজার চলতি যা হয় সেই টাকাই আমরা দেব। দরকারে তার থেকে কিঞ্চিৎ বেশি টাকাও আমরা দিতে রাজি।”


ততক্ষণে অলোকেশের কথা শোনার জন্যে বাজারে এদিক সেদিক থেকে আরও মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। ওর কথা শেষ করার পর সমবেত মানুষের মধ্যে থেকে একটা গুনগুন শব্দ ছিটকে এদিক সেদিক দোল খেতে খেতে ছড়িয়ে যেতে লাগল। আলম মোল্লা খানিক চুপ থেকে বলল, “সে আপনার প্রস্তাব তো ভালই। অভাবী চাষাভুষো মানুষদের তাহলে সত্যিই উপকার হয়। আপনি আমার সঙ্গে আসুন। বাজারে আমার দোতলা দোকানবাড়ি আছে। ভুষিমালের দোকান আমার। দোতলায় বড় ঘরটা তাহলে আপনাকে দিতে পারি। আসুন দেখে যান । পছন্দ হলে কোম্পানীকে গিয়ে বলুন। সামসেদ, বাবুকে আমার ওখানে নিয়ে আয়। আর শোন, কাছে আয়, বলে আস্তে আস্তে সামসেদকে বলল, আসার সময় কানুর মিষ্টি দোকান থেকে খান দশেক সিঙাড়া আর পঞ্চাশ টাকার সন্দেশ নিয়ে আয়। সিঙাড়াটা যেন গরম গরম হয়, দেখে নিবি। মনে হলে আর একবার গরম করিয়ে নিবি।”


একটা ভাল দিন দেখে নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিঃ-এর হাসেমনগরের শাখা অফিস উদ্বোধন হ’ল। আলম মোল্লার ওই দোতলার ঘরেই অফিসটা হ’ল। আলম মোল্লার পরামর্শে এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্বোধনের দিন আমন্ত্রণ করা হ’ল। এম.এল.এ.র বাড়ি এই এলাকায় বলে, ওনাকেও ডাকা হ’ল। যেহেতু এম.এল.এ. আসছে তাই স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান সহ গ্রাম সদস্যরাও আমন্ত্রণ পেল। বেশ সাড়া জাগিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা হওয়ায় এলাকার মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মনে মনে সন্তোষ বোধ করে। অনেকে ভেবে নেয় এরা যদি সহজ শর্তে চাষের জন্যে বীজ, সার বা অন্য কাজে দাদন দেয় তো তারা আর ব্যাঙ্কের অতসব কাগজপত্র জমা দেওয়ার ঝামেলায় যাবে না। এখান থেকেই অর্থ সাহায্য নেবে। তাছাড়া ওরা তো উদ্বোধনের দিন বলেছে, ব্যাঙ্কের হারেই ঋণের টাকার উপর সুদ নেবে।


উদ্বোধনের পর দিন থেকেই নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিঃ-এর কাজ শুরু হয়ে যায়। কোম্পানী, ডেপুটি ম্যানেজার  অলোকেশ রায়কেই এই অফিসের দায়িত্ব দেয়। একজন দক্ষ অফিসার থাকলে তবেই অফিসটা জমজমিয়ে চলবে। সেই হিসেবেই কোম্পানীর এই সিদ্ধান্ত।  স্থানীয় কোন করিৎকর্মা ছেলেকে তার সাহায্যকারি হিসেবে নিয়োগ করা দরকার। সেটা অলোকেশ কোম্পানীতে পাশ করিয়ে নিয়েছে। তার বাড়িওয়ালা, শুভাকাঙ্খী, আলম সাহেবের কাছে এ’ব্যাপারে সহযোগিতা চইল। আলম সাহেব সঙ্গে সঙ্গে সামসেদ আলির কথা বলে,“ছেলেটা যেমন কর্মঠ, মাধ্যমিক পাশ শিক্ষিত তেমনি দৌড়ঝাঁপে তার কোন ‘না’ নেই। আমাদের হাসেমনগরের প্রধানের ফায়ফরমাশ খেটে ওর একলা পেট চলে চায়। বিয়ে থা এখনো করেনি। আপনি যদি ওকে কাজটা দেন, ওর যেমন একটা হিল্লে হয়,আপনাদেরও কাজ করতে অনেক সুবিধা হবে। তখন স্থানীয়ভাবে কোন ঝুট ঝামেলা আর সরাসরি আপনাকে পোহাতে হবে না। সব ওই সামসেদই সামলে নেবে। ছেলেটা এমন জেদী, একবার যদি বলে ওই কাজটা করে দেবে তো দেবেই। তার জন্যে জান লড়ে দিতে ও পিছপা হবে না। এমনি ও স্বভাব-রাগী নয়। কিন্তু একবার রেগে গেলে ওর ধারে কাছে কেউ ঘেঁসতে পারে না। তখন আমাদের গিয়ে ওকে সামলাতে হয়। বড়দের যথেষ্ট মেনে চলে ছেলেটা। তবে প্রধানের কাছে থেকে থেকে দেখছি আজকাল একটু কুট বুদ্ধি মাথায় ঢোকাতে শুরু করেছে।” এই শেষ বাক্যটা অলোকেশের মনে ধরে। কূট বুদ্ধি না থাকলে যে এই ঋণ দেওয়া-নেওয়ার কারবার চলে না, সে তো সকলে জানে। মনে হচ্ছে সামসেদই ওর যোগ্য সহযোগী হতে পারবে।


হাসেমনগর বাজারের অফিসটা এক বছর পূর্ণ হ’ল। ইতিমধ্যে কোম্পানী কোলকাতা থেকে একজন হিসেবরক্ষককে এখানে পাঠিয়েছে। তাদের যা লক্ষ্য ছিল তার থেকে অনেক বেশি মানুষ কৃষিকাজের জন্যে দাদন নিয়েছে। হিসেবরক্ষক, নিখিলবাবু এখন ব্যস্ত বাৎসরিক হিসেব তৈরী করার জন্যে। কত লোক ঋণ নিয়েছে, ঋণ বাবদ ধার্য কত সুদ তারা পরিশোধ করেছে। কার কাছে কোম্পানী ঋণের কত টাকা পাবে এবং কারা কারা কর্জের আসল টাকা শোধ করেছে, তার সবিস্তার হিসেব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিখিলবাবুকে দিতে বলেছে, অলোকেশ। কেননা হিসেব করার পর পুণরায় কার কত ঋণ দেওয়া যেতে পারে বা নতুন কাউকে ধার দেওয়া যায় কি না সেইসব সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরী। তাছাড়া যারা কর্জের আসল টাকা তো দূরে থাক, সুদ পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারেনি, তাদের জন্যে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় সেই বিবেচনাটা এখন জরুরী। কেননা কোম্পানী তো এখানে দানসত্র খুলে বসে নি। এমনিতেই অত্যন্ত কম সুদে তারা চাষীদের ঋণ দিচ্ছে। যা কোন বেসরকারি কোম্পানী দিতে পারে না। তার উপর মানুষ যদি তা মিটিয়ে না দেয় তো চিন্তার বিষয়। এই ব্যাপারে সামসেদের সঙ্গে গভীর শলা-পরামর্শর দরকার। ওই তো বেশিরভাগ চাষীকে ঋণের জন্যে সুপারিশ করেছিল। তারপর ওইসব মানুষদের হাঁড়ির খবর ও সবই প্রায় জানে।


যেসব চাষী পুরোনো ঋনের সুদ মিটিয়ে পুণরায় নবীকরণের জন্যে আবেদন করেছে এবং নতুনদের আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনার জন্যে রাখা হয়েছে, হেড অফিসের অনুমোদনের জন্যে। হেডঅফিস তা মঞ্জুরও করবে, অলোকেশ নিশ্চিত। ওদের নিয়ে তার কোন চিন্তা নেই। কিন্তু যারা সুদ দিতে পারেনি তাদের প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সামসেদ তথ্য নিয়ে এসেছে। তারা কেউই আসল তো দূরের কথা সুদও পরিশোধ করতে পারবে না। চিন্তায় পড়ে গেল অলোকেশ। সামসেদ পরামর্শ দিল,“আপনি কোম্পানীকে বলুন স্যার, যাতে এদের জমি আপনারা কিনে নিতে পারেন। এরা অভাবী মানুষ। বাজারদর থেকে একটু বেশি দাম দিলে ওরা এক কথায় জমি আপনাদের বেচে দিতে রাজি হয়ে যাবে। একটু বেশি টাকা পেলে, সেই টাকায় ওরা ছোটখাটো কোন ব্যবসা করে ভালভাবে সংসার চালাতে পারবে। ওদের রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। আর একটা কথা, এই জমি কেনাবেচার ব্যাপারটা হবে সম্পূর্ণ গোপনে। এই মুহূর্তে, তৃতীয়পক্ষ কাউকে একদম জানানো যাবে না। এখানকার আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কাজকারবার তো আপনার জানা নেই, তাই আগে থেকে বলে রাখছি। চাউর হয়ে গেলে কাজে প্রবল বাধা আসতে পারে বিভিন্ন দিক থেকে। কার কত জমি তা চাষীর মুখের কথায় আমাদের কাজ নেই। ঋণের আবেদনের সময় প্রত্যেকের কাছ থেকে তো আমরা জমির দলিলের জেরক্স কপি নিয়ে রেখেছি। ওখান থেকেই পেয়ে যাবো। আর কিছু বর্গাদারকে আমরা কর্জ দিয়েছি। ওদের তো জমির দলিল নেই। বর্গা রেকর্ডের কাগজ দেখে দিয়েছি। আগের সরকারের আমলে করা এইসব কাগজপত্র। যারা জমির মালিকের কাছে ভাগ চাষে জমি চাষ করত, তখনকার সরকার বর্গা আইন করে এইসব জমি মালিকের কাছ থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে ওই ভাগ চাষীদের দিয়ে দিয়েছে। আইনে আছে, উৎপাদিত ফসলের চারভাগের এক ভাগ মালিক পাবে আর বাকী তিন ভাগ বর্গাদারের। অথচ এই বর্গা আইনের আগে জমি-মালিক এবং ভাগচাষী উভয়ে আপোষে অর্ধেক-অর্ধেক ফসলের ভাগ পেত। এখন বাস্তবে মালিক কিছুই পায় না। সরকার পক্ষে থাকায় সব ফসল বর্গাদার বা পাট্টাদাররা গায়ের জোরে নিয়ে নেয়।তখনকার সরকারের স্লোগান ছিল ‘নাঙ্গল যার জমি তার।’ তাই নিয়ে কোর্টে প্রচুর কেস হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ জেতে, কিছু হারে। আইনের অপব্যবহার যেখানে হয়েছে সেখানে মালিকরা জিতে যায়। আচ্ছা, আপনার নামে বর্গা রেকর্ড হ’ল, আবার সেই রেকর্ড হওয়া জমি অন্য কাউকে হস্তান্তর করতে পারেন ? পারেন না। সেই বিধান আইনে নেই। জমির সত্ত্বাধিকার তার প্রকৃত মলিকের, বর্গাদারের নয়। অনেক বর্গাদার আইন ভেঙে  সেটাই করেছে। আইন বর্গাদারকে কেবল চাষ করার অধিকার দিয়েছে।ভাগ চাষীরা গরিব, এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সরকারের উদ্দেশ্য ছিল জমি পেলে এইসব ভাগচাষীদের অভাব দূর হবে। উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু ভুলটা কোথায় থেকে গেল জানেন, শুধু জমির ব্যবস্থা করলে ওই অভাবীরা কি করবে তা নিয়ে ? তার জন্যে অন্যান্য যে খরচ,  তা যোগাবে কে ? এই আপনারা যেমন করতে চাইছেন। এমনিতেই ওদের সংসারে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’, আবার চাষের খরচ !পাবে কোথায় ওরা ? তারপর হয়েছে কি, আদৌ সে লোক নির্দিষ্ট জমিটা কোনদিন চাষ করেনি, তবু তার নামে বর্গা রেকর্ড করা হয়ে গেল ! মগের মুল্লুক আরকি, এবং সেটাই অনেক ক্ষেত্রে হয়েছিল। এইসব ক্ষেত্রে মলিকরা মামলায় জিতলেও বাস্তবে অনেকেই নিজেদের জমি ফেরত পায়নি। সরকারি দলের মদতে তা মালিকদের অধরাই থেকে যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের যেমন অনেকগুলো কারণ ছিল, আগের সরকারের পতনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটাও একটা কারণ। এইসব কারণে মালিকরা ওদের উপর ভীষণ খাপ্পা। এই বর্গাদার ঋণ খেলাপীরা তো এমনিতেই টাকা শোধ করতে পারবে না। সেই সুযোগে ওই জমির মালিকদের কাছে বর্গার রেকর্ডের কাগজ নিয়ে গেলেই ওরা এক কথায় জামি বেচতে রাজি হয়ে যাবে। ওদের জমি ওরা কোনদিন ফিরে পাবে বলে ভাবে না। তারপর একসঙ্গে এতগুলো টাকা হবগা পেয়ে গেলে ওরা খুশিতে টগবগ করে ফুটবে। মধ্যিখান থেকে হবে কি, ওইসব বর্গাদাররা ছাগলের তিন নম্বর ছানার মত নাচানাচি করতে শুরু করবে। ওরা যেমন সেইসময় জমির মালিকদের কাঁদিয়েছে, এখন ওদের কাঁদতে হবে। আমার বাপ-ঠাকুরদার কত জমি ওদের হাতে আছে জানেন ? ওদের ওপর আমার খুব রাগ ! ঝামেলাটা শুরু হবে তখনই। তখনই চাউর হয়ে যাবে সবকিছু। সেইজন্যে খুব সন্তর্পনে আমাদের এগোতে হবে। আর বর্গাদারের কেসটায় আমরা হাত দেবো অনেকটা পরে। অত্যন্ত গোপনে মালিকদের সঙ্গে কথা বলে।


জাতীয় সড়কের দক্ষিণে বিদ্যুৎ নগর মৌজায় একলপ্তে বিশাল চাষযোগ্য ফাঁকা জমি। নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিঃ প্রথমে ওই এলাকার চাষীদের কৃষিঋণ দিতে সম্মত হয়েছিল। তারপর কাজে সফল হলে উত্তরে হাত দেবে, এমনই ওদের সিদ্ধান্ত। উত্তরে অবশ্য দক্ষিণের মত এতটা ফাঁকা জমি নেই। ওদিকে জামরুল তালা, বারিকোল, হাসেম নগর গ্রামগুলো অনেকটাই এগিয়ে এসেছে জাতীয় সড়কের কাছাকাছি। সামসেদ আলির কাজের পটুতায় অত্যন্ত খুশি কোম্পানী। বছর দেড়েকের মধ্যে ওকে কোম্পানী প্রমোশনের সাথে সাথে বেতনও অনেকটা বাড়িয়ে দিল। খুশিতে সামসেদও জান লড়িয়ে কাজ করতে লাগল। সামসেদের পরামর্শ মত অলোকেশ প্রত্যেক ঋণ খেলাপী এবং সুদের কিস্তি খেলাপী চাষীদের অফিসে ডাক করিয়ে কোম্পানীর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল, “হয় আপনারা ঋণের কিস্তি জমা দিন। না দিতে পারলে অন্তত বকেয়া সুদ মিটিয়ে দিন। তাহলে কোম্পানী আসল কিস্তির জন্যে চাপাচাপি করবে না। ইতিমধ্যে যারা সুদ মিটিয়ে দিয়েছেন, তাদের আমরা ডাক করায় নি। সুদ মিটিয়েছেন অথচ আমরা ডেকেছি, এমন কি কেউ আছেন ? তেমন কেউ থাকলে হাত তুলুন। কেউ হাত তুলছেন না মানে, তাঁদের আমরা ডাকিনি। তা না হলে আর একটা লোভনীয় প্রস্তাব আমরা আপনাদের দিতে চাই। আহাঃ এত গুঞ্জন হলে আমি বলব কেমন করে। দয়া করে আমার প্রস্তাবটা শুনুন। আপনাদের জন্যে প্রস্তাবটা যথেষ্ট ভাল। বাজার দর থেকে অনেকটা বেশি দরে কোম্পানী এই জমি কিনে নিতে চায়। একসঙ্গে অনেক টাকা আপনারা পেয়ে যাবেন। তাতে অন্য কোন ব্যবসা করে সংসার চালাতে আপনাদের অসুবিধা হবে না। বরং এখনকার থেকে অনেক ভাল থাকবেন। সেইসঙ্গে ঋণ এবং সুদের টাকা আপনাদের পরিশোধ করতে হবে না। কোম্পানী মুকুব করে দেবে। সবথেকে যেটা জরুরী কথা, গোটা প্রক্রিয়াটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভীষণভাবে গোপন রাখতে হবে। এই গোপনীয়তাটা আমাদের উভয়ের স্বার্থে রাখতে হবে। তার আগে চাউর হয়ে গেলে সব পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে। আপনারা প্রতিশ্রুতি দিলে আমরা  এই নতুন কাজে হাত দেব। নচেত চুক্তি মত আপনারা কাজ করুন, আমরাও আর ডাকাডাকি করে আপনাদের বিরক্ত করব না।”


বিদ্যুৎ নগর মৌজার হাজার হাজার বিঘা জমির প্রায় অর্ধেক নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিঃ-এর কব্জায় এসে যায়। চার ভাগের আর একভাগ আছে ওই বর্গা হয়ে যাওয়া জমি। এত জমি গোপনে বিক্রি হয়ে গেল, কেউ জানতে পারল না ঠিকই কিন্তু তা যে বেশিদিন চেপে রাখা যাবে না তা সামসেদ সতর্ক করে দিল অলোকেশদের। ওই চাষীরা যখন আর জমি চাষে যাবে না। তার পরিবর্তে অন্য কোন পেশায় ঢুকবে তখন সাধারণের তো চোখ আটকাবেই। তাই আর মুহূর্ত দেরি না করে বর্গা জমির আসল মালিকদের কাছে ছুটে গেল কোম্পানীর লোকজন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাকি একভাগ জমি তাদের হাতে চলে এল। এখন চার ভাগের তিন ভাগ জমি কোম্পানীর দখলে। এবার যা জমি পড়ে রইল তা অবস্থাপন্ন বড় চাষী বা বড় জমি মালিকের অধীনে। খাপছাড়া ভাবে হলেও সেইসব জমির সিংহভাগই জাতীয় সড়কের ধারে ধারে। এদের পেটের দায় নেই। তাই জমি বিক্রির ব্যাপারে ‘গা-গদ গদ খিদে মন্দ’ ভাব । এরা সহজে জমি হাতছাড়া করতে চাইবে না। তা অলোকশরা খুব ভাল করে বুঝে গেছে। এই জমি পেতে গেলে যেমন প্রচুর কাটখড় পোড়াতে হবে তেমনি যথেষ্ট বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে। আর সড়কের সম্মুখের জমি না পেলে পেছনের জমির কোন মূল্যই নেই। দেখা যাবে তিনভাগ জমি নিতে যা না খরচ হয়েছে, এই একভাগ নিতে তার দ্বিগুণ ব্যায়ভার কোম্পানীকে বহন করতে হবে। তা-ও সহজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তা পেতেই হবে। সেজন্যে যা করার করতে হবে। না হলে কোম্পানীর যে লক্ষ্য, বেসরকারি টাউনসিপ গড়া, তা বাস্তবায়িত হবে না। সরকার আবার নিজে জমি অধিগ্রহণ করে দেবে না। কোম্পানীকে জমি জোগাড় করে নিতে হবে। তবে টাউনশিপ গড়ার লাইসেন্স দেবে।

 

বর্গা জমির মালিকরা টাকা পেয়ে যাবার পরই গোটা ব্যাপারটা চউর হয়ে গেল। ওরাই বর্গাদারদের তাতিয়ে দিল, “মলিকরা তো বর্গা হয়ে যাওয়া জমি সব কোম্পানীকে বেচে দিয়েছে। এবার কার জমিতে চাষ করবি করগে যা ? এতদিন আমাদের চোখে তোরা জল ঝরিয়েছিস এবার তোরা চোখের জল ঝরা। আমরা ঠ্যাঙে ঠ্যাঙ তুলে দেখি।” শুরু হয়ে গেল হইচই, থানা-পুলিশ। কোর্টে যাবার ক্ষমতা তাদের মত গরিবদের নেই। আর যে পার্টি একসময় তাদের পক্ষে কাজ করেছিল এখন তো তাদের মাজা ভেঙে গেছে। তাদের নিজেদের পায়ের তলায় মাটি নেই তো এদের হয়ে লড়বে কেমন  করে ! লড়তে এগিয়ে এল বড় জমির মালিকদের একটা গোষ্ঠী। এতদিন তারা কোম্পানীর এইসব কান্ডকারখানা জেনেশুনেও চুপচাপ ছিল। পাশের ঘরে আগুণ লাগলে তা যে ঝড়ের হাত ধরে তাদের ঘরে হামলা করতে পারে, সে চিন্তা তখন তারা করেনি। এবার যখন কোম্পানী তাদের কাছে লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে হাজির হ’ল, তখনই টনক নড়ে। জমি হাঙররা তাদের দোরগোড়ায় এসে ঠোক্কর দিচ্ছে। এবার ঘর থেকে বাইরে বার না হলে রক্ষে নেই। ওই হাঙরের পেটে সব জমিজমা চলে যাবে। তখন তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য। বিপ্লব কোম্পানীর এই প্রস্তাবে ঘোর আপত্তি করল, “আমরা কি জমি বিক্রি করব বলে আপনাদের কাছে গলায় গামছা দিয়ে বলতে গেছি ? আপনারা এসেছেন কেন। অভাবি চাষাভুষো মানুষদের বেশ পরিকল্পনা করে দাদনের ফাঁদে ফেলে চুপিসাড়ে তাদের জমি হাতিয়ে নিলেন। আমাদের কি অভাব পড়েছে, আমরা জমি বিক্রি করতে যাবো ? এইসব ফালতু কথা বলতে আর কোনদিন আমাদের কাছে আপনারা আসবেন না। ব্যাপারটা আমরা মোটেই ভাল চোখে দেখছিনা।


রেজিস্ট্রি অফিস এবং বি.এল.আর. অফিসের কাগজ তুলে বিপ্লব দেখে নিল বিদ্যুৎ নগর মৌজার কাদের জমি এখনও হাঙররা গ্রাস করতে পারেনি। নাম ঠিকানা ধরে ধরে ওরা জনা চারেক মালিক জোট হয়ে তাদের একত্রিত করার চেষ্টা করল। প্রায় সত্তর জন মালিককে পাওয়া গেল, যারা নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিমিটেডকে জমি দিতে নারাজ।  কোম্পানী যতই তারা টাকার লোভ দেখাক। জোটবদ্ধ হয়ে তারা কোর্টে মামলাও জুড়ে দিল কোম্পানী অন্যায়ভাবে দু-তিন ফসলি কৃষিজমি হস্তগত করার জন্যে। সাক্ষী হিসেবে কিছু বর্গাদারের নামও তারা ঢুকিয়ে দিল, মামলাটা গুরুত্ব পাবার জন্যে। মামলার ঘায়ে কোম্পানী প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেল ! পরিস্থিতির উপর নজর রাখার জন্যে বেশ কিছু সময় চুপচাপ হয়ে গেল ওরা। কিন্তু দেওয়ানি মামলা। ও তো সহজে মিটবার নয়। কত বছর যে লাগবে তার ঠিক নেই। তাই সামসেদও চুপচাপ থাকার পাত্র নয়। ও অন্য খেলা খেলতে শুরু করে দিল। সবদিক থেকে ক্ষমতার বৃত্তে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালীর দারস্থ হ’ল তাদের মদত দেবার জন্যে। অবশ্যই তা দেয়া-নেয়ার সূত্র মেনে। কোম্পানী যেন এমন কোন প্রস্তাবের জন্যে মুখিয়ে ছিল। পত্রপাঠ সামসেদকে এগিয়ে যেতে ছাড়পত্র দিল। কার্য সিদ্ধির জন্যে কোম্পানী সবসময় দু’হাত উপুড় করে থাকবে। এক মুহূর্তের জন্যে হাত গুটিয়ে নেবে না। এবার বিপ্লবদের মত প্রতিবাদিদের উপর চাপ আসতে শুরু করল ! সমাজের কিছু প্রভাবশালী মানুষদের মারফৎ প্রশাসনের উঁচু মহল থেকে এমন চাপ আসতে পারে তা বিপ্লবরা কল্পনাও করতে পারেনি। বিপ্লবরাও তো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নয় কিছুতেই। তাই ওরাও দমবার পাত্র নয়। দরকারে যে মহল থেকে গোপনে চাপ আসছে, প্রকাশ্যে তাদের এনে অভিযোগ জানাতে পারে। কোর্টে চলা মামলাতেও সেই অভিযোগ দাখিল করে দিতে পারে। এমন টক্করে যে তাদের পড়তে হবে তা ভাবেনি অলোকেশরা। সামসেদ বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। প্রভাবশালী বা প্রশাসনের উপরওয়ালারা প্রকাশ্যে আসতে পারছে না। ওরা তো নিশ্চিত, কাজটা আইন বিরুদ্ধ। তাদের নাম সামনে এসে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাদের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এখানেই বিপ্লবরা এক কদম এগিয়ে থেকে গেল। সেইসূত্রে আরও জোর কদমে ওরা কাজ চালিয়ে যেতে লাগল।


বিপ্লবদের মামলার সঙ্গে যুক্ত এক বর্গাদার হঠাৎ একটা সাংঘাতিক খবর শোনালো ! তাদের কর্মকান্ডের সীমানার পাড় ভাঙছে ! আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মামলাকারিদের তিনজন ইতিমধ্যে কোম্পানীকে জমি বিক্রি করে দিয়েছে ! দু’দিন আগেই খুব গোপনে জামি রেজিষ্টি হয়ে গেল ! কোম্পানী নাকি প্রচুর টাকার লোভ দেখিয়েছে। তাতেই ওরা কাবু ! সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লব রেজিষ্ট্রি অফিসে ছোটে। জানতে পারে খবরটা সত্যি। চাঁপাডালি গ্রামের তিনজন মিলে মোট সাত একর জমি বেচে দিয়েছে। প্রচুর টাকার কথা  যেটা বলছে তা নয়। ওই টাকার প্রস্তাব ওরা বিপ্লবকেও দিয়েছিল। এইটুকু টাকার লোভ ওরা ছাড়তে পারল না ! হতাশ হয়ে পড়ল বিপ্লব। সত্যিই তাহলে তাদের সীমানার পাড় ভাঙতে শুরু হ’ল। তাতেও না দমে ওরা আবার তাদের কাজের সঙ্গে যুক্ত সকলের সঙ্গে দেখা করতে ছুটল। বোঝালো, কোন টাকার লোভে, বা চাপের কাছে মাথা নত না করে মামলার রায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে। কেননা তাদের জয় নিশ্চিত। উকিলবাবু বলেছে, মামলার যা  মেরিট, তা পুরোপুরি তাদের পক্ষে। কোম্পানীকে পেছু হটতেই হবে।


মামলার দিন এত দীর্ঘ তফাতে পড়ছে যে, ওদের সাথে যুক্ত সব মানুষকে একজায়গায় ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ছে। সক্কলে তো আর বিপ্লবদের বাড়ির আশপাশের মানুষ নয়। কার কাছে কি প্রস্তাব নিয়ে ওই বদমায়েশের দল যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। বিপ্লবরা যেমন থেমে নেই, ওরাও তো চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নয়। ইতিমধ্যে প্রচুর টাকা কোম্পানীর ঢালা হয়ে গেছে। এখন ওরা মরিয়া। রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র মত ওই জমি ওদের চাই চাই। না হলে দৈর্ঘ্য প্রস্থে সমান হবে না তাদের রাজত্ব। বিপ্লব, অংশুমানরা চেষ্টা করে কাছাকাছি মামলার ডেট ফেললেই বিরুদ্ধ পক্ষের উকিল হয় অনুপস্থিত থাকছে নয়তো নতুন করে ডেট নিয়ে নিচ্ছে। মামলা দীর্ঘায়িত করতে এ যে ওদের একটা চাল, সে তো স্পষ্ট। উদ্দেশ্য, এটা করতে পারলে ওরা নরমে-গরমে লোক ভাঙাবার সময় পেয়ে যাবে। একটা সময় হ’লও তাই। সোজা আঙুলে ঘী না উঠলে আঙুল বেঁকানোর নীতি নিল ওরা ! মানুষের পেছনে সমাজবিরোধী, ভাড়াটে খুনেদের লাগিয়ে দিল। এবার প্রাণভয়ে লোকেরা এক এক করে তাদের জমি কোম্পানীর হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হ’ল। পারল না বিপ্লব, অংশুমানদের মত দু’চারজনকে। ওরা তেমনভাবে চেষ্টাও করল না। এরা বিপ্লবদের সোজা নাক না ধরিয়ে কান বেড় দিয়ে ধরার পন্থা নিল। একে একে সব জমি পেয়ে গেলে ওই কয়েক একর জমি এমন জটিল অবস্থার মধ্যে ফেলে দিতে চাইল, যাতে বিপ্লবরা শেষপর্যন্ত আধাকড়িতে কোম্পানীকে দিতে বাধ্য হয়। জাতীয় সড়কের পাশেই বিপ্লবের চার একর জমির আগের প্লট হ’ল অংশুমানদের। তাদের অপারেশন একদম প্রায় শেষ করে এনেছে কোম্পানী । পড়ে রয়েছে অংশুমান আর বিপ্লব। সামসেদরা এবার অংশুমানকেই টার্গেট করল। একে কব্জা করতে পারলে বিপ্লব একেবারে কোম্পানীর সম্পত্তির ঘেরাটোপের মধ্যে পড়ে যাবে। বিপ্লব আর ওর জমির ভেতর ঢুকতেই পারবে না। বাধ্য হবে জলের দরে জমি ছেড়ে দিতে। হার না মানার শেষ চেষ্টা করতে থাকল বিপ্লব। অংশুমান যাতে ওদের টোপ না গেলে  তার জন্যে আগে থেকেই বিপ্লব বলে রেখেছে, “অংশুমান,    যদি তোকে ওরা খুনেদের সাহায্য নিয়ে ওই জমি বেচতে বাধ্য 

করায় তার আগে তুমি আমাকে বলবি। ওরা যে দাম তোকে দেবে বলবে সেই দামই আমি তোকে দেবো। আমি তোর কাছ থেকে ওই জমি কিনে নেবো। তারপর ওদের সঙ্গে লড়াই হবে আমার। আমি ওদের বুঝে নেব। কিন্তু অংশুমানের মতিগতি ভাল ঠেকলো না বিপ্লবের। দুর্বৃত্তরা এমনভাবে ওকে ভয় দেখিয়ে দিয়েছে যে প্রাণভয়ে সে কোম্পানীকেই জমি বিক্রি করবে বলে ঠিক করেছে। বাড়ির লোক নাকি ওকে ভীষণভাবে চাপ দিচ্ছে। সেইমত রেজিষ্ট্রি অফিসে জমির মূল্য এবং  রেজিষ্ট্রি ফি নির্ধারণ করার জন্যে আবেদনও করা হয়ে গেছে। কিন্তু বিপ্লবও ছাড়ার পাত্র নয়। একদম পাশের দাগের জমি হওয়ায় এ’জমির প্রথম হকদার সে। কোন এক সময় বিপ্লবের ঠাকুর্দা বিপদে পড়ে অংশুমানের ঠাকুর্দাকে সামনের প্লটের ওই জমি বিক্রি করেছিল।এখন অংশুমান বিক্রি করলে আগে তাকেই কেনার প্রস্তাব দিতে হবে। সে যদি রাজি না হয় তো অন্যজনকে বিক্রি করতে পারবে। এটা আইনী শর্ত। সেই শর্ত সামনে রেখে অংশুমানের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় বিপ্লব। আপাতত মামলার জেরে অংশুমানের জমি বিক্রি স্থগিত হয়ে গেল। সাময়িকভাবে স্বস্তি পেল বিপ্লব।


ঠিক সেই মুহূর্তে এই খবরে হইচই পড়ে গেল দেশে ! নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট প্রাঃ লিঃ-এর কর্ণধার, নিত্যানন্দ তলাপাত্র সহ তার কোম্পানীর আরও চার ডিরেক্টর গ্রেফতার !  


হাজার হাজার কোটি টাকা নেটওয়ার্ক কারবারে তছরুপ করেছে 

কোম্পানী। গরিব মানুষের জমানো টাকা দিতে পারবে না বলে ঘোষণা করেছে ওরা। হাসেম নগর বাজারের অফিসের ডেপুটি ম্যানেজার অলোকেশ রায়ও রাতারাতি বেপাত্তা ! অলোকেশের ডান হাত, কর্মচারি সামসেদ আলিকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।


মানুষের টাকা ফেরত দেবে কেমন করে ! এই হাজার হাজার একর জমি  হাঙরের মত গিলতে গেলে তো টাকার দরকার। সমাজবিরোধী, খুনি, লুঠেরাদের পুষতে গেলে, প্রভাবশালীদের হাতে রাখতে গেলে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তা মানুষকে না ঠকালে পাবে কোথা থেকে ! এরা শাঁখের করাত হয়ে একদিকে যেমন মানুষের জমানো টাকা লুঠ করেছে তেমনি চাষাভুষো মানুষদের ঋণের জালে জড়িয়ে জমি হাতিয়েছে। বিপ্লব মামলার নথি ঘাঁটতে ঘাঁটতে চিন্তা করছিল এই সূত্র ধরে কোম্পানীর সমস্ত জমি ক্রয়-বিক্রয় লেনদেন বাতিল করা যায় কি না। সেই মুহূর্তে অংশুমান এসে হাজির,“তুমি মামলাটা তুলে নাও বিপ্লব। না হলে কবে যে এই দেওয়ানী মামলা মিটবে তার শেষ নেই। হয়তো আমার জীবদ্দশাতেও শেষ হবে না। ও জমি থেকেও না থাকার সমান হয়ে গেল। প্রাণনাশের হুমকির মধ্যে পড়েই তোমার সঙ্গে কথা রাখতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাইছি।” অংশুমানের কথা শোনার পর মামলার নথি থেকে মুখ তুলে প্রাক্তন সহ-যোদ্ধার দিকে একটা মলীন হাসির তীর ছুড়ে দিল বিপ্লব।




-----------

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন