শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অরুণ কুমার বিশ্বাস।। পারক গল্পপত্র



বনানী রেল ক্রসিংয়ের পাশে যে ফুটওভার ব্রিজ, সেখানেই আপাতত আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ। অফিস আওয়ার, তাই ফুটওভার ব্রিজ নানান কিসিমের মানুষের হাঁটাচলায় ব্যতিব্যস্ত। কেউ অফিস যাচ্ছে, আবার কেউ বা যাচ্ছে কারবারে। এর বাইরেও কিছু লোক আছে দেখবেন, যারা কিনা ফুটওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে কিছুই করছে না,  স্রেফ মানুষ গুনছে বা নাক-কান খোঁচাচ্ছে। আমাদের কামাল উদ্দিন দৃশ্যত এমনই একজন। এখানে সে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় মিনিট দশেক। আপাতচোখে তাকে বেকার-বেবুঝ বলে মনে হলেও যারা তার মনের খবর রাখে, তারা বিলক্ষণ জানে যে মিছে সময় নষ্ট করার মতোন মানুষ কামাল নয়। বস্তুত, সে একজনের জন্যে অপেক্ষা করছে। একটি যুবতী।


    কামাল মানুষ গোনে, কার মনে কী চলছে তা বোঝার চেষ্টা করে। এই যান্ত্রিক শহরটা যে ক্রমশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে, তা কামালের চেয়ে ভালো আর কে জানে! সত্যি বলতে, এই শহর কামালের নয়, কামালদের মতো উঞ্ছবৃত্তি করে বেঁচে থাকা মানুষের পক্ষে সত্যি খুব কঠিন জায়গা এই ঢাকার শহর।

   

   কিছুক্ষণ বাদে ফুটওভার ব্রিজের র‌্যাম্প ধরে উঠে আসে একটি মেয়ে। ওহ, এখনও তার নামটা আপনাদেরকে বলা হয়নি। ওর নাম সুমি। শেক্সপিয়র যতই বলুন হোয়াটস ইন অ্যা নেম, চলতি পথে হাঁটতে গেলে সত্যি হোক বা মিছে, নাম একটা থাকা চাই। মেয়েটিকে উঠে আসতে দেখে কামালের ঠোঁটে পাতলা হাসির প্রলেপ ছুঁয়ে যায়। সুমি যে তার কথা রেখেছে, তাতেই সে খুশি। সুমি তার দীর্ঘদিনের চেনা। তাদের এই পরিচিতির মাঝে রোম্যান্টিক কিছু খুঁজলে ব্যাপক পস্তাবেন, এই আমি বলে রাখছি। তাদের মাঝে চেনাশোনা আছে, তবে সেই অর্থে জানাশোনা কিছু নয়। আত্মিক যোগ তো নয়ই।


  সুমির পরনে আলাদা করে চোখে পড়বার মতো কোনো পোশাক নয়। সাদা-কালো মিলিয়ে স্যালোয়ার কামিজ, বুকের উপর না-থাকার মতো এক টুকরো স্কার্ফ অবশ্য আছে। সব মিলিয়ে অতি সাধারণ ড্রেস, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘নন-ডেসক্রিপ্ট’। এর বাংলা কী হবে! আটপৌরে। মনে হয় না। কারণ সকল বাংলা শব্দের যুতসই ইংরেজি অনুবাদ করা যায় না। এই যেমন ‘অভিমান’।

 

    কামালও অবশ্য চায় না এ জাতীয় মুসাবিদার ক্ষেত্রে সুমি চটকদার কোনো পোশাক পরে আসুক। তাতে অকারণ লোকের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। ছুঁচো বা ঢ্যামনা প্রকৃতির কেউ কেউ হয়তো আবার কামাল আর সুমিকে জড়িয়ে রগরগে কিছু ভেবেও বসতে পারে।


   এলে তাহলে?

উত্তরে মুচকি হেসে সুমি বলে, তুমি ডাকবে কামাল ভাই আর আমি আসবো না! এমন কখনও হয় নাকি! এই শহরে তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো!


  এর জবাবে কামাল কিছু বলে না। কথায় কথা বাড়ে। তাছাড়া ওরা তথাকথিত সভ্যসমাজের কেউ নয় যে ভদ্রতা করে কথার পিঠে কথার লেজুড় জুড়তে হবে। সুমি ওর অতি মসৃণ ও ফিনফিনে, মাত্র চার ইঞ্চি চওড়া স্কার্ফ দিয়ে বিকচমান বুক ঢাকতে ঢাকতে বলল, কেন ডেকেছো বলো? বড় কোনো মক্কেল আছে নাকি!


  তেরছা হেসে কামাল বলল, ‘তা আছে বটে। তবে এবারকার কাজটা একটু অন্য ধরনের। গতানুগতিক নয়।’


 ওর কথার ধরন দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কামাল মেয়েছেলের দালাল হতে পারে, তবে সে অশিক্ষিত নয়। বরং এলাকার একটা নামকা ওয়াস্তে কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করে শহরে এসেছিল চাকরি করবে বলে। মিডিওকার গোছের কিছু স্বপ্নও ছিল কামালের মনে। কিন্তু চাকরি ওর হয়নি। কারণ কামাল সঠিক দরজায় এখনও ঘা মারতে পারেনি। ঠিকঠাক লাইন-ঘাটও করে উঠতে পারেনি বেচারা কামাল। তাই বলে সে দমবার পাত্রও নয়। ঝোঁক বুঝে কাজে নেমে পড়েছে। বছর দুয়েকের মধ্যেই সে সমাজের উপরতলায় পা ফেলতে পেরেছে। এখন সে অনায়াসে আঠারো উনিশ তলার উপরে উঠে পাত্তিঅলা রাজাগজার সঙ্গে বসে আরামসে কফি খেতে পারে। তার হাতে মেলা নগদ টাকা, যদিও টাকার গন্ধ তাকে খুব একটা টানে না, যতটা টানে গেঁয়ো জমিনের আলপথে দাঁড়িয়ে জ্যোৎ¯œালোকিত রাত কিংবা সদ্যফোটা হাসনাহেনার দল। অর্থাৎ মনটা এখনও পুরোপুরি মরে যায়নি কামালের।


  সুমি, কিছু খাবে?

  নাহ। তুমি কাজের কথা বলো কামাল ভাই। তাড়া আছে একটু। সুমির চোখের তারায় ঘূর্র্ণি খেলে, কামালের কাছে সে তার দর বাড়াতে চায়। কামাল সব বোঝে, বুঝেও চুপ মেরে থাকে। সে জানে, সুমি তার মতো নয়। সে পুরোপুরি ‘এই’ লাইনের মেয়ে। টাকার জন্যে সুমি সব করতে পারে। এভরিথিং।


  ‘কাজটা একটু জটিল। তবে আমি জানি, তুমি পারবে সুমি। কাজটা কিন্তু করে দিতে হবে।’ প্রতিটি শব্দের উপর এক্সট্রা জোর ঢেলে কথাগুলো বলল কামাল। সুুমিও বোকা নয়। কাজ বুঝে সে টাকা উসুল করতে জানে। পার্কে বা সস্তার টুপাইস হোটেলে যারা ঘণ্টায় ঘণ্টায় শরীর বেচে, সুমি ঠিক সেই দলে পড়ে না। শরীর সেও বেচে, তবে তার দর অনেকখানি বেশি। এই যেমন পাঁচ টাকার চা ফাইভ-স্টার হোটেলে পাঁচশ টাকা বিকোয়। দুনিয়াটাই এমন, সবার জন্যেই সবকিছু সাজানো গোছানো আছে। যে যেমন লুফে নিতে পারে আর কি! আবার নিলেই তো হবে না, তা হজমও করতে হবে। নইলে মাঝপথে বদহজম হয়ে টেঁসে যেতে কতক্ষণ!


  কামাল লক্ষ্য করে, দুএকজন চোরা চোখে ওদের দেখছে। রসালো কিছু ভাবছেও হয়তো। ভাবুক না, চিন্তার স্বাধীনতা এদেশে সবার আছে, যদিও মুখ ফুটে বলার অধিকার নেই। মতের বিরুদ্ধে কিছু বললেই আচমকা নিরুদ্দেশ।

 

   উসখুস করে সুমি। বারবার মোবাইলের আলো জে¦লে ঘড়ি দেখে। ঈষৎ কষা গলায় সে বলে, কী কাজ তাই তো বললে না কামাল ভাই।


  একজনকে ফাঁসাতে হবে। দুম করে অমনি বলে দেয় মেয়েছেলের শিক্ষিত দালাল কামাল উদ্দিন। নিজেকে সে ‘পিম্প’ বলে ভাবতে মোটেও লজ্জা পায় না। এটা এখন তার ফুলটাইম পেশা বৈকি! 

  কাকে! কেন?

  লোকটাকে তুমি চেনো সুমি। বারকয়েক মোলাকাতও হয়েছে তোমার সঙ্গে। ভালো পেমেন্ট দেয়। সাদাচোখে দেখলে ভদ্র বলেই মনে হয়।

 

  তাহলে! মিছে তাকে ফাঁসাবে কেন কামাল ভাই? লোকটা কে, শুনি।

  মতিঝিলের কাউছার সাহেব। ফ্যামিলি ম্যান, তবে খুব ছুঁকছুঁকে। তার নিত্যনতুন মেয়ে চাই। বেশি টাকাকড়ি হলে যা হয় আর কি! গোঁফঅলা, গায়ে ভীষণ দুর্গন্ধ! জন্মগত। মনে পড়েছে?    

   সুমি কিছু বলে না। হয়তো মনে করবার চেষ্টা করছে। বলল, তাকে কেন ফাঁসাবে বলো তো! আমাকেই বা কী করতে হবে?

  তেমন কিছু না। বরাবর যা করো, তাই করবে। 

  মানে? 

  ঘনিষ্ঠ হয়ে তারপর ...! কথা শেষ করে না কামাল উদ্দিন। দুজন উর্দিধারী পুলিশ এদিকে আসছে। ওদেরকে আবার সন্দেহ করেছে নাকি! কিন্তু না, কামাল তো তেমন সস্তাদরের কেউ নয়! সুমিও নয়। ওরা রাস্তায় নেমে খদ্দের ধরে না। ওরা হাইক্লাসের দালাল। তাহলে! পুলিশ দুজন ওদের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। কিছু বলল না। মিছেই ভয় পেয়েছিল আর কি! 

    ওভারব্রিজের উপরে ঢাকনা নেই। সূর্যটা খুব তেতেছে আজ। শরতের রোদ মানেই বড্ড উত্তাপ। ইশ্ মানুষের ভালোবাসায় যদি একটু উত্তাপ থাকতো! 

    তুমি হঠাৎ কাউছার সাহেবের পিছে লাগতে গেলে কেন বলো তো? সে তোমার কী ক্ষতি করেছে। বেচারা ভালো পেমেন্ট...!

   সুমির কথা শেষ হবার আগেই ঘাঁউ করে উঠলো কামাল উদ্দিন। মুখ খারাপ করে বলল, খেতা পুড়ি তোর পেমেন্টের। টাকায় সব হয়! যার টাকা নাই সে কি মানুষ না! মানুষের মানইজ্জতের কি কোনোই মূল্য নাই! ওই হালার পুত আমার বইনের দিকে কুনজর দিছে। আমি ওর চক্কু তুইল্যা লমু। অয় কী মনে করছে, টেকা থাকলে সক্কলের ইজ্জত নিয়া টানাটানি করন যায়! রাগের সময় কামালের ভদ্রতার মুখোশ খুলে পড়ে। সে আদিম মানুষ হয়ে যায়।  

  একটু দম নিয়ে সে আবার বলে, সুমি, তুমি-আমি এক জাত। ওরা উপরতলার মানুষ। ওরা টেকার গরমে ধরাকে সরাজ্ঞান করে। ওরে আমি ফাঁসাবোই। তুমি আমার সাথে থাকবা।


  সুমি বিষয়টা তলিয়ে ভাবলো। এর নাম শ্রেণিসংঘাত। কাউছারদের সাথে তার নেহাতই কেনাবেচার সম্পর্ক, জোরাজুরির নয়। কামালের বোনের দিকে নজর দিয়ে কাজটা সে ভালো করেনি। টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায় না।


   এর ঠিক দুদিন বাদে ফেসবুকে একটা দৃশ্য ভাইরাল হয়। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাউছার মিঞাকে সেখানে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখা যায়। ফুটেজে সে পুরোপুরি দিগম্বর। তবে মেয়েটিকে দেখা যায় না, শুধু তার অবয়ব অর্থাৎ শরীরের আউট লাইনখানা অস্পষ্টভাবে পরিদৃশ্যমান। কামাল সুমিকে এই শহরে আশ্রয় দিয়েছিল, উপরন্তু ওরা এক কাতারের মানুষ, নেহাত কৃতজ্ঞতাবশত এটুকু সে করতেই পারে। তাছাড়া সিধা রাস্তায় চলতে পারলে কোনো মেয়ে কি তার গতর বেচে!                                                   

    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন