শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইন্দ্রাণী সমাদ্দার।। পারক গল্পপত্র



দৈনন্দিন কাজের যে কতটা গুরুত্ব সারা জীবনে পরিতোষ ব্যনার্জী সেটা উপলব্ধি না করলেও জীবন সায়াহ্নে এসে  হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন। সারা জীবন ঘরের কাজকে খানিকটা খাটো করে দেখেছেন। জীবনের সব শিক্ষা মানুষ শিক্ষালাভের মাধ্যমে অর্জন করে না। কিছু কিছু ধারণা সে সামাজিক জীব হিসেবে সমাজ থেকে  এবং অবশ্যই পরিবার থেকে পায়। পরিতোষ আজন্ম কাল দেখেছেন ঘরের কাজ মা, কাকিমা করে এসেছেন। পরবর্তীকালে স্ত্রী বেলা তার  জীবনে আসার পর এই নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কোনোদিন এক গ্লাস জল গড়িয়ে খেয়েছেন বলে  মনে পড়েনা। ঘরে ফ্রিজ থেকে টিভি, ঘড়ি থেকে গাড়ি - সব কিছুই কখনো না  কখনো খারাপ হয়েছে কিন্তু বেলা সারাজীবনে কখনো কোনও  বড়  অসুখে পরেননি। পরিতোষের ঠাকুমা মাকে কোনদিন একরাতের জন্যও মামার বাড়ি থাকতে দেননি। কাছেই মামার বাড়ি ছিল বলে তাঁরা মামার বাড়ি থেকে রাতেই ফিরে আসতেন। বেলাও একদিনের বেশী দুদিন কখনো বাপের বাড়ি থাকেননি। বেলা বাড়িতে না থাকলে মা হেঁসেল সামলেছেন  তাই কোনোদিন ঘরের  কাজ ঠিক কী–সেটা পরিতোষ অনুভব করেননি। পরিতোষের মা মারা যাবার অনেক আগেই তাঁর শ্বশুর ও শ্বাশুড়ি ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেন। তারপর  থেকে বেলার বাপের বাড়ি যাওয়া মানে বিয়ে অথবা অন্নপ্রাশনের মত বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে পরিতোষের সঙ্গে গিয়ে খেয়ে বাড়ি চলে আসা। 


 একমাত্র ছেলে প্রত্যয় মেধাবি ছাত্র। উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য সে বিদেশে গিয়ে তারপর সেখানেই চাকরি –বাকরি করে থিতু হয়। ততদিনে পরিতোষ অবসর নিয়েছেন। ছেলে কোনোদিন দেশে ফিরবে না জানার পর বেলার মুখে এক বিষাদের ছায়া নেমে আসে। পরিতোষ ছেলের অভাববোধ সে ভাবে উপলব্ধি  করেননি। কারণ সারাজীবন পড়াশুনো, বইপত্র, ছাত্রছাত্রী নিয়েই তার জীবন কেটেছে। হঠাৎ একদিন বেলার হার্ট অ্যাটাক হয়। বেলা নার্সিংহোমে নিয়ে যাবারও সুযোগ দেননি। ডাক্তারবাবু এসে মৃত্যুকে সুনিশ্চিত করেন। বিদেশ থেকে ছেলে এসেছিল। বেলা বেঁচে থাকতে প্রত্যয় দেশে এলে বোধহয় তার মায়ের জীবনী শক্তিকে বাড়াতে পারতো। মায়ের পারলৌকিক কাজ শেষ করে প্রত্যয় দেশে ফিরে যায়। দেশে ফেরার আগে বাবাকে প্রত্যয় বাড়ি বিক্রি করে তার সঙ্গে থাকার কথা বলেছিল।  চেনা বইয়ের র‍্যাক,  চেনা পড়ার টেবিল, নিজের বাড়ি, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে পরিতোষ যেতে  রাজি হননি। ছেলে চলে যাবার পর এত বড় বাড়ি জীবনে প্রথমবার যেন খাঁ খাঁ করে। সারা জীবন পাশে থাকলেও যার উপস্থিতি কোনোদিন পরিতোষ আলাদা ভাবে অনুভব করেননি সেই বেলার আজীবন উপস্থিতি তার প্রথমবার অনুপস্থিতিতে অনুভব করলেন। প্রত্যেক মানুষই কম – বেশী না বুঝে শুধু কথা বলার জন্যই কিছু কথা বলে থাকে। ঠিক সেরকম পরিতোষ বেলাকে বলতেন –‘সারাদিন বাড়িতে কী  যে করো?’ এতদিন পাশে থেকেও বোঝেননি সারাদিন ঠিক কী করতেন বেলা! কয়েক মাস যেতেই দেয়ালে জমা ঝুল, পোড়া  আলুভাজা, সিদ্ধ না হওয়া ভাত  আর আঁশটে গন্ধ যুক্ত মাছ খেয়ে অনুধাবন করলেন সারাদিন ঠিক বাড়িতে বসে বেলা কী করতেন। কতদিন শক্ত ভাত গলায় আঁটকে গেলে জল খেতে গিয়ে দেখেন খাবার বোতলে এক ফোঁটাও জল নেই। কয়েক মাস সময় লেগেছিল পরিতোষের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে  নিজেকে অভ্যস্ত করতে। আবার বইয়ের মধ্যে ডুবে যান। পরিচিতরা একজন ভালো গৃহ সহায়িকার সন্ধান দেন। এখন সে রান্না থেকে ঝুল ঝাড়া, বাসন মাজা থেকে জল ভরা সবই করে। সম্প্রতি পরিতোষ  অনলাইনে খাবার অর্ডার দিতেও শিখে গেছেন। রোজ না হলেও এক দু’ইসপ্তাহ অন্তর  অনলাইনে খাবার অর্ডার দেন। নিজে খান এবং গৃহ সহায়িকা অনিতাকেও দেন। যদিও মেয়েটি খাবার না খেয়ে তার বাচ্চাদের জন্য নিয়ে যায়। সে যা ইচ্ছে করুক। মসৃনভাবে জীবনের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ লক ডাউন সময়ের কাঁটাকে থামিয়ে দেয়।   


জীবনে এরকম পরিস্থিতির পরিতোষ কোনোদিন সম্মুখীন হননি। জনতা কার্ফুয়ের  পরের দিন কাজের মেয়েটি কাজে আসা বন্ধ করে। ফোন করে  জানিয়েছিল সে কথা। প্রথমদিন পরিতোষ মুড়ি খেয়ে বিকেল অব্ধি থাকেন। প্রত্যয় ছোটবেলা থেকে ম্যাগি খেতে ভালবাসত। ছেলের সঙ্গে পরিতোষও ম্যাগি খেতেন । উনি রান্না করতে না জানলেও একথা জানতেন ম্যাগি করার কোনও ঝামেলা নেই। তাই সারাদিন টুকটাক খেয়ে থাকলেও  সন্ধ্যেবেলায় দিকে খিদে পায়। হাত পুড়িয়ে ঘেমে নেয়ে ম্যাগি রান্না করেন।  ম্যাগি ঢালতে গিয়ে হাত পোড়ান। আঙুলে  সেকী জ্বালা। চোখে জল এসে যায়। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় দুমিনিটের মধ্যে কড়াই থেকে ম্যাগি   নামিয়ে খেতে গিয়ে দেখেন খাবার সিদ্ধ হয়নি। অথচ টিভিতে ম্যাগির বিজ্ঞাপনে  দেখেছেন ২ মিনিটে ঝটপট ম্যাগি রেডি হয়ে যায়। সারাজীবনের এত সাফল্য, এত ব্যস্ততা বহির্জগতের এতো মানুষের ভিড়ে পরিতোষ নিজেকে একা পান। আজ বেলার কথা বড্ড মনে পরে। খাওয়া শেষ করে ছোটবেলার বন্ধু অজয়কে ফোন করেন। অজয় অবিবাহিত। বাড়িতে নিজেই রান্না করে খান। স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অবসর নেবার পর , এক -দুবার পরিতোষকে দুপুরে নেমন্তন্ন করে খাইয়েছেন।  অজয় বলেছিলেন, নিজে পেট পুরে খাওয়ার থেকে কাউকে খাওয়াতে অনেক বেশী তৃপ্তি বোধ করেন। ম্যাগি খাওয়া শেষ হলে পরিতোষ অজয়কে ফোন করেন,

         - ‘ কিরে কেমন আছিস? বড় বিপদে পরে ফোন করলাম।’

অজয়   -‘ আমি ভালো আছি কিন্তু তুই ভালো আছিস তো? কিসের বিপদ হয়েছে ?’

পরিতোষ-‘ আমি সারা জীবনে রান্না করিনি তাই লকডাউনে না খেতে পেয়ে মারা  যাব। কাজের মেয়ে আসছে না। কী যে করি!’

অজয়-  ‘ভয় পাস না। সব শিখে নিবি। পরিস্থিতি মানুষকে সব শিখিয়ে দেয়। সকাল ও বিকেলের খাবারটা চিঁড়ে- মুড়ি দিয়ে চালা। দুপুর ও রাতের বেলায়  রান্না  করার আগে আমায় ফোন করবি। আমি সব বলে দেব। আরে কিছু না হোক ভাতে ভাত রান্না করে ঠিক খেতে পারবি। একটা রাইস কুকার কিনে ফেলিস। ভাত করতে সুবিধা হবে যদিও রাইস কুকার এখন ইচ্ছে হলেও কিনতে পারবি না কারন সেটা   অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আওতায় পরে না। তুই রাত নটার সময় ফোন করবি।’ 


 ঠিক নটার সময় অজয়কে পরিতোষ ফোন করেন। অজয় বলে দেন কী করে ভাতে-ভাত করতে হবে। পরিতোষ ভাতে-ভাত রান্না করেন। যাই হোক সারাদিনের পর ঘি সহযোগে ভাত খাওয়া শেষ হয়। খিদেও জব্বর পেয়েছিল। এই ভাবে চলতে থাকে। পরিতোষ বাড়ির কাজে অনভ্যাসের জন্য ক্লান্ত বিধস্ত হয়ে পরেন। অজয়ের বাড়ি গিয়ে পরিতোষ ভেবেছিলেন লকডাউনের দিনগুলো থাকবেন। কিন্তু এখন লকডাউনে অন্য কোথাও থাকা ঠিক নয়। একদিন অজয় ইয়ার্কির ছলে বলেছিলেন  -‘তোর এই সমস্যার একটাই সমাধান আছে  বিয়ে করে নে’ অজয় বোধ হয় ইয়ার্কির ছলে বন্ধুকে একথা বলেছিলেন কিন্তু পরিতোষ কথাটা লুফে নেন। বলেন –‘ টাকার আমার অভাব নেই, ছেলের কাছে গিয়ে থাকতে চাইনা। যদি কোনো মহিলা আমায় বিয়ে করতে রাজি হন, আমার বিন্ধুমাত্র আপত্তি নেই। তবে আমার বিয়ের একমাত্র  কারণ  আমার  দেখাশুনো, আমার রান্না বান্না  করার কেউ নেই তাই। আমি যতদিন বাঁচব ততদিন আমার সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে।  তারপর এই বাড়ি, আমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স সব যে এই বৃদ্ধকে বিয়ে করবে তাঁর’। অজয় বলেন তাহলে খোঁজ শুরু করে দিই পাত্রীর। 


ঝর্না ও তাঁর মায়ের সংসারে এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। হঠাৎ করে  লকডাউনে জীবনের গাড়ি যেন থমকে দাঁড়ায়। সামান্য কটা টিউশন আর প্রাইভেট ফার্মে রিসেপশানিষ্টের চাকরিতে মাও মেয়ের সংসার চলে যেতো। লকডাউনে চাকরি ও টিউশন দুই গেছে। ঝর্নার বাবা বেশ কয়েক বছর হল মারা গেছেন। একমাত্র ভাই কলেজ পাশ করেই প্রাইভেট ফার্মে চাকরি  নেয়। তারপর  বিয়ে করে বহুদিন আলাদা। লকডাউনে দুটো মানুষের খাওয়া কষ্ট করে চলে  গেলেও ঝর্নার মায়ের ঔষুধের খরচা, বাড়ি ভাড়া কী করে দেবে ভেবে ঝরণা দিশেহারা। ভাইয়ের কাছে সাহায্যের জন্য সে ছুটে গেছিল। খালি হাতে ফিরে আসে। টিউশনের বাড়ি গুলোতে এই মুহুর্তে অভিভাবকরা যেতে দিতে রাজি নন।  বাড়িওয়ালা ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। ভাড়া না দিলে বাড়ি থেকে বের করে দেবার হুমকি দিয়েছেন। এক সন্ধ্যায় এক পরিচিত  ভদ্রলোক এক অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে ঝর্নাদের বাড়িতে আসেন। প্রস্তাব হল- এক সত্তর  উর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত বিপত্নীক অধ্যাপক বিয়ে করতে চান। লকডাউনে কাজের মেয়ে আসছে না। তাছাড়া বাড়ির কাজ সামলাতে তিনি একদম অনভিজ্ঞ।  তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন তাঁর ঘর সংসার সামলাতে হবে। তাঁর  পরিবর্তে তাঁর অবর্তমানে তাঁর বাড়ি , সম্পত্তি যে তাকে বিয়ে করবে তার। যদিও ভদ্রলোকের একটি ছেলে আছে। যে বিদেশে থাকে। মা-মেয়ে সারা রাত জেগে ভাবতে থাকে কী করবে! অবশেষে ঝর্না তাঁর মাকে বলে-‘  বাড়িওয়ালা বাড়ি থেকে বার করে দিলে কোথায় গিয়ে যে  দাঁড়াবো? এই বিয়েতে আমি রাজি শুধু একটা শর্ত- যদি বিয়ের পর তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে ভদ্রলোক দেন তবে আমি এই বিয়েতে রাজি।’           


কিছুদিনের মধ্যে শয়ে - শয়ে, হাজারে হাজারে পাত্রীর সম্বন্ধ আসতে লাগলো। পরিতোষ উপলব্ধি করেন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে এসে ঠেকেছে।  হাঁটুর বয়সী মেয়েরা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একজন বৃদ্ধের সঙ্গে বিয়ে করতেও পিছুপা নয়। কয়েক মাস কেটে গেল পাত্রী বাছাই করতে । আসলে রূপ অথবা গুণ নয় পাত্রীর বিশ্বাসযোগ্যতাই পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি। অজয়ের কথামতো পরিতোষ তাঁর ছেলেকে জানান তাঁর বিয়ে করার সিদ্ধান্ত। প্রত্যয় বাবার বিয়েতে কোনো আপত্তি জানায়নি। একদু’ই মাস সময় লাগল পাত্রী নির্বাচন করতে। অবশেষে মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সি ঝর্না সেনের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়। পাত্রীর  একটাই শর্ত– পাত্রীর সঙ্গে পাত্রীর মা থাকবেন। এই শর্তে পরিতোষের কোনও আপত্তি নেই। 


খুব সাদামাটা ভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর লক ডাউনে চাকরি হারিয়ে ঝর্নার অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা শুনে বাড়ি ভাড়া থেকে মুদির দোকান সব  ধার পরিতোষ হাসিমুখে শোধ করেন। এখন তিনজন মানুষ একি ছাদের নীচে ভালো আছেন। আনলক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় অনিতা আবার  কাজে ফিরে এসেছে। যদিও এতোদিন যারা পরিতোষ কী খেয়েছে জানতে চায়নি। ঝর্ণা তার মাকে নিয়ে চাকরি হারিয়ে দিশেহারা –তাঁর পাশেও দাঁড়ায়নি। তারা আজ সমালোচনার ঝড় তুলেছে- ‘  বুড়োটার কী শখ এই বয়সে বিয়ে করলো , মেয়েটির কী লোভ টাকার জন্য একজন বুড়োকে বিয়ে করলো।’ এইসব কথা কানে গেলে  ঝর্ণার খুব কষ্ট হয়। পরিতোষ  স্বান্তনা দেন-‘ যারা আমাদের অসহায়তার দিনে পাশে এসে দাঁড়ালো না তাদের কথায় কী এসে যায়।’ পরিতোষ ও ঝর্ণার দিনগুলো এখন  আনন্দে কাটতে লাগলো।  


২টি মন্তব্য: