শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সুকুমার রুজ।। পারক গল্পপত্র



  নীলাভ পায়ে পায়ে ছাদে উঠে আসে। খোলা ছাদ।  নিস্তব্ধ।  হালকা হাওয়া বইছে। মেঘ  কাটছে বোধহয়! নীলাভর শরীরে আরামের ছোঁয়া। একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পরে মনের ঝড় থেমে গেছে মাঝরাতে। কিন্তু ঝড়ে বিধ্বস্ত মনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ওর রক্তাভ চোখে আর ঝুলে পড়া ঠোঁটে।  

  পুব আকাশে এখন গেরুয়া আভা। তার মাঝে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করছে। দূরে কলেজ-চত্বরে গাছপালাগুলো আঁধার জড়িয়ে  দাঁড়িয়ে। নীলাভর মনে শুকতারার মতো জ্বলজ্বল করছে সেদিনের দৃশ্যটা। কলেজে প্রথম যেদিন নূপুর সামনে এগিয়ে এসে বলেছিল -- স্যার! নবীন-বরণ অনুষ্ঠানে আমি গান গাইবো। আমার নামটা লিখে নেবেন স্যার!    

সেদিনই নীলাভ মনে মনে জীবন খাতার পাতায় জীবন-সঙ্গিনী হিসেবে নূপুরের নামটা লিখে ফেলেছিল। তারপর চারবছর পেরিয়েছে। তার জীবনের আঙিনায় নূপুরের  রিনিঝিনি পদচারণা ওকে বিজয়ী করেছে। এই চার বছরের অজস্র ঘটনা সুদৃশ্য ছবি হয়ে মনের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে। আজ সে ছবিগুলো কেমন যেন আঁধার জড়ানো। আলাদা করে চেনা যায় না। যেমন কলেজ-চত্বরে আঁধার জড়ানো গাছপালাগুলোর   মধ্যে কোনটা কৃষ্ণচূড়া, কোনটা রাধাচূড়া চেনা যাচ্ছে না।  

  গাছের নিচে কে যেন দাঁড়িয়ে! কলেজের দেওয়ালে নতুন করে অপমান ছড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নাকি কেউ? এ ক'দিনে যা অপমান ছড়িয়েছে, তাতেই তো জীবনের অভিমুখ বদলে গেছে। দু'জনে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। এ কথা মনে আসতেই নীলাভর মনের মধ্যে দমকা হাওয়ার মতো একটা হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে।  

  এমন সময় হা-হা হাসির শব্দে ও চমকে ওঠে। রাধু-পাগলার হাসি। ও তো শুয়ে থাকে কলেজের গাড়ি-বারান্দায়। কখন উঠে চলে এসেছে। কোয়ার্টার্সের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে বিকট শব্দে হাসছে। এটাই ওর ধরন। যাত্রাপালা শুরু করার আগে হা-হা করে  খানিক হেসে নেয়।   

  এবার হাত-পা ছুঁড়ে গুরু গম্ভীর গলায় শুরু হলো রাধু-পাগলার যাত্রাপালার সংলাপ  -- আমি বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলা, আমাকে বন্দী করবে ওই বেনিয়ার  জাত, ম্লেচ্ছ রবার্ট ক্লাইভ!  হা হা হা ...! 

  নীলাভর কান পেরিয়ে মনের ঘরে আলোড়ন তোলে রাধু-পাগলার হাসি। অসহ্য! ওকে কেউ থামাচ্ছে না কেন! ওই যে আবার শুরু করেছে -- কে বলেছে নারী নরকের দ্বার! /নারী মাতা, নারী কন্যা, নারী ভগিনী-দুহিতা/ নারী গান্ধারী, নারী সাবিত্রী, নারী দ্রৌপদী সীতা...।   

নীলাভর ইচ্ছে করে, নিচে নেমে গিয়ে রাধু-পাগলার গলা টিপে ধরে। ওর পাগল- জীবনের ইতি টেনে দেয় এখুনি। ওর মুখখানা কী বীভৎস! মুখের ডানপাশটা পোড়া। ডানচোখটা বেঁচে গেলেও আশপাশটা মরুভূমি হয়ে গেছে। গলায় ঝোলানো দেশলাই  বাক্স, ওষুধের কৌটো এসব সুতলি দিয়ে গেঁথে নিজের হাতে তৈরি করা মালা।  ঠোঁটের চারপাশে থুতুর ফেনা। 

  ও সারাটা দিন বকে চলে। কিন্তু সূর্য ডুবলেই পাগলামি বন্ধ। তখন যেন শান্ত, ভদ্র সেই কলেজের ল্যাবরেটরি-অ্যাসিস্ট্যান্ট রাধেশ্যাম দাস। ওই যে আবার শুরু করেছে। কত কথা যে বলে! যাত্রার সংলাপই বেশি। কখনো সখনো থুতুর সঙ্গে বেরিয়ে আসে ওর বউ মল্লিকার কথা। যার জন্য আজ ওর এই দশা।     

মল্লিকা এই কলেজের ছাত্রী ছিল। প্রেমে পড়ে ওকে বিয়ে করেছিল। বিয়ের একবছর পরেই ওকে ছেড়ে এক অধ্যাপকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল মল্লিকা। তা নিয়ে সারা কলেজে তোলপাড়। ওকেও কম অপমান সহ্য করতে হয়নি! বউ পালিয়ে যাওয়ার দিন কয়েক পরেই ও মনের দুঃখে কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি থেকে এক বোতল মিথাইল অ্যালকোহল নিয়ে গায়ে মাথায় ঢেলে দেশলাই-কাঠি মেরে দিয়েছিল। মরতে পারেনি। যখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল তখন মাথাটা গেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে স্মৃতিশক্তি   ফিরে পায় বোধহয়! ওই যে এখন বলছে ওর প্রেমিকা-বউ মল্লিকার কেচ্ছার কথা।         

  নীলাভর কেন যে এখন রাধু-পাগলার উপর এত রাগ হয়! ইচ্ছে করে ওর পাগলামি আজ ছুটিয়ে দেবে। ও রেগেমেগে সিঁড়িমুখো হয়। কয়েক ধাপ নেমে আসে। হঠাৎ থেমে যায়। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ যেন! তবে কি নূপুর ছাদে আসছে! ঘরে দেখতে না পেয়ে ওকে খুঁজতে আসছে, ওকে বুঝতে আসছে!  

  নীলাভ আর ওর মুখোমুখি হতে চায় না। তাই তড়িৎ-পায়ে  আবার ছাদে উঠে যায়। নূপুরের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করতেই যেন একদম ছাদের কোনায় চিলেকোঠার দেওয়ালের পাশে চলে আসে। এদিকটায় সচরাচর আসা হয় না। দেওয়ালের ফোকরের বাসিন্দা পায়রাগুলো এদিকটাকে বড্ড নোংরা করে রাখে। ওর পায়ের শব্দে ঘুম কাতুরে পায়রাগুলোর ঘুম ভেঙে গেল বোধহয়! ওরা বক-বকম শুরু করলো। নূপুর ছাদে উঠে এসেছে। হয়তো ওকে ছাদময় খুঁজে বেড়াচ্ছে! খারাপ কিছু ভাবতেও শুরু করেছে এতক্ষণে। অনেক ঝগড়াঝাঁটির পর কাল রাতে তো সিদ্ধান্ত নেওয়াই হলো, কাগজে-কলমে দু'জনের ছাড়াছাড়ি। কলেজের দেওয়াল-লিখনকে সত্যি মেনে নূপুর ইচ্ছে করলে অধ্যাপক সেনের সঙ্গে ঘর বাঁধতেই পারে। তার আগে আইনসিদ্ধ-ভাবে দু'জনে স্বাধীন হবে। ইচ্ছে হলে কেউ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেও অন্যের কিছু বলার নেই।   

  শেষ মুহূর্তে নূপুর বলতে চেয়েছিল দেওয়ালের লেখাগুলো মিথ্যে, উদ্দেশ্য-প্রণোদিত। ও বিশ্বাস করেনি। দেওয়ালে লেখা চূড়ান্ত অপমানগুলো ওর বিশ্বাসের দেওয়ালে ভাঙন ধরিয়েছিল। 

  ওদিকে পাগলা হাসি থামিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরেছে -- যখন প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকাবনে ...।  

 এখন ও কেমন যেন শান্ত, স্নিগ্ধ। ওর চোখ মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও বেশ বোঝা যায়, ওর মুখখানায় এখন এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে আছে! এই মুহূর্তে নূপুরের কথাগুলো কেন যে নীলাভর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে!  

  রাধু  হঠাৎ গান থামিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠে। ভোরের গেরুয়া আভায় নীলাভ দেখে, রাধু-পাগলা রাধাচূড়া গাছটাকে জড়িয়ে ধরে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। তা দেখে নীলাভরও কেমন যেন কান্না পেয়ে যায়। ওর ভেতরটা গুমরে ওঠে। ও চিলেকোঠার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কী এক লজ্জা ও অবসন্নতা ওকে গ্রাস করে। ও মাথা নিচু করে পায়রার বিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে থাকে, নাকি কাঁদতে থাকে ওই জানে! এমন সময় নূপুরের আকুল দৃষ্টি ওকে আবিষ্কার করে। পুব আকাশের গেরুয়া পশ্চাদপটে সিলুয়েট যেন! শুধু ওর অবয়ব বোঝা যায়, ছায়া ছায়া আঁধার জড়ানো। নূপুর এক পলক দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীর পায়ে ওর দিকে এগোয়। কাঁধে হাত রাখে। নীলাভ ঘুরে দাঁড়ায়। এক পলক তাকিয়ে থাকে নূপুরের রঙ্গন-রঙা চোখ দুটোর দিকে। তারপর রাধাচূড়ার মত নূপুরকে জড়িয়ে ধরে রাধু-পাগলার মতো হু-হু করে কেঁদে ওঠে।   

  এমন সময় রাধু-পাগলা হা হা করে হেসে উঠে বলতে থাকে -- দিল্লির নবাব আমি সম্রাট শাহজাহান। মমতাজ আমার বেগম। একটা তাজমহল তৈরি করতেই হবে। হা-হা-হা হা-হা-হা ...।  


 


২টি মন্তব্য: