রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মলয় মজুমদার।। পারক গল্পপত্র



জেলের সেলটা আধো অন্ধকার । রাতদিন, সকাল, সন্ধ্যা । একই রকম । দিনের আলো আসে না খুব একটা । রাতে যে বাল্বটা জ্বলে ,সেটার আলোটাও টিমটিম । সেলের সামনে একটা লম্বা করিডোর । সেখানে কয়েকটা বাল্ব জ্বলে । এই আধো অন্ধকারেই কয়েকটা মাস কেটে গেলো । বিচারাধীন জেলবন্দি অনিমেষ । উই পি এ আইনে গ্রেপ্তার । সাত মাস । যদিও এটা অনিমেষের প্রথম হাজতবাস নয় । এর আগে দু’বার তাকে জেলে কাটাতে হয়েছিল । প্রথমবার তিন মাসের জন্যে । দ্বিতীয়বার তিন বছর । বয়স এখন আটত্রিশ । ছিপছিপে লম্বা । ঠ্যাঙারে চেহারা । প্রায় ছ’ফিট লম্বা । মাথা ভর্তি চুল । দিল্লীর কনাট প্লেস থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় । বছর দুই আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সে গিয়েছিল দিল্লীতে । প্রথমে এক বন্ধুর বাড়িতে । পরে নিজেই ভাড়া নিয়েছিল এক কামরার ফ্ল্যাট । একটা চাকরিও জুটেছিল বন্ধুর রেফারেন্সে । কিন্তু বেশিদিন আর চাকরিটা করা  হলো না । একভোর রাতে অনিমেষকে ঘুম থেকে তুলে আনলো দেশের নাম করা গোয়েন্দা সংস্থা ।  মার্চের প্রথম সপ্তাহে এই সেন্ট্রাল জেলে তাকে চালান করা হয়েছে ।  এই আধো অন্ধকার কুঠুরিতে এখন তার বাস ।  মাঝে মাঝে কিছু লোক আসে, কখনো এই কুঠুরিতে , কখনো বা জেলের ইন্টারগেশন চেম্বারে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় । জেরা করে । তারপর তারা চলে যায় । আর অনিমেষের  ঘুরেফিরে এই কুঠুরিতে স্থান হয় । এইদিকে সাধারণ কয়েদীদের আসা নিষেধ । পালাবদল করে সেন্ট্রি বদল হয় শুধু । 


এম এস সি তে দূর্দান্ত রেজাল্ট ছিল অনিমেষের । মা বলেছিল পি এইচ ডি করতে ।  কিন্তু সেদিকে কান দেয়নি । কোন রকমে একটা স্কুলের চাকরি জোটাতে পারলেই অনিমেষ যেন শান্তি পায় । তার জন্যে অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি । খুব সহজেই চাকরিটা হয়েছিল । তখন অনিমেষ সাতাশ । ঊনত্রিশে এসে অনিমেষ বিয়ে করলো । বাবা মার এক মাত্র সন্তান সে । অনেকদিনের পরিচিত মেয়ে মৌপিয়াকে । পাড়ার কাছাকাছি । কিছুটা পারিবারিক সম্পর্ক । মা নাকি অনেকদিন আগেই ঠিক করে রেখেছিল,  মৌপিয়াকে বাড়ির বউ করে আনবে । মায়ের এই বিষয়টিতে অনিমেষের অবাক লেগেছিল । সে যেভাবে তার মাকে দেখেছে । তার সাথে এই বিষয়টি মেলাতে পারেনি । ছোট থেকে মা এর যে রূপ দেখেছে সেখানে এই রকম একটা সামাজিক ইচ্ছা প্রকাশ পেতে পারে মায়ের মনে, সেটা কল্পনাও করেনি । ফিজিক্সের শিক্ষিকা কল্পনা ঘোষ । অনিমেষ দেখতো মা সময় পেলেই অঙ্ক করতো । ফিজিক্সের অঙ্ক । ছোট বেলায় অবাক হয়ে দেখতো । তারপর বড়ো হবার পর , যখন নিজের মধ্যেও সেই স্বভাবটার বর্হিপ্রকাশ ঘটলো । তখন সে অনুভব করলো, মা কেন সুযোগ পেলেই অঙ্ক নিয়ে বসতো । ঠিক অঙ্ক নয় । যেন জীবনের হিসেবটা মিলিয়ে নেওয়া । অভিকর্ষজ ত্বরণ, শেষে বেগ ও উচ্চতা এবং তার সাথে যুক্ত করতো সময়, এই রকম নানা রকম অদ্ভুত গাণিতীক প্রয়োগ মাকে করতে দেখেছে  । যখন মা কোন অঙ্কের সমস্যার শেষ অধ্যায়ে চলে আসতো, যেখানে সমাধান মায়ের হাতের মুঠোয়, তখন মাকে অদ্ভুত মায়াবীর মতো মনে হতো । চোখে মুখে অদ্ভুত অনুভূতি । যেন কোন দেবী । যার চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে আলোর রোশনাই ।  মায়ের এই রূপ তার কাছে প্রতিবার নতুন নতুন ভাবে ধরা দিতো । সে এক অন্য জগৎ । অনুভূতির জগৎ । শুধু অনুভব করা যায় । কাউকে তার বর্ণনা করা যায় না । 


মা কবে যে মৌপিয়াদের পরিবারের সাথে এই রকম একটা সন্ধি করেছিল , সেটা সে জানে না । প্রথমে না করেছিল । অনিমেষ জানতো মৌপিয়াকে । তার স্বভাবের থেকে একদম উল্টো প্রকৃতির । কিন্তু মা নাছোড়বান্দা । এক সময় রাজি হয়ে যায় বিয়েতে । মৌপিয়া অসাধারণ সুন্দরী দেখতে । প্রাণবন্ত । ফুর্তি করতে ভীষণ ভালোবাসে । একবার ড্যান্স বাংলা ড্যান্সে কয়েকটি রাউন্ড ঘুরে এসেছিল । অনেকেই যে মৌপিয়াকে পছন্দ করতো, সেটা অজানা ছিল না । অনিমেষের মনেও যে মৌ্পিয়াকে ভালো লাগার ইচ্ছেটা ছিল না, তা না । কিন্তু অনিমেষ সব সময় নিজের গোপন ইচ্ছেটাকে শাসন করে রেখেছিল । কিন্তু মায়ের প্রস্তাবে  গোপন ইচ্ছেটা সামলাতে পারেনি । ধুমধাম করে বিয়ে হলো ।  বাবা দুহাত উজাড় করে বিয়ে দিয়েছিল ছেলের । এই রকম একজন সুন্দরীকে বিয়ে করে অনিমেষ প্রথম প্রথম নিজেকে বেশ এলেমদার ভাবতে শুরু করেছিল । কাশ্মীরে হানিমুনটা সেরেছিল বেশ জমকালো ভাবে । তারপর যা হয় স্বাভাবিক জীবন যাপন । স্কুল বাড়ি । বউ । সংসার । সাথে ফিজিক্স ।


অনিমেষ ম্যারমেরে স্বভাবের না হলেও । কিন্তু মৌ্পিয়ার স্বভাবের থেকে একদম আলাদা । কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক  । বন্ধু বান্ধব ছিল । কিন্তু  তাদের সাথে সেভাবে কোনদিনই নিজেকে নিমজ্জিত করতে পারেনি  । অনেক ব্যাপার সে কোনদিনই মানিয়ে নিতে পারেনি বন্ধুদের সাথে ।  যেমন তার কোনদিনই বারে বসে মদ খেতে ভালো লাগতো না, আর যেটা অনিমেষের বন্ধুরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিতো । মদের মধ্যে একটা অবৈ্ধতা তার পছন্দ । তাই  সে কখনো মালা, কখনো সুখেন কখনোবা রতনের অবৈধ ঠেকের এক কোণে বসে দেশী মদের বোতল খালি করতো । অতীব কুৎসিত মালার মধ্যে রাতের অন্ধকারে বনলতা সেনের রূপ অনুভব করতো । কত কত দিন মালার মুখের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠতো,’কেন চেয়ে আছো গো মা…… ‘।    বন্ধুরা সহ্য করতে পারতো না । কেমন ঘিনঘিনে ভাব তাদের শরীর থেকে বেরিয়ে আসতো অনিমেষের ওই স্বভাবের জন্যে । পার্থ একদিন প্রায় টেনে হিঁচড়ে তাকে নিয়ে গিয়েছিল ড্যান্সিং বারে । সেখানকার সুন্দরী মেয়েদের দেখে , অনিমেষের শরীরের মধ্যে ঘিনঘিন একটা ব্যাপার অনুভব করতে পেরেছিল । অথচ তারা সবাই রূপ কথার রাজকুমারীর মতো দেখতে । আধো-আলোকিত বারে তাদের রূপ যেন ছড়িয়ে পড়েছিল ।  কিন্তু  দশ মিনিট পরেই সবার  চোখে ধুলো দিয়ে উঠে গিয়েছিল মালার ঠেকে ।   মালার ওই কুৎসিত মুখ ও শরীর । কালো মুখের মাঝে সাদাসাদা দাঁতের হাসি , আহা সে যেন এসেছে কোন পদ্ম্য বনে । যেখানে মালা তার রূপ কথার রাজকন্যা , আর সে এক তৃষ্ণাত্ব পুরুষ ।


অনিমেষের এই অদ্ভুত স্বভাবের কারণ সে নিজেও জানে না । আজো জানে না । বাবা-মার এক মাত্র ছেলে হয়ে কিভাবে এই অদ্ভুত একটা স্বভাব পেলো ? জানে না সে । সোনার চামচ না হোক, রূপার চামচ তো এনেছে জন্মের সাথে, কিন্তু তার এই স্বভাব ? এখন ভেবে অবাক লাগে অনিমেষের । জেলে বসে অনিমেষ অতীতকে ভাবে , অনেক ভাবে । শুধু ভাবতে থাকে । নিজেকে পরখ করে । অনেক কেন’র জন্ম হয় মনের মধ্যে । কিন্তু অনেক কেন’র কোন জবাব  পাওয়া যায় না ।  


(২)


অনিমেষকে একবারই কোর্টে তোলা হয়েছিল ।  স্পেশাল কোর্ট । ওই রকম কোর্ট আগে দেখেনি সে । আগের কেসগুলোতে যে রকম কোর্ট ও কাঠগড়া দেখেছে  । সেগুলো আলাদা । আর এটা আলাদা । একটা খাঁচার মতো ঘেরা কাঠগড়ায় তাকে দাঁড় করানো হয়েছিল । কেউ অনিমেষকে কোন প্রশ্ন করেনি না সেদিন । শুধু উকিল ও জর্জ সাহেবের কথোপকথন , মাঝে একজন লোককে কিছু প্রশ্ন করা হয় ,সে  লোকটি অনিমেষের চেনা মুখ ।   


অনিমেষ এজলাস মাপে । খাঁচার ভেতর অনেক মশা,মাছি ও পোকা, সে  মশা মারে । মাছিদের মারতে পারে না । কেমন ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় । কিছু পোকারা ওড়ে না । ওদেরকে টিপে মারে । মারে আর হাসে অনিমেষ । পোকারা মরে যাবার পর অনিমেষের চোখ জ্বল জ্বল করে  । ওদের শরীর থেকে কি রকম একটা অ্যাসিড বেরিয়ে আসে । যা কিনা মশাদের শরীর থেকে বের হয় না । মশারা একবারে মরে যায় । পোকারা মরে না । পোকাদের পশ্চাদপদে আঘাত করার পরেও মাথাটা নিয়ে এগোতে চায় । মাথায় আঘাত করলে পাখনা ও পশ্চাদপদ ধরে এগোতে চায় ।  পাখনাগুলো ঝাপটাতে থাকে । অনিমেষ পাখনাগুলোকে শরীর থেকে আলাদা করে, একের পর এক । তখন পোকাগুলো আরো বেশি উন্মাদ হয় উড়ে যাবার জন্যে । অনিমেষের মজা লাগে ।  পোকাগুলো নিস্তেজ হলে । স্থিতিজাড্য ও গতিজাড্য সূত্রের সমাপ্ত ঘোষণা করার পর অনিমেষ পোকাদের দিকে তাকিয়ে হাসে ।  পোকাদের মৃত্যুর সাথে সাথেই অনিমেষেরও শুনানী শেষ হয় ।  সেদিনের পর  থেকেই এই কুঠুরিই অনিমেষের পৃথিবী ।


যে কুঠুরিতে তাকে রাখা হয়েছে । এটা জেলের অনেকগুলো  বিশেষ কুঠুরির মধ্যে একটা । দেশদ্রোহ বা খুনখার অপরাধীদের এই রকম কুঠুরিতে রাখা হয়  । অনিমেষ ছাড়াও এক অধ্যাপক ,এক ডাক্তার ও রিসার্চ স্কলারকে এই জেলের বিভিন্ন কুঠুরিতে এনে রেখেছে । এরা সবাই ইউ পি এ আইনে গ্রেপ্তার । দু’এবার দেখা হয়েছে । গোয়েন্দা বিভাগের কর্তারা কয়েকবার সবাইকে এক সাথে জেরা করেছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত । অনেকটা গোল টেবিল বৈঠকের মতো লেগেছিল । রাজনৈ্তিক মতার্দশ অনিমেষের ছিল । যদিও কোনদিন কোন মিটিঙে হাঁটেনি সে । যে টুকু ছিল সেটা শুধুই নিজের মনের মধ্যে । অনেক মধ্যবিত্ত মানুষের যেমন থাকে । সেই রকম । জারণ ছিল । কিন্তু প্রকাশ ছিল না  । সেদিন গোল টেবিল জেরাতে ওই লোকগুলোর কথাতে পরিস্কার ছিল রাজনৈ্তিক চিন্তাভাবনা । কিন্তু অনিমেষ এদের কাউকে চেনে না । তবু সেই গোয়েন্দারা প্রতিবার অনিমেষকে ওদের সাথে, ওদেরকে অনিমেষ সাথে জড়াতে চায়ছিল ।


 আবার কোন কোনদিন অনিমেষকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে । একই প্রশ্ন বার বার, ঘুরেফিরে, একই জায়গাতে  । অনিমেষের উত্তর জানাছিল না । কখনো প্রশ্নের মধ্যে  প্রলোভন ছিল অনেক । মুক ও বধিরের মতো চেয়ে থাকা ছাড়া তার কাছে অন্য কিছু ছিলনা । দশ বারো ঘন্টা একই প্রশ্নের বিভিন্ন রূপের ঘ্যান ঘ্যান অনিমেষকে ক্লান্ত, অবসন্ন করে দেয় ।  গোয়েন্দাগুলো চলে যাবার পর  যখন তাকে আবার কুঠুরিতে চালান করা হয়  , তখন আর  অন্যদিনের মতো বসে থাকতে পারে না,  ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে ।


    অলস যাপনের মধ্যেই দিন কাটে অনিমেষের । কোন কাজ নেই । প্রথম প্রথম কুঠুরির দেয়াল জুড়ে ফিজিক্সের অঙ্ক করতো । করতে করতে দেওয়াল ভরে যেতো  । মুছে আবার করতো ।  কিন্তু এখন আর করে না । দিনগুলো কেটে যায় । মাঝে এক সেট্রির সাথে একটু ভাব জমেছিল । কখনো মাঝরাতে । কখনো রাতে  খাবারের পরে । ছেলেটি বেশ । বছর তিরিশের ছেলেটি  । ভেবেছিল কবি হবে । কিন্তু হতে পারেনি । পেটে খাবার না থাকলে কিভাবে কবি হবে । বৃদ্ধ্ব মা ।  অবিবাহিত দিদি ও বোন, বখে যাওয়া ভাই । ভাড়া বাড়ি । ভাত বাড়ন্ত ।


  পাড়ার কোন এক নেতাকে ধরে চাকরিটা পেয়েছে । প্রথমে লাল পার্টিতে । পালা বদল হতেই ঘাসফুল । আগের নেতাটি অনেক খাটিয়েছে । কিন্তু চাকরির কথা বললেই, বলতো “’আমাদের আদর্শ পাইয়ে দেওয়া রাজনীতিকে সমর্থন করে না ।’ অথচ বাড়ি পোষ্যগুলো ছাড়া সবারই সরকারী চাকরির খাতায় নাম উঠে গেছে । বিড়বিড় করে সব  বলতো । আর অনিমেষ মন দিয়ে সেই সেন্ট্রির গল্প শুনতো  । শুনেছিল কিভাবে ওর বাবা দিনের পর দিন পালিয়ে বেড়াতো, পুলিশ ও গুন্ডাদের ভয়ে । কখনো কখনো রাতে বাড়ি এসে, ছেলে মেয়ে বউকে একবার দেখেই আবার গা ঢাকা দিতো । কিন্তু একদিন আর গা ঢাকা দিতে পারেনি । রাস্তার মোড়ে গুন্ডাদের হাতে খুন হয়েছিল ভোজালির কোপে । সালটা ছিল উনিশ'শ পঁচাত্তর । অনিমেষ শুধু বলেছিল,’সে সব তো ইতিহাস, কমরেডরা কি আর সেই সব ইতিহাসকে মনে রাখে ? তাই হয়তো পার্টির অস্তিত্ব এখন মানুষের থেকে হাজার মাইলে দূরে চলে গেছে ’ ।  সেই রাতই শেষ কথা হয় সেই ছেলেটির সাথে । তারপর দেখা হয়নি । কিছুদিন আগে অনিমেষ জানতে পারলো, ছেলেটি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে । কারণ অজানা ।




(৩)


একই অঙ্ককে বিভিন্ন পদ্ধত্বিতে সমাধান করা । আর তাকে কেন্দ্র করে নতুন ভাবনা ও তার প্রায়োগিক পদ্ধতিগুলো লিখতো । যেমন মাকে দেখেছিল, মা সেগুলো কি করতো কে জানে, কিন্তু অনিমেষ ইন্টানেটে সেগুলো নিজের ব্লগে পোষ্ট করে রাখতো । সেটা সে শুরু করেছিল  এম এস সি তে ভর্তি হবার পর থেকেই । । এই একটি বিষয়ে অনিমেষের উৎসাহের অন্তছিল না । রাতের পর রাত জেগে থাকতো । একটা ঘরকে গবেষণার ঘর  বানিয়ে নিয়েছিল নিজের মতো করে ।


   বিয়ের পরে প্রথম প্রথম মৌপিয়া কিছু বলতো না । আবার উৎসাহও দেখাতো না । ধীরে ধীরে মৌপিয়ার মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন প্রকাশ পেতে শুরু করলো । সব সময় একটা খিটখিটে ব্যবহার । যা মুখে আসতো বলে দিতো । অনিমেষের অঙ্কের পাগলামোটা অসহ্য মনে হতো মৌপিয়ার । কিন্তু অনিমেষ সব বুঝেও চুপ করে শুনতো ।  “পাগল, মাথা খারাপ, আনস্মার্ট” কত কি বলতো । অনিমেষ চুপ । আর চুপ থাকাটা যেন আরো বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলতো মৌপিয়াকে । শরীরকে ছুঁতে দিতো না । হাতটা কোন ভাবে গায়ে স্পর্শ করলেই এমনভাবে  ছুঁড়ে ফেলতো, মনে হতো যেন শূন্যে ভাসিয়ে দেবে সব । সেই অন্ধকারেও অনিমেষ অনুভব  করতে পারতো ঘৃণার তীব্রতা ।



“রোল অফ ম্যাথামেটিস ইন মোর্ডান টেকনলজি”, এই বিষয়টা নিয়ে অনিমেষ বহুদিন ধরে কাজ করছিল । মুম্বাই এর এক গবেষণা কেন্দ্রের মাসিক জার্নালে অনিমেষের একটা লেখাও জায়গা পেয়েছিল । সেই সুবাদে সেবার তাকে মুম্বাই যেতে হয়েছিল পনের দিনের জন্যে । খবরটা মাকে খুব খুশি করেছিল । সে বারই বাবা যাবার সময় নিজে এসেছিল ছেলেকে ট্রেনে তুলে দিতে ।  অনিমেষের ফিজিক্সের পাগলামির জন্যে যে এই রকম একটা সম্মান পেতে পারে,সেটা সে নিজেও ভাবতে পারেনি কোনদিন । অনেক উৎসাহ ও আশা নিয়ে ফিরেছিল সেদিন মুম্বাই থেকে । অনিমেষের ব্লগ ও বক্তৃতা সবাইকে ভীষণ আকৃষ্ট করেছিল । কিন্তু বাড়ি ফিরে সব উল্টে গেলো । বউ নেই । মা বললো ,”বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে, তুই যাবার পরের দিনই “ । বাবা বললো, “তোকে পুলিশ খুঁজছে । তুই না ফিরলেই ভালো করতিস ।” অনিমেষ কিছুটা অবাক,  ও বাকহীন হয়ে পড়েছিল সেদিন । নিজের শোবার ঘরে ঢোকার আগেই পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল,  পাড়ার লোকজন এর ওর মুখের প্রশ্ন চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো অনিমেষের গ্রেপ্তারী ।  


 সেই প্রথম অনিমেষের জেল যাত্রা । তিনমাস জেলে বসে প্রমাণ করার কোন সুযোগ পায়নি  । অনিমেষের বাবা অনেক চেষ্টা করেছিল । কিন্তু মেয়ের বাড়ি থেকে কেসটা উঠিয়ে নেয়নি । মা নাকি মৌপিয়ার পা ধরতে বাকি রেখেছিল । পাড়ার নেতাদেরও ধরেছিল । কিন্তু কিছু হয়নি । তিন মাস জেল খাটার পর । যেদিন বাইরে এলো, চাকরিটা চলে গেছে । উদভ্রান্ত জীবন । তার ছ’মাস পরে পারস্পারিক সমঝোতার মধ্যে দিয়ে  ডিভোর্স হলো । সেদিন শেষবারের মতো   মৌপিয়ার মুখোমুখি হয়ে শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল,”আমি কি তোমার উপর সত্যি শারীরিক অত্যাচার করতাম ?” মৌ্পিয়া ভাবলেশহীন ভাবে বলেছিল, “উকিল বললো এই ভাবে কেস সাজালে তাড়াতাড়ি ডির্ভোস পাওয়া যাবে । আমিও হা বলে দিলাম । না হলে হয়তো তোমার মতো ম্যারমেরে শিক্ষকের সাথে সারা জীবন কাটাতে হতো । “  


কথাগুলো শুনে অনিমেষ আকাশের দিকে চেয়ে খুব জোরে হেসে উঠেছিল  । আর কিছু বলার ছিলো না অনিমেষের । চুপচাপ কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল শূন্যতার আকাশ । এক নিথর স্থবিরতা অনিমেষকে ছেয়ে ফেলেছে । যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই ধপ করে বসে পড়লো । কতক্ষণ বসেছিল সে বোধ ছিল না । শুধু অন্ধকার ছিল চোখে । একটা ভিক্ষারীর ধাক্কায় যখন বোধটা ফিরে পেয়েছিল ।   রাত হয়ে গেছে । ভিক্ষারীটি তার রাতের শোবার ব্যবস্থা করছে । আর অনিমেষ সেই ভিক্ষারীর বরাদ্দ জায়গা দখল করে বসে আছে  । 


জেলের এই কুঠুরি থেকে আকাশ দেখা যায় না । শুধু এক ফালা করিডোর । অথচ আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে দারুণ লাগে অনিমেষের । মা যখন অঙ্ক করতে করতে ক্লান্তি অনুভব করতো, জানালা দিয়ে আকাশ দেখতো । ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলো সবই অনিমেষ মায়ের থেকে পাওয়া । বহুদিন অনিমেষ আকাশ দেখেনি ভালো করে । সবার থেকে বিচ্ছিন্ন একটা কুঠুরিতে তার বাস । কেউ এই দিকে আসে না । শুধু  সেন্ট্রিরা আসে পালাবদল করে  ।  সেলের ভেতরেই খাওয়া, হাগা, স্নান করাসহ সব কিছু । এক কোণে হাফ দেওয়াল তুলে সেখানেই বাথরুম । জমাদার মাঝে মাঝে এসে পরিস্কার করে । প্রথম প্রথম ভীষণ দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগতো । এখন আরে লাগে না । অভ্যাস হয়ে গেছে  সব ।  


অনিমেষ শুনেছিল একবার জেলের ভাত খেলে, ভয়ভীতি সব লোপ পেয়ে যায় ।  তার কিন্তু সে রকম কিছু হয়নি । অনিমেষের এখনো ভয় করে । ভয় করে জেলের এই চারদিক ঘেরা প্রাচীরের উচ্চতার কথা ভেবে । ভয় করে এই আধো-অন্ধকার কুঠুরি । কত চিন্তা আসে মাথার মধ্যে সারাদিন , কতক জারণ হয়, কতক ভুলে যায় । কিছু মাছি । আর কিছু পোকাদের সাথে জেগে থাকে অনিমেষ । রাত বাড়ার সাথে সাথে  বাড়ে  ভাবনার গতিবেগ । কল্পিত সব ভাবনায় শিহরিত হয় । কেঁপে ওঠে । ছোট বেলায় ভয় পেলে যে ভাবে মায়ের বুকের মধ্যে মুখ লুকাতো । আর এখন সেই ভাবেই তেল চিটচিট কম্বল বা গন্ধে ভরা বালিশে মুখ লুকায় ।


অনেকক্ষণ চুপচাপ চিন্তার জালে থেকে, কেমন যেন গলাটা শুকিয়ে গিয়েছল। জলের কুঁজো থেকে জল ঢেলে তৃষ্ণা মিটিয়ে আবার সেই  কংক্রিটের বিছানায় বসে পড়লো । বিছানা বলতে একটা কম্বল পাতা । একটা বালিশ । মশারি আছে । কিন্তু কোনদিন ব্যবহার করেনি । মশারি টাঙালে  গরম একটু বেশি লাগে । মশার কামড় প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে । ফ্যান একটা আছে । কিন্তু তার যা গতি ক্ষীণ ।  গুমোট গরম । দুর্গন্ধ । মশার কামড় । মাঝ রাতে বসে বসে মশা মারা মধ্যেই আজকাল আনন্দ খুঁজে পায় । সব কিছু গা সওয়া হয়ে গেছে । এখন অনেক কিছুই ক্রিয়া করে না শরীরে ।


(৪)


প্রায় সাত বছর আগের এক সন্ধ্যায় অনিমেষ ট্রেনে করে ফিরছিল আসাম থেকে । ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস । আলিপুরদুয়ার আসতে আসতে সন্ধ্যে নেমে এলো । কিছুটা ভবঘুরে জীবন তখন অনিমেষের । এক জামা কাপড়েই  চলে যেতো এদিক ওদিক । মুখ ভর্তি দাড়ি । ট্রেন আলিপুরদুয়ার ছেড়ে জঙ্গলের পথ ধরে এগোতে শুরু করলো । অনিমেষ জানালার ধারে বসে অন্ধকারের মধ্যেই প্রকৃতি দেখার চেষ্টা করছিল । মাঝে মাঝে পিচ রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়া গাড়ির আলোতে অনিমেষ দেখতে পাচ্ছিল ঘণ সবুজে ঢাকা জঙ্গল । হঠাৎ কিছু লোক চিৎকার করে উঠলো ,ট্রেনে ডাকাত পড়েছে ।  অনিমেষ যেদিক থেকে চিৎকার আসছিল সেইদিকে এগিয়ে গেলো । কিছু লোক পিস্তল উঁচিয়ে যার থেকে যা পাচ্ছে ছিনিয়ে নিচ্ছে, একসময় তারা ট্রেনের চেন টেনে, এক এক করে নেবে গেলো । ট্রেনের সব যাত্রী ভয়ে কাতর । অনিমেষ নিজের জায়গাতে এসে বসে । ট্রেন ছাড়লো একটু দেরিতে  । জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো । ট্রেন মালবাজার এসে থামতেই, অনিমেষের ঘুম ভাঙলো । 


পকেটের মোবাইলটা দেখলো, এখন সবে সাতটা । আর মাত্র এক ঘন্টা লাগবে শিলিগুড়ি পৌঁছাতে ।  হঠাৎ কি মনে দুম করে নেমে পড়লো  । যদিও টিকিট শিলিগুড়ি জংশন অব্দি । একটু পরেই আর একটা ট্রেন আছে  কাঞ্চনকন্যা । ওটা কোলকাতা অব্দি যায় ।  সেটাতেই ফিরবে বলে ঠিক করলো  । ষ্টেশন ছোট হলেও বেশ জমজমাট এই সময়টা ।পরিচিত স্টেশন । অনিমেষের জীবনের প্রথম চাকরি মালবাজার হাইস্কুলে । পরে অন্য এক জনের সাথে অদল বদল করে শিলিগুড়িতে ফিরেছিল । স্টেশনের পুরণো সেই চায়ের দোকান । আগে মুখ চেনা ছিল । এখন আর নেই । এমনিতেও অনিমেষ দেখে চেনার কথা না । দাঁড়ি রাখার পর চেহারায় আমুল পরিবর্তন এসে গেছে , সাথে এসেছে রুক্ষতা চোখে মুখে  । তবু সেই চায়ের স্টলে গিয়ে চা খেলো । কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো লোকটিকে । লোকটিও দেখলো । কিন্তু কোন কথা হলো না । পুরণো স্মৃতিগুলো ধোঁয়াশার মতো খেলে গেলো অনিমেষের মনে । ট্রেন এলো । ভীড় একটু বেশি বলে একটা রিজার্ভেশন কামড়ায় উঠে পড়লো । আর তো এক ঘন্টা । কোন স্পটেজ নেই । টিটি নামতে বললেও সেই শিলিগুড়ি জংশনে গিয়েই নামতে হবে ।

(৫)


সকালে অনিমেষের  ঘুম ভাঙে দেরিতে । মা স্কুলে যাবার আগে চা দিয়ে গেল । জলখাবার রাখা টেবিলে । বাবা বেরিয়ে গেছে  ন’টায় । মাও স্কুলে যাবে । বাড়ি থেকে স্কুল পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ । অনিমেষ  বিছানায় বসেই চা খায় । চায়ে চুমুক দিতেই  কলিং বেলটা চিৎকার করে উঠলো । যে এসেছে তার যে ধৈর্য্যের অভাব আছে। সেটা বোঝা যায় কলিং বেলের আওয়াজ থেকে । মা দরজা খুলে প্রায় অবাক । পুলিশ দরজায় দাঁড়িয়ে । কিছু বোঝার আগেই পুলিসগুলো ঘরের মধ্যে ঢুকে একটাই কথা ,” আপনার ছেলেকে ডাকুন । কাল রাতের ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসের ডাকাতির সর্দার আপনার ছেলে “ । অনিমেষের মা কথাগুলো শুনে বোবার মতো চুপ । অনিমেষ খুঁজে পেতে দেরি হলো না । রাতের কাপড়টা শুধু ছাড়ার সময় দিয়েছিল । তারপর সোজা পুলিশের ভ্যানে । অনিমেষ বা অনিমেষের মায়ের কোন কথায় শুনলো না ।  পুলিশ অফিসারটি প্রায় রুক্ষভাবে মা বললো,”যা কিছু জানার বা বলার থাকলে, পুলিশের ষ্টেশনে এসে জানবেন বা বলবেন ।” অনিমেষের হাতে হ্যান্ডক্যাপ ।


সেই কেসে অনিমেষের জেল হয়েছিল তিন বছর । প্রমাণ বলতে সহযাত্রী নির্মলাদেবী ।  যিনি নাকি স্ব-চোখে ডাকাতদের সাথে অনিমেষকে আলিপুরদুয়ার ষ্টেশনে দেখেছেন চা খেতে ।  অনিমেষই নাকি ডাকাতদের নেমে যেতে সাহার্য্য করেছিল ট্রেনের চেন টেনে  । তারপর  মালবাজার এসে গা ঢাকা দিয়েছিল । সেই স্বাক্ষীর জোরেই  তিন বছর সহশ্রম কারাবাস । সেই নির্মলাদেবী আর কেউ না মৌপিয়ার বিধবা পিসি  । কাঠগোড়া থেকে শেষবার মায়ের মুখের যন্ত্রণা অনিমেষকে বিদ্ধ করেছিল ভীষণ ভাবে । দু’বার বাবা এসেছিল জেলে দেখা করতে । মা একবার । কিন্তু  বাবা বা  মায়ের মুখোমুখি হয়নি । আর কোন যোগাযোগ নেই  তারপর থেকে । কুঠুরির এই অন্ধকার ঘরে বসে সে জানতে পারে না । কেমন আছে মা ও বাবা । শুধু দেওয়ালে প্রায় মুছে যাওয়া অঙ্কগুলো মধ্যে মায়ের ফিজিক্সের ঘ্রাণ খুঁজতে থাকে ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন