বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

শ্রীকান্ত অধিকারী।। পারক গল্পপত্র



হোলি কথার মানেটাই আজ পালটে গেছে । ছেলে-মেয়েদের কাছে হোলি মানে উৎসব। বসন্তের উৎসব। আগেও ছিল।তখন ওনারা এই দিনে খোল করতাল নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় রাধা-কৃষ্ণের নামগান করে রঙ মাখাতেন।  দরজায় এলে বাড়ির মহিলারা বেরিয়ে আসতেন। তারপর বাতাসা হোক বা হাতে গড়া লাড়ু দিয়ে জল দিতেন। বাতাসা ছড়িয়ে হরির লুঠও হত।তারপর আলতো করে যে যার গালে কপালে কিংবা পায়ে আবির দিয়ে হোলি মানাত। এটা অবশ্য শাশুড়িদের আমলের কথা। পরে পরে দিন পাল্টালো। বাড়ির পুরুষের সঙ্গে মহিলারাও বেরিয়ে দোল মাতিয়ে তুলল। এখন আরও নতুন ভাবে, নতুন সাজে। বেশ গুছিয়ে দোল উৎসব করে । রঙ খেলে। তবে একটা সিস্টেমে হয়। বড় ভালো লাগে।  

ছেলে বউ সকালে চলে গেছে উৎসব মাঠে। ওখানে বৌমার অনুষ্ঠান ।  নাতিটা বেরোবে একটু পড়ে। বন্ধুরা ডাকতে আসবে । ঘর গুছাতে গুছাতে এই কথাগুলোই ভাবছিল নীলিমা। আজ অনেক দিন হল উনি চলে গেছেন। অনেক বসন্তের রঙ ফিকে হয়ে গেছে।যে তৃণদল আবিরে লাল হয়ে উঠেছিল একদিন আজ তা ধূসর।যে বাতাস দোলের সৌরভ গায়ে মেখে এক সকালে দক্ষিণে বয়েছিল আনন্দ হিল্লোলে হয়তো এখন তাকে খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। তবু এই দিনে উনি এক মুঠো আবির নিয়ে মনের ফরাশে এসে আকাশে মুঠো খুলে বসে পড়েন । ছড়িয়ে দেন আবির। মাখিয়ে দেন রঙ।

 --বাই সাইকেলের পেছনে বসিয়ে উনি টেনে নিয়ে যেতেন শিবমন্দিরে। তখন অবশ্য পাড়ার শিবতলায় সব্বাই এসে জমা হত। তবে শুধু পুরুষেরা। মহিলারা তখনও ঘর থেকে বেরোতে সাহস করতেন না। সেই প্রথম ওই পুরুষদের মাঝে গিয়েছিল। মানে মদনমোহন বাবুই ওনার স্ত্রীকে নিয়ে গেছিলেন। --তুমিইবা ঘরে একা একা থাকবে কেন?আর তাছাড়া রঙ মাখা ভালো।মনে হৃদয়ে রস সেচন হয়। বছরে একবারই তো। 

সেই যে যাওয়া শুরু হলো , আর বন্ধ হয় নি। তারপর আসতে আসতে পাড়ার অনেকেই যোগ দিতে লাগলে দোল সে দোলই হয়। মনে রাখার মত। কেউ গান গাইত, কেউ মৃদঙ্গ বাজাত, তো কেউ করতাল। শেষ পাতে খাওয়ানো হত খিঁচুড়ি। নীলিমা আপন মনেই হেসে ওঠে। 

সুমিতের বন্ধুরা এসে গেছে। সুমিত ঠাম্মার কাছে বলতে এসেছিল, যে সে এবার যাবে। কিন্ত্ত এসে দেখে ঠাম্মা আপন মনে হাসে। --কী হল ঠাম্মা হাসছ যে?  

--ও কিছু না তুই আয়।কোথায় থাকবি? 

--সাতরঙার মাঠে। বলতে বলতে কয়েক লাফে রাস্তায়। 

নীলিমার তখনও মন থেকে ঘটনাটা যায় নি। যাওয়ার কথাও নয়। সেবার তো গিয়ে পড়ল পুরুষদের মাঝে। কিন্ত্ত রঙ মাখাবে কে? কোন পুরুষ মদনমোহন বাবুর বউয়ের অঙ্গ স্পর্শ করবে। সবার ইচ্ছে হয় ওই মাখন-নরম গালে একটু আবির ঘষে দিই। কিন্ত্ত সাহসে কুলায় না। নীলিমার তখন মুখ টিপে টিপে হাসি। শেষে উনিই ঠিক করে দিলেন তোদের কাউকে রঙ মাখাতে হবে না , নীলুই  তোদের গালে আবির ঘষে দেবে। সে যাত্রা না হয় সবার আড় ভাঙল। কিন্ত্ত মুস্কিল হল, বাড়িতে ফিরে। রাতে। বাবুর গোসা হল। কেন কী? – নীলিমা নাকি ও পাড়ার গিরিধারীবাবুকে একবার দুবার নয় তিনবার গালে রঙ মাখিয়েছে। মদনবাবুর কথায় –কী দরকার ছিল তিনবার রঙ মাখানোর! উনি যত রাগ করেন তত নিলিমাও সেই রাতে নবপ্রেয়সীর মত খিল খিল করে হেসে ওঠে। তখন সে ড্রেসিং আয়নার সামনে কানের পাশের বেয়াদপ রঙগুলো গোরুরদুধ  দিয়ে ঘষে ঘষে তুলছিল। হঠাৎ লক্ষ করে ডান গালের একপাশে বিন্দুর মত গর্তটা আজ আরও ওকে সুন্দর করে তুলছে। গালে হালকা লালিমার প্রলেপ। সে তুলো দিয়ে গালের রঙ তোলা বন্ধ করে খাটে যে রাগ করে বসে আছে তাকে সজোরে জাপটে ধরে ওর লোমশ বুকে মুখ দলতে থাকে। দলতে দলতে এক সময় শুধু মুখ নয়, ঘার নয় পিঠ নয় সারা শরীর সোহাগের আবিরে রাঙা হয়ে উঠে। --নীলিমা আবার হেসে উঠে।    

কলিং বেল বেজে উঠল। নীলিমা দরজা খুলে দিলে হাসতে হাসতে ছেলে-বৌমা ঘরে ঢুকেই  দুজনে একসঙ্গে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। শাওয়ার থেকে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ে ।ওরা তখন রঙ তুলতে ব্যস্ত ।

নীলিমা ওদের খাবার রেডি করে। কেননা একটু পরে ওরা আবার বেরোবে। আজ ছুটির দিন শহরে নানান অনুষ্ঠান।সকালেই বৌমা জানিয়ে দিয়েছে।

বৌমা বাথরুম থেকে বেরিয়ে গজগজ করে , এখনও সুমিত বাড়ি ফিরলো না কেন?  

ছেলেরও সেই এক কথা। সঙ্গে জুড়ে দেয় , --মডার্ন ছেলেদের এই এক বদ অভ্যাস। টাইম মেনটেন করতে দম ছুটে যায়। লিভিঙ ট্রাকে কোনও আগল নেই।   

বৌমা খিচখিচ করে, আমাকে এখুনি আবার বেরতো হবে। ও তো জানে ব্যাপারটা । 

টেবিলে খাবার দিয়ে নীলিমা বলে ,তোমরা খাও। আমি দেখছি। আমায় বলে গেছে ও কোথায় থাকবে ।  

কিছুক্ষণেই নাতি ঠাকুমা ফিরে আসে। ওরা তখনও খাবার টেবিলে। নিজেদের মধ্যে গল্পে ব্যস্ত। কিন্ত্ত ওদের দিকে চোখ পড়া মাত্রই বৌমা চমকে ওঠে। ছেলের মুখের ভাত মুখে। 

--আমাকেও রঙ মাখিয়ে দিল। নির্বিকার নীলিমার সারা শরীরে তখন নানা রঙের ঝিকিমিকি।

ছেলে চিৎকার করে বলে, -- তোমায় রঙ কে মাখালো। 

বৌমা ফেটে পড়ল—আপনি না বিধবা। জানেন না, বিধবাদের রঙ মাখতে নেই। 

--কী করব বল?রাস্তায় এখনও ছেলেমেয়েরা আনন্দ করছে যে।নীলিমার অমায়িক উত্তর।

--কী করব মানে? আপনি বাধা দিলেন না। 

-না না। ঠাম্মার দোষ নেই। ওই লালিটাই জোর করে মাখিয়ে দিল।সুমিত মাকে বুঝায়। ঠাকুমা নিষেধ করে ছিল। ও শুনলো না।  বলল , বিধবা বলে কি রঙ মাখতে নেই। একটা মানুষের চলে যাওয়াতে আরেক মানুষের মনের রঙ কি এমনি এমনি ধুয়ে মুছে যায়?গাছের পাতা শুকনো হলে পাতা ধূসর দেখতে লাগে। সে ত আমাদের ভুল। ভেতরের সবুজ রঙটা তো আমরাই দেখতে পাই না। আমাদের চেতনার অভাবে।

--তোর পাকামি থামাবি। বৌমা জোর ধমকে দেয়। 

-- কে লালি? ছেলে ভাতের থালা ফেলে ওঠে। আমায় বলতো ওর বাড়িটা কোনখানটায়?ওর মা বাবার কাছে এক্ষুনি যাব। 

--হ্যাঁ তাই চল , এত বড় অন্যায়টা করে কী করে।বউমা ছটফট করে।

ওরা দুজনে যখন হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বে্রোতে যাবে নীলিমা ওদেরকে আটকে দেয়। 

--আচ্ছা ঠিক আছে ; ও ছেলেমানুষ। আমাদের সমাজের গভীর সংস্কারের কথা ওদের বোঝার কথা না। আমি না হয় সাবান শ্যাম্ফু দিয়ে ভালো করে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে নিচ্ছি। 

--ও-! সরষের মধ্যেই ভূত! আপনিই তার মানে শখ করে রঙ মেখেছেন। -ছিঃ আপনার লজ্জা করা উচিৎ। অন্তত ওই মৃত মানুষটার কথা ভেবে। 

--এই বুড়ো বয়সে তোমাকেও বলিহারি ।  আমার আর কিছু বলার নাই। ছেলে বৌমা নিজের ঘরে ঢুকে যায়।   

নীলিমা নিজের রুমে গিয়ে ধীরে ধীরে নানা রঙে রঙীন সাদা কাপড়টা ছেড়ে রাখে। তারপর ব্লাউজ । সায়া। সব ছাপ ছাপ লাল সবুজ মেরুন হলুদ গোলাপি । সে অতি যত্নে কাপড় চোপড় পিট করে গুছিয়ে রাখে নিজের  সুটকেসে । তারপর ছোট্ট আয়নায় নিজের রঙীন মুখমন্ডল ঘার গলা বুক সব ঘুরে ফিরে দেখতে লাগে। এমন কি বিচিত্র রঙের ফুলে ফুলেল বুকের ঝুলন্ত উপত্যকার দিকে চেয়ে বহুদিন পর অভিভূত হয়ে পড়ে। উপত্যকায় বয়সের ধ্বস নামলেও সেই সব দিনের মত এখনও বাহারি ফুল এখনও ফোটে। ওনাদের সেই আগুনে পোড়া দিনগুলো দগ দগে ঘায়ের মত সারা শরীর হৃদয়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। ওর সঙ্গে প্রথম আবির খেলেছিল, সে আর কত বছর হবে, ছেলেটার বয়স যদি আটত্রিশ হয় । তবে !নীলিমা নিজেকে আর বেঁধে রাখতে পারে না।  মদনমোহন বাবুর ছবির সামনে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। -তুমিই তো বলতে আমি চলে গেলেও বিধবা সাজবে না। ভিতরের রঙ না থাকলে  মানুষ তো মৃত। বলনি বলো? 

নীলিমা নিজেকে যখন দুমড়ে মুচড়ে নিঙড়ে কৈফিয়ত তলব করার জন্য প্রস্তত করছে ঠিক তখন বাইক স্টার্ট দেওয়ার আওয়াজ পেয়ে নীলিমা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে। পরনে পুরোনো কোনও এক রঙীন শাড়ি। গায়ে রঙবেরঙের রঙ। দেখে ছেলে স্টার্ট দিয়ে বাইকে বসে। বউমা ছেলের কোমর ধরে সবে উঠতে যাবে । 

তখনি নীলিমা কথাটা না বলে পারল না।-–শোন খোকা নিয়মের কথা যখন তুললি, তাহলে  বলি, সেই নিয়মেই, যেহেতু তোদের বয়সের ফারাক আট বছর,  তাই এ পৃথিবী ছেড়ে আগে তোরই যাওয়ার কথা। তখন কিন্ত্ত বৌমা বিধবা । যদি সংসারের এই নিয়ম না খাটে তবে তো কথাই নেই । অন্যথায় কিন্ত্ত আমার মত পু্নরাবৃত্তি হতে পারে।পারিস তো এ নিয়ম ভেঙে দে। তোরা নিজের মত করে বাঁচ। গাছের পাতা যতই ধূসর হয়ে যাক তবু তাতে যেন সেই ধূসর রঙটাই থাকে। ধূসর রঙটাও কিন্ত্ত রঙ। --একটানে কথাগুলো বলে নীলিমা হাঁফিয়ে ওঠে। হয়তো খানিক উত্তেজিত হয়ে পড়ে । 

ছেলেবউ চলে গেলেও নীলিমা অনেকক্ষণ বার দরজায় দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বসন্তের বাসন্তী  আকাশের দিকে চেয়ে থাকে । যেন দেখতে পেয়েছে ওর আপনার সেই রঙীন মানুষটাকে।--উনি হাসছেন আর সারা আকাশ জুড়ে সাতরঙা আবির ছড়িয়ে বলছেন-- কই আকাশের রঙ তো কখনও মুছে যায় না।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন