মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

তরুনার্ক লাহা।। পারক গল্পপত্র



রাত নটা।নিজের ঘরে ফিরে আসে পুলক।ঘর না বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই বলাই ভালো।থাকে জন তিনেক বন্ধুর সাথে।হোটেলে খাওয়া দাওয়া।কাজ থেকে ফেরার সময়ই হোটেলের কাজটা সেরে আসে।


বাকী বন্ধুরা এখনো ফেরে নি। হ্যাঙ্গারে জামাটা ঝুলিয়ে রাখে।পাখার বাতাসে ক্লান্ত শরীরটা ভিজিয়ে নেয়।অনেকটা শান্তি।বিছানার উপর টানটান শুয়ে পড়ে।মন মেজাজ ভালো নেই।কাজে মন লাগছিল না কিছুতেই।পেটের দায়-তাই পড়ে আছে বিদেশ বিভূঁয়ে।ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে ফিরে যায় নিজের গ্রামে।কিন্তু রোজগার পাতি….


আলোটা নিভিয়ে দেয়।অন্ধকারটা মন্দ লাগছে না।চোখ বন্ধ করলেই তো স্মৃতি জ্বলজ্বল করে ওঠে।একের পর এক ছবি ভেসে ওঠে মনের বায়োস্কোপে।


প্রায় একবছর হল ঘরছাড়া।খরচের ভয়ে বাড়ি ফেরাটাই উঠে গেছে।গরিবের ছেলে।দুটো পয়সা জমিয়ে রাখলে লাভ।মাসে মাসে সংসার খরচের জন্য বাড়িতে টাকা পাঠায়।দুটো ফোন কিনবে ভেবেছিল।বাবার শরীর খারাপ হওয়ায় বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে যায়।যোগাযোগের মাধ্যম সেই চিঠি।তাছাড়া চিঠি লিখতেও বেশ লাগে।রুমমেট বিবেক রসিকতা করে বলেছিল—পুলক,তোর জন্যই বোধহয় ভারতের ডাকব্যবস্থা বেঁচে আছে।নাহলে জাদু ঘরে গিয়ে চিঠি জিনিসটা কি দেখে আসতে হতো।


বেশ কিছুদিন ধরে বাবার চিঠি আসে নি।মা,বাবা,ছোট্ট বোনের জন্য মনটা কেমন করে উঠে।কে জানে কেমন আছে সব।সব চেয়ে মনে পড়ছে বোনের কথা।চিঠিতে অর্ধেকের বেশী কথা ওর সম্পর্কে।ইনিয়ে বিনিয়ে কতো যে কথা।কোনো ক্লান্তি নেই।মা বলে --কথা বলার মেশিন।


দরজা খোলার শব্দ হয়।বিবেক ঘরে ঢোকে।আলো জ্বালে।পুলককে অন্ধকারে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে—কি ব্যাপার আলো নিভিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছিস?শরীর খারাপ নয় তো?


গ্লাসে ঢাকা দেওয়া কিছুটা জল খেয়ে পুলক বলে—বাবার চিঠি এখনো এলো না,চিন্তায় আছি।সবাই যে কি করছে কে জানে? 


বিবেক সান্বনা দিয়ে বলে—জানিস তো ভারতের ডাক ব্যবস্থার হাল।কোথাও হয়তো আটকে আছে।বাড়ির জন্য আমারও মন খারাপ।ঠিক করেছি,সামনের পূজোতে  যাব।


বিবেকের বাড়ি পুরুলিয়ার জিওদারুতে।অভাবি সংসার।বিবেক ছাড়া পরিবারে উপার্জনশীল ব্যক্তি কেউ নেই।মা আর ছোট ভাই।ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার দায়িত্ব তার।সবাইকে ছেড়ে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে থাকে এই কারণেই।


বিবেক বলে—শুনেছি বর্ষার সময় গঙ্গার ভয়ঙ্কর রূপ।তোদের গ্রাম  গঙ্গার ধারেই তো?


পুলক চিন্তিত হয়ে বলে—চিন্তা তো সেই কারণেই বেশি।নদী আমাদেরকে দিয়েছে অনেক।আবার মহাজনের মতো সুদে আসলে কেড়েও নিয়েছে বহুকিছু।জানিস তো ন্দীর পাশে আমাদের বিঘা পাঁচেক সরেস জমি ছিল।এক বর্ষায় সেই জমি একেবারে গঙ্গার গর্ভে।এই বছরও ভীষণ বর্ষা।ভাবতে পারছি না বাড়িতে কি হচ্ছে।


বিবেক পরামর্শ দেয়—আমার মনে হয় তোর একবার বাড়ি যাওয়া দরকার।মালিককে সব জানা।নিশ্চয় তোকে ছেড়ে দেবে।


--ঠিক বলেছিস।তাই করব।


পরের দিন মালিক সুরেশ আগরবালকে সব জানায় পুলক।সুরেশ লোক হিসেবে খুব ভালো।কর্মীদের ভালো মন্দ বোঝে।হাসতে হাসতে বলে—চিন্তা কি কোই বাত নেহি।কাল সুবহা নিকাল যা।জলদি লট আনা।


যাবার সময় একছড়া হার আর একজোড়া কানের দুল সাথে নেয়।পাপিয়া বার বার কানের দুলের কথা লিখেছিল।নিজের হাতে বানানো দুল দুটো দারুন মানাবে তাকে।মা কিছু না বললেও হারের ছড়াটা নিয়েছে।মা তো কোনোদিনই কিছু চায় না।হারের ছড়াটা পেলে দারুন খুশী হবে।


ট্রেন ছুটছে ঝড়ের গতিতে।গ্রাম শহর চোখের পলকে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে।জানলার ধারে বসে এসব দেখতে দারুন লাগে।দূরে মাঠে চাষীরা লাঙল করছে।পুলকের বাবার কথা  মনে পড়ে যায়।এভাবে তার বাবাও মাঠে লাঙল নিয়ে যেত।সেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কি পরিশ্রম।এখন জমি নেই। হাল লাঙলও পড়ে আছে উঠোনের একপাশে।


পুলকের চোখে পড়ে জনা কয়েক মেয়ে মাথায় কলসি চাপিয়ে সার বেঁধে এগিয়ে চলেছে।একটা মাঠে হই হই করে ছেলেরা ফুটবল খেলছে।উঃ,সে কি আনন্দ।ছেলেবেলায় সেও কম ফুটবল খেলে নি।ঝগড়া মারামারি,আবার মিলেমিশে খেলা।একদিন এক কান্ড হলো।সামান্য বিষয় নিয়ে ছেলেদের মধ্যে ঝগড়া হয়।শেষে সিদ্ধান্ত হয় আর খেলা হবে না।ফুটবলটা কেটে এক একটা সেপ সবাই ভাগ করে নিল।উত্তেজনা কমতে সে কি আফশোষ।শেষে আবার চাঁদা করে ফুটবল কেনা।এসব কথা মনে পড়লে পুলকের ভীষণ হাসি পায়।


ট্রেনে পরিচয় হয় নন্দিনী নামে এক মেয়ের সাথে।ঠিক তার বোনের মতো।বাবা মায়ের সাথে ফিরছে হাওড়ায়।দেশের বাড়ি।চাকরি সুত্রে থাকে আহমেদাবাদে।সারাক্ষণ বকবক করছে মেয়েটা।পুলককে নানা প্রশ্ন করে। নন্দিনীর বাবা বলেন—জানো তো,বহুদিন পর দেশের বাড়ি ফিরছি।ভালো  লাগছে।বিদেশ বিভূঁই যতই ভালো হোক নিজের গ্রামের মতো হয় না।


পুলকের মতে নন্দিনীর বাবা ঠিক কথাই বলেছেন।গ্রামের সেই চেনাজানা মানুষজন,মাঠ ঘাট,নদী পুকুর,মন্দির বটগাছ পুলকের চোখে ভাসছে।গ্রামে পৌঁছালেই পরিচিত মানুষ জন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করবে—পুলক নাকি? কবে ফিরলি?শহরে থাকিস চেনাই যায় না।গ্রামে চব্বিশ প্রহর হবে, থাকবি তো?


কতো প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের যথাযোগ্য উত্তর দান।একটু বেচাল হলেই হয়তো মন্তব্য আসবে—শহরে থেকে বাবু হয়ে  গেছিস,গ্রামের মানুষগুলোর সাথে কথা বলে ভালো লাগবে কেন?


নন্দিনী হঠাৎ প্রস্তাব দেয়—পুলকদা,তোমার বোনকে নিয়ে একবার আমাদের বাড়ি এস।দারুন মজা হবে।বলো মা ঠিক বলি নি?


নন্দিনীর মা মেয়েকে সায় দিয়ে বলে—ঠিক বলেছিস।সময় পেলে একদিন এসো বাবা।ভালো লাগবে।


পুলক নন্দিনী আর তার মায়ের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়।বলে—সময় পেলে অবশ্যই যাব।


নন্দিনী ভীষণ খুশী ।পুলক আনমনা হয়ে পড়ে।পাপিয়া হয়তো দাদার আসার অপেক্ষায় দিন গুণছে।তাকে কাছে পেলে কি আনন্দই না হবে।শুরু হবে তার বকবকানি—দাদা,তোর সেখানে কষ্ট হয় নি তো?জানিস, তোর জন্য  মন কেমন করে।তোর লেখা চিঠি গুলো দিন একবার করে পড়ি।গতবছর ভাইফোঁটার সময় ছিলি না,কত কেঁদেছিলাম তোর জন্য।দাদা আমাদের ছেড়ে আর যাস না।


বোনের কথা ভাবতেই চোখে জল চলে আসে।মনে মনে ভাবে—তোদের ছেড়ে থাকতে কি ইচ্ছে হয় রে?বাইরে গিয়ে কাজ কর্ম না করলে টাকা জমবে কি করে?আর কিছু দিন পর তোর জন্য পাত্র খুঁজতে হবে।বিয়ের সময় অনেক  টাকার দরকার।একমাত্র বোন।ধুমধাম করে বিয়ে না দিলে চলে?বাবা বেকার।এ সব তো তাকেই করতে হবে।


নন্দিনীর মা জিজ্ঞেস করে—মায়ের জন্য নিশ্চয় মন খারাপ করছে?


পুলক জানলার বাইরে চোখ রাখে।মানস চক্ষে ভেসে ওঠে তার মায়ের ছবি।একঘর ধোঁয়ার মাঝে তার মা হয়তো  রান্নায় ব্যস্ত।পুলকের ডাক শুনে দৌড়ে বেরিয়ে আসবে রান্না ফেলে।প্রাণ ভরে দেখতে থাকবে তাকে।মায়ের পা ছুঁইয়ে প্রণাম করে পুলক জিজ্ঞেস করবে—কেমন আছো মা?


আনন্দে মায়ের বাকরুদ্ধ হয়ে আসবে।উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে চোখের জলে ভাসবে মা।এমন আনমদঘন মুহুর্তের সাক্ষী থাকবে পাপিয়া আর পাশের ঘর থেকে তাকে দেখতে আসা মানুষজন।


চাএ,চা এ গরমাগরম চা এ—চাওলার ডাক শুনে বাস্তবে ফিরে আসে পুলক।নন্দিনীর বাবা বলে—নাও পুলক চা খাও।


হাত বাড়িয়ে চাএর কাপটা নেয়।গরম চা এ চুমুক দিয়ে নন্দিনীর বাবা জিজ্ঞেস করেন—তোমার বাবা কি করেন?


খোলা জানলার দিকে চোখ রেখে পুলক জবাব দেয়—বিশেষ কিছু না।আগে জমি জায়গা ছিল,চাষ বাস করত।এখন বিঘে দুই রয়েছে,কোনো রকমে সংসারটা চলে।


খালি ভাঁড়টা জানলার বাইরে ছুঁড়ে দেয় পুলক।দূরে চোখ পড়ে কাঁধে লাঙল নিয়ে মেঠো পথ ধরে এক চাষীর হনহন করে হেঁটে যাওয়া।তার বাবাও হয়তো মাঠ থেকে ফিরবে।জমি অন্ত প্রাণ ।বাবার মুখ থেকে প্রায়ই একটা কথা শুনে এসেছে-জমি হলো আমাদের অন্নদাত্রী মা।তাকে ভালো না বাসলে চলে?


পুলককে দেখে বাবা হয়তো অবাক হয়ে যাবে।কতদিন পর ছেলেকে দেখছে।প্রণাম করতেই বাবা আশীর্বাদ করে বলবে—জীবনে বড় হও,মানুষের মত মানুষ হও।


--আচ্ছা পুলকদা তোমাদের গ্রামে মেলা হয়?


নন্দিনীর প্রশ্নে পুলকের চমক ভাঙে।পুলক নন্দিনীর চোখে চোখ রেখে উত্তর দেয়—আমাদের গ্রামে নয়,পাশের গ্রাম আলমপুরে।চড়কের মেলা।ভীষণ জমাটি মেলা।পাশাপাশি দশ বারোটা গ্রামের মানুষ মেলায় ভিড় করে।


  --খুব মজা তাই না?


--দারুন।


আগের বারে চিঠিতে পাপিয়া আলমপুরের মেলার কথা লিখেছিল।ও নাকি ফিতা,চুড়ি নেলপালিশ,লিপ্সটিক সব কিনেছে।


পাপিয়ার আর একটা কথা মনে পড়ে যায় পুলকের।


তার জন্য নাকি পাত্রী দেখা হয়েছে।শ্যামপুরের বেলাদির ননদ।পাপিয়ার নাকি দারুন পছন্দ।ওর ভাষায় মেয়েটা নাকি ডানাকাটা পরি।এখন শুধু তার ফেরার অপেক্ষা।


সেই অজানা অচেনা মেয়েটার কথা ভাবতেও ভালো লাগে পুলকের।তার মতো গরিব মানুষের জীবনে প্রেম হল মরুভূমির মরীচিকা।পুলক আপনমনেই হেসে ওঠে।


নন্দিনীর বাবা জানতে চান—তোমাদের গ্রামটা নিশয় বড়?জানো তো আমিও গ্রামের ছেলে।ছেলেবেলাটা কেটেছে গ্রামেই।পরে বাবার সাথে পড়াশুনার জন্য শহরে চলে আসি।এখনও সেই গ্রামের কথা মনে পড়ে।


ছুটন্ত ট্রেন গ্রামগুলোকে ইশারা করে চলে যাচ্ছে।পুলক তাকিয়ে থাকে সেই ছবির মতো গ্রামগু্লোর দিকে।মনের মধ্যে ভেসে উঠে নিজের গ্রামের ছবি।বাবা চিঠিতে লিখেছিল—জানিস পুলক,আমাদের গ্রাম আর সেই গ্রাম নেই রে।অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।ঘোষদের গোয়ালঘরটা ভেঙে ধানের আড়ত হয়েছে।মানিকদের ঘরের সামনে যে বিশাল অশোক গাছটা ছিল সেটাও আর নেই।ভাই এ ভাই এ ঝগড়ার কারনে গাছটার প্রাণ যায়।বলাইদের মাটির ঘরের পরিবর্তে পাকা দালান হয়েছে।বলাই এর দাদা চালের ব্যবসা খুলেছে।বছর খানেকের মধ্যে আঙুল ফুলে কলা গাছ।


পাপিয়া লিখেছিল—নদীর পাড়ে বুড়োবট গাছের তলায় শিব মন্দিরে এবছর নাকি মেলা বসবে।


বুড়ো বট গাছের কথা মনে পড়লেই মনটা শীতল হয়ে ওঠে।যখনই মন অস্থির হয়ে উঠত বটগাছের শীতল ছায়ায় গিয়ে বসলেই সব ঠিক হয়ে যেত।


শিব মন্দিরের পুরোহিত অবনী ভটচাজ বড় ভালো মানুষ।অপূর্ব মন্ত্রপাঠ করেন।দুর্গাপূজার সময় চন্ডীপাঠ শুনতে দূরদূরান্ত থেকে লোক আসে।


এক ফেরিওলার ডাকে পুলকের চোখ ফেরায়।ফেরিওলার কাছে হরেকরকমের জিনিস। নন্দিনী বলে—পুলকদা,তোমার বোনের জন্য কিছু নেবে না?


নন্দিনীর পছন্দ মতো কিছু বাহারী চুড়ি,চুলের খোঁপা নেয়।মায়ের কথা ভেবে একটা লক্ষ্মীর বাঁধানো ফটো নেয়।হঠাৎ নজরে আসে শাঁখের তৈ্রি সুন্দর শিব মূর্তি।পাপিয়ার জন্য নিয়ে নেয় একটা।মা বলে—শিব পূজো করলে নাকি শিবের মতো বর পাওয়া যায়।বাবার জন্য পেতলের তৈ্রি সুন্দর একখানা মাকু কিনল।পুলক জানে বাবা খুব খুশী হবে।জাল বোনার হাত দারুন।তাছাড়া নিজের হাতে বোনা জাল দিয়ে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাই আলাদা।


ট্রেন এসে থামল হাওড়া স্টেশনে।ট্রেন থেকে নেমে নন্দিনী বলল—পুলকদা কথা দিচ্ছ তুমি আমাদের বাড়ি যাবে।


পুলক বলে—যদি সময় সুযোগ হয় অবশ্যই যাবো।


সামান্য পরিচয়েই কতো আপন লাগে পরিবারটিকে।বিচ্ছেদ বিরহ পুলকের মনকে নাড়া দেয়।


আবার অন্য ট্রেন ধরতে হবে।বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।মালদায় যখন ট্রেন এসে থামল ,তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল।আধ ঘন্টার মতো বাস জার্ণির পর দশ মিনিটের হাঁটা পথ।শরীরে ক্লান্তির চাঁই।হাত পা নড়তে চায় না।তবু ঘরে ফেরার উত্তেজনার পারদ উর্দ্ধমুখী।কষ্টকে কষ্ট বলেই মনে হচ্ছে না তার।


লাল মাটির রাস্তা।সারি সারি গাছ রাস্তার ধারে।আলো ছায়ার খেলায় নানান রকমের নকশা রাস্তার উপর।ফুরফুরে বাতাসে পুলকের মন বেশ সতেজ।যমজ হরিতকি গাছদুটো পেরোলেই তাদের গ্রাম।মণিহারতলা।চেনা জানা লাগছে এই মাটিকে।শৈশব,বাল্য,কৈশোর পেরিয়েছে এই মাটির বুকেই।মাঝে শুধু কয়েক মাসের বিরহ।আবার সেই আকাঙ্খিত মিলন।মন আজ পুলকিত।সবকিছু কত আপন।


কিন্তু একি?কোথায় তার ঘর,কোথায় বাড়ি?কোথায় রয়েছে তার বাবা,মা,আদরের বোন?হাত পা কাঁপছে।শরীরে বোধহয় কোনো রক্ত নেই।মনে হল-ঘন কুয়াশার মাঝে কোনো খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে সে।যেখানে তাদের ঘর ছিল তার উপর দিয়ে গঙ্গা বয়ে চলেছে।নিষ্ঠুর নদীটা তার সামনে যেন অট্টহাস্য করছে।


আর ভাবতে পারছে না।এখানে যে ঘর গুলো দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে ছুটে যায় পুলক।গ্রামে লোকজন নেই বললেই চলে।যারা আছে তারা চলে যাবার তোড়জোড় করছে।একজন তার দিকেই এগিয়ে আসছে।পুলক উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করে—অবিনাশদা,আমার বাবা মা বোন কোথায়? কবে এমন ভাঙন হল?


অবিনাশ বাকরুদ্ধ।চোখদুটো ভাসাভাস।মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে যেন।অনেকক্ষণ পর উত্তর দেয়—সব শেষ হয়ে গেল ভাই।কে যে কোথায় গেছে বলতে পারব না।আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দ্যাখ।দেখছিস তো গ্রামের হাল।গ্রাম বলতে আর কিচ্ছুটি নেই।সব নদীর পেটে।আমরাও  কাল সকালের মধ্যে চলে যাব।


দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবিনাশ হনহন করে সামনের দিকে এগিয়ে চলে।পুলকের পায়ে যেন খিল ধরেছে।তবু টেনে হিচড়ে এগিয়ে চলে নদীর পাড় ধরে।বুড়ো বটগাছ,শিবমন্দির আজ সব রাক্ষুসে নদীর পেটে।মনে একটা আতঙ্কের চোরাস্রোত।তার মা বাবা বোনকে গ্রাস করে নি তো নদীটা?কোথায় খুঁজবে তাদের?নিজের প্রতি বিরক্ত হয় সে।কেনই বা সবাইকে ছেড়ে বাইরে গেল?চাষীর ছেলে চাষ করে খেলে কি চলত না?ইচ্ছে করে ভয়ঙ্কর নদীর স্রোতে নিজের প্রাণটাও সঁপে দেয়।  


নদীর কুলকুল শব্দে যেন ব্যঙ্গ বিদ্রূপের হাসি।নদীটা যেন বলতে চাইছে—আমি সবাইকে খেয়েছি,এবার তোর পালা।আমি কাউকে ছাড়ি না।


একটা ঢিল ছুঁড়ে দেয় নদীর বুকে।কুব করে শব্দ হয়।সমস্ত রাগ উজাড় করে দিতে চায় পুলক।তারস্বরে চিৎকার করে বলে—তুই একটা রাক্ষুসী,তুই সর্বনাশী।


পুলকের চিৎকার জলের তীব্র শব্দে হারিয়ে যায়।টলতে টলতে এগিয়ে যায় দিকভ্রান্তের মতো।পশ্চিমে সূর্যটা লাল আলো ছড়িয়ে অস্তগামী।এক্ষুনি কালো আঁধার গ্রাস করবে বিশ্বচরাচর।অন্ধকারেও শোনা যাবে বুভুক্ষু নদীর খাই খাই শব্দ।


                

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন