শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সুজয় চক্রবর্তী।। পারক গল্পপত্র



---- শোনো মিত্রা, আমার হাতের পাঁচটা আঙুলের মধ্যে যদি একটায় পচন ধরে , তবে সেটা কেটে ফেলতে হবে, বুঝলে ? নইলে বাকিগুলোও পচে যাবে ।

সুমিত্রাদেবী কথাটা দেরিতে হলেও বুঝলেন । কর্তা খুবই রেগে গেছেন মেজোছেলে কুনালের ওপর । বাড়ির অমতে বিয়ে তো সে করেছেই , আবার মাস পুরতে না পুরতে আলাদা হতে চাইছে !

কর্তা-গিন্নী নিজের মেয়ের মতোই দেখেন মেজো বউমাকে । এমনকি অবিবাহিতা ননদ বাড়িতে থাকলে যা হয় ---- এই অপবাদও দেওয়া যাবে না দুই ননদ কবিতা আর মৌমিতাকে । তারাও খুব মিশুকে । মেজো বউদিকে তারা খুবই ভালোবাসে । কিন্তু কুনালের বউ পারুল আলাদা সংসার পাততে চেয়ে ‘আবদার’ করেছে স্বামীর কাছে । পারুলকে কুনাল বুঝিয়েছে অনেক । লাভ হয়নি । শেষে সিদ্ধান্তটা জানিয়েছে বাড়িতে ।

সোজা কথার লোক সতীশ দত্ত । মেজাজী মানুষ । একটা সময় গোলা ভরা ধান , গোয়াল ভরা গোরু , পুকুর ভরা মাছ  ---- সবই ছিল তাঁদের । বনেদি পরিবার । বাপ-ঠাকুর্দার আমলের দালান বাড়ি , সামনের সিংহ দরজা আজও আছে  । গ্রামেরই প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন তিনি । চার ছেলে , দুই মেয়েকে নিয়ে কর্তাগিন্নীর সুখের সংসার । পাড়াতে অন্য কার্স্টের লোকই বেশি । তবু তাদের পরিবারের ঐতিহ্য মেনেই পাড়ার নাম এখনও দত্তপাড়া ।

সতীশবাবু বড়ছেলে হিতেনের বিয়ে দিয়েছেন নিজে দেখে-শুনে । বড় বউমা স্বাতীলেখার রূপ-গুণ-বংশ গৌরব বরাবরই উজ্জ্বল । বড় মেয়েটার বিয়ে দেবেন সামনের বৈশাখে । পাত্রও ঠিক করে ফেলেছেন । তারপর ছোটমেয়েটার বিয়ে দেওয়া হয়ে গেলেই বাকি ছেলেদের বিয়ে দেবেন । এই নিয়ে শলা পরামর্শও করে রেখেছেন গিন্নীর সঙ্গে । তাঁদের সেই রুটিনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে কুনাল । তবু মেনে নিয়েছিলেন সব । কিন্তু একেবারে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছে  ! এই মানসিকতা কুনালের ! বাবা-মা’র প্রতি কোনও কর্তব্যই নেই তার ? মন থকে মেনে নিতে পারলেন না ছেলের সিদ্ধান্তটাকে । কর্তাগিন্নী দুজনেই খুব কষ্ট পেলেন । তবে যে চলে যেতে চায় , তাকে তো ধরে রাখা যায় না ! সতীশবাবু রাগে ফেটে পড়লেন কুনালের উপর ।

 ---- তাহলে তুমি সারা জীবন বউয়ের আঁচল ধরেই থাকো । দোষ আমারই । আমি একটা ভেড়া জন্ম দিয়েছিলাম । বাবা যে রেগে গেছেন , কুনাল নিজেও বুঝতে পেরেছে , কেননা রেগে গেলেই একমাত্র সতীশবাবু ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন ।

কুনালকে শেষ পর্যন্ত ত্যজ্যপুত্র করার কথা ভাবলেন সতীশবাবু । অনেক বোঝালেন সুমিত্রাদেবী , ‘ সন্তান ভুল করতে পারে । তাই বলে ওকে এতবড় শাস্তি দিও না ।‘ দম মেরে গেলেন সতীশবাবু । কুনাল যে দু’দিন বাড়িতে ছিল , জলস্পর্শ করলেন না তিনি । 

মাসখানেক শ্বশুরবাড়ি কাটালো কুনাল । তারপর সে বাড়ি ছাড়লো বটে , তবে খুব একটা বেশি দূরে গেল না । দত্তবাড়ির ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ছিল সতীনাথ মুখুজ্জের আট কাঠা অনাবাদী জমি । সেখানেই সাড়ে তিন কাঠার ওপর টালির ছাদের পাকা বাড়ি খাঁড়া করলো কুনাল । নিন্দুকরা কেউ কেউ বললো , ‘ এসব শ্বশুরের দেওয়া টাকায় ।‘ আবার এটা শোনা যেতো , ‘ কুনাল এতদিন বাড়িতে সাংসারিক খরচ কিছু দিত না । সেই সবই কৃপণের মতো জমিয়ে জমিয়ে এই বাড়ি করেছে সে । 

বাড়িতে যাওয়া-আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল কুনালের । যোগাযোগ থাকলো না ভাইবোনদের সঙ্গেও ।

গতকালই ছিল ভাইফোঁটা । দত্তবাড়ি থেকে শঙ্খ ও উলুধ্বনির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল প্রতিবেশী কুনাল ! মনে পরে যাচ্ছিল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ---- এই দিনে , চারভাই বসে থাকতো চারটে আসনে । মা শঙ্খ হাতে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে । তদারকি করছেন । বোন কবিতা আর মৌমিতা ফোঁটা এঁকে দিচ্ছে ভাইদের কপালে । শঙ্খে ফুঁ দিচ্ছেন মা ।

গত পরশু বাজারে ছোটবোন কবিতার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কুনালের । কবিতা কুনালকে ভাইফোঁটার নেমন্তন্ন করেনি । বাড়িও যেতে বলেনি । শুধু বলেছিল , ‘ কেমন আছিস ? মা’র কথা মনে পড়ে না ? ‘ চোখটা ছলছল করে উঠেছিল কুনালের । কবিতা সবার ছোট । কতো ভালোবাসতো তাকে ! কুনাল বুঝেছিল তার বাড়ি ছেড়ে চলে আসা কেউই মেনে নিতে পারেনি । এমনকি যার সঙেগ বেশি সখ্যতা ছিল , সেই কবিতাও । কুনালকে তো স্বয়ং তার বাবাই ‘পচন’ ধরেছে বলে কেটে ফেলতে চেয়েছে , সেখানে অবিবাহিতা বোনরা আর …। তবে মা’র কথা কুনালের খুব মনে পড়ে । কষ্ট হয় । 

সেদিন যদি পারুলের কথা সে না শুনতো, তবে হয়তো …।।

[ ২ ]

মারা যাওয়ার আগে সতীশবাবু দুই মেয়েকেই সুপাত্রে দিয়ে গেছেন । তবে সেজো আর ছোট ছেলেটা সম্বন্ধ করে বিয়ে করে হালে সংসার পেতেছে । মায়ের সম্মতি ছিল তাতে । কিছুদিন আগেই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মা ছেলেদের হাঁড়ি আলাদা করে দিয়েছেন । এখন তিনি আছেন সেজো ছেলের কাছে । বেঁচে থাকতে থাকতেই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বসত বাড়ির দশ কাঠা জমিও তিনি ভাগ করে দিতে চান । তার অবর্তমানে মনোমালিন্য তৈরি হোক, তা চান না । 

সুমিত্রাদেবী স্বামীর পেনশন পান । তাই তিনি যার কাছেই থাকবেন , তাকে তারজন্য আর্থিক ব্যয় ভার বহনের ব্যাপার নেই ।

রেজিষ্ট্রি অফিসে যাওয়ার আগে বড় ভাই হিতেন অন্য ভাই-বোনদের বললো , ‘ অফিসে জিজ্ঞেস করলে বলবি , আমরা তিন ভাই  দুইবোন । ঠিক আছে ? ‘বাকিটা আমি সামলে নেবো ।‘ 

পিতৃসম বড়দাকে সবাই মান্য করে চলে । তবু এক্ষেত্রে সেজো ও ছোট ভাইয়ের ঘাড় নেড়ে সায় দেওয়ার পেছনে যে বাড়তি প্রাপ্যটাই ছিল, তা বুঝতে কারওরই বাকি থাকলো না ।

বোনেরা কেউই বাবার সম্পত্তি দাবি করলো না ।কেননা তারা বেশ সুখে-বৈভবেই আছে । জামাইরা চাকরি-বাকরি করে । প্রত্যেকের পাকা বাড়ি । তাছাড়া শ্বশুরের সম্পত্তিতে ভাগ বসানোর কোনও দুরভিসন্ধি দেখা যায়নি জামাইদের মধ্যেও । 

কবিতা রেজিষ্ট্রি অফিসে সারাক্ষণ মাথা নিচু করে বসেছিল । খুব খারাপ লাগছিল এমন একটা জঘন্য ঘটনার সাক্ষী থাকতে হয়েছে বলে । একই মায়ের পেটের ভাইকে অস্বীকার ! বড়দা হিতেনকে ঘেন্না পাচ্ছিল । সেজদা , ছোটদাও কি করে পারলো ! রক্তের সম্পর্ক ভুলে গেল ওরা ! বাবা আজ বেঁচে নেই । এখনতো মেজদাকে ফেরানো যেত ? ওতো কোনও দিন দুর্ব্যবহার করেনি আমদের সঙ্গে । কবিতা মা’কে কুনালের কথা বলেছিল । মা’র কাছে তো সবাই সমান । সুমিত্রাদেবী বড় ছেলেকে বলেছলেন  , ‘ কুনালকে ডাকিস তোরা ।‘ তার কথায় কেউ কান দেয়নি । বরং ছেলেদের গম্ভীর মুখগুলো দেখে কথা বাড়াবার সাহস পাননি । বয়স বেড়ে গেলে হয়তো এমনটাই হয় । বাড়ির কর্তা হয়ে দাঁড়ায় ছেলেমেয়েরা । পরিবারের পক্ষে কোনটা মঙ্গল , কোনটা অমঙ্গল তারা তা জানে ! সুমিত্রাদেবীর কথা তারা শুনবে কেন ?

[ ৩ ]

বিরানব্বই বছরের বৃদ্ধা সুমিত্রাদেবী এখন থাকেন ছোটমেয়ে কবিতার কাছে । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটে গেচেহ অনেক কিছুই । তাঁর জীবনেও এসেছে অনেক বাঁক । বড়ছেলে হিতেন মারা গেছে হার্ট অ্যাটাকে । গত বছর । বাজার থেকে বাড়ি ফিরেই সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছিল । বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা । ঘাম ঝরছিল । হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পাওয়া যায়নি ।

সেজোছেলে কমল নিরুদ্দেশ । পার্টি করতো । সবাই জানতো । থানা-পুলিশ অনেক হয়েছিল । খোঁজ পাওয়া যায়নি তার । কেউ বলেছে সে খুন হয়ে গেছে । কেউ বলেছে সে সাধু হয়ে গেছে । 

ছোটছেলে নির্মল মারা গেল মধ্য চল্লিশেই । নেশা করতো । বেহেড মাতাল যাকে বলে । এই নিয়ে অশান্তি ছিল পরিবারে । লিভার সিরোসিস ধরা পড়লো । শেষ পর্যায়ে । হাসপাতালে টানা দু’মাস থাকার পরেও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো না । 

বড় মেয়ে মৌমিতাও আজ স্বামীহারা । ক্যানসার ধরা পড়েছিল জামাই রমেনের । এসবই সুমিত্রাদেবী শুনেছেন । দেখেছেনও কিছু অঘটন নিজের চোখে । একে একে তাঁর প্রিয়জনেরা তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন । আর বসে বসে তাঁকে তা দেখতে হচ্ছে । সহ্য করতে পারছেন না এ মৃত্যু যন্ত্রণা । আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না । নিভৃতে শুধু চোখের জল ফেলা ছাড়া তাঁর আর কিছুই করার নেই । ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে যে ভরাট সংসারের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন , তা কেমন যেন এলোমেলো ।

বেশ কদিন ধরেই মনটা বড় অস্থির হয়ে উঠছিল সুমিত্রাদেবীর । বাড়িতে যেতে ইচ্ছে কড়ছিল তাঁর ।ভাগ হয়ে গেছে সব কিছু । তবুতো স্বামীর ভিটে ! কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেখানে । আর কুনালটাই বা কেমন আছে  কে জানে ! 

বিকেলবেলায় কথাটা বললেন কবিতাকে । তাঁর শরীরের অবস্থা দেখে কবিতা রাজি হল না । মা’কে আশ্বস্ত করে বললো, ‘ তোমার শরীর এখন ভালো নেই । একটু ভালো হোক । পরে নিয়ে যাবো ।‘

শুনলেন না সুমিত্রাদেবী । ‘বড় ছেলে মানুষি’ করে ফেললেন তিনি । যাবেনই । শেষটায় তাঁকে ট্যাক্সি করে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলো কবিতা ।

বহুদিন পর বাপের বাড়িতে এলো কবিতা । সঙ্গে মা । দাদারা নেই । ভাইপো-ভাইঝিরা সব বড় হয়ে গেছে । বৌদিরাও কেউ কেউ দিদিমা , ঠাকুমা আখ্যায় ভূষিতা । বড়দার ছেলে অম্লান অটো মোবাইল ইঞ্জিনিয়ার । সেজোদার বড় মেয়েটা প্রাইমারি স্কুলের দিদিমণি । ছোটদার ছেলে দুটো ব্যবসা করে । বিয়ে-থা হয়ে গেছে সব । বাড়ির পরিবেশটা সেই আগের মতো নেই । বাড়ির ঢোকার মুখের সেই নারকেল গাছটা কাটা হয়ে গেছে । গোটা একটা বাড়িই এখন তিন টুকরো হয়ে তিনটে বাড়ি হয়ে গেছে । সেই দত্তবাড়ি আর নেই । পাঁচিলের একাংশ ধসে গেছে । বাড়ির সামনেই বিশাল দোতলা বাড়ি হাঁকিয়েছে কুন্ডুরা । কুন্ডুর ছেলেটা আর্মিতে চাকরি করে । বাড়ির বাঁ-পাশের বিশ্বাসদের গোয়াল ঘরটা আর নেই । ওখানে মুদির দোকান খুলেছে বিশ্বাসের ছোটছেলে । ভগীরথদের পুকুরটা বাড়ি থেকেই দেখা যেত, ওটা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে । ওখানে বাড়ি তৈরি হবে । আগের সেই ফাঁকা ফাঁকা শান্ত পরিবেশটা যেন উধাও । এক চিলতে খেলার মাঠ বলতে নন্দীদের বাড়ির পেছনটা ।

লোকজনের আনাগোনা , বাচ্চাদের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যেও শোনা গেল একজন খুব জোরে কাশছে । দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হলেও শ্রবণশক্তি তাঁর এখনও প্রখর । গলার স্বরটা চেনা মনে হল সুমিত্রাদেবীর । এক মুহূর্ত কান খাঁড়া করলেন তিনি । কুনাল নাকি ? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন সুমিত্রাদেবী । কুনালই কাশছে । কুনালের কথা ভেবে বেশ বিচলিত হয়ে উঠলেন । শুনেছিলেন বহুদিন আগে , কুনালকে অ্যাজমায় ধরেছে ।

'নিশ্চয় খুব কষ্ট পাচ্ছে ছেলেটা ! 

আশঙ্কিত সুমিত্রাদেবী ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন ।

সীতানাথ মুখুজ্যের জমিতে একটা দোতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছে । ওদিকেই আঙুল দেখিয়ে সুমিত্রাদেবী কবিতার কাছে জানতে চায়লেন, ‘ হ্যাঁরে, ওটা কুনালের বাড়ি না ?

কবিতা অবাক দৃষ্টিতে মা’য়ের দিকে তাকিয়ে বললো , ‘হ্যাঁ ‘।

--- যাবি একবার কুনালের কাছে ?

---- কেন ?

--- বলবি, মা ডাকছে ।

কথাটা বলেই কবিতার কাছ থেকে উত্তরের আশায় শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সুমিত্রাদেবী ।

কবিতা একেবারেই থ’ মেরে গেল । -- এতদিন পর ! তবে মায়ের করুণ মুখের দিকে চেয়ে কোনও প্রশ্নই করলো না কবিতা । রাজি হয়ে গেল । 

কবিতা চলে যেতেই সুমিত্রাদেবী এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলেন আরও কিছুটা । এতা সেজো ছেলের ঘর । ঘর পেরিয়ে বারান্দায় এলেন । সেখানে সতীশবাবুর একটা ফটো টাঙানো আছে । কর্তার ফটোর সামনে অশক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে অস্ফুটে কাঁপা কাঁপা গলায় সুমিত্রাদেবী বললেন, ‘ মাস্টারমশাই, আপনার সেই ‘পচন’ ধরা আঙুলটা, যেটা আপনি কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন , সেটাকেই যে আজ আমার বড় দরকার । ‘ গলাটা ধরে এলো । চশমার কাঁচের ভেতর থেকে তাঁর চোখদুটো ছলছল করে উঠলো । চেয়ারের হাতল দুটো ধরে ধীরে ধীরে বসে পড়লেন তিনি । ছেলের হাতের আগুন পাওয়ার ইচ্ছেটা যেন প্রবল হচ্ছে ।

ঈশিতা, সেজদার মেয়ে । ওকে সঙ্গে নিয়ে কুনালের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কবিতা । ‘

মেজদা’, ‘মেজদা’, বলে কয়েকবার ডাক দিল । বেশ কিছুক্ষণ পর সত্তরোর্ধ এক বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিতে দিতে এগিয়ে আসলো । সঙ্গে বছর পাঁচ-সাতের একটা ছেলে । বৃদ্ধের গায়ে একটা সুতির চাদর । মুখভর্তি দাড়ি । পাকা । হাঁপাচ্ছে । কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার । মাথাটাও সমানে নড়ছে । হাত-পা কাঁপছে । বোঝা যাচ্ছে অ্যাজমার সঙ্গে সঙ্গে নার্ভেরও সমস্যা আছে । খুব কাছ থেকেও কেমন অচেনা লাগছে মানুষটিকে ।

কবিতা বললো , ‘ মেজদা, মা তোকে ডাকছে ।‘

আর্থারাইটিসে কাবু কবিতা সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে । তারও তো বয়স কম হল না ! কবিতাকে চিনতে পারলো না কুনালও । তবে ডাকটা খুব চেনা লাগলো । 

--- কবিতা না ?

--- হ্যাঁ মেজদা , আমি । আমি কবিতা ।

হারানো কোনও জিনিস খুঁজে পেলে যেমন আনন্দ হয় , তেমনই আনন্দ ঝরে পড়লো দুজনের চোখে-মুখে । কুনাল ডান হাতটা বাড়িয়ে কবিতার মাথায় ছোঁয়াল । পুরনো কোনও কথাই কেউ তুললো না । 

কবিতার বুঝতে অসুবিধা হল না , দাদার সঙ্গে বাচ্চা ছেলেটি তাদের নাতি । তার গালে হাত দিয়ে চুমু খেল কবিতা ।

---- মা, কোথায়, নিয়ে আসলি না কেন ? 

--- মা সেজদার ঘরে । হাঁটতে পারে না ঠিকমতো । তুই যাবি ?

ইতিমধ্যে ছোট্ট প্রীতমকে কোলে নিয়ে ফেলেছে ঈশিতা । কুনাল পা বাড়ালো ওদের সঙ্গে । ডানহাতে লাঠি । বাঁ-হাতটা কবিতার কাঁধে । কুনালকে মা ডাকছে ।মা নিশ্চয় শুনেছে তার হাঁপের টান । ছোটবেলায় শরীর খারাপ করলে মা’র কোলে মাথা রেখেই .........। মা’কে অনেকদিন দেখেনি কুনাল । অনেকদিন ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন