সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গৌতম রায়।। পারক গল্পপত্র



সুবে সাদিকে মোয়াজ্জিনের আজান তখনো পড়েনি। নিজের দিকে থেকে কাঁথাটা রোহিমার গায়ে টেনে দিল ফতেমা। আজ দুদিন হল মরদের ঘরে এসেছে সে।পেটের শত্তুর দুটোকে কোথায় আর থুয়ে আসে? অগত্যা সেই দুটি ও সঙ্গী হয়েছে আশারার।বাপ যে কি বস্তু,সেই সোহাগচান্দর , আর কি বোঝার মতো নছিব করে কি শত্তুর দুটো এয়েছে? মামানীর গালমন্দে দুবেলা , দুমুঠো খেতে পেতো বশাইপুরে,  বড়ভাইয়ের ঘরে, এই না তাদের বাপ -দাদা- পরদাদাদের নছিবের জের--, ভাবে ফতেমা।

                     ভোলা মিঞার অসুখের গতিক ভালো না।তাই বাড়ির অন্য ভাড়াটেরা খবর দিয়েছিল। খবর পেয়ে এসে সবকিছু দেখবার পর বাপের বাড়ি আর ফিরে যেতে পারে নি ফতেমা।ছেলে মেয়েকে নিয়ে ভোলার এই লাইন ঘরেই শেষ পর্যন্ত থেকে গেছে।এটাকে ঠিক লাইন ঘর বলা যায়।আবার যায় ও না।বাড়িওয়ালা রামনরেশের বাড়ির একটা বাড়তি অংশেই থাকে ভোলা মিঞা।বাড়িতে ঢুকেই সরষু, মার্কন্ড পাঁড়েদের ঘর।তারপর ভোলা।শেষে থাকে রাজিন্দর পাঁড়ে।বৌ নিয়ে থাকে বলে রাজিন্দর নিজের ঘরের আগে একটা ইঁট - কাদার পাঁচিল করে, সকলের সাথে নিজের একটু আলাদা থাকার ইচ্ছে টা প্রকাশ করেছে।তবে রাজিন্দরের বৌ দেওসুন্দরী, ভোলার প্রথম বৌ মারা যাওয়ার পর, মহল্লার ভালোমন্দের দায় এখন কার্যত নিজের হাতেই তুলে নিয়েছে।ফলে কাদার পাঁচিলের আবডাল এখন দেওসুন্দরীর আর বিশেষ দরকার হয় না। এজমালী গেটের মুখে , ড্রেনের উপরের শ্ল্যাবটাতেই এখন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে তার।মহল্লার খবরাখবর সেখান থেকেই তার সংগৃহীত হয় এবং চালাচালি চলে!

                   কাল আসরের বেলা থাকতেই ভোলাকে সামনের ঘোষেদের বাড়ির রোয়াক থেকে এই টালির একটেরে খোপে নিয়ে আসতে মা , বিটি , ছেলে মিলে কম চেষ্টা করে নি।ছেলে, মেয়ে গুলো তো ছোট ।তারা পারবে কি করে অসুস্থ, রুগ্ন একটা মানুষ কে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে আনতে? হাঁটার শক্তি তো ভোলার নেই।

                ভোলা কে নিজেদের আব্বা বলে বিশ্বাস করতেও হাফিজ আর রোহিমার একটু যেন কেমন কেমন ঠেকছে।এই কেমন কেমন ঠেকার কারন হল , ভাষা।গ্রামের বাঙালি চৌহদ্দিতে জন্ম ইস্তক কাটানো রোহিমাদের যেমন অসুবিধা হচ্ছে তাদের আব্বার কথা বুঝতে, আবার একান্ত গাঁয়ের উচ্চারণ ভঙ্গি , বাংলা একটু আধটু ভুঝলেও, এই বিমারের কালে দিমাকে ঢুকছেই না ভোলার।

                      চটকলের কাজ টা ভোলার অনেক দিন ধরেই নেই।পাওনা গন্ডাও মেলে নি।তাই ঝারফুঁক, জলপড়া, তেলপড়া কেই পেশা করে নিতে বাধ্য হয়েছিল ভোলা।তাতে কি আর সংসার চলে? বিবি বাচ্চারা তাই একমুঠো খাবারের তাগিদে চলে গিয়েছিল আপন বাপের কাছে।

                     বাপের বাড়িতে আর যাই হোক ফতেমার ভাতের অভাব ছিল না। এখানে যে কি হবে- এই চিন্তা কাল রাতে বিছানায় যাবার সময় থেকে জাড়ের দিনে কাঁথার ওমের মতো লেগে আছে ফতেমার গায়ে।

                 খারাপ লাগছিল , রুগ্ন মরদের গা থেকে কাঁথাটা খুলে আনতে।ফতেমা একবার ভেবেছিল নেবে না কাঁথাটা।তারপর ভাবলো; নিজের কথা ছেড়েই দিই।ছোট ছেলে মেয়ে দুটোর তো এই জারের রাতে গায়ে একটা কিছু দরকার।

                     রোহিমার আব্বার গায়ে দুটো কাঁথা আছে।একটা যদি নিই , খুব কি কষ্ট হবে বুড়োর?- একবার ভাবে ফতেমা।ভেবে কুলকিনারা পায় না।স্বামী বনাম সন্তানের এই টানাপোড়েনে কেমন যেন দিশেহারা হয়ে যায় ফতেমা।আসলে দারিদ্র যে এতোটা ও চরম হতে পারে, সেটা বুঝে ওঠা টা ঠিক যেন, বোঝার মতো অবস্থায় থাকতে পারছে না এখন ফতেমা।

                          বিয়ের পর থেকে মরদের ঘর সেভাবে করার সুযোগ তার হয় নি।আসলে বিবি কে কি খাওয়াবে, এই ভাবনা থেকে ই ভোলা মিঞা তার দ্বিতীয় পক্ষের বৌ কে নিজের কাছে রাখেই নি।নিজের বস্তিবাড়ি থেকে শ্বশুরঘর খুব একটা দূরে ছিল না।বাসে করে গেলে ঘন্টা খানেকের পথ।আর হেঁটে গেলে ঘন্টা তিনেকের।হেঁটে পয়সা বাঁচানোটাকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করতো ভোলা।কারণ, ওই টুকু পয়সা বাঁচলে একটা দিন তো মিলের গেটের সামনে র হোটেলের ভাতের খরচ টা জোগার হবে।

                      আইবুড়ো মেয়ে ঘরে রাখা বাঙালি জীবনে একটা সমস্যা।তা সে বাঙালি হিন্দুই হোক আর মুসলমান।বাঙালির সামাজিক এবাদতে ধর্মের ইধার উধার যে গ্রাম্যরীতিনীতিতে কোথায় মিলে মিশে গেছে, তা বোঝার জন্যে লোকসংস্কৃতির গবেষকদের ফিল্ড ওয়ার্কে অনেক পশিনা ঝরলেও, ফতিমার আম্মা আর প্রভার মা আরতি দের মতো এতো জীবন দিয়ে জানা টা বোধহয় , সকলের হয়ে ওঠে না।তাই লোকসংস্কৃতির হাল আমলের শৌখিন মজদুরি আর ফতেমা, প্রভাদের জীবনের বাস্তবতায় ফারাক টা কেবল থেকেই যায় না, বাড়তেই থাকে সেই ব্যবধান।

                    সেই ব্যবধানের খেসারত দিতেই হয়তো ফতেমাকে তার নিজের সমাজে র হাঁড়িকাঠে মাথা দিতে হয়।যেমনটা দিতে হয় প্রভাকে তার নিজের সমাজে।তবে ধর্মে ভেন্ন হলেও গরিবীবোলচাল ফতেমা আর প্রভা দুই ধর্মের দুই নারীকে যেন বেঁধেছে এক সুতোয়।নজরুল কি এমন মানুষদের কথা চিন্তা করেই লিখেছিলেন, তুমি মরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান? 

                     রাজিন্দারের বৌ দেওসুন্দরী ফতেমা এখানে থেকে রুগ্ন স্বামীর সেবা শুশ্রষা করছে, এটা দেখে ঠিক খুশি হয়েছে ,না গুসসা করছে, সেটা যেমন তার আদমি রাজিন্দার বুঝছে না, তেমনি ই ফতেমাও ঠিক বুঝছে না।নিজের বৌ কি চোখে ভোলার মেহেরারু কে দেখছে, তার উপরে নির্ভর করবে ফতেমার প্রতি রাজিন্দরের আচরণ।গোটা ঘোষপাড়া রোডের কুলিডিপোর মানুষ জানে রাজিন্দরের বৌসোহাগের কথা।আর হারেঠোরে হাসে তার গমকিনী বৌ দেওসুন্দরীর কীর্তিকল্প দেখে।

                      বাড়িওলার মূল বাড়ির ভিতরের ছাপড়ার ঘর গুলোতে থাকে সোরস্বোত্তি সাউ, দেবী শাহ।এই দেবী শাহর বৌ আবার কুলিডিপোতে পরিচিত শোয়াইন বলে।শাহজীর বৌ।তাই শোয়াইন।আর ও থাকে চামাড়ুয়া, তার বৌ আশা, তাদের ছেলের পাল, বিদেশি,রাজকুমার ,রবিকুমার।এই রবিকুমারের আগে চামাড়ুয়ার মেয়ে ববিতা।চামাড়ুয়ার মা, যে তারকবালা দাসীর ভাড়াটে হয়ে, দেওর হরিহর কে নিয়েই জীবন কাটিয়ে গেল লাইচিয়ার মা হয়ে, লাইচিয়া, সেই বুড়ির মেজমেয়ে ছিল,সে মা কতো চেষ্টা করেছিল ছেলের চামাড়ুয়া নামটিকে ' পরদেশিয়া' বলে জনপ্রিয় করে তুলতে।পারে নি।ব্যর্থ হয়েছে।তবে চামাড়ুয়ার বৌ আশা যখন নিজেদের মেজছেলের নাম রাখে ' রাজকুমার' ,তখন তাদের খোলার ঘরের সামনে এসে কোমর বেঁধে ঝগড়া করে গিয়েছিল রাজিন্দরের বৌ দেওসুন্দরী।কারন, সে যে তার বোউয়ার নাম রেখেছে ,' রাজকুমার' ।দেওসুন্দরীর ছেলের নামে নাম কি কখনো চামাড়ুয়ার ছেলের হতে পারে?প্রলেতারিয়েটের শ্রেণীস্বার্থের এই গাঁওয়ালি তরিকার খুনসুটির কথা , আচ্ছা মার্কস বা এঙ্গেলস সাহেব কখনো কল্পনা করতে পেরেছিলেন?

                   এমন ছত্তিশ জাতের মানুষজনের সঙ্গে ই থাকে আরতি।সে বাঙালি হয়েও তার বাপ ,কন্যাসন্তান, এই গলার কাঁটা কে বিদেয় করেছে এক হিন্দিভাষী চপকল শ্রমিকের সাথে বিয়ে দিয়ে।

                জন্ম থেকেই আরতির দুটি পায়ের গঠন সমান হয়।একটা স্বাভাবিক।অন্যটা খাটো।ফলে স্বামী মরার পর হঠাৎ কালী ভক্ত হয়ে যাওয়া শ্বশুর যখন আর বেওড়া বৌকে রাখতে চাইল না , তখন এই থিয়েটার সাউয়ের বস্তিতে ঘর ভাড়া নেওয়ার সাথে সাথে পিতৃদত্ত নামটা বুজে গেল।নোতুন নাম হল, লেংড়ি।

                     আসলে একদম পিছিয়ে পড়া মানুষ , সব সময় খোঁজে , তার থেকেও পিছিয়ে পড়া কে আছে।সে যে সামাজিক নির্যাতন সয়েছে, তার থেকেও নির্মম ভাবে চাক্কি পিসিংয়ের জন্যে , সে আরো কোনঠাসা, দেওয়ালে পিঠ আটকে যাওয়া মানুষ খুঁজতে চায়।

                আর তেমন মানুষ পেয়ে গেলে, সেই মানুষ দের সবথেকে গোপন যন্ত্রণাটাকে সদরকোঠায় একদম হাটের দেউরে টেনে এনে, প্রথমে তারা খুব আনন্দ পায়।এই আনন্দ পাওয়াটিকেই হয়তো আজকের সাজুগুজু সমাজবিজ্ঞানীরা , চোখ মুখ বেঁকিয়ে ' সোশাল রাগিং' এর একটা পর্যায় বলে বেশ চোখ মুখ দুলিয়ে বর্ণনা করবে।কিন্তু এই সামাজিক হ্যাটাই একদিন যে হানিফ থেকে বিজরাজ পাঁড়েদের ত্রাণকর্ত্রী হয়ে ওঠা , বাবুদের বাড়ির রান্নার মাসী, থিয়েটার সাউয়ের ভাড়াটে' লেংড়ি ' হয়ে ওঠে, এই হয়ে ওঠাটা আর সেইসব সমাজবিজ্ঞানীদের দেখা হয় না।কারন, তাঁরা তখন নোতুন অ্যানালিটিকাল স্টাডিডে যাওয়ার জন্যে মুখে চোখে রঙচঙ ঘষতে ব্যস্ত থাকে।

                      আরতি নিজের সব কিছু সামলে একটু আধটু পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করে ফতেমার।সাধ থাকলেও , পাশে দাঁড়াবার সাধ্য কোথায় তার? তিন বাড়ি বাসন মাজা আর এক বাড়ি রান্না করে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায় , আরতি নিজেই টের পায় না।তবু তিন বাড়ি থেকে যে জল খাবার আনে, মায়ে- ঝিয়ে খাওয়ার পর তা থেকে যতোটা বাঁচে, ফতেমার ছেলে মেয়ে দুটোকে খাওয়ায় আরতি।রোজগেরে কেউ নেই, চটকলের ছাঁটাই শ্রমিক ভোলা মিঞার ঘরে দুটাকা ও সঞ্চয় নেই।তাই চুলো ও ধরাবার হুড়োহুড়ি নেই ফতেমার।রুগীর পথ্য? চেয়েচিন্তে যে দুটো ফুটিয়ে দেবে মরজুল মউতে র হওয়ারী মরদকে, তা সেই চাইবার আদত টাই তো ফতেমা রপ্ত ই করতে পারে নি।

                        ধুকপুক করে চলতে থাকা চটকলের শ্রমিক মহল্লায় দুটো মসজিদ।শ্মশানে যাওয়ার ঘোষপাড়া রোড লাগোয়া মসজিদটাতে নামাজ আদায় করতে যায় হিন্দি ভাষী মানুষেরা।গ্রাম্য বাঙালি পরিমন্ডলে আজীবন কাটানো ফতেমা , হিন্দি বোলচালে একেবারেই অনভ্যস্ত।তার মেয়ে রোহিমা তো বাপের রুগ্ন গলায় দু চারটে হিন্দি জবানের বিন্দু বিসর্গ ও বুঝতে পারে না।

                    মসজিদ থেকে মাঝে মাঝে খানিকটা করে চাল, আলু , আটা দিয়ে যায়।চটকলিয়া এবাদতে জাকাত , ফেরত ঘিরে মসজিদে টাকা পয়সা তেমন একটা জমা না পড়লেও, খাদ্যসামগ্রী দিয়েই সেই অভাব পূরণের চেষ্টা মুসুল্লিদের ভিতরে আছে।পাড়ার দু প্রান্তে দুটো মসজিদ।দক্ষিণদিক দিয়ে শ্মশানে ঢুকতেই বাংলা মসজিদ।এই বাংলা মসজিদের এককালে নাকি বেশ রমরমা ছিল।

                          দেশভাগের পর বাংলা মসজিদ লাগোয়া মানুষদের ভিতর বেশিরভাগ চলে গিয়েছিল সেদিনের পূর্ব পাকিস্থানে।আর তাদের পরিত্যক্ত বাড়ি , পুকুর সব দখল করে নিয়েছিল বৈকুন্ঠ দাস। বরিশালের ঝালকাঠির গাভারামচন্দ্রপুর, বৈকুন্ঠের নিজের গাঁ, সেখানকার নিজের পেটোয়া লোকেদের দিয়ে দখল করেছিল পূর্ব পাকিস্থানে চলে যাওয়া আসলাম, জিন্নাত, ইয়াকুবদের বাড়ি, জমি,পুকুর।বাংলা মসজিদের অনেকটা জায়গা বৈকুন্ঠ দখল করলেও , মূল মসজিদ টা পুরোটা দখল করতে সাহস করে নি।তারপর থেকেই বাংলা মসজিদ এই বাঙালপাড়ায় একবুক অভিমান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তাই এই মসজিদের ইমাম ইচ্ছে থাকলেও রুগ্ন, অসুস্থ ভোলা কে দোয়াদরুদ ছাড়া কিছুই দিতে পারে না।

                       শ্মশানের উত্তরের মসজিদটির অবস্থা অবশ্য বাংলা মসজিদের মতো নয়।চটকলের হিন্দিভাষী মানুষের দৌলতে মসজিদটা সব সময়েই গমগম করে। মসজিদের সামনের চাতালে রাখা তাজিয়া জানান দেয় সেখানকার হাড়ের গরম।বাংলা মসজিদ থেকে তাজিয়া বেরোতে এই তল্লাটের মানুষ ইদানিং দেখে নি।দেশভাগের আগে বাংলা মসজিদ থেকে দুলদুল বেরোনো , সেই মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষজনেরা এখন এই চটকল লাগোয়া আধা মফস্বলি শহরে প্রায় কেউ ই আর বেঁচে বর্তে নেই। 

                          বাঙালি পাড়াতে অবাঙালি বরের বৌ হয়ে  এসেছে ফতেমা।বাঙালি মেয়ে ফতেমার এই চটকলি পাড়াতে পরিচয় মিঞাইন।মিঞার বৌ।তাই ল্যাংড়া আরতি ছাড়া কারো কাছ থেকে তেমন কিছু মৌখিক মিঠেকথাও মেলে না ফতেমার।তবে ভোলা কে খাওয়ানোর সময়ে ফতেমাকে সাহায্য করতে আসে আরতি।নোংরা , তেলচিটে বিছানার উপর উঁচু করে নিজের বুকের সঙ্গে ভোলার পিঠ লাগিয়ে বসায় আরতি।ফতেমা ছোট ছোট লোকমা তুলে দেয় বরের মুখে।

                 ফতেমাকে এভাবে আরতির সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া ঘিরে বস্তিবাড়ির আর সকলের তেমন কোনো হেলদোল নেই। মুসলমান ভোলা কে নিয়ে হিন্দু ঘরের মেয়ে আরতির আদিখ্যেতা নিয়ে ফিশফাশ চলে।আরতির কানে এলেও , সেসব ফিশফাশে পাত্তা দেওয়ার মতো মানুষ সে নয়।বাঙালি মেয়ে, টাকার অভাবে চটকলের হিন্দুস্থানী লেবারকে বাপের কথায় বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল সে।বাঙালি ঘরের মেয়ে ফতেমাও।বাপের বাড়িতে ভাইবোনের চলবলানিতে অধৈর্য হয়ে তার আম্মা বিহারি ভোলার সাথে ফতেমার বিয়ে দিয়েছিল।ধর্ম না মেলাতে পেরেছে আরতিকে, না পেরেছে ফতেমাকে।বরের সন্তান পেটে ধরেও বরের মুখের কথা কখনো বুঝতেই পারে নি আরতি আর ফতেমা-- দুটি বাঙালি নারী।

              আরতি খেয়াল করে নি , ফতেমার ঘরের দরজার বাইরে কখন এসে দাঁড়িয়েছে হিন্দি মসজিদের ইমাম সাহেব।মেয়ে ছোট থাকতে জলপড়া, তেলপড়া আনতে মসজিদে যেত আরতি।অসুখ করলে ডাক্তার দেখানোর পয়সা তো সব সময় হাতে থাকত না।ইমাম সাহেবের জলপড়া ভক্তিভরে খাওয়ালে মেয়ে ভালো ও হয়ে যেত।

                  যুক্তিবাদী লোকেরা কুসংস্কার নিয়ে অনেক কথাই বলে।কিন্তু পেটের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে একজন মা  রুগ্ন শিশুটিকে দাওয়াখানায় না নিয়ে গিয়ে কেন ছোটে মসজিদে, পীরের থানে, কেন ছোটে না মন্দিরে-- চাঁদির ঝংঙ্কারের সেই রহস্যের গোপন কথা তো আর যুক্তিবাদী বাবুরা জানার চেষ্টাও করে না।

                          বিছানায় মিশে যাওয়া, একমুখ দাড়ি, বিছানা থেকে ইউরিয়ার ঝাঁজ উঠে আসছে, তবু নিজৃর বুকে ঠেস দিয়ে পড়শি ফতেমার মরদ কে বসিয়ে রেখেছে আরতি, আর ফতেমা নিজের স্বামীকে মোমিন মুসলমানের জাকাতলব্ধ ভাতের লোকমা তুলে দিচ্ছে-- চোখের জল সামলাতে পারলো না ইমাম।ধরা ধরা গলায় বলে উঠলো, খোদাতালা তেরা ভালা করে।ভাষা না বুঝলেও দুই বাঙালি রমণী বুঝলো, বুড়ো ইমামসাহেব কাঁদছেন। ভোলার টালির চালে ডেকে উঠলো  একটা অজানা পাখি।

                        


৩টি মন্তব্য:

  1. পড়লাম দাদা,বেশ ভালো লাগল। নতুন করে দেখতে, ভাবতে শেখালে।

    উত্তরমুছুন
  2. গল্পকারকে ধন্যবাদ! এরম একটি ভালো গল্প উপহার দেওয়ার জন্য।

    উত্তরমুছুন