সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

শৌভিক রায়।। পারক গল্পপত্র



কাঁচের মধ্যে দিয়ে সামনের করিডোরে লোকটাকে দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল সুমন্তর। লোকটা আজও এসেছে! হেন সপ্তাহ যায় না যে লোকটা আসে না। বয়সের ভারে ঠিকঠাক হাঁটতে পর্যন্ত পারে না, কিন্তু তবু আসা চাই। আজ আবার কী শোনাতে এসেছে কে জানে! এমনিতে অন্য সময় লোক দেখার ফুরসত মেলে না। কিন্তু এই লোকটা এলে তারও চোখ চলে যায় কেন কে জানে!  দিনদিন এই চলছে। এসব ঝামেলা মেনে নেওয়া যেত, যদি কাজের চাপটা কম থাকত। কিন্তু সেটা হবার না। উল্টে দিনদিন সেটা বেড়েই চলেছে। নেহাত সেসময় ব্যাঙ্ক তার পাশে সবরকমভাবে দাঁড়িয়েছিল, তা না হলে কবে এই চাকরি ছেড়ে দিত সে! 


বাড়িতেও কম ঝামেলা নাকি! সহজ সরল একটা ব্যাপারকে কিভাবে জটিল করা যায়, সেটা মৌমিতার কাছে শিখতে হয়। আরে বাবা দশ বছর কেটে গেছে, এখন আর ওত ভয় নেই। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে সে কথা! কয়েক দিন ধরে এক ফাটা রেকর্ড চলছে, 

- তোমার লজ্জা করল না বাইরে খেতে?

- আরে বললাম তো টার্গেট এখনও পুরো হয়নি। তাই ক্লায়েন্টের সঙ্গে নিজে বসেছিলাম।

- বসলেই খেতে হবে?

- আহা বোঝোই তো।

- বুঝব আর কি? এরকম চললে আর দেখতে হবে না।

- আরে বহু বছর হয়ে গেছে।

- তুমি কী বুঝবে আর! যা সব দেখেছি নিজের চোখে...

- প্লিজ মৌ...

- কিসের প্লিজ? বোঝো আমার অবস্থাটা? 

- আরে একদিন বাইরে খাওয়ার সঙ্গে তোমার অবস্থার কী সম্পর্ক?

- আছে সম্পর্ক। ইনফেকশন হলে? তার ওপর ওই চাপ নিচ্ছ! 

- আহা...ম্যানেজার তো আসলে। বুঝছ না কেন!

- এরপর কিছু হলে কে দেখবে!

- আরে কিচ্ছু হবে না।

- তুমি বললেই হল? 


সুমন্ত আর কথা বাড়ায় নি। ব্যাঙ্কে এসে নিজের কিউবিকলে ঢুকে এ সি টা চালিয়ে ঘরটাকে বেশ ঠান্ডা করে বসতে না বসতেই কাঁচের ওপারে লোকটার চেহারা। সুমন্তর আর কিচ্ছু ভালো লাগে না। 


কয়েকটা চেকে সই করতে করতে সুমন্ত আড়চোখে তাকালো। নাহ্...লোকটা তার এখানে ঢুকছে না। টুকটুক করে এগিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে ওই বৃদ্ধাটি তো লোকটার স্ত্রী। আজ একদম দুজনেই হাজির দেখছি। কি ব্যাপারটা কি? বিশেষ প্রযোজন নাকি? তুত...এত ভাবছে কেন সে? কী হবে এত ভেবে? 


আসলে লোকটা এই অঞ্চলে খুব পরিচিত। লোকটাকে চেনে না, এরকম লোকের সংখ্যা এখানে কম। দীর্ঘদিন এই অঞ্চলের একটি মাত্র স্কুলের হেডমাস্টার ছিল লোকটা আর সেই দৌলতে বাপ, মা, ছেলে মায় নাতিও বোধহয় লোকটার ছাত্র। তার এই ব্রাঞ্চেই তিনজন আছে যারা লোকটার কাছে পড়েছে। কম বয়সের বেশ কয়েকজন আছে যাদের কেউ না কেউ লোকটার ছাত্র বা ছাত্রী। আর এরা সব লোকটাকে সম্মানও করে বটে! অবাক হয় সুমন্ত। একবার লোকটার একটা চেক আটকে বুঝেছিল কাজটা ঠিক হয় নি। ব্যাংকের অন্যান্য কাস্টমার তো বটেই, তার নিজের স্টাফরাও তার বিরুদ্ধে চলে গেছিল প্রায়। লোকটা কিন্তু কিচ্ছু বলে নি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে খুব মৃদু সুরে জিজ্ঞাসা করেছিল, 'আমার তবে কী করণীয় একটু বলে দেবেন ম্যানজারবাবু।` কিছু বলতে অবশ্য হয় নি সুমন্তকে। বেগতিক বুঝে চুপচাপ সই করে দিয়েছিল সে। আসলে সুমন্তর ইচ্ছে ছিল এই চেকের চক্করে লোকটা যদি এ টি এম থেকে টাকা তোলে তবে অন্তত ব্যাংকের ভেতর লোকটাকে আর দেখতে হবে না। 


দেখতে দেখতে বছর সাতেক কেটে গেল এই ব্রাঞ্চে।  দু'দুবার তাকে বদলির অর্ডার আটকাতে হয়েছে মৌমিতার জন্য। কিছুতেই মৌমিতা এই জায়গা ছেড়ে যেতে চায় না। বোধহয় বারবার জায়গা বদল তার আর ভালো লাগে না। নিঃসন্তান সুমন্তর অফিস নিয়ে কেটে গেলেও মৌমিতা যে কিভাবে সময় কাটায় সেটা ভেবে পায় না সুমন্ত।  অবশ্য মৌমিতা আজকাল কিসব লেখালিখি করে নিজের মতো। এখানকার দু'চারটে পত্রিকায় লেখাগুলি ছাপাও হয়। মৌমিতার দৌলতে সেসব পত্রিকা আয়োজিত সাহিত্য বাসরে তাকে দু'একবার যেতেও হয়েছে। গিয়ে দেখেছে যে, লোকটা সেখানেও উপস্থিত। বেশ পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে একেবারে মধ্যমণি হয়ে বসে আছে। মৌমিতাও লোকটাকে দেখে 'স্যার` 'স্যার` করে বেশ গদগদ হয়ে যায়। সুমন্তর মাথায় আগুন জ্বলে। তাকে দেখলে লোকটা আবার 'আসুন ম্যানেজারসাহেব` বলে এমন নিষ্পাপ হাসি দেয় যে কে বলবে এই লোকটা ব্যাংকে তাকে এত জ্বালায়! কিন্তু সত্যি কি জ্বালায়? আসলে যে কোনো ছুঁতোয় লোকটার তার ঘরে ঢুকে পড়াটা একেবারেই না পসন্দ সুমন্তর। সেও একটা ম্যানেজার। তারও একটা ইয়ে আছে। 


মৌমিতাকে সে একবার বলেছিল,

- ওই লোকটা বুঝলে...ভাল লাগে না। 

- কোন লোকটা?

- আরে ওই যে মাস্টারমশাই!

- হেডস্যার? কেন? ওনাকে তোমার ভালো লাগে না কেন? উনি তোমার  কী করেছেন?

- কী আবার করবেন? কিছুই করেন নি। জাস্ট ভাল লাগে না। 

- সেটা আবার কী?

- আরে সবকিছুতেই পরামর্শ চান!

- সেটা মন্দ কি?

- টাকা কোথায় রাখবেন, রামকৃষ্ণ মিশনকে ডোনেশন দেওয়া ঠিক হবে কিনা...আমি কি ওনার ইয়ে নাকি?

- তা তুমি কী কর?

- আগে দু'একবার বলেছি। এখন বিরক্ত লাগে। কাজের সময় এসব কী ধরণের কথা। লোকটার কোনো সেন্স নেই।

মৌমিতা খানিকক্ষণ তার দিকে একদৃষ্টে চুপ করে তাকিয়েছিল। কোনো উত্তর দেয় নি। কেন যেন মাঝেমাঝে সুমন্তর সন্দেহ হয় যে, লোকটার সঙ্গে মৌমিতার বেশ ভাল যোগাযোগ আছে!


তবে আজকাল লোকটার পরিচিতি কমছে। এটাই শান্তি। তার স্টাফেরাও আর আগের মতো লোকটাকে ওত খাতির করে না। সুমন্ত বোঝে সেটা। লোকটা এবার কোনঠাসা হচ্ছে ধীরে ধীরে। যে কদিন বাঁচবে যেন এরকম কোনঠাসা হয়েই থাক। সেই প্রথমদিকের ঘটনার পর লোকটাকে মাঝে সমীহ করলেও এখন আর সে সেসবের ধার ধারে না। কিন্তু অবুঝ লোকটা দুদিন পরপর আসবেই, আর আসা মানেই সুমন্তর মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যাওয়া। সুমন্ত নিজেও বোঝে না কেন তার মেজাজ এরকম হয়ে যায়। লোকটা সে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছে লোকটা কোনোদিন তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে নি, অসম্মান করে নি। সে নিজে নির্ঘাত লোকটার ছেলের বয়েসী হবে। লোকটা তাকে কোনোদিন 'তুমি` সম্বোধন করে নি। সে যে একটা ম্যানেজার আর তার চেয়ারটার দাম আছে সেটা লোকটা খুব ভাল বোঝে। এমনিতেও খুব নিচু স্বরে সুন্দর বাংলায় লোকটা কথা বলে। সত্যি বলতে লোকটা কিছুই করে নি তার। কিন্তু তাও কেন জানি লোকটাকে একেবারেই পছন্দ হয় না সুমন্তর।  


আচমকাই কিউবিকলের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে সুমন্ত চমকে তাকায়। কাঁচের দরজার ওপাশে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে। পাশে বৃদ্ধা স্ত্রী। উফ্, ভেবেছিল আজ বোধহয় লোকটা আর তার চেম্বারে আসবে না। কিন্তু কি বিপদ। লোকটা হাজির হয়েছে এখানে। কি করবে আর সুমন্ত! সকাল থেকে বিগড়ে থাকা মেজাজটা এবার সত্যিই খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই আজ তার ফ্লাইট। কাজকর্ম বুঝিয়ে দিচ্ছে সে আসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার স্বরূপকে। তাই খানিকটা খেকিয়েই উঠল সুমন্ত,

- আজ আসবেন না তো। ব্যস্ত আছি। কেন যে প্রায় প্রতিদিন আসেন অযথাই। যান যান আজ কিছু করতে পারব না। 

লোকটার মুখটা একটু কালো হয়ে গেল সুমন্তর কথা শুনে। কিন্তু কিছু না বলে স্ত্রী-কে নিয়ে পেছন ফিরলেন। করিডোর ধরে ধীর পায়ে এগোনোর সময় অবশ্য কাঁচের ওপাশ দিয়ে সুমন্তর দিকে তাকিয়ে রইলেন দুজনেই খানিকক্ষণ। সুমন্তও বেরিয়ে পড়ল। মৌমিতাকে পিক আপ করে সোজা এয়ারপোর্ট। সেখান থেকে চেন্নাই। বছরে দু'বার বাঁধাধরা রুটিন। দশ বছর হতে চলল। সেই সময়ের কথা ভাবলেই কেমন যেন লাগে। দুম করে শরীর খারাপ হল একদিন, আর ধরা পড়ল যে, তার কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। তারপর তো টানাটানি শুরু হল যমে মানুষে। এক-দেড়মাসের মধ্যেই তার একদম কাহিল দশা। চেন্নাইতে ডায়ালিসিস শুরু হল। কিন্তু ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য ডোনার পাওয়া যাচ্ছিল না। পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল মৌমিতা। তামিলনাডুর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছেও দরবার করেছিল নিজের কিডনি দিতে চেয়ে। অনুমতি মিললেও কিডনি মেলেনি।  সে সময় তার অফিস ভীষণভাবে দাঁড়িয়েছিল তার পাশে। মৌমিতা, অফিসের লোকজন সবাই জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছিল। সুমন্ত নিজে তখন হসপিটালের বেডে। প্রায় মাস ছয়েক টানাটানি শেষ হয়েছিল আচমকাই। হঠাৎ একদিন সে জানতে পারে যে পরদিন তার ট্রান্সপ্লান্ট হবে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও অপারেশনের আগে বা পরে আজও জানতে পারেনি কে দিল তাকে নিজের কিডনিটা। হসপিটাল এই ব্যাপারে মুখে একদম কুলুপ এটেছে। 


এবার ডঃ ভেলমুরুগানকে ধরে বসল সুমন্ত। কিডনিটা কে দিয়েছিল তাকে জানতেই হবে। নাছোড়বান্দা সুমন্তকে কিছুতেই ফেরাতে পারলেন না ডাক্তারবাবু। আমতা আমতা করে ইংরেজি-হিন্দি মিশিয়ে যা বললেন তা অবশ্য কিছুই বুঝলো না সুমন্ত। তবে এটা বুঝল যে, মৌমিতা সব জানে। হোটেলে ফিরে মৌমিতাকে চেপে ধরল সুমন্ত। যেভাবেই হ'ক আজ তাকে জানতেই হবে যে, কে দিয়েছিল কিডনিটা। কোথায় সেই ডোনার ? কত পয়সা নিয়েছিল? 

- কী হবে এসব জেনে আর? লাভ কী ?

- কেন? 

- থাক না সুমন্ত।

- না, আজ বলতেই হবে তোমাকে।

- প্লিজ সুমন্ত। 

- আজ কোন কথা শুনব না। বলো। 

- কী দরকার? ঠিক তো আছ। সুস্থ তো আছ।

- আরে সেটা বললে কি হয় নাকি! আমার দিব্যি। আজ তোমাকে বলতেই হবে। লোকটাকে একটা ধন্যবাদ তো দেব।

- সেটা সম্ভব নয় সু। 

- কেন? কেন সম্ভব না?

- বেঁচে নেই আর সে।

- মানে?

- মানে অ্যাক্সিডেন্টাল কেস ছিল...

- তারপর?

- ব্রেন ডেথ হয়....বাবা-মা অঙ্গদানের অনুমতি দেন। তাই কলকাতা থেকে প্লেনে কিডনি যায়, গ্রীন করিডোর করে এয়ারপোর্ট থেকে হসপিটালে নেওয়া হয় সেই কিডনি। 

- তা...তাহলে আমি...

- হ্যাঁ সু, তুমি এমন একজনের কিডনি নিয়ে বেঁচে আছো যে নিজে আর বেঁচে নেই। 

- এতগুলি বছর ধরে বলো নি কেন? 

- শর্ত ছিল যে তোমাকে বলা যাবে না।

- মানে?

- মানে যারা পারমিশন দিয়েছিলেন তাদের ওই একটিই শর্ত ছিল যে, কাউকে বলা যাবে না...তোমাকেও না। 

- পা...পারমিশন কে দিয়েছিল?

- ছেলেটির বাবা-মা। সারা দেশ তখন জেনেছিল তোমার কথা। আমার মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করাটা খবর হয়েছিল। ওনারা ব্যাপারটা জানতেন।

- কী হয়েছিল যার কিডনি তার?

- বাইক থেকে পড়ে গিয়েছিল। পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের তরতাজা ছেলে ছিল। ব্রেন ডেথ। তখনই ওরা সিদ্ধান্ত নেন ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখবেন এভাবেই অঙ্গদান ক'রে। তবে কিডনিটাই নেওয়া গিয়েছিল শুধু। আর কিছু সম্ভব হয় নি।

- তু..তুমি জানো তারা কারা? মানে ছেলেটির বাবা মা?

- জানি।

- ব...বলো। বলো শিগগিরি।

- থাক না সুমন্ত। 

- থাকবে কেন! বলো। এক্ষুণি।

- কী হবে এসব জেনে আর! 

- সেটা বললে হয় নাকি! জানব না তিনি কে?

- থাক না...

- না। আজ বলতেই হবে। 


সুমন্তর জেদের কাছে হার মানে মৌমিতা। নামটা বলে। নামটা খুব চেনা চেনা লাগে সুমন্তর। কোথায় কোথায় শুনেছে নামটা! বিদ্যুৎচমকের মতো নামটার মালিকের চেহারাটা মনে পড়তেই ধপ করে বসে পড়ে সে। 

চোখের সামনে থাকা মৌমিতার চেহারা মুছে গিয়ে সুমন্ত দেখে বৃদ্ধ সেই হেডমাস্টার কাঁচের ঘরের ওপাশ থেকে তার দিকে তাকাতে তাকাতে বৃদ্ধা স্ত্রী-কে নিয়ে অথর্ব পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন...

1 টি মন্তব্য:

  1. দারুণ লাগলো গল্পটি। বেশ অন্যরকম। শৌভিক দার নিজস্ব নির্মাণ শৈলী গল্পটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

    উত্তরমুছুন