শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কাকলী দেবনাথ।। পারক গল্পপত্র



‘কি গো , আর কতক্ষণ ঘুমোবে ? যাবে না আমার সঙ্গে ?’

  বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসলেন রাধারানী। মুখে  বললেন , ‘ হ্যাঁ যাব তো। ’

কিন্তু কোথায় কে ?কেউ তো নেই ঘরে।

তাহলে কি তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন ? সারাদিন তো মনের ভিতর একটা চিন্তাই ঘোরাফেরা করে ,কবে যম রাজা এসে তাঁকে নিয়ে যাবে ? কবে আবার তাঁর স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে ?

রাধারানী জানালার কাছে এসে দাঁড়ালেন । নিস্তব্ধ গভীর কালো রাত। মাথার পাশে রাখা জলের গ্লাস থেকে এক ঢোক জল খেলেন । না ,আজ আর ঘুম আসছে না । চুপচাপ বসে থাকলেন জানালার বাইরের দিকে চেয়ে । মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে থাকল, আর কতদিন ? কবে তার ডাক আসবে ?

কত শত নদীর ধারা যেন বয়ে গেছে তাঁর মুখের উপর দিয়ে । সময়ের প্রখর রৌদ্রে  সেইসব স্রোতধারা শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেলেও তার চিহ্ন আজও রয়ে গেছে । মাঝে মাঝে রাধারানী এইসব জলহীন স্রোতধারায় ডুব দেন । হাতড়ে হাতড়ে  মনিমুক্ত খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই পঁচাশি বছর বয়সে  স্মৃতির  জমিতে পলির পর পলি জমে রাধারানীর  উজ্জ্বল  দিন গুলি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে ।  এখন সবই কেমন যেন ধোয়াঁশা ধোয়াঁশা লাগে  তাঁর।


                                                         (দুই)


রোজ সকালের মত আজও রাধারানী ঘুম থেকে উঠে , কুঁজো শরীরটাকে কোন রকমে টানতে টানতে কলতলায় নিয়ে গেলেন । মুখ ধুয়ে আসার সময় বুড়ো গন্ধরাজ লেবু গাছটার  দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন । কত পুরোনো গাছ এটা। দুলালের বাবা রথের মেলা থেকে কিনে এনেছিল। একবছর যেতে  না যেতেই ঝেঁপে  ফুল এসেছিল গাছটায় ।  কত বছর আগের কথা । এখন গাছটা প্রায় শুকিয়ে কাঠ । বেঁচে আছে কিন্তু  না থাকার মত। কি মনে করে রাধারানী নিজের শরীরটার দিকে একবার তাকালেন,নিজের শিরা বের করা  ,চামড়া কুঁচকে যাওয়া হাত দুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন  তারপর এক মগ জল নিয়ে গাছটার গোড়ায়  দিলেন। 

প্রত্যেকদিনের মত  আজও মুখ ধুয়ে রাধারানী বারান্দার এক কোণে এসে বসেছেন। এই কোণ টুকুই  তাঁর জন্য বরাদ্দ । খুব ইচ্ছে করে ,সকাল সকাল এক কাপ গরম চা খেতে। তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকেন রান্নাঘরের দিকে কিন্তু বাড়ির কারও তখন রাধারানীর দিকে তাকানোর সময় নেই ।

রাধারানীর দুই ছেলে । একজনের বয়স পয়ষট্টি আর একজনের বাষট্টি । ছোটছেলে তার সংসার নিয়ে  কলকাতায় থাকে । বড়ছেলের কাছেই থাকেন রাধারানী। নবদ্বীপে । ‘থাকেন’ কথাটা বলা বোধহয় ঠিক হল না  বরং বলা ভালো সমাজের ভয়ে ফেলে দিতে পারে না তাই রাখে । 

‘ও বউ কতখানি বেলা হল , একটু চা দে না ।’

‘চুপ করে বসে থাক তো বুড়ি । সারাদিন  কাজ কম্ম নাই ,শুধু খাই খাই ।’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে নাত বউ ।

রাধারানী কানে কম শোনেন । নাতবউয়ের সব কথা ঠিকমত তাঁর কানে গেল না । অঙ্গভঙ্গি দেখে আন্দাজ করলেন, নাতবউ রেগে আছে । এইভাবেই আন্দাজে আন্দাজে  মুখভঙ্গি দেখে বাড়ির মানুষগুলোর মন বোঝার চেষ্টা করেন রাধারানী । কিন্তু তার মুখ দেখে মন বোঝার দায় এ বাড়ির কারো নেই । 


                                                               (তিন)


আজ বাড়িটা কেমন যেন থম থম করছে । রাধারানী সবার মুখের দিকে তাকান , মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করেন কী হল ? ছেলের বউ,সেও এখন প্রৌঢ়া  বলা চলে । সে এসে একটা মোটা বস্তা পেতে দিয়ে বলল, ‘এর উপরে বসুন । নীচে বসবেন না । ঠান্ডা লেগে যাবে।’ রাধারানী অবাক চোখে একবার ছেলের বউয়ের দিকে তাকালেন । শীতকালে মেঝেতে বসার জন্য কতবার করে একটা বস্তা চাইতে হয় অথচ এই গরমে বসার জন্য ছেলের বউ বস্তা দিচ্ছে ! এত আদর ? ব্যাপারটা কী ? তাহলে কি আবার তাকে ছোট ছেলের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে ? না না , কিছুতেই তিনি যাবেন না সেখানে । গ্রামে তাও অনেকটা খোলা জায়গা  আছে । দরকার পরলে একটু হাটতে পারেন , আশে পাশের মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন । ওখানে তো সারাক্ষন গৃহবন্দি ।

‘এই যে তোমার চা ।’ বড় গ্লাসে করে নাতবউ চা দিয়ে গেল ।

রাধারানী ভয়ে ভয়ে  চায়ের গ্লাসের দিকে তাকালেন । মুখ ধুয়ে আসতে না আসতেই এতটা চা !  না , নিশ্চই তাকে নিয়ে কোনও ফন্দী এঁটেছে এরা । একবার ভাবলেন  নাতবউকে জিগ্যেস করবেন ।  সাহস হল না ।

 বাড়ির সবাই যেন আজ সকাল থেকে খুব ব্যস্ত । বড় বড় ব্যাগে বাজার আসছে । কত আলু কত পেঁয়াজ । তাহলে কি বাড়িতে কোনও  নিতা নিমতন্ন আছে ? কিন্তু সবাই এত চুপচাপ কেন ? শুকনো মুখ কেন সবার ? সকাল থেকে টিভিটা চলছে । রাধারানী আস্তে আস্তে টিভির দুয়ারে এসে বসলেন। কানে ভালো শুনতে পান না । পড়তে তো কোনদিনই শেখেন নি । শুধু তাকিয়ে থাকেন টিভির পর্দায় । হয়ত ঐ বোকা বাক্স থেকে নির্গত আলোকমালা আর ছবি দিয়েই নিজের জীবনের পলি পরা  গল্পগুলিকে নতুন করে বুনে নেন ।

নাতবউ এসে জলখাবার দিয়ে গেল । খেতে যাবেন পাশ থেকে নাতি চিৎকার করে উঠল , ‘খেও না এখন । আগে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধোও ।’  ধরে ধরে নিয়ে গেল বেসিনে। যত্ন করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে দিল । রাধারানী ফোকলা দাঁতে একমুখ হেসে তাকালেন নাতির দিকে । নাতির গম্ভীর মুখ ।

বেলা বাড়তেই রাধারানী দেখলেন এক এক করে তার আরও দুই নাতি  যারা দূর দেশে থাকত সবাই ছেলে, মেয়ে , বউ নিয়ে হাজির । না , কিছু একটা  উৎসব আছে আজ বাড়িতে। কিন্তু কিসের উৎসব ? 

রাধারানী ছেলের বউকে কাছে আসতে দেখে একমুখ হেসে জানতে চাইলেন , ‘ও বউ কিসের উৎসব আজ বাড়িতে ?’

ছেলের বউ তরকারি কাটতে কাটতে গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল , ‘মরন উৎসব  শুরু হয়েছে গো । মড়ক লেগেছে চারিদিকে । এক এক করে সবাই মরে যাবে  । ’

রাধারানীর বুক কেঁপে উঠল । তাহলে কি কলিযুগে  মরন সবাইকে জানান দিয়ে আসছে ? আগে শুনেছেন মৃত্যু আসে চুপিসাড়ে । হয়ত এই যুগে যম রাজা আগে থেকে সবাইকে জানান দেয় ‘আমি আসছি তোমরা সবাই তৈরি হও ।’ তাই কি আজ বাড়িতে তার এত যত্ন?  এ বাড়িতে সব চেয়ে বয়স্ক তো তিনি । তাকেই সবার  আগে যেতে হবে । এটা জানতে পেরেই কি সব নাতিরা চলে এসেছে ? রাধারানী মনে মনে খুশি হন , এইভাবে তুচ্ছ তাছিল্যের জীবন থেকে মুক্তি চান তিনি। তাঁর কতদিনের সাধ ছেলে আর নাতিদের কাঁধে চড়ে শ্মশানে যাবেন । সে সাধ এবার বোধহয় পূর্ণ হবে । রাধারানি  প্রত্যেকদিন সন্ধ্যেবেলায় যে গানটা করেন, সেটা আজ সকালেই গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন , 

                    ‘হরি দিন তো গেল,সন্ধ্যে হল

                             পার কর আমারে ।’ 


                                                       (   চার )


টিভিটা সারাক্ষন চলছে ,বাড়ির সবাই কাজ করতে করতে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে গম্ভীর মুখে । সবাই কেমন যেন ভয়ে চুপসে গেছে । রাধারানী এখন জানতে পেরেছেন এই মারন রোগ নাকি খুব ছোঁয়াচে । সরকার থেকে বলা হয়েছে সবাইকে বাড়ির ভেতর থাকতে । রাস্তায় বের হলেই পুলিশে ধরে নিয়ে যাচ্ছে । বাড়ির বড়রা সারাক্ষন টিভি দেখছে কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাগুলো ? তাদের  তো স্কুল বন্ধ । তারা  ঘরে কতক্ষন চুপচাপ বসে থাকবে? অথচ দুষ্টুমি করলেই বকা খাচ্ছে  । রাধারানী বাচ্চাগুলোকে কাছে ডেকে নিলেন । গল্প বলতে শুরু করলেন  । কখনও শোনালেন রাক্ষস খোক্কসের গল্প ,কখনও বললেন রামায়ন মহাভারতের গল্প আবার কখনও নিজের ছোটবেলার গল্প । এক একজনের এক এক রকম বায়না । রাধারানী সবার  বায়না হাসিমুখে মেটাতে থাকেন ।

টিভি তে মৃত্যুর মিছিল দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে গেছে বাড়ির সবাই । আজকাল বাড়িতে বেশি টিভি চলে না । এখন বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের মায়েরাও এসে বসে গল্প শুনতে ।  কেউ  আবার আবদার করে রাধারানীর বিয়ের গল্প শুনতে । গল্প বলতে বলতে তাঁর মুখ উজ্বল হয়ে ওঠে । মুখের অজস্র শুকিয়ে যাওয়া আকিঁবুকি গুলোতে আনন্দধারা বয়ে যায় । রোজ বিকেলে এখন বাড়ির সবাই একসঙ্গে চা খাওয়া হয় । নাতিরা, নাতবউরা খুনসুটি করে রাধারানীর সঙ্গে। সেদিন তো ছেলেও এসে বসল রাধারানীর কাছে । চা খেতে খেতে হঠাৎ বলে উঠল , ‘মা ,তোমার মনে আছে  সেই বড় বন্যার সময় ,বাবা আর আমি কত মাছ ধরে নিয়ে এসেছিলাম।’ 

আনন্দে রাধারানীর চোখে জল চলে এসেছিল । ছেলের সব কথা ভালো করে শুনতে না  পেলেও ছেলের ‘ মা’ ডাকে তার  সারা শরীর কেঁপে উঠেছিল । কতদিন পর আজ ছেলে তার পাশে এসে বসল ,তাকে মা বলে ডাকল ।



                                                          (পাঁচ)


এখন আর রাধারানীকে সকালের চায়ের জন্য  তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করতে হয় না । রোজ সকালের চা তিনিই বানান । ভুল হল ,  তিনি নিজে চা বানান না্‌ ,তবে  রান্নাঘরে বসে  নাতবউদের বলে দেন , কিভাবে আদা , তুলসী পাতা দিয়ে চা বানাতে হয় । আসলে সেদিন হঠাৎ করে সর্দি লেগে যায় রাধারানীর বড় ছেলে দুলালের । বাড়ির সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল । রাধারানীই  তুলসী পাতা,আদা দিয়ে চা বানিয়ে বারবার খাইয়ে ভালো করেছেন ছেলেকে । তারপর থেকে সকালের চা তাঁর নির্দেশ মতই হয় এ বাড়িতে । এই অসুখটাকে কেমন যেন ভালো লাগতে শুরু করেছে রাধারানীর । এই অসুখটাই তো তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া সুখ বয়ে নিয়ে এসেছে ।

 ‘ও মা , মা  তাড়াতাড়ি এস । দেখে যাও একটা জিনিস । ’ বড় নাতির চিৎকারে বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসেছে ।

কি হয়েছে ?

দেখ, লেবু গাছটায় এবার কেমন ফুল এসেছে । বাড়ির সবাই দেখে, হ্যাঁ সত্যিই তো! প্রায় মরে যাওয়া গাছটায় আবার ফুল এসেছে ।

নাত বউ বলে , ‘এটা হয়েছে লকডাউনের জন্য । পলিউশন কমে গেছে না , তার ফল। ’

আর একজন বলে উঠল , ‘দেখছিস না এখন কতরকমের পাখির ডাক শোনা যায় । ’

কেউ বলল, ‘আরে টিভিতে তো  সেদিন বলছিল,সুন্দর বনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে গেছে । ’

কেউ বলছে , ‘ জানিস , গঙ্গার জল  এখন  খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে গেছে ।’

রাধারানী কারও কথা শুনতে পাচ্ছেন না । তিনি শুধু লেবু গাছটার দিকে তাকিয়ে আছেন। শুধু কি লেবু গাছটাই প্রান ফিরে পেয়েছে ?

আজ বহু যুগ  পরে রাধারানীরও যে  ইচ্ছে হচ্ছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে , আরও কিছুদিন  সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে ।   রাধারানী একবার আকাশের দিকে তাকালেন। আচ্ছা , দুলালের বাবা কি তাকে ওপর থেকে দেখছে ? তারপর কি মনে করে, চুপি চুপি নাতবউয়ের ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন  ।



৫টি মন্তব্য:

  1. এখন করোনা আবহে লকডাউন নিয়ে নানারকম গল্প লেখা হচ্ছে। সেই আবহে লেখা এই গল্পটিও চমৎকার। করোনা ও লকডাউন রাধারানীর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কাকলি দেবনাথের লেখা খুব গতিময়। শুরু করলে শেষ করতেই হবে। রাধারানী ও লেবুফুল গাছ একে অন্যের পরিপূরক। ভালো গল্প। এমন গল্পের কাছে পাঠক একটা আশ্রয় পায়। একটা রিলিফ পায়।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভালো লাগলো আপনার গল্প কাকলী। আজকের বাস্তব কে নিয়ে, এত সুন্দর গল্প

    উত্তরমুছুন
  3. বেশ লিখেছেন। এমন সত্যি ঘটনা আমি দেখেছি।

    উত্তরমুছুন