শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য।। পারক গল্পপত্র



উত্তরবঙ্গের এক ছোট্ট গ্রাম পায়রাডাঙায় কেটেছিল আমার কৈশোর। বাবা ছিলেন স্টেশনমাস্টার। জনা কয়েক স্কুলটিচার, একজন ডাক্তার, তাঁর কম্পাউন্ডার, দুজন পোস্ট অফিসের কর্মচারী আর হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী ছাড়া গ্রামের বেশিরভাগ লোকের জীবিকাই ছিল চাষাবাদ। 


পায়রাডাঙার প্রান্ত ছুঁয়ে সাহেবপোতার জঙ্গল। তার গহিনে কপালিনীর মন্দির। লাল পোড়া ইঁটে বিষ্ণপুরি ঘরানায় তৈরি স্থাপত্য। মন্দিরের প্রত্যেকটি ইঁটে কারকার্য। নবরত্নচুড়োর সবগুলোই ভাঙা। ভেতরে কালো কষ্টিপাথরে গড়া অষ্টভুজা দেবীঘূর্তি। মূর্তির গায়ে বহুদিনের জমাট সিঁদুরের প্রলেপ দেখে মনে হত চাপ ধরা রক্ত লেগে আছে। মন্দির লাগোয়া একটা মজা দিঘি। তার ঘাটের সিঁড়িগুলো ভেঙে ঘাসবনের মধ্যে হারিয়ে গেছে।


সুকল্যাণ ওরফে সুকু ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এক পাড়াতেই ছিল আমাদের বাড়ি। এক স্কুলে এক ক্লাসে পড়তাম আমরা। মাঝেমধ্যে সাইকেল চালিয়ে কাঁচা মাটির পথ ধরে আম-জাম-বাবলাবনের পাশ কাটিয়ে ছোট একটা নদী পেরিয়ে ভাঙা দেউলের ওদিকে আমি আর সুকু যেতাম ঘুরতে। মাইল আষ্ট্রেক পথ। যেতে আসতে খুব বেশি সময় লাগত না। এই গোপন অ্যাডভেঞ্চার আমাদের অ্যাউ্রিনালিন হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দিত।


সেদিন চৈত্র সংক্রান্তি। স্কুল ছুটি। দুপুরে আমি আর সুকু সাইকেল চালিয়ে ভাঙা দেউলের সামনে গিয়ে পৌঁছেছিলাম।

তাকিয়ে দেখি হলদে আলখাল্লা পরা গৌরবর্ণ এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। শ্বেতশুভ্র চুল, সারা মুখে গ্রীষ্মের ফুটিফাটা মাটির মতো অসংখ্য রেখা। তাঁর কাঁধে একটা ঝোলা। বৃদ্ধের পাশে কোঁকড়া চুলের আয়ত চোখের এক কিশোরী দাঁড়ানো। বৃদ্ধের দু'হাতে লাল ফিতের মতো কিছু একটা ধরা।


কাছে যেতেই ভয়ের একটা স্রোত নেমে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে। ফিতে নয়, বৃদ্ধ ধরে আছেন কটকটে লাল রংয়ের একটা সাপ। গ্রামেগঞ্জে বড় হয়েছি কিন্তু এমন সাপ আমি কোথাও কখনও দেখিনি। ভাল করে লক্ষ করে দেখি বৃদ্ধের পাশে, মাটিতে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা কিছু বেতের ঝাঁপি। ঢোক গিললাম একবার। বলেই ফেললাম সভয়ে, আপনি কি সাপুড়ে? ওগুলোর মধ্যেও কি সাপ আছে ?


বৃদ্ধ হো হো করে হাসলেন আমার কথা শুনে। আমাদের নাম জানতে চাইলেন। আমরা ভয়ে ভয়ে বললাম। উনি স্মিত মুখে বললেন, আমি একজন জাদুকর। দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই। আমার এই ঝোলার মধ্যে রয়েছে বাঁদরের হাড়, বাজপাখির ঠোঁট, শেয়ালের জিভ, বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য গাছের শিকড়বাকরের মতো রকমারি জিনিস। এসব আমার জাদুর প্রয়োজনে লাগে। সবচাইতে মজার হচ্ছে এই ঝাঁপিগুলো। এর মধ্যে নানারকম সাপ রয়েছে। দেখবে? 


বৃদ্ধ ঝাঁপিগুলো এক এক করে খুলে দেখালেন আমাদের। আমি আর সুকু কৌতুহলী হয়ে মুখ বাড়িয়ে দিলাম। আমাদের চোখ ছানাবড়া। কী আশ্চর্য, লাল সাপের ঝাঁপিটা বাদে বাকি পাঁচটা ঝাঁপিতে পাঁচটা সাপ, জাদুর গুণে কিংবা মন্ত্রপূত শিকড়ের প্রভাবে, শুয়ে আছে গোল হয়ে। ঝাঁপি ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করছে না কেউ। প্রত্যেকটা সাপের রং আলাদা। একটা যদি কুচকুচে কালো হয় অন্যটা তবে শ্যাওলাসবুজ। বাকিগুলোও অদ্ভুত দেখতে। কেউ গাঢ় নীল, কেউ কালচে বেগুনি, আবার কোনওটা তীব্র ধূসর।


মেয়েটি রিনরিনে গলায় বলল, এই লাল সাপটার নাম কী জানো?  প্রথমা। হাকুচ কালোটা দ্বিতীয়া, শ্যাওলার মতো

সবুজ যেটা ওটা তৃতীয়া .. মেয়েটি কথা বলে চলছিল। জাদুকর মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, ও আমার মেয়ে, রূপমতি। প্রত্যেক বছর এই বিশেষ তিথিতে আমরা কপালিনীর মন্দিরে আসি।

আমরা হাঁ করে জাদুকর আর সঙ্গের মেয়েটিকে দেখছিলাম। জাদুকর একজন অশীতিপর মানুষ, এদিকে তাঁর মেয়ে একরত্তি এক কিশোরী ! বিলক্ষণ অবাক হলেও মুখে কিছু বললাম না আমরা।


বৃদ্ধের হাত থেকে জমাটবাধা রক্তের মতো লালরঙা সাপটা ছাড়া পাবার জন্য গা মোচড়াচ্ছিল প্রবলভাবে। চেরা জিভ দুটো লকলক করছে। দেখলেই গা কেমন ছমছম করে। জাদুকর আমাদের দিকে এক পা এগিয়ে এসে বললেন, ছুঁয়ে দেখবে না কি একবার? 


আমি আর সুকু সভয়ে দু'পা পিছিয়ে গেলাম। আমাদের ভয় পেতে দেখে বৃদ্ধ আমোদ পেলেন। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হেসে ফেললেন হো হো করে৷ মেয়েটিও হেসে কুটিপাটি। এবার জাদুকর চোখ বুঁজে কী সব মন্ত্র পড়ে লাল সাপটাকে ছুঁড়ে দিলেন ওপরে। তার পর মাটির দিকে নেমে আসা কুন্ডলী পাকানো সাপটাকে ধরে ফেললেন দু'হাতে। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে দেখি জাদুকরের হাতে সাপ নয়, ধরা রয়েছে সাপের খোলস। জাদুকর হেসে বললেন, যত বিষধর সাপই

হোক তার খোলসে বিষ থাকে না। এসো, ছুঁয়ে দ্যাখো একবার।


আমাদের সেই সাহস হল না। এদিকে সূর্য অস্ত গিয়েছে ততক্ষণ। জাদুকর আর দাঁড়ালেন না। রূপমতির হাত ধরে হাঁটা দিলেন। বলে গেলেন পরের বছর এই তিথিতে আবার আসবেন। আমরা এলে দেখা হবে।


এক বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে। পরের চৈত্র সংক্রান্তির দিন আমি আর সুকু বিকেলের আগেই পৌঁছে গেলাম যথাস্থানে। দেখি জাদুকর আর তাঁর মেয়ে দাঁড়ানো ভাঙা দেউলের সামনে। জাদুকরের পরনে সেই হলদে আলখাল্লা। মুখে বয়সের ইকরি মিকরি রেখাগুলো সংখ্যায় আরও বেড়েছে। এক বছরে চেহারা ভেঙেছে বেশ খানিকটা। কথা বলতে গেলে হাঁফ ধরছে। এদিকে কোঁকড়া চুলের সেই কিশোরী বড় হয়েছে অনেকটা। আধময়লা পোশাক, তবুও তাকে দেখে মনে হয় স্বপ্নপুরীর রাজকন্যা।


জাদুকর গতবার যে জাদু দেখিয়েছিলেন এবার দেখালেন ঠিক তার উল্টোটা। ঝাঁপি থেকে কটকটে লালরঙা সাপের খোলসটা বের করে মন্ত্র পড়লেন চোখ বুঁজে। খোলসটাকে ছুঁড়ে দিলেন ওপরে। তাজ্জব ব্যাপার, নিচে যেটা নেমে এল সেটা কুন্ডলী পাকানো একটা জ্যান্ত সাপ। থকথকে রক্তের মতো গায়ের রং, হিমশীতল ক্রুর চোখ, চেরা লকলকে জিভ। সন্তর্পণে ভয়ালদর্শন সাপটাকে ঝাঁপির মধ্যে ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে হাসলেন জাদুকর। মেয়েটির হাত ধরে চলে গেলেন ধীর পায়ে। বলে গেলেন আসছে বছর এই বিশেষ তিথিতে দেখা হবে।


অপেক্ষার পর অপেক্ষা জড়ো করে বারোটা মাস কাটালাম। পরের বছর চৈত্র সংক্রান্তির দিন সাইকেল নিয়ে দুপুরবেলা বেরিয়ে পড়লাম আমি আর সুকু। দ্রুত প্যাডেল করছিলাম আমরা। জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় হোঁচট খেয়ে পড়ল সুকু। কড়াং কট শব্দ হল। চেন ছিঁড়ল সাইকেলের। সাইকেল হাঁটাতে হাঁটাতে যখন আমরা ঘেমে নেয়ে মন্দিরের সামনে

পৌঁছলাম তখন সন্ধে হয়ে গেছে। মন্দির চত্বর ফাঁকা। ধু ধু করছে চারদিক। কেউ কোথাও নেই।


ঘাটে বসলাম আমরা। দিঘির জলের ওপর পদ্মের কালো শুকনো ডাঁটা সারি সারি ফণাহীন কেউটের মতো দাঁড়িয়ে।

দিঘির চারধারে বেল, আমলকি, রুদ্রাক্ষ আর হরিতকীর বন থেকে উঠে আসছে বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস। সন্ধে গাঢ় হল।

ফিকে নীল রেশমি শাড়ির মতো হালকা সন্ধের গায়ে নক্ষত্রের দল জরি বুনতে শুরু করল। সুকু গলায় আক্ষেপ মিশিয়ে বলল, সাইকেলের চেনটা আর ছেঁড়ার সময় পেল না! নাহ্ পরের বছর আরও আগে থাকতে রওনা দেব।


আরও একটা বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে। স্কুলের সবচেয়ে উঁচু ক্লাসে পড়ছি। কচি দুর্বা ঘাসের মতো গোঁফদাড়ি গজিয়ে গেছে ততদিনে। বয়ঃসন্ধির পর্ব চলছে তখন আমাদের। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি। জেগেও। চৈত্র সংক্রান্তির দিন সকাল থেকে উত্তেজনায় ফুটছি দু'জনে। ভর দুপুরে আমি আর সুকু গিয়ে পৌঁছলাম যধাস্থানে।

আমার বুকের ভিতর মাদল বাজছিল। সুকুর চোখ জুলজুবল করছিল উত্তেজনায়। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে লাগল। দুপুর বদলে গেল বিকেলে। বিকেল গিয়ে সন্ধে এল। বিশাল একটা বুনো বেড়াল ছাড়া আর কারও দেখা পেলাম না। আমি অন্যমনস্ক গলায় বললাম, বয়স হয়েছিল অনেক, মনে হচ্ছে জাদুকর দেহ রেখেছেন। বেঁচে থাকলে কপালিনীর মন্দিরে নিশ্চয়ই আসতেন।


ছায়া ছায়া অন্ধকার পথ ধরে ফিরছিলাম আমরা। নদীর মুখটায় এসে সাইকেলটা দাঁড় করাল সুকু। আমিও সাইকেলের ব্রেক কষে দাঁড়ালাম ওর পাশে। ধূসর জ্যোস্না এসে পড়েছিল ওর মুখে। সুকুকে কেমন অচেনা লাগছিল। কেমন একটা গলায় সুকু বলেছিল, রূপমতি তো এতদিনে আরও বড় হয়ে গেছে তাই না?  ওর সঙ্গে যদি কোথাও কখনও দেখা হয়ে যায় তাহলে চিনতে পারবি তুই? 


বাতাসে একটা ভারী শ্বাস মিশিয়ে দিলাম আমি। এই প্রশ্নটা তো আমিও করতে যাচ্ছিলাম সুকুকে।



ঘোর সংসারী হয়েছি আমরা। ছেলেমেয়েরা বড় হতে হতে আমাদের কাঁধ ছুঁয়ে ফেলেছে। হাজার কিলোমিটার দূরের দুই আলাদা শহরে থাকি আমি আর সুকু। যোগাযোগের সুতো প্রায় ছিঁড়েই গেছে। ফেসবুকে কাঁচাপাকা চুলের সুকুকে দেখি ওর ফ্যামিলি ফোটো-আ্যালবামে। তেমনি সুকুও দেখে ওর একসময়ের বেস্ট ফ্রেন্ডকে, যার চুলে রূপোলি জরির আঁকিবুকি। লাইক দেয় অভ্যাসবশত। “অসাধারণ” বা “দারুণ” জাতীয় বাধা গতের কমেন্ট করে, ঠিক আমি যেমন করি। যখন ভাবি যে, পায়রাডাঙার সেই দিনগুলো আর কখনও ফিরে আসবে না জীবনে, তখন বড় কষ্ট হয়।


না, এতগুলো বছর পার করে এলেও আর কখনও দেখা পাইনি সেই বৃদ্ধ জাদুকরের। দেখা হয়নি রূপমতির সঙ্গেও। এখন যখন পিছন ফিরে চড়ক সংক্রান্তি দিনদুটোকে দেখি তখন অবিশ্বাস্য মনে হয় সবকিছু। প্রশ্ন জাগে, কে ওই জাদুকর? কেন এসেছিলেন তিনি আমাদের জীবনে?  চোখ বোঁজার আগে কি তিনি তার ছটা  সাপকে ঝাঁপি থেকে মুক্ত করে দিয়ে গেছেন ? রূপমতিই বা কী করছে এখন?  কোথায় আছে সে? 


কখনও বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। ওই ছটা  সাপ আমাদের ষড়রিপু নয় তো? রূপমতি বলেছিল জমাটবাধা রক্তের মতো লালরঙা সাপটার নাম প্রথমা। তাহলে ওই সাপটা কি আমাদের মনের অতলে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা প্রথম রিপু কামনার প্রতীক? কুচকুচে কালো সাপটা তাহলে দ্বিতীয় রিপু অর্থাৎ ক্রোধ ? তবে কি শ্যাওলাসবুজ সাপটা আমাদের লোভ? জ্যান্ত সাপটাকে খোলসে বদলে দেওয়া আর নিষ্প্রাণ খোলসটাকে ফের জীবন্ত করে দেওয়ার মধ্যে কি লুকিয়ে আছে কোনও গুঢ় সংকেত? আমাদের মনের গহিন বিলের মধ্যে কি গাঢ় ঘুমের আবেশে তলিয়ে থাকে ছটা সাপ,ষড়রিপুরই মতো? তা-ই যদি হয়, রূপমতি তবে কে? কী তার পরিচয়? সে কি আসলে প্রকৃতি? তার হাতেই কি

আছে সেই জিয়নকাঠি আর মরণকাঠি যা দিয়ে সে জাগিয়ে তুলতে কিংবা ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে সাপগুলোকে? 


এই সব প্রশ্নগুলো সঙ্গোপনে রেখে দিয়েছি মনের অতলে। জানি না সুকুও আমার মতো করে এসব ভাবে কি না। তবে কুয়াশাঘেরা শান্ত সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে, ছায়াঘেরা কপালিনীর মন্দিরে বেজে ওঠে ঘন্টার ধ্বনি, মসজিদ থেকে ভেসে ওঠে আজানের শব্দ, ছলাৎ ছলাৎ দাঁড়ের শব্দ ওঠে উত্তরঙ্গ নদীর বুকে, নোনাগাঙের ওপর এসে পড়ে জ্যোৎস্নার ছটা,কাশবনে শোনা যায় মর্মরধ্বনি। আজও আমার স্বপ্নের মধ্যে ফিরে ফিরে আসেন সেই বৃদ্ধ জাদুকর। পাশ ফিরে শুলে স্পষ্ট দেখতে পাই কোঁকড়া চুলের কিশোরী মেয়েটিকে। আজও রূপমতির শরীর থেকে নাকে ভেসে আসে লেবুঘাস আর বনতুলসীর ঘ্রাণ।




২টি মন্তব্য:

  1. লেখার মুন্সিয়ানা চোখে পড়ার মতো,খুব ভালো একটা গল্প পড়লাম। এমন আরও গল্প পড়তে চাই। শুভেচ্ছা রইলো।

    উত্তরমুছুন