শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

রুখসানা কাজল।। পারক গল্পপত্র




সাজেদালি কারওয়ান বাজারে মিস্ত্রির কাজ করে। থাকে বাজারের পাশে রেল বস্তির পলিথিন ঘরে।    

প্রতিদিন ভোরে আজান মগ্ন সময়ে ঝাঁকা হাতে বেরিয়ে পড়ে সাজেদালি। নির্দিস্ট    হোটেলগুলোতে মাছমাংস তরিতরকারি্র সাথে শাকসবজি তেলনুন পৌঁছে দিয়ে নয়টার ভেতর গোসল করে ফ্রেশ হয়ে যায়। এরপর চলে আসে অনুপম গার্মেন্টেসের বিপরীত দিকে জব্বার মোল্লার তালাচাবি ছুরিকাঁচির দোকানের সামনে। গামলার মত বড় মগ ভর্তি চা আর দশ বারোটা পরোটা নিয়ে খেতে বসে ঠিক গার্মেন্টসের গেটের দিকে মুখ করে। ওর এক সময়ের বউ সাফিনা কাজ করে এখানে। সাধারণ ঠিকা শ্রমিক থেকে সে এখন সেলাই সেকশনের হেড ট্রেইনার স্যার হয়েছে ।         

মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যায় । কখনো চোখে চোখ পড়তেই চকিতে মুখ নামিয়ে বান্ধবীদের মাথার পেছনে লুকিয়ে পড়ে সাফিনা। আর সাজেদালির রোম রোম জুড়ে বেজে ওঠে,  “বকুলফুল  বকুলফুল সোনা দিয়া -------   

গেলো দশ বছর ধরে এভাবেই চলছে। সাজেদালি কখনো কোনো দিন সাফিনার সাথে কথা বলার  চেষ্টা করেনি। ইচ্ছে করে তাকিয়েও দেখেনি। কিন্তু প্রতিদিন এই দোকানের সামনে এসে বসে থাকে। ভাই ভাই রেস্তোরাঁর কিশোর কর্মচারি সাফায়েত কাজের ফাঁকে এসে গল্প করে যায়। ল্যাদা বয়সে বন্যার পানিতে ভেঙ্গে যাওয়া এক বাঁধের উপর পড়ে ছিল ছেলেটা। বুকে করে তুলে এনেছিল সাজেদালি। অনেকেই ভাবে সাফিনার জন্যে আবার কেউ কেউ ভাবে পালিত পুত্র সাফায়েতের জন্যে এমন ঢ্যাপ মেরে বসে থাকে সাজেদালির।    

ভুল করে সাফিনাও তাকিয়ে দেখে না । ওর কাছে সাজেদালি এখন কেউ না। তামাদি সম্পর্ক নিয়ে ওর কোন মাথাব্যাথাও নেই। তাই অন্য কোন গার্মেন্টসে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেনি কখনও। তাছাড়া এ পাড়ার সরকারী ইশকুলে পড়াশুনা করে ওর দু  ছেলেমেয়ে। দুজনেরই মাথা ভাল। পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করে প্রতি বছর। সাফিনা স্বভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং চরম বাস্তববাদী। স্বামি সন্তান নিয়ে সমাজের অনেক দূর উঠে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। ওর স্বামীও খুব হিসেবি এবং ঘোর সংসারি। জীবনকে ওরা বহতা নদীর মত ভাবে না। স্বামীস্ত্রী  মনে করে  জীবন হচ্ছে পাড় বাঁধানো বাহারি একটি লেক। ইচ্ছে করলেই যার দুপারে ফুল বা ফলের বাগান সাজানো যায়। 

মাস গেলে দুজনেই হিসেব নিয়ে বসে। তাতে যে কদিন ছেলেমেয়েকে ঝালমুড়ি, ফুচকা কিম্বা আলুকাবলি বা চিপস কিনে দিয়েছে তার হিসেবও ঠিক ঠিক লিখতে  কখনও ভুল হয় না ওদের।        

মাঝে মাঝে সাজেদালি উধাও হয়ে যায়। ফিরে যখন আসে, তখন ওর গায়ে লেপে থাকে নদীজলের গন্ধ, শাপলাফুলের রেণু লাগা স্বপ্ন আর দূর দূর বহু দূরের সাগর আর মহাসাগরের সুরধ্বনি। চেনাজানা অনেকেই কাছে এসে আপনজনের মত জানতে চায়, মিয়ার বেটা তাইলে ফিরলা আবার ! কই কই যে হারায়ে যাও ! শোকর আল্লার যে ফিরে আসিছ। তা শরীর টরির কেমন আছে তোমার ?    

সাজেদালি হাসে। হেসে হেসেই শ্বাস নেয় মহা নগররের ধূলো ওড়া বাতাসে। নাক জ্বলে যায় ওর।  বুক ভরে ওঠে চারদিকের কুগন্ধে। ব্রীজের নিচে বসা বৃদ্ধ ভিখেরি মুন্নু হাওলাদার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চায়, ও মনা, বাড়িতি গেছিলি নাকি ? তা সবকিছু  ঠিকঠাক আছে ত বাপ ?     

সাজেদালি মাথা নাড়ে। যেনো মিহিন দুঃখে বইঠা পড়ে বুকের ডাইনে বাঁয়ে, কিছুই  ঠিকঠাক নাই গো  কাগা ! কেমন থাকপিনি কও দিনি ! দিনকে দিন আমাগের গাঙ যে সাগর  হয়ি যাতিছি । আমার মন  কতিছে গো কাগা, ঘরবাড়ি ভিটেমাটি যা আছে এবার আর থাকবি নানে কিছু। ভাসি যাবেনে পাগলা গাঙের ভাঙ্গনে।        

সাজেদালিকে দেখে ছুটে আসে সাফায়েত। উজ্জ্বল মুখ। শাপলাফুলের মত আলো ভাসছে ওর দুচোখে। দুটি পরোটা আরেকটু ভাজি বেশি দিয়ে চুপিচুপি জানতে চায়, কাগা, ও কাগা, নতুন গান বান্ধিছ তাই না ? আমারে শিখাবা ত কাগা ?   

সাজেদালির বুক থইথই করে ওঠে স্নেহে। শ্যামাকোলা ফুলের মত নরম অন্তর ছেলেটার।  সাজেদালির জন্যে কি যে মায়া ধরে রাখে সেই অন্তরে !  মনে মনে সে বলে, শিখামু রে বাজান। তোরেই শিখামু। কিন্তু তার আগি, সংসারের সাথে বান্ধা তোর নাড়িখান যে কাটি ফেলাতি হবিনে সোনা বাপধন আমার ! পারবিনি বাজান ! তুই কি তা পারবিনি ও সাফায়েত ? 

কি বোঝে সাফায়েত ! সাজেদালির হাঁটু জড়িয়ে বসে থাকে অনেকক্ষণ।  

এভাবে কিছুদিন নদীর মত ঝুরে ঝুরে বয়ে যায় ওর মন। কিন্তু আবার উথাল পাথাল করে ওঠে শরীর। টালুমালু করে মন। এ শহরের রোদ্দুর আর ধুলো ওড়া আগ্রাসন থেকে আবার পালিয়ে যেতে চায়।  অথচ পারে না। পারে না বলেই ঘাটে বাঁধা নৌকার মত ওর বুক দাপায়। মন দোলে। গ্রীষ্মদগ্ধ বিলের মত ওর প্রাণ খা খা করে ওঠে।   

অনেক অনেক রাতে, উকিলবাড়ির বিশাল দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে সিমেন্টে বাঁধানো একলা এক কৃষ্ণচূড়া গাছের বেদিতে বসে সাজেদালি তখন গলা খুলে গান গায়,  হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ পাখিটি ছাড়িল কে ----- 

সাফায়েত সেই গান শুনে উঠে বসে হোটেল ঘরের মেঝের বিছানায়। পুরোনো জানালার ওপাশে ভাঙ্গা আকাশ। সেখান থেকে দেখা যায়  কৃষ্ণচূড়া গাছের মাথা। তার  আড়ালে ভীরু চাঁদ এসে ডাক দেয়, সাফায়েত ও সাফায়েত, আয় বাপ। দেখ, নদী নামাচ্ছি এই যে এখানে, এই গলিতে বন্দি গাছের পায়ের কাছে। তুই কি সাঁতার দিবিনি বাপ ? পারবিনি ত ! তবে আয় । জানিস ত, নদী পেরুলেই সাগর, সাগর পেরুলে মহাসাগর। তার কত যে রঙ্গ ! কত যে ঢেউ ! থেকে থেকে  মাতম তুলে আছড়ে পড়ছে সমুন্দরের খোলা বুকে। দেখবি তুই ? তবে ছুটে চলে আয় জলের খোকা আমার !        

সাফায়েত ভাই ভাই রেস্তোরাঁর খোলা দরোজার পৈঠায় বসে আকাশে তাকায়।  সত্যি সত্যি আকাশগঙ্গা থেকে এক  নদী নেমে আসছে  চাঁদের আলো বেয়ে। সাফায়েতের চোখ দোলে, মন দোলে। সাফায়াতের প্রাণ কাঁপে । সাফায়েত ভেসে যায় জ্যোৎস্না নদীর হাতছানিতে। চাঁদ হাসে। দূরে বহু দূরে কি এক খুশিতে ঝনঝন করে ওঠে সাগরের জল । ঝলক ওঠে সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। প্যান্টের পকেট থেকে ছোট্ট বাঁশিটা বের করে কপালে ছোঁয়ায় সাফায়েত। তারপর ঠোঁট রাখে বাঁশির উদ্বেল খোলা অধরে। রাতের নির্জনতাকে আরও স্তব্ধ করে দিয়ে ঝুরে বেজে ওঠে সুর ।   

সাজেদালির মন আজ বড় উতলা। ঝড়ের সময় ঘাটে বাঁধা নৌকার মত উথাল পাথাল করছে দেহ মন প্রাণ। সাফিনার সাথে কথা বলতে হবে। খুব, খুব দরকার। আজ না হলে এ জীবনে আর কখনো দেখা হবে না। সে চলে যাচ্ছে উত্তরে। আরো উত্তরে। সেখানে জলের ঢল নেমেছে উৎসবের আনন্দে । বানের পানির সাথে বইছে শোঁ শোঁ   মারমুখী বাতাস । হঠাত ফণা তুলে ঢেউ নাচাচ্ছে বহতা পানির স্রোত । সেই ঢেউ আবার নেচে নেচে বয়ে যাচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলের জমি ভাসিয়ে কোন অজানাতে । সেই প্লাবিত উদীচীর বাহু ছুঁয়ে সাজেদালি ভেসে যাবে। নিজেকে ডুবিয়ে দিবে জল আর গানের সুরের মর্মতে। সাজেদালির তর সইছে না। দেহ ছেড়ে তার প্রাণপাখি বন্ধুয়া চলে  গেছে আরও আগে। জলের ছোঁয়ায় শিউরে কেঁপে উঠছে সে বন্ধুয়া। স্পর্শিত আনন্দে অনুক্ষণ ডেকে যাচ্ছে সাজেদালিকে।    

কিন্তু যাওয়ার আগে সাফিনার সাথে কাজটা সেরে নিতে হবে। খুব “আজ্জেন্ট” কাজ। এই ধূলো  ওড়া শহরে, চকচকে রঙ মাখা শহরে, ছুটে চলা অবিশ্বাস আর প্রতারণার শহরে সাফিনাকে জানিয়ে যাবে, তার গাতক এখনও জলের মত স্বচ্ছ এবং সৎ। কথা দিলে সে কথা রাখতে জানে। সাজেদালি সাফিনার দিকে তাকাবে না। সাফিনার আমলকি রঙ চোখের মণিতে যে সবুজ দ্বীপ রয়েছে তাতে সে আশ্রয় চায় না। সে শুধু দরকারের কাজটা সেরে চলে যাবে। সাজেদালি জানে  ঘরগেরস্তি সন্তান, নারীর দেহ আর দেহজ সুখ তুচ্ছ তার কাছে। এ সবকিছু ফেলে সে চলে যাবে গহন জলের অতল গভীরে। তার জীবনে জলই সত্য। তাই ত থেকে থেকে তাকে ডাক পাঠাচ্ছে সে মহা জলধিপতি !   

সেই ডাকে চঞ্চল হয়ে উঠেছে ওর  মন। ভেসে যাচ্ছে প্রাণ। জলজ সুরে ভিজে যাচ্ছে হৃদয়, শান্তি স্বস্তি আর সময় । মহা জলের প্লাবনেরও তর সইছে না। অবিরাম ডেকে যাচ্ছে, ওরে ও  জলপুত্র, দেরি কেন সখা ! আয় আয় ওরে ছুটে চলে আয় !                

সাজেদালি কেমন উড়াল উড়াল ! পাখি পাখি হয়ে ওঠে এ সময়। পরাণের ভেতর  কুঠরিতে পূর্ণস্থিত থাকে যে  মহাপ্রাণ,  যার নাম অন্তরাত্মা, তাতে সুর এসে ভর করে। খুসখুস করে  ওঠে ওর গলা । ইচ্ছে  করে জলের ঘরে বসে গলা ছেড়ে গান গায়,  নিধুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে--  

সাজেদালির চা পড়ে থাকে মগে। পরোটা শুকিয়ে কাগজ হয়ে যায়। সাজেদালি অন্যমনস্ক। বিবশ। বেভুল মনে অনুপম গার্মেন্টসের গেট  ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। সুরের ধৌত মায়ায় ভর দিয়ে খুঁজে ফেরে সাফিনাকে। সাফিনা নেই। মাথার ভেতর বেজে যায় নদী।  থরথর তাতা থৈ থৈ। মাঝে  মাঝে যেন সাফিনা সাফিনা সুরও ভেসে আসে । সাজেদালির বোধ গুলে যায়।  কে সাফিনা ! জল নাকি  স্থল। নাকি নিধুয়া  অতল  বিলাবল বোল ! কেবলই হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কেবলই আর্ত আহবানে তাকে পাগল করে তুলছে । কেবলই বুক খুলে অমলধবল সকরুণ সুরে কেঁদে যাচ্ছে  আয় আয়, ওরে চলে আয় আমার জলকুমার।  

অনুপম গার্মেন্টসের মেয়েরা গেট পেরিয়ে যেতে যেতে মুখ টিপে হাসে। কারও কারও আবার মায়াও লাগে। তারা জানে সাজেদালি গাতক। তার মাথার ভেতর সারাক্ষণ গান গায় কতগুলো  সুরেলা কোকিল আর মনের ভেতর উড়ে বেড়ায় ডাহুক পানকৌড়ির দল। এই মায়াবি নারীদের কেউ কেউ কাছে এসে নরম গলায় বলে, গাতক ভাইসাব, আপনি চলি যান ভাই। সাফিনাবু আজও গারমেনছে আসি নাই। গেল কালও আসি নাই। আর বলি পাঠাইছে, সে আসলিও আপনার সাথি  দেখা করবি নানে। আপনি ত সব বুঝেন ভাইসাব।    

সাজেদালি বোঝে। আবার বোঝেও না। মায়াবি নারীদের মাথায় নানা রঙের হিজাব।  তারা ঝাঁক  বেঁধে চলে  যাচ্ছে গেটের ভেতর অন্ধকার আবছায়ায়। কাঁচা সোনা সকালে সমুদ্রের জলে রোদ্দুরের ঝিকিমিকির  মত লাগে ওর কাছে। পায়ের ভর বদলে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায় । সুর খেলে যাচ্ছে ওর চোখে মুখে বুকে। ভূমিতে ঝরে পড়ার আগে এক খন্ড মন্দ্রিত মেঘের মত দুলতে থাকে জলপাগল গানপাগল সাজেদালি।           

আরও দুদিন পর হামিদ এসে ডাক দেয়, মিয়াভাই এদিকে একবার আসেন ত দেখি। আপনার সাথে কিছু জরুরী কথা আছে  !      

হামিদের গলায় উষ্মা। চোখে খর দৃষ্টি। কদিনের জমা রাগে মুখ কালো হয়ে আছে।  

আর ঠিক সেই মুহুর্তে সাজেদালির চমক ভাঙ্গে। হামিদ তার ফুপাত  ভাই। ছোটফুফু জরিনা আর তার স্বামী রাকিব ফুপা লঞ্চ ডুবিতে মারা গেলে তাদের একমাত্র ছেলে হামিদকে নিয়ে এসেছিল সাজেদালির বাবা মা। ওর প্রায় তিন বছরের ছোট হামিদ। জন্ম এতিম বলে এই ভাইটার উপর খুব টান ছিল সাজেদালির। উচ্চমাধ্যমিকের বোর্ড পরীক্ষায় দুই দুই বার ইংরেজিতে ফেল করে  লেখাপড়া ছেড়ে ঢাকা চলে এসেছিল চাকরির খোঁজে। চাকরীও পেয়ে যায়। প্রমোশন পেয়ে এখন কোনো এক ফ্যাক্টরির  যেনো সুপারভাইজার পদে কাজ করছে। দশ বছর আগে সাজেদালিকে  তালাক দিয়ে হামিদকে বিয়ে করেছে সাফিনা। খুব ভাল আছে দুজনে। শুকসারির মত একাত্ম। একই বৃন্তে দুটি ফুল। দুটি কুঁড়িও আছে। সাফিনা হামিদের দুই ছেলেমেয়ে।      

সাজেদালির হঠাত মনে পড়ে যায়, আচ্ছা সে তো হামিদকেও বলতে পারত তার “আজ্জেন্ট কথাডা” ! কি যে মন তার ! হাসি মুখে এগিয়ে আসে সাজেদালি, কিরে হামিদ কেমন আছিস তোরা ? সবাই ভালো আছিস ত ?      

হামিদ ভাবে বিশেষ করে সাফিনার কথা জানতে চাইছে সাজেদালি । তারা যে ভালো আছে সে তো সবাই জানে। রাগ রাগ গলায় সে বলে, কাজটা কি ভাল করতিছেন আপনি ? আপনার জন্যি সাফিনা কাজে আসতি পারতেছে না। ছেলেমেয়েদের ঘর আমাগের। কত খরচ। এখন চাকরি গেলি কি চাকরি জুটবে্নে ফের? কতবার কইছি একটা বিয়ে করে ফেলেন মিয়াভাই ! ঘর বান্ধেন। ঘরে ফেরেন। গান গায়ি কি জীবন চলে ! একবার ত দেখলেন।       

সাজেদালির বুকের ভেতর ঢেউ খেলে যায়। হু হু করে বান ডেকে ওঠে। উথাল পাথাল হয়ে নেমে  আসে পুরনো বানের পানি । দশ বছর আগের পানি ছইছই সেই ভাঙ্গন । ধান গেল, পুকুর উজালা  হয়ে মাছ ভেসে গেল, নদী ভেঙ্গে ডুবিয়ে দিলো ওদের বসতবাড়ি। কেবল দুই শতাংশ বাগান  পড়ে রইল  কিছু গাছপালা নিয়ে। সাফিনা বাঁচার জন্যে পালিয়ে এলো পাকা ইটের শহরে। তখনও সাথে ছিল সাজেদালি। সাফিনার প্রিয় গাতক ! ওরা  হামিদের সাহায্যে কাজ নিলো গার্মেন্টসে।  আধা আলো আধা অন্ধকারে মেশিনের ধাতব শব্দ আর কড়া শাসনের নিয়মকানুনে সাজেদালি মরে যাচ্ছিল । তার বুকের ভেতরের নদী কেঁদে ককিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল অভিমানে। সাজেদালি ফিরে যেতে চায় গ্রামে। সাফিনা চায় না। গার্মেন্টসের আবছায়া পরিবেশে সাফিনা বুঝতে পারে এটাই জীবন। এতদিনে সে জীবনের ঝুঁটি ধরতে পেরেছে। হামিদের পরামর্শে ভর্তি হয়ে যায় ওপেন ইউনিভার্সিটির ইশকুল শাখায়। তারপর কলেজ আর সাজেদালির জীবন থেকে সরে যাওয়া। এক চিলতে ঘর, আকাশহীন আশ্রয়ের এক মুঠো নিশ্চয়তায় সাফিনা সুখে আছে হামিদকে নিয়ে।                     

প্যান্টের গোপন জায়গা থেকে একটি টিস্যু প্যাকেট বের করে সাজেদালি। গুণে গুণে সাত  হাজার   টাকা  হামিদের হাতে তুলে দিয়ে হাসে, ধুর বলদ । মেয়েমানুষ বিয়ে করার মেলা ঝামেলা। নে   ধর, সাফিনারে দিস। ওর লাগানো গাছটা আর রাখা গেলো না। আমাগের বাড়ি আবার ভাঙ্গনে পড়িছে। কথা ছিল গাছ বিক্রির টাকার অর্ধেক পাবে সাফিনা। তাই দিয়ে গেলাম।       

সাজেদালি চলে যায়। সুরে ছেয়ে গেছে ওর মন। এই বৃষ্টি নামে তো, এই রোদ। শিউরে শিউরে কাঁপছে ওর শরীর। সুর জাগছে ঢেউ তুলে। মীড় ভাঙ্গছে অভিমানে। গমকে ধমক দিচ্ছে, ওরে দেরি কেন! আয়। আয় না পাগলা ! ছুটে চলে আয়।  

সাজেদালির আর্ত, বঞ্চিত শরীর মন ভেসে যাচ্ছে সুরের কামনায়। জড়িয়ে পড়ছে সুরের মায়া জলে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, যমুনা,  দুধকুমার নদ গাইছে, “কথা ছিল মনে মনে-----     

হামিদ সাত থেকে চার হাজার টাকা সরিয়ে রাখে। সাজেদালি মিয়াভাই একা মানুষ। চাইলেই সৎ থাকতে পারে। কিন্তু হামিদের বাঁচার স্বপ্ন সুতীব্র। তাছাড়া কথা দিলেই যে সব কথা সব সময় রাখতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই এই ভূ ভারতে। সংসারও এক গহীন সমুদ্র। বানের জলের মত টাকা লাগে নির্বাহ করতে। হামিদের কিছু বন্ধু বানভাসিদের গরু ছাগল, গাছ সস্তা দামে কিনে রাখছে। কুরবানীর ঈদ আসছে সামনে। সেই হাটে  চড়া দামে বিক্রি করে ফাটকা লাভ তুলে নেবে ওরা । হামিদও আছে এই ফাটকাবাজ বন্ধুদের সাথে।        

কে না জানে মেয়েমানুষ হচ্ছে বানের পানিতে ভেসে আসা পলিমাটির মত। বড় বাড়ন্ত, উর্বর । দশ বছরে হামিদের বিছানা বড় হয়েছে। দুই মুখ চার হয়েছে। নিজের গ্রামে বাড়ি করেছে। বাড়ির পাশে আম্রপালি গাছে আম ধরেছে। সেই আমের আঁটিতে আবার নতুন গাছ জন্মেছে। 

হামিদ এখন আর এতিম হামিদ নাই। সাফিনা তাকে ভরে দিয়েছে। এই ভরভরন্ত সংসার টিকিয়ে রাখতে তার এখন অনেক টাকা চাই ! 

বন্ধুদের টাকা পাঠাবে বলে হামিদ বিকাশ করার দোকান খুঁজতে থাকে।

    

                         ----------------     


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন