শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

তনুশ্রী পাল।। পারক গল্পপত্র




                   " তুই কোত্থেকে এলিরে ননীদি এই লকডাউনের মধ্যে? কার সঙ্গে, কেমন করেই বা এসে পৌছালি এখানে? এগুলো কী? পাটশাক? বাবা! কি ভালবাসি আমি পাটশাক, পাটপাতার বড়া!' প্লাস্টিকের বড় একটা ব্যাগ থেকে আঁটি বাঁধা শাকপাতা নামায় ননীদি। পুরনো মানুষ আর ডগডগে সবুজ পাটশাক, লাউয়ের ডগা, কাচালংকা আরও সব দেখে বহুদিন বাদে ভারি উৎফুল্ল বোধ করি। 

                   প্রায় চারমাস একবারে বন্দীজীবন! কারো বাড়ি যাওয়া নেই, বাজার, মল, সিনেমা নেই! উইকএন্ড ট্যুর, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, শপিং, বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান, বুকিং কিচ্ছু নেই। পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ নেই, এমনকি পাশের বাড়িও যেন দূরতম দ্বীপ! এমনিতেও ওনারা খুব সাবধানী আর এখন এই করোনাকালে সদাই আতংকিত। করোনার আপডেট বুলেটিন ছাড়া আর কোনও বিষয়ে বার্তালাপ তেমন পছন্দ করেননা। আমরাও সাবধানী বটে, এ দুনিয়ায় কোন মানুষের আর মৃত্যুভয় নেই? কিন্তু সারাক্ষণ ওই বিষয়টি নিয়ে চর্চায় মোটে সায় নেই আমার; এতে মনের জোর কমে যায়। তায় মার্চের শেষদিকে দেশজুড়ে লকডাউনের আগে আগে ব্যাঙ্গালোর থেকে আমার মেয়ে-জামাই কদিনের জন্যে এখানে এসে আটকে পড়েছে। আপাতত ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম চলছে দুজনেরই। জামাইয়ের ইনভলান্টারি পেকাট হয়েছে, একধাক্কায় বেশ অনেকটাই, মেয়েরটা হয়নি একই আছে। কিন্তু সবসময় কিহয় কিহয় এই এক অনিশ্চয়তার ভার সব্বার বুকের মধ্যে টিকটিক করে! সবমিলিয়ে চারধারে মনখারাপের হাওয়া। প্রয়োজনের এটাসেটা আর এখানকার গেরস্থালীর নানাকিছু প্রায়ই কাঁধের বিরাট ব্যাগ থেকে নামিয়ে দিয়ে যায় আমাজন, ফ্লিপকার্টের ডেলিভারি বয়রা। আতঙ্কিত প্রতিবেশী মহিলা আমাদের বাড়ির দিকের ওনার সব জানালা বন্ধ করে রেখেছেন কবে থেকেই। একে ব্যাঙ্গালোর সংযোগ তায় প্রায়শ ডেলিভারি বয়েদের আগমন; উনি ত্রস্ত ও বিরক্ত আমাদের মতো প্রতিবেশী নিয়ে। কিন্তু আমি নিরুপায়! এমনসময় সব ভয়ডর ধুলিস্যাৎ করে ননীদির আগমন যেন মরুভূমির আকাশে একটুকরো জলেভরা মেঘ।

   থুতনিতে ঝোলানো আকাশীরঙের মাস্কটা টেনে নামিয়ে ও একটু হাসে। তুই সাবান দিয়ে হাত মুখ সব ধো আগে। দ্যাখ লিকুইড সাবানও আছে। আর কাপড়চোপড় ছেড়ে ফেল, একটা ম্যাক্সি দিচ্ছি পরে নে।' 

" একটু চা খাওয়া দিদি আগে। আদা আচে? আদা দিস। নাল চা দিস।' আমি চায়ের জল চাপাই, ননীদি হাতমুখ ধুতে যায়। চা নিয়ে আসতেই দেখি ধপ করে দরজার সামনে বসে পড়েছে। বেশ গল্পের মুডে আছে দেখছি। কল্যানও এসে হাসিমুখে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে। জিজ্ঞেস করে "তারপর বল ননীদি তোমাদের ওদিককার খবর টবর। ভালো আছ সবাই? হরমোহনদার খবর কী? মেয়েরা? সরকারি র‍্যাশন ট্যাশন সব পাচ্ছ তো তোমরা। হ্যাঁ ভালই হয়েছে, কি বল।'  

ননীদি আমার বাপেরবাড়ি সুবাদের বহুকালের পরিচিত জন। সেখানে আরও তিনবাড়িসুদ্ধ আমাদের বাড়িতেও ঠিকে কাজ করছে সে নাগাড়ে বহুবছর। এখন বয়স হয়েছে ঠিকেকাজ করেনা, তবে দুবাড়ির রান্নার কাজ করে। ওর বর হরমোহনদা আগে রিক্সা চালাত, ডেইলি লেবারের কাজ করত। এখন ওদের বাড়ির সামনেই ছোট একটা মুদির দোকান করেছে। জলপাইগুড়িতে আমরা বাড়ি করবার পর আবার দেখাসাক্ষাৎ শুরু হয় বছর আটেক হল। প্রথমে একবার এসেছিল ওর বর হরমোহনদাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে আবার সেজমেয়ের বাচ্চা হওয়ার সময় হসপিটালে ছিল। তখন থেকেই আমাদের বাড়ি চেনে। এদিকে এলেই দেখা করতে আসে। কাশিয়াবাড়িতে তার ছোটমেয়ে কাকলির বিয়ে হয়েছে, জানি।

         গোটা পাঁচেক মেয়ে আর একটাই ছেলে ননীদির। কিন্তু এই করোনা, এই ফটাস করে লকডাউন, "ঘরে থাকুন বাইরে বেরোবেন না' হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেসন, স্যানিটেশন, কন্টেনমেন্ট জোন, বাঁশের ব্যারিকেড তার ফাঁকফোকর গলে মানুষের বেরিয়ে পড়া। পুলিশি টহল-নিয়মভঙ্গকারীদের কান ধরে উঠবস করানো; আরও কতযে কান্ড নিত্যদিন! আর এই হাত ধুতে ধুতে, শাকসব্জি ধুতে ধুতে হয়রান। তায় ধরা পড়েছে, ধরা পড়েছে; অমুক ওয়ার্ডে একজন, তমুক ওয়ার্ডে একজনের পুরো ফ্যামিলি ইত্যাদি ইত্যাদিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত! মৃত্যুর  আগেই কেমন মড়ে আছি যেন!

 "কাপড়টা ছাড়লিনা ননীদি?' চায়ে চুমুক দিয়ে ননীদি বলে, " নারে এখনে চলি যাব, জামইয়ের সাথে বাইকে আচ্চি। মেয়েটার বাচ্চা হইচে ওইমাসে; তখন থাকি জামইয়ের বাড়িত আছি। মেয়েটাক ভাতজল দেচ্চি। শরিলটা কাঁচা আচে না এখনও কাকুলির, আরও দশবিশ দিন এই কাশিয়াবাড়ি জামইয়ের বাড়িত থাকিবার লাগিবে বুচচিস। জামই টাউনে আসল ওসুদ নিবে তায় উয়ার বাইকে তোক দেখির আচ্চি। পেসকিপসান আচে, পুলিশে ধরেনা।' " চলে যাবি? ভাত খেয়ে যেতি। বুকুন আর বুকুনের বর এখানে তো, ব্যাঙ্গালোর থেকে পুনেতে নতুন কাজে যাবার কথা ছিল জামাইয়ের পরের মাসে। তাই নতুন কাজে যাওয়ার আগে ক'দিনের জন্যে বেড়াতে এসেছিল এখানে। সিকিমে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। এখন তো আর সেসবের প্রশ্নই নেই। চোখের সামনে আছে, সুস্থ থাকুক সবাই তাহলেই যথেষ্টরে ননীদি। বিপদের দিনগুলো কেটে যাক তাড়াতাড়ি তাহলেই খুশি আমি। কিন্তু তুই এই বিপদ মাথায় করে দেখতে এলি রে ননীদি। আচ্ছা দাঁড়া ওদের ডাকি একটু, দেখে যা।' ওপরতলায় ওরা কাজে বসেছে আমি নীচতলা থেকে  বুকুনকে হোয়াটএপ করি "দুমিনিটের জন্যে একটু আসবি মা, ননীমাসি এসেছে। দেখা করে যাবি একটু? রাহুল কি আসবে?' একটু পরে ওরা দুজনে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে একটুক্ষণের জন্যে দাঁড়ায়। বুকুন বলে, " ভাল আছ মাসি? তোমার চুল দেখছি পেকেছে। হু ? সাবধানে থেকো। আমার মেলা কাজ গো, যাই হ্যাঁ।' রাহুল ওখান থেকেই হাত জোড় করে। চলে যায় নিজেদের কাজে ওরা। ননীদির মুখটা একটু গম্ভীর দেখি। স্বভাবসুলভ হাসিটা মুছে গিয়ে একটু যেন চিন্তাগ্রস্ত! আমি কথা ঘোরাই, " ননীদি, তোর সব মেয়েগুলোর মধ্যে কাকলির বিয়েটাই সবচেয়ে ভাল হয়েছে তাইনা? জামাইটাও বেশ ভাল, শাশুড়িকে নিয়ে এলো, বৌ-বাচ্চার জন্যে ওষুধ কিনতে এসেছে, এত শাকসব্জি দিয়ে দিয়েছে আমাদের জন্যে। চারদিকে খুব খেয়াল না?'

কেমন উদাসীন গলায় ননীদি বলে, "হ্যাঁ, এই জামইটা খুবে ভাল। ওদের মেলা জমিন জায়গা আচে। তাতে কেরালায় গিয়া কাজ করি আইচ্চে। রাজমিস্ত্রীর কাজ শিখিছে, ভাল কাজ করির পারে। বাচ্চা হবে দেখি চলি আইচ্চে নকডাউনের আগে। তোরঠে আসিম শুনি নিজের হাতত খেতের থাকি সব তুলি দিল। কছে "টাউনের মানসিগুলার এলায় কিচুই নাই। খালি বড্ড বড্ড বাড়িগিলা আচে। সরকার থাকি চাউল টাউল কিচুই পায়না। শাকশব্জি, আলুটালু ধরি যাও, কয়দিন খায়া টায়া বাচুক।' স্কুল পাশ তো, ভালয় জানে সব। আমার কাকুলির সাথে মোবাইল ফোনে ফোনে আলাপ সালাপ হইচে তারপর তো এই বিয়া।'ননীদির বড় আর সেজ মেয়ের বিয়েতে অল্পক্ষণের জন্যে গিয়েছিলাম কিন্তু বাকি তিনটে মেয়ের বিয়েতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি নানা কারণে। যাক ভালোই আছে ছোট মেয়েটা।

            ননীদি হঠাৎ বলে "জামইয়ের ফোন নম্বর নিয়া রাখিস। কিছু নাগলে বলবি। বিপদের সময় নজ্জা করা যায়না। দাদাবাবু শুকি গেইচে। তোর মেয়েটা জামইটার কি অবস্থা হইচে, মেয়েটা ছিঁড়া পেন্ট পিন্দি আচে! জামইটার শরিল স্বাস্থ্য নাই। তোর চটি এন্দুরে খাইচে খাবলা খাবলা করি?' ননীদির কথা শুনে অবাক হই! কত যে দরদ ওর, নিজ সহোদরার জন্যেও তো থাকেনা মানুষের! আমি বোঝাতে চাই, " আরে না না এই চটিটা এরকমই, খাদিম থেকে কেনা। পুরনো কিন্তু পরে খুব আরাম। বুকুনরা সব ছেড়াফাটা প্যান্টই পরে। ওটাই স্টাইল। জামাইটার দুদিন পেটটা খারাপ ছিল তাই একটু...'  বাইরে বাইকের হর্ণ শুনে উঠে পড়ে ননীদি। ব্লাউজের ভেতর হাত ঢুকিয়ে গিঁট বাঁধা একটা রুমাল বের করে তার থেকে একটা দুশো টাকার নোট আমার হাতের মুঠোয় গুঁজে বলে, " এইটা রাখ। তুই আমার বিপদে কতকি কচ্চিত। মেয়েগিলার বিয়ার সময় টাকা কাপড় দিচিত। ওদের বাবার ওসুকের সময় কত কল্লি, পয়সা দিলি, অসুদ কিনা দিলি, বুকের ছবি তোলার টাকা দিলি। এখন তোর বিপদের সময় হাতগুটায়া থাকব?' ওর মায়া মাখানো চোখদুটোর দিকে চেয়ে কিছু বলতে পারিনা। গেটের ওপাশে হেলমেট আর মাস্কঢাকা ছেলেটিকে ঘরে আসতে বলি, সে জানায় " না না ঘরে যাওয়া যাবেনা। দোকান-টোকান গেছি তো। বাড়ি যায়া আগে চান।' সে আমার নাম্বার নিয়ে রিং করে; বলে সেভ করে রাখেন। সব্জিটব্জি, ডিম যা লাগে ফোন করবেন, পায়া যাবেন। আমি তো আসি টাউনে দিয়া দিব। জানেন  মাসি খালি নুন তেল কিনিলেই হয়া যায় আমাদের ঘরে।' ননীদি সব্জির ফাঁকা ব্যাগটা ভাঁজ করে নিয়েছে, এবারে বাইকে উঠে বসে। ছেলেটি ঘ্রং ঘ্রং শব্দে বাইকে স্টার্ট দিয়ে বলে ওঠে " জমিনে আলু লংকা, টম্যাটো, বেগুন, ঢ্যাঁড়স, কুমড়া সব হয়; ধানের চাষও করি। দিয়া যাব আপনাকে।' ননীদির ছোট জামাইটির মুখশ্রী অপরিচিতই রয়ে গেল মাস্ক আর হেলমেটের আবরণের ভিতর। কিন্তু ওর হৃদয়ের স্বজনসুলভ দয়ালু মুখটি সুস্পষ্ট দেখতে পাই। ওরা রওনা হয়ে যায়। গেট বন্ধ করে  সিঁড়িতে দাঁড়াতেই পাশের বাড়ির দিকে চোখ যায়। কেমন কঠিন নিষেধের মতো, নির্দয় প্রহরীর মতো নিস্তব্ধ, নিকট প্রতিবেশীর বন্ধ জানালার কপাটগুলো!     

      


২টি মন্তব্য: