শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

প্রগতি মাইতি।। পারক গল্পপত্র



ছিয়াসি পার হতে আর মাত্র ক'টা মাস। অশক্ত শরীর। চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা। লাঠিই এখন চলার সাথী। বহুদিন সূর্যের আলো লাগেনি শরীরে। এখনও বাড়িতে ছাত্র ছাত্রী আসে। গড়গড় করে ইতিহাস পড়ান। বই দেখার দরকার হয় না। সে-ই মাধব সামন্ত রিকশায় চেপে তার হাতে গড়া ' অগ্নিবীণা 'ক্লাবের সামনে এসে হাজির। সঙ্গে সদ্য স্নাতক নাতি, দিগন্ত। দিগন্ত তার দাদুর হাত ধরে ক্লাবে ঢুকল। সেইমূহুর্তে ক্লাবে যারা ছিল তারা মাধব মাস্টারকে চেনে না। কিন্তু একে বৃদ্ধ তারপর আবার লাঠি হাতে  - তাই চেয়ার এগিয়ে দিল বসার জন্য। প্লাস্টিকের চেয়ার। চেয়ারের রংটা আবার বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রিয় রং।

মাধব মাস্টার গম্ভীর হয়ে বললো, আমি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসি না। এতগুলো কাঠের চেয়ার ছিল, সেগুলো গেল কোথায়? বাসরাফ তড়িঘড়ি একটা কাঠের চেয়ার এনে দিল। সুকমল বাসরাফকে চাপা গলায় বললো, আরে এটা তো আমাদের সেক্রেটারির চেয়ার ! এটাতে তো কেউ বসে না। তুই এটাই বার করে দিলি? মাধব মাস্টারের কানে কথাটা বাজতেই লাঠি উঁচিয়ে সুকমলকে কাছে ডেকে বললো, ডাক তোদের সেক্রেটারিকে। বল, মাধব মাস্টার এসেছে।

মাধব মাস্টারের নাম শুনে ক্লাবের সেক্রেটারি উত্তম খুব তাড়াতাড়ি বাইকে করে ক্লাবে চলে এলো। মাধব মাস্টারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উত্তম বললো, জ্যাঠা আপনি !

- না এসে পারলাম না যে।

- কেন কী হয়েছে?

- কি হয়নি তাই বল?

- না মানে, একটু যদি ভেঙে বলেন।

- পরশু তোদের ক্লাবের ভোট ছিল?

- হ্যাঁ, এবারও আমি...

- জিতেছিস। তা ভালো। কিন্তু যা শুনলাম।

- কী শুনেছেন জ্যাঠা?

- তুই নাকি সব সভ্যদের ভোট দিতেই দিসনি?

- এ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার জ্যাঠা।

- আচ্ছা তাই মানলাম। কিন্তু তিন বছর অন্তর ভোট কি হয়?

- হয়, জ্যাঠা হয়।

- পাঁচ পাঁচ বার তুই জিতিস কি করে?

- সে আমি আর কি বলবো, সভ্যরা যদি...

- তোকে চায় তো তোরই বা কি করার আছে।

মাধব মাস্টার আর উত্তম যখন কথা বলছিল তখন ক্লাবের যুবকরা ভিড় করে সব শুনছিল। সন্দীপ ভিড় থেকে একটু সরে গিয়ে বারিদকে ফোন করে মাধবমাস্টার-উত্তমের কথাবার্তার খবর দিল। বারিদ মণ্ডল - যাকে পর পর দু'বার নমিনেশন দাখিল করতেই দেয়নি। প্রতিবার গায়ের জোরে, আর এবছর ইচ্ছে করে নমিনেশনের ওপর জল ঢেলে বাবার নাম ও পেশা ফুটো করে দেওয়া হয়। এবছর ক্লাবের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী। উত্তম কোনো ভাবেই সেক্রেটারির পদ ছাড়তে চায়নি। অন্তত এবছরটা তাকে থাকতেই হবে। বিশাল বাজেট। ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বলে সদস্যদের চাঁদা, এলাকার বাড়ি বাড়ি কালেকশন, সোভেনির ছাড়াও স্থানীয় এম এল এ - এম পি 'র ফান্ড, তারপর রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর সাহায্যও আসবে। অগ্নিবীণা ক্লাব একসময় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের আখড়া ছিল। এই ক্লাব যারা গড়ে তুলেছেন তাদের মধ্যে একমাত্র মাধবমাস্টার জীবিত।

ইতিমধ্যে বারিদ এসে গেছে। বাইকে চাবি দিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে ক্লাবে ঢুকল। ঢুকেই মাধবমাস্টারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। বারিদকে দেখে উত্তম অবাক। কিন্তু মাধবমাস্টারের সৌজন্যে এক তরুণ সদস্যকে চেয়ার আনতে বললো। বারিদ প্রথমে মাধবমাস্টারের ভালোমন্দ খবর নিল। মাধবমাস্টার আবার শুরু করলো, বলছি, তোরা কী করছিস? ক্লাবটার এই দশা...। বারিদ কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে উত্তম বললো, জ্যাঠা আপনার চোখে কী কী খারাপ লাগছে যদি বলেন তো আমরা...।

- কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। আমি কতকাল পরে ক্লাবে এলাম। তোরা ক্লাবের রংটাও পাল্টে ফেললি!

এবারও বারিদকে থামিয়ে উত্তম বললো, সামনেই ক্লাবের ৭৫ বছর পূর্তি। রং তো করতেই হবে জ্যাঠা।

- সে তো ঠিক। এটা কী রং হয়েছে? এই রং তো তাড়াতাড়ি চটে যাবে। আমরা যে রং করেছিলাম সেটা কতদিন ছিল বলদেখিনি! খরচও তো কম। এবার বারিদ ফুঁসে ওঠে। সে বলে, ও তো সবেতেই রংবাজী করছে। রং নিয়েও...। উত্তম এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। সে এবার ক্ষেপে গিয়ে বলে, তুই থাম দিখিনি। খালি নেগেটিভ কথা বলিস। ক্লাবের জন্য কী করেছিস?

ব্যাপারটা ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দেখে মাধবমাস্টার আলোচনার রাশ টেনে নিয়ে বললো, আচ্ছা রংয়ের কথা না হয় বাদ দিলাম। লাইব্রেরি? লাইব্রেরিতে কী সব বই কেনা হচ্ছে? এসব বই কি পড়ার যোগ্য? শুনলাম পাঠক সংখ্যাও কমে গেছে। ক্লাবে খবরের কাগজ রাখা নিয়েও নাকি যা তা হচ্ছে? ফ্রি-কোচিং তুলে দিয়ে নাকি টাকা নেওয়া হয়? বিনিপয়সায় চিকিৎসা তুলে নাকি কুপন বিক্রি হচ্ছে? আর কত বলবো?

ক্লাবে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে গুঞ্জন উঠলো। তরুণ, বাসরাফ, সন্দীপ সহ বেশ ক'জন তাদের ক্ষোভ উগরে দিল। উত্তম এবার একটু বিড়ম্বনায় মধ্যে পড়ে গেল। ঠিক এই সময়ে বারিদ বললো, জ্যাঠা আপনাদের সেই ক্লাব আর নেই। এটা এখন একটা রাজনৈতিক দলের অঘোষিত পার্টি অফিস হয়ে গেছে। এখানে গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। চলছে উত্তমতন্ত্র। ওর টিকি বাঁধা আছে...। বারিদের কথা শেষ হতে না হতেই উত্তম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হম্বিতম্বি করতে করতে খিস্তি দিতে থাকলো বারিদকে। ক্লাবের মধ্যে বেধে গেল ধুন্দুমার কান্ড। কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি। পরিস্থিতি বুঝে তরুণ সদস্যদের কয়েকজন তড়িঘড়ি রিকশা ডেকে মাধবমাস্টার আর তার নাতিকে তাতে তুলে দিল। মাধবমাস্টার স্পষ্টতই বিহ্বল। তার মুখে কোনো রা নেই। দিগন্ত সমস্ত ঘটনার সাক্ষী। সে তার দাদুকে সহজ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু দিগন্তের কথা যেন মাধবমাস্টারের কানেই ঢুকছে না। মাধবমাস্টারের অবস্থা দেখে দিগন্ত চিন্তায় পড়ে গেল।

মাধবমাস্টারের ক্লাবে আসা, বারিদের আস্ফালন - এসব খুঁটিনাটি খবর উত্তমের সৌজন্যে স্থানীয় পার্টি অফিসে পৌঁছে গেছে। জেলার এক ডাকাবুকো নেতার ছত্রছায়ায় থাকে উত্তম। ওই নেতার আঙুল নাড়ানোতেই উত্তম চলে। নেতা যা বলবে যেভাবে বলবে - সেভাবেই সব হতে হবে। যে বা যারা বিরোধীতা করবে তাকে নানা ভাবে নাস্তানাবুদ হতে হয়। সারা এলাকা ওই নেতার কথায় তটস্থ। প্রতিবাদ করার সাধ্য কারুর নেই। নেতার নাম বসন্ত।


কখনও কোনো ঝামেলায় বসন্তকে দেখা যায় না। এমনকি এলাকার ভালো কোনো কাজেও তার উপস্থিতি চোখে পড়ে না। কিন্তু সে সবেতেই আছে। পর্দার আড়ালে থাকতে ভালোবাসে বসন্ত। আড়াল থেকেই ঘুঁটি সাজায়। যখন যেমন তখন তেমন অস্ত্রের ব্যবহার করে থাকে। বিয়ে, পৈতে, জন্মদিন, শ্রাদ্ধ, ইফতার পার্টি, পুজো - পার্বন, ঈদ, মহরম - কোনও অনুষ্ঠানে বসন্তকে দেখা যায় না। নেমন্ত্রণ করলে তার বিশ্বস্ত কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে উপহার ঠিকই পৌঁছে যায়। তার প্রতিনিধিরা সব জায়গায় একটাই কথা বলে, দাদা খুব ব্যস্ত। আসতে পারলেন না। এই সামান্য উপহার পাঠিয়েছেন।

অগ্নিবীণা ক্লাবেও বসন্ত আসে না। বা তার আসার দরকার হয় না। কারণ বসন্তের খাস লোক আছে ক্লাবে। এহেন বসন্ত সকলকে অবাক করে দিয়ে একদিন হাজির মাধবমাস্টারের বাড়িতে। বসন্তকে দেখে মাধবমাস্টার অবাক। ভাবলো, এ আবার কী করতে... । নাকি ক্লাবের ব্যাপারটা জানতে পেরে আমাকে ম্যানেজ করতে এসেছে! বসন্ত প্রণাম করলো । বললো, আপনার শরীর কেমন?

- ভালোই।

- আপনার বয়স কি আশি ছাড়িয়ে গেছে?

- তা গেছে। ছিয়াসি পেরতে আর ছ'মাস বাকি।

- বলেন কি!

- যা সত্যি তাই বললাম। কিন্তু এসব কী? 

- কোনটা? 

- এই যে ফল মিষ্টি... 

- আমি কি কিছু অন্যায় করলাম? আপনার বাড়িতে কোনোদিন আমি আসিনি। এই প্রথম। লোক-লৌকিকতা তো আমাদের সমাজ থেকে এখনও মুছে যায়নি? 

- কিন্তু আমি আবার এসব পছন্দ করি না। 

- জেনে রাখলাম। কিন্তু জ্যেঠু আমি এসেছি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আলোচনা করতে। 

- বেশ তো, কিন্তু তার আগে যদি তুমি এইসব ফল-মিষ্টি না ওঠাও, আমি একটা কথাও বলবো না। 

   বসন্তের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। নেহাত মাধবমাস্টারের বয়স হয়ে গেছে। আর তাছাড়া তারই বাড়িতে সে এসেছে। এছাড়া অগ্নিবীণা ক্লাবের ইনি অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা। তা না হলে...। বসন্ত নিজেকে সামলে নিল। রাজনৈতিক সংগঠনের জাঁদরেল নেতা। তার হাতের তালুতে এলাকা ও তার মানুষজন। বসন্ত ভাবলো, মাধবমাস্টার নয়, তার বয়সটাই তাকে এযাত্রা হারিয়ে দিল। কেন্নোর মতো নিজেকে সাময়িক গুটিয়ে নিল বসন্ত। তারপর বললো, আপনি এসব না নিলে তো আমাকে ফেরত নিয়ে যেতেই হবে। কিন্তু এভাবে আমাকে অপমান না করলেই পারতেন। 

- আমি সাধারণত কাউকে অপমান করি না। 

- কিন্তু আমাকে তো করলেন ! 

- এগুলো গ্রহণ করলে যে আমি অপমানিত হবো। নিজে অপমানিত হয়ে অন্যকে সম্মানিত করি কী করে? 

- আমি এতকিছু ভেবে এসব আনিনি। সিজিনের ফল। এই প্রথম আপনার বাড়িতে এসেছি। তাই... 

- তুমি তো তোমার কোনও আত্মীয় বা কুটুম্বের বা কোনও বন্ধুর বাড়িতে আসোনি। এসেছো বুড়ো মাধবমাস্টারের বাড়িতে ।

      ঠিক সেই মুহূর্তে ঠিকেকাজের মেয়ে শুক্লা কাজ সেরে ওদের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। বসন্ত ডাকলো, এই যে বৌদি। শুক্লা ফিরে তাকিয়ে বললো, আমাকে কি কিছু বলছেন? 

- হ্যাঁ, আপনাকেই ডাকলাম। 

- বলুন ।

বসন্ত ফল - মিষ্টির দুটো প্যাকেট শুক্লার দিকে বাড়িয়ে বললো, এগুলো আপনি বৌদি বাড়ি নিয়ে যান। শুক্লা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুক্লা মাধবমাস্টারের দিকে তাকালো। মাধবমাস্টারের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, যেন বলছে যে তুমি নিতেই পারো। কিংবা তুমি নেবে কি নেবে না সেটা তোমার ব্যাপার। শুক্লা এক মূহুর্ত কী একটা ভেবে উত্তর দিল, আমাকে দিচ্ছেন কেন? আমার জন্য তো আর আপনি এসব আনেননি? আমি যাই। আরও দুবাড়ি কাজ পড়ে আছে। কিছু মনে করবেন না। একথা বলে শুক্লা নির্লিপ্ত ভাবে বেরিয়ে গেল। 

  কোথা থেকে দুটো মাছি এসে মিষ্টির প্যাকেটে বসলো। বসন্ত মাছি দুটোর দিকে তাকিয়ে। তার মুখে আর কোনো কথা নেই। কত কথা বলার ছিল। বুড়ো মাস্টার শুধু নয়, এদের বাড়ির কাজের বৌ-টাও ডাঁটিয়ে চলে গেল। মাধবমাস্টার ঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে হাঁক দিল, ওগো শুনছো, বসন্ত এসেছে। ওকে একটু চা দাও, আমাকেও দিও। হঠাৎ একটা মাছি মিষ্টির প্যাকেট থেকে উড়ে এসে বসন্তের কাঁধে এসে বসলো। বসন্ত মাছিটা তাড়াতেই আর একটা মাছি এসে বসলো তার নাকের ডগায়। বসন্ত সপাটে থাপ্পড় কসাল নিজের নাকে। গৃহকত্রী মনে হয় আগেই চা বসিয়ে ছিল। চা বিস্কুট এনে টেবিলে রেখে বললো, একটু চা খেয়ে নাও। বলে চলে গেল। তিড়িং করে বসন্ত উঠে ফল-মিষ্টির প্যাকেট না নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। মাছি দুটো তার পেছন পেছন ধাওয়া করছিল। 

  

২টি মন্তব্য: