শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নন্দিনী পাল।। পারক গল্পপত্র



(১)

-অনেকদিন তো হইল এখনো একখান পোলাপান হইল না। আমার কি আর অ-ভাগ্য আছে যে পোলাপানের মুখ দেইখ্যা মরব, লাতিন লিয়ে খেলব। শুধু গন্ডে পিন্ডে গিলে গতরখান হইছে। আমার ছেলেডার মুখখান দিনদিন সুইখ্যা যাইছে।   

  এই হয়েছে রোজকার কথা। রাবেয়ার আর সহ্য হয় না। গা গতরে সংসারের জন্য কম করে না। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের হেন কাজ নেই সে করে না। কোন কাজেই শ্বাশুরি হাত লাগায় না। তবুও একটুও মন পায় না কারোর। উঠতে বসতে ঐ এক খোঁটা। যেন সন্তান না হওয়াতে ওর নিজের কোন দুঃখই নেই। সব দুঃখ ওদের। সামনের বারান্দাটা নিকিয়ে নোংরা জলটা ফেলতে বাগানের দিকটায় যায়। কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। ততক্ষনে বিষমিশ্রিত বাক্যবাণ ছুটে আসে তার দিকে। রংরূপতো তার কম ছিল না। নিকার আগে তাদের পাড়ার সব বৌঝিরা বলত                                                         

   –মিঞার ঘরে তোকে বেগম কইর‍্যা রাখবা দেখিস। পায়ের উপর পা তুইল্যা সংসারে পটের বিবি হইয়্যা থাকবি।                   

  প্রথম প্রথম সে পটের বিবি হইয়্যাই ছিল। মিঞা তাকে চোখের আড়াল হতে দিত না। যা চাইত সব এনে দিত। অন্য কোন মরদ ঘরে এলে সামনে আড়াল করে দাঁড়িয়ে পরত। রাবেয়া মুখে কাপড় দিয়ে সেখান থেকে দৌড়ে পালাত। তারপর মুখ টিপে হাসত। কোথাও গেলে সঙ্গে করে নিয়ে যেত, আগলে আগলে রাখত। শ্বাশুড়িও পান চিবোতে চিবোতে সুন্দরী ছেলের বৌ এর কথা বলে বেড়াত পাড়ায়। সে সব দিন যে কিভাবে বদলে গেল । দুবছর পরেও রাবেয়ার কোলে যখন সন্তান এলনা সেই মানুষগুলোই এখন তাকে দুচক্ষে দেখতে পারে না। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রাতে যখন বিছানায় যায় তখন মিঞা তার শরীরটা অসহ্য যন্ত্রণায় ভরিয়ে দেয়। সেখানে ভালবাসার ছিটেফোঁটাও থাকে না। সমস্ত ভাত কাপড়ের দাম আদায় করে যখন ক্ষান্ত হয় তখন রাবেয়ার নিজের শরীরটাকে আস্তাকুড়ে পরে থাকা পরিতক্ত ছিবড়ার মত মনে হয়। তবুও সকাল হলে আবার মন দিয়ে ঘরের কাজ করে। আল্লার উপর তার বিশ্বাস আছে। একদিন এই অন্ধকার কেটে যাবে । এই ঘর সুন্দর ফুটফুটে এক শিশুর আধোআধো শব্দে ভরে যাবে। ছোট ছোট পায়ে ঘরময় ঘুরে বেরাবে,রাবেয়ার কোল জোড়া সেই আলো সবার মুখে হাসি ফোটাবে। সে ফিরে পাবে তার অতীত গৌরব।                                                                                    

 -কি লো বেটি ,কানে কথা যায় না। বেটির দেমাগ দেখো। ঐ রূপের গরমে একেবারে মটমট করছে। আমাগো পোলাটার একেবারে হাড়মাস খিয়ে ফেলল। কুতদিন আমাগো বাসায় বইস্যা গিলবি রে বেটি। বাপের ঘরে গিয়া দেমাগ দিখাস।       এরপর রাবেয়া আর চুপ করে থাকতে পারে না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়                                                                       

 -আমি শুধু বইস্যা গিলছি। ক্যানে ঘরের কাম করি না। তুমি তো হাত পা লাড়ক না, বইসাই থাক।                                                                                                        

 -যত বড় মুখ লয় তত বড় কথা। আমি বইস্যা থাকি। হ্যাঁ রে বেটি আমি আমার ছেলের ঘরে বইস্যা আছি। তুই আগে প্যাটে ধর তারপর বইস্যা থাকিস। বলে রাবেয়াকে গালমন্দ করতে থাকে।                                                                          

- প্যাটে ধরব না ক্যানে। গতমাসে ডাক্তার বাবুর কাছে গেসলুম। ডাক্তারবাবু কি বললে শুন নাই, আমার কোন দোষ নাই। তোমার ছেলেকে ক্যানে বল না ডাক্তার বাবুকে দিখাতে।                                                                                                       

-এত্তবড় কথা তুই আমাকে বলতে পারলি,বেশরম মেইয়ে, মুখের লাগাম নাই এত্তটুকু।মিঞার নামে এইকথা ধম্মেও সইবেনি। আল্লাহ সব দিখতেছে।                                                                                                                       

 -হ্যাঁ আল্লাহ সবই দেখতেছে কে ঠিক কে বেঠিক। বলে রাবেয়া চলে যায় রান্নাঘরে। আনাজ কুটতে থাকে।                                                                                

     কিন্তু তার শাশুড়ি নিজের মনে গজরাতে থাকে।                                                                                                    

-হে আল্লাহ কুথা থেকে ঐ বাঁজ মেয়েখানাকে আমার ঘরে পাঠালে। আমার সংসারে সব কিছু নষ্ট হয়ে গেল।                                                                  

    বাঁজ শব্দটা রাবেয়ার কানে পৌঁছোয়। ঐ শব্দটা তার সমস্ত শরীরের রক্ত এনে জমাট বাঁধে তার মাথার ভেতর। যে স্বপ্ন সে দেখে তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় ঐ একটা শব্দের আঘাতে। যে আশার আলো তার মনে এখনো বিদ্যমান ঐ একটা শব্দ সেটাকে নিভিয়ে দেয় এক মুহুর্তে। এত অপমান লাঞ্ছনা সহ্য করে সে যে মাটি আঁকড়ে পরে আছে ওই একটা আশায় যে সে একদিন ঠিক মা হবে, সেই মাটি যেন তার পায়ের তলা থেকে সরে যায়। রাবেয়া আর নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। বঁটিটা হাতে তুলে ছুটে আসে শাশুড়ির দিকে।                                                                                                    

 -খবরদার ওই কথাটা বলবেনি। তাহলে কিন্তু ভাল হবে নি।                                                                                      

   রাবেয়ার রূদ্রমূর্তি শাশুড়ির মনে ভয়ের সঞ্চার করে। খোলা বঁটির দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।

– আমাকে মেরে ফেইল্লো,ওরে ও সাদেক দেখে যা তোর বউ আমাগো কাইট্যা ফেলবে।                                                                       

ততক্ষনে রাবেয়ার হুশ ফিরে এসেছে। সে বঁটিটা মাটিতে রাখতেই যাবে আর ঠিক তখনই সাদেক মিঞা ঘরে এসে পড়ে। মায়ের ক্রন্দনের আওয়াজ সাদেকের পৌরুষকে পুরো মাত্রায় জাগিয়ে দেয়। সে রাবেয়াকে কোন কথা বলারই সুযোগ দেয় না। রাবেয়ার গালে একটা চড় কষায়। তারপর তিনটে শব্দ তালাক তালাক তালাক......।                                                                                                   

চড়ের তীব্রতা সে বুঝে ওঠার আগেই ওই তিনটে শব্দ তার পায়ের নীচ থেকে জমিনকে এক লহমায় সরিয়ে দেয়। নিজের কানকে সে বিশ্বাস করতে পারে না। একটা জমাট কালো অন্ধকার বিষধর সাপের মত তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরছে। তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। দুবছরের বিবাহিত জীবনের সুখের দিনগুলোকে তার মিথ্যে মনে হয়। 

 

(২)  সাদেক মিঞা রেল লাইনের ধার দিয়ে হেঁটে চলেছে। রেললাইনের ধারে পুকুর পাড়ে দু-চার ঘর বসতি। রাবেয়াকে তালাক দেওয়ার পর সে আবার নিকা করেছে। সেদিনের বিকেলে ঘর ছেড়ে রাবেয়া চলে যায় । কোথায় গেল সে খোঁজ খবরের প্রয়োজন বোধ করে নি। লোকমুখে শুনেছিল বাপের ঘরেও তার স্থান জোটে নি।  তার বাপ ভাইয়েরা ওই বাঁজ মেয়েকে ঘরে স্থান দেয় নি। কিন্তু তার বন্ধু রহমতের চিঠিটা পেয়ে ইস্তক তার ঘুম উড়ে গেছে।চিঠিটা পেয়ে সে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলেছে।আজ সেই কারণটা যাচাই করতেই রেল ধারের এই নিষিদ্ধ পল্লীতে তার আগমন।এই দিনের আলোতে এটাকে নিষিদ্ধ এলাকা বলে মনে হয় না।খুব সাধারন নিত্ত নৈমিত্তিক কাজে ব্যস্ত সব মানুষ।বাড়ির বউ ঝিদের মত সবাই ঘরের কাজে ব্যস্ত।রাস্তার একদম শেষপ্রান্তের ঝুপরিটা বেশ সাজানো গোছানো।একটা মাধবীলতা বেশ যত্নে ছেয়ে আছে টালির চালা।তার গোছা গোছা গোলাপী ফুল ভাঙাচোরা ঘরটার একটা শ্রী এনেছে।সাদেকের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।দরমার ছোট গেটটা ঠেলে সে ঢুকে পড়ে।গৃহকর্তী তখন স্নান সেরে কাপড় শুকোতে দিচ্ছে।লম্বা চুলের ডগা থেকে ঝরে পড়া জল,ভিজে ভ্রু পল্লব সাদেকের চোখে জ্বালা ধরায়।   

 -নষ্টা মাইয়্যা,নষ্টামি করনের লগে এখেনে উঠেছিস। 

রাবেয়ার ঠোঁটের কোণায় ফুটে ওঠা বিদ্রুপের হাসিটা সাদেকের বুকটাকে চীরে বেরিয়ে যায়। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। -রোজ রোজ ফূর্তি করনের লগে এখানে এসেছিস। তোর জন্য তো আজ আমার বন্ধু বান্ধবের সামনে মুখ দেখনের জো নাই।

রাবেয়া হাসিতে ফেটে পড়ে, কিন্তু পরমূহুর্তে ঘা খাওয়া সাপের মত ফোঁস করে ওঠে। 

-তোমার তাতে কি। তালাকের পর এখানে আইসছ জুলুম করনের লগে। আমি কি কমু তা তোমার লগে জিজ্ঞেস করে কমু। কোথা ছিল তোমার বন্ধুর দল যখন আমি একমুঠো ভাতের লগে দোরে  দোরে ঘুরেছি।

যখন রাবেয়ার বাপের ঘরেও স্থান হয় না তখন তার সাথে পরিচয় হয় রতনের। রতনের এই পাড়ায় যাতায়াত আছে। কাজ দেবার আছিলায় রাবেয়াকে নিয়ে এসেছিল এখানে। তারপর নিজের ঘরে এনে তোলে। রতন ছাড়া আর কোন  পুরুষকে কাছে ঘেঁসতে দেয়নি সে। এ পাড়ায় সবাই জানে রতনের রক্ষিতা রাবেয়াকে। রাবেয়া দিনরাত পরিশ্রম করে সেলাই মেশিন চালিয়ে রোজগার করে, স্বপ্ন দেখে রতনের সাথে নতুন ঘর বাঁধার।                                                                                              

   -তার পর তোর পিরিতির নাগর গেল কোথায়। সে জানে তোর নিকার কথা, কেন তোরে ঘর থেকে তাড়াই দিলুম তাও জানে নিশ্চয়। 

সাদেকের তীব্র শ্লেষ গিয়ে বেঁধে রাবেয়াকে। সে বাঘিনীর মত ছুটে আসে সাদেকের দিকে। 

-দু বচ্ছর তো নিকা করেছো তা তোমার নতুন বিবি তোমায় কটা পোলা দিলা। তারপর নিজের পেটের উপর হাত রেখে এখানে আমার আর রতনের ছেলে আছে। পৃথিবীশুদ্ধ লোক জানবে বাঁজ আমি নই, তুমি ছিলা। 

রাবেয়ার কথাতে সাদেকের মাথার ঠিক থাকে না। তীব্র আক্রোশে সে রাবেয়াকে ধাক্কা মারে।  টাল সামলাতে না পেরে সে পড়ে যায়। ধাক্কার তীব্রতা এত বেশী ছিল যে মাথা ফেটে যায় রাবেয়ার।

তিনদিন পর রাবেয়ার পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট যখন মেলে সবাই জানতে পারে সে সন্তানসম্ভবা ছিল। খুন বলে পুলিশ তার বাপের ঘর, শ্বশুর ঘর সবজায়গায় যায় খুনির হদিশ করতে। সকলে আজ জানতে পারে রাবেয়া বাঁজ ছিল না। রাবেয়ার মা হওয়ার সাধ পূরণ হল না ঠিকই, কিন্তু মরে গিয়ে সে তার অপমানের শোধ নিয়েছে।   


    


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন